📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই

📄 প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই


আমি অনেকবার ভেবে দেখেছি, নফস কখনো কখনো প্রচণ্ডভাবে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার দিকে ধাবিত হয়। এমনকি যখন সে ধাবিত হয়, অন্তর জ্ঞান বোধ বুদ্ধি বিবেক সকলকে মাড়িয়েই ধাবিত হয়। কারও বাধাই তখন আর মানে না। এ সময় মানুষ কোনো নসিহত দ্বারা উপকৃত হওয়ার অবস্থায় থাকে না।

আমার নফসও একদিন হঠাৎ এভাবে প্রবৃত্তির দিকে ধাবিত হলো। আমি সচেতন সতর্ক হয়ে তাকে বলে উঠলাম, তোমার ধ্বংস হোক, কয়েক মুহূর্ত থামো। আগে আমার কিছু কথা শোনো, এরপর তোমার যা ইচ্ছা করো। সে থেমে বলল, তুমি বলো, আমি শুনছি।

আমি বললাম, প্রবৃত্তির হাতছানি উপেক্ষা করে জায়েয জিনিসের দিকে তুমি খুবই কম যাও। তোমার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ও আকর্ষণ হলো হারাম বিষয়ের দিকে। এখন আমি তোমার স্বভাবের দুটি বিষয় এখানে উপস্থাপন করছি। মনোযোগ দিয়ে শোনো।

এক. তুমি সাধারণত দুটি তিক্ত জিনিসকে মিষ্ট ভাবো। যেমন, জায়েয জিনিসের চেয়ে নাজায়েয প্রবৃত্তির আনুসরণকে মিষ্ট ভাবো। অথচ প্রবৃত্তির সেই কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের দিকে পৌঁছার পথ তো অনেক কঠিন। কারণ, সম্পদের স্বল্পতার কারণে কখনো কখনো সেটি সম্ভব হয়ে ওঠে না। স্বল্প উপার্জনের কারণে তার অধিকাংশটাই তোমার প্রাপ্তিতে আসবে না। এটি অর্জনে জীবনের কত মূল্যবান সময় তোমার খরচ হয়ে যাবে। অর্জনের পুরোটা সময় তোমার অন্তর তাতেই ব্যস্ত হয়ে থাকবে। আবার অর্জনের পরও হারানোর ভয়ে অস্থির হয়ে থাকবে। এরপর হয়তো প্রাপ্ত জিনিসের বাস্তব কোনো অপূর্ণতা তোমার এই প্রবৃত্তির আগ্রহকে নষ্ট করে দেবে। সেটা যদি খাবার-জাতীয় হয় তাহলে হতে পারে, তোমার এই পরিতৃপ্ত ভক্ষণই তোমার সমস্যার সৃষ্টি করবে। আর যদি তোমার প্রবৃত্তির বাসনা থাকে কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে- তাহলে হয়তো একসময় তুমি তার মাধ্যমে বিরক্ত হয়ে উঠবে। তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে কিংবা তার কোনো নিকৃষ্ট স্বভাব ও আচরণে তুমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। এরপর বিয়ে ও সহবাসের আস্বাদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে অনেক ক্ষতি ও অসুবিধা, শরীর ভেঙে পড়ে। ব্যক্তিকে নিয়ে আরও কত সমস্যা, যার বর্ণনা অতি দীর্ঘ।

দুই.

নিষিদ্ধ জিনিসের দিকে ধাবিত হওয়ার কারণে উল্লিখিত সমস্যাগুলোর সাথে রয়েছে দুনিয়ার শান্তি। মানুষের মাঝে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ার ভয়। এরপর আখেরাতের কঠিন শাস্তির কথা রয়েই গেল। তাছাড়া যখনই এই গোনাহের কথা স্মরণ হবে, আপনাআপনিই তোমার অন্তর হয়ে পড়বে অস্থির ও বেচাইন।

অন্যদিকে প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ের স্বাদ এমনই এক স্বাদ, যা অন্য সকল স্বাদের চেয়ে উন্নত। তুমি কি প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত মানুষকে দেখোনি, তারা কেমন লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়েছে? এর কারণ কী? কারণ, তারা প্রবৃত্তির চাহিদার কাছে পরাজিত হয়েছে। অন্যদিকে যারা প্রবৃত্তির ওপর বিজয় অর্জন করে, প্রবৃত্তির অন্যায় চাহিদাকে দমিয়ে রাখে, তারাই হলো শক্তিশালী অন্তরের অধিকারী। তারাই হলো সম্মানিত ও অনুসরণীয়। কারণ, তারা প্রবৃত্তির ওপর হয়েছে বিজয়ী।

সুতরাং নিজের আকর্ষিত বিষয়কে শুধু সৌন্দর্যের চোখ দিয়ে দেখা থেকে সতর্ক থাকো। যেমন, একজন চোর সম্পদ চুরির সময় শুধু তার আস্বাদনের কথাই মনে রাখে, এর ক্ষতির দিকে দৃষ্টি দেয় না। হাত কর্তিত হওয়ার কথা স্মরণ করে না।

