📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুনিয়ামুখী আলেম ও আখেরাতমুখী আলেম

📄 দুনিয়ামুখী আলেম ও আখেরাতমুখী আলেম


আলেমদের মাঝে এত যে রেষারেষি হিংসা বিদ্বেষ ও পারস্পরিক দোষচর্চা— আমি এর কারণ অনুসন্ধান করে দেখলাম, এগুলোর প্রধান উৎস হলো দুনিয়ার প্রতি তাদের লোভ ও আসক্তি। কারণ, আখেরাতমুখী আলেমগণ দ্বীনের প্রতি নিঃশর্ত অনুগত হন। তারা এভাবে রেষারেষি করে বেড়ান না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا )

যা কিছু তাদেরকে দেওয়া হয়, তার প্রতি তারা তাদের অন্তরে কোনো চাহিদা বোধ করে না। [সুরা হাশর: ৯]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَقُولُونَ: رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْأَيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غلا لِلَّذِينَ آمَنُوا )

(মুমিনগণ) বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, ক্ষমা করো আমাদেরকে এবং আমাদের সেই ভাইদেরকেও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে এবং আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। [সুরা হাশর: ১০]

হজরত আবু দারদা রা. প্রতিরাতে তার সকল সাথির জন্য দুআ করতেন।

হজরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. একবার ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর ছেলেকে বললেন, আমি প্রতিদিন প্রভাতে যে ছয় জন ব্যক্তির জন্য একান্তভাবে দুআ করি, তোমার বাবা হলেন তাদের অন্যতম।

দুনিয়ামুখী ও আখেরাতমুখী আলেমদের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-

এক. দুনিয়ামুখী আলেম যারা, তারা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের প্রতি অত্যধিক আগ্রহী হন। তারা নিজেদের নিকট মানুষদের আধিক্য কামনা করেন। লোকদের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসেন।

দুই. আখেরাতমুখী আলেম যারা, তারা কখনোই উল্লিখিত তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দেন না। তারা এগুলোকে ভয় করেন। এগুলো থেকে দূরে থাকতে চান। তবে কখনো নিজের ওপর দায়িত্ব এসে গেলে সবার ওপর দয়া ও মহানুভবতার পরিচয় দেন।

যেমন, আল্লামা নাখঈ রহ. কখনো কোনো খুঁটি বা তাকিয়াতে হেলান দিতেন না।

হজরত আলকামা রহ. তাঁর পেছনে কারও চলাকে পছন্দ করতেন না।

এমনকি আলেমদের মধ্যে এমন কিছু বুজুর্গ ব্যক্তিও অতিবাহিত হয়েছেন, যারা তাদের নিকট চারজনের বেশি উপবেশন করলে সেখান থেকে উঠে যেতেন। নিজেদের অহংকার প্রকাশ পাওয়ার সকল ব্যবস্থা ও মাধ্যম তারা এভাবেই পরিহার করে চলতেন।

তারা ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে অন্যদের প্রাধান্য দিতেন। প্রশ্নকারীকে অন্যের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। তারা খ্যাতির চেয়ে অখ্যাতিকেই পছন্দ করতেন বেশি। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সাগরের মাঝে তারা ছিলেন টলটলায়মান নৌকার অভিযাত্রীর মতো। নিজেদের এবং অন্যদের মুক্তির চিন্তা তাদেরকে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল। এত কিছুর পর অন্যদের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ করার সময় ও সুযোগ কোথায়!

তাই তারা সর্বক্ষণ একে অন্যের জন্যে দুআ করতেন। একে অন্যের থেকে উপকৃত হতেন। তারা ছিলেন দ্বীনের সফরে এমন এক সমমনা অভিযাত্রী দল, যারা ছিলেন পরস্পরের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল। পারস্পরিক সম্প্রীতি ছিল যাদের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। কারণ, তাদের দিন-রাতের অবিরাম যাত্রা ও অভিযাত্রা এগিয়ে চলেছে জান্নাতের অভিমুখে। তাই তারা ভেবেছেন, পথের মাঝেই পড়ে থাকুক ঠুনকো স্বার্থ নিয়ে সব রেষারেষির জঞ্জাল!

