📄 প্রতিফলের প্রয়োজনীয়তা
যে-কেউ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাজ ও পরিচালনা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করবে, সে-ই সেগুলোকে একটি ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত দেখতে পাবে। বিলম্বে হলেও সব জিনিসের সে একটি প্রতিফল লক্ষ করবে। সুতরাং কোনো গোনাহের তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তি বা প্রতিফল না দেখে কারও ধোঁকায় পতিত হওয়া উচিত নয়।
সবচেয়ে নিকৃষ্টতম গোনাহের কাজ হলো, অব্যাহত গোনাহের মধ্যে লিপ্ত থাকা এবং তাওবা না করা। এর কারণে শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। অথচ এই ব্যক্তিও যদি কখনো ইস্তেগফার করে, নামাজ, রোজা ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট কাকুতি-মিনতি করে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তার এই ক্ষমা চাওয়া বিফলে যাবে না। আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী।
কিন্তু মানুষজাতি একটি প্রবল ধোঁকা ও প্রতারণার শিকার হয়ে আছে। এটি তার একটি নিকৃষ্টতম স্বভাবে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি হলো, প্রতিনিয়ত সে আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ করে, অথচ আল্লাহর পক্ষ থেকে সে নিজের পছন্দের জিনিস প্রত্যাশা করে বসে থাকে। যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
والعاجز من أتبع نفسه هواها وتمنى على الله الأماني.
দুর্ভাগা সে ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে; অথচ আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে মহান প্রতিদানের প্রত্যাশা করে। ১৬ সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তির কর্তব্য হলো, প্রতিদান প্রাপ্তির আশা করা এবং সেভাবেই আমল করা। তার কাজের ফলাফল সে একদিন না-একদিন পাবেই পাবে।
স্বপ্নের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকারক আল্লামা ইবনে সিরিন রহ.১৭ বলেন, আমি একবার এক লোককে ঠাট্টা করে বললাম, 'হে মুফলিস (হতদরিদ্র)।' ঠিক এর ৪০ বছর পর আমি নিজেই হতদরিদ্র হয়ে পড়লাম।
হজরত ইবনুল জালা রহ.১৮ বলেন, একবার আমার নিকট আমার এক মুরুব্বি এলেন। আমি তার চুলহীন টেকো মাথার দিকে একটু অন্যভাবে তাকিয়ে ছিলাম।
তিনি আমার দিকে ক্ষুণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 'এভাবে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছ কেন? তুমি অবশ্যই এর পরিণাম ভোগ করবে।' ঠিকই এ ঘটনার ৪০ বছর পর আমি আমার মুখস্থ কোরআন ভুলে গেলাম।
এমনিভাবে এর বিপরীত জিনিসগুলোও সংঘটিত হয়। যে-কেউ কোনো ভালো কাজ করলে বা আন্তরিকতাপূর্ণ কোনো ভালো কাজের নিয়ত করলে, অবশ্যই সে এর সুন্দর প্রতিদানের প্রতীক্ষা করতে পারে; যদিও কখনো কখনো সেটা বিলম্বে আসে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ) নিশ্চয় যে ব্যক্তি খোদাভীতি অর্জন করবে এবং ধৈর্যধারণ করবে [তার জানা উচিত,] আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের প্রতিফল নষ্ট করেন না। [সুরা ইউসুফ: ৯০]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من غض بصره عن محاسن امرأة أثابه الله إيماناً يجد حلاوته في قلبه. যে ব্যক্তি তার চোখকে কোনো নারীর সৌন্দর্য থেকে সরিয়ে অবনত করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে এমন ঈমান দান করবেন; সে তার অন্তরে যার স্বাদ ও মিষ্টতা অনুভব করতে পারবে। ১৯
সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তির জানা থাকা উচিত, কিয়ামতের দিন ইনসাফের দাঁড়িপাল্লা কোনো পক্ষপাতিত্ব করবে না। কারও বেশ-কম করা হবে না। বরং ভালো-খারাপ সকল কিছুর পরিপূর্ণ প্রতিফল পাওয়া যাবে। কোনোকিছুই বাদ পড়বে না।
টিকাঃ
১৬. ইমাম তিরমিজি রহ. হাদিসটি 'আল কিয়ামাহ' অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন-৪/৪২৬০। এবং তিনি বলেন, হাদিসটি হাসান সহিহ। এছাড়া মুসনাদে আহমদ-৪/১২৪, ইবনে মাজা-২/৪২৬০ গ্রন্থেও তা উল্লেখিত হয়েছে। এখানে হাদিসটির দ্বিতীয় অংশ উল্লেখ করা হয়েছে। পুরো হাদিসটি এমন- الْكَيْسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ.
১৭. নাম: আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে সিরিন আল-আনাসি আল-বসরি রহ.। তিনি একজন ইমাম। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম হজরত আনাস ইবনে মালেক রা.-এর আজাদকৃত গোলাম। তিনি অনেক সাহাবি থেকে হাদিস শ্রবণ করেছেন। খুবই উত্তম চরিত্রের ব্যক্তি ছিলেন। প্রকাশ্যে অনেক হাসি-মজাক করতেন। ১০৮ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। [ سير أعلام النبلاء : ৯/৫৮৫، طبقات ابن سعد 8/604 ]
১৮. পুরো নাম: আবু আবদুল্লাহ ইবনুল জালা আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া অথবা মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া রহ.। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ আরেফ। উত্তম মানুষ। বিশর ইবনুল হারেস রহ.-এর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত। তিনি ৩০৬ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। [ سير أعلام النبلاء : ১৪/২৫১، صفة الصفوة : ۲/۲۶۶ ]
১৯. হাদিসটি 'মুসনাদে আহমদ'-এ বর্ণিত হয়েছে- ৫/৬৪। এবং আল্লামা হাইছামি রহ. তাঁর مجمع الزوائد -এ উল্লেখ করেছেন- ২/৬৩। এবং ইমাম তবারনি একটু ভিন্ন শব্দে উল্লেখ করেছেন। তবে সনদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে।
📄 দুনিয়ায় নিজের অংশ ভুলে যেয়ো না
আমি সুফি এবং তথাকথিত দুনিয়াত্যাগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি। এদের অধিকাংশই শরিয়ত থেকে অনেক দূরে ভ্রষ্টতার মধ্যে বসবাস করছে। হয়তো এটা তাদের অজ্ঞতার কারণে হয়েছে; নতুবা জেনেশুনে সজ্ঞানে তারা তাদের বানানো বিদআতের মধ্যে অবস্থান করছে।
তারা তাদের এ ধরনের জীবনযাপনের পক্ষে অনেক সময় এমন কিছু আয়াত দ্বারা দলিল দেয়; যেগুলোর অর্থ তারা নিজেরাই জানে না। এবং এমন কিছু হাদিস দ্বারাও তারা দলিল দেয়; যেগুলোর রয়েছে স্বতন্ত্র কারণ। তথাপি সেগুলোর অধিকাংশই প্রমাণিত নয়।
তাদের এ ধরনের ব্যাখ্যা ও অর্থের কারণ, তারা কোরআনের আয়াতে পেয়েছে—
﴿وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ﴾
এই পার্থিব জীবন সামান্য ধোঁকার ভোগ্যসামগ্রী ছাড়া কিছু নয়। [সুরা আলে ইমরান: ১৮৫]
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে—
﴿اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ﴾
তোমরা জেনে রেখো, নিশ্চয় এই পার্থিব জীবন শুধু ক্ষণিকের খেল-তামাশা, ক্রীড়া-কৌতুক ও শোভা-সৌন্দর্য। [সুরা হাদিদ: ২০]
এছাড়া হাদিসে তারা শুনেছে—
لَلدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللهِ مِنْ شَاةٍ مَيِّتَةٍ، عَلَى أَهْلِهَا.
