📄 ইলমের শ্রেষ্ঠত্ব তার আমলে
কিছুদিন একটি বিষয় নিয়ে চিন্তা করলাম, বান্দার থেকে স্রষ্টার চাহিদা কী কিংবা স্রষ্টার জন্য বান্দার কর্তব্য কী?
ভেবে পেলাম, বান্দার কর্তব্য হলো, বিনয় প্রকাশ করা, নিজের কমতি ও অক্ষমতার কথা স্বীকার করা। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে আলেম ও জাহেদ-আবেদদের দুটি ভাগ করতে পারি। আলেমদের কাতারে ধরছি ইমাম মালেক রহ., সুফিয়ান সাওরি রহ., ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম শাফেয়ি রহ. ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.কে। আর আবেদ-জাহেদদের কাতারে রাখছি মালিক ইবনে দিনার রহ.৩৪, রাবিয়া বসরি রহ., মারুফ আল কারখি রহ.৩৫, বিশর ইবনে হারিস রহ.কে।
এই জাহেদ-আবেদগণ যখন তাদের গভীর ইবাদতে মশগুল হতে শুরু করলেন, যুগের আওয়াজ তাদেরকে চিৎকার করে বলতে লাগল, তোমাদের এই ইবাদত কোনো কাজে আসবে না, এগুলো একেবারেই বৃথা। ইবাদত তো কাজে আসবে আলেমদের, যারা ইলমের সাথে আমল করে। তারাই হলেন নবীদের উত্তরাধিকারী। তারাই হলেন জমিনে আল্লাহর প্রতিনিধি। শরিয়তের ব্যাপারে তারাই হলেন নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত। তারাই হলেন মান্য ও অনুসরণীয়। তাদের জন্যই রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের সকল শ্রেষ্ঠত্ব।
এ কথায় আবেদগণ অবনত হলেন। নমিত হলেন। এবং এই কথার সত্যতাও স্বীকার করে নিলেন। প্রতিফলে মালিক ইবনে দিনার রহ. ইলম শেখার জন্য ছুটে এলেন হাসান বসরি রহ.-এর নিকট। এবং বললেন, হ্যাঁ, হাসান আমাদের উস্তাদ।
আবার অন্যদিকে আলেমগণ যখন নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বে শির উঁচু করে আছেন। সবার ঊর্ধ্বে তাদের স্থান। তখন আবার যুগের ভাষ্য চিৎকার করে উঠল আলেমদের ব্যাপারেও। বলা হলো, ইলমের একমাত্র উদ্দেশ্য আমল। আমল ছাড়া ইলমের কোনো মূল্য নেই। স্বয়ং আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন,
وهل يراد بالعلم إلا ما وصل إليه معروف ؟ মারুফ কারখি যেখানে পৌঁছেছে, ইলম দ্বারা তো সেখানে পৌঁছানোই উদ্দেশ্য!
হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. থেকে বর্ণনা এসেছে। তিনি বলেন,
وددت أن يدي قطعت ولم أكتب الحديث. আমি কখনো কখনো কামনা করি, আমার এই হাত কর্তিত হোক এবং আমি আর কোনো হাদিস না লিখি। [কারণ, যা লিখেছি সেগুলোর ওপরই আমল করে সেরে উঠতে পারি না।]
হজরত উম্মে দারদা একবার এক লোককে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি যতটুকু জেনেছ, তার সবগুলোর ওপর আমল করেছ?
লোকটি বলল, না।
উম্মে দারদা বললেন, তবে তুমি কেন ইলমচর্চার দ্বারা অযথা নিজের ওপর আল্লাহর দলিল বাড়িয়ে চলেছ?'
হজরত আবু দারদা রহ. বলেন,
ويل لمن يعلم ولم يعمل مرة، وويل لمن علم ولم يعمل سبعين مرة. যে জানেনি এবং আমল করেনি, তার জন্য একবার আফসোস। আর যে ব্যক্তি জেনেছে কিন্তু আমল করেনি, তার জন্য সত্তরবার আফসোস।
হজরত আবুল ফুজাইল বলেন, يغفر للجاهل سبعون ذنباً. قبل أن يغفر للعالم ذنب واحد.
