📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ভালো এবং মন্দ

📄 ভালো এবং মন্দ


পৃথিবী এবং তার ওপর যারা রয়েছে, তাদের ব্যাপারে একবার চিন্তার দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলাম। মনে হলো, পৃথিবীর বয়সের চেয়েও তার অবস্থা বড় ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তারপর এখানকার বসবাসকারীদের দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, জগতের প্রায় সকল জায়গা কাফেররা দখল করে আছে। এরপর দৃষ্টি দিলাম মুসলমানদের দিকে। দেখলাম, কাফেরদের তুলনায় পৃথিবীতে তাদের সংখ্যা অনেক কম।

এরপর শুধু মুসলমানদের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করলাম। দেখলাম, বিভিন্ন পেশা ও কাজ-কর্ম তাদের অধিকাংশকে রিজিকদাতা আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, তার সম্পর্কে ইলম অর্জন করা থেকেও তাদেরকে বিরত রেখেছে।

আর রাজ-বাদশাহরা রয়েছে কর্মচারীদের আদেশ-নিষেধ ও নিজেদের আরাম-আয়েশ নিয়ে। তাদের মাঝে অঢেল টাকা-সম্পদের প্রবাহধারা জারি রয়েছে; কিন্তু এগুলোর কোনো শুকরিয়া নেই। কেউ তাদেরকে আজ আর উপদেশ দিতে আসে না। বরং সকলেই নির্বিচারে তাদের প্রশংসা আর চাটুকারিতা চালিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের বন্ধনহীন নফসকে আরও লাগামছাড়া করে তুলছে। অথচ নফসের এসকল রোগ খুব শক্তহাতে প্রতিহত করার দরকার ছিল। যেমন, আমর ইবনে মুহাজির রহ. বলেন, আমাকে একবার উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. বললেন,
إذا رأيتني قد حدث عن الحق فخذ بثيابي و هزني، وقل ما لك يا عمر ؟

আপনি যদি দেখেন আমি সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছি তাহলে তখন আমার জামার প্রান্ত চেপে ধরবেন এবং ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে বলবেন, হে উমর, এ তোমার কী হলো? ভুল করলে কেন?

এছাড়া উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেছেন,
رحم الله من أهدى إلينا عيوبنا.

আল্লাহ তার প্রতি দয়া বর্ষণ করুন, যে আমাদেরকে আমাদের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে জানিয়ে দেয়।

সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপদেশ ও নসিহত দরকার হলো রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের জন্য। কিন্তু অহংকারের ঘোড়ায় সাওয়ার হয়ে তারাই আজকে সবচেয়ে কম উপদেশ গ্রহণ করে।

আর এদিকে মুসলিম রাজা-বাদশাহর সেনাবাহিনীর অবস্থা কেমন? তাদের অধিকাংশই প্রবৃত্তির নেশায় মত্ত। দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও শোভা-সৌন্দর্যের মধ্যে নিমগ্ন। সাথে রয়েছে তাদের সীমাহীন অজ্ঞতা ও মূর্খতা। কোনো পাপই যেন তাদেরকে উদ্বিগ্ন করে না। কোনো পাপই যেন তাদের হাতছাড়া হয় না। রেশমি কাপড় পরিধান করে। মদ্যপানেও যেন তারা অস্বস্তি বোধ করে না। আরও আছে লোকজন থেকে অন্যায়ভাবে জিনিস-পত্র ছিনিয়ে নেওয়া। জুলুম যেন তাদের সত্তার সাথে মিশে গেছে।

আর এদিকে বেদুইন জাতি ডুবে রয়েছে পুরো অজ্ঞতার মধ্যে। গ্রামবাসীদেরও একই অবস্থা। তাদের অধিকাংশের চলাফেরা অপবিত্রতার মধ্যে। নামাজকে নষ্ট করে। শিক্ষাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করে।

এরপর আমি ব্যবসায়ীদের দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, লোভ তাদেরকে আকণ্ঠ নিমজ্জিত করেছে। ব্যবসায় লাভ হলেই হলো, কিন্তু সেটা কীভাবে হলো, তা যেন তাদের দেখার অবসর নেই। তাদের মাঝে সুদের ছড়াছড়ি। যেভাবেই হোক দুনিয়া উপার্জন হোক— এছাড়া আর কোনো দিকে তারা ভ্রুক্ষেপ করে না। জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রেও তারা সীমাহীন গাফেল। জাকাত না দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছে। তবে আল্লাহ যাদেরকে এসকল খারাবি থেকে রক্ষা করেছেন, তাদের কথা ভিন্ন।

এরপর আমি সরকারি ও বিভিন্ন চাকুরিজীবীদের দিকে লক্ষ করলাম। দেখলাম, তাদের লেনদেনের মধ্যে ঘুষের ছড়াছড়ি। ঘুষ তাদের নিকট ব্যাপক এবং সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কম দেওয়া। কৃপণতা করা। আত্মসাৎ করা। অন্যকে বঞ্চিত করা। এছাড়াও তারাও আসলে মূর্খতার মধ্যে ডুবে আছে। দ্বীনি কোনো শিক্ষা নেই।