একটি মৃত বকরি তার মালিকের নিকট যতটা গুরুত্বহীন, পুরো দুনিয়া আল্লাহ তাআলার নিকট তার চেয়ে আরও বেশি তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন।২০
তারা এ ধরনের আয়াত ও হাদিস দেখে প্রকৃত সত্য ও বাস্তবতা না বুঝে দুনিয়া বর্জনের ব্যাপারে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছে। ঢালাওভাবে দুনিয়ার গাল-মন্দ শুরু করেছে। অথচ কেই-বা না জানে, কোনো জিনিসের হাকিকت و বাস্তবতা না জেনে তার প্রশংসা বা বদনাম করা জায়েয নেই।
আমরা যখন দুনিয়ার ব্যাপারে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি ফেলি এবং বোঝার চেষ্টা করি, দুনিয়া আসলে কী, তখন তো আমরা এটাই দেখতে পাই- এই বিপুল বিস্তৃত বিশাল পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে সকল প্রাণীর বাসস্থান ও অবস্থানস্থল হিসেবে। এই দুনিয়া থেকেই তাদের খাদ্য-সামগ্রীর সরবরাহ হয় এবং তাদের মৃতদেরকে এর মাঝে দাফন করা হয়। এখানে বসে আখেরাতের আমল করা যায়...। এগুলো তো ভালো জিনিস। সুতরাং এই ধরনের ভালোত্ব ও কল্যাণ যার মধ্যে রয়েছে, ঢালাওভাবে তার নিন্দা করা যায় না।
এছাড়া পৃথিবীর মাঝে যত পানি শস্য সবুজ শাক-সবজি, বাগান ও প্রাণী রয়েছে—সবই রয়েছে মানুষজাতির উপকারের জন্য। এসকল খাদ্য-খাবার ও দ্রব্য-সামগ্রীর মাধ্যমে সে জীবনধারণ করে পৃথিবীতে টিকে থাকে। পৃথিবীতে মানুষের টিকে থাকা বড় একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কারণ, আল্লাহর পরিচয় লাভ করা এবং তার আনুগত্য ও দাসত্ব করার জন্য মানুষজাতিকে পৃথিবীতে অবস্থান করা জরুরি। তাহলে, যে সকল বস্তু-সামগ্রী আল্লাহর পরিচয় লাভকারী ও তাঁর ইবাদতকারীর অবস্থান ও টিকে থাকার মাধ্যম, সেগুলোর তো প্রশংসা করা প্রয়োজন; নিন্দা নয়।
তাহলে বোঝা গেল, দুনিয়ার নিন্দার কারণ হলো অজ্ঞ অথবা অপরাধী ব্যক্তিদের কাজকর্ম। কারণ, কেউ যদি বৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন করে এবং এর জাকাত প্রদান করে, তাহলে এ সম্পদের নিন্দা করার কিছু নেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনের মধ্যে অনেক জায়গায় ধন-সম্পদকে فضل الله বা 'আল্লাহর অনুগ্রহ' বলে উল্লেখ করেছেন।
জুবায়ের ইবনে আবদুল্লাহ এবং ইবনে আউফ রা. তাদের উত্তরাধিকারীদের জন্য কত ব্যাপক সম্পদ রেখে গিয়েছেন—সেটা তো জানা বিষয়। একবার হজরত আলি রা.-এর জাকাতের পরিমাণ হয়েছিল ৪০ হাজার দিনার। হজরত ইবনে মাসউদ রা.-এর পরিত্যক্ত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার দিনার। হজরত লাইস ইবনে সাদ রহ. ২.২১ প্রতি বছর বিশ হাজার দিনারের বেশি উপার্জন করতেন। হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ.২২ নিজের সম্পদ দিয়ে বাণিজ্য করতেন। আর হজরত ইবনু মাহদি রহ. প্রতিবছর দুই হাজার দিনার বিনিয়োগ করতেন।
দুনিয়াতে বিয়ে-শাদির কথা যদি ধরা হয়, তবে এটিও প্রশংসনীয় একটি বিষয়। কিছুতেই নিন্দা বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক স্ত্রী ছিল। দাসীও ছিল। এছাড়া অধিকাংশ সাহাবির ছিল একাধিক স্ত্রী। হজরত আলি রা.-এর চারজন স্ত্রী ছিল।
কেননা, বিয়ে যদি সন্তান-সন্ততির উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলেও এটি ইবাদত হিসেবেই গণ্য হবে। আর যদি নিজের চাহিদা পূরণের জন্য হয়, তাহলেও এটা হালাল এবং বৈধ। বিয়ে ইবাদত হওয়ার কারণ, এর মাধ্যমে নিজেকে ও অন্য নারীকে জিনা ও রজম থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়। হাদিসে এর অনেক ফজিলতও বর্ণিত হয়েছে।
হজরত মুসা আলাইহিস সালাম তাঁর জীবনের মূল্যবান দশ-দশটি বছর হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের কন্যাকে বিয়ের মহর আদায়ে ব্যয় করে দিয়েছেন।২৩ প্রায় সকল নবীই বিয়ে করেছেন। বিয়ে যদি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না হতো, তবে তো তারা এদিকে পা বাড়াতেন না। হজরত মুসা আলাইহিস সালামের মতো একজন নবী জীবনের মূল্যবান দশটি বছর মহর আদায়ে ব্যয় করতেন না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
خيار هذه الأمة أكثرها نساء. এই উম্মতের মধ্যে উত্তম সে, যার স্ত্রী অনেক। ২৪
এবার খাদ্য-খাবারের কথায় আসি। ভালো খাদ্য গ্রহণের দ্বারা উদ্দেশ্য হবে, নিজের শরীরকে মজবুত ও শক্ত-সামর্থ্যবান রাখা; যাতে ঠিকভাবে আল্লাহর ইবাদত ও দাসত্ব করা যায়। এছাড়া নিজের অধীন পশু-প্রাণীকেও ভালোভাবে খাবার দেওয়া উচিত; যাতে সেগুলো তাকে বহন করতে পারে।
হজরত রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হালাল যা পেতেন, আল্লাহর শুকরিয়া করে খেয়ে নিতেন। গোশত হলে গোশত খেতেন। মুরগির গোশতও খেতেন। তবে খাদ্যের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল মিষ্টান্ন এবং মধু। তাঁর ব্যাপারে এমন কোনো বর্ণনা নেই যে, তিনি হালাল ও বৈধ খাবার গ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছেন।
একবার হজরত আলি রা.-এর সামনে ফালুদা পরিবেশন করা হলো। তিনি বললেন, এটা কী? লোকেরা বলল, এটি ফালুদা। ইরানিরা তাদের নওরোজের এদিন এটা খায়। হজরত আলি রা. সেটা খেলেন এবং বললেন, نوروزنا كل يوم -আমাদের প্রতিটা দিনই নওরোজ। অর্থাৎ যেকোনো দিন এটা আমরা খেতে পারি। কোনো বাধা নেই।
তবে এটা ঠিক যে, পরিতৃপ্তির পরও পেটুকের মতো ভক্ষণ করা উচিত নয়। এবং অহংকার প্রকাশের জন্য ভালো পোশাক-পরিচ্ছদ পরাও ঠিক নয়। হ্যাঁ, তারপরও কিছু মানুষ এরচেয়ে অনেক অল্পতেই সন্তুষ্ট থেকেছেন। কারণ, নিখাদ হালালের মধ্য থেকেও তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভবপর হচ্ছিল না। অন্যথায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ সময় পরিধানের জন্য এমন একটি পোশাক ছিল, যা ২৭টি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হয়েছিল।
হজরত তামিম দারি রা.-এর এমন একটি পোশাক ছিল, যা এক হাজার দিরহাম দিয়ে খরিদ করা হয়েছিল। এটি পরিধান করে তিনি রাতে নামাজ আদায় করতেন।
কিন্তু এসকল সাহাবি ও তাবেয়ির পর এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হলো, যারা বাইরে খুব দুনিয়াবিমুখতা প্রকাশ করতে শুরু করল এবং নিজেরা নিজেদের মতো করে একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করে নিল, যেটা আদতে তাদের প্রবৃত্তিতাড়িত পথ। এরপর তারা এই পথ-পদ্ধতির পক্ষে দলিল-প্রমাণ অনুসন্ধানে লেগে পড়ল। অথচ এটা তো ইসলামের পথ নয়। মানুষের উচিত হলো দলিলের অনুসরণ করা; প্রথমে কোনো পথের অনুসরণ করে এরপর তার জন্য দলিল-প্রমাণ অনুসন্ধান করা নয়।
সুফিদের আরও কয়েকটি শ্রেণি রয়েছে। যেমন-
এক. প্রকাশ্যে মানুষের সামনে সুফি ও দুনিয়াবিমুখতার ভান করে। অথচ গোপনে এবং বাস্তবে সবচেয়ে বেশি সে-ই দুনিয়ার প্রতি লোভী হয়ে থাকে। গোপনে ও নির্জনে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। গোনাহের কাজে লিপ্ত হয়। তার বাহ্যিক পোশাক-পরিচ্ছদ ও বেশ-ভূষায় লোকদের দেখাতে চায় যে, সে একজন সুফি দুনিয়াত্যাগী অনুগত সাধু পুরুষ। কিন্তু তার এই সাধুতা শুধু বেশ-ভূষা ও বাহ্যিকতার মাঝেই সীমাবদ্ধ। নতুবা তার বাস্তব সকল কর্মকাণ্ডের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, তার মধ্যে বিরাজ করছে ফেরাউনের অহংকার ও আমিত্ব।
দুই. দ্বিতীয় প্রকার সুফি, বাস্তবে যাদের অন্তর কলুষমুক্ত। দ্বীনের জন্য হৃদয় পরিষ্কার। কিন্তু শরিয়তের ইলম সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ ও মূর্খ। সে কারণে হৃদয়ের স্বচ্ছতা সত্ত্বেও অজ্ঞতার কারণে ডুবে আছে ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার মধ্যে।
তিন. তৃতীয় প্রকার ব্যক্তিরাও অজ্ঞ। কিন্তু তারা যেকোনোভাবে সমাজে শীর্ষ অবস্থান লাভ করেছে। তারা বইপত্রও রচনা করেছে। এই পথে মূর্খ অনুসারীরা তাদেরকে ভুলভাবে অনুসরণ করে বসেছে। তাদের অনুসারীদের অবস্থা হলো ওই অন্ধ ব্যক্তির মতো, যে অপর কোনো অন্ধের অনুসরণ করেছে। অথচ তারা যদি এসব ত্যাগ করে শুধু সেই পথ ও পদ্ধতির অনুসরণ করত, যার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ, তবে তারা এভাবে পথভ্রষ্ট হতো না এবং লাঞ্ছিতও হতো না।
কোনো মর্যাদাবান ব্যক্তি শরিয়ত থেকে বিচ্যুত হলে বিজ্ঞ আলেমদের অনেকেই তাদের বিচ্যুতি তুলে ধরতে কোনো কিছুর পরোয়া করতেন না; বরং তারা আরও বিস্তৃতভাবে তাদের সমালোচনা করতেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর ব্যাপারে বর্ণিত রয়েছে যে, মারওয়াজি রহ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বিয়ের ব্যাপারে আপনার কী অভিমত? তিনি বললেন, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত।
মারওয়াজি রহ. তখন বললেন, ইবরাহিম বিন আদহাম রহ. বলেছেন...। সঙ্গে সঙ্গে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. চিৎকার করে বলে উঠলেন, তুমি আমার কাছে পথশিশুদের প্রমাণ নিয়ে এসেছ!
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.কে জিজ্ঞেস করা হলো, সারি সাকাতি রহ. বলেছেন, আল্লাহ যখন হরফসমূহ সৃষ্টি করলেন তখন আলিফ দাঁড়িয়ে ছিল এবং বা সিজদা করল। ইমাম আহমদ রহ. বললেন, তোমরা তার থেকে মানুষজনকে সরিয়ে দাও।
জেনে রেখো, মুহাক্কিক ব্যক্তিকে কোনো মর্যাদাবান নাম ভীত করে না। যেমন, একবার এক ব্যক্তি হজরত আলি রা.-এর নিকট এসে বলল, আপনি কি মনে করেন, আমরা তালহা এবং জুবায়রের ব্যাপারে এই ধারণা পোষণ করি যে, তারা ভ্রান্তির ওপর ছিল? হজরত আলি রা. উত্তরে বললেন,
إن الحق لا يعرف بالرجال اعرف الحق تعرف أهله.
সত্য কখনো মানুষের পরিচয়ে জানা যায় না। তুমি আগে সত্যকে জানো, এরপর তা দিয়েই তুমি সত্যপন্থীকে চিনতে পারবে।
কিন্তু যেই বাস্তবতা আমাদের ব্যথিত করে তা হলো, লোকদের অন্তরে কিছু মানুষের প্রতি প্রচণ্ড রকমের সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রোথিত হয়ে আছে। এরপর যখন এসব মানুষদের থেকে কোনো বিষয় প্রচারিত হয়, দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা নিজেদের অন্তরে তাদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার কারণে এগুলোকেই সত্য ও সঠিক ভেবে গ্রহণ করে নেয়।
যেমন আবু ইয়াযিদ রহ. থেকে বর্ণনা করা হয়। তিনি বলেন, ‘একবার আমার নফস আমার ওপর কর্তৃত্ব করতে শুরু করে। তাই আমি নফসকে শান্তি প্রদানের জন্য শপথ করে বলি- আমি এক বছর পানি পান করব না।’
সত্যই যদি তিনি এ কথা বলে থাকেন তবে এটা তার জন্য স্পষ্ট একটি ভুল কাজ এবং ভ্রষ্ট পদ্ধতি। কারণ, পানি শরীরের সকল খাদ্যকে সুসমন্বিত করে। পরিপাকতন্ত্রে সাহায্য করে। অন্য কোনো খাদ্য তার বিকল্প হতে পারে না। তাই যখন সে পানি পান করবে না, তার শরীর কষ্ট পাবে। শরীর অসুস্থ হয়ে পড়বে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও মিষ্ট পানি পান করতেন। তাই কেউ যদি নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পানি পান না করার মতো শপথ করে তাহলে এটা তার জন্য জায়েয হবে না। কারণ, এই শরীরের মালিক সে নিজে নয়। শরীরের মালিকের অনুমতি ব্যতীত তাকে অবৈধভাবে কষ্ট প্রদান করা তার জায়েয নেই।
অথচ কিছু সুফি ব্যক্তির থেকে এধরনের বিভিন্ন কথা প্রচলিত আছে। তাদের মধ্যে একজনের বক্তব্য এমন- আমি আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করে মক্কা পর্যন্ত খালি পায়ে হেঁটে গিয়েছি। পথে যখন পায়ে কাঁটা ফুটেছে, সেগুলো ছাড়িয়ে নিইনি। বরং জমিনের সাথে ঘষে দিয়ে নিয়েছি। তখন সেখান থেকে রক্ত ছুটেছে ফিনকি দিয়ে...।
কেউ বলেছে, একবার আমার দেহে একটি ফোঁড়া হয়েছিল। বড় যন্ত্রণা দিচ্ছিল ফোঁড়াটা। যখন আমার চোখ আমাকে কষ্ট দিত তখন সেই ফোঁড়া দিয়ে তা ঘষে দিতাম। এভাবে আমার একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেল। আল্লাহর সম্পদ আল্লাহ নিয়েছেন; এতেই বা দুঃখের কী আছে!
এ ধরনের আরও অনেক ঘটনা ও কথা পাওয়া যায়। বক্তারা অনেক সময় এগুলোকে তাদের কারামাত হিসেবেও চালিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলোকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদাপূর্ণরূপে উপস্থাপন করে। ফলে তারা ভাবতে শুরু করে, এসকল সুফিরা বুঝি ইমাম শাফেয়ি রহ. ও আহমদ রহ.-এর চাইতেও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন।
আচ্ছা তুমিই বলো, নিজের শরীরের ওপর এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় কষ্টারোপ কি তার জন্য জায়েয হয়েছে? এই শরীরের মালিক কি সে নিজে?
আহা, আমি কসম করে বলতে পারি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বড় রকমের গোনাহের কাজ। বড়ই কুৎসিত বীভৎসতা।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, ﴿وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ﴾ আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। [সুরা নিসা: ২৯]
এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إن لنفسك عليك حقاً. নিশ্চয় তোমার ওপর তোমার শরীরের হক বা অধিকার রয়েছে। ২৫
হিজরতের সময় হজরত আবু বকর রা. অনুসন্ধানী মনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশ্রামের জন্য একটু মনোরম ছায়া খুঁজছিলেন। খুঁজতে খুঁজতে যখন এক জায়গায় একটা বড় প্রস্তরখণ্ড পেলেন, তখন তার ছায়ায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বসার ব্যবস্থা করলেন।
অথচ আমাদের নিকট পূর্ববর্তী কিছু ব্যক্তিদের থেকে 'তাসাওউফ'-এর নামে নিজের শরীরের ওপর বিভিন্ন ধরনের বাড়াবাড়ির বর্ণনা পাওয়া যায়। তাদের এগুলো করার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে-
১. ইলম ও শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞতা।
২. খ্রিষ্টানদের সন্ন্যাসবাদ যুগের কাছাকাছি অবস্থান করা। অর্থাৎ তাদের দুনিয়াত্যাগের দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হওয়া।
এভাবে কত গল্পকার যে মজলিস মাতিয়েছে এ-জাতীয় গল্প বলে-অমুক অমুক বিশাল মরু প্রান্তরে বের হয়েছেন কোনো পাথেয় পানি ও খাদ্য ছাড়া। কিন্তু কথক হয়তো জানে না, এরূপ করাটা নিকৃষ্ট কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আল্লাহ তাআলা এ ধরনের কিছু করতে বান্দাকে বাধ্য করেন না। নির্দেশও দেন না।
কেউ কেউ বর্ণনা করেন, অমুক অমুক পানির ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছেন। একবার এ ধরনের এক গল্প শুনে হজরত ইবরাহিম হারবি বললেন, কারও পানির ওপর হেঁটে যাওয়ার কথা সত্য নয়। অন্যরা রই রই করে উঠল, তবে কি আপনি সৎ ওলিদের কারামাতকে অস্বীকার করছেন?
এসকল ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো, আমরা এগুলোকে অস্বীকার করি না। কিন্তু যেটা প্রমাণিত সত্য, সেটাকেই আমরা অনুসরণ করি। সৎ ও সঠিক ব্যক্তিরা অবশ্যই শরিয়তের অনুসরণ করে চলেন। তারা কিছুতেই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের নিজস্ব মত ও পথের অনুসরণ করেন না।
হাদিসে এমন অনেক বিবরণ এসেছে যে, বনি ইসরাইল নিজেদের কর্মকে তারা নিজেরাই কঠিন করে নিয়েছে। সে কারণে আল্লাহও তাদের ওপর কঠিনতা আরোপ করেছেন। ২৬ তাহলে আমরাই বা কোন সাহসে এগুলো করে বেড়াই!
