📄 কল্যাণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে শয়তানের ধোঁকা
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ওয়াজের মজলিস, তাওবাকারীদের তাওবা এবং দুনিয়াত্যাগীদের দর্শন আমাকে প্রচণ্ডভাবে জুহুদ ও দুনিয়াত্যাগের প্রতি আকর্ষিত করে তুলছে। আমাকে ধাবিত করছে নানা রকম মানুষের সংশ্রব থেকে মুক্ত থাকার দিকে এবং নির্জনে-নিরালায় আখেরাতের আমলে মগ্ন হওয়ার দিকে।
আমি বিষয়টা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। অবশেষে বুঝতে পারলাম, এর অধিকাংশই হলো শয়তানের ধোঁকা। কারণ, শয়তান দেখে, আমার প্রতিটি মজলিসেই বহু বহু মানুষ তাদের অতীত গোনাহের জন্য ক্রন্দন করে, অনুতাপ-অনুশোচনায় দগ্ধ হয়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ দৃঢ়ভাবে তাওবা করে এবং সকল ধরনের অবৈধ কামনা-বাসনাকে পরিত্যাগের ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
কখনো কখনো পঞ্চাশ-একশজনও তাওবা করে। আর কিছুদিন তো একশোরও অধিক ব্যক্তি তাওবা করে। এদের অধিকাংশই তরুণ-যুবক, যারা এতদিন ইচ্ছাধীন খেলতামাশায় মগ্ন থেকেছে। বিভিন্ন পাপকর্মে নিমজ্জিত থেকেছে। এগুলো দেখে শয়তানও সম্ভবত গভীর দুঃখে নিমজ্জিত হয়। সে দেখতে পায়, এতদিন যারা তার দিকে ঝুঁকে ছিল, আজ তারা আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তাওবা ও আমলের দিকে ঝুঁকছে। সুতরাং সে বাহ্যিকভাবে মনোরম সুসজ্জিত কথা দিয়ে এগুলো থেকে আমাকে বিরত রাখতে চায়; যাতে তার থেকে যারা ছুটে যাচ্ছে, তাদেরকে যেন সে এককভাবে আবার তার দিকে প্রলুব্ধ করতে পারে।
সে আমাকে মজলিস থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে মন্ত্রণা দিয়ে বলে, যে ব্যক্তি এভাবে মানুষদের সংশ্রবে বিভিন্ন লৌকিকতা ও কৃত্রিমতার মাঝে মজে থাকে, সে তো আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন হওয়ার নির্জনতা লাভ করতে পারে না!
আমি বলি কী, মানুষদের মাঝে যদি সুন্দর ও মনকাড়া কথা বলি এবং সেগুলো যদি ভালো কথা হয়, তাহলে ভালোই তো; খারাপ কিছু তো নয়। এই সৌন্দর্যমণ্ডিত কথা দিয়ে আমি যদি মানুষদের শরিয়তের নাজায়েয কোনো কাজের দিকে আহ্বান ও আকর্ষণ করতাম, তবে সেটা খারাপই হতো; কিন্তু এর মধ্যে খারাপের কী আছে!
এরপর শয়তান আমাকে দুনিয়াত্যাগের পথ দেখায়। মানুষের স্বাভাবিক বৈধ জীবনোপকরণ, হালাল উপার্জন থেকে বিরত থাকার প্রলোভন দেখায়। সে বলে, এগুলো তো পার্থিব বিষয়ে মত্ত থাকা!
আমি তাকে বলি, আমি যদি দুনিয়াত্যাগের মানসিকতা গ্রহণ করি এবং সকল উপার্জন থেকে নিজেকে বিমুখ করে রাখি, তবে তো কিছুদিনের মধ্যেই আমার হাতে যা রয়েছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে অথবা আমার জীবনধারণের জন্য আমার পরিবার-পরিজনের কাছে হাত পাততে হবে। তাহলে কি আমি অধঃপতিত হয়ে পড়ব না?
