📄 ভ্রষ্টদের ভ্রষ্ট হওয়ার কারণ
আমি একদিন দীর্ঘক্ষণ মানুষের ওপর অর্পিত কাজ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। লক্ষ করলাম, মানুষের করিতব্য কাজগুলোর মধ্যে কিছু কাজ তুলনামূলক সহজ আর কিছু কাজ কঠিন।
সহজ কাজের মধ্যে ধরা যায়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে যে সকল কাজ সম্পাদন করা হয়। তবে এর মধ্যেও কিছু কর্ম অন্যটার থেকে তুলনামূলক সহজ। যেমন, সারাদিন রোজা রাখার চেয়ে নামাজ পড়া সহজ। আবার কখনো কোনো সম্প্রদায়ের নিকট জাকাতের চেয়ে রোজা সহজ।
আবার কঠিন কাজগুলো কয়েক ধরনের। একটি অন্যটির থেকে তুলনামূলক কঠিন। যেমন, স্রষ্টার সঠিক পরিচয় ও মারেফাত অর্জন করার জন্য চিন্তা ও দর্শনকে কাজে লাগানো। এ কারণে সঠিক বিশ্বাস অর্জন করাটাও এত কঠিন। তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, এটি বেশি কঠিন তাদের জন্য, যাদের নিকট সকল বিষয়ের অনুধাবন অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তমূলক। কিন্তু যারা বুদ্ধিমান, তাদের নিকট এটি সহজ।
এরপর কঠিন কাজ হলো প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হওয়া। নফসের ওপর কঠোর হওয়া। নিজের স্বভাবকে তার আকর্ষিত বিষয় থেকে ফিরিয়ে রাখা। তবে কথা হলো, যদিও এগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কঠিন; কিন্তু বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা যখন এর পরিণাম ও প্রতিদান সম্পর্কে অবগত হন, তখন তাদের জন্য এগুলো সম্পাদন করা সহজ হয়ে যায়।
তবে সবচেয়ে কঠিন হলো জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে স্রষ্টার হিকমত ও রহস্য বোঝা। যদিও যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর হিকমত আমাদের নিকট প্রতিষ্ঠিত। তবুও আমরা দেখতে পাই, ইলম ও আমলে নিমগ্ন একজন ব্যক্তিকে তিনি করে রেখেছেন পার্থিব সম্পদে দরিদ্র। দরিদ্রতা তার সকল নির্দয়তাসহ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। পার্থিব কিছু খাদ্য ও ভরণ-পোষণের জন্য তাকে নত হতে হয় কোনো মূর্খ ধনীর নিকট।
অন্যদিকে হয়তো কোনো জ্ঞানহীন আকাট মূর্খ ফাসেক ব্যক্তিকে তিনি দিয়ে রেখেছেন অঢেল ধন-সম্পদ। দুনিয়ার সকল বস্তুগত প্রাচুর্য ঢেলে দিয়েছেন তার ওপর।
এরপর আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের শরীরের পূর্ণতা দান করেন এবং সীমাহীন সুন্দর ও সুগঠিত করেন। এরপর হয়তো অদম্য যৌবনের শুরুতেই কারও শরীর ভেঙে দেন, মৃত্যু প্রদান করেন। কেউ আবার যৌবন না পেতেই বৃদ্ধতে রূপান্তরিত হয়।
রয়েছে আরও কত অসহ্য যন্ত্রণাকাতর মানুষ ও শিশুর অবর্ণনীয় কাতর যন্ত্রণার বিশদ বিবরণ, সাধারণ মানবিক মানব-স্বভাবও যার প্রতি করুণাময় হয়ে ওঠে! এমন ক্ষেত্রেও প্রভুর পক্ষ থেকে মানুষকে বলা হয়, তুমি এ ব্যাপারে কিছুতেই সন্দেহ করো না যে, আল্লাহ হলেন সকল করুণাকারীর শ্রেষ্ঠ করুণাকারী। তিনিই হলেন শ্রেষ্ঠ দয়াবান।
এক আয়াতে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা ফেরাউনকে পথভ্রষ্ট করেছেন। অথচ অন্য আয়াতে এসে দেখতে পাই, তিনিই আবার ফেরাউনের কাছে মুসা আ.-কে পাঠাচ্ছেন হিদায়াতের দাওয়াত দিয়ে।
মানুষ জেনেছে, আল্লাহ তাআলার মহা পরিকল্পনার ছকে হজরত আদম আলাইহিস সালাম-এর গাছ থেকে 'গন্দম' খাওয়া ছিল অপরিহার্য। অথচ আল্লাহ তাআলা তার এই আচরণে তাকে তিরস্কার করে বলছেন, وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ -আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্য হয়েছে।...