সুফিরা মানুষকে আর কত দরিদ্রতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে? এরা মানুষের হাত শূন্য করে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যখন তাদের নিজেদের এবং পরিবারের পার্থিব প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন হয়তো তারা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছে অথবা ধনীদের দুয়ারে হাত পাতছে।
তারা মানুষকে আর কত স্বল্পাহারের দ্বারা কষ্টে আপতিত করবে? অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বল্পতার পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ثلث للطعام وثلث للشراب وثلث للنفس.
পেটের এক তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, আরেক তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ শূন্য থাকবে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য। ২৭
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারের কমতির সর্বোচ্চ সীমা এখানে বর্ণনা করে দিয়েছেন।
হজরত আবু তালেব আল-মাক্কি রহ. তার 'কুতুল কুলুব' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, 'তাদের মাঝে একজন বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি একটি পাত্র দিয়ে নিজের খাদ্যের পরিমাণ মেপে রেখেছিলেন। সেই পরিমাণ অনুসারে তিনি খাদ্য গ্রহণ করতেন। কিন্তু প্রতিদিন তিনি আগের পরিমাণ থেকে কিছুটা করে কমাতে থাকেন। প্রতিফলে খাদ্যের পরিমাণ ক্রমে কমতেই থাকে। আমি শৈশব থেকে ছিলাম তার গুণগ্রাহী ও অনুসারী। কিন্তু তার এ কাজ আমার নিকট সঠিক মনে হয় না। প্রতিদিন তার খাদ্যের পরিমাণ কমতে কমতে একপর্যায়ে পরিমাণ একেবারে তলানিতে এসে ঠেকে। এভাবে স্বল্প খাদ্য গ্রহণের কারণে কিছুদিনের মধ্যেই তার শরীর ভেঙে পড়ে। এরপর তিনি দীর্ঘ কয়েক বছর অসুস্থ থাকার পর একদিন ইন্তেকাল করলেন।
আচ্ছা বলো, এটা কি শরিয়ত অনুমোদন করে?
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, 'আমি অতি অল্প খাদ্য গ্রহণ করাকে অপছন্দ করি। যে সকল লোক এ ধরনের কাজ করে, একসময় তারা ফরজ আমল করা থেকেও অক্ষম হয়ে পড়ে।'
এটিই বিশুদ্ধ কথা। কারণ, অল্প আহার গ্রহণকারী ব্যক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় সে নফল পড়তে অক্ষম হয়। এরপর ফরজ আদায়েও অক্ষম হয়ে পড়ে। এরপর সে তার স্ত্রী ও পরিবারের হক আদায়ে অক্ষম হয়ে পড়ে। তাদের জন্য উপার্জন করতে সক্ষম থাকে না। আরও এমন অনেক ভালো কাজ সে আর করতে পারে না, আগে যেগুলো সে করত।
যে সকল হাদিসে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের ওপর উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলো শুনে তোমার শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সেগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য হয়তো রোজার ওপর উদ্বুদ্ধ করা কিংবা ভক্ষণ বা অধিক খাদ্যের প্রতি নিরুৎসাহিত করা।
অর্থাৎ প্রয়োজন সত্ত্বেও ধারাবাহিক স্বল্প আহার শারীরিক শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। এটা একজন মুমিনের জন্য জায়েয নয়।
এসকল কথা শুনে আবার আমার নিকট ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. বা এ ধরনের কারও কথা দিয়ে দলিল দিতে এসো না। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবির মাধ্যমে যে দলিল প্রদান করা হচ্ছে, তা নিশ্চয়ই এসকল বুজুর্গ ব্যক্তির কথার চেয়ে অধিক শক্তিশালী। হ্যাঁ, আমরা তাদের ব্যাপারেও ভালো ধারণা রাখি। ব্যতিক্রম বিষয় দিয়ে কখনো দলিল প্রদান করা যায় না। তাছাড়া সকল মানুষের সক্ষমতা ও সহ্যক্ষমতাও এক নয়।
আমার কাছে একদিন এমন এক ব্যক্তির সংবাদ এলো, যাকে আমরা সম্মান করি এবং যার জিয়ারতকে আমরা গনিমত মনে করি। তিনি একবার দজলা নদীর তীরে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করলেন। তাকে বলা হলো, পানি তো পাশেই রয়েছে। তবুও যে তায়াম্মুম করলেন!
উত্তরে তিনি বললেন, 'আমি ভয় করছিলাম, আমি হয়তো অতদূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব না। তার আগেই হয়তো মৃত্যু এসে যাবে।'
আহা, মৃত্যুকে এত নিকট জ্ঞান করা তো ভালো কথা! কিন্তু তাই বলে শরিয়তকে এভাবে ফেলনা বানিয়ে ফেলা কি ঠিক? তাঁর এই ঘটনা শুনে ফিকাহবিদগণ তাকে ছেড়ে কথা বলেননি! এটা তার অনুচিত হয়েছে; তিনি যত বড় পির ও জাহেদই হন না কেন।
এ ধরনের সকল ঘটনার দিকে যদি কোনো ব্যক্তি দৃষ্টি দেয়, তাহলে সে বুঝবে একজন ফকিহ—তার অনুসারী মুরিদ যতই কম হোক, তার মৃত্যু যতই নীরবে সংঘটিত হোক—এমন হাজার পির বা সুফি থেকে অনেক উত্তম, সাধারণ লোকেরা যাদের স্পর্শ করাকেও বরকত মনে করে। যাদের জানাযায় মানুষের সংখ্যা গণনা করে শেষ করা যায় না।
আল্লাহ আমাদের অজ্ঞতা থেকে মুক্তি দান করুন। কোনো দলিল ছাড়া শুধু সম্মান ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সালাফদের অনুসরণ করা থেকে হেফাজত করুন।
এ পর্যন্ত আমি অনেক সাধারণ মানুষ দেখেছি, তারা এ ধরনের অনেক উদ্ভট শাইখ বা পিরদের প্রশংসা করে বেড়ায়। গর্বের সাথে তারা তাদের পিরদের ব্যাপারে বলে বেড়ায়, তিনি তো বলতে গেলে রাতভর ঘুমানই না। দিনভর রোজা রাখেন। স্ত্রীকে যেন চেনেনই না। দুনিয়ার কোনো স্বাদ-আস্বাদন তিনি চেখেও দেখেন না। তার শরীর শীর্ণ হয়ে গেছে। হাড় বাঁকা হয়ে গেছে। এখন তাকে বসেই নামাজ পড়তে হয়। নিশ্চয়ই তিনি সে সকল আলেমের চেয়ে অনেক উত্তম এবং বেশি বুজুর্গ, যারা সাধারণভাবে পানাহার করেন এবং বৈধভাবে দুনিয়া উপভোগ করেন!
আহা, এই হলো তাদের ধারণা! এটার কারণ তাদের মূর্খতা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। অজ্ঞতা তাই সকল ক্ষেত্রেই অন্ধকার এবং পরিত্যাজ্য।
অথচ তাদের যদি দ্বীনের জ্ঞান ও বুঝ-বুদ্ধি থাকত, তাহলে তারা বুঝত, দুনিয়ার সকল খাদ্য-খাবার যদি একটিমাত্র লোকমাতে রূপান্তরিত করা হতো এবং তা একজন প্রাজ্ঞ আলেম ভক্ষণ করতেন, তবুও তা তার একটিমাত্র ফতোয়ার সমপরিমাণ মূল্য হতো না। কারণ, তিনি আল্লাহর দ্বীনের বুঝ রাখেন, মানুষকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করেন, আল্লাহর পথে পথ প্রদর্শন করেন। তার একটিমাত্র সঠিক ফতোয়া একজন মূর্খ আবেদ ব্যক্তির সারাজীবনের সকল আমল ও ইবাদতের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। ইলম যদি না থাকে আর সারা দুনিয়া যদি আবেদ দিয়ে ভরে যায়, তারা সবাই হবে ভ্রষ্ট ও বিপথগামী।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
فقيه واحد، أشد على إبليس من ألف عابد. একজন ফকিহ ইবলিসের ওপর হাজার আবেদের চেয়েও বেশি ভারি। ২৮
আমার এসকল কথা পড়ে পাঠক আবার ধারণা করে বসবেন না যে, আমি আমলহীন কোনো আলেমের প্রশংসা করছি। আমি সে সকল আলেমের প্রশংসাই করি, যারা তাদের ইলম অনুযায়ী আমল করেন এবং নিজেদের নফস ও অবস্থার জন্য কল্যাণকর বিষয়ে খবর রাখেন।
কারণ, আলেমদের মধ্যেও অনেকে নিজের কঠোর ও দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনযাপনের মধ্যে নিজের কল্যাণ দেখেছেন। যেমন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.।
আবার কেউ নিজের আভিজাত্য ও প্রাচুর্যের মধ্যে জীবনযাপনকে ভালো মনে করেছেন। এগুলো তাদের তাকওয়া দ্বীনদারি ইলম ও ফিকহি প্রাজ্ঞতার মধ্যে সামান্যতম বিঘ্নতা সৃষ্টি করেনি। যেমন হজরত সুফিয়ান সাওরি, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আবু হানিফা রহ. এবং আরও অনেকে।
মূলকথা, কোনো মানুষের জন্য উচিত নয় যে, সে এমন পথ অবলম্বন করবে, যার কারণে অন্যজন তার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে যায় এবং সে তার চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। আমার জানামতে, প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজের কল্যাণের দিকটি বুঝতে পারেন। সকলের মেজাজ ও শারীরিরিক অবস্থাও একরকম নয়। সুতরাং কারও জীবনযাপন অভিজাত ও সচ্ছল হয়েও শরিয়তের বাইরে না গেলে নিন্দার কিছু নেই।
হজরত রাবেয়া বসরি রহ. ২৯ বলেন, কেউ যদি মনে করে ফালুদা খাওয়ার মধ্যে তার অন্তরের তৃপ্তি ও কল্যাণ নিহিত, তাহলে তার ফালুদা খাওয়াই উচিত।
কিন্তু হে পাঠক, তুমি কিছুতেই লোক দেখানো সুফি হতে যেয়ো না। বৈধ পন্থায় জীবনকে উপভোগ করাতে কোনো অবুজুর্গি নেই। তাতে তাকওয়ার কোনো ঘাটতি নেই। আমি কত অভিজাতকে দেখেছি, সে মূলত বিলাস-ব্যসনের ভুক্তভোগী নয়, তবে এটা তার পরিবেশ, শরীর ও মানসিক চাহিদা। এটিই তার স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য শান্তিদায়ক।
সকল শরীরই কৃচ্ছতা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। সকল পাকস্থলিই দীর্ঘ অনাহার সইতে পারে না। কিছু নফসকে তার বৈধ উপভোগ্যতা না দিলেই বরং বিপত্তি দেখা দেয়। ভীষণ কষ্ট হয়তো তাকে কুফরি ও অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ সময় সে যদি তার নিজের ওপর সহজ ও সদয় না হয়, তবে সে অবশ্যই সহজতাকে বর্জন করল, দ্বীনের ক্ষেত্রে যার সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ চান; কঠিন চান না।
প্রিয় পাঠক, এই বিষয়ে আলোচনা এত ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, আমি যদি এর পক্ষে সকল প্রমাণ ও হাদিস বর্ণনা করতে যাই, তবে বিষয়টি অনেক দীর্ঘ হয়ে পড়বে। কিন্তু সকল প্রমাণের কথা চিন্তা না করে তাৎক্ষণিকভাবে হৃদয়ের মধ্যে যা উদয় হয়েছে, তা-ই এখানে লিখে রাখলাম। আল্লাহই আমাদের সকল কল্যাণের মালিক।
টিকাঃ
২০. হাদিসটি ইবনে মাজা রহ. তার ‘আয-যুহুদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- ২/৪১১১। মুসনাদে আহমদ: ১/৩২৯/৩০৪৮। হাদিসটি সহিহ। ইমাম মুসলিম রহ. তার ‘আয-যুহুদ’ গ্রন্থে হজরত জাবের রা. থেকে এটি উল্লেখ করেছেন-৪/২/২২৭২।
২১. পুরো নাম: লাইছ ইবনে সাদ ইবনে আবদুর রহমান রহ.। তিনি ছিলেন ইমাম এবং হাফেজে হাদিস। খুবই বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন মিসরের ফহিক ও মুহাদ্দিস এবং ধর্মীয় নেতা। মিসরের গভর্নর, কাজি, প্রশাসক- সকলেই তার নির্দেশের অধীন ছিলেন। সকলেই তার মত ও পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতেন। তিনি বছরে বিশ হাজার দিনারের বেশি উপার্জন করতেন। কিন্তু সব দান করে দিতেন। তাই তার ওপর জাকাত ফরজ হতো না। তিনি ১৫৭ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। [সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ৮/১৩৬-১৬৩, তবাকাতে ইবনে সাদ: ৭/৫১৭]
২২. তার পুরো নাম: সুফিয়ান ইবনে সাইদ ইবনে মাসরুক ইবনে হাবিব... ইবেন ছাওর আল কুফি। তিনি ছিলেন শাইখুল ইসলাম। ইমাম এবং হাফেজে হাদিস। তার সময়ের আলেমদের নেতা। ফকিহ। আস্থাবান মুহাদ্দিস। আবেদ। তার ইলমে উম্মাহ বহুভাবে উপকৃত হয়েছে। তার এক বিখ্যাত বাণী ছিল এমন- إِنَّ هَؤُلَاءِ الْمُلُوْكَ قَدْ تَرَكُوْا لَكُمُ الْآخِرَةَ ، فَاتْرُكُوْا لَهُمُ الدُّنْيَا - এই সকল রাজা-বাদশা তোমাদের জন্য আখেরাতকে ছেড়ে দিয়েছে। সুতরাং তোমরা তাদের জন্য দুনিয়া ছেড়ে দাও। তিনি ১৭১ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। [সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ৭/২২৯-২৭৯ এবং তবকাতু ইবনি সা'দ : ৭/৫১৭]
২৩. এই কথা বলে কোরআনের এই আয়াতের দিকে ইশারা করা হয়েছে- (قَالَ إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أُنْكِحَكَ إِحْدَى ابْنَتَيَّ هَاتَيْنِ عَلَى أَنْ تَأْجُرَنِي ثَمَانِيَ حِجَجٍ فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَشْرًا فَمِنْ عِنْدِكَ)
২৪. ইমাম বোখারি রহ. 'আন-নিকাহ' অধ্যায়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেন- ৯/৫০৬৯।
২৫. সুনানে আবু দাউদ: ৩/১৩৬৯। মুসনাদে আহমদ: ৬/২৬৮। বিশুদ্ধ হাদিস। এটি হাদিসের একটি অংশ। পুরো হাদিসটি এমন- عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ إِلَى عُثْمَانَ بْنِ مَظْعُونٍ فَجَاءَهُ فَقَالَ يَا عُثْمَانُ أَرَغِبْتَ عَنْ سُنَّتِي قَالَ لَا وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَلَكِنْ سُنَّتَكَ أَطْلُبُ قَالَ فَإِنِّي أَنَامُ وَأُصَلِّي وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَنْكِحُ النِّسَاءَ فَاتَّقِ اللَّهَ يَا عُثْمَانُ فَإِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِضَيْفِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَصُمْ وَأَفْطِرْ وَصَلَّ وَنَمْ.
২৬. হাদিসের বিবরণটি এমন- إن بنى إسرائيل شددوا فشدد الله عليهم। ইবনে আবি হাতেম রহ. হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে মারফু হিসেবে এটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়া ইবনে কাসির রহ. তার তাফসিরে এটি বর্ণনা করেছেন- ১/১০৮। তিনি বলেন, এটির সনদ সহিহ। আরও বর্ণিত হয়েছে 'কাশফুল খাফা' গ্রন্থে-২/৯। এছাড়া আরও অনেকেই এটা বর্ণনা করেছেন।
২৭. পূর্ণ হাদিসটা এমন-
الْمِقْدَامَ بْنَ مَعْدِ يَكَرِبَ يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ حَسْبُ الْآدَبِيَّ لُقَيْمَاتُ يُقِمْنَ صُلْبَهُ فَإِنْ غَلَبَتْ الْآدَمِيَّ نَفْسُهُ فَثُلُثٌ لِلطَّعَامِ وَثُلُثُ لِلشَّرَابِ وَثُلُثُ لِلنَّفْسِ. ইবনে মাজা: ১০/৩৩৪০, পৃষ্ঠা: ১০৫- মাকতাবা শামেলা।
২৮. • ইবনে মাজা: ১/২১৮, পৃ:২৫৮- মা.শামেলা। অবশ্য এই বর্ণনায় হাদিসটি রয়েছে এমন-
فَقِيهُ وَاحِدٌ أَشَدُّ عَلَى الشَّيْطَانِ مِنْ أَلْفِ عَابِدٍ.