এ কারণে নিজের কর্মগুলোকে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার দৃষ্টি দিয়ে দেখো, পরিণামের কথা চিন্তা করো। কারণ, স্বাদ আস্বাদনের কর্মটি বদলে গিয়ে সেটাই হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসের কারণ। কিংবা এটি তার আস্বাদনের পরিবর্তে হয়ে উঠতে পারে কষ্টের কারণ।

মানুষের প্রথম গোনাহ এমন একটি লোকমার মতো, যা কোনো ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ভক্ষণ করে। এটি তার ক্ষুধাকে নিবারণ করে না। বরং এটি খাবারের মতো তাকে আরও বেশি কাতর করে তোলে।

এ কারণে প্রবৃত্তির চাহিদার কাছে পরাজিত মানুষের পরিণাম এবং ধৈর্যধারণের উপকারিতা নিয়ে উপদেশ গ্রহণ করা উচিত। যে ব্যক্তি এটি করতে সক্ষম, সফলতা তার থেকে দূরে নয়। সফলতা যেন তার হাতের মুঠোয় এসে গেছে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 জীবনের বাস্তবতা

📄 জীবনের বাস্তবতা


হঠাৎ আমার মনে একটি চিন্তা এলো-

আমাদের তো সুন্দর মজলিস। মনোযোগী সকল অন্তর। চক্ষুগুলো অশ্রু প্রবাহিত করছে। মাথাগুলো দুলছে। নফস তার অন্যায় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হচ্ছে। সংকল্পগুলো সুদৃঢ় হচ্ছে তার অবস্থার সংশোধনের জন্য। এদিকে যদিও শয়তানের চক্রান্ত মনের অভ্যন্তরে প্রতিজ্ঞাগুলো নষ্ট করতে এবং গোনাহ সম্পর্কে সতর্ক না হতে কাজ করে যায়। কিন্তু মন তবু তাওবার দিকেই ধাবিত হয়।

এ সময় আমি নফসকে ডেকে বললাম, 'এই যে মনের জাগরণ, এটা স্থায়ী হয় না কেন? মজলিসে আমি নফস ও জাগরণকে পরস্পরের সাথে সখ্যতা ও হৃদ্যতার সাথে সহাবস্থানে দেখতে পাই। কিন্তু যখনই আমরা এই মাটির মজলিস থেকে উঠে যাই, আমাদের অন্তরগুলো পরিবর্তন হয়ে যায়।

আমি চিন্তা করলাম, এমনটা কেন হয়? ভেবে দেখলাম, নফস জাগ্রতই থাকে, অন্তর আল্লাহর স্মরণেই থাকে। কিন্তু এগুলোর সচেতন থাকার অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যতটুকু সময় আল্লাহ তাআলার পরিচয় ও স্মরণে চিন্তাকে ব্যবহার করা হয়, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি ব্যবহার করা হয় দুনিয়ার উপার্জনে, নফসের চাহিদাগুলোর উপকরণ জোগাড়ে। অন্তর সব সময় এর মধ্যেই নিমজ্জিত থাকে। আর আমাদের শরীর যেন এমনই এক সোহাগি বন্দি, যার পরিচর্যার কোনো বিরাম নেই।

এভাবে আমরা দেখি, মানুষের চিন্তা ব্যস্ত রয়েছে তার খাদ্য-খাবার, পোশাক, বাসস্থান ও শারীরিক পরিচর্যা নিয়ে। এগুলো নিয়েই সে চিন্তা করে এবং তার আগামীকাল বা আগামী বছরের জন্য খাদ্য ও অর্থ জমাতে থাকে। শরীর থেকে নাপাকি বের হলে যেমন পবিত্রতা অর্জন করতে হয়, তেমনি শরীরের জৈবিক চাহিদার জন্য বিয়েও করতে হয়। পরিবার হয়। দায়িত্ব আসে। তাই স্বাভাবিকভাবেই দুনিয়ার উপার্জন ছাড়া তার আর উপায় থাকে না। এরপর যখন সন্তান-সন্ততি আসে তখন তো তার চিন্তা পুরোদমে দুনিয়ার উপার্জনে ঘুরতে থাকে।

কিন্তু মানুষ যখন মজলিসে আসে তখন সে ক্ষুধার্ত হয়ে আসে না। বড় ধরনের কোনো পেরেশানির চিন্তা নিয়েও আসে না। বরং এখানে সে তার সমস্ত মনোযোগ একত্র করে। দুনিয়ার যত চিন্তা ও ভাবনা, সেগুলোকে ভুলে থাকে। তখন সে অন্তর দিয়ে ওয়াজ শুনতে পারে। যা বলা হয়, তা-ই স্মরণ করে। যা শোনে, তা-ই গ্রহণ করে। যা জানে, তার ওপরই আমল করতে উদ্বুদ্ধ হয়। এভাবেই মানুষ তাদের নফসকে উদাসীনতা থেকে জাগ্রত করে তোলে। অতীতে যে ভুল-ত্রুটি ও গোনাহ হয়ে গেছে, সেগুলোর ওপর অনুতপ্ত হয়। চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়। এবং ভবিষ্যতে মেনে চলার ব্যাপারে অন্তরগুলো প্রবলভাবে প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে।