আলেমের একটি গোনাহ ক্ষমা করার আগে জাহেলের সত্তরটি অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
এসবের সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত কথা হলো কোরআনের কথা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ) যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সবাই সমান? [সুরা যুমার: ৯]
এসকল কথায় আলেমগণও নত হলেন। প্রতিফলে তাই আমরা দেখি, বিখ্যাত আলেম মুহাদ্দিস মুজতাহিদ হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. ছুটে এসেছেন হজরত রাবেয়া বসরি রহ.-এর নিকট। তার কথা ও তারবিয়ত দ্বারা উপকৃত হয়েছেন।
অর্থাৎ ইলমই আলেমদেরকে বুঝিয়েছে, ইলম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আমল। ইলম শুধুমাত্র একটি উপকরণ বা মাধ্যম। এটি কিছুতেই মূল লক্ষ্যবস্তু নয়। আলেমরাও এভাবেই নত ও অবনত হয়েছেন। নিজেদের কমতি ও অপূর্ণতাকে স্বীকার করে নিয়েছেন।
অতএব, দেখা যাচ্ছে সকল কিছুই অর্জিত হচ্ছে নিজের কমতির স্বীকারোক্তির মাধ্যমে, বিনয়ের মাধ্যমে। এর দ্বারাই বুঝে আসে, ইবাদতের মূল লক্ষ্যই হলো নিজেদের কমতি ও অক্ষমতাকে স্বীকার করে নেওয়া। আর এটিই হলো স্রষ্টার পক্ষ থেকে বান্দাকে তাকলিফ বা ইবাদতের হুকুম প্রদানের মূল উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
৩৪. মালেক ইবনে দিনার রহ.। তিনি ছিলেন সৎকর্মশীল আলেমদের এক উজ্জল নক্ষত্র। আস্থাবান তাবেঈদের অন্তর্ভুক্ত। আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে হাদিস শ্রবণ করেছেন। তিনি ১২৭ কিংবা ১৩০ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ৫/৩৬২ এবং তাবাকাতু ইবনি সা'দ : ৭/২৪৩।
৩৫. তাঁর পুরো নাম: আবু মাহফুজ মারুফ আল কারখি আল বাগদাদি। তিনি ছিলেন জাহেদদের মধ্যে অন্যতম নক্ষত্র। যুগের বরকত। বলা হয়- তিনি ছিলেন 'মুস্তাজাবুত দাওয়াত'। তার থেকে অনেক কারামত প্রকাশ পেয়েছে। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ৯/৩৩৯ এবং তাবাকাতুল হানাবিলা : ১/৩৮১।
৩৬. পুরো নাম: বিশর ইবনে হারেছ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আতা। তিনি ছিলেন যোগ্য ইমাম প্রাজ্ঞ আলেম মুহাদ্দিস এবং বিশিষ্ট জাহেদে রব্বানি। তিনি 'বিশর আলহাফি' নামে অধিক প্রসিদ্ধ। ইবনুল জাওযি তাকে নিয়ে স্বতন্ত্র একটি কিতাব লিখেছেন। ২২৭ হিজরি সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ১০/৪৬৯-৪৭৭।
📄 স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা জরুরি
আমি আল্লাহ তাআলার একটি আয়াতাংশ নিয়ে ভাবছিলাম। আয়াতটি এই-
( يُحِبُّهُم وَيُحِبُّونَهُ )
তিনি তাদেরকে ভালোবাসেন, তারাও তাকে ভালোবাসে। [সুরা মায়িদা: ৫৪]
অন্তর বা নফস যখন স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার অস্বীকৃতি জানায়, তখন তার মাঝে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। সে ভাবে, স্রষ্টার আনুগত্যই বুঝি তার প্রতি মুহাব্বত।
এটা সে কেন বলে? ভেবে দেখলাম, সে আসলে এই ভালোবাসা সম্পর্কে অজ্ঞ রয়েছে ইন্দ্রিয়জাত প্রভাবের কারণে। এটিকে সহজ করে ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, ইন্দ্রিয়জাত ভালোবাসা দৃশ্যত কোনো বস্তু বা আকৃতির বাইরে যেতে পারে না। কিন্তু ইলম ও আমলের ভালোবাসা ধাবিত হয় কোনো সত্তার গভীরতম অর্থময়তার দিকে এবং সকল বাহ্যিকতা দূরে সরিয়ে তাকেই সে ভালোবাসে।
আমরা দেখি, মানুষেরা হজরত আবু বকর রা.-কে ভালোবাসে, ভালোবাসে হজরত আলি রা.-কে। এভাবে উম্মতের বড় সংখ্যক একটি দল হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর সমর্থন করে। আরেকটি দল হজরত আশআরি রহ.-এর এবং এই নিয়ে কখনো কখনো নিজেদের মাঝে মারামারি ও ঝগড়া-বিবাদ হয়। এমনকি কেউ কেউ জীবনও দিয়ে দেয়।
এই যে তাদের মধ্যে একটি দলবদ্ধতা কাজ করে; কিন্তু তাদের কেউ কোনোদিন এই দল বা জাতির কোনো চিত্র স্বচোখে দেখেনি। তাছাড়া জাতির চিত্র কখনো ভালোবাসা জাগাতে পারে না। কিন্তু এসকল ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে যখন তাদের মাঝে কিছু বিশ্বাস, কথা, কর্ম ও উপকারিতা এসেছে, সেগুলোই তাদের মস্তিষ্কে সমমনাদের নিয়ে একটি দলবদ্ধতা তৈরি করেছে। এর জন্যই তাদের ভালোবাসা উথলে উঠেছে।
তাহলে এই অসাধারণ ব্যক্তিদের যিনি তৈরি করেছেন, জ্ঞান বুদ্ধি মেধা ও কর্মের ক্ষমতা দিয়েছেন, সেই স্রষ্টার প্রতি কেমন ভালোবাসা হওয়া প্রয়োজন?
তাকে আমি ভালোবাসবই তো!