এ ধরনের আরও কত বিষয় মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এমনকি এ কারণে তাদের অনেকে স্রষ্টাকে অস্বীকার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার দিকেও ধাবিত হয় নাউজুবিল্লাহ।
আহা, তারা যদি এসকল বিষয়ের রহস্য ও হিকমত সম্পর্কে অনুসন্ধান করে দেখত, তাহলে তারা বুঝতে পারত, এগুলোকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়াই হলো জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। সেটাই ছিল জ্ঞানের অনুসরণ।
وهذا أصل، إذا فهم، حصل السلامة والتسليم.
আহা, এটি এমন এক মূলনীতি, তুমি যদি এটি বুঝতে পারো, তবে তুমি মুক্তি পাবে এবং পাবে নিজেকে সঁপে দেওয়ার যুক্তি।
আল্লাহ যেন আমাদের তরে সে সকল রহস্যময় বিষয় ও অস্পষ্টতা প্রকাশ করে দেন, যেগুলো ভ্রষ্টদেরকে বিভ্রান্ত করেছে। নিশ্চয় তিনি আমাদের নিকটবর্তী এবং আহ্বানে সাড়াদানকারী।
📄 সময়ের মূল্যায়ন
মানুষের জন্য উচিত তার জীবন ও সময়ের মূল্যায়ন করা। সময়ের মর্যাদা ও মূল্য বোঝার চেষ্টা করা। কেউ যদি সময়ের মূল্য বুঝতে পারে, তাহলে সে তার জীবনের একটি মুহূর্তও অনর্থক নষ্ট করবে না।
আর যদি বুঝতে পারে জীবনের মর্যাদা, তাহলে যথাসম্ভব সবচেয়ে ভালো কাজের দিকেই সে ধাবিত হবে। তার কথা হবে শ্রেষ্ঠ। তার কাজ হবে শ্রেষ্ঠতর। এবং কর্মের কিছু ক্ষেত্রে তার শারীরিক বা অবস্থানগত সামর্থ্য যদি না-ও থাকে, তবুও কাজগুলির জন্য সর্বদা তার নিয়ত বহাল থাকবে। যেভাবে হাদিস শরিফে এসেছে, نية المؤمن خير من عمله - মুমিনের আন্তরিক নিয়ত তার কাজ থেকেও উত্তম। ১৩
আমাদের সালাফে সালেহিনদের একটি বিরাট অংশ সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজ করতেন। আমের ইবনে আবদে কায়েস রহ. থেকে বর্ণিত রয়েছে, একবার এক লোক তাকে বলল, 'আসুন একটু আলাপ করি।' আমের ইবনে আবদে কায়েস তাকে বললেন, তবে তুমি সূর্যকে আটকে রাখো। [অর্থাৎ সময়কে আটকে রাখতে পারলে আমি তোমার সাথে কথা বলতে রাজি আছি; নতুবা নয়।]
ইবনে সাবেত আল-বুনানি বলেন, আমি আমার বাবাকে মৃত্যুমুহূর্তে কালেমার তালকিন দিতে এগিয়ে গেলাম। তখন বাবা বললেন, বেটা, আমাকে আমার অবস্থায় ছেড়ে দাও। আমি তো এখন আমার সপ্তম ওজিফা আদায়ে মগ্ন আছি।
একবার এক পূর্বসূরি বুজুর্গের নিকট লোকেরা উপস্থিত হলো। তার মৃত্যু সন্নিকটে। অথচ লোকেরা গিয়ে দেখল, তিনি নামাজে দণ্ডায়মান। নামাজ শেষে তাকে লোকদের উপস্থিতির কথা বলা হলো। তিনি বললেন, এখন তো আমি কোরআন তেলাওয়াত করব। তাদের সাথে অনর্থক কথাবার্তার সময় কোথায়?
এভাবে মানুষ যখন অন্তর দিয়ে অনুধাবন করে- মৃত্যু তার সকল আমলের দরজা বন্ধ করে দেবে, তখন সে তার জীবনে এমন আমল ও কর্মের মাঝে নিমগ্ন হবে, যেটা তার মৃত্যুর পরও তার সওয়াবের বিষয় হিসেবে গণ্য হবে। যেমন, দুনিয়ার কোনো সম্পদ অতিরিক্ত থাকলে সেটা ওয়াকফ করবে। গাছ লাগাবে। মানুষের কল্যাণের জন্য নদীনালা খনন করবে। এবং এমন একটি পরিবার তৈরির জন্য প্রচেষ্টা করবে, যারা তার মৃত্যুর পরও আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করবে। তার জন্য দুআ করবে। এটি তার সওয়াবের মাধ্যম।
হবে। অথবা ইলমি কোনো কিতাব রচনা করবে। কেননা, একজন আলেমের লিখিত রচনা তার মৃত্যুহীন সন্তানের মতো।
একজন আলেম যেকোনো কাজ করবে, জেনে-শুনেই করবে। সে এমন কাজই করবে, যার দ্বারা অন্যরা উপকৃত হতে পারে।
আহা, এ সকল কথা তার জন্য বলা হচ্ছে, যার এখনো মৃত্যু হয়নি। যার এখনো জীবনী শক্তি রয়েছে অটুট। কবি বলেন, قد مات قوم وهم في الناس أحياء.
কত লোক এমন রয়েছে, যারা মারা গিয়েছে বহু আগে। তবু তারা মানুষের মাঝে এখনো রয়েছে জীবিত—(তাদের কাজে ও কর্মে)।
টিকাঃ
১০. হাদিসটি ইমাম বাইহাকি রহ. তাঁর গ্রন্থ 'শুয়াবুল ঈমান'-এ হজরত আনাস রা. থেকে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন-৫/৩৪৩/৬৮৫৯। আল্লামা হাইছামি রহ. তাঁর গ্রন্থ 'আল-মাজমা'-তে এটা উল্লেখ করেছেন-১/১০৯। হজরত আবু নাঈম রহ. তাঁর حلية الأولياء গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি বলেন, এটি একটি গারিব হাদিস। একটি সূত্র দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম সুয়তি রহ. বলেন, এটি সকল দিক দিয়েই দুর্বল।
১৪. তাঁর পুরো নাম: আবু আবদুল্লাহ আমের ইবনে কায়েস আত-তামিমি আল-বসরি। তিনি ছিলেন প্রথমসারির একজন আদর্শ জাহেদ। কাব আহবার তাকে দেখে বলেছিলেন, ইনি হলেন এই উম্মতের রাহেব। তিনি হজরত মুআবিয়া রা.-এর যুগে ইন্তেকাল করেন। [ سير أعلام النبلاء: ৪/১৫-১৯]
১৫. তাঁর পুরো নাম: আবু মুহাম্মদ ছাবেত ইবনে আসলাম আল-বুনানি আল-বসরি। তিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে খুবই শক্তিশালী ও আস্থাবান ব্যক্তি ছিলেন। হজরত আনাস ইবনে মালেক রহ. বলেন, কল্যাণের অনেকগুলো চাবি থাকে, ছাবেত হলো সেই চাবিগুলোর একটি চাবি। তিনি ১২৭ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। [ بن سعد ২২০/৬ : سير أعلام النبلاء ]
📄 সচ্চলতার মর্যাদা এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি
অনেক ভেবে, আমি শয়তানের দুটি বড় ধরনের ধোঁকা ও ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেছি। যেমন,
১. শয়তান সম্পদশালীদের সম্পদের আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখে। তাদেরকে এমন সব পার্থিব ন্যায়-অন্যায় আস্বাদন ও বিলাসিতার মধ্যে ডুবিয়ে রাখে, যার কারণে তারা আখেরাত ও তার জন্য আমলের সকল চিন্তা-চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদেরকে সম্পদের মায়ায় আবদ্ধ করে তাদের আরও অর্জনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তোলে। সম্পদের প্রতি লোভ আরও বাড়াতে থাকে। এবং সম্পদের আকর্ষণ ও লোভের মাধ্যমে তাদেরকে কৃপণতার দিকেও ধাবিত করে। ফলে অনেক ধনবান মানুষ দান-সদকা তো দূরের কথা; জাকাত-ফিতরাও অনেক সময় সঠিকভাবে আদায় করে না। তখন সে ন্যায়-অন্যায় ও হালাল-হারামের কথা একেবারে ভুলে যায়। এটি শয়তানের একটি বড় ধরনের চক্রান্ত এবং শক্তিশালী কৌশল।
২. এই বিষয়ে শয়তান আরেকটি অতি সূক্ষ্ম চক্রান্ত সাজিয়ে রেখেছে। শয়তান অন্য মুমিনদেরকে ধনী ব্যক্তিদের দ্বীনি অবস্থার ভয় দেখিয়ে বলে, দেখো তো, সম্পদ আজ তাদের কোথায় নিয়ে ফেলেছে। দ্বীন থেকে কত দূরে সরে গেছে তারা!... তখন শয়তানের এই চক্রান্তে পা দিয়ে পরহেজগার মুমিন ব্যক্তিরা সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং হাতে যা রয়েছে সেগুলোও তড়িঘড়ি নিঃশেষ করে ফেলে বা দান করে দেয়। এরপর শয়তান অব্যাহতভাবে তাদেরকে আরও জুহুদ ও কৃচ্ছতা সাধনে উদ্বুদ্ধ করে। দুনিয়ার সংস্রব বর্জনের প্রতি বিভিন্ন আদেশ-উপদেশ দিতে থাকে। আয়-উপার্জনের সকল পদ্ধতি সম্পর্কেই তাকে ভয় দেখাতে থাকে।
এগুলো সব করতে থাকে দ্বীনের প্রতি কল্যাণকামিতা ও দ্বীন সংরক্ষণের নাম দিয়ে। অথচ এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে শয়তানের এক ভয়াল ও গোপন চক্রান্ত। সর্বনাশের দুষ্ট পরিকল্পনা।
শয়তান কখনো যুগের কিছু শাইখ-মাশায়েখের সুরতেও কথা বলে। অনুগ্রহপ্রার্থী তার কাছে উপদেশ নিতে এলে, উক্ত শাইখ তাকে বলে, তুমি তোমার সকল ধন-সম্পদ থেকে বের হয়ে এসো। সকল কিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে জাহেদ-দুনিয়াত্যাগীদের কাতারে এসে দাঁড়াও। তোমার ঘরে যখন আগামী দিনের সকল খাদ্য গচ্ছিত ও পরিমাপিত রয়েছে, তবে আর তোমার কিসের জুহুদ আর তাকওয়া! তাহলে তুমি কিছুতেই রিজিকদাতা আল্লাহর ওপর দৃঢ়ভাবে নির্ভরকারী নও।
এসকল কথার পেছনে কখনো কখনো কিছু অশুদ্ধ হাদিস ও ঘটনা পেশ করা হয়। অথবা এমন কিছু বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়, যেগুলো কোনো বিশেষ ব্যক্তির জন্য বিশেষ অবস্থা, হিকমত ও শিক্ষার জন্য উল্লেখিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষ সেগুলো সহ্য করতে অক্ষম।
কিন্তু অন্য অনেক মানুষ শয়তানের এই চক্রান্তে পড়ে নিজের সম্পদ বিলিয়ে দেয়। উপার্জনবিমুখ হয়ে কর্মহীন হয়ে পড়ে। পরিণামে, কিছুদিনের মধ্যেই জীবনের তাগিদে তাকে তার আশপাশের লোকজন ও বন্ধু-বান্ধবদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। অথবা রাজা-বাদশাহর দরবারে তোষামোদি বা চাটুকারিতা শুরু করতে হয়। কেননা, এভাবে ক্ষুধার্ত হয়ে বেশিদিন জুহদ ও মুজাহাদার রাস্তায় সে অটল থাকতে পারে না। কিছুদিন পরেই সে আবার তার স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি কাতর হয়ে পড়ে। তার আগের সকল চাহিদা তার মধ্যে চাঙ্গা হয়ে উঠতে থাকে। অথচ এখন তার হাত শূন্য। তাই নিজের ও পরিবারের চাহিদাগুলো পূরণ করতে গিয়ে আগের অবস্থা থেকে তাকে আরও হারাম ও নিকৃষ্টতম বিষয়ের মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়তে হয়। এভাবেই সে ধীরে ধীরে তার দ্বীন, ধর্ম ও চরিত্রের দৃঢ়তা ও সততা বিকিয়ে দেয়। দিনে দিনে সে নেমে আসে ভিক্ষুকদের কাতারে।
কিন্তু সে যদি অতীতের মহৎ ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের জীবনী এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ হাদিসগুলোর প্রতি মনোযোগ দিত, তবে সে জানতে পারত, আল্লাহর খলিল ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন অনেক সম্পদের মালিক। এমনকি তার এলাকা তার প্রাণীগুলোর ধারণক্ষমতার বাইরে ছিল। এমনিভাবে হজরত লুত আলাইহিস সালামও ছিলেন সম্পদশালী। এছাড়া আরও অনেক নবীই ছিলেন সম্পদ-প্রাচুর্যের অধিকারী। আর সুলাইমান আলাইহিস সালামের সম্পদ ও রাজত্বের কথা কেই-বা না জানে!
এভাবে অনেক সাহাবিও ছিলেন প্রচুর সম্পদের অধিকারী। হজরত উসমান গনি রা.-এর কথা কতই না প্রসিদ্ধ।
তাদের জীবনধারণের বৈশিষ্ট্য ছিল এমন—কিছু না থাকলে তারা ধৈর্যধারণ করতেন। কিন্তু প্রয়োজনমাফিক উপার্জন করতে কখনো পিছপা হতেন না। আবার সম্পদ-প্রাচুর্য এলে সেগুলো প্রকাশ করা থেকেও বিরত থাকতেন না। এটাই হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা।
হজরত আবু বকর রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়ও ব্যবসার জন্য দূর-দূরান্তে সফর করতেন। অধিকাংশ সাহাবি বাইতুল মাল থেকে প্রদত্ত সম্পদ অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। এভাবেই তারা অন্যদের দ্বারস্থ হওয়ার লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা থেকে মুক্ত থাকতেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. কখনো কোনো হাদিয়া ফিরিয়ে দিতেন না। আবার তিনি কখনো কারও কাছে কিছু চাইতেনও না।
আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও চিন্তা-ভাবনা করলাম। সাধারণ ধার্মিক ব্যক্তি এবং আলেমদের অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করলাম। আলেমদের ক্ষেত্রে যেটা হয় তা হলো, জীবনের প্রাথমিক সময়গুলো ইলম অন্বেষণে ব্যস্ত থাকায় তারা সাধারণত পার্থিব সম্পদ উপার্জন করতে সক্ষম হন না। কিন্তু একটি সময়ে যখন তাদের জীবনধারণের পার্থিব উপায়-উপকরণের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। অপমানিত হতে হয়। অপদস্থ হতে হয়। অথচ তারাই হলেন পৃথিবীতে সবচেয়ে সম্মানের উপযুক্ত।
অতীতে অবশ্য এসকল ক্ষেত্রে বাইতুল মাল থেকে বরাদ্দ সম্পদ তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। কিন্তু সে অবস্থা এখন আর নেই। এখন আহলে ইলম বা দ্বীনদারদের অন্যদের থেকে কিছু নিতে গেলে নিজের দ্বীনদারির কিছু অংশ খোয়াতে হয়। তবুও যদি উদ্দেশ্য অর্জিত হতো! কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবস্থা হলো, দ্বীনদাররা দুনিয়াদারদের কাছে ধরনা দিয়ে দিয়ে দ্বীনের তো ক্ষতি করছেই; অধিকন্তু তাদের কোনো পার্থিব উদ্দেশ্যও অর্জিত হচ্ছে না।
সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য কর্তব্য হলো, নিজের কাছে যে সম্পদ রয়েছে তার যত্ন নেওয়া। প্রয়োজনীয় সম্পদ উপার্জনের জন্য চেষ্টা ও শ্রম দেওয়া। যাতে কোনো আলেম বা ধার্মিক ব্যক্তিকে কোনো জালেমের তোষামোদ করতে না হয়। কোনো সম্পদশালী মূর্খ জাহেলের চাটুকারিতা করতে না হয়।
এক্ষেত্রে অজ্ঞ সুফিদের কথায় একদমই কান দেবে না, যারা শুধু দারিদ্র্য অবলম্বনের দিকেই আহ্বান করে এবং এটাকেই বড় কল্যাণ ও দ্বীনদারি বলে দাবি করে।
দারিদ্র্য হলো অক্ষম ব্যক্তির অসুস্থতা। অসুস্থতার ওপর ধৈর্যধারণের যে সওয়াব, দারিদ্র্যের ওপর ধৈর্যধারণের সেই একই সওয়াব। এটা স্বেচ্ছায় যেচে আনার জিনিস নয়।
তবে হ্যাঁ, খরচ কমিয়ে কৃচ্ছতা অবলম্বন করা এবং নিজের সামান্য কিছু নিয়েই নিজের মতো তৃপ্ত থাকা—এটি হারাম বা ভ্রান্তিমূলক কিছু নয়। তবে এটি হলো ভীরু দুর্বল অক্ষম জাহেদ ব্যক্তিদের কাজ।
কিন্তু যে ব্যক্তি হালালভাবে সম্পদ উপার্জন করেছে এই নিয়তে যে, তাকে যেন অন্যদের থেকে চাইতে না হয়। সে গ্রহণকারী না হয়ে যেন প্রদানকারী হয়। নিজেই বরং অন্যদেরকে দান-সদকা করবে; তাকে যেন অন্যের সদকা গ্রহণ করতে না হয়। তাহলে তার এ কাজটি হবে শ্রেষ্ঠতম কাজ—আমাদের বীর সাহসী মহান ব্যক্তিদের মতো কাজ। উচ্চ হিম্মতওয়ালা ব্যক্তির কাজ।
এতক্ষণ যা বলা হলো, সেগুলো নিয়ে যে ব্যক্তি চিন্তা করবে, সে একই সাথে একজন দ্বীনদার ব্যক্তির সম্পদ-প্রাচুর্যে মর্যাদার কথা বুঝবে—এবং বুঝতে পারবে দারিদ্র্যের লাঞ্ছনা ও ক্ষতির কথাও।
📄 অপ্রাপ্ত জিনিসের প্রতি আফসোস
আমি মহান ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের বিষয়ে অনুসন্ধান করে দেখেছি, তাদের অধিকাংশই পার্থিব সম্পদ থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে দুনিয়ার তাবৎ সম্পদ ও প্রাচুর্য গচ্ছিত হয়ে আছে খারাপ স্বভাববিশিষ্ট আকাট মূর্খ ব্যক্তিদের হাতে।
আমি কিছু জ্ঞানবান ব্যক্তিকে নিজেদের এই সম্পদহীনতা এবং মূর্খদের সম্পদ-প্রাচুর্য নিয়ে এভাবে আফসোস করতেও দেখেছি যে, এগুলো কেন তাদের প্রাপ্ত হলো না? কাউকে কাউকে তো এই আফসোসে জীবনের ওপর বিতৃষ্ণ হয়ে উঠতেও দেখেছি। দেখেছি দুঃখে-হতাশায় ভেঙে পড়তে...।
আমি এরূপ আফসোসকারীদের সম্বোধন করে বলতে চাই- এ তোমার কেমন কাণ্ড! তুমি কি তোমার আচরণ সম্পর্কে ভেবে দেখেছ? এখন এই আফসোস করাটা তোমার জন্য সকল দিক দিয়েই অনর্থক, অযৌক্তিক এবং ভ্রান্ত। কারণ-
১. তোমার যদি দুনিয়া অন্বেষণের যোগ্যতা, শক্তি, হিম্মত ও আকাঙ্ক্ষা থাকে, তাহলে তুমিও তা অর্জনে নেমে পড়ো। পরিশ্রম করো। অর্জন করো...। তাহলে আর তোমাকে এই আফসোস করতে হবে না। কিন্তু সেটা না করে শুধু বসে বসে অন্যরা যা পরিশ্রম করে অর্জন করছে, সেটা নিয়ে আফসোস করা প্রচণ্ড রকমের বোকামি ও মূর্খতা। এটা তোমার অক্ষমতা ও পরিশ্রমহীনতার চূড়ান্ত প্রকাশ।
২. তুমি জানো, দুনিয়া হলো অতিক্রম করার জায়গা; এটা স্থায়ী জীবনযাপনের কোনো জায়গা নয়। তোমার এতদিনের অর্জিত ইলম, প্রাজ্ঞতা ও অভিজ্ঞতা এটাই তো বলে। ইলমহীন যে সকল লোক এসব পার্থিব সম্পদ প্রাপ্ত হয়েছে, সেগুলো তাদের অধিকাংশের শরীর, চরিত্র ও দ্বীন-ধর্ম নষ্ট করে দিয়েছে। এগুলো জেনেও যদি তুমি দুনিয়ার অপ্রাপ্তি নিয়ে আফসোস করো, তাহলে তো তোমার আফসোস করাটা হবে এমন এক অপ্রাপ্তি নিয়ে, যা না-পাওয়াই তোমার জন্য কল্যাণকর। যার মধ্যে কল্যাণ নেই—তার অপ্রাপ্তি নিয়ে আফসোস করার শাস্তিস্বরূপ আজকের এই আফসোসের কষ্ট তোমাকে সইতে হচ্ছে।
সুতরাং হে বন্ধু, আসন্ন অনন্ত আজাব থেকে নিরাপদ থাকার যদি কোনো পথ করতে পারো, তবে ক্ষণিকের পার্থিব এই কষ্টটুকু সহ্য করে নাও না কেন!
৩. তুমি এটাও জানো, একজন মানুষ সারাজীবন যত খাদ্য-খাবার খায়, সেই তুলনায় একটি চতুষ্পদ প্রাণী বহুগুণ বেশি আহার করে। তাদের এই আহারে কোনো ধরনের ভয়-ভীতি নেই। অথচ সম্পদ ও আহার নিয়ে তোমার কত ভয়; কিন্তু পরিমাণ কত কম!
এ অবস্থায় তুমিও যদি তাদের মতো বহুধা সম্পদের অধিকারী হতে চাও, তাহলে তো তুমিও সেই মূর্খ সম্পদশালী ও চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের কাতারে পড়ে যাবে। কেননা, এই অতিরিক্ত খাদ্য-খাবার ও সম্পদ অর্জনের ধান্দাই তো তাদেরকে ইলম অর্জন করা থেকে বিরত রেখেছে। তুমি জন্তু-জানোয়ারের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছ এই ইলমের দ্বারাই; নতুবা খাবার গ্রহণের পরিমাণে তারা তোমার চেয়ে অনেক এগিয়ে।
মনে রেখো, অল্প আহার, অল্প চাহিদা এবং অল্প বিলাসই মানুষকে সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের উচ্চ শিখরে আরোহণে সাহায্য করে।
এসব জানার পরও তুমি যদি দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী সামান্য [যত বেশিই হোক, তবু সেটা সামান্যই] ভোগ্যসামগ্রিকেই প্রাধান্য দাও, তবে তো তোমার আজরদের কাহিনি জানাই আছে। [আজর মূর্তির ক্ষমতাহীনতার কথা জেনেও তা পূজা করার ওপর অটল ছিল] এই আফসোসের মাধ্যমে তুমি তোমার ইলম ও প্রজ্ঞাকে অপমান ও অপদস্থ করে তুলছ। তুমি তোমার সঠিক মত ও বিশ্বাসের দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করছ।