এতক্ষণ আমি দুনিয়ার যে কর্তব্য-কাজের কথা বললাম, অন্তরগুলো যদি সকল সময় সেই ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হতো তবে তারা সর্বক্ষণই তার প্রতিপালকের ইবাদতে নিমগ্ন থাকত। মানুষ যদি এভাবে তার প্রতিপালকের প্রেমে পড়ে যেত তবে সকল কিছু বর্জন করে তার নৈকট্য প্রাপ্তির জন্য জীবনপাত করত। এ কারণেই দুনিয়াবিমুখ সাধকগণ নির্জনতাকে অবলম্বন করে নিরালায় বসবাস করেন। সকল অন্তরায় ও পিছুটান থেকে মুক্ত হয়ে ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন। তারা তাদের এই পরিশ্রম ও ত্যাগের পরিমাণ অনুপাতেই ইবাদতের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করেন। যেমনভাবে কৃষকরা তাদের বপিত বীজের পরিমাণ অনুপাতে ফসল পায়।

কিন্তু চিন্তার ঠিক এই মুহূর্তে আমার মনের মধ্যে একটি জিনিস ঝলক দিয়ে উঠল। তা হলো, নফসের যদি সর্বক্ষণ এই জাগ্রত অবস্থা বিরাজ করে, দু-হাতে আঙুলের মুঠো দিয়ে যেমন বালির কণাগুলো বেরিয়ে যায়, তেমনি অসংখ্য ক্ষতির সৃষ্টি হবে এতে। যেমন, মানুষ তার নিজের অবস্থার ওপর অহংকারী হয়ে উঠবে। অন্যদের তুচ্ছ ও হেয়জ্ঞান করতে শুরু করবে। জোশ ও অবস্থার ক্রমোন্নতির একপর্যায়ে সে দাবি করে বসবে, আমার সাথে দুনিয়ার কার কী কর্তব্য আর লেনদেন? আমার কারও সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। তখন দুনিয়ার কোনো দায়-দায়িত্বই আর পালন করবে না। আর যারা পালন করছে, তাদেরকে নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ভাবতে থাকবে। এভাবে নফসকে সে গোনাহের বিভিন্ন আক্রমণের মাঝে হাবুডুবু খেতে দেবে। এরপর যখন তীরে উঠে এসে অন্যদের দিকে দৃষ্টি দেবে তখন অন্যদের ইবাদতের তুচ্ছতা নিয়ে নাক ছিটকাবে।

একেবারে সংশ্রবহীন নির্জন সাধকদের অধিকাংশের অবস্থা এমনটাই হয়ে থাকে। এ কারণে আলেমগণ এই অবস্থা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। যে ব্যক্তি বীজ বপন করে, সে তার পরিচর্যা করে। পোকা-মাকড় ধ্বংস করে ও আগাছা উঠিয়ে ফেলে। এই পরিশ্রম তার ক্ষেতকে পরিশুদ্ধতা এনে দেয়। সুতরাং বান্দার জন্যও অবশ্যই এমন কিছু ভুল থাকা আবশ্যক, যে দিকে সে ভয়মিশ্রিত কম্পিত বুক নিয়ে তাকিয়ে থাকবে, আল্লাহ মাফ করবেন কি না! এতেই তার দাসত্ব প্রকাশিত হবে। তার ইবাদত গ্রহণ করা হবে। আর এদিকে ইশারা করেই হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ.

হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা যদি গোনাহ না করতে তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের অপসারিত করে এমন এক সম্প্রদায় নিয়ে আসতেন, যারা গোনাহ করবে এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে এবং আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেবেন। ৪৫

টিকাঃ
৪৫ সহিহ মুসলিম: ১৩/৬৪৯৬ পৃষ্ঠা: ৩০১- মা শামিলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সুফিতত্ত্বের যাচাই-বাছাই

📄 সুফিতত্ত্বের যাচাই-বাছাই


চিন্তা করে দেখলাম, মানুষের সম্পদ সংরক্ষণ করাও একটি আবশ্যক কর্তব্য। অথচ এদিকে মূর্খ সুফিরা বলে বেড়ায়, হাতে যা আছে তা দান করে আল্লাহর ওপর ভরসা করো।

এটি আমাদের শরিয়তে বৈধ নয়। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাব ইবনে মালিক রা.-কে বলেছিলেন, أمسك عليك بعض مالك.