বরং আমার উচিত হবে এমন কিছু সম্পদ জমা করে রাখা, যা আমাকে মানুষের মাঝে সম্প্রীতি বজায় রাখতে সহায়তা করবে। মানুষদের নিকট হাত পাতা থেকে বিরত রাখবে। আমার পুরো জীবনযাপনে সেটা কাজে লাগবে। কিংবা মৃত্যুর পর সেটা আমার পরিবার-পরিজনের জন্য রয়ে যাবে। আমি অবশ্যই এমন মুসাফির হতে চাই না, দূর থেকে মরীচিকা দেখেই যে তার সকল পানি নিঃশেষ করে ফেলে। কিন্তু নিকটে গিয়ে মরীচিকা দেখে হায় হায় বলে আফসোস করে। তখন তার এই আফসোস কোনো কাজে লাগবে না। বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাজ হবে, ঘুমুতে যাওয়ার আগেই বিছানার মসৃণতা প্রস্তুত করে নেওয়া। বার্ধক্যের আগেই উপযুক্ত পরিমাণ সম্পদ জমা করে নেওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لأن تترك ورثتك أغنياء، خير لك من أن تتركهم عالة يتكففون الناس. তুমি তোমার সন্তানদেরকে এমন নিঃস্ব অবস্থায় রেখে যাবে যে, তাদেরকে মানুষের কাছে হাত পাততে হবে—এরচেয়ে তাদেরকে তোমার স্বচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়াই উত্তম।৩২
তিনি আরও বলেছেন,
نعم المال الصالح للرجل الصالح. সৎ ব্যক্তির জন্য সৎ মাল কত উত্তম! ৩৩
আর বিচ্ছিন্ন থাকার ক্ষেত্রে আদেশ হলো, বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে অন্যায় ও অকল্যাণ থেকে। কল্যাণ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন থাকা যাবে না। আর প্রত্যেক অবস্থাতেই অকল্যাণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা অপরিহার্য। তাছাড়া শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষা প্রদান করা, মুরিদদের পথনির্দেশনা দেওয়া—এটা তো একজন আলেমের ইবাদত।
আর কিছু আলেমের জন্য তো নফল নামাজ ও রোজার চেয়ে কোনো কিতাব রচনা করা অথবা দ্বীনের উপকারী ইলম প্রদান করাই শ্রেষ্ঠতর কাজ। কারণ, এটি স্বল্প দেখা গেলেও এর প্রতিফল অনেক দূরগামী। কালের অতিবাহনে এটা বৃদ্ধি পেতেই থাকে। এবং এর উপকারের সময়-সীমাও অনেক প্রলম্বিত।
এখন কথা হলো, শয়তান যে সজ্জিত ধোঁকার দিকে আহ্বান করে, মানুষের সেদিকে ধাবিত হওয়ার দুটি কারণ রয়েছে—
১. অলসতাকে ভালোবাসা। কারণ, দ্বীনি এসকল কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিরত থেকে একাকী অলসতার মাঝে ডুবে যাওয়া সহজ।
২. প্রশংসার লোভ। কারণ, সে জানে, দুনিয়াত্যাগের ব্যাপারে যখন সে মানুষদের মাঝে প্রসিদ্ধি লাভ করবে, তখন আগের তুলনায় বহু সংখ্যক সাধারণ মানুষ তার দিকে ঝুঁকতে থাকবে। তারা তার প্রশংসা করে বেড়াবে।
এ কারণে তোমার কর্তব্য হবে, সর্বপ্রথম সর্বাধিক প্রয়োজনীয় জিনিসের দিকে দৃষ্টি দেওয়া। কাজ-কর্মে অগ্রগামীদের সাথে থাকা। এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ রা. যেগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন, সেগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া। তাদের কারও থেকে কি এমন কোনো বিষয় বর্ণিত হয়েছে, যা আজকের কথিত দুনিয়াত্যাগী ও সুফি-দরবেশরা আবিষ্কার করেছে? ইলম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করা—এগুলো তো দ্বীনের কর্মীদের কাজ নয়। নবীদের সকল ব্যস্ততা ছিল মানুষদের সাথে মেশা এবং তাদের কল্যাণ সাধন করা, সৎ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করা।
হ্যাঁ, যে ব্যক্তি আলেম নয়, সে মন্দ থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে মুর্খ লোকদের সংশ্রব ত্যাগ করতে পারে। অর্থাৎ মন্দ সংশ্রবের কারণে যার মধ্যে খারাপ প্রভাব পড়ার ভয় রয়েছে, সে থাকবে আত্মরক্ষার পর্যায়ে। একজন জাহেল কিংবা দুর্বল মনের মানুষ যেহেতু নিজের ইলম ও দৃঢ়তা দিয়ে মন্দদের প্রভাবিত করতে সক্ষম নয়, তাই নিজেকে বাঁচানোর জন্য তাদের সংশ্রব বর্জন করাই তার জন্য উত্তম। কিন্তু যিনি দক্ষ অভিজ্ঞ প্রাজ্ঞ ডাক্তার, তিনি যাকে নাগালে পাবেন কিংবা যারা তার নাগাল পাবে, সবাই উপকৃত হবে। তাকে তো দূরে সরে থাকলে চলবে না।
টিকাঃ
০২. কিতাবুল জানাইয: ১২৯৫/৩, ফাতহুল বারি।
৩৩. ইমাম বোখারি রহ. হাদিসটি তার 'আল আদাবুল মুফরাদ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আর মুসনাদে আহমদ: ৪/১৯৭,২০২।
📄 ইলমের শ্রেষ্ঠত্ব তার আমলে
কিছুদিন একটি বিষয় নিয়ে চিন্তা করলাম, বান্দার থেকে স্রষ্টার চাহিদা কী কিংবা স্রষ্টার জন্য বান্দার কর্তব্য কী?
ভেবে পেলাম, বান্দার কর্তব্য হলো, বিনয় প্রকাশ করা, নিজের কমতি ও অক্ষমতার কথা স্বীকার করা। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে আলেম ও জাহেদ-আবেদদের দুটি ভাগ করতে পারি। আলেমদের কাতারে ধরছি ইমাম মালেক রহ., সুফিয়ান সাওরি রহ., ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম শাফেয়ি রহ. ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.কে। আর আবেদ-জাহেদদের কাতারে রাখছি মালিক ইবনে দিনার রহ.৩৪, রাবিয়া বসরি রহ., মারুফ আল কারখি রহ.৩৫, বিশর ইবনে হারিস রহ.কে।
এই জাহেদ-আবেদগণ যখন তাদের গভীর ইবাদতে মশগুল হতে শুরু করলেন, যুগের আওয়াজ তাদেরকে চিৎকার করে বলতে লাগল, তোমাদের এই ইবাদত কোনো কাজে আসবে না, এগুলো একেবারেই বৃথা। ইবাদত তো কাজে আসবে আলেমদের, যারা ইলমের সাথে আমল করে। তারাই হলেন নবীদের উত্তরাধিকারী। তারাই হলেন জমিনে আল্লাহর প্রতিনিধি। শরিয়তের ব্যাপারে তারাই হলেন নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত। তারাই হলেন মান্য ও অনুসরণীয়। তাদের জন্যই রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের সকল শ্রেষ্ঠত্ব।
এ কথায় আবেদগণ অবনত হলেন। নমিত হলেন। এবং এই কথার সত্যতাও স্বীকার করে নিলেন। প্রতিফলে মালিক ইবনে দিনার রহ. ইলম শেখার জন্য ছুটে এলেন হাসান বসরি রহ.-এর নিকট। এবং বললেন, হ্যাঁ, হাসান আমাদের উস্তাদ।
আবার অন্যদিকে আলেমগণ যখন নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বে শির উঁচু করে আছেন। সবার ঊর্ধ্বে তাদের স্থান। তখন আবার যুগের ভাষ্য চিৎকার করে উঠল আলেমদের ব্যাপারেও। বলা হলো, ইলমের একমাত্র উদ্দেশ্য আমল। আমল ছাড়া ইলমের কোনো মূল্য নেই। স্বয়ং আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন,
وهل يراد بالعلم إلا ما وصل إليه معروف ؟ মারুফ কারখি যেখানে পৌঁছেছে, ইলম দ্বারা তো সেখানে পৌঁছানোই উদ্দেশ্য!
হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. থেকে বর্ণনা এসেছে। তিনি বলেন,
وددت أن يدي قطعت ولم أكتب الحديث. আমি কখনো কখনো কামনা করি, আমার এই হাত কর্তিত হোক এবং আমি আর কোনো হাদিস না লিখি। [কারণ, যা লিখেছি সেগুলোর ওপরই আমল করে সেরে উঠতে পারি না।]
হজরত উম্মে দারদা একবার এক লোককে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি যতটুকু জেনেছ, তার সবগুলোর ওপর আমল করেছ?
লোকটি বলল, না।
উম্মে দারদা বললেন, তবে তুমি কেন ইলমচর্চার দ্বারা অযথা নিজের ওপর আল্লাহর দলিল বাড়িয়ে চলেছ?'
হজরত আবু দারদা রহ. বলেন,
ويل لمن يعلم ولم يعمل مرة، وويل لمن علم ولم يعمل سبعين مرة. যে জানেনি এবং আমল করেনি, তার জন্য একবার আফসোস। আর যে ব্যক্তি জেনেছে কিন্তু আমল করেনি, তার জন্য সত্তরবার আফসোস।
হজরত আবুল ফুজাইল বলেন, يغفر للجاهل سبعون ذنباً. قبل أن يغفر للعالم ذنب واحد.
আলেমের একটি গোনাহ ক্ষমা করার আগে জাহেলের সত্তরটি অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
এসবের সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত কথা হলো কোরআনের কথা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ) যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সবাই সমান? [সুরা যুমার: ৯]
এসকল কথায় আলেমগণও নত হলেন। প্রতিফলে তাই আমরা দেখি, বিখ্যাত আলেম মুহাদ্দিস মুজতাহিদ হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. ছুটে এসেছেন হজরত রাবেয়া বসরি রহ.-এর নিকট। তার কথা ও তারবিয়ত দ্বারা উপকৃত হয়েছেন।
অর্থাৎ ইলমই আলেমদেরকে বুঝিয়েছে, ইলম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আমল। ইলম শুধুমাত্র একটি উপকরণ বা মাধ্যম। এটি কিছুতেই মূল লক্ষ্যবস্তু নয়। আলেমরাও এভাবেই নত ও অবনত হয়েছেন। নিজেদের কমতি ও অপূর্ণতাকে স্বীকার করে নিয়েছেন।
অতএব, দেখা যাচ্ছে সকল কিছুই অর্জিত হচ্ছে নিজের কমতির স্বীকারোক্তির মাধ্যমে, বিনয়ের মাধ্যমে। এর দ্বারাই বুঝে আসে, ইবাদতের মূল লক্ষ্যই হলো নিজেদের কমতি ও অক্ষমতাকে স্বীকার করে নেওয়া। আর এটিই হলো স্রষ্টার পক্ষ থেকে বান্দাকে তাকলিফ বা ইবাদতের হুকুম প্রদানের মূল উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
৩৪. মালেক ইবনে দিনার রহ.। তিনি ছিলেন সৎকর্মশীল আলেমদের এক উজ্জল নক্ষত্র। আস্থাবান তাবেঈদের অন্তর্ভুক্ত। আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে হাদিস শ্রবণ করেছেন। তিনি ১২৭ কিংবা ১৩০ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ৫/৩৬২ এবং তাবাকাতু ইবনি সা'দ : ৭/২৪৩।
৩৫. তাঁর পুরো নাম: আবু মাহফুজ মারুফ আল কারখি আল বাগদাদি। তিনি ছিলেন জাহেদদের মধ্যে অন্যতম নক্ষত্র। যুগের বরকত। বলা হয়- তিনি ছিলেন 'মুস্তাজাবুত দাওয়াত'। তার থেকে অনেক কারামত প্রকাশ পেয়েছে। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ৯/৩৩৯ এবং তাবাকাতুল হানাবিলা : ১/৩৮১।
৩৬. পুরো নাম: বিশর ইবনে হারেছ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আতা। তিনি ছিলেন যোগ্য ইমাম প্রাজ্ঞ আলেম মুহাদ্দিস এবং বিশিষ্ট জাহেদে রব্বানি। তিনি 'বিশর আলহাফি' নামে অধিক প্রসিদ্ধ। ইবনুল জাওযি তাকে নিয়ে স্বতন্ত্র একটি কিতাব লিখেছেন। ২২৭ হিজরি সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ১০/৪৬৯-৪৭৭।
📄 স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা জরুরি
আমি আল্লাহ তাআলার একটি আয়াতাংশ নিয়ে ভাবছিলাম। আয়াতটি এই-
( يُحِبُّهُم وَيُحِبُّونَهُ )
তিনি তাদেরকে ভালোবাসেন, তারাও তাকে ভালোবাসে। [সুরা মায়িদা: ৫৪]
অন্তর বা নফস যখন স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার অস্বীকৃতি জানায়, তখন তার মাঝে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। সে ভাবে, স্রষ্টার আনুগত্যই বুঝি তার প্রতি মুহাব্বত।
এটা সে কেন বলে? ভেবে দেখলাম, সে আসলে এই ভালোবাসা সম্পর্কে অজ্ঞ রয়েছে ইন্দ্রিয়জাত প্রভাবের কারণে। এটিকে সহজ করে ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, ইন্দ্রিয়জাত ভালোবাসা দৃশ্যত কোনো বস্তু বা আকৃতির বাইরে যেতে পারে না। কিন্তু ইলম ও আমলের ভালোবাসা ধাবিত হয় কোনো সত্তার গভীরতম অর্থময়তার দিকে এবং সকল বাহ্যিকতা দূরে সরিয়ে তাকেই সে ভালোবাসে।
আমরা দেখি, মানুষেরা হজরত আবু বকর রা.-কে ভালোবাসে, ভালোবাসে হজরত আলি রা.-কে। এভাবে উম্মতের বড় সংখ্যক একটি দল হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর সমর্থন করে। আরেকটি দল হজরত আশআরি রহ.-এর এবং এই নিয়ে কখনো কখনো নিজেদের মাঝে মারামারি ও ঝগড়া-বিবাদ হয়। এমনকি কেউ কেউ জীবনও দিয়ে দেয়।
এই যে তাদের মধ্যে একটি দলবদ্ধতা কাজ করে; কিন্তু তাদের কেউ কোনোদিন এই দল বা জাতির কোনো চিত্র স্বচোখে দেখেনি। তাছাড়া জাতির চিত্র কখনো ভালোবাসা জাগাতে পারে না। কিন্তু এসকল ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে যখন তাদের মাঝে কিছু বিশ্বাস, কথা, কর্ম ও উপকারিতা এসেছে, সেগুলোই তাদের মস্তিষ্কে সমমনাদের নিয়ে একটি দলবদ্ধতা তৈরি করেছে। এর জন্যই তাদের ভালোবাসা উথলে উঠেছে।
তাহলে এই অসাধারণ ব্যক্তিদের যিনি তৈরি করেছেন, জ্ঞান বুদ্ধি মেধা ও কর্মের ক্ষমতা দিয়েছেন, সেই স্রষ্টার প্রতি কেমন ভালোবাসা হওয়া প্রয়োজন?
তাকে আমি ভালোবাসবই তো!
যিনি আমাকে সুখ আস্বাদনের ইন্দ্রিয়-উপকরণ দিয়েছেন! যিনি আমাকে চিনিয়েছেন ইলমের সুখ! আহা, ইলম ও প্রজ্ঞার স্বাদ ও আস্বাদন সকল প্রকার ইন্দ্রিয় সুখের চেয়েও অতি সুখকর। তিনিই তো হলেন সেই সত্তা, যিনি আমাকে শিখিয়েছেন এগুলো। তিনি আমাকে অনুভব ও অনুভূতির শক্তি দিয়েছেন। আর কীভাবে অনুভব করব—সে শিক্ষাও দিয়েছেন তিনিই।
এছাড়া প্রতিমুহূর্তে প্রতিটি নতুন সৃষ্টিতে তিনি আমার কাছে আরও উজ্জ্বলভাবে উদ্ভাসিত হন। আমি সেই সৃষ্টির সুষম সংগতি ও মন অবশকরা সৌন্দর্যের মাঝে তাকে যেন অবলোকন করি।
আমার সকল প্রিয় জিনিসই এসেছে তার থেকে। আমার ইন্দ্রিয় অনুভূতি, আমার গভীর থেকে গভীরতম অনুভব এসেছে তার থেকে। অনুভব-অনুভূতির সহজতম পথ ও পন্থা এসেছে তার থেকে। এবং আমার সবচেয়ে সুমিষ্ট আস্বাদন ও গহীনতম আনন্দের বিষয় হলো, তাকে চিনতে পারা। তিনি যদি আমাকে না চেনাতেন, আমি কিছুতেই তাকে চিনতে পারতাম না।
আমি কীভাবে তাকে ভালো না বেসে পারি!
আমার পুরো অস্তিত্ব এসেছে তার থেকে। আমার অবস্থিতি, আমার বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠা—এ সবই হয়েছে তার হাত থেকে। আমি আবার তাঁর কাছেই ফিরে যাব। আমার যত সৌন্দর্য ও প্রিয়তা—সব তিনিই সৃষ্টি করেছেন। এগুলোকে সৌন্দর্য দিয়েছেন। সজ্জিত করেছেন। এসবের মাঝে প্রাণ সঞ্চার করেছেন।
আমি কীভাবে স্রষ্টাকে ভালো না বেসে পারি!
সৃষ্টির সকল শক্তিই তো এসেছে স্রষ্টার পক্ষ থেকে। বান্দার শিল্প ও সৌন্দর্যবোধও তার পক্ষ থেকে। বান্দার যে অনুভব ও অনুভূতির ক্ষমতা—তা তো তিনিই দিয়েছেন। আমরা যদি কখনো কোনো অতি মুগ্ধকর বিস্ময়কর চিত্র বা ছবি দেখি, তখন আমরা সেই চিত্রের চেয়ে চিত্রকরের প্রতিই বেশি মুগ্ধ হই, তার প্রতি সম্মানবোধ করি, তার এই অসাধারণ কাজের জন্য তারই প্রশংসা করি। চিত্রটির সাথে সাথে, এমনকি চিত্রের চেয়েও তখন আমাদের কাছে চিত্রকর বা চিত্রের স্রষ্টাই বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে।
এভাবে আমাদের নিজেদের এবং চারপাশের বিষয়াবলির দিকে আন্তরিক দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে স্রষ্টা সম্পর্কে আমাদের ভালোবাসাময় এক পবিত্র চিন্তার উন্নতি ঘটে। যখন এ চিন্তাগুলো তুচ্ছ ইন্দ্রিয়ানুভবের পর্দা সরিয়ে দিয়ে উদ্ভাসিত করবে তার পেছনের অসাধারণ এক সত্তার অসীম দয়া ও মায়াময় উপস্থিতি, তখন অবশ্যই অন্তরের মধ্যে জেগে উঠবে স্রষ্টার প্রতি দুকূল ছাপানো এক অপার্থিব বান ডাকা ভালোবাসা। এই দোলায়িত হৃদয়ের ভালোবাসার সাথে দুনিয়ার কোনো ভালোবাসারই তুলনা চলে না, তুলনা হয় না।
তবুও এই ভালোবাসার ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে কিছুটা তারতম্য হয়। কারণ, স্রষ্টার রয়েছে অনেকগুলো মহান গুণাবলি। কারও কারও অন্তরে কোনো গুণ হয়তো একটু বেশি প্রভাব ফেলে। সে কারণে তার ভালোবাসার সাথে সেই গুণের বৈশিষ্ট্যও লেগে থাকে। যেমন,
কেউ হয়তো স্রষ্টার এই বিশাল জগতের নিখুঁত পরিচালনায় প্রতি লক্ষ করে তাকে সমীহের সাথে ভালোবাসে। কেউ হয়তো তার কঠোরতা ও শাস্তির বিষয় লক্ষ করে ভয়ের সাথে ভালোবাসে। কেউ তাঁর দয়া ও করুণার প্রতি দৃষ্টি রেখে প্রবল আশা ও আকাঙ্ক্ষার সাথে ভালোবাসে।
আহা, এ যেন স্রষ্টার বর্ণিত সেই ব্যবস্থাপনা, যার কথা তিনি নিজেই বলেছেন এভাবে-
﴿قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ
প্রত্যেক মানুষই তার নিজ পানি পানের স্থান জেনে নিয়েছে। [সূরা বাকারা: ৬০]
📄 আল্লাহর হিকমতের কাছে জ্ঞানের আত্মসমর্পণ
এবার এক আশ্চর্য বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। বিষয়টি হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কত বিস্ময়করভাবেই না মানুষের এই শরীর সৃষ্টি করেছেন। কত সুন্দর ও সুগঠিত করেছেন! এখানেও তিনি তাঁর অসীম ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
অথচ এই শরীরই তিনি আবার নষ্ট ও ধ্বংস করেছেন। কত মানুষের মৃত্যু দিয়েছেন। আরও কত মানুষের মৃত্যু দেবেন এবং এই সুন্দর সুগঠিত কান্তিমান লাস্যময় শরীর বিনষ্ট করে দেবেন।
মানুষের আকল স্রষ্টার এসকল সৃষ্টি দেখে যেমন বিস্মিত ও বিমুগ্ধ হয়, তেমনি আবার তার রহস্যময়তার মধ্যে হাবুডুবু খায়—কেনই বা এই বিস্ময়কর সৌন্দর্যের সৃষ্টি আবার কেনই বা অচিরেই তার ধ্বংস!