আর যাদের সন্তান-সন্ততি আছে, তারা তো রাতদিন তাদের সন্তানদের জন্য উপার্জনের পাগলামিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। অথচ খেয়াল করছে না, সন্তানের জন্য তার কর্তব্য কী? কীভাবে তাকে সুন্দর ও সততার সাথে লালন-পালন করবে।

এরপর নারীদের বিষয়ে চিন্তা করে দেখলাম। দ্বীন সম্পর্কে তাদের জ্ঞান খুবই অল্প। সীমাহীন মূর্খতা বিরাজ করছে তাদের মধ্যে। আর আখেরাত সম্পর্কে তাদের যেন কোনো খবরই নেই। হ্যাঁ, আল্লাহ যাদেরকে রক্ষা করেছেন, তাদের কথা ভিন্ন।

আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, হায়, এই যদি হয় অবস্থা তবে আর কারা অবশিষ্ট রইল আল্লাহ তাআলার দ্বীনের খেদমত ও তার পরিচয় জানার জন্য!

এরপর আমার দৃষ্টি নিপতিত হলো আলেম, তালিবুল ইলম, ইবাদতগুজার ও দুনিয়াত্যাগী সাধকদের দিকে।

প্রথমে ইবাদতগুজার ও সাধকদের কথা চিন্তা করলাম। দেখলাম, তাদের অধিকাংশই ইবাদত করে কোনো ইলম ছাড়া। নিজেকে অনেক বড় বুজুর্গ মনে করে। নিজেদেরকে আল্লাহর অনেক বড় ওলি মনে করে। অনেক মানুষের অনুসরণ কামনা করে। অন্যরা তার হাতে চুমো খায়। এমনকি তাদের কেউ যদি কখনো কোনো প্রয়োজনে বাজার থেকে কিছু কিনতে বাধ্য হয়, সে নিজে তা করে না। এতে যেন তার সম্মানের মিনার ভেঙে পড়ে। তারা মানুষের মাঝে বিভিন্ন মনগড়া রীতিনীতি বাড়াতে থাকে। খুব উচ্চ মর্যাদার কেউ না হলে সাধারণ কারও জানাযায় উপস্থিত হয় না। খরচের ভয়ে একে অন্যের সাথে সাক্ষাৎ করে না। তাদের এই রীতিনীতিগুলো এক সময় অনুসারীদের উপাস্যে পরিণত হয়; যেন এগুলোরই তারা পূজা করে। এর বাইরে তারা যেতে চায় না। কিছু মানতে চায় না। ইলম অর্জন করে না। বরং তাদের কেউ কেউ অগ্রগামী হয়ে তাদের এই মনগড়া রীতিনীতির পক্ষে অজ্ঞতাপূর্ণ ফতোয়া প্রদান করে। সর্বক্ষণ আলেমদের বদনাম ও দোষ-ত্রুটি ধরে বেড়ায়। বলে বেড়ায় দুনিয়ার প্রতি আলেমদের লোভের কথা। অথচ তারা জানে না, প্রয়োজনমাফিক দুনিয়া অর্জনের জন্য কেউ-ই নিন্দিত হওয়ার উপযুক্ত নয়। কারণ, তারা তো জায়েয কাজের মধ্যেই রয়েছে।

এরপর আলেম ও তালিবুল ইলমদের ব্যাপারে চিন্তা করলাম। দেখলাম খুব অল্পসংখ্যক ছাত্রই রয়েছে, যাদের ওপর সঠিকভাবে ‘তালিবুল ইলম' শব্দ ব্যবহার করা যায়। কারণ, শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার তারাই, যারা ইলম তলব করে তদনুযায়ী আমল করার জন্য। অথচ এদের অধিকাংশই ইলম অর্জন করছে এ জন্য যে, এর দ্বারা উপার্জনের কোনো মাধ্যম হবে। কিংবা তাকে দিয়ে কোনো বাড়ি-ঘর বানানো হবে। কিংবা তাকে কোনো শহরের কাজি বানানো হবে। অথবা সে এই ইলম দ্বারা তার সমবয়সীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসন অর্জন করবে। এতটুকুই। এই হলো সার্বিকভাবে তাদের উদ্দেশ্য।

এরপর আলেমদের ওপর দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, তাদের অধিকাংশই নিজের প্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত এবং তার কথামতোই চালিত। ইলম তাকে যা থেকে বাধা প্রদান করে, সে বরং সেটাকেই প্রাধান্য দেয়। ইলম তাকে যেটা থেকে নিষেধ করে, সে সেইদিকেই ধাবিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সাথে তার কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই এবং তাঁর নির্জন ইবাদতের আস্বাদনও সে প্রাপ্ত নয়। তার একমাত্র লক্ষ্য মুহাদ্দিস হওয়া, ফকিহ হওয়া, দুনিয়াতে মানুষের মাঝে সম্মান অর্জন করা। এতটুকুই। আর কিছু না।

কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তো কখনো পৃথিবী এমন ব্যক্তি থেকে খালি রাখেন না, যারা তাঁর দ্বীনের জন্য প্রতিষ্ঠিত থাকবে। ইলম ও আমলের মাঝে সমন্বয় করবে। যথার্থভাবে আল্লাহ তাআলার হকগুলো জানবে। তাকে ভয় করবে। তারাই হলেন ‘কুতুবুদ দুনয়া’ বা দুনিয়ার কুতুব। যখন তাদের কেউ ইন্তেকাল করেন, আল্লাহ তাআলা তার স্থানে অন্যজনকে প্রতিষ্ঠা করেন। কখনো কখনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ইনতেকালের আগেই তারা এমন কিছু ব্যক্তিকে দেখে যান, যারা সর্বদিক দিয়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম। এভাবেই পৃথিবী কখনো তাদের বরকত ও প্রতিনিধিত্ব থেকে মুক্ত থাকে না। এই উম্মতের মধ্যে তাদের স্থান আগের যুগের নবীদের মতো।

তাদের পরিচয় কী?

আমি তাদের পরিচয়ের ক্ষেত্রে বলে থাকি- তারা হলেন সেই সকল ব্যক্তি, যারা দ্বীনের উসুলের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যারা দ্বীনের সীমারেখাগুলো সংরক্ষণ করেন। হয়তো কখনো তাদের ইলম কম হতে পারে। কম হতে পারে মানুষের সাথে তাদের মেলামেশা।

অর্থাৎ তাদের মর্যাদা ও অবস্থানের মধ্যেও কিছুটা তারতম্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যারা সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ ও যোগ্যতার অধিকারী, এমন সংখ্যা খুবই কম। অতীতে মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি শুধু একজনই থাকতেন।

আমি গভীরভাবে আমাদের সালাফে সালেহিনের মাঝে এই সংখ্যাটা তলিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। আমি বের করতে চেষ্টা করলাম, এমন সংখ্যা কত হবে? যারা এমনভাবে ইলম অর্জন করেছেন যে, মুজতাহিদদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। আবার এমনভাবে আমল করেছেন যে, আবেদদের নেতা হয়ে উঠেছেন। আমার পর্যবেক্ষণ শেষে আমি এ ক্ষেত্রে তিনজনের অধিক পাইনি। ১. হজরত হাসান বসরি রহ.। ২. হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ.। ৩. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.।

আমি তাদের এই বিন্যাস নিয়ে বহুজনের কাছে চিঠি দিয়েছি। সবাই আমার কথা মেনে নিয়েছেন। তবে তাদের কেউ কেউ চতুর্থ জন হিসেবে হজরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব রহ. এর কথা বলেছেন।

আমাদের সালাফে সালেহিনের মধ্যে যদিও আরও অনেক নেতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কিন্তু তাদের অধিকাংশের ওপর হয়তো কোনো বিশেষ শাস্ত্র বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। তাই অন্য বিষয়টি তার থেকে কমতি হয়ে গেছে। কারও ওপর প্রভাব ফেলেছে ইলম। কারও ওপর আমল। তবে সকলেরই নিজের ইলমের ক্ষেত্রেই একটি মজবুত ভিত ও দক্ষতা ছিল। ছিল আচার-আচরণ ও জানাশোনার একটি ভারসাম্যপূর্ণ অনুসরণীয় অংশ।

এখন তাদের পথে কেউ যদি চলতে চায়, তার তো কোনো বাধা নেই। যদিও সময়ের প্রেক্ষাপটে তারা অগ্রগণ্য হয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হজরত খাজির আলাইহিস সালামকে এমন বিষয় জানিয়েছিলেন, যা হজরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট ছিল অনুপস্থিত। আল্লাহর ভান্ডার পূর্ণ ও অবারিত। এটা শুধু কিছু ব্যক্তিতেই নিঃশেষিত নয়। সকলেরই অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

আমার কাছে ইবনে আকিল সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি নিজের সম্পর্কে বলতেন, 'নৌকা তৈরির কাজে আমিই সেরা ছিলাম। তারপর এ ধারা নষ্ট হয়ে গেছে।'

আমি বলি, এটা তার ভুল কথা। তিনি কীভাবে এটা মনে করতে পারেন যে ভবিষ্যতে অন্য কেউ তার মতো বা তারচেয়েও ভালো নৌকা বানাতে পারবে না?

কত আত্মগর্বী সম্ভাবনাময়ী মানুষ যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেটাই হয়তো সম্পাদিত হয়েছে এমন ব্যক্তির হাত দিয়ে, যার ক্ষেত্রে ধারণাই করা হতো না। কত পরবর্তীগণ কাজে ও কর্মে ছাড়িয়ে গেছেন পূর্ববর্তীদের! বলা হয়-
إن الليالي والأيام حاملة وليس يعلم غير الله ما تلد রাত ও দিনগুলো প্রসবের ভারে হয়ে আছে নত খোদাই শুধু জানে, কী যে করবে তারা প্রসবিত।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই

📄 প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই


আমি অনেকবার ভেবে দেখেছি, নফস কখনো কখনো প্রচণ্ডভাবে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার দিকে ধাবিত হয়। এমনকি যখন সে ধাবিত হয়, অন্তর জ্ঞান বোধ বুদ্ধি বিবেক সকলকে মাড়িয়েই ধাবিত হয়। কারও বাধাই তখন আর মানে না। এ সময় মানুষ কোনো নসিহত দ্বারা উপকৃত হওয়ার অবস্থায় থাকে না।

আমার নফসও একদিন হঠাৎ এভাবে প্রবৃত্তির দিকে ধাবিত হলো। আমি সচেতন সতর্ক হয়ে তাকে বলে উঠলাম, তোমার ধ্বংস হোক, কয়েক মুহূর্ত থামো। আগে আমার কিছু কথা শোনো, এরপর তোমার যা ইচ্ছা করো। সে থেমে বলল, তুমি বলো, আমি শুনছি।

আমি বললাম, প্রবৃত্তির হাতছানি উপেক্ষা করে জায়েয জিনিসের দিকে তুমি খুবই কম যাও। তোমার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ও আকর্ষণ হলো হারাম বিষয়ের দিকে। এখন আমি তোমার স্বভাবের দুটি বিষয় এখানে উপস্থাপন করছি। মনোযোগ দিয়ে শোনো।

এক. তুমি সাধারণত দুটি তিক্ত জিনিসকে মিষ্ট ভাবো। যেমন, জায়েয জিনিসের চেয়ে নাজায়েয প্রবৃত্তির আনুসরণকে মিষ্ট ভাবো। অথচ প্রবৃত্তির সেই কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের দিকে পৌঁছার পথ তো অনেক কঠিন। কারণ, সম্পদের স্বল্পতার কারণে কখনো কখনো সেটি সম্ভব হয়ে ওঠে না। স্বল্প উপার্জনের কারণে তার অধিকাংশটাই তোমার প্রাপ্তিতে আসবে না। এটি অর্জনে জীবনের কত মূল্যবান সময় তোমার খরচ হয়ে যাবে। অর্জনের পুরোটা সময় তোমার অন্তর তাতেই ব্যস্ত হয়ে থাকবে। আবার অর্জনের পরও হারানোর ভয়ে অস্থির হয়ে থাকবে। এরপর হয়তো প্রাপ্ত জিনিসের বাস্তব কোনো অপূর্ণতা তোমার এই প্রবৃত্তির আগ্রহকে নষ্ট করে দেবে। সেটা যদি খাবার-জাতীয় হয় তাহলে হতে পারে, তোমার এই পরিতৃপ্ত ভক্ষণই তোমার সমস্যার সৃষ্টি করবে। আর যদি তোমার প্রবৃত্তির বাসনা থাকে কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে- তাহলে হয়তো একসময় তুমি তার মাধ্যমে বিরক্ত হয়ে উঠবে। তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে কিংবা তার কোনো নিকৃষ্ট স্বভাব ও আচরণে তুমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। এরপর বিয়ে ও সহবাসের আস্বাদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে অনেক ক্ষতি ও অসুবিধা, শরীর ভেঙে পড়ে। ব্যক্তিকে নিয়ে আরও কত সমস্যা, যার বর্ণনা অতি দীর্ঘ।

দুই.

নিষিদ্ধ জিনিসের দিকে ধাবিত হওয়ার কারণে উল্লিখিত সমস্যাগুলোর সাথে রয়েছে দুনিয়ার শান্তি। মানুষের মাঝে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ার ভয়। এরপর আখেরাতের কঠিন শাস্তির কথা রয়েই গেল। তাছাড়া যখনই এই গোনাহের কথা স্মরণ হবে, আপনাআপনিই তোমার অন্তর হয়ে পড়বে অস্থির ও বেচাইন।

অন্যদিকে প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ের স্বাদ এমনই এক স্বাদ, যা অন্য সকল স্বাদের চেয়ে উন্নত। তুমি কি প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত মানুষকে দেখোনি, তারা কেমন লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়েছে? এর কারণ কী? কারণ, তারা প্রবৃত্তির চাহিদার কাছে পরাজিত হয়েছে। অন্যদিকে যারা প্রবৃত্তির ওপর বিজয় অর্জন করে, প্রবৃত্তির অন্যায় চাহিদাকে দমিয়ে রাখে, তারাই হলো শক্তিশালী অন্তরের অধিকারী। তারাই হলো সম্মানিত ও অনুসরণীয়। কারণ, তারা প্রবৃত্তির ওপর হয়েছে বিজয়ী।

সুতরাং নিজের আকর্ষিত বিষয়কে শুধু সৌন্দর্যের চোখ দিয়ে দেখা থেকে সতর্ক থাকো। যেমন, একজন চোর সম্পদ চুরির সময় শুধু তার আস্বাদনের কথাই মনে রাখে, এর ক্ষতির দিকে দৃষ্টি দেয় না। হাত কর্তিত হওয়ার কথা স্মরণ করে না।

এ কারণে নিজের কর্মগুলোকে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার দৃষ্টি দিয়ে দেখো, পরিণামের কথা চিন্তা করো। কারণ, স্বাদ আস্বাদনের কর্মটি বদলে গিয়ে সেটাই হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসের কারণ। কিংবা এটি তার আস্বাদনের পরিবর্তে হয়ে উঠতে পারে কষ্টের কারণ।

মানুষের প্রথম গোনাহ এমন একটি লোকমার মতো, যা কোনো ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ভক্ষণ করে। এটি তার ক্ষুধাকে নিবারণ করে না। বরং এটি খাবারের মতো তাকে আরও বেশি কাতর করে তোলে।

এ কারণে প্রবৃত্তির চাহিদার কাছে পরাজিত মানুষের পরিণাম এবং ধৈর্যধারণের উপকারিতা নিয়ে উপদেশ গ্রহণ করা উচিত। যে ব্যক্তি এটি করতে সক্ষম, সফলতা তার থেকে দূরে নয়। সফলতা যেন তার হাতের মুঠোয় এসে গেছে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 জীবনের বাস্তবতা

📄 জীবনের বাস্তবতা


হঠাৎ আমার মনে একটি চিন্তা এলো-

আমাদের তো সুন্দর মজলিস। মনোযোগী সকল অন্তর। চক্ষুগুলো অশ্রু প্রবাহিত করছে। মাথাগুলো দুলছে। নফস তার অন্যায় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হচ্ছে। সংকল্পগুলো সুদৃঢ় হচ্ছে তার অবস্থার সংশোধনের জন্য। এদিকে যদিও শয়তানের চক্রান্ত মনের অভ্যন্তরে প্রতিজ্ঞাগুলো নষ্ট করতে এবং গোনাহ সম্পর্কে সতর্ক না হতে কাজ করে যায়। কিন্তু মন তবু তাওবার দিকেই ধাবিত হয়।

এ সময় আমি নফসকে ডেকে বললাম, 'এই যে মনের জাগরণ, এটা স্থায়ী হয় না কেন? মজলিসে আমি নফস ও জাগরণকে পরস্পরের সাথে সখ্যতা ও হৃদ্যতার সাথে সহাবস্থানে দেখতে পাই। কিন্তু যখনই আমরা এই মাটির মজলিস থেকে উঠে যাই, আমাদের অন্তরগুলো পরিবর্তন হয়ে যায়।

আমি চিন্তা করলাম, এমনটা কেন হয়? ভেবে দেখলাম, নফস জাগ্রতই থাকে, অন্তর আল্লাহর স্মরণেই থাকে। কিন্তু এগুলোর সচেতন থাকার অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যতটুকু সময় আল্লাহ তাআলার পরিচয় ও স্মরণে চিন্তাকে ব্যবহার করা হয়, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি ব্যবহার করা হয় দুনিয়ার উপার্জনে, নফসের চাহিদাগুলোর উপকরণ জোগাড়ে। অন্তর সব সময় এর মধ্যেই নিমজ্জিত থাকে। আর আমাদের শরীর যেন এমনই এক সোহাগি বন্দি, যার পরিচর্যার কোনো বিরাম নেই।

এভাবে আমরা দেখি, মানুষের চিন্তা ব্যস্ত রয়েছে তার খাদ্য-খাবার, পোশাক, বাসস্থান ও শারীরিক পরিচর্যা নিয়ে। এগুলো নিয়েই সে চিন্তা করে এবং তার আগামীকাল বা আগামী বছরের জন্য খাদ্য ও অর্থ জমাতে থাকে। শরীর থেকে নাপাকি বের হলে যেমন পবিত্রতা অর্জন করতে হয়, তেমনি শরীরের জৈবিক চাহিদার জন্য বিয়েও করতে হয়। পরিবার হয়। দায়িত্ব আসে। তাই স্বাভাবিকভাবেই দুনিয়ার উপার্জন ছাড়া তার আর উপায় থাকে না। এরপর যখন সন্তান-সন্ততি আসে তখন তো তার চিন্তা পুরোদমে দুনিয়ার উপার্জনে ঘুরতে থাকে।

কিন্তু মানুষ যখন মজলিসে আসে তখন সে ক্ষুধার্ত হয়ে আসে না। বড় ধরনের কোনো পেরেশানির চিন্তা নিয়েও আসে না। বরং এখানে সে তার সমস্ত মনোযোগ একত্র করে। দুনিয়ার যত চিন্তা ও ভাবনা, সেগুলোকে ভুলে থাকে। তখন সে অন্তর দিয়ে ওয়াজ শুনতে পারে। যা বলা হয়, তা-ই স্মরণ করে। যা শোনে, তা-ই গ্রহণ করে। যা জানে, তার ওপরই আমল করতে উদ্বুদ্ধ হয়। এভাবেই মানুষ তাদের নফসকে উদাসীনতা থেকে জাগ্রত করে তোলে। অতীতে যে ভুল-ত্রুটি ও গোনাহ হয়ে গেছে, সেগুলোর ওপর অনুতপ্ত হয়। চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়। এবং ভবিষ্যতে মেনে চলার ব্যাপারে অন্তরগুলো প্রবলভাবে প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে।