ইমাম তিরিমিজি রহ, হাদিসটি 'কিতাবুল ইলম'-এ বর্ণনা করেছেন। ইমাম গাজালি রহ.ও তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন'-এ হজরত আবু হুরাইরা রা.-এর সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন। তবে হজরত ইরাকি রহ. বলেন, এই সনদটি বিশুদ্ধ নয়। অন্য সনদে ঠিক আছে।
২৯. পুরো নাম: উম্মু আমর রাবিয়া বিনতে ইসমাইল আল-বসরিয়া। তিনি হলেন বিখ্যাত আবেদা জাহেদা মুত্তাকিয়া। ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে তার বহু খবর প্রসিদ্ধ। তিনি ১৩৫ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন।
📄 মৃত্যুর পর আত্মার প্রত্যাবর্তন
সকলেই প্রাণের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। অথচ এর প্রকৃতি ও অবস্থান নিয়ে এক রহস্যময় সংকটের মধ্যে রয়েছে সকলেই। যদিও এর প্রকৃতি সম্পর্কে না জানলেও তার অবস্থান নিয়ে কোনো অসুবিধায় পড়তে হয় না। কারণ, এটা নিশ্চিত যে, সেটা আছে। শরীরের যেখানেই হোক, যেভাবেই হোক, আছে।
কিন্তু ঝামেলা বাঁধে মানুষের মৃত্যুর পর আত্মার অবস্থান নিয়ে। আহলে হকের মাজহাব হলো, মৃত্যুর পরও এটি বিদ্যমান থাকে এবং তখন তা হয়তো আরামে থাকে কিংবা আজাবে আক্রান্ত হয়। শহিদদের ব্যাপারে হাদিসে এসেছে, তাদের আত্মা জান্নাতের সবুজ পাখিদের দেহে অবস্থান করে এবং জান্নাতের গাছে গাছে আনন্দের সাথে উড়ে বেড়ায়।
আত্মাদের আনন্দ উপভোগের ক্ষেত্রে হাদিসের এই বাহ্যিকতা ধরে কোনো কোনো মূর্খ ব্যক্তি বলে বসেন, মৃত ব্যক্তিরা তাহলে কবরে খায় এবং সম্ভোগও করে।
কিন্তু সঠিক কথা হলো, মানুষের মৃত্যুর পর আত্মা তার শরীর থেকে বের হয়ে বেহেশতের উচ্চতম স্থান বা অনন্ত কয়েদ-খানা জাহান্নামে অবস্থান করতে থাকে। কিয়ামত পর্যন্ত সেখানেই তারা অবস্থান করবে। যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, আত্মা তখন আবার এক নতুন শরীরের সাথে এসে মিশবে; যাতে আত্মা তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ নিয়ামত বা আজাব ভোগ করতে সক্ষম হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা - في حواصل طير خضر [সবুজ পাখির আকৃতির মধ্যে থাকবে] প্রমাণ করে, আত্মা কোনো শরীর বা মাধ্যম ব্যতীত স্বাদ আস্বাদন করতে পারে না।
তবে এই স্বাদ আস্বাদন হলো খাবার ও পানীয়ের। নতুবা ইলম বা স্মরণ কোনো মাধ্যম বা উপায় ছাড়া শরীরহীন আত্মা নিজেই ধারণ করতে সক্ষম।
আমার এ নিয়ে আলোচনা করার কারণ হলো, আমি কিছু মানুষকে মৃত্যুর ভয়ে অধিক ভীত হয়ে পড়তে দেখি। আবার কিছু মানুষকে দেখি মৃত্যুর সময় আত্মার একেবারে ধ্বংস বা নিঃশেষ হওয়ার বিশ্বাসে বিশ্বাসী হতে। তাদের মাঝে একটি হাহাকার কাজ করে যে, হায়, মৃত্যুতে সব শেষ হয়ে যাবে!
আমি তাদেরকে অভয় দিয়ে বলি, তুমি যদি ইসলামি শরিয়তে বিশ্বাসী হও, তবে তো তুমি তোমার অবস্থা জানোই। মৃত্যুপরবর্তী আত্মার জীবন অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু তুমি যদি শরিয়তের খবর সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করো, তবে তো তোমার সামনে আগে শরিয়তের সত্যতা নিয়ে কথা বলতে হবে। সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু যারা বিশ্বাসী, তাদের কোনো ব্যক্তিকে আমি যখন সম্বোধন করে বলি, বলো, মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে তোমার কি কোনো সন্দেহ আছে?
উত্তর আসে, না, আমার নিকট সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
আমি বলি, তাহলে মৃত্যুতে তোমার চিন্তা কী! তুমি বরং দুনিয়াতে তোমার ঈমানকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করো। তাকওয়া অবলম্বন করো। এটা যদি করতে পারো, তবে তুমি মৃত্যুর সময় থেকে প্রশান্তির সুসংবাদ গ্রহণ করো। মৃত্যুতে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। বেশির থেকে বেশি—আরও অধিক আমলের সুযোগ হারাবে, এই যা!
হে নফস! জেনে রেখো, মৃত্যুর পর তুমি তোমার দুনিয়ার আমল ও মর্যাদার অনুপাতে আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ পাবে। তাই আর দেরি কেন! আমলের ডানায় ভর করে তুমি তোমার মর্যাদার শিখরে আরোহণে ব্যস্ত হও। নিজের খেয়াল-খুশি থেকে সতর্ক হও। আল্লাহর সাথে শিরক করা থেকে বিরত থাকো। আল্লাহই সকল কিছুর তাওফিকদাতা।
টিকাঃ
৩০. সহিহ মুসলিম: ৩/১২১/১৫০২, ১৫১৩। সুনানে আবু দাউদ: ৩/৫২০। সুনানে তিরমিজি: ৫/৩০১১। মুসনাদে আহমদ: ১/২৬৬/২৩৮৮। আবু ইসা বলেন, এটি হাসান সহিহ হাদিস। তবে বিভিন্ন বর্ণনায় শব্দের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। পূর্ণ হাদিসটি এমন-
عَنْ ابْنِ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنَّ أَرْوَاحَ الشُّهَدَاءِ فِي طَيْرٍ خُضْرٍ تَعْلُقُ مِنْ ثَمَرِ الْجَنَّةِ أَوْ شَجَرِ الْجَنَّةِ.
📄 আলেমের হতভম্বতা
একদিন মজলিসে আলোচনার এক পর্যায়ে আমি বলে বসলাম, لو أن الجبال حملت ما حملت لعجزت. আমি যা বহন করছি পাহাড়কে যদি তা বহন করতে হতো, তবে সে পেরে উঠত না।
মজলিস থেকে ফিরে গৃহে যখন নিরিবিলি হলাম, হঠাৎ আমার নফস আমাকে ডেকে বলল, এ কথা তুমি কীভাবে বললে? মানুষ হয়তো মাঝেমধ্যে সন্দেহ করে যে, তোমার চিন্তা-ভাবনা ভিন্ন রকম। কিন্তু তুমি তো তোমার নিজেকে ও পরিবার নিয়ে বহাল তবিয়তেই আছ। জীবনযাপনের যে দায়িত্ব ও কষ্ট তুমি কখনো পাও—এটা তো সকল মানুষই বহন করে। তবে আর তোমার এই অভিযোগের কারণ বা যৌক্তিকতা কোথায়? এ কথা তুমি কেন বললে?
আমি তাকে উত্তরে বললাম, যেই মানসিক চাপ ও কষ্ট আমি বহন করে চলেছি, মাঝেমধ্যে সেটা বইতে অক্ষম হয়ে পড়ি বলেই কথাটি মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। এটি আমি কোনো অভিযোগ বা অনুযোগের ভিত্তিতে বলিনি। নিজের একটু আরামের জন্য দীর্ঘশ্বাস হিসেবে বলেছি। আমার পূর্বেও তো অনেক সাহাবি ও তাবেয়ি কখনো কখনো বলে উঠেছেন, ليتنا لم تخلق. হায়, আমাদের যদি সৃষ্টিই না করা হতো!
তাদের এ কথা বলার কারণ কী? তারা এটা বলেছেন জীবনের ভার বইতে অক্ষম হয়েই।
অনেকেই জানে না, মানুষকে পাগল করে ফেলানোর মতো চাপ কী? তার জন্য সবচেয়ে কঠিনতম কাজ কী? কেউ যদি ধারণা করে যে, মানুষের বিশ্বাসগত চাপ ও আনুগত্য খুবই সহজ তবে সে এর কিছুই জানে না।
তোমার কী মত? কেউ যদি ধারণা করে, মানুষের জন্য কঠিন কাজ হলো ভীষণ ঠান্ডায় পানি দিয়ে অজু করা, মসজিদে গিয়ে নামাজে দাঁড়ানো, রোজা পালন করা, জাকাত আদায় করা! আহা, তুমি যদি জানতে, এ সবই হলো সবচেয়ে সহজতম কাজ!
কষ্টের কাজ তো সেটা, যা পাহাড়ও বহন করতে অক্ষম। আহা, যখন এমন অনেক 'ভাগ্যের' বিষয় সংঘটিত হতে দেখি, বোধ-বুদ্ধি যেগুলোকে বুঝতে পারে না, তখন জ্ঞান-বুদ্ধিকে আনুগত্যের খাতিরে সেই 'ভাগ্য-নির্ধারিত' বিষয়গুলো মানতে বাধ্য করি। বিবেকের ওপর এই চাপ প্রয়োগই সবচেয়ে কঠিনতম কাজ।
অহরহ এমন কত বিষয় ঘটে চলেছে, জ্ঞান-বুদ্ধি যার অর্থ বা রহস্য উদঘাটনে অক্ষম। যেমন, নিষ্পাপ শিশুদের অসহ্য কষ্ট-কাতর আর্তনাদ, বিকলাঙ্গ ও দুরারোগ্য যন্ত্রণা-কাতর অসহায় মানুষের করুণ চাহনি এবং অবলা পশুদের জবাই- তবুও বিশ্বাস করি যে, এগুলোই এদের ভাগ্যলিপি এবং এসবের আদেশদাতা হলেন আররাহমানুর রাহীম বা শ্রেষ্ঠ করুণাকারী।
এগুলোর সামান্য চিন্তাও বুদ্ধিকে হতভম্ব করে তোলে। অদেখা ঝড়ে এলোমেলো হয়ে পড়ে মস্তিষ্কের প্রতিটি অণু। আহা! বন্ধু, এটাই তো যুক্তি বা বুদ্ধির আত্মসমর্পণের পরীক্ষা- কোনো অভিযোগহীন মেনে নেওয়ার সময়।
তবে প্রশ্ন হলো, শারীরিক ও চিন্তাগত আনুগত্যের এই কষ্টের মাঝে কতটা পার্থক্য?
এটি যদি বিস্তারিত আলোচনা করতে যাই, তবে কথা অনেক দীর্ঘ হয়ে পড়বে। এখানে সেদিকে যাওয়া প্রয়োজন মনে করি না। অন্যের কথা উল্লেখ না করে আমারই কিছু বিষয় উল্লেখ করছি। আশা করি, এর দ্বারা বিষয়টা কিঞ্চিৎ হলেও অনুধাবন করা যাবে।
আমি এমন এক বান্দা, শৈশব থেকেই যার নিকট ইলমকে প্রিয় করে তোলা হয়েছে। তাই আমি আমার শৈশব থেকেই ইলমের সাধনায় নিমগ্ন থেকেছি। অধিকন্তু আমার আকর্ষণের বিষয় শুধু একটি শাস্ত্র নয়; ইলমের প্রতিটি শাখায় আমার আগ্রহ ও আকর্ষণ রয়েছে। এবং এগুলোর কোনো শাখাতেই ভাসাভাসা ইলম অর্জনের ওপর আমি সন্তুষ্ট নই। আমি বরং ইলমের প্রতিটি শাখার সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করতে চেয়েছি। কিন্তু সময় বড় সংকীর্ণ। জীবন বড় সংক্ষিপ্ত। আমার ইলমের সাধনা তো উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু সময়ের কারণে অক্ষমতা এসেছে। তাই এখনো কিছু কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের গভীরতম অনবগতি নিয়ে আমার আফসোস রয়ে গেছে।
এরপর ইলম আমাকে আমার মাবুদের পরিচয় জানিয়েছে। তাঁর দাসত্বের প্রতি ধাবিত ও উৎসাহিত করেছে। তাঁর অস্তিত্বের হাজারো দলিল-প্রমাণ আমাকে তাঁর দিকেই টেনেছে। আমি তাঁর কুদরতের সামনে নতজানু হয়েছি। তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের মাঝে আমি তাঁকেই খুঁজে পেয়েছি। তাঁর গুণাবলির কার্যকারিতা আমি চিনেছি। আমার দূরদর্শী অভিজ্ঞতা যতই তাঁর দয়া ও অভিভাবকত্বের পরিচয় পেয়েছে, ততই তাঁর মুহাব্বত ও ভালোবাসার দিকে টেনে নিয়েছে। নির্জন-নীরব একান্ত ইবাদতের প্রতি আমাকে আকর্ষণ করেছে। এভাবে তাঁর জিকির হয়ে উঠেছে আমার কাছে প্রাপ্তির চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিটি অবকাশ ও নির্জনতার ইবাদত ও জিকির দুনিয়ার সকল মিষ্টতা থেকেও আমার নিকট বেশি আস্বাদনের হয়ে উঠেছে।
কিন্তু যখনই আমি ইলমের মগ্নতা ছেড়ে অন্য কিছুতে মনোনিবেশের ইচ্ছা করেছি, ইলম আমার আঁচল ধরে চিৎকার করে বলেছে, যাচ্ছ কোথায়? তুমি কি আমাকে ছেড়ে যেতে চাও? অথচ তুমি আমার মাধ্যমেই পেয়েছ তোমার রবের পরিচয়!
আমি তাকে বললাম, তুমি ছিলে সামান্য দলিল মাত্র। স্রষ্টাকে চেনার সামান্য মাধ্যম। এখন যখন উদ্দিষ্ট মাবুদকে পেয়ে গিয়েছি, দলিলের আর কী প্রয়োজন?
ইলম আমাকে কটাক্ষ করে বলেছে, আহা, এসব বলে না! এখনো যখন তুমি আরও কিছু ইলম অর্জন করো, তুমি তোমার মাহবুবের পরিচয় আরও বেশি করেই জানতে পারো। এবং জানতে পারো কীভাবে তাঁর আরও নিকটবর্তী হওয়া যায়। প্রতিদিনের এই অবস্থাটা প্রমাণ করে, ইলম থেকে দূরে থাকার অর্থ, তোমার প্রভুর পরিচয় লাভের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। ইলমহীন কিছুদিন অবস্থান করলেই তুমি জানতে পারবে, কী ক্ষতির মধ্যে তুমি রয়েছ। তুমি কি তোমার রবকে তাঁর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শোনোনি?-
رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا ( وَقُل رَّبِّ زدْنِي عِلْمًا )
আপনি বলুন, হে আমার রব, আপনি আমার ইলম আরও বৃদ্ধি করে দিন। [সুরা তোয়াহা: ১১৪]
এরপর ইলম আমাকে বলে, তুমি কি তাঁর নৈকট্য প্রত্যাশী নও? তুমি কি তোমার রবের নৈকট্য প্রত্যাশা করো না? তাহলে এবার তুমি তাঁর গাফেল বান্দাদের তাঁর দিকে আহ্বানে মশগুল হও। সকল নবী আলাইহিমুস সালাম এগুলোই করেছেন। তুমি কি জানো না, নিজেদের নির্জন ইবাদত-বন্দেগির চেয়ে তাঁরা সব সময় মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান ও শিক্ষা-দীক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন? তাদের মাঝেই থেকেছেন। তাদের সাথেই চলাফেরা করেছেন। যেহেতু তাঁরা জানতেন, এগুলোই তাদের প্রতিপালকের নিকট অধিক পছন্দনীয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি হজরত আলি রা.-কে বলেননি?-
لأن يهدي الله بك رجلاً، خير لك من حمر النعم. (হে আলি,) তোমার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা যদি একজন মানুষকেও হেদায়েত দান করেন, তবে এটা তোমার জন্য মূল্যবান শত লাল উট প্রাপ্তি থেকেও লাভজনক। ৩১
ইলমের এসকল প্রমাণ ও বক্তব্যে আমার মাথা ঘুরে গেল। তার কথাগুলোর সত্যতা স্বীকার করা ছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না। কিন্তু যখন বাস্তবে আমি মানুষদের সাথে মেলামেশা ও ওঠাবসার জীবনযাপনের দিকে ধাবিত হলাম, কিছুদিনের মধ্যেই আমার লক্ষ্য ইচ্ছা ও মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল। কারণ, আমি আমার সকল ইচ্ছাকে তাদের কল্যাণের দিকে নিয়োগ করেছিলাম। আমার সকল সময় তাদের জন্যই ব্যয় হচ্ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি দুর্বল হয়ে পড়তে লাগলাম। কিছু কিছু সময় আমি এমন হতবুদ্ধি ও দ্বিধান্বিত অবস্থার মুখোমুখি হতাম যে, বুঝতে পারতাম না, আমি আমার কোন পায়ের ওপর ভর দেবো।
এরই মাঝে হঠাৎ একদিন আমার ইলম আমাকে চিৎকার করে ডেকে বলল, বয়স তো হলো, আল্লাহর নাম নিয়ে এবার বিয়ে করো। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তান অন্বেষণ ও প্রতিপালনের জন্য অর্থ উপার্জনে নেমে পড়ো।
কথা তো সত্য। বিয়ে হলো। স্ত্রী-সন্তান হলো। উপার্জন তো দরকার। কিন্তু অবস্থার দাবি অনুযায়ী যখন উপার্জনের দিকে মনোযোগ দিলাম, আমি যেন দিশেহারা হয়ে উঠলাম। দুনিয়া যেন আমার দুধ দোহনের সময়ই তার সকল ওলান শুকিয়ে নিল। আমার মুখের সমুখে উপার্জনের সকল দরজা সরব শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। আমি তো কিছুই পারি না। ইলম অর্জনের নিমগ্নতা আমাকে অর্থকড়ি বৈষয়িক জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা থেকে বঞ্চিত রেখেছে। ইলম ছাড়া তো আমার কোনো পুঁজি নেই।
আমি আমার চারপাশের সকল দুনিয়াদার খলিফা শাসক ও ধনবান ব্যক্তিদের দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, তারা তো গ্রহীতার দ্বীনের বিনিময় ছাড়া কিছুই প্রদান করে না। নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে আপস করা ছাড়া গ্রহণকারীগণ তাদের থেকে কিছুই প্রাপ্ত হয় না। তাদের থেকে কিছু পেতে হলে দ্বীনের ক্ষতি করা ছাড়া কিছুই অর্জন করা সম্ভব হয় না।
হায়, আরও ভয়াবহ কথা হলো, কিছু কিছু আলেম তাদের দরবারে নিজেদের দ্বীন-দুনিয়া ও মর্যাদাবোধ সকল কিছু বিকিয়ে দিয়েও কাঙ্ক্ষিত দুনিয়াটুকুও প্রাপ্ত হয় না।
আমার ক্রোধ ও ক্ষুব্ধতা বলে উঠল, এসব ছিন্ন করে নিজের পথে অটল থাকো।
শরিয়ত বলে বসল, সক্ষম কোনো ব্যক্তি যদি তার ক্ষমতা ও যোগ্যতাকে অপব্যয় করে, তবে এটি তার গোনাহের জন্যে যথেষ্ট।
সংকল্প এসে বলল, নিজের কাজে একাকী এগিয়ে যাও। ইলমে নিমগ্ন হও। নিজেকে বিকিয়ে দিয়ো না।
এবার নফস বলে উঠল, তাহলে তোমার পরিবার ও অধীনস্থদের কী হবে?
অনেক চিন্তা-ভাবনা করলাম। কিন্তু বাড়তি উপার্জনের জন্য কিছুই করলাম না। অথচ এদিকে পরিবার রয়েছে। মানুষদের সাথে মেলামেশাও রয়েছে। কারণ, একাকী নির্জনবাস তো গ্রহণ করিনি। পরিণামে জীবনযাপনের অনেক খরচ কমিয়ে দিতে হলো। অথচ এতদিন আমি স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপন করে আসছিলাম। দুনিয়ার আস্বাদন করেছি। মেজাজ ও মানসিকতায় একটি সাধারণ পরিপাট্য আভিজাত্য ও সূক্ষ্ম ভব্যতা এসে ভর করেছে। কিন্তু এখন আমার পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্য-খাবারের ধরন নিম্নমানে রূপান্তরিত হলো। কারণ, এর চেয়ে প্রশস্তভাবে চলার আর্থিক সামর্থ্য আমার ছিল না।
পছন্দনীয় অভ্যাস ও জীবনযাপনের রুচিশীল পদ্ধতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে আমার মেজাজে রুক্ষতা এসে গেল। শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে অনেক আবশ্যক কাজ করতেও অক্ষম হয়ে পড়লাম। জীবন আমাকে এক বিভীষিকাময় অবস্থায় ফেলে দিলো। আর এটা তো জানা কথা, অতীতে কোনো ধরনের কষ্ট-ক্লেশ ছাড়াই যার সুখময় খাদ্য-খাবারের সংস্থান হয়েছে, সে যদি হঠাৎ এই রুক্ষ ও স্বল্প খাবারের কবলে পতিত হয়, তবে তার জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
আমি মনে মনে ভাবলাম, তবে আমি এ অবস্থায় কী করতে পারি? এখন কী করা উচিত আমার?
প্রায় আমি নির্জনে নিমগ্ন হয়ে ভাবতে থাকি। আমার দুরাবস্থা দেখে আপনাআপনিই যেন আমার চোখে জল এসে যায়।
সাধক আলেমদের জীবনযাপন করতে চাই; অথচ আমার শরীর আর ইলমি সাধনায় মগ্ন হওয়ার মতো অবস্থায় নেই। সুফিদের জীবন ধারণ করব কি? কিন্তু আমার শরীর যে জুহুদ বা কৃচ্ছতা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না!
এদিকে বন্ধু বা সাধারণ মানুষদের সাথে মেলামেশা আমার মনোযোগ ও স্থিতিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। প্রিয়তমের কান্তিমান অবয়ব আমার হৃদয় থেকে উধাও হতে থাকে। জং ও ক্লেশে ঝাপসা হয়ে আসে হৃদয়ের আয়না। অথচ সম্প্রীতি টিকে থাকার জন্য ভালোবাসার চারাকে উদার মাটির সবুজ বুকে কোমলতার সাথে যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। হৃদয়ের আলমারিতে সুরভিত কথামালায় তাকে সিঞ্চিত ও সজিব রাখতে হয়। কিন্তু আমার মন ধীরে ধীরে শুধু রুক্ষই হতে থাকে।
এই অবস্থায় আমি যদি উপার্জনকেই প্রাধান্য দিই তবে সেটা আমার সাধ্যের বাইরে। আর যদি ইলমের পুঁজি নিয়ে দুনিয়াদার বিত্তবানদের নিকট উপস্থিত হই—যদিও আমার মর্যাদাবোধ, সচেতন স্বভাব এবং নিজের দ্বীনের প্রতি সতর্কতা এটাকে কিছুতেই সমর্থন করে না—আমার এই স্বভাব ও সতর্কতার কারণে তাদের সাথে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিন অটুট থাকবে না।
মানুষদের সাথে অবস্থানে কষ্টই শুধু বাড়তে থাকবে।
অথচ এদিকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সক্ষমতাও আর অবশিষ্ট নেই। ইলম, আমল ও মুহাব্বতের কোনো মর্যাদাও হলো না অর্জিত। আমি যখন আমার অবস্থার দিকে তাকাই, নিচের কবিতাটিতে কবি যে অবস্থার কথা বলেছেন, আমার অবস্থাও ঠিক তেমনই দেখতে পাই। কবি বলেন,
ألقاه في اليم مكتوفاً وقال له ... إياك إياك أن تبتل بالماء.
হাত-পা বেঁধে তাকে ফেলে দিলো সাগরের মাঝে। এরপর বলল, দেখো, তুমি কিন্তু সতর্ক থেকো, পানিতে যেন আবার না ভিজে যাও!
আমি আমার বিষয় নিয়ে প্রায় চিন্তিত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। জীবনের কর্ম নিয়ে হিসাব-নিকাশ করি। কষ্টে-দুঃখে কখনো কখনো দিশেহারা অবস্থা হয়ে যায়। আমার নিদারুণ নির্জনতায় প্রায় আমি এক সাধারণ ব্যক্তি থেকে শোনা কবিতার পঙ্ক্তি দুটি আবৃত্তি করি। তিনি যেন আমারই অবস্থা কত যথার্থভাবে তুলে ধরেছেন!
واحسرتي كم أداري فيك تعثيري . . مثل الأسير بلا حبل ولا سيري ما حيلتي في الهوى قد ضاع تدبيري . . لما شكلت جناحي قلت لي طيري
আফসোস, আমি আর কত তোমার ব্যাপারে প্রতারিত হব। রশি-রশদ ও অসহায় এক বন্দির মতো অপদস্থতার সাথে রয়েছি পড়ে।
আমার সকল কৌশল উধাও হয়েছে। প্রচেষ্টা হয়েছে ব্যর্থ। তুমি আমার উড়ে চলার সকল ডানা কেটে দিয়ে বলছ, এবার যাও উড়ে।
শরীর ও অর্থের এমন অসহ্য কষ্টে নিপতিত হয়েও আমি অনুভব করেছি, এগুলোর চেয়েও এই চিন্তাগত চাপ এবং নিঃশর্তভাবে তাকদিরকে মেনে নেওয়ার আনুগত্যই সবচেয়ে কঠিন ও দুঃসাধ্য। এর কাছে শারীরিক হাজার কষ্টও অতি তুচ্ছ। এটার আঘাত সইতে না পেরেই তো কত চিন্তাবিদ শিক্ষাবিদ পণ্ডিত নাস্তিকতার পথে পা বাড়িয়েছে, আত্মহত্যা করেছে। সন্দেহের গরল-বিষে জীবন তুলেছে বিষিয়ে।
তবুও জেনে রাখো বন্ধু, জান্নাতের বিনিময়ে দুনিয়ার হাজার কষ্টও কিছু নয়। একবার ভাবো তো জান্নাতের সেই বিশাল বিস্তৃতি এবং সতত নিয়ামতের বাহার! বিশ্বাসগত এই কষ্টটাও তাই এত বেশি।
টিকাঃ
৩১. ইমাম বোখারি রহ. এটি 'কিতাবুল জিহাদ'-এ উল্লেখ করেছেন-৬/২৯৪২, ফাতহুল বারি। ইমাম মুসলিম রহ, উল্লেখ করেছেন 'ফাজাইলুস সাহাবা' অধ্যায়ে- ৪/৩৪/১৮৭১। এটি হাদিসের শেষ অংশ। পূর্ণ হাদিসটি এমন-
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ يَوْمَ خَيْبَرَ لَأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ رَجُلًا يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ فَقَامُوا يَرْجُونَ لِذَلِكَ أَيُّهُمْ يُعْطَى فَغَدَوْا وَكُلُّهُمْ يَرْجُو أَنْ يُعْطَى فَقَالَ أَيْنَ عَلِيٌّ فَقِيلَ يَشْتَكِي عَيْنَيْهِ فَأَمَرَ فَدُعِيَ لَهُ فَبَصَقَ فِي عَيْنَيْهِ فَبَرَأَ مَكَانَهُ حَتَّى كَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ بِهِ شَيْءٌ فَقَالَ نُقَاتِلُهُمْ حَتَّى يَكُونُوا مِثْلَنَا فَقَالَ عَلَى رِسْلِكَ حَتَّى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُ عَلَيْهِمْ فَوَاللَّهِ لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ.
সহিহ বোখারি: ১০/২৭২৪, পৃষ্ঠা: ৯৪- মা. শামেলা।