যিনি আমাকে সুখ আস্বাদনের ইন্দ্রিয়-উপকরণ দিয়েছেন! যিনি আমাকে চিনিয়েছেন ইলমের সুখ! আহা, ইলম ও প্রজ্ঞার স্বাদ ও আস্বাদন সকল প্রকার ইন্দ্রিয় সুখের চেয়েও অতি সুখকর। তিনিই তো হলেন সেই সত্তা, যিনি আমাকে শিখিয়েছেন এগুলো। তিনি আমাকে অনুভব ও অনুভূতির শক্তি দিয়েছেন। আর কীভাবে অনুভব করব—সে শিক্ষাও দিয়েছেন তিনিই।
এছাড়া প্রতিমুহূর্তে প্রতিটি নতুন সৃষ্টিতে তিনি আমার কাছে আরও উজ্জ্বলভাবে উদ্ভাসিত হন। আমি সেই সৃষ্টির সুষম সংগতি ও মন অবশকরা সৌন্দর্যের মাঝে তাকে যেন অবলোকন করি।
আমার সকল প্রিয় জিনিসই এসেছে তার থেকে। আমার ইন্দ্রিয় অনুভূতি, আমার গভীর থেকে গভীরতম অনুভব এসেছে তার থেকে। অনুভব-অনুভূতির সহজতম পথ ও পন্থা এসেছে তার থেকে। এবং আমার সবচেয়ে সুমিষ্ট আস্বাদন ও গহীনতম আনন্দের বিষয় হলো, তাকে চিনতে পারা। তিনি যদি আমাকে না চেনাতেন, আমি কিছুতেই তাকে চিনতে পারতাম না।
আমি কীভাবে তাকে ভালো না বেসে পারি!
আমার পুরো অস্তিত্ব এসেছে তার থেকে। আমার অবস্থিতি, আমার বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠা—এ সবই হয়েছে তার হাত থেকে। আমি আবার তাঁর কাছেই ফিরে যাব। আমার যত সৌন্দর্য ও প্রিয়তা—সব তিনিই সৃষ্টি করেছেন। এগুলোকে সৌন্দর্য দিয়েছেন। সজ্জিত করেছেন। এসবের মাঝে প্রাণ সঞ্চার করেছেন।
আমি কীভাবে স্রষ্টাকে ভালো না বেসে পারি!
সৃষ্টির সকল শক্তিই তো এসেছে স্রষ্টার পক্ষ থেকে। বান্দার শিল্প ও সৌন্দর্যবোধও তার পক্ষ থেকে। বান্দার যে অনুভব ও অনুভূতির ক্ষমতা—তা তো তিনিই দিয়েছেন। আমরা যদি কখনো কোনো অতি মুগ্ধকর বিস্ময়কর চিত্র বা ছবি দেখি, তখন আমরা সেই চিত্রের চেয়ে চিত্রকরের প্রতিই বেশি মুগ্ধ হই, তার প্রতি সম্মানবোধ করি, তার এই অসাধারণ কাজের জন্য তারই প্রশংসা করি। চিত্রটির সাথে সাথে, এমনকি চিত্রের চেয়েও তখন আমাদের কাছে চিত্রকর বা চিত্রের স্রষ্টাই বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে।
এভাবে আমাদের নিজেদের এবং চারপাশের বিষয়াবলির দিকে আন্তরিক দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে স্রষ্টা সম্পর্কে আমাদের ভালোবাসাময় এক পবিত্র চিন্তার উন্নতি ঘটে। যখন এ চিন্তাগুলো তুচ্ছ ইন্দ্রিয়ানুভবের পর্দা সরিয়ে দিয়ে উদ্ভাসিত করবে তার পেছনের অসাধারণ এক সত্তার অসীম দয়া ও মায়াময় উপস্থিতি, তখন অবশ্যই অন্তরের মধ্যে জেগে উঠবে স্রষ্টার প্রতি দুকূল ছাপানো এক অপার্থিব বান ডাকা ভালোবাসা। এই দোলায়িত হৃদয়ের ভালোবাসার সাথে দুনিয়ার কোনো ভালোবাসারই তুলনা চলে না, তুলনা হয় না।
তবুও এই ভালোবাসার ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে কিছুটা তারতম্য হয়। কারণ, স্রষ্টার রয়েছে অনেকগুলো মহান গুণাবলি। কারও কারও অন্তরে কোনো গুণ হয়তো একটু বেশি প্রভাব ফেলে। সে কারণে তার ভালোবাসার সাথে সেই গুণের বৈশিষ্ট্যও লেগে থাকে। যেমন,
কেউ হয়তো স্রষ্টার এই বিশাল জগতের নিখুঁত পরিচালনায় প্রতি লক্ষ করে তাকে সমীহের সাথে ভালোবাসে। কেউ হয়তো তার কঠোরতা ও শাস্তির বিষয় লক্ষ করে ভয়ের সাথে ভালোবাসে। কেউ তাঁর দয়া ও করুণার প্রতি দৃষ্টি রেখে প্রবল আশা ও আকাঙ্ক্ষার সাথে ভালোবাসে।
আহা, এ যেন স্রষ্টার বর্ণিত সেই ব্যবস্থাপনা, যার কথা তিনি নিজেই বলেছেন এভাবে-
﴿قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ
প্রত্যেক মানুষই তার নিজ পানি পানের স্থান জেনে নিয়েছে। [সূরা বাকারা: ৬০]
📄 আল্লাহর হিকমতের কাছে জ্ঞানের আত্মসমর্পণ
এবার এক আশ্চর্য বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। বিষয়টি হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কত বিস্ময়করভাবেই না মানুষের এই শরীর সৃষ্টি করেছেন। কত সুন্দর ও সুগঠিত করেছেন! এখানেও তিনি তাঁর অসীম ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
অথচ এই শরীরই তিনি আবার নষ্ট ও ধ্বংস করেছেন। কত মানুষের মৃত্যু দিয়েছেন। আরও কত মানুষের মৃত্যু দেবেন এবং এই সুন্দর সুগঠিত কান্তিমান লাস্যময় শরীর বিনষ্ট করে দেবেন।
মানুষের আকল স্রষ্টার এসকল সৃষ্টি দেখে যেমন বিস্মিত ও বিমুগ্ধ হয়, তেমনি আবার তার রহস্যময়তার মধ্যে হাবুডুবু খায়—কেনই বা এই বিস্ময়কর সৌন্দর্যের সৃষ্টি আবার কেনই বা অচিরেই তার ধ্বংস!