তুমি নিজের কাছে তোমার কিছু সম্পদ রেখে দাও (সম্পূর্ণ দান করো না)। ৪৬

এবং সাদ রা.-কে বলেছিলেন, لأن تترك ورثتك أغنياء خير من أن تتركهم عالة يتكففون الناس.

তুমি তোমার পরিবারকে নিঃস্ব অবস্থায় রেখে যাবে আর তারা মানুষের দুয়ারে চেয়ে বেড়াবে-এর চেয়ে তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের স্বচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়াই ভালো। ৪৭

এখন কোনো মূর্খ যদি এসে প্রশ্ন উঠায়- তবে যে হজরত আবু বকর রা. তার সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিয়েছিলেন! এর কী উত্তর হবে?

উত্তরে আমরা বলব, হজরত আবু বকর রা. ছিলেন এক মহৎ হৃদয়ের মানুষ এবং ছিলেন একজন দক্ষ ব্যবসায়ী। তিনি তার সকল সম্পদ দিয়ে দিলেও তার জন্য সম্ভব ছিল কারও থেকে ঋণ করে ব্যবসার মাধ্যমে জীবনযাপন করতে পারা। যার এ ধরনের ধৈর্য, হৃদয়, সক্ষমতা ও দক্ষতা রয়েছে, তার জন্য আমি সকল সম্পদ দান করে দেওয়াও কিছু মনে করি না। কিন্তু এটা তার জন্য অবশ্যই নিন্দনীয় হবে, যার জীবনযাপনের আর কোনো মাধ্যম ও পুঁজি নেই। কারণ, তখন সে নিজের সম্পদ হারিয়ে অন্যের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। মানুষের দয়া অনুগ্রহ ও সহানুভূতির ওপর চলতে বাধ্য হবে। তার অন্তর তখন সর্বক্ষণ মাখলুকের দিকে ঝুঁকে থাকবে। তাদের মাঝেই তার আশা-নিরাশা ঘুরপাক খেতে থাকবে। যখনই কেউ তার দরজায় কড়া নাড়বে, তার অন্তর প্রত্যাশার চাপে তিরতির করতে থাকবে, এই বুঝি রিজিক এসে গেল। কেউ বুঝি কিছু নিয়ে এলো। নাউজুবিল্লাহ। সক্ষম কোনো ব্যক্তির জন্য এটি খুবই কুৎসিত একটি বিষয়।

আর যে ব্যক্তি উপার্জনে সক্ষম নয়, তার সকল সম্পদ দান করা তো আরও খারাপ, অবৈধ। কারণ, এরপর তাকে সব সময় মানুষের হাতের দিকে চেয়ে থাকতে হবে। তাদের দয়া-অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এটি একটি অপদস্থতার পথ। কখনো কখনো এটিকে দুনিয়াবিমুখতা বলে সুশোভন করার চেষ্টা করা হয়। অথচ আসলেই এটি একটি অপদস্থতার পথ। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম লাঞ্ছনার অবস্থা হলো, তারা ফকির মিসকিন ও নিঃস্বদের সাথে জাকাতের সম্পদে ভিড় বাড়িয়ে দেবে। তুমি প্রথম যুগের অবস্থার দিকে তাকাও। সেখানে এমন কাউকে পাবে না, যেমনটি আজকের যুগের মূর্খ সুফিগুলো করে বেড়ায়। আগেই উল্লেখ করেছি, তারা নিজেরা উপার্জন করেছেন এবং পরবর্তীদের জন্য সম্পদ রেখে গেছেন।

তাছাড়া প্রথম যুগের দিকে তাকিয়ে দেখো, সেখানে কেউ তাদের নিজেদের জন্য 'সুফি' পরিভাষা ব্যবহার করেননি। তাই শরিয়তে যে ধরনের আচরণ ও পরিভাষা বিদ্যমান ছিল না, সে ধরনের বিষয় থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নিশ্চয় আমাদের এই দ্বীন অসম্পূর্ণ নয় যে, নতুন কোনো বিষয় এসে তাকে পূর্ণতা দান করবে।

জেনে রেখো, মানুষের শরীর হলো একটি জীবন্ত বাহনের মতো। তাকে খাইয়ে-পরিয়ে রাখতে হয়। তার পরিচর্যা করতে হয়। কিন্তু তুমি যদি এ ব্যাপারে অবহেলা করো তাহলে বুঝতে হবে, তুমি নবী ও সাহাবিদের জীবন ও জীবনাচার সম্পর্কে সামান্যতমও অবগত নও।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন খুবই প্রিয় ও বিখ্যাত সাহাবি হজরত সালমান ফারসি রা.। তাকে দেখা যেত যে, তিনি খাবার কাঁধে নিয়ে ঘুরতেন। তাকে একবার প্রশ্ন করা হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন সাহাবি হয়ে আপনি এমন কাজ করেন? জবাবে তিনি বললেন,
إن النفس إذا أحرزت قوتها اطمأنت.