এতক্ষণ আমি দুনিয়ার যে কর্তব্য-কাজের কথা বললাম, অন্তরগুলো যদি সকল সময় সেই ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হতো তবে তারা সর্বক্ষণই তার প্রতিপালকের ইবাদতে নিমগ্ন থাকত। মানুষ যদি এভাবে তার প্রতিপালকের প্রেমে পড়ে যেত তবে সকল কিছু বর্জন করে তার নৈকট্য প্রাপ্তির জন্য জীবনপাত করত। এ কারণেই দুনিয়াবিমুখ সাধকগণ নির্জনতাকে অবলম্বন করে নিরালায় বসবাস করেন। সকল অন্তরায় ও পিছুটান থেকে মুক্ত হয়ে ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন। তারা তাদের এই পরিশ্রম ও ত্যাগের পরিমাণ অনুপাতেই ইবাদতের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করেন। যেমনভাবে কৃষকরা তাদের বপিত বীজের পরিমাণ অনুপাতে ফসল পায়।

কিন্তু চিন্তার ঠিক এই মুহূর্তে আমার মনের মধ্যে একটি জিনিস ঝলক দিয়ে উঠল। তা হলো, নফসের যদি সর্বক্ষণ এই জাগ্রত অবস্থা বিরাজ করে, দু-হাতে আঙুলের মুঠো দিয়ে যেমন বালির কণাগুলো বেরিয়ে যায়, তেমনি অসংখ্য ক্ষতির সৃষ্টি হবে এতে। যেমন, মানুষ তার নিজের অবস্থার ওপর অহংকারী হয়ে উঠবে। অন্যদের তুচ্ছ ও হেয়জ্ঞান করতে শুরু করবে। জোশ ও অবস্থার ক্রমোন্নতির একপর্যায়ে সে দাবি করে বসবে, আমার সাথে দুনিয়ার কার কী কর্তব্য আর লেনদেন? আমার কারও সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। তখন দুনিয়ার কোনো দায়-দায়িত্বই আর পালন করবে না। আর যারা পালন করছে, তাদেরকে নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ ভাবতে থাকবে। এভাবে নফসকে সে গোনাহের বিভিন্ন আক্রমণের মাঝে হাবুডুবু খেতে দেবে। এরপর যখন তীরে উঠে এসে অন্যদের দিকে দৃষ্টি দেবে তখন অন্যদের ইবাদতের তুচ্ছতা নিয়ে নাক ছিটকাবে।

একেবারে সংশ্রবহীন নির্জন সাধকদের অধিকাংশের অবস্থা এমনটাই হয়ে থাকে। এ কারণে আলেমগণ এই অবস্থা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। যে ব্যক্তি বীজ বপন করে, সে তার পরিচর্যা করে। পোকা-মাকড় ধ্বংস করে ও আগাছা উঠিয়ে ফেলে। এই পরিশ্রম তার ক্ষেতকে পরিশুদ্ধতা এনে দেয়। সুতরাং বান্দার জন্যও অবশ্যই এমন কিছু ভুল থাকা আবশ্যক, যে দিকে সে ভয়মিশ্রিত কম্পিত বুক নিয়ে তাকিয়ে থাকবে, আল্লাহ মাফ করবেন কি না! এতেই তার দাসত্ব প্রকাশিত হবে। তার ইবাদত গ্রহণ করা হবে। আর এদিকে ইশারা করেই হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ.

হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা যদি গোনাহ না করতে তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের অপসারিত করে এমন এক সম্প্রদায় নিয়ে আসতেন, যারা গোনাহ করবে এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে এবং আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেবেন। ৪৫

টিকাঃ
৪৫ সহিহ মুসলিম: ১৩/৬৪৯৬ পৃষ্ঠা: ৩০১- মা শামিলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সুফিতত্ত্বের যাচাই-বাছাই

📄 সুফিতত্ত্বের যাচাই-বাছাই


চিন্তা করে দেখলাম, মানুষের সম্পদ সংরক্ষণ করাও একটি আবশ্যক কর্তব্য। অথচ এদিকে মূর্খ সুফিরা বলে বেড়ায়, হাতে যা আছে তা দান করে আল্লাহর ওপর ভরসা করো।

এটি আমাদের শরিয়তে বৈধ নয়। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাব ইবনে মালিক রা.-কে বলেছিলেন, أمسك عليك بعض مالك.

তুমি নিজের কাছে তোমার কিছু সম্পদ রেখে দাও (সম্পূর্ণ দান করো না)। ৪৬

এবং সাদ রা.-কে বলেছিলেন, لأن تترك ورثتك أغنياء خير من أن تتركهم عالة يتكففون الناس.

তুমি তোমার পরিবারকে নিঃস্ব অবস্থায় রেখে যাবে আর তারা মানুষের দুয়ারে চেয়ে বেড়াবে-এর চেয়ে তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের স্বচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়াই ভালো। ৪৭

এখন কোনো মূর্খ যদি এসে প্রশ্ন উঠায়- তবে যে হজরত আবু বকর রা. তার সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিয়েছিলেন! এর কী উত্তর হবে?

উত্তরে আমরা বলব, হজরত আবু বকর রা. ছিলেন এক মহৎ হৃদয়ের মানুষ এবং ছিলেন একজন দক্ষ ব্যবসায়ী। তিনি তার সকল সম্পদ দিয়ে দিলেও তার জন্য সম্ভব ছিল কারও থেকে ঋণ করে ব্যবসার মাধ্যমে জীবনযাপন করতে পারা। যার এ ধরনের ধৈর্য, হৃদয়, সক্ষমতা ও দক্ষতা রয়েছে, তার জন্য আমি সকল সম্পদ দান করে দেওয়াও কিছু মনে করি না। কিন্তু এটা তার জন্য অবশ্যই নিন্দনীয় হবে, যার জীবনযাপনের আর কোনো মাধ্যম ও পুঁজি নেই। কারণ, তখন সে নিজের সম্পদ হারিয়ে অন্যের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। মানুষের দয়া অনুগ্রহ ও সহানুভূতির ওপর চলতে বাধ্য হবে। তার অন্তর তখন সর্বক্ষণ মাখলুকের দিকে ঝুঁকে থাকবে। তাদের মাঝেই তার আশা-নিরাশা ঘুরপাক খেতে থাকবে। যখনই কেউ তার দরজায় কড়া নাড়বে, তার অন্তর প্রত্যাশার চাপে তিরতির করতে থাকবে, এই বুঝি রিজিক এসে গেল। কেউ বুঝি কিছু নিয়ে এলো। নাউজুবিল্লাহ। সক্ষম কোনো ব্যক্তির জন্য এটি খুবই কুৎসিত একটি বিষয়।

আর যে ব্যক্তি উপার্জনে সক্ষম নয়, তার সকল সম্পদ দান করা তো আরও খারাপ, অবৈধ। কারণ, এরপর তাকে সব সময় মানুষের হাতের দিকে চেয়ে থাকতে হবে। তাদের দয়া-অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এটি একটি অপদস্থতার পথ। কখনো কখনো এটিকে দুনিয়াবিমুখতা বলে সুশোভন করার চেষ্টা করা হয়। অথচ আসলেই এটি একটি অপদস্থতার পথ। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম লাঞ্ছনার অবস্থা হলো, তারা ফকির মিসকিন ও নিঃস্বদের সাথে জাকাতের সম্পদে ভিড় বাড়িয়ে দেবে। তুমি প্রথম যুগের অবস্থার দিকে তাকাও। সেখানে এমন কাউকে পাবে না, যেমনটি আজকের যুগের মূর্খ সুফিগুলো করে বেড়ায়। আগেই উল্লেখ করেছি, তারা নিজেরা উপার্জন করেছেন এবং পরবর্তীদের জন্য সম্পদ রেখে গেছেন।

তাছাড়া প্রথম যুগের দিকে তাকিয়ে দেখো, সেখানে কেউ তাদের নিজেদের জন্য 'সুফি' পরিভাষা ব্যবহার করেননি। তাই শরিয়তে যে ধরনের আচরণ ও পরিভাষা বিদ্যমান ছিল না, সে ধরনের বিষয় থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নিশ্চয় আমাদের এই দ্বীন অসম্পূর্ণ নয় যে, নতুন কোনো বিষয় এসে তাকে পূর্ণতা দান করবে।

জেনে রেখো, মানুষের শরীর হলো একটি জীবন্ত বাহনের মতো। তাকে খাইয়ে-পরিয়ে রাখতে হয়। তার পরিচর্যা করতে হয়। কিন্তু তুমি যদি এ ব্যাপারে অবহেলা করো তাহলে বুঝতে হবে, তুমি নবী ও সাহাবিদের জীবন ও জীবনাচার সম্পর্কে সামান্যতমও অবগত নও।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন খুবই প্রিয় ও বিখ্যাত সাহাবি হজরত সালমান ফারসি রা.। তাকে দেখা যেত যে, তিনি খাবার কাঁধে নিয়ে ঘুরতেন। তাকে একবার প্রশ্ন করা হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন সাহাবি হয়ে আপনি এমন কাজ করেন? জবাবে তিনি বললেন,
إن النفس إذا أحرزت قوتها اطمأنت.

নফস যখন তার খাদ্য সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়, তখন সে শান্ত থাকে। বিখ্যাত তাবেয়ি হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন,
إذا حصلت قوت شهر فتعبد.

তোমার যদি অন্তত একমাসের খাদ্য জমা থাকে তাহলে তুমি অধিক নফল ইবাদতে সময় দিতে পারো।

আবার কিছু লোক আছে, নিছক কথার দাবি ছাড়া তাদের কোনো দলিল নেই। তারা বলে, এটা তো আল্লাহ তাআলার 'রাজ্জাক' হওয়ার ক্ষেত্রে সন্দেহ পোষণ করা কিংবা তার ওপর 'তায়াক্কুল'-এর বিরোধী কথা।

এ ধরনের কথা যারা বলে, তুমি তাদের থেকে বেঁচে থাকো। তাদের কথা শুনে বিভ্রান্ত হয়ো না। অবশ্য তারা কিছু 'সালাফ'-এর দুনিয়াবিমুখতা দিয়ে এ ব্যাপারে উদাহরণ দিতে চায়। কিন্তু সেই অবস্থা এখন আর নেই। মানুষের আচরণ, মানুষের ধৈর্য একেবারে পাল্টে গেছে। সুতরাং মূর্খ সুফিদের বিরোধিতা যেন তোমাকে উদ্বিগ্ন না করে। যেমন, আবু বকর আল-মারুজি বর্ণনা করেন, কথাপ্রসঙ্গে আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে একবার বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করতে শুনলাম। এ কথা শুনে আমি তাকে বললাম, হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. বলেছেন...। আমি কথাটি শেষ করার আগেই আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. আমাকে ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, কী বলো, আমি তোমার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের অবস্থা বর্ণনা করছি আর তুমি নিয়ে আসছ নব আবিষ্কৃত পথ? চুপ করো।

ভালোভাবে জেনে রাখো, কোনো ব্যক্তি যদি জীবনযাপনের আবশ্যক উপকরণগুলো স্বেচ্ছায় ব্যবহার না করে বলে, আমি খাব না, পান করব না, রোদের তাপ থেকে দূরে সরে যাব না কিংবা ঠান্ডায় উষ্ণতার আশ্রয় নেব না, সর্বসম্মতিক্রমে সে ব্যক্তি গোনাহগার হবে। এমনিভাবে যার অধীনে পরিবার-পরিজন রয়েছে, সে যদি বলে, আমি উপার্জন করব না। তাদের রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ তাআলার ওপর। এরপর যদি পরিবারের লোকদের ক্ষুধার্ত থাকতে হয় কিংবা আর্থিক কষ্ট করতে হয় তাহলে সেই লোক গোনাহগার হবে। যেমনটি হাদিসে এসেছে-
كفى بالمرء إثما أن يضيع من يقوت.

মানুষের গোনাহগার হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, নিজের সক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ৪৮

জেনে রেখো, গুরুত্বের সাথে উপার্জন করা নিজের হিম্মত ও মনোবল বাড়িয়ে দেয়, অন্তরকে মুক্ত ও প্রফুল্ল রাখে, মাখলুকের ওপর কোনো আশা করতে হয় না। তাছাড়া তোমার নিজের মানবিক স্বভাব-তবিয়তের একটা অধিকার আছে। তার বৈধ চাহিদাগুলো পূরণ করা উচিত। শরিয়ত এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য বর্ণনা করেছে-
إن لنفسك عليك حقا وإن لعينك عليك حقا.

তোমার ওপর তোমার নফসের অধিকার রয়েছে। অধিকার রয়েছে তোমার চোখের। ৪৯

নতুবা অর্থহীন লোকদেখানো দুনিয়াবিমুখতার উদাহরণ হলো সেই কুকুরের মতো, যে রাতের অন্ধকারে কাউকে চেনে না। যাকে দেখে তার সাথেই হাঁটতে শুরু করে। ঘেউ ঘেউ করে। লোকটি যদি কোনো রুটির টুকরো ছুড়ে মারে তখন চুপ হয়ে যায়।

এই নীতিগুলো ভালোভাবে বুঝে নাও। একটি সুন্দর জীবনযাপনের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ এই বুঝটা খুবই জরুরি।

টিকাঃ
৪৬. হাদিসটি ইমাম বোখারি রহ. 'কিতাবুল মাগাযি' তে উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারি: ৭/৪৪১৮। এবং ইমাম মুসলিম রহ. 'কিতাবুত তাওবা' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। এখানে হাদিসের কিছু অংশ উল্লেখ করা হয়েছে। এবং বিভিন্ন বর্ণনায় শব্দেরও ভিন্নতা রয়েছে। সহিহ বোখারিতে পুরো হাদিসটি এমন- أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ كَعْبٍ قَالَ سَمِعْتُ كَعْبَ بْنَ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ مِنْ تَوْبَتِي أَنْ أَنْخَلِعَ مِنْ مَالِي صَدَقَةً إِلَى اللهِ وَإِلَى رَسُولِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ أَمْسِكْ عَلَيْكَ بَعْضَ مَالِكَ فَهُوَ خَيْرٌ لكَ قُلْتُ فَإِنِّي أُمْسِكُ سَهْمِي الَّذِي بِخَيْبَرَ.
সহিহ বোখারি: ৯/২৫৫২ পৃষ্ঠা: ৩৩৩- মা. শামেলা।
৪৭. সূত্র- পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
৪৮ সুনানে আবু দাউদ: ৫/১৪৪২, পৃষ্ঠা: ১২- মা. শামেলা। এছাড়া মুসনাদে আহমদ: ২/১৬০, ১৯৪। এবং মুসতাদরাকে হাকেম: ১/৪১৫। ইবনে হাকেম বলেন, এটি বিশুদ্ধ সনদের হাদিস।
৪৯ সহিহ বোখারি: ৭/১৮৩৯, পৃষ্ঠা: ৮৭- মা. শামেলা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00