📄 শাস্তি ও পুরস্কার
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই পার্থিব জগতে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, এর প্রত্যেকটির প্রতিরূপ রয়েছে আখেরাতে। এবং আখেরাতে যা ঘটবে, দুনিয়ার ঘটনাবলি তারই কিছু নমুনা। অবশ্য ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
ليس في الجنة شيء يشبه ما في الدنيا إلا الأسماء.
শুধু নাম ব্যতীত জান্নাতের কোনো কিছুই দুনিয়ার মতো হবে না। ৪০
তবে সাদৃশ্য থাকবেই। এবং এই সাদৃশ্যের কারণ হলো, আল্লাহ তাআলা মানুষদের দুনিয়ার নিয়ামত দেখিয়ে আখেরাতের নিয়ামতের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। একইভাবে দুনিয়ার শাস্তি দেখিয়ে আখেরাতের শাস্তি থেকেও সতর্ক করেন।
তাহলে এখন দেখি দুনিয়াতে কী ঘটে?
প্রত্যেক জালেমকেই আখেরাতের শাস্তির আগে দুনিয়াতেও নগদ কিছু শাস্তি প্রদান করা হয়। প্রত্যেক পাপীরও তাৎক্ষণিক কিছু শাস্তি প্রদত্ত হয়। আর এগুলো হলো আল্লাহ তাআলার এই কথাটির বাস্তবায়ন-
مَنْ يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ )
যে ব্যক্তি কোনো খারাপ কাজ করবে, তাকে অবশ্যই তার প্রতিদান দেওয়া হবে। [সুরা নিসা : ১২৩]
কিন্তু মানুষ অনেক সময় তার এই শাস্তির কথা বুঝতে পারে না। পাপী দেখছে তার দেহ সুস্থ, তার রয়েছে অঢেল সম্পদ। সে ভাবছে, তার তো কোনো শাস্তি হয়নি বা হচ্ছে না। আসলে তার শাস্তিটাই তাকে তার শাস্তি সম্পর্কে উদাসীন করে রেখেছে। এটাই তার শাস্তি।
এ কারণে জনৈক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি বলেন, المعصية عقاب المعصية، والحسنة بعد الحسنة ثواب الحسنة.
গোনাহের শাস্তিই হলো আরেকটি গোনাহ করা... এবং সওয়াবের প্রতিদানই হলো আরেকটি সওয়াব অর্জন করতে পারা।
অবশ্য কখনো কখনো দুনিয়ার এই শাস্তিটা হয়ে থাকে অভ্যন্তরীণ; বাহ্যদৃষ্টির আড়াল। যেমন, বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করা হয়—একবার বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলল, يا رب، كم أعصيك ولا تعاقبني.
হে আমার প্রতিপালক, আমি তোমার কত অবাধ্যতা করি, কিন্তু তুমি তো আমাকে কোনো শাস্তি দাও না।'
আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে বলা হলো, كم أعاقبك وأنت لا تدرى، أليس قد حرمتك حلاوة مناجاتي؟
আমি তোমাকে কত শাস্তি প্রদান করি, কিন্তু তুমি তো তা বুঝতে পারো না। আমি কি আমার জন্য তোমার সেই নির্জন ইবাদতের মিষ্টতা ও আস্বাদন তোমার থেকে উঠিয়ে নিইনি?
যে ব্যক্তি আল্লাহর এ ধরনের শাস্তির কথা চিন্তা করে সতর্ক থাকে, সে-ই কেবল সফলকাম হতে পারে। কারণ, এ ধরনের শাস্তি তো খুবই ভয়াবহ একটি ব্যাপার। কিন্তু অনেকেই সেটা বুঝতে পারে না।
গোনাহের ওপর গোপন এই শাস্তি খুবই মারাত্মক। এমনকি ওহাব ইবনে ওরদ রহ.৪১ বলেন, তাকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে ব্যক্তি গোনাহে লিপ্ত থাকে, সে কি ইবাদতের স্বাদ অনুভব করতে পারে?