নফস যখন তার খাদ্য সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়, তখন সে শান্ত থাকে। বিখ্যাত তাবেয়ি হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন,
إذا حصلت قوت شهر فتعبد.

তোমার যদি অন্তত একমাসের খাদ্য জমা থাকে তাহলে তুমি অধিক নফল ইবাদতে সময় দিতে পারো।

আবার কিছু লোক আছে, নিছক কথার দাবি ছাড়া তাদের কোনো দলিল নেই। তারা বলে, এটা তো আল্লাহ তাআলার 'রাজ্জাক' হওয়ার ক্ষেত্রে সন্দেহ পোষণ করা কিংবা তার ওপর 'তায়াক্কুল'-এর বিরোধী কথা।

এ ধরনের কথা যারা বলে, তুমি তাদের থেকে বেঁচে থাকো। তাদের কথা শুনে বিভ্রান্ত হয়ো না। অবশ্য তারা কিছু 'সালাফ'-এর দুনিয়াবিমুখতা দিয়ে এ ব্যাপারে উদাহরণ দিতে চায়। কিন্তু সেই অবস্থা এখন আর নেই। মানুষের আচরণ, মানুষের ধৈর্য একেবারে পাল্টে গেছে। সুতরাং মূর্খ সুফিদের বিরোধিতা যেন তোমাকে উদ্বিগ্ন না করে। যেমন, আবু বকর আল-মারুজি বর্ণনা করেন, কথাপ্রসঙ্গে আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে একবার বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করতে শুনলাম। এ কথা শুনে আমি তাকে বললাম, হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. বলেছেন...। আমি কথাটি শেষ করার আগেই আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. আমাকে ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, কী বলো, আমি তোমার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের অবস্থা বর্ণনা করছি আর তুমি নিয়ে আসছ নব আবিষ্কৃত পথ? চুপ করো।

ভালোভাবে জেনে রাখো, কোনো ব্যক্তি যদি জীবনযাপনের আবশ্যক উপকরণগুলো স্বেচ্ছায় ব্যবহার না করে বলে, আমি খাব না, পান করব না, রোদের তাপ থেকে দূরে সরে যাব না কিংবা ঠান্ডায় উষ্ণতার আশ্রয় নেব না, সর্বসম্মতিক্রমে সে ব্যক্তি গোনাহগার হবে। এমনিভাবে যার অধীনে পরিবার-পরিজন রয়েছে, সে যদি বলে, আমি উপার্জন করব না। তাদের রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ তাআলার ওপর। এরপর যদি পরিবারের লোকদের ক্ষুধার্ত থাকতে হয় কিংবা আর্থিক কষ্ট করতে হয় তাহলে সেই লোক গোনাহগার হবে। যেমনটি হাদিসে এসেছে-
كفى بالمرء إثما أن يضيع من يقوت.

মানুষের গোনাহগার হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, নিজের সক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ৪৮

জেনে রেখো, গুরুত্বের সাথে উপার্জন করা নিজের হিম্মত ও মনোবল বাড়িয়ে দেয়, অন্তরকে মুক্ত ও প্রফুল্ল রাখে, মাখলুকের ওপর কোনো আশা করতে হয় না। তাছাড়া তোমার নিজের মানবিক স্বভাব-তবিয়তের একটা অধিকার আছে। তার বৈধ চাহিদাগুলো পূরণ করা উচিত। শরিয়ত এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য বর্ণনা করেছে-
إن لنفسك عليك حقا وإن لعينك عليك حقا.

তোমার ওপর তোমার নফসের অধিকার রয়েছে। অধিকার রয়েছে তোমার চোখের। ৪৯

নতুবা অর্থহীন লোকদেখানো দুনিয়াবিমুখতার উদাহরণ হলো সেই কুকুরের মতো, যে রাতের অন্ধকারে কাউকে চেনে না। যাকে দেখে তার সাথেই হাঁটতে শুরু করে। ঘেউ ঘেউ করে। লোকটি যদি কোনো রুটির টুকরো ছুড়ে মারে তখন চুপ হয়ে যায়।

এই নীতিগুলো ভালোভাবে বুঝে নাও। একটি সুন্দর জীবনযাপনের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ এই বুঝটা খুবই জরুরি।