মাথার মধ্যে প্রশ্ন জাগে। প্রশ্ন নড়ে। নড়তেই থাকে।
কিন্তু আকল বা যুক্তি যখন জানল, শরীরের এই কাঠামো একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর আবার জীবিত করা হবে। দুনিয়ার এই সুন্দর কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছে শুধু কিছু দিনের চেনা-জানার জন্য, আমলের জন্য এবং ফসলের বীজ বপনের জন্য।
হ্যাঁ, এই যুক্তিতে আকল কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিশ্চুপ হলো। কিন্তু... কিন্তু এরপর এজাতীয় আরও অনেক জিনিস তার সামনে এসে পড়তে থাকে। প্রশ্ন বাড়তে থাকে। যেমন, হয়তো তারুণ্যের আলোয় ঝলমল করা কোনো তরুণের মৃত্যু কিংবা পিতা-মাতার পায়ে পায়ে খেলে বেড়ানো মায়াময় কোনো শিশুর আকস্মিক পরলোকগমন। মায়ের কোল থেকে এই নিষ্পাপ শিশুটি ছিনিয়ে নেওয়ার রহস্য তার বুঝে আসে না। কারণ, আল্লাহ তাআলার তো এর মধ্যে কোনো লাভ নেই। প্রয়োজনও নেই।
এই তরুণ-তরুণী কিংবা এই শিশু প্রাণ দুটি পৃথিবীতে বেঁচে থাকার, বেড়ে ওঠার হয়তো সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল। সবুজ পৃথিবীতে মাত্র তাদের জীবনের শুরু হয়েছিল—কিন্তু শুরু হতে না হতেই যেন জীবন সাঙ্গ করে দেওয়া হলো। অথচ অন্যদিকে পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে জরাজীর্ণ অথর্ব এমন কত মানুষকে; কষ্টের অনুভূতি ছাড়া যাদের আর কোনো অনুভূতি নেই। বেঁচে থাকার অর্থই যারা আর বোঝে না-কেনই বা তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা হয়!
আরও প্রশ্ন জাগে-
একজন জ্ঞানী বুদ্ধিমান মুমিন ব্যক্তিকে ভীষণ দারিদ্র্যের মধ্যে আপতিত হতে হয়, অন্যদিকে কত অবাধ্য ফাসেক-কাফেরকে অঢেল সম্পত্তি প্রদান করা হয়। কী এর রহস্য!
এমন আরও অনেক বিষয় আছে, যেগুলোর রহস্য উদ্ঘাটনে আকল বা বুদ্ধিবিবেক কোনো কিনারা খুঁজে পায় না। হতভম্ব হয়ে বসে থাকে।
তবুও আমি আপাত যুক্তিহীন এই বিষয়গুলোর মাঝেও যুক্তি খুঁজতে থাকি। কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিও যখন এগুলোর কারণ উদ্ভাবনে অক্ষম হয়ে পড়ে-অথচ যুক্তি সকল কিছুরই কারণ খুঁজে পায়-তখন আমি যুক্তির অক্ষমতা বুঝতে পারি। আমি বুঝতে পারি, যুক্তিই সবকিছুর সমাধান নয়। আমি তখন নিঃশর্তে আল্লাহর প্রতি অনুগত হয়ে যাই। আর এটিই আমাকে স্রষ্টার সকল হুকুম মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। উৎসাহ জোগায়।
এবার একটি উল্টো প্রশ্ন-
কখনো যদি যুক্তি-বুদ্ধিকে প্রশ্ন করা হতো, এবার তুমিই বলো দেখি, স্রষ্টার সকল সৃষ্টি ও কর্মের রহস্য যেহেতু তোমার জানা, স্রষ্টা যে এভাবে সুন্দর করে সৃষ্টি করে আবার ধ্বংস করে ফেলেন, এর জন্য তার ওপর কোনো মন্দ আসে কি না?
যুক্তি-বুদ্ধি নিশ্চয় উত্তর দিত, বহু বাস্তব প্রমাণের মাধ্যমে আমি যেহেতু আগেই জেনে গিয়েছি, তিনি বড় জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান এবং আমি তার জ্ঞান বা প্রজ্ঞার রহস্য অনুধাবনে অক্ষম। সুতরাং আমার অক্ষমতা স্বীকার করে আমি তার সবকিছু নতশিরে মেনে নিয়েছি।