টিকাঃ
৪. কথাটি ইমাম যাহাবি রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' তে উল্লেখ করেছেন- ১১/২২৭।
৫. তাঁর পুরো নাম আবু ইমরান ইবরাহিম ইয়াযিদ ইবনে কায়েস আন-নাখঈ। ইয়ামানি এরপর কুফি। তিনি ছিলেন ইমাম হাফেজে হাদিস এবং ফকিহ। ইসলামি জ্ঞানের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বংশগতভাবে তিনি ছিলেন আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদের বোন মালিকার পুত্র। কুফাবাসীর একজন মুফতি। তিনি ছিলেন খুবই সচ্চরিত্রবান। লৌকিকতা-বর্জিত অমায়িক মানুষ। তাঁর স্ত্রী হুনাইদা বলেন, তিনি একদিন পরপর রোজা রাখতেন। হাজ্জাজের ভয়ে তাকে লুকিয়ে থাকতে হতো। অবশেষে যখন তাঁর নিকট একদিন হাজ্জাজের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছাল, তখন তিনি খুশিতে আল্লাহর দরবারে সেজদায় পড়ে গেলেন এবং দীর্ঘক্ষণ কাঁদলেন। তিনি ৯৬ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সূত্র- সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা ৪/৫২০। এবং তাবাকাতু ইবনু সা'দ : ৬/২৭০।
৬. তিনি ছিলেন কুফা নগরীর একজন বিখ্যাত আলেম, ফকিহ ও কারি। আরও ছিলেন হাফেজে হাদিস, ইমাম, সংস্কারক ও মুজতাহিদ। তাঁর পুরো নাম আবু শিবিল আলকামা ইবনে কায়েস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মালেক ইবনে আলকামা বিন সালামান বিন কুহুল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশাতেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইলম ও জিহাদের প্রয়োজনে বহু স্থানে সফর করেছেন। এরপর কুফায় অবস্থান করে বিরতিহীনভাবে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর সান্নিধ্য অর্জন করেন। তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন। তিনি ৭২ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা ৪/৩৫-৬১।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আনুগত্যের প্রতিফল

📄 আনুগত্যের প্রতিফল


যে ব্যক্তি নিজের জীবনের অবস্থার উন্নতি করতে চায়, তাকে অবশ্যই কর্ম- কৌশলের পরিবর্তনে প্রচেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَأَنْ لَوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ، لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقاً )

তারা যদি সঠিক পথের ওপর অটল থাকে, তাহলে অবশ্যই আমি তাদেরকে প্রচুর বৃষ্টি প্রদান করব। [সুরা জিন: ১৬] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, لو أن عبادي أطاعوني لسقيتهم المطر بالليل، وأطلعت عليهم الشمس بالنهار، ولم أسمعهم صوت الرعد.

যদি আমার বান্দারা আমার আনুগত্য করে চলত, তবে আমি রাতে তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করতাম আর দিনে সূর্য উদিত করতাম। তাদেরকে কোনো বজ্রের আওয়াজও শোনাতাম না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
البر لا يبلى، والإثم لا ينسى، والديان لا ينام، وكما تدين تدان.

পুণ্য নিঃশেষ করে দেওয়া হবে না। গোনাহও বিস্মৃত হবে না। দ্বীনদার ব্যক্তি ঘুমায় না। আর তুমি যেমন কর্ম করবে, তেমনই ফল পাবে।

হজরত আবু সুলাইমান দারানি রহ. বলেন,
من صفى صفى له ومن كدر كدر عليه، ومن أحسن في ليله كوفىء في نهاره، ومن أحسن في نهاره كوفىء في ليله.

যে ব্যক্তি নির্মল আচরণ করবে, তার প্রতিও নির্মল আচরণ করা হবে। আর যে ব্যক্তি মানুষের কাজকে কঠিন ও জটিল করবে, তার ওপরও কঠোরতা আরোপ করা হবে। যে ব্যক্তি রাতে কারও প্রতি অনুগ্রহ করবে, এটি দিবসে তার অনুগ্রহ প্রাপ্তির জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি দিবসে কারও প্রতি অনুগ্রহ করবে, এটি রাতে তার অনুগ্রহ প্রাপ্তির জন্য যথেষ্ট হবে।

একজন বৃদ্ধ ব্যক্তির কথা আমি জানি, যিনি দ্বীনের বিভিন্ন মজলিসে বিচরণ করতেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি বলতেন, সার্বক্ষণিক অনুগ্রহ প্রাপ্তি নিয়ে যে ব্যক্তি আনন্দিত হতে চায়, সে যেন আল্লাহ তাআলাকে সর্বক্ষণ ভয় করে চলে।

ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহ.” বলতেন, আমি আল্লাহর কোনো অবাধ্যতা করলে সেটা আমি আমার গৃহপালিত পশু ও প্রতিবেশীর আচরণ-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বুঝতে পারি। তখন তাদের আচরণ বিগড়ে যায়।

আর জেনে রেখো—আল্লাহ তাআলা বোঝার তাওফিক দিন—এগুলোর প্রতিফল ও প্রতিক্রিয়া নিছক এ ধরনের গুটিকয়েক উদাহরণের মাধ্যমে অনুধাবন করা যাবে না; বরং নিজের থেকে নফসের হিসাব-নিকাশ যখন কমতে থাকবে, তখনই বুঝতে হবে খোদার অবাধ্যতা বেড়ে গেছে।

নিজের বর্তমান অবস্থার কোনো স্খলন বা বিচ্যুতি দেখতে পেলে স্মরণ করো এমন কোনো নিয়ামতের কথা, যা প্রাপ্ত হয়ে তুমি তার শুকরিয়া আদায় করোনি অথবা স্মরণ করো তোমার লাঞ্ছনাকর গোনাহের কথা। এটি তারই প্রতিফল। এ কারণে নিয়ামতের অকৃতজ্ঞ হওয়া থেকে সতর্ক থেকো। সতর্ক থেকো আকস্মিক দুর্ভোগ ও শাস্তির ব্যাপারেও। মহান প্রতিপালকের মহা উদারতা ও সুযোগের প্রাচুর্যে ধোঁকায় আপতিত হয়ো না। কারণ, কখনো কখনো তার পাকড়াও আকস্মিক ও নগদও হয়ে থাকে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ ۗ

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থার পরিবর্তন ঘটান না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা এর পরিবর্তন সাধন করে。
[সূরা রাদ : ১১]

হজরত আবু আলি রুজাবারি” বলতেন,
من الاغترار أن تسيء، فيحسن إليك، فتترك التوبة، توهماً أنك تسامح في العقوبات

এটাও একপ্রকার আত্মপ্রবঞ্চনা যে, তুমি গোনাহের মধ্যে লিপ্ত রয়েছ, অথচ তোমার প্রতি এখনো অনুগ্রহ করা হচ্ছে। আর তুমি তোমাকে শান্তি থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে মনে করে তাওবা করা থেকে বিরত রয়েছ। আহা, শান্তির এই বিলম্ব তো তোমাকে তাওবা করার সুযোগ প্রদানের জন্যই দেওয়া হয়েছে!

টিকাঃ
1. মুসনাদে আহমদ : ২/৩৬৯। মুসতাদরাকে হাকিম : ৪/২৫৬। হাকিম তার মুসতাদরাকে বলেন, হাদিসটি সকালের উজ্জ্বলতার মতোই পরিষ্কার বা বিশুদ্ধ। তবে ইবনে মাইন, ইমাম নাসাঈ এবং কিছু মুহাদ্দিস বলেন, এটি যয়িফ বা দুর্বল।
হজরত ইবনে আদি তার ইতিহাসের বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-কামিল' এর মধ্যে হজরত উমর রা. থেকে এটি উল্লেখ করেছেন। তবে এই সনদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল মালেক রয়েছে। ইবনে আদি বলেন, সে দুর্বল বর্ণনাকারী। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ এটি তাঁর 'জুহুদ' গ্রন্থে হজরত আবু দারদা রা.-এর ওপর মাওকুফ করে বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম সাখাবি রহ. বলেন, এটি শুধু মাওকুফই নয়; মুনকাতে।
তিনি ছিলেন একজন বড় ইমাম। যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাহেদ। পুরো নাম- আবু সুলাইমান আবদুর রহমান ইবনে আহমদ আদ-দারানি রহ.। তিনি ১৪০ হিজরি সনের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ২১৫ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। তাঁর অনেক বিখ্যাত কথার মধ্যে একটি কথা এই যে- أفضل الأعمال خلاف هوى النفس - সর্বোত্তম আমল হলো নফসের কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতা করা। سير أعلام النبلاء :১০/১৮২]।
হাদিসটি ঠিক এই শব্দে কোথায় আছে, আমরা এখনো খুঁজে পাইনি। তবে আশা করছি কোথাও আছে। কেউ সন্ধান দিলে বাধিত হব। অনুবাদক।
১১. তাঁর পুরো নাম- ফুজাইল ইবনে ইয়াজ ইবনে মাসউদ ইবনে বাশার আত-তামিমি খুরাসানি রহ.। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ ইমাম। শাইখুল ইসলাম। সমরকন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজে অনেক কষ্টস্বীকার করে ইলম অর্জন করেছেন এবং তাঁর ইলম ও প্রজ্ঞা থেকে অন্যরাও প্রচুর উপকৃত হয়েছে। খুবই মুত্তাকি ও পরহেজগার মানুষ ছিলেন। ১৮৭ হিজরি সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। [سير أعلام النبلاء : 6/823-888; حلية الأولياء: 6/48]
১২. তাঁর পুরো নাম : আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসেম ইবনে মানসুর। আবু নাইম রহ. বলেন, তিনি ছিলেন একজন সুপণ্ডিত বিশুদ্ধভাষী। তাঁর বয়ানে প্রচুর প্রভাব ছিল। তিনি বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। তবে মিসরে বসবাস করেন। এবং সেখানেই ৩২২ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। [سير أعلام النبلاء : ১৪/৫৩৫]

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ভ্রষ্টদের ভ্রষ্ট হওয়ার কারণ

📄 ভ্রষ্টদের ভ্রষ্ট হওয়ার কারণ


আমি একদিন দীর্ঘক্ষণ মানুষের ওপর অর্পিত কাজ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। লক্ষ করলাম, মানুষের করিতব্য কাজগুলোর মধ্যে কিছু কাজ তুলনামূলক সহজ আর কিছু কাজ কঠিন।

সহজ কাজের মধ্যে ধরা যায়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে যে সকল কাজ সম্পাদন করা হয়। তবে এর মধ্যেও কিছু কর্ম অন্যটার থেকে তুলনামূলক সহজ। যেমন, সারাদিন রোজা রাখার চেয়ে নামাজ পড়া সহজ। আবার কখনো কোনো সম্প্রদায়ের নিকট জাকাতের চেয়ে রোজা সহজ।

আবার কঠিন কাজগুলো কয়েক ধরনের। একটি অন্যটির থেকে তুলনামূলক কঠিন। যেমন, স্রষ্টার সঠিক পরিচয় ও মারেফাত অর্জন করার জন্য চিন্তা ও দর্শনকে কাজে লাগানো। এ কারণে সঠিক বিশ্বাস অর্জন করাটাও এত কঠিন। তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, এটি বেশি কঠিন তাদের জন্য, যাদের নিকট সকল বিষয়ের অনুধাবন অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তমূলক। কিন্তু যারা বুদ্ধিমান, তাদের নিকট এটি সহজ।

এরপর কঠিন কাজ হলো প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হওয়া। নফসের ওপর কঠোর হওয়া। নিজের স্বভাবকে তার আকর্ষিত বিষয় থেকে ফিরিয়ে রাখা। তবে কথা হলো, যদিও এগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কঠিন; কিন্তু বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা যখন এর পরিণাম ও প্রতিদান সম্পর্কে অবগত হন, তখন তাদের জন্য এগুলো সম্পাদন করা সহজ হয়ে যায়।

তবে সবচেয়ে কঠিন হলো জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে স্রষ্টার হিকমত ও রহস্য বোঝা। যদিও যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর হিকমত আমাদের নিকট প্রতিষ্ঠিত। তবুও আমরা দেখতে পাই, ইলম ও আমলে নিমগ্ন একজন ব্যক্তিকে তিনি করে রেখেছেন পার্থিব সম্পদে দরিদ্র। দরিদ্রতা তার সকল নির্দয়তাসহ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। পার্থিব কিছু খাদ্য ও ভরণ-পোষণের জন্য তাকে নত হতে হয় কোনো মূর্খ ধনীর নিকট।

অন্যদিকে হয়তো কোনো জ্ঞানহীন আকাট মূর্খ ফাসেক ব্যক্তিকে তিনি দিয়ে রেখেছেন অঢেল ধন-সম্পদ। দুনিয়ার সকল বস্তুগত প্রাচুর্য ঢেলে দিয়েছেন তার ওপর।

এরপর আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের শরীরের পূর্ণতা দান করেন এবং সীমাহীন সুন্দর ও সুগঠিত করেন। এরপর হয়তো অদম্য যৌবনের শুরুতেই কারও শরীর ভেঙে দেন, মৃত্যু প্রদান করেন। কেউ আবার যৌবন না পেতেই বৃদ্ধতে রূপান্তরিত হয়।

রয়েছে আরও কত অসহ্য যন্ত্রণাকাতর মানুষ ও শিশুর অবর্ণনীয় কাতর যন্ত্রণার বিশদ বিবরণ, সাধারণ মানবিক মানব-স্বভাবও যার প্রতি করুণাময় হয়ে ওঠে! এমন ক্ষেত্রেও প্রভুর পক্ষ থেকে মানুষকে বলা হয়, তুমি এ ব্যাপারে কিছুতেই সন্দেহ করো না যে, আল্লাহ হলেন সকল করুণাকারীর শ্রেষ্ঠ করুণাকারী। তিনিই হলেন শ্রেষ্ঠ দয়াবান।

এক আয়াতে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা ফেরাউনকে পথভ্রষ্ট করেছেন। অথচ অন্য আয়াতে এসে দেখতে পাই, তিনিই আবার ফেরাউনের কাছে মুসা আ.-কে পাঠাচ্ছেন হিদায়াতের দাওয়াত দিয়ে।

মানুষ জেনেছে, আল্লাহ তাআলার মহা পরিকল্পনার ছকে হজরত আদম আলাইহিস সালাম-এর গাছ থেকে 'গন্দম' খাওয়া ছিল অপরিহার্য। অথচ আল্লাহ তাআলা তার এই আচরণে তাকে তিরস্কার করে বলছেন, وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ -আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্য হয়েছে।...

এ ধরনের আরও কত বিষয় মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এমনকি এ কারণে তাদের অনেকে স্রষ্টাকে অস্বীকার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার দিকেও ধাবিত হয় নাউজুবিল্লাহ।

আহা, তারা যদি এসকল বিষয়ের রহস্য ও হিকমত সম্পর্কে অনুসন্ধান করে দেখত, তাহলে তারা বুঝতে পারত, এগুলোকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়াই হলো জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। সেটাই ছিল জ্ঞানের অনুসরণ।

وهذا أصل، إذا فهم، حصل السلامة والتسليم.

আহা, এটি এমন এক মূলনীতি, তুমি যদি এটি বুঝতে পারো, তবে তুমি মুক্তি পাবে এবং পাবে নিজেকে সঁপে দেওয়ার যুক্তি।

আল্লাহ যেন আমাদের তরে সে সকল রহস্যময় বিষয় ও অস্পষ্টতা প্রকাশ করে দেন, যেগুলো ভ্রষ্টদেরকে বিভ্রান্ত করেছে। নিশ্চয় তিনি আমাদের নিকটবর্তী এবং আহ্বানে সাড়াদানকারী।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সময়ের মূল্যায়ন

📄 সময়ের মূল্যায়ন


মানুষের জন্য উচিত তার জীবন ও সময়ের মূল্যায়ন করা। সময়ের মর্যাদা ও মূল্য বোঝার চেষ্টা করা। কেউ যদি সময়ের মূল্য বুঝতে পারে, তাহলে সে তার জীবনের একটি মুহূর্তও অনর্থক নষ্ট করবে না।

আর যদি বুঝতে পারে জীবনের মর্যাদা, তাহলে যথাসম্ভব সবচেয়ে ভালো কাজের দিকেই সে ধাবিত হবে। তার কথা হবে শ্রেষ্ঠ। তার কাজ হবে শ্রেষ্ঠতর। এবং কর্মের কিছু ক্ষেত্রে তার শারীরিক বা অবস্থানগত সামর্থ্য যদি না-ও থাকে, তবুও কাজগুলির জন্য সর্বদা তার নিয়ত বহাল থাকবে। যেভাবে হাদিস শরিফে এসেছে, نية المؤمن خير من عمله - মুমিনের আন্তরিক নিয়ত তার কাজ থেকেও উত্তম। ১৩

আমাদের সালাফে সালেহিনদের একটি বিরাট অংশ সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজ করতেন। আমের ইবনে আবদে কায়েস রহ. থেকে বর্ণিত রয়েছে, একবার এক লোক তাকে বলল, 'আসুন একটু আলাপ করি।' আমের ইবনে আবদে কায়েস তাকে বললেন, তবে তুমি সূর্যকে আটকে রাখো। [অর্থাৎ সময়কে আটকে রাখতে পারলে আমি তোমার সাথে কথা বলতে রাজি আছি; নতুবা নয়।]

ইবনে সাবেত আল-বুনানি বলেন, আমি আমার বাবাকে মৃত্যুমুহূর্তে কালেমার তালকিন দিতে এগিয়ে গেলাম। তখন বাবা বললেন, বেটা, আমাকে আমার অবস্থায় ছেড়ে দাও। আমি তো এখন আমার সপ্তম ওজিফা আদায়ে মগ্ন আছি।

একবার এক পূর্বসূরি বুজুর্গের নিকট লোকেরা উপস্থিত হলো। তার মৃত্যু সন্নিকটে। অথচ লোকেরা গিয়ে দেখল, তিনি নামাজে দণ্ডায়মান। নামাজ শেষে তাকে লোকদের উপস্থিতির কথা বলা হলো। তিনি বললেন, এখন তো আমি কোরআন তেলাওয়াত করব। তাদের সাথে অনর্থক কথাবার্তার সময় কোথায়?

এভাবে মানুষ যখন অন্তর দিয়ে অনুধাবন করে- মৃত্যু তার সকল আমলের দরজা বন্ধ করে দেবে, তখন সে তার জীবনে এমন আমল ও কর্মের মাঝে নিমগ্ন হবে, যেটা তার মৃত্যুর পরও তার সওয়াবের বিষয় হিসেবে গণ্য হবে। যেমন, দুনিয়ার কোনো সম্পদ অতিরিক্ত থাকলে সেটা ওয়াকফ করবে। গাছ লাগাবে। মানুষের কল্যাণের জন্য নদীনালা খনন করবে। এবং এমন একটি পরিবার তৈরির জন্য প্রচেষ্টা করবে, যারা তার মৃত্যুর পরও আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করবে। তার জন্য দুআ করবে। এটি তার সওয়াবের মাধ্যম।

হবে। অথবা ইলমি কোনো কিতাব রচনা করবে। কেননা, একজন আলেমের লিখিত রচনা তার মৃত্যুহীন সন্তানের মতো।

একজন আলেম যেকোনো কাজ করবে, জেনে-শুনেই করবে। সে এমন কাজই করবে, যার দ্বারা অন্যরা উপকৃত হতে পারে।

আহা, এ সকল কথা তার জন্য বলা হচ্ছে, যার এখনো মৃত্যু হয়নি। যার এখনো জীবনী শক্তি রয়েছে অটুট। কবি বলেন, قد مات قوم وهم في الناس أحياء.

কত লোক এমন রয়েছে, যারা মারা গিয়েছে বহু আগে। তবু তারা মানুষের মাঝে এখনো রয়েছে জীবিত—(তাদের কাজে ও কর্মে)।

টিকাঃ
১০. হাদিসটি ইমাম বাইহাকি রহ. তাঁর গ্রন্থ 'শুয়াবুল ঈমান'-এ হজরত আনাস রা. থেকে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন-৫/৩৪৩/৬৮৫৯। আল্লামা হাইছামি রহ. তাঁর গ্রন্থ 'আল-মাজমা'-তে এটা উল্লেখ করেছেন-১/১০৯। হজরত আবু নাঈম রহ. তাঁর حلية الأولياء গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি বলেন, এটি একটি গারিব হাদিস। একটি সূত্র দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম সুয়তি রহ. বলেন, এটি সকল দিক দিয়েই দুর্বল।
১৪. তাঁর পুরো নাম: আবু আবদুল্লাহ আমের ইবনে কায়েস আত-তামিমি আল-বসরি। তিনি ছিলেন প্রথমসারির একজন আদর্শ জাহেদ। কাব আহবার তাকে দেখে বলেছিলেন, ইনি হলেন এই উম্মতের রাহেব। তিনি হজরত মুআবিয়া রা.-এর যুগে ইন্তেকাল করেন। [ سير أعلام النبلاء: ৪/১৫-১৯]
১৫. তাঁর পুরো নাম: আবু মুহাম্মদ ছাবেত ইবনে আসলাম আল-বুনানি আল-বসরি। তিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে খুবই শক্তিশালী ও আস্থাবান ব্যক্তি ছিলেন। হজরত আনাস ইবনে মালেক রহ. বলেন, কল্যাণের অনেকগুলো চাবি থাকে, ছাবেত হলো সেই চাবিগুলোর একটি চাবি। তিনি ১২৭ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। [ بن سعد ২২০/৬ : سير أعلام النبلاء ]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00