টিকাঃ
৪৬. হাদিসটি ইমাম বোখারি রহ. 'কিতাবুল মাগাযি' তে উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারি: ৭/৪৪১৮। এবং ইমাম মুসলিম রহ. 'কিতাবুত তাওবা' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। এখানে হাদিসের কিছু অংশ উল্লেখ করা হয়েছে। এবং বিভিন্ন বর্ণনায় শব্দেরও ভিন্নতা রয়েছে। সহিহ বোখারিতে পুরো হাদিসটি এমন- أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ كَعْبٍ قَالَ سَمِعْتُ كَعْبَ بْنَ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ مِنْ تَوْبَتِي أَنْ أَنْخَلِعَ مِنْ مَالِي صَدَقَةً إِلَى اللهِ وَإِلَى رَسُولِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ أَمْسِكْ عَلَيْكَ بَعْضَ مَالِكَ فَهُوَ خَيْرٌ لكَ قُلْتُ فَإِنِّي أُمْسِكُ سَهْمِي الَّذِي بِخَيْبَرَ.
সহিহ বোখারি: ৯/২৫৫২ পৃষ্ঠা: ৩৩৩- মা. শামেলা।
৪৭. সূত্র- পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
৪৮ সুনানে আবু দাউদ: ৫/১৪৪২, পৃষ্ঠা: ১২- মা. শামেলা। এছাড়া মুসনাদে আহমদ: ২/১৬০, ১৯৪। এবং মুসতাদরাকে হাকেম: ১/৪১৫। ইবনে হাকেম বলেন, এটি বিশুদ্ধ সনদের হাদিস।
৪৯ সহিহ বোখারি: ৭/১৮৩৯, পৃষ্ঠা: ৮৭- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 খোদভীরুতার স্বরূপ

📄 খোদভীরুতার স্বরূপ


আমার কাছে একদিন আমাদের সময়ের দুনিয়াবিমুখ কিছু ব্যক্তির ঘটনা শোনানো হলো। আমি তাদের বিষয়গুলো শুনে অতি আশ্চর্য বোধ করলাম। মানুষ এমনটা কেন করে?

তাদের ঘটনা ছিল এমন- এক ব্যক্তির নিকট খাবার উপস্থিত করা হলো। কিন্তু তিনি খেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, 'আমি খাব না'। কেন? কেন খাবেন না?

লোকটি বলল, 'দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে আমি আমার নফস যা চায়, তা থেকে তাকে বিরত রাখি।'

ঘটনা শুনে আমি বললাম, দুটি কারণে এ লোকটি সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

১. প্রথম কারণ- ইলম না থাকা।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে কখনো এমন করেননি। তাঁর সাহাবিদের মধ্যেও কেউ এমন করেননি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুরগির গোশত খেতেন। মিষ্টান্ন এবং মধু ভালোবাসতেন। এবং সেগুলো খেতেন।

একবার হজরত হাসান রা. ফালুদা খাচ্ছিলেন। এ সময় ফারকিদ আস-সাবুখি তার নিকট দেখা করতে এলেন। হাসান রা. বললেন, হে ফারকিদ, এ খাদ্য সম্পর্কে তোমার অভিমত কী?

ফারকিদ বলল, আমি এটি ভালোবাসি না এবং যে ব্যক্তি এটা খায়, তাকেও ভালোবাসি না।

তখন হজরত হাসান রা. বললেন, মধু, গম এবং গরুর ঘি-কোনো মুসলিম কি এগুলোকে দূষণীয় মনে করতে পারে? এগুলো দিয়েই তো ফালুদা বানানো হয়েছে। (ফালুদা আরও বিভিন্নভাবেই বানানো যায়। এটি একটি ফর্মুলা)।

একবার এক ব্যক্তি হজরত হাসান রা.-এর নিকট এসে বলল, আমার এক প্রতিবেশী আছে, সে কখনো ফালুদা খায় না।'

হাসান রা. বললেন, 'সে এটা কেন খায় না?'

লোকটি বলল, 'সে বলে, আমি তো এর শোকর আদায় করতে পারব না।'

হজরত হাসান রা. বললেন, 'তোমার প্রতিবেশী হলো একজন মূর্খ বোকা। সে যে ঠান্ডা পানি পান করে, তারও কি সে শোকর আদায় করতে সক্ষম?'

হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. তাঁর সফরের সময় সাথে ফালুদা ও ভুনা গোশত রাখতেন। এবং বলতেন, আমি যখন আমার বাহনের প্রতি অনুগ্রহ করব তখন সেটাও আমার জন্য ভালোভাবে কাজ করবে।'

আর মুসলমানদের মধ্যে বাড়াবাড়ি ধরনের এই যে 'সুফিতন্ত্র', এটা এসেছে মূলত খ্রিষ্টানদের 'রাহবানিয়াত' বা কৃচ্ছতাসাধন থেকে। আমি এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের ভয় করি-
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ)

হে মুমিনগণ, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে সকল উৎকৃষ্ট বস্তু হালাল করেছেন, তাকে হারাম সাব্যস্ত করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না। [সুরা মায়িদা: ৮৭]

আর হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে যে কথাটি বর্ণিত আছে- 'তিনি যা ভালোবাসতেন, সেটার ক্ষেত্রে অন্যকে প্রাধান্য দিতেন এবং তার বালিকা দাসীকেও আজাদ করে দিতেন। কারণ, এগুলো ছিল তার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।'