মাথার মধ্যে প্রশ্ন জাগে। প্রশ্ন নড়ে। নড়তেই থাকে।
কিন্তু আকল বা যুক্তি যখন জানল, শরীরের এই কাঠামো একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর আবার জীবিত করা হবে। দুনিয়ার এই সুন্দর কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছে শুধু কিছু দিনের চেনা-জানার জন্য, আমলের জন্য এবং ফসলের বীজ বপনের জন্য।
হ্যাঁ, এই যুক্তিতে আকল কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিশ্চুপ হলো। কিন্তু... কিন্তু এরপর এজাতীয় আরও অনেক জিনিস তার সামনে এসে পড়তে থাকে। প্রশ্ন বাড়তে থাকে। যেমন, হয়তো তারুণ্যের আলোয় ঝলমল করা কোনো তরুণের মৃত্যু কিংবা পিতা-মাতার পায়ে পায়ে খেলে বেড়ানো মায়াময় কোনো শিশুর আকস্মিক পরলোকগমন। মায়ের কোল থেকে এই নিষ্পাপ শিশুটি ছিনিয়ে নেওয়ার রহস্য তার বুঝে আসে না। কারণ, আল্লাহ তাআলার তো এর মধ্যে কোনো লাভ নেই। প্রয়োজনও নেই।
এই তরুণ-তরুণী কিংবা এই শিশু প্রাণ দুটি পৃথিবীতে বেঁচে থাকার, বেড়ে ওঠার হয়তো সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল। সবুজ পৃথিবীতে মাত্র তাদের জীবনের শুরু হয়েছিল—কিন্তু শুরু হতে না হতেই যেন জীবন সাঙ্গ করে দেওয়া হলো। অথচ অন্যদিকে পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে জরাজীর্ণ অথর্ব এমন কত মানুষকে; কষ্টের অনুভূতি ছাড়া যাদের আর কোনো অনুভূতি নেই। বেঁচে থাকার অর্থই যারা আর বোঝে না-কেনই বা তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা হয়!
আরও প্রশ্ন জাগে-
একজন জ্ঞানী বুদ্ধিমান মুমিন ব্যক্তিকে ভীষণ দারিদ্র্যের মধ্যে আপতিত হতে হয়, অন্যদিকে কত অবাধ্য ফাসেক-কাফেরকে অঢেল সম্পত্তি প্রদান করা হয়। কী এর রহস্য!
এমন আরও অনেক বিষয় আছে, যেগুলোর রহস্য উদ্ঘাটনে আকল বা বুদ্ধিবিবেক কোনো কিনারা খুঁজে পায় না। হতভম্ব হয়ে বসে থাকে।
তবুও আমি আপাত যুক্তিহীন এই বিষয়গুলোর মাঝেও যুক্তি খুঁজতে থাকি। কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিও যখন এগুলোর কারণ উদ্ভাবনে অক্ষম হয়ে পড়ে-অথচ যুক্তি সকল কিছুরই কারণ খুঁজে পায়-তখন আমি যুক্তির অক্ষমতা বুঝতে পারি। আমি বুঝতে পারি, যুক্তিই সবকিছুর সমাধান নয়। আমি তখন নিঃশর্তে আল্লাহর প্রতি অনুগত হয়ে যাই। আর এটিই আমাকে স্রষ্টার সকল হুকুম মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। উৎসাহ জোগায়।
এবার একটি উল্টো প্রশ্ন-
কখনো যদি যুক্তি-বুদ্ধিকে প্রশ্ন করা হতো, এবার তুমিই বলো দেখি, স্রষ্টার সকল সৃষ্টি ও কর্মের রহস্য যেহেতু তোমার জানা, স্রষ্টা যে এভাবে সুন্দর করে সৃষ্টি করে আবার ধ্বংস করে ফেলেন, এর জন্য তার ওপর কোনো মন্দ আসে কি না?
যুক্তি-বুদ্ধি নিশ্চয় উত্তর দিত, বহু বাস্তব প্রমাণের মাধ্যমে আমি যেহেতু আগেই জেনে গিয়েছি, তিনি বড় জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান এবং আমি তার জ্ঞান বা প্রজ্ঞার রহস্য অনুধাবনে অক্ষম। সুতরাং আমার অক্ষমতা স্বীকার করে আমি তার সবকিছু নতশিরে মেনে নিয়েছি।
📄 বিয়ে নিয়ে কিছু কথা
আমি একবার বিয়ের উপকারিতা, অর্থময়তা ও তার উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করলাম। দেখতে পেলাম, এর আসল ও সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো বংশ রক্ষা করা, জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। কারণ, প্রতিনিয়ত পৃথিবী থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী বিলীন হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের খাদ্য-খাবার বিলুপ্ত হচ্ছে। আরও এমন অনেক মৌলিক জিনিস বা বস্তু বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, যেগুলো পৃথিবীতে তাদের প্রতিনিধি রেখে যাচ্ছে না কিংবা রেখে যেতে পারছে না। যেহেতু সবকিছুই পৃথিবীতে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এদিকে পৃথিবীর বয়সও দীর্ঘায়িত করা উদ্দেশ্য, সুতরাং প্রতিনিয়ত এখানে আসল থেকে তার প্রতিনিধি রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মানুষ জন্মের বিষয়টি যেহেতু কিছুটা লজ্জাকেন্দ্রিক উন্মোচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেখানে নিজের একান্ত অঙ্গের উন্মোচন করতে হয়, অন্যের সাথে মিলিত হতে হয়। সুরুচিবোধসম্পন্ন মানুষ লজ্জাবোধ করার কারণে বিবাহোত্তর এই প্রক্রিয়াটা হয়তো পছন্দ করত না। এ কারণে স্রষ্টার পক্ষ থেকে মানুষের মাঝে কামভাব বা যৌনচেতনা ও উত্তেজনা প্রদান করা হয়েছে। এর আকর্ষণে এখন মানুষ সকল লজ্জা-নিরাগকে জয় করে নিজেই উন্মোচন ও মিলনের প্রতি আবেগি হয়ে ওঠে। এবং পৃথিবীতে এভাবেই বংশ বিস্তারের প্রক্রিয়াটি বহাল থাকে।
এটিই বিবাহের প্রধান উদ্দেশ্য।
তবে এই মৌলিক উদ্দেশ্য ছাড়াও আরও কিছু উপকারী বিষয় এতে অর্জিত হয়। তার মধ্যে প্রধান একটি বিষয় হলো, মানুষের শরীর থেকে সেই পিচ্ছিল পানীয় নির্গত হয়ে যায়, যার আবদ্ধতা মানুষকে কষ্ট দেয়। পদার্থটিকে মনি বা বীর্য বলে। মানবশরীরের পরিপাকযন্ত্রের প্রক্রিয়ার চতুর্থ ধাপে এসে এটি মনিতে রুপান্তরিত হয়। প্রথমে খাদ্য, এরপর নির্যাস। এরপর রক্ত, তারপর মনি।
মানবশরীরে যখন মনির উপস্থিতি বেড়ে যায়, তখন তার মাঝে প্রস্রাব আবদ্ধতার মতো এক ধরনের কষ্ট ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। বরং বলা যায়, এটি প্রস্রাব আবদ্ধতার চেয়েও অনেক কষ্টের। কারণ, এর অধিক উপস্থিতি এবং দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা অনেক কঠিন রোগের সৃষ্টি করে। কারণ, এটির তপ্ততীব্রতা মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করে। ভীষণ কষ্ট দেয়। কখনো এটি শরীরে ভীষণ বিষক্রিয়ারও সৃষ্টি করতে পারে।
কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানবশরীরের চাহিদাই হলো, মনির উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে সেটি বের হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠা। তবে কারও যদি শরীর অসুস্থ থাকে কিংবা মানসিক বিকৃতি থাকে তাহলে তার ক্ষেত্রে এই চাহিদা নাও হতে পারে। কিন্তু সুস্থ স্বাভাবিক শরীরে এমনটি হবেই। বলা হয়ে থাকে, একটি স্বাভাবিক সুস্থ শরীরে যদি দীর্ঘদিন মনি আটকে রাখা হয়, এটি বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে। অনেক রকম কুচিন্তা বা কল্পনার সৃষ্টি করে। প্রেম, ভালোবাসা বা শারীরিক আসক্তি ছাড়াও এটি আরও অনেক ভয়াবহ বিপদ ও লাঞ্ছনার মধ্যে ঠেলে দেয়।
একটি স্বাভাবিক সুস্থ মেজাজের মানবশরীর থেকে একটি উত্তেজনা ও অস্থিরতার পর এটি পর্যায়ক্রমে শরীর থেকে বের হতেই থাকে। এর থেকে নিবৃত্তি নেই। এটা যেন সেই ভক্ষণকারীর মতো, যার তৃপ্তি যেন মেটেই না।
