📄 সচ্চলতার মর্যাদা এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি
অনেক ভেবে, আমি শয়তানের দুটি বড় ধরনের ধোঁকা ও ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেছি। যেমন,
১. শয়তান সম্পদশালীদের সম্পদের আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখে। তাদেরকে এমন সব পার্থিব ন্যায়-অন্যায় আস্বাদন ও বিলাসিতার মধ্যে ডুবিয়ে রাখে, যার কারণে তারা আখেরাত ও তার জন্য আমলের সকল চিন্তা-চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদেরকে সম্পদের মায়ায় আবদ্ধ করে তাদের আরও অর্জনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তোলে। সম্পদের প্রতি লোভ আরও বাড়াতে থাকে। এবং সম্পদের আকর্ষণ ও লোভের মাধ্যমে তাদেরকে কৃপণতার দিকেও ধাবিত করে। ফলে অনেক ধনবান মানুষ দান-সদকা তো দূরের কথা; জাকাত-ফিতরাও অনেক সময় সঠিকভাবে আদায় করে না। তখন সে ন্যায়-অন্যায় ও হালাল-হারামের কথা একেবারে ভুলে যায়। এটি শয়তানের একটি বড় ধরনের চক্রান্ত এবং শক্তিশালী কৌশল।
২. এই বিষয়ে শয়তান আরেকটি অতি সূক্ষ্ম চক্রান্ত সাজিয়ে রেখেছে। শয়তান অন্য মুমিনদেরকে ধনী ব্যক্তিদের দ্বীনি অবস্থার ভয় দেখিয়ে বলে, দেখো তো, সম্পদ আজ তাদের কোথায় নিয়ে ফেলেছে। দ্বীন থেকে কত দূরে সরে গেছে তারা!... তখন শয়তানের এই চক্রান্তে পা দিয়ে পরহেজগার মুমিন ব্যক্তিরা সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং হাতে যা রয়েছে সেগুলোও তড়িঘড়ি নিঃশেষ করে ফেলে বা দান করে দেয়। এরপর শয়তান অব্যাহতভাবে তাদেরকে আরও জুহুদ ও কৃচ্ছতা সাধনে উদ্বুদ্ধ করে। দুনিয়ার সংস্রব বর্জনের প্রতি বিভিন্ন আদেশ-উপদেশ দিতে থাকে। আয়-উপার্জনের সকল পদ্ধতি সম্পর্কেই তাকে ভয় দেখাতে থাকে।
এগুলো সব করতে থাকে দ্বীনের প্রতি কল্যাণকামিতা ও দ্বীন সংরক্ষণের নাম দিয়ে। অথচ এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে শয়তানের এক ভয়াল ও গোপন চক্রান্ত। সর্বনাশের দুষ্ট পরিকল্পনা।
শয়তান কখনো যুগের কিছু শাইখ-মাশায়েখের সুরতেও কথা বলে। অনুগ্রহপ্রার্থী তার কাছে উপদেশ নিতে এলে, উক্ত শাইখ তাকে বলে, তুমি তোমার সকল ধন-সম্পদ থেকে বের হয়ে এসো। সকল কিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে জাহেদ-দুনিয়াত্যাগীদের কাতারে এসে দাঁড়াও। তোমার ঘরে যখন আগামী দিনের সকল খাদ্য গচ্ছিত ও পরিমাপিত রয়েছে, তবে আর তোমার কিসের জুহুদ আর তাকওয়া! তাহলে তুমি কিছুতেই রিজিকদাতা আল্লাহর ওপর দৃঢ়ভাবে নির্ভরকারী নও।
এসকল কথার পেছনে কখনো কখনো কিছু অশুদ্ধ হাদিস ও ঘটনা পেশ করা হয়। অথবা এমন কিছু বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়, যেগুলো কোনো বিশেষ ব্যক্তির জন্য বিশেষ অবস্থা, হিকমত ও শিক্ষার জন্য উল্লেখিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষ সেগুলো সহ্য করতে অক্ষম।