এ ধরনের বিষয় তো প্রশংসনীয়। নিজের কাছে যা কিছু প্রিয় ও ভালো, তার ক্ষেত্রে তিনি অন্যকে প্রাধান্য দিতেন। অন্যকে দান করতেন এবং নিজের জন্যও রাখতেন। অর্থাৎ মাঝে মাঝে যখন এ ধরনের কাজ করা হবে, এর দ্বারা অন্তরের সেই লোভ-কাতরতা ভেঙে যাবে- দুনিয়াতে সে যা চায়, তা-ই পায়। ধারণা ভাঙার দরকারও আছে। দুনিয়া তো আসলে এমনই।

কিন্তু যে ব্যক্তি সর্বক্ষণ তার অন্তরের চাহিদার বিপরীত চলে, সে তার অন্তরকে অন্ধ করে ফেলে। সব ক্ষেত্রেই নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রাখে এবং তার সকল ইচ্ছা টুকরো টুকরো করে ফেলে। এভাবে তাকে সে যতটা উপকার করে, ক্ষতি করে তারচেয়ে বেশি। হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম বলেন,
إن القلب إذا أكره عمي.

অন্তরকে যখন অব্যাহতভাবে বাধ্য করে রাখা হয়, অন্তর তখন অন্ধ হয়ে যায়।

তার কথার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে। তা হলো, আল্লাহ তাআলা মানুষের স্বভাব-তবিয়তের মধ্যে একটি আশ্চর্য নিয়ম রেখেছেন। নিয়মটি হলো, অন্তর যেটার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে, সেটার মধ্যেই তার সুস্থতা রয়েছে।

এ কারণে চিকিৎসাবিদ্যার বিশেষজ্ঞরা বলেন, মনের মধ্যে যে ধরনের খাবারের আগ্রহ জন্মে, সে ধরনের খাবার খাওয়াই উচিত; বাহ্যিক পর্যবেক্ষণে তার মধ্যে যদি কিছুটা ক্ষতি থেকেও থাকে। কারণ, অন্তর বা প্রবৃত্তি তার জন্য সেটাই পছন্দ করে, যা তার জন্য সংগত। কিন্তু কোনো জাহেদ ব্যক্তি যখন অব্যাহতভাবে নিজের চাহিদা থেকে নিজেকে বিরত রাখে তখন তার শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। শক্তি নিঃশেষ হয়ে পড়ে। এটা অনুচিত।

মনের অভ্যন্তরে যদি খাবারের প্রতি আকর্ষণ না থাকত তাহলে তো মানুষের শরীরই টিকত না। কারণ, আকর্ষণ না থাকলে খাবারের প্রতি আগ্রহ হতো না। মানুষের খাওয়া সম্ভব হতো না। আগ্রহটাই হলো আসল অগ্রদূত। শরীর ঠিক রাখার জন্য এর কোনো জুড়ি নেই।

কিন্তু কেউ যদি খাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে ফেলে তবে সেটাও তার জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু মন যা চায়, কোনো ক্ষতির কারণ না থেকেও তুমি যদি সর্বক্ষণ তা থেকে বিরত থাকো তবে এটা পরিণামে তোমার শরীর নষ্ট করে দেবে। এটা তখন একটি বিষের মতো কাজ করবে। যেমন, কোনো প্রচণ্ড পিপাসার্ত ব্যক্তিকে পানি পান করতে বাধা দেওয়া হলো, প্রচণ্ড ক্ষুধার সময় খাবার থেকে বিরত রাখা হলো কিংবা সঙ্গম থেকে নিষেধ করা হলো প্রচণ্ড যৌন-উত্তেজনার সময়। ঘুমে ঢলে পড়ার সময় ঘুম থেকে বাধা প্রদান করা হলো। এমনকি কোনো ব্যথাক্রান্ত ব্যক্তিকে তার ব্যথার কথা বলতে দেওয়া হলো না। এই সবগুলো বিষয় তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। হয়তো এভাবে তাদেরকে হত্যা করে ফেলা হবে কিংবা বেদনার অভ্যন্তরীণ চাপেই তারা মারা যাবে।

এটাই হলো আসল কথা। কোনো জাহেদ যখন এটি বুঝবে তখন জানতে পারবে, সে আসলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের পথের বিপরীত কাজ করছে। এবং এগুলো সাধারণ প্রজ্ঞারও বিপরীত।

২. ভুল হওয়ার দ্বিতীয় কারণ

আমি ভয় করি, তার এই 'নফস যা চায়, তা থেকে বিরত থাকা' তার নিজের খাহেশে পরিণত হয়ে যাবে। লোক দেখানো লৌকিকতা হয়ে পড়বে। কারণ, এসকল ক্ষেত্রে নফসের মধ্যে খুবই সূক্ষ্ম এক ষড়যন্ত্র ও গোপন অহংকার লুকিয়ে থাকে। এই অহংকার সে বাইরের মানুষের কাছে প্রকাশ করে না। নিজের মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে পরিতৃপ্তিসহ ঘুরতে থাকে। এটা খুবই ক্ষতিকর একটি অবস্থা। খুবই ভুল একটি পদ্ধতি। এ কারণে দ্বীনের জন্য যা সাধারণ, সর্বজনের কাছে গ্রাহ্য, তার বাইরে না যাওয়া উচিত। এর মাধ্যমে নফস নিজেকে ব্যতিক্রমী ও অহংকারী করে তোলে।

এসকল আলোচনার প্রেক্ষিতে কিছু মূর্খ আবার বলে বসতে পারে, এর মাধ্যমে তো মানুষকে কল্যাণ ও দুনিয়াবিমুখতা থেকে বাধা প্রদান করা হচ্ছে।

আমি বলি, না, বিষয়টা এমন নয়। কারণ, হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে,
كل عمل ليس عليه أمرنا فهو رد.