সুতরাং এর সুস্থ ও সুন্দর সমাধান হলো বিয়ে করা। কেউ যদি তার চেহারার অসৌন্দর্যের কারণে, দারিদ্র্যের কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে বিয়ে করতে না পারে, তবুও তার শরীর থেকে যেকোনো প্রক্রিয়ায় এগুলোর কিছুটা নির্গত হয়; কিন্তু বেশিরভাগই শরীরে অবশিষ্ট থেকে যায়। কারণ, বিয়ে বা সহবাসহীন কোনো পদ্ধতিই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। থেকে যাওয়ার পরিমাণ যদি তুমি জানতে চাও তাহলে তুমি নিজেই কাঙ্ক্ষিত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত স্থানে মনি নির্গত হওয়ার পরিমাণের ওপর তুলনা করে নিতে পারো। স্থান ও আনন্দের ভিন্নতার কারণে মনি নির্গত হওয়ার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা আসে। যেমন, দুই রানের মাঝখান আর যোনিপথে মনি নির্গমনে ভিন্নতা আসে। অকুমারী ও কুমারীর সাথে সহবাসেও ভিন্নতা হয়।
তাহলে জানা গেল, রুচিময় কাঙ্ক্ষিতা বিবাহিতার সাথে মনি নির্গত হওয়ার পরিমাণ হয় বেশি। এবং অনিবার্যভাবেই পূর্ণ নির্গমনের সাথে সাথে আনন্দ ও স্বাদও আসে পরিপূর্ণ। কখনো কখনো এটি সন্তানের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। যেমন, কোনো তরুণ-তরুণী যদি নিজেদের দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখার পর প্রবল আসক্তির সাথে মিলিত হয় তবে অন্যদের তুলনায় তাদের সন্তান সাধারণত স্বাস্থ্যবান হয়। আর যাদের মিলন এতটা উত্তেজক, আনন্দদায়ক ও কাঙ্ক্ষিত হয় না, তাদের সন্তানের ক্ষেত্রেও অনেক সময় অবনমন দেখা যায়।
এ কারণে বৈধ নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে করাকে অপছন্দ করা হয়েছে। কারণ, অন্তর এখানে ভীষণ উত্তেজনা ও উৎফুল্লতায় ভাসে না। নতুনত্বের স্বাদ তেমন একটা প্রাপ্ত হয় না। ব্যক্তির মধ্যে কিছুটা এমন একটা কল্পনা এসে যায়, সে যেন তার নিজেরই কোনো অংশের সাথে মিলিত হচ্ছে। নিতান্তই পরিচিত। নিতান্তই জানাশোনা এবং নতুনত্বহীন।
এ কারণেই অজানা অপরিচিতাকে বিয়ে করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তখন সন্তান উৎপাদনের এই মহান লক্ষ্য—কষ্টদায়ক পদার্থটিকে শরীর বের করে দেওয়া ছাড়াও নব পরিচিতা বধূর মাধ্যমে অনেক উদ্দেশ্য সাধিত হয়। সুন্দরী হলে ভালো হয়। কারণ, কুৎসিত চেহারা হলে সাধারণত প্রবৃত্তির সকল কিছু অর্জিত হয় না। উদ্যম-উৎফুল্লতাও আসে কম।
ধরা যাক একজন ভক্ষণকারী—গোশত ও রুটিতে যে তার পেট ভর্তি করে ফেলেছে—আরেকটি লোকমাও মুখে দেওয়ার সাধ্য তার নেই। ঠিক এই অবস্থাতেও যদি তার সামনে হালুয়া বাড়িয়ে দেওয়া হয় তাহলে সে আবার নতুন করে হাত বাড়াবে। এরপর যদি এরচেয়েও অতি আশ্চর্যরকম ভিন্ন কিছু তার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া হয় তবে সে আবারও হাত বাড়াবে। কারণ, নতুনত্বের আকর্ষণই আলাদা। তার মোহকে অগ্রাহ্য করা সহজ কথা নয়। এ কারণে মানুষের প্রবৃত্তি খুব পরিচিত বিষয়ের দিকে তেমন একটা কৌতূহলী ও আকর্ষিত হয় না। সে চায় নতুন কিছু। অপরিচিত কিছু। সে যেন নতুনত্ব ও অজানা রহস্যের মধ্যেই নিজের বাসনা পূরণের স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু যখন সে নিজের প্রাপ্তির মধ্যে কাঙ্ক্ষিত বাসনা পূরণ হতে দেখে না তখন সে আরেক নতুনত্বের দিকে ধাবিত হয়। সে যেন ধরেই নিয়েছে, কোনো ধরনের ত্রুটি ও খুঁত ছাড়াই পূর্ণভাবে তার উদ্দেশ্য পূরণ হবে। সে এখনো যা পেয়ে ওঠেনি, তারই স্বপ্ন সে এখনো দেখে ফেরে।
ঠিক মানুষের এই মনোবৃত্তিটিই তার পুনর্জীবনের ওপর একটি গোপন দলিল। কারণ, মানুষ তার কল্পনার রাজ্যে কোনো ধরনের খুঁত বা অপূর্ণতা রাখতে চায় না। যখনই মানুষ দুনিয়ার যাপিত জিনিসের মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখতে পায় তখনই সে অন্য কোনো নতুনত্বে খুঁজে ফেরে খুঁতহীন বাসনা পূরণের স্বপ্ন।
এ কারণে পণ্ডিতরা বলেন, ভালোবাসার অপর নাম হলো প্রিয়জনের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে অন্ধ হয়ে যাওয়া। দোষ-ত্রুটির পেছনে পড়লেই মুশকিল; ভালোবাসা উধাও হয়ে যাবে। তাছাড়া অন্যের দোষ-ত্রুটি সামনে এলে নিজের দোষগুলো নিয়েও চিন্তা করা উচিত। এটাই শান্তিতে থাকার একমাত্র পথ।
স্ত্রীদেরও উচিত, স্বামীদের থেকে এমন বেশি দূরে দূরে থাকবে না যে, স্বামী তাকে ভুলে যাওয়ার অবসর পায়। আবার সর্বক্ষণ তার এত বেশি কাছে কাছেও থাকবে না যে, তার সঙ্গ স্বামীর জন্য বিরক্তিকর ওঠে। স্বামীর জন্যও একই কর্তব্য। সে যেন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গ দ্বারা স্ত্রীকে বিরক্ত করে না ফেলে কিংবা সার্বক্ষণিক অবস্থানের কারণে স্ত্রীর সকল রহস্য ও মানবিক ত্রুটিগুলো তার কাছে যেন প্রকাশিত না হয়ে পড়ে। কিছুটা রহস্য রেখে দেওয়া উচিত।