তিনি বলেন, কিছুতেই না। এমনকি যে গোনাহের প্রতি শুধু আগ্রহ রাখে, বাস্তবে করে না, সে ব্যক্তিও ইবাদতের স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকে।
যেমন, কোনো ব্যক্তি হয়তো চোখের হেফাজত করে না, আল্লাহ তাআলা তাকে দৃষ্টির মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করেন। কেউ হয়তো জবানের হেফাজত করে না, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরের নির্মলতা দূর করে দেন। হয়তো কেউ হারাম বা সন্দেহপূর্ণ খানা ভক্ষণ করে, আল্লাহ তাআলা তার অভ্যন্তরকে অন্ধকার করে দেন। তাকে বঞ্চিত করেন রাতের নির্জন নামাজ থেকে, একান্ত মোনাজাত থেকে, ইবাদতের স্বাদ থেকে, এমনিভাবে আরও অনেক বিষয় থেকে।
এটা হলো এমন এক অন্তরগত বিষয়, যারা প্রতিদিন নফসের হিসাব-নিকাশ করে, তারা নিজেদের মাঝে এই তারতম্য বুঝতে পারে। আর অন্যরা থাকে এর থেকে গাফেল।
আর ঠিক এর বিপরীত অবস্থা হলো, যারা তাকওয়া অর্জন করে, গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে, আল্লাহ তাদেরকেও তার তাকওয়ার কারণে তাৎক্ষণিক পুরস্কার প্রদান করেন। এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে, হজরত আবু উমামা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
النظرة إلى المرأة سهم مسموم من سهام الشيطان، من تركه ابتغاء مرضاتي آتيته إيمانا يجد حلاوته في قلبه
কোনো বেগানা নারীর দিকে দৃষ্টিপাত শয়তানের তিরগুলোর মধ্যে একটি বিষাক্ত তির। যে ব্যক্তি আমার সন্তুষ্টির জন্য এটাকে বর্জন করবে, আমি তাকে এমন ঈমান প্রদান করব, যার মিষ্টতা সে তার অন্তরের মধ্যে অনুভব করতে পারবে। ৪২
উদাসীন ব্যক্তিদের সতর্কতার উদ্দেশ্যে এ ব্যাপারে এখানে অল্প কিছু আলোচনা উপস্থাপিত হলো। তাছাড়া গোনাহের স্পষ্ট শাস্তির কথাও হাদিসে এত বেশি বর্ণনা এসেছে যে, তুমি গুণে শেষ করতে পারবে না। যেমন হাদিসে এসেছে—
وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
বান্দার কৃত পাপ, তার রিজিককে কমিয়ে দেয়।৪৩
বুঝমান ব্যক্তিরা যখন এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করেন তখন তারা এর প্রতিদান ও প্রতিফল বুঝতে পারেন। যেমন, ফুজাইল রহ. বলেন, 'আমি কখনো আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হলে তা আমি আমার বাহন ও দাসীর আচরণ দ্বারা টের পাই। তাদের আচরণও বিগড়ে যায়।'
আবু উসমান নিশাপুরী রহ.৪৪ থেকে বর্ণিত আছে, মসজিদে যাবার পথে একবার তার পায়ের জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেল। এটা ঠিক করতে তাকে কিছুক্ষণ বিলম্ব করতে হলো। এরপর তিনি বললেন, 'আসলে আজকে আমি জুমার দিনের গোসল করিনি। এ কারণেই আমার জুতার ফিতা ছিঁড়েছে।'
দুনিয়াতে তাৎক্ষণিক প্রতিদানের এক উজ্জ্বল ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত হলো হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা। তারা তাদের যে হাত ইউসুফের প্রতি জুলুমের জন্য প্রসারিত করেছিল, একদিন তাদের সেই হাতই ইউসুফের দিকে প্রার্থনার জন্য বাড়িয়ে বলতে হয়েছিল- وَتَصَدَّقُ عَلَيْنَا – আমাদের কিছু দান করুন।
যে জুলাইখা মিথ্যাভাবে ইউসুফ আলাইহিস সালামের প্রতি অপবাদ আরোপ করেছিল, আল্লাহ আবার তার মুখ দিয়েই বলিয়েছেন- أنا راودته - আমিই আসলে ইউসুফকে ফুসলিয়েছিলাম।
একইভাবে সুন্দর কাজের প্রতিদানও তাৎক্ষণিক দুনিয়াতেও পাওয়া যায়। যেমন, হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন জুলায়খার সেই পরীক্ষার সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলেন, পরিণামে আল্লাহ তাআলা একসময় হালালভাবেই তাকে তার আয়ত্তে এনে দিলেন।
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলার জন্য কেউ যদি কোনো পাপকর্ম বর্জন করে, অবশ্যই সে তার সুন্দর প্রতিফল দেখতে পাবে। আবার কেউ যদি কোনো সওয়াব বা ভালো কাজ করে, তার প্রতিফলও সে প্রাপ্ত হবে।
এ কারণে আমাদের সকল কাজেই সতর্ক থাকা চাই। কারণ, আমরা এমন অনেক মানুষকেই দেখি, সাময়িক আনন্দ-উল্লাসের জন্য হয়তো কোনো শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে গিয়েছে; কিন্তু আচমকাই তার সকল ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে। তখন তার অবস্থাই গেছে পাল্টে। মরে গেছে কিংবা চিরদিনের জন্য অথর্ব অসম্মানী কিংবা নিঃস্ব হয়ে গেছে।
এক শাইখের ঘটনা। তিনি বলেন, একবার আমি আমার যৌবনকালে একটি দাসী ক্রয় করেছিলাম। তার প্রতি খুবই আসক্ত হয়ে পড়ছিলাম। ক্রয়ের পর আমি ফিকাহবিদকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি এখন তার সাথে মিলিত হতে পারব?