দ্বীনের ক্ষেত্রে প্রতিটি এমন কাজ, যার ক্ষেত্রে আমার কোনো আদেশ নেই, তা পরিত্যাজ্য। ৫১

সুতরাং কোনো মুমিন ব্যক্তির জন্য উচিত নয়, ভিত্তিহীন কর্তিত কোনো বাহ্যিক ইবাদতের মাধ্যমে ধোঁকায় পতিত হওয়া। 'তাকওয়া'র নামে নিজের ক্ষতিসাধন করা। কারণ, আজকের কিছু মূর্খ সুফি এমন পথের অনুসরণ করছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ যে পথ অনুসরণ করেননি। যেমন, লৌকিকভাবে খুব বেশি বেশি বিনয় প্রকাশ করা, উষ্কখুষ্ক পোশাক পরিধানের মাধ্যমে খোদাভীরুতা দেখানো। এমন নতুন কিছু বিষয় সৃষ্টি করা, যেগুলো মানুষ ভালো মনে করতে থাকে। এমনি কিছু রীতি-নীতি ও নব্যপ্রথা, যার মাধ্যমে কিছু মানুষের অন্যায়ভাবে আয়-উপার্জনের দুয়ার খুলে যায়। হাতে চুমো দেওয়া, অত্যাধিক সম্মান প্রদর্শন করা। কারামতির আকাঙ্ক্ষা করা। নির্জন ও প্রকাশ্য অবস্থার মধ্যে আমল ও আচরণের ভিন্নতা। অবশ্য এটির ভালো দিকও আছে। যেমন হজরত ইবনে সিরিন রহ. মানুষের মাঝে হাসি-তামাশা করে চলতেন। কিন্তু যখন রাত হয়ে যেত, একাকী রবের সামনে দাঁড়িয়ে এমনভাবে কাঁদতেন, তাকে যেন জনপদবাসীরা হত্যা করতে আসছে।

সুতরাং আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট উপকারী ইলম চাই। এটাই আসল। যখন এই ইলম অর্জিত হয়ে যাবে, সেটাই রব ও মাবুদের পরিচয় জানিয়ে দেবে। এবং সেই সঠিক ইবাদতের দিকে নিয়ে যাবে, যা তিনি আমাদের দিয়েছেন এবং যা তিনি ভালোবাসেন। এবং সেই ইলম অর্জনকারী ইখলাস ও একনিষ্ঠতার পথ অনুসরণ করবে।

আবারও বলি, সকল মূলনীতির প্রধান মূলনীতি হলো ইলম। আর সবচেয়ে উপকারী ইলম হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিদের জীবনের দিকে দৃষ্টি দেওয়া।

কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهِ

(ওপরে যাদের কথা উল্লেখ করা হলো) তারা ছিল এমন লোক, আল্লাহ যাদেরকে হেদায়েত দিয়েছেন। সুতরাং তুমিও তাদের পথে চলো। [সুরা আনআম: ৯০]

টিকাঃ
৫০. তার পুরো নাম: ইবরাহিম ইবনে আদহাম বিন মানসুর বিন ইয়াযিদ বিন জাবের। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ ইমাম ও আরেফ। জাহেদদের সরদার। শামে বসবাস করতেন। ইমাম নাসাঈ রহ. বলেন, তিনি ছিলেন, আস্থাভাজন। জাহেদ। ১৬২ হিজরি সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। سير أعلام النبلاء : ৭/৩৮৭-৩৯৬ এবং حلية الأولياء : ৭/৩৬৭-৮/৫৮।
৫১. ইমাম মুসলিম রহ. এটাকে হজরত আয়েশা রা. এর শব্দে 'কিতাবুল আকযিয়া' তে উল্লেখ করেছেন- ৩/১৮/১৩৪৩, ১৩৪৪। ইমাম বোখারি রহ. উল্লেখ করেছেন 'কিতাবুস সুলহ'-এর মধ্যে। ফাতহুল বারি: ৫/২৬৯৭। তবে বিভিন্ন বর্ণনায় হাদিসটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে। যেমন সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে এভাবে-
قَالَ أَخْبَرَتْنِي عَائِشَةُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ.
সহিহ মুসলিম: ৯/৩২৪৩, পৃষ্ঠা: ১১৯- মা. শামেলা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00