এভাবে পুরুষের জন্য উচিত নয়, স্ত্রীর গোপনীয় বিষয়গুলির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া। এবং সে চেষ্টা করবে, স্ত্রীর থেকে সব সময় যেন সুঘ্রাণ প্রাপ্ত হয়। স্ত্রীও চেষ্টা করবে নিজের কোনো অপ্রীতিকর অরুচিকর কোনো কিছু স্বামীর দৃষ্টিতে যেন না আসে। স্বামী যেন তার থেকে কোনো দুর্গন্ধ না পায়।
এ ধরনের আরও বিভিন্ন বিষয় রয়েছে, যেগুলো বুঝমান নারীগণ কারও শেখানো ছাড়াই তার সহজাত বুদ্ধির মাধ্যমে জেনে যায় এবং সেগুলো মেনে চলে। কিন্তু মূর্খ বোকা মেয়েরা এগুলোর দিকে তেমন দৃষ্টি দেয় না কিংবা খেয়ালই করে না। পরিণামে স্বামীরা তাদের থেকে খুব দ্রুতই আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে।
যে ব্যক্তি ভালো সন্তান চায় এবং বৈবাহিক জীবনে নিজের বাসনা পূরণ করতে চায়, সে যেন নিজেই স্ত্রী নির্বাচন করে নেয়। মেয়ে দেখতে গিয়ে পূর্ণভাবে তাকিয়ে দেখে নেবে। প্রথম দৃষ্টিতেই যদি তার অন্তরে একটি প্রীতির জায়গা তৈরি হয় তাহলে তাকেই বিয়ে করে নেবে। এবং এই দেখার সময় সে তার অন্তরের দিকে দৃষ্টি রাখবে। দেখবে, অন্তরের কী অবস্থা। সেখানে ভালোবাসার সৃষ্টি হচ্ছে কি না—বোঝার চেষ্টা করবে। হৃদয়ের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হওয়ার আলামত হলো, মেয়েটি থেকে তার চোখ যেন সরতেই চাইবে না। আরও দেখতে মন চায়। হৃদয় উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। আর দৃষ্টি সরাতেই অন্তরের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়ে যায়। তখন বুঝতে হবে, এই হলো তার কাঙ্ক্ষিতা সঙ্গিনী।
এছাড়াও অবস্থার তারতম্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ব্যাপার থাকে, যেগুলোর প্রতি সজাগ দৃষ্টি প্রদানের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হয়।
যদি দেখার মজলিসে দেখা ও কথা বলার সুযোগ হয় তাহলে কিছুটা কথা বলা উচিত। নারীর সৌন্দর্য আসলে তার মুখে ও চোখে।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, পুরুষ যে মেয়েকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক, তার জন্য নারীর সতর দেখা জায়েয রয়েছে। সতর বলতে চেহারা, হাত-পা ইত্যাদি।
মেয়ে তো দেখা হলো, কিন্তু বিবাহ কখন করা উচিত? এ ক্ষেত্রে আমার মত হলো, পুরুষের জন্য যথাসম্ভব বিয়েকে একটু বিলম্ব করা ভালো; যাতে ইলমের পথে অনেকটা এগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু প্রয়োজন বেশি দেখা দিলে অগ্রসর হতে পারে। এবং মেয়ে দেখার সময় সে তার অন্তরের ঝোঁক বোঝার চেষ্টা করবে। বুঝমান যে-কেউ একটি নতুন বিষয়ের প্রতি হৃদয়ের এই ঝোঁকটা খুব সহজেই অনুভব করতে পারে। একজন মেয়েও সম্ভাব্য হবু স্বামীর প্রতি ভালোবাসার ঝোঁক টের পায়। যখন অন্তরে ভালোবাসার নড়াচড়া অনুভব করবে তখন সে সামনে অগ্রসর হওয়ার চিন্তা করবে।
হযরত আতা আল-খুরাসানি রহ. ৩৭ বর্ণনা করেছেন, مكتوب في الثوراة كل تزويج على غير هوى حسرة وندامة إلى يوم القيامة.
তাওরাতের মধ্যে লিখিত ছিল, ভালোবাসার আকর্ষণ ব্যতীত যত বিবাহ হয়েছে, কিয়ামত পর্যন্ত সেগুলো আফসোস ও অনুশোচনার কারণ হবে।
শোভা-সৌন্দর্য দেখা শেষ—
এবার মেয়েটির আখলাক-চরিত্রের দিকে দৃষ্টি দেবে। আর এটিই হলো বিয়ের ক্ষেত্রে আসল ধর্তব্য। এটিই স্থায়ী ও কল্যাণকর। নতুবা শুধু সৌন্দর্য দেখে বিয়ে করা হলে নারীটি যখন তার শোভা-সৌন্দর্য ও লাবণ্য হারাবে তখন তা যেন স্খলিত আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
সন্তানের ক্ষেত্রে বংশের আভিজাত্যও একটি প্রধান উদ্দেশ্য। তাই অন্তরের আকর্ষণ ও ঝোঁক বোঝার পর আসল উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ মেয়ের আখলাক-চরিত্রের দিকে দৃষ্টি প্রদান করা উচিত। খোঁজ- খবর নেওয়া প্রয়োজন।
হাদিসে এসেছে— لا يقضى القاضي بين إثنين وهو غضبان.
কাজি (বিচারক) রাগান্বিত অবস্থায় দুজনের মাঝে ফয়সালা করবে না। ৩৮ অর্থাৎ কম গুরুত্বপূর্ণ রাগ আগে প্রশমিত করা হবে, এরপর প্রধান কাজ বিচারের দিকে ধাবিত হতে হবে।
অন্য হাদিসে এসেছে— وإذا وضع العشاء و حضرت العشاء فابدأوا بالعشاء.