তারা বললেন, না, একবার ঋতুস্রাব না হওয়ার আগে আপনি তার সাথে মিলিত হতে পারবেন না। এমনকি তার দিকে কামনার দৃষ্টিতে তাকাতেও পারবেন না, স্পর্শও করতে পারবেন না।
এরপর কিছুদিন যাওয়ার পর দাসীটি জানাল, তাকে যখন আমি ক্রয় করি তখনই সে ঋতুমতী অবস্থায় ছিল। আমি ভাবলাম, তাহলে বুঝি এখন সময় হয়ে গেছে। আমি আবার এটার কথা ফিকাহবিদদের জিজ্ঞাসা করলাম। তারা বললেন, সময় তো আরও দূরবর্তী হয়ে গেল। পুনরায় আপনার মালিকানায় ঋতুস্রাব হয়ে তা থেকে পবিত্র হতে হবে। এখনো আপনি আগের মতোই সবকিছু থেকে বিরত থাকবেন।'
তাদের কথায় কষ্টে আমার অন্তর চৌচির হয়ে যেতে লাগল। জৈবিক চাহিদা যেন আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। হাতের কাছেই এমন সুন্দরী মেয়েটি; অথচ...। আমি একদিন দাসীটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ অবস্থায় কী করা যায়?
দাসীটি বলল, কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করাই হলো ঈমান। এখন আপনি মেনেও চলতে পারেন কিংবা অস্বীকারও করতে পারেন। আপনি কোনটি গ্রহণ করবেন?
দাসীটির কথায় আমার চক্ষু খুলে গেল। অন্তর প্রসারিত হলো। আমি আল্লাহর জন্য জান-প্রাণ বেঁধে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করলাম। এবং এভাবে কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণের কারণে পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা আমাকে জীবনে এত এত প্রতিদান দিলেন! আহা, আমি বলে শেষ করতে পারব না! আমার জীবনটাই গেল বদলে। জীবন হয়ে উঠল আরও উচ্চ উন্নত ও সম্মানজনক।
টিকাঃ
৪০. কথাটি হজরত ইবনে কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন- ১/৯১। এবং তিনি বলেন, এটা ইবনে জারির রহ. বর্ণনা করেছেন। তাফসিরে ইবনে জারির- ১/৩৬৯/৫৩৪, ৫৩৫।
৪১. পুরো নাম: আবু উসমান বা আবু উমাইয়া ওহিব ইবনে উরদ আলমাক্কী। কেউ বলেন, তার নাম আসলে আবদুল ওয়াহহাব। তিনি ছিলেন একজন ‘ছিকা’ বা হাদিসের ক্ষেত্রে একজন আস্থাভাজন ব্যক্তি। খুব ইবাদতগুজার। তিনি ১৫৩ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ৭/১৯৮ এবং তাবাকাতু ইবনি সা'দ : ৫/৪৪৮।
৪২. মুসতাদরাকে হাকেম: ৪/৩১৪। হাদিসটি হজরত আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম গাজালি রহ. এটি তাঁর গ্রন্থ 'ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন'এ উল্লেখ করেছেন- ১/৩৬৫। সনদ সহিহ। তবে কিছু কিছু সূত্রে এর রাবীর মধ্যে দুর্বলতা আছে।
৪৩. হাদিসটি ‘মুসনাদে আহমদ’ এ বর্ণিত হয়েছে- ১/৭৩/৫৩০। ‘সুনানে ইবনে মাজা’তেও বর্ণিত হয়েছে-২/৪০২২। আহমদ শাকের বলেন, হাদিসটি দুর্বল। পুরো হাদিসটি এমন-
عَنْ ثَوْبَانَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الْعَبْدَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ وَلَا يَرُدُّ الْقَدَرَ إِلَّا الدُّعَاءُ وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمُرِ إِلَّا الْبِرُّ.