কিন্তু অন্য অনেক মানুষ শয়তানের এই চক্রান্তে পড়ে নিজের সম্পদ বিলিয়ে দেয়। উপার্জনবিমুখ হয়ে কর্মহীন হয়ে পড়ে। পরিণামে, কিছুদিনের মধ্যেই জীবনের তাগিদে তাকে তার আশপাশের লোকজন ও বন্ধু-বান্ধবদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। অথবা রাজা-বাদশাহর দরবারে তোষামোদি বা চাটুকারিতা শুরু করতে হয়। কেননা, এভাবে ক্ষুধার্ত হয়ে বেশিদিন জুহদ ও মুজাহাদার রাস্তায় সে অটল থাকতে পারে না। কিছুদিন পরেই সে আবার তার স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি কাতর হয়ে পড়ে। তার আগের সকল চাহিদা তার মধ্যে চাঙ্গা হয়ে উঠতে থাকে। অথচ এখন তার হাত শূন্য। তাই নিজের ও পরিবারের চাহিদাগুলো পূরণ করতে গিয়ে আগের অবস্থা থেকে তাকে আরও হারাম ও নিকৃষ্টতম বিষয়ের মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়তে হয়। এভাবেই সে ধীরে ধীরে তার দ্বীন, ধর্ম ও চরিত্রের দৃঢ়তা ও সততা বিকিয়ে দেয়। দিনে দিনে সে নেমে আসে ভিক্ষুকদের কাতারে।
কিন্তু সে যদি অতীতের মহৎ ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের জীবনী এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ হাদিসগুলোর প্রতি মনোযোগ দিত, তবে সে জানতে পারত, আল্লাহর খলিল ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন অনেক সম্পদের মালিক। এমনকি তার এলাকা তার প্রাণীগুলোর ধারণক্ষমতার বাইরে ছিল। এমনিভাবে হজরত লুত আলাইহিস সালামও ছিলেন সম্পদশালী। এছাড়া আরও অনেক নবীই ছিলেন সম্পদ-প্রাচুর্যের অধিকারী। আর সুলাইমান আলাইহিস সালামের সম্পদ ও রাজত্বের কথা কেই-বা না জানে!
এভাবে অনেক সাহাবিও ছিলেন প্রচুর সম্পদের অধিকারী। হজরত উসমান গনি রা.-এর কথা কতই না প্রসিদ্ধ।
তাদের জীবনধারণের বৈশিষ্ট্য ছিল এমন—কিছু না থাকলে তারা ধৈর্যধারণ করতেন। কিন্তু প্রয়োজনমাফিক উপার্জন করতে কখনো পিছপা হতেন না। আবার সম্পদ-প্রাচুর্য এলে সেগুলো প্রকাশ করা থেকেও বিরত থাকতেন না। এটাই হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা।
হজরত আবু বকর রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়ও ব্যবসার জন্য দূর-দূরান্তে সফর করতেন। অধিকাংশ সাহাবি বাইতুল মাল থেকে প্রদত্ত সম্পদ অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। এভাবেই তারা অন্যদের দ্বারস্থ হওয়ার লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা থেকে মুক্ত থাকতেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. কখনো কোনো হাদিয়া ফিরিয়ে দিতেন না। আবার তিনি কখনো কারও কাছে কিছু চাইতেনও না।
আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও চিন্তা-ভাবনা করলাম। সাধারণ ধার্মিক ব্যক্তি এবং আলেমদের অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করলাম। আলেমদের ক্ষেত্রে যেটা হয় তা হলো, জীবনের প্রাথমিক সময়গুলো ইলম অন্বেষণে ব্যস্ত থাকায় তারা সাধারণত পার্থিব সম্পদ উপার্জন করতে সক্ষম হন না। কিন্তু একটি সময়ে যখন তাদের জীবনধারণের পার্থিব উপায়-উপকরণের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। অপমানিত হতে হয়। অপদস্থ হতে হয়। অথচ তারাই হলেন পৃথিবীতে সবচেয়ে সম্মানের উপযুক্ত।
অতীতে অবশ্য এসকল ক্ষেত্রে বাইতুল মাল থেকে বরাদ্দ সম্পদ তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। কিন্তু সে অবস্থা এখন আর নেই। এখন আহলে ইলম বা দ্বীনদারদের অন্যদের থেকে কিছু নিতে গেলে নিজের দ্বীনদারির কিছু অংশ খোয়াতে হয়। তবুও যদি উদ্দেশ্য অর্জিত হতো! কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবস্থা হলো, দ্বীনদাররা দুনিয়াদারদের কাছে ধরনা দিয়ে দিয়ে দ্বীনের তো ক্ষতি করছেই; অধিকন্তু তাদের কোনো পার্থিব উদ্দেশ্যও অর্জিত হচ্ছে না।
সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য কর্তব্য হলো, নিজের কাছে যে সম্পদ রয়েছে তার যত্ন নেওয়া। প্রয়োজনীয় সম্পদ উপার্জনের জন্য চেষ্টা ও শ্রম দেওয়া। যাতে কোনো আলেম বা ধার্মিক ব্যক্তিকে কোনো জালেমের তোষামোদ করতে না হয়। কোনো সম্পদশালী মূর্খ জাহেলের চাটুকারিতা করতে না হয়।
এক্ষেত্রে অজ্ঞ সুফিদের কথায় একদমই কান দেবে না, যারা শুধু দারিদ্র্য অবলম্বনের দিকেই আহ্বান করে এবং এটাকেই বড় কল্যাণ ও দ্বীনদারি বলে দাবি করে।
দারিদ্র্য হলো অক্ষম ব্যক্তির অসুস্থতা। অসুস্থতার ওপর ধৈর্যধারণের যে সওয়াব, দারিদ্র্যের ওপর ধৈর্যধারণের সেই একই সওয়াব। এটা স্বেচ্ছায় যেচে আনার জিনিস নয়।
তবে হ্যাঁ, খরচ কমিয়ে কৃচ্ছতা অবলম্বন করা এবং নিজের সামান্য কিছু নিয়েই নিজের মতো তৃপ্ত থাকা—এটি হারাম বা ভ্রান্তিমূলক কিছু নয়। তবে এটি হলো ভীরু দুর্বল অক্ষম জাহেদ ব্যক্তিদের কাজ।
কিন্তু যে ব্যক্তি হালালভাবে সম্পদ উপার্জন করেছে এই নিয়তে যে, তাকে যেন অন্যদের থেকে চাইতে না হয়। সে গ্রহণকারী না হয়ে যেন প্রদানকারী হয়। নিজেই বরং অন্যদেরকে দান-সদকা করবে; তাকে যেন অন্যের সদকা গ্রহণ করতে না হয়। তাহলে তার এ কাজটি হবে শ্রেষ্ঠতম কাজ—আমাদের বীর সাহসী মহান ব্যক্তিদের মতো কাজ। উচ্চ হিম্মতওয়ালা ব্যক্তির কাজ।
এতক্ষণ যা বলা হলো, সেগুলো নিয়ে যে ব্যক্তি চিন্তা করবে, সে একই সাথে একজন দ্বীনদার ব্যক্তির সম্পদ-প্রাচুর্যে মর্যাদার কথা বুঝবে—এবং বুঝতে পারবে দারিদ্র্যের লাঞ্ছনা ও ক্ষতির কথাও।
📄 অপ্রাপ্ত জিনিসের প্রতি আফসোস
আমি মহান ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের বিষয়ে অনুসন্ধান করে দেখেছি, তাদের অধিকাংশই পার্থিব সম্পদ থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে দুনিয়ার তাবৎ সম্পদ ও প্রাচুর্য গচ্ছিত হয়ে আছে খারাপ স্বভাববিশিষ্ট আকাট মূর্খ ব্যক্তিদের হাতে।
আমি কিছু জ্ঞানবান ব্যক্তিকে নিজেদের এই সম্পদহীনতা এবং মূর্খদের সম্পদ-প্রাচুর্য নিয়ে এভাবে আফসোস করতেও দেখেছি যে, এগুলো কেন তাদের প্রাপ্ত হলো না? কাউকে কাউকে তো এই আফসোসে জীবনের ওপর বিতৃষ্ণ হয়ে উঠতেও দেখেছি। দেখেছি দুঃখে-হতাশায় ভেঙে পড়তে...।
আমি এরূপ আফসোসকারীদের সম্বোধন করে বলতে চাই- এ তোমার কেমন কাণ্ড! তুমি কি তোমার আচরণ সম্পর্কে ভেবে দেখেছ? এখন এই আফসোস করাটা তোমার জন্য সকল দিক দিয়েই অনর্থক, অযৌক্তিক এবং ভ্রান্ত। কারণ-
১. তোমার যদি দুনিয়া অন্বেষণের যোগ্যতা, শক্তি, হিম্মত ও আকাঙ্ক্ষা থাকে, তাহলে তুমিও তা অর্জনে নেমে পড়ো। পরিশ্রম করো। অর্জন করো...। তাহলে আর তোমাকে এই আফসোস করতে হবে না। কিন্তু সেটা না করে শুধু বসে বসে অন্যরা যা পরিশ্রম করে অর্জন করছে, সেটা নিয়ে আফসোস করা প্রচণ্ড রকমের বোকামি ও মূর্খতা। এটা তোমার অক্ষমতা ও পরিশ্রমহীনতার চূড়ান্ত প্রকাশ।