যখন ইশার সময় হয়ে গেল, আবার এদিকে রাতের খাবারও হাজির হয়ে গেল তাহলে তোমরা রাতের খাবারই আগে খেয়ে নাও। ৩৯ অর্থাৎ কম গুরুত্বের ঝামেলা মিটিয়ে তারপর আসল কাজে অগ্রসর হও।
কোনো পুরুষ যদি এমন মেয়ে পায়, যে দেখতেও সুন্দর, যার স্বভাব-চরিত্রও ভালো তাহলে আর কোনো দোষ-ত্রুটি বা অসুবিধার দিকে না তাকানোই উচিত। মানবিক কিছু দোষ-ত্রুটি সকলেরই থাকে। এটা থেকে কেউ-ই মুক্ত নয়। তবে নিজেরটা নিজের চোখে ততটা ধরা পড়ে না, অন্যেরটা যেমন পড়ে। এ সত্ত্বেও বিয়ের পর স্ত্রীও চেষ্টা করবে স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখতে। বেশি বেশি সান্নিধ্যে বিরক্তও করে তুলবে না, আবার বেশি দূরত্ব সৃষ্টি করে নিজেকে ভুলিয়েও দেবে না। সে স্বামীর সাথে এমন আচরণ করবে; যাতে স্বামীর চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। যেমন, সন্তান এবং জৈবিক বাসনা। তবে খুবই সতর্কতার সাথে, কৌশল ও চাতুর্যের সাথে এমনভাবে সঙ্গ দেবে, যেমনটা আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি; যাতে স্বামী তাকে নিয়ে তৃপ্ত থাকে, অন্য কোনো দিকে মন না যায়।
তবে কোনো পুরুষ যদি বোঝে, একাধিক বিয়ের মাধ্যমেই শুধু তার কাঙ্ক্ষিত বাসনা পূরণ হবে, তাকে বিভিন্ন অস্থিরতা থেকে মুক্ত রাখবে এবং একাধিক বিয়ের সকল শর্ত পূরণেও সে সক্ষম তাহলে তার একাধিক বিয়ে করাটাই উত্তম।
আর যদি সে আত্মসম্মানবোধের ভয় করে কিংবা অধিক সুন্দরীর ক্ষেত্রে যদি তার ভয় হয়, নারীটি তার অন্তরকে আখেরাতের স্মরণ থেকে বিমুখ করবে অথবা তার থেকে এমন বিষয় চাহিদা করবে, যা তাকে তাকওয়ার পথ থেকে সরিয়ে দেবে তাহলে সে নিজের জন্য বর্তমান স্ত্রীকেই যথেষ্ট মনে করবে।
আমি এতক্ষণ যে নসিহতগুলো করলাম, তার মধ্যে এটিও একটি—পুরুষ অন্যান্য সুন্দরী নারীদের থেকে নিজেকে সব সময় দূরে রাখবে।
তবে স্বামী যদি স্ত্রী থেকে কাঙ্ক্ষিত সন্তুষ্টির কিছু প্রাপ্ত না হয়, তবে দ্রুতই স্ত্রী পরিবর্তন করে নেবে। কারণ, এটাই হবে শান্তিদায়ক। আর সে যদি একজন স্ত্রীর ওপর সীমিত থাকতে সক্ষম হয় তবে সেটাই ভালো। অর্থাৎ উদ্দেশ্য সাধিত হলে একজন স্ত্রীতেই পরিতৃপ্ত থাকবে।
তবে ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক পুরুষ ছিলেন, যারা একসাথে একাধিক স্ত্রী রেখেছেন। মেয়েরাও ধৈর্যধারণ করেছেন এবং মেনে নিয়েছেন। হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের এক শ স্ত্রী ছিল। হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের ছিল একহাজার স্ত্রী। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একাধিক স্ত্রী ছিল। এবং তাঁর সাহাবাদের কথাও আমরা জানি, তাঁদের অনেকেরই ছিল একাধিক স্ত্রী। তবে উম্মতের জন্য অবশ্যই একসঙ্গে চারজনের বেশি স্ত্রী রাখা জায়েয নয়। পরবর্তী যুগেও একাধিক স্ত্রীর উদাহরণ ছিল এবং এখনো আছে। প্রয়োজন আছে বলেই আছে।
এসকল ব্যাপারে এখানে আরও দীর্ঘ আলোচনা হতে পারত। কিন্তু আমি অল্প কথার মধ্যেই এখানে কিছু ইঙ্গিত করে গেলাম। এগুলো বুঝলে এবং সে মতে কাজ করলে একটি সফল জীবনযাপন করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
৩৭. পুরো নাম: আতা ইবনে আবি মুসলিম। তিনি ছিলেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ওয়ায়েজ। দামেস্ক এবং ফিলিস্তিনে বসবাস করতেন। তিনি আবু দারদা, ইবনে আব্বাস, মুগিরা... থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এবং ইবনে মুসাইয়েব, উরওয়া ও আতা ইবনে রবাহ... প্রমুখ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি ১৩৫ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৬/১8০৷
*. ইমাম বোখারি রহ. হাদিসটি 'কিতাবুল আহকাম' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন- ফাতহুল বারি: ১৩/৭১৫৮। এবং ইমাম মুসলিম রহ, 'কিতাবুল আকযিয়া' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন- ৩/১৬/১৩৪২, ১৩৪৩।
৩৯. হাদিসটি ইমাম বোখারি রহ. 'কিতাবুল আতইমা' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন- ফাতহুল বারি: ৯/৫৪৬৩। এবং ইমাম মুসলিম রহ, 'কিতাবুল মাসাজিদ' অধ্যায়ে হজরত আনাস ইবনে মালেক রা.-এর শব্দে এটি উল্লেখ করেছেন- ১/৬৪/৩৯২।