মুসনাদে আহমদ: ৪৫/২১৪০২, পৃষ্ঠা: ৪১৭- মা. শামেলা।
৪৪. তার পুরো নাম: আবু উসমান সাঈদ ইবনে ইসমাইল ইবনে নিসাপুরী। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ ইমাম মুহাদ্দিস ও বক্তা। তিনি ছিলেন ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াত’। আবেদ ও জাহেদদের তিনি ছিলেন কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ২৯৮ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন।
📄 অন্তরের একনিষ্ঠতা
আল্লাহ তাআলাই যেহেতু আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাই তার অবস্থিতি কিংবা সত্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ বা সংশয় থাকতে পারে না। তবুও কিছু মানুষ অস্বীকার করে। আল্লাহ নিজেই তাই তার সত্যতার ব্যাপারে কোরআনে অনেক প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।
আমিও একবার আল্লাহর সত্যতার প্রমাণ নিয়ে কিছু চিন্তা-ভাবনা করলাম। দেখলাম, এ ক্ষেত্রে অসংখ্য দলিল-প্রমাণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিস্ময়কর ও সহজ প্রমাণ হলো, কখনো কখনো মানুষ এমন কাজ-কর্ম গোপন করে, যার প্রতি আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট নন। অনেকদিন পরে হলেও আল্লাহ তাআলা সেটাকে প্রকাশ করে দেন। মানুষ এটা নিয়ে কথা বলতে থাকে, অথচ তারা এটা দেখেনি।
কখনো গোপন গোনাহকারী ব্যক্তি এমন বিপদের মধ্যে পড়ে যে, মানুষের সামনে তার সকল পাপ প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সে এতদিন ধরে যে গোনাহগুলো করে আসছিল, এই হলো তার দুনিয়ার প্রতিদান। আল্লাহ কেন এমনটি করেন? তিনি এমনটি করেন, যেন মানুষ বুঝতে পারে, অবশ্যই এমন একজন সত্তা রয়েছেন, যিনি মানুষের পদস্খলনের প্রতিদান দেন। তিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন। তার ক্ষমতা ও নির্বাচনের কাছে কোনো গোপনীয়তা ও পর্দা নেই। মানুষের কোনো কর্মই তাঁর নিকট অবিদিত নয়।
এমনিভাবে মানুষ কখনো কখনো তাঁর ইবাদত-আনুগত্যকেও মানুষের থেকে লুকিয়ে রাখে। মানুষকে জানতে দিতে চায় না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা মানুষের সামনে একদিন এগুলোও প্রকাশ করে দেন। মানুষ তাঁর আমলগুলোর কথা আলোচনা করতে থাকে। তাঁর প্রচারে রত হয়। এমনকি আমল যতটা নয়; তার চেয়েও বেশি বলতে থাকে। মানুষ যেন তাঁর কোনো খারাবির কথাই জানে না। তাঁর সম্পর্কে ভালো ছাড়া কিছুই বলে না। আল্লাহ এটা কেন করেন? যেন মানুষ জানে, নিশ্চয় একজন প্রতিপালক রয়েছেন, যার নিকট কোনো আমলকারীর আমলই বিফলে যায় না।
এভাবে মানুষ যখন কারও প্রকৃত অবস্থা জেনে যায় তখন হয়তো কাউকে ভালোবাসে এবং প্রশংসা করে এবং কাউকে ঘৃণা করে ও বদনাম করে। সবই হয়ে থাকে আল্লাহ ও তাঁর মাঝের সম্পর্ক অনুযায়ী। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য যথেষ্ট হন, সকল কষ্ট দূর করেন। সকল খারাবি থেকে মুক্ত রাখেন।
আর যে ব্যক্তি সত্যের দিকে লক্ষ না করে মানুষের সাথে নিজের সম্পর্ক ভালো করতে চায়, পরিণামে তার উদ্দেশ্য উল্টে যায়। তার প্রশংসাকারীও একসময় তার নিন্দায় অংশ নেয়। সে স্রষ্টাকে অসন্তুষ্ট করে সৃষ্টিকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিল; কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয় না। একসময় সৃষ্টিও তার বিপক্ষে চলে যায়। তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে।
📄 ভালো এবং মন্দ
পৃথিবী এবং তার ওপর যারা রয়েছে, তাদের ব্যাপারে একবার চিন্তার দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলাম। মনে হলো, পৃথিবীর বয়সের চেয়েও তার অবস্থা বড় ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তারপর এখানকার বসবাসকারীদের দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, জগতের প্রায় সকল জায়গা কাফেররা দখল করে আছে। এরপর দৃষ্টি দিলাম মুসলমানদের দিকে। দেখলাম, কাফেরদের তুলনায় পৃথিবীতে তাদের সংখ্যা অনেক কম।
এরপর শুধু মুসলমানদের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করলাম। দেখলাম, বিভিন্ন পেশা ও কাজ-কর্ম তাদের অধিকাংশকে রিজিকদাতা আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, তার সম্পর্কে ইলম অর্জন করা থেকেও তাদেরকে বিরত রেখেছে।
আর রাজ-বাদশাহরা রয়েছে কর্মচারীদের আদেশ-নিষেধ ও নিজেদের আরাম-আয়েশ নিয়ে। তাদের মাঝে অঢেল টাকা-সম্পদের প্রবাহধারা জারি রয়েছে; কিন্তু এগুলোর কোনো শুকরিয়া নেই। কেউ তাদেরকে আজ আর উপদেশ দিতে আসে না। বরং সকলেই নির্বিচারে তাদের প্রশংসা আর চাটুকারিতা চালিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের বন্ধনহীন নফসকে আরও লাগামছাড়া করে তুলছে। অথচ নফসের এসকল রোগ খুব শক্তহাতে প্রতিহত করার দরকার ছিল। যেমন, আমর ইবনে মুহাজির রহ. বলেন, আমাকে একবার উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. বললেন,
إذا رأيتني قد حدث عن الحق فخذ بثيابي و هزني، وقل ما لك يا عمر ؟
আপনি যদি দেখেন আমি সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছি তাহলে তখন আমার জামার প্রান্ত চেপে ধরবেন এবং ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে বলবেন, হে উমর, এ তোমার কী হলো? ভুল করলে কেন?
এছাড়া উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেছেন,
رحم الله من أهدى إلينا عيوبنا.
আল্লাহ তার প্রতি দয়া বর্ষণ করুন, যে আমাদেরকে আমাদের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে জানিয়ে দেয়।
সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপদেশ ও নসিহত দরকার হলো রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের জন্য। কিন্তু অহংকারের ঘোড়ায় সাওয়ার হয়ে তারাই আজকে সবচেয়ে কম উপদেশ গ্রহণ করে।
আর এদিকে মুসলিম রাজা-বাদশাহর সেনাবাহিনীর অবস্থা কেমন? তাদের অধিকাংশই প্রবৃত্তির নেশায় মত্ত। দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও শোভা-সৌন্দর্যের মধ্যে নিমগ্ন। সাথে রয়েছে তাদের সীমাহীন অজ্ঞতা ও মূর্খতা। কোনো পাপই যেন তাদেরকে উদ্বিগ্ন করে না। কোনো পাপই যেন তাদের হাতছাড়া হয় না। রেশমি কাপড় পরিধান করে। মদ্যপানেও যেন তারা অস্বস্তি বোধ করে না। আরও আছে লোকজন থেকে অন্যায়ভাবে জিনিস-পত্র ছিনিয়ে নেওয়া। জুলুম যেন তাদের সত্তার সাথে মিশে গেছে।
আর এদিকে বেদুইন জাতি ডুবে রয়েছে পুরো অজ্ঞতার মধ্যে। গ্রামবাসীদেরও একই অবস্থা। তাদের অধিকাংশের চলাফেরা অপবিত্রতার মধ্যে। নামাজকে নষ্ট করে। শিক্ষাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করে।
এরপর আমি ব্যবসায়ীদের দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, লোভ তাদেরকে আকণ্ঠ নিমজ্জিত করেছে। ব্যবসায় লাভ হলেই হলো, কিন্তু সেটা কীভাবে হলো, তা যেন তাদের দেখার অবসর নেই। তাদের মাঝে সুদের ছড়াছড়ি। যেভাবেই হোক দুনিয়া উপার্জন হোক— এছাড়া আর কোনো দিকে তারা ভ্রুক্ষেপ করে না। জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রেও তারা সীমাহীন গাফেল। জাকাত না দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছে। তবে আল্লাহ যাদেরকে এসকল খারাবি থেকে রক্ষা করেছেন, তাদের কথা ভিন্ন।
এরপর আমি সরকারি ও বিভিন্ন চাকুরিজীবীদের দিকে লক্ষ করলাম। দেখলাম, তাদের লেনদেনের মধ্যে ঘুষের ছড়াছড়ি। ঘুষ তাদের নিকট ব্যাপক এবং সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কম দেওয়া। কৃপণতা করা। আত্মসাৎ করা। অন্যকে বঞ্চিত করা। এছাড়াও তারাও আসলে মূর্খতার মধ্যে ডুবে আছে। দ্বীনি কোনো শিক্ষা নেই।
আর যাদের সন্তান-সন্ততি আছে, তারা তো রাতদিন তাদের সন্তানদের জন্য উপার্জনের পাগলামিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। অথচ খেয়াল করছে না, সন্তানের জন্য তার কর্তব্য কী? কীভাবে তাকে সুন্দর ও সততার সাথে লালন-পালন করবে।
এরপর নারীদের বিষয়ে চিন্তা করে দেখলাম। দ্বীন সম্পর্কে তাদের জ্ঞান খুবই অল্প। সীমাহীন মূর্খতা বিরাজ করছে তাদের মধ্যে। আর আখেরাত সম্পর্কে তাদের যেন কোনো খবরই নেই। হ্যাঁ, আল্লাহ যাদেরকে রক্ষা করেছেন, তাদের কথা ভিন্ন।
আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, হায়, এই যদি হয় অবস্থা তবে আর কারা অবশিষ্ট রইল আল্লাহ তাআলার দ্বীনের খেদমত ও তার পরিচয় জানার জন্য!
এরপর আমার দৃষ্টি নিপতিত হলো আলেম, তালিবুল ইলম, ইবাদতগুজার ও দুনিয়াত্যাগী সাধকদের দিকে।
প্রথমে ইবাদতগুজার ও সাধকদের কথা চিন্তা করলাম। দেখলাম, তাদের অধিকাংশই ইবাদত করে কোনো ইলম ছাড়া। নিজেকে অনেক বড় বুজুর্গ মনে করে। নিজেদেরকে আল্লাহর অনেক বড় ওলি মনে করে। অনেক মানুষের অনুসরণ কামনা করে। অন্যরা তার হাতে চুমো খায়। এমনকি তাদের কেউ যদি কখনো কোনো প্রয়োজনে বাজার থেকে কিছু কিনতে বাধ্য হয়, সে নিজে তা করে না। এতে যেন তার সম্মানের মিনার ভেঙে পড়ে। তারা মানুষের মাঝে বিভিন্ন মনগড়া রীতিনীতি বাড়াতে থাকে। খুব উচ্চ মর্যাদার কেউ না হলে সাধারণ কারও জানাযায় উপস্থিত হয় না। খরচের ভয়ে একে অন্যের সাথে সাক্ষাৎ করে না। তাদের এই রীতিনীতিগুলো এক সময় অনুসারীদের উপাস্যে পরিণত হয়; যেন এগুলোরই তারা পূজা করে। এর বাইরে তারা যেতে চায় না। কিছু মানতে চায় না। ইলম অর্জন করে না। বরং তাদের কেউ কেউ অগ্রগামী হয়ে তাদের এই মনগড়া রীতিনীতির পক্ষে অজ্ঞতাপূর্ণ ফতোয়া প্রদান করে। সর্বক্ষণ আলেমদের বদনাম ও দোষ-ত্রুটি ধরে বেড়ায়। বলে বেড়ায় দুনিয়ার প্রতি আলেমদের লোভের কথা। অথচ তারা জানে না, প্রয়োজনমাফিক দুনিয়া অর্জনের জন্য কেউ-ই নিন্দিত হওয়ার উপযুক্ত নয়। কারণ, তারা তো জায়েয কাজের মধ্যেই রয়েছে।
এরপর আলেম ও তালিবুল ইলমদের ব্যাপারে চিন্তা করলাম। দেখলাম খুব অল্পসংখ্যক ছাত্রই রয়েছে, যাদের ওপর সঠিকভাবে ‘তালিবুল ইলম' শব্দ ব্যবহার করা যায়। কারণ, শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার তারাই, যারা ইলম তলব করে তদনুযায়ী আমল করার জন্য। অথচ এদের অধিকাংশই ইলম অর্জন করছে এ জন্য যে, এর দ্বারা উপার্জনের কোনো মাধ্যম হবে। কিংবা তাকে দিয়ে কোনো বাড়ি-ঘর বানানো হবে। কিংবা তাকে কোনো শহরের কাজি বানানো হবে। অথবা সে এই ইলম দ্বারা তার সমবয়সীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসন অর্জন করবে। এতটুকুই। এই হলো সার্বিকভাবে তাদের উদ্দেশ্য।
এরপর আলেমদের ওপর দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, তাদের অধিকাংশই নিজের প্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত এবং তার কথামতোই চালিত। ইলম তাকে যা থেকে বাধা প্রদান করে, সে বরং সেটাকেই প্রাধান্য দেয়। ইলম তাকে যেটা থেকে নিষেধ করে, সে সেইদিকেই ধাবিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সাথে তার কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই এবং তাঁর নির্জন ইবাদতের আস্বাদনও সে প্রাপ্ত নয়। তার একমাত্র লক্ষ্য মুহাদ্দিস হওয়া, ফকিহ হওয়া, দুনিয়াতে মানুষের মাঝে সম্মান অর্জন করা। এতটুকুই। আর কিছু না।
কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তো কখনো পৃথিবী এমন ব্যক্তি থেকে খালি রাখেন না, যারা তাঁর দ্বীনের জন্য প্রতিষ্ঠিত থাকবে। ইলম ও আমলের মাঝে সমন্বয় করবে। যথার্থভাবে আল্লাহ তাআলার হকগুলো জানবে। তাকে ভয় করবে। তারাই হলেন ‘কুতুবুদ দুনয়া’ বা দুনিয়ার কুতুব। যখন তাদের কেউ ইন্তেকাল করেন, আল্লাহ তাআলা তার স্থানে অন্যজনকে প্রতিষ্ঠা করেন। কখনো কখনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ইনতেকালের আগেই তারা এমন কিছু ব্যক্তিকে দেখে যান, যারা সর্বদিক দিয়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম। এভাবেই পৃথিবী কখনো তাদের বরকত ও প্রতিনিধিত্ব থেকে মুক্ত থাকে না। এই উম্মতের মধ্যে তাদের স্থান আগের যুগের নবীদের মতো।
তাদের পরিচয় কী?
আমি তাদের পরিচয়ের ক্ষেত্রে বলে থাকি- তারা হলেন সেই সকল ব্যক্তি, যারা দ্বীনের উসুলের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যারা দ্বীনের সীমারেখাগুলো সংরক্ষণ করেন। হয়তো কখনো তাদের ইলম কম হতে পারে। কম হতে পারে মানুষের সাথে তাদের মেলামেশা।
অর্থাৎ তাদের মর্যাদা ও অবস্থানের মধ্যেও কিছুটা তারতম্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যারা সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ ও যোগ্যতার অধিকারী, এমন সংখ্যা খুবই কম। অতীতে মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি শুধু একজনই থাকতেন।
আমি গভীরভাবে আমাদের সালাফে সালেহিনের মাঝে এই সংখ্যাটা তলিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। আমি বের করতে চেষ্টা করলাম, এমন সংখ্যা কত হবে? যারা এমনভাবে ইলম অর্জন করেছেন যে, মুজতাহিদদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। আবার এমনভাবে আমল করেছেন যে, আবেদদের নেতা হয়ে উঠেছেন। আমার পর্যবেক্ষণ শেষে আমি এ ক্ষেত্রে তিনজনের অধিক পাইনি। ১. হজরত হাসান বসরি রহ.। ২. হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ.। ৩. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.।
আমি তাদের এই বিন্যাস নিয়ে বহুজনের কাছে চিঠি দিয়েছি। সবাই আমার কথা মেনে নিয়েছেন। তবে তাদের কেউ কেউ চতুর্থ জন হিসেবে হজরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব রহ. এর কথা বলেছেন।
আমাদের সালাফে সালেহিনের মধ্যে যদিও আরও অনেক নেতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কিন্তু তাদের অধিকাংশের ওপর হয়তো কোনো বিশেষ শাস্ত্র বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। তাই অন্য বিষয়টি তার থেকে কমতি হয়ে গেছে। কারও ওপর প্রভাব ফেলেছে ইলম। কারও ওপর আমল। তবে সকলেরই নিজের ইলমের ক্ষেত্রেই একটি মজবুত ভিত ও দক্ষতা ছিল। ছিল আচার-আচরণ ও জানাশোনার একটি ভারসাম্যপূর্ণ অনুসরণীয় অংশ।
এখন তাদের পথে কেউ যদি চলতে চায়, তার তো কোনো বাধা নেই। যদিও সময়ের প্রেক্ষাপটে তারা অগ্রগণ্য হয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হজরত খাজির আলাইহিস সালামকে এমন বিষয় জানিয়েছিলেন, যা হজরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট ছিল অনুপস্থিত। আল্লাহর ভান্ডার পূর্ণ ও অবারিত। এটা শুধু কিছু ব্যক্তিতেই নিঃশেষিত নয়। সকলেরই অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
আমার কাছে ইবনে আকিল সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি নিজের সম্পর্কে বলতেন, 'নৌকা তৈরির কাজে আমিই সেরা ছিলাম। তারপর এ ধারা নষ্ট হয়ে গেছে।'
আমি বলি, এটা তার ভুল কথা। তিনি কীভাবে এটা মনে করতে পারেন যে ভবিষ্যতে অন্য কেউ তার মতো বা তারচেয়েও ভালো নৌকা বানাতে পারবে না?
কত আত্মগর্বী সম্ভাবনাময়ী মানুষ যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেটাই হয়তো সম্পাদিত হয়েছে এমন ব্যক্তির হাত দিয়ে, যার ক্ষেত্রে ধারণাই করা হতো না। কত পরবর্তীগণ কাজে ও কর্মে ছাড়িয়ে গেছেন পূর্ববর্তীদের! বলা হয়-
إن الليالي والأيام حاملة وليس يعلم غير الله ما تلد রাত ও দিনগুলো প্রসবের ভারে হয়ে আছে নত খোদাই শুধু জানে, কী যে করবে তারা প্রসবিত।
📄 প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই
আমি অনেকবার ভেবে দেখেছি, নফস কখনো কখনো প্রচণ্ডভাবে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার দিকে ধাবিত হয়। এমনকি যখন সে ধাবিত হয়, অন্তর জ্ঞান বোধ বুদ্ধি বিবেক সকলকে মাড়িয়েই ধাবিত হয়। কারও বাধাই তখন আর মানে না। এ সময় মানুষ কোনো নসিহত দ্বারা উপকৃত হওয়ার অবস্থায় থাকে না।
আমার নফসও একদিন হঠাৎ এভাবে প্রবৃত্তির দিকে ধাবিত হলো। আমি সচেতন সতর্ক হয়ে তাকে বলে উঠলাম, তোমার ধ্বংস হোক, কয়েক মুহূর্ত থামো। আগে আমার কিছু কথা শোনো, এরপর তোমার যা ইচ্ছা করো। সে থেমে বলল, তুমি বলো, আমি শুনছি।
আমি বললাম, প্রবৃত্তির হাতছানি উপেক্ষা করে জায়েয জিনিসের দিকে তুমি খুবই কম যাও। তোমার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ও আকর্ষণ হলো হারাম বিষয়ের দিকে। এখন আমি তোমার স্বভাবের দুটি বিষয় এখানে উপস্থাপন করছি। মনোযোগ দিয়ে শোনো।
এক. তুমি সাধারণত দুটি তিক্ত জিনিসকে মিষ্ট ভাবো। যেমন, জায়েয জিনিসের চেয়ে নাজায়েয প্রবৃত্তির আনুসরণকে মিষ্ট ভাবো। অথচ প্রবৃত্তির সেই কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের দিকে পৌঁছার পথ তো অনেক কঠিন। কারণ, সম্পদের স্বল্পতার কারণে কখনো কখনো সেটি সম্ভব হয়ে ওঠে না। স্বল্প উপার্জনের কারণে তার অধিকাংশটাই তোমার প্রাপ্তিতে আসবে না। এটি অর্জনে জীবনের কত মূল্যবান সময় তোমার খরচ হয়ে যাবে। অর্জনের পুরোটা সময় তোমার অন্তর তাতেই ব্যস্ত হয়ে থাকবে। আবার অর্জনের পরও হারানোর ভয়ে অস্থির হয়ে থাকবে। এরপর হয়তো প্রাপ্ত জিনিসের বাস্তব কোনো অপূর্ণতা তোমার এই প্রবৃত্তির আগ্রহকে নষ্ট করে দেবে। সেটা যদি খাবার-জাতীয় হয় তাহলে হতে পারে, তোমার এই পরিতৃপ্ত ভক্ষণই তোমার সমস্যার সৃষ্টি করবে। আর যদি তোমার প্রবৃত্তির বাসনা থাকে কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে- তাহলে হয়তো একসময় তুমি তার মাধ্যমে বিরক্ত হয়ে উঠবে। তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে কিংবা তার কোনো নিকৃষ্ট স্বভাব ও আচরণে তুমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। এরপর বিয়ে ও সহবাসের আস্বাদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে অনেক ক্ষতি ও অসুবিধা, শরীর ভেঙে পড়ে। ব্যক্তিকে নিয়ে আরও কত সমস্যা, যার বর্ণনা অতি দীর্ঘ।
দুই.
নিষিদ্ধ জিনিসের দিকে ধাবিত হওয়ার কারণে উল্লিখিত সমস্যাগুলোর সাথে রয়েছে দুনিয়ার শান্তি। মানুষের মাঝে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ার ভয়। এরপর আখেরাতের কঠিন শাস্তির কথা রয়েই গেল। তাছাড়া যখনই এই গোনাহের কথা স্মরণ হবে, আপনাআপনিই তোমার অন্তর হয়ে পড়বে অস্থির ও বেচাইন।
অন্যদিকে প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ের স্বাদ এমনই এক স্বাদ, যা অন্য সকল স্বাদের চেয়ে উন্নত। তুমি কি প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত মানুষকে দেখোনি, তারা কেমন লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়েছে? এর কারণ কী? কারণ, তারা প্রবৃত্তির চাহিদার কাছে পরাজিত হয়েছে। অন্যদিকে যারা প্রবৃত্তির ওপর বিজয় অর্জন করে, প্রবৃত্তির অন্যায় চাহিদাকে দমিয়ে রাখে, তারাই হলো শক্তিশালী অন্তরের অধিকারী। তারাই হলো সম্মানিত ও অনুসরণীয়। কারণ, তারা প্রবৃত্তির ওপর হয়েছে বিজয়ী।
সুতরাং নিজের আকর্ষিত বিষয়কে শুধু সৌন্দর্যের চোখ দিয়ে দেখা থেকে সতর্ক থাকো। যেমন, একজন চোর সম্পদ চুরির সময় শুধু তার আস্বাদনের কথাই মনে রাখে, এর ক্ষতির দিকে দৃষ্টি দেয় না। হাত কর্তিত হওয়ার কথা স্মরণ করে না।
এ কারণে নিজের কর্মগুলোকে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার দৃষ্টি দিয়ে দেখো, পরিণামের কথা চিন্তা করো। কারণ, স্বাদ আস্বাদনের কর্মটি বদলে গিয়ে সেটাই হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসের কারণ। কিংবা এটি তার আস্বাদনের পরিবর্তে হয়ে উঠতে পারে কষ্টের কারণ।
মানুষের প্রথম গোনাহ এমন একটি লোকমার মতো, যা কোনো ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ভক্ষণ করে। এটি তার ক্ষুধাকে নিবারণ করে না। বরং এটি খাবারের মতো তাকে আরও বেশি কাতর করে তোলে।
এ কারণে প্রবৃত্তির চাহিদার কাছে পরাজিত মানুষের পরিণাম এবং ধৈর্যধারণের উপকারিতা নিয়ে উপদেশ গ্রহণ করা উচিত। যে ব্যক্তি এটি করতে সক্ষম, সফলতা তার থেকে দূরে নয়। সফলতা যেন তার হাতের মুঠোয় এসে গেছে।