📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইবাদতের সাথে অন্তরের সংযোগ

📄 ইবাদতের সাথে অন্তরের সংযোগ


أعظم المعاقبة أن لا يحس المعاقب بالعقوبة - শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি তার (গোপন) শাস্তির বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারে, তবে এটাই হলো তার জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি।

এরচেয়েও মারাত্মক ব্যাপার হলো, সতর্ক না হয়ে বরং শাস্তির বিষয় নিয়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকা। যেমন, হারাম সম্পদ নিয়ে গর্ব করা। গোনাহের বিষয়