২. তুমি জানো, দুনিয়া হলো অতিক্রম করার জায়গা; এটা স্থায়ী জীবনযাপনের কোনো জায়গা নয়। তোমার এতদিনের অর্জিত ইলম, প্রাজ্ঞতা ও অভিজ্ঞতা এটাই তো বলে। ইলমহীন যে সকল লোক এসব পার্থিব সম্পদ প্রাপ্ত হয়েছে, সেগুলো তাদের অধিকাংশের শরীর, চরিত্র ও দ্বীন-ধর্ম নষ্ট করে দিয়েছে। এগুলো জেনেও যদি তুমি দুনিয়ার অপ্রাপ্তি নিয়ে আফসোস করো, তাহলে তো তোমার আফসোস করাটা হবে এমন এক অপ্রাপ্তি নিয়ে, যা না-পাওয়াই তোমার জন্য কল্যাণকর। যার মধ্যে কল্যাণ নেই—তার অপ্রাপ্তি নিয়ে আফসোস করার শাস্তিস্বরূপ আজকের এই আফসোসের কষ্ট তোমাকে সইতে হচ্ছে।
সুতরাং হে বন্ধু, আসন্ন অনন্ত আজাব থেকে নিরাপদ থাকার যদি কোনো পথ করতে পারো, তবে ক্ষণিকের পার্থিব এই কষ্টটুকু সহ্য করে নাও না কেন!
৩. তুমি এটাও জানো, একজন মানুষ সারাজীবন যত খাদ্য-খাবার খায়, সেই তুলনায় একটি চতুষ্পদ প্রাণী বহুগুণ বেশি আহার করে। তাদের এই আহারে কোনো ধরনের ভয়-ভীতি নেই। অথচ সম্পদ ও আহার নিয়ে তোমার কত ভয়; কিন্তু পরিমাণ কত কম!
এ অবস্থায় তুমিও যদি তাদের মতো বহুধা সম্পদের অধিকারী হতে চাও, তাহলে তো তুমিও সেই মূর্খ সম্পদশালী ও চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের কাতারে পড়ে যাবে। কেননা, এই অতিরিক্ত খাদ্য-খাবার ও সম্পদ অর্জনের ধান্দাই তো তাদেরকে ইলম অর্জন করা থেকে বিরত রেখেছে। তুমি জন্তু-জানোয়ারের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছ এই ইলমের দ্বারাই; নতুবা খাবার গ্রহণের পরিমাণে তারা তোমার চেয়ে অনেক এগিয়ে।
মনে রেখো, অল্প আহার, অল্প চাহিদা এবং অল্প বিলাসই মানুষকে সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের উচ্চ শিখরে আরোহণে সাহায্য করে।
এসব জানার পরও তুমি যদি দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী সামান্য [যত বেশিই হোক, তবু সেটা সামান্যই] ভোগ্যসামগ্রিকেই প্রাধান্য দাও, তবে তো তোমার আজরদের কাহিনি জানাই আছে। [আজর মূর্তির ক্ষমতাহীনতার কথা জেনেও তা পূজা করার ওপর অটল ছিল] এই আফসোসের মাধ্যমে তুমি তোমার ইলম ও প্রজ্ঞাকে অপমান ও অপদস্থ করে তুলছ। তুমি তোমার সঠিক মত ও বিশ্বাসের দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করছ।
📄 মানুষের ভুল করার কারণ
নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়ার পেছনে মানুষের কয়েকটি কারণ রয়েছে। এগুলোর কিছু কিছু কুফরির দিকে ঠেলে দেয়। তাই এগুলোর অর্থ ও কারণ স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ, নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদনে মানুষের কয়েকটি প্রকার রয়েছে। যেমন,
১. এক প্রকার মানুষ হলো তারা, যারা আসলে জানেই না যে, বিষয়টা নিষিদ্ধ বা গোনাহের কাজ। বৈধ মনে করে করে ফেলে। এটা এক ধরনের ওজর বা প্রাথমিকভাবে ক্ষমার যোগ্য।
২. আরেক প্রকার মানুষ হলো তারা, যারা নিষিদ্ধ বিষয়কে মাকরুহ বা অপছন্দনীয় ভেবে করে ফেলে। তারা জানে না যে, এটা হারাম। সে বরং এটাকে মাকরুহ বা অপছন্দনীয় মনে করেছিল। এটাও প্রায় প্রথম প্রকারের মতো। হজরত আদম আলাইহিস সালামের 'গন্দম' খাওয়া ছিল এ ধরনের।
৩. তৃতীয় প্রকার মানুষ হলো তারা, যারা একটা নিষিদ্ধ জিনিসকে বিভিন্ন আলামত বা কারণ দেখিয়ে ব্যাখ্যা করে জায়েয মনে করে নিয়েছে। কিন্তু আসলে তার ব্যাখ্যা ছিল ভুল। যেমন হজরত আদম আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে বলা হয়, তাকে শাব্দিকভাবে গাছ খেতে নিষেধ করা হয়েছিল। তিনি তাই গাছের একটি অংশ বা ফল খেয়েছেন। মূল গাছ খাননি। কিন্তু এতে তার ব্যাখ্যা সঠিক হয়নি।
৪. চতুর্থ প্রকার মানুষ হলো তারা, যারা হারাম ও গোনাহের কথা জানে। স্পষ্টভাবেই জানে। কিন্তু প্রবৃত্তির শক্তি ও প্রভাব তাদেরকে এটা ভুলিয়ে দেয়। সুতরাং তাদের কাজটাও তারা যা জানে তার বিপরীত হয়। এ কারণেই চোরের চুরি করার সময় হাত কাটার দণ্ডের কথা মনে থাকে না। সাময়িক প্রাপ্তি তাকে এর পরিণাম ও নিষেধের কথা ভুলিয়ে দেয়। এভাবে জিনায় লিপ্ত ব্যক্তির এর লাঞ্ছনা ও দণ্ডের কথা স্মরণ থাকে না। সুতরাং তার কাজও এমন হয়, যেন সে জানে না; অথচ সে জানে। কিন্তু প্রবৃত্তির তাড়না তাকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এটা স্পষ্ট পাপ।
৫. পঞ্চম প্রকার ব্যক্তিরা নিষেধ ও পরিণামের কথা জানে, স্মরণ রাখে এবং সে অনুযায়ীই তারা তাদের জীবন পরিচালিত করে। ভালো কাজগুলো করে আর মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকে।
এটিই একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির হৃদয়ের দৃঢ়তা ও সংকল্পের প্রতি অটলতার প্রকাশ। এগুলো সে কেন করে? কারণ, সে জানে, ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক সামান্য চার দিনার চুরির কারণে তার হাত কেটে দেবে। ক্ষণিকের আস্বাদন ভোগ ও আনন্দের কারণে (জিনার কারণে) তার সুগঠিত সুকান্ত শরীর পাথর নিক্ষেপে ধ্বংস করে দেবে। তাই দৃঢ় চিত্তের কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধের দিকে অগ্রসর হতে পারে না। হয় না। কারণ, সে জানে, ক্ষণিকের এই ভোগ ও সম্ভোগের কারণে তাকে সইতে হবে চিরদিনের যন্ত্রণা।
বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনো এমন বিষয়ে রাজি হবে না। এতে লিপ্তও হবে না।
📄 প্রতিফলের প্রয়োজনীয়তা
যে-কেউ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাজ ও পরিচালনা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করবে, সে-ই সেগুলোকে একটি ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত দেখতে পাবে। বিলম্বে হলেও সব জিনিসের সে একটি প্রতিফল লক্ষ করবে। সুতরাং কোনো গোনাহের তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তি বা প্রতিফল না দেখে কারও ধোঁকায় পতিত হওয়া উচিত নয়।
সবচেয়ে নিকৃষ্টতম গোনাহের কাজ হলো, অব্যাহত গোনাহের মধ্যে লিপ্ত থাকা এবং তাওবা না করা। এর কারণে শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। অথচ এই ব্যক্তিও যদি কখনো ইস্তেগফার করে, নামাজ, রোজা ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট কাকুতি-মিনতি করে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তার এই ক্ষমা চাওয়া বিফলে যাবে না। আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী।
কিন্তু মানুষজাতি একটি প্রবল ধোঁকা ও প্রতারণার শিকার হয়ে আছে। এটি তার একটি নিকৃষ্টতম স্বভাবে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি হলো, প্রতিনিয়ত সে আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ করে, অথচ আল্লাহর পক্ষ থেকে সে নিজের পছন্দের জিনিস প্রত্যাশা করে বসে থাকে। যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
والعاجز من أتبع نفسه هواها وتمنى على الله الأماني.
দুর্ভাগা সে ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে; অথচ আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে মহান প্রতিদানের প্রত্যাশা করে। ১৬ সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তির কর্তব্য হলো, প্রতিদান প্রাপ্তির আশা করা এবং সেভাবেই আমল করা। তার কাজের ফলাফল সে একদিন না-একদিন পাবেই পাবে।
স্বপ্নের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকারক আল্লামা ইবনে সিরিন রহ.১৭ বলেন, আমি একবার এক লোককে ঠাট্টা করে বললাম, 'হে মুফলিস (হতদরিদ্র)।' ঠিক এর ৪০ বছর পর আমি নিজেই হতদরিদ্র হয়ে পড়লাম।
হজরত ইবনুল জালা রহ.১৮ বলেন, একবার আমার নিকট আমার এক মুরুব্বি এলেন। আমি তার চুলহীন টেকো মাথার দিকে একটু অন্যভাবে তাকিয়ে ছিলাম।
তিনি আমার দিকে ক্ষুণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 'এভাবে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছ কেন? তুমি অবশ্যই এর পরিণাম ভোগ করবে।' ঠিকই এ ঘটনার ৪০ বছর পর আমি আমার মুখস্থ কোরআন ভুলে গেলাম।
এমনিভাবে এর বিপরীত জিনিসগুলোও সংঘটিত হয়। যে-কেউ কোনো ভালো কাজ করলে বা আন্তরিকতাপূর্ণ কোনো ভালো কাজের নিয়ত করলে, অবশ্যই সে এর সুন্দর প্রতিদানের প্রতীক্ষা করতে পারে; যদিও কখনো কখনো সেটা বিলম্বে আসে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ) নিশ্চয় যে ব্যক্তি খোদাভীতি অর্জন করবে এবং ধৈর্যধারণ করবে [তার জানা উচিত,] আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের প্রতিফল নষ্ট করেন না। [সুরা ইউসুফ: ৯০]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من غض بصره عن محاسن امرأة أثابه الله إيماناً يجد حلاوته في قلبه. যে ব্যক্তি তার চোখকে কোনো নারীর সৌন্দর্য থেকে সরিয়ে অবনত করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে এমন ঈমান দান করবেন; সে তার অন্তরে যার স্বাদ ও মিষ্টতা অনুভব করতে পারবে। ১৯
সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তির জানা থাকা উচিত, কিয়ামতের দিন ইনসাফের দাঁড়িপাল্লা কোনো পক্ষপাতিত্ব করবে না। কারও বেশ-কম করা হবে না। বরং ভালো-খারাপ সকল কিছুর পরিপূর্ণ প্রতিফল পাওয়া যাবে। কোনোকিছুই বাদ পড়বে না।
টিকাঃ
১৬. ইমাম তিরমিজি রহ. হাদিসটি 'আল কিয়ামাহ' অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন-৪/৪২৬০। এবং তিনি বলেন, হাদিসটি হাসান সহিহ। এছাড়া মুসনাদে আহমদ-৪/১২৪, ইবনে মাজা-২/৪২৬০ গ্রন্থেও তা উল্লেখিত হয়েছে। এখানে হাদিসটির দ্বিতীয় অংশ উল্লেখ করা হয়েছে। পুরো হাদিসটি এমন- الْكَيْسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ.
১৭. নাম: আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে সিরিন আল-আনাসি আল-বসরি রহ.। তিনি একজন ইমাম। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম হজরত আনাস ইবনে মালেক রা.-এর আজাদকৃত গোলাম। তিনি অনেক সাহাবি থেকে হাদিস শ্রবণ করেছেন। খুবই উত্তম চরিত্রের ব্যক্তি ছিলেন। প্রকাশ্যে অনেক হাসি-মজাক করতেন। ১০৮ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। [ سير أعلام النبلاء : ৯/৫৮৫، طبقات ابن سعد 8/604 ]
১৮. পুরো নাম: আবু আবদুল্লাহ ইবনুল জালা আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া অথবা মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া রহ.। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ আরেফ। উত্তম মানুষ। বিশর ইবনুল হারেস রহ.-এর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত। তিনি ৩০৬ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। [ سير أعلام النبلاء : ১৪/২৫১، صفة الصفوة : ۲/۲۶۶ ]
১৯. হাদিসটি 'মুসনাদে আহমদ'-এ বর্ণিত হয়েছে- ৫/৬৪। এবং আল্লামা হাইছামি রহ. তাঁর مجمع الزوائد -এ উল্লেখ করেছেন- ২/৬৩। এবং ইমাম তবারনি একটু ভিন্ন শব্দে উল্লেখ করেছেন। তবে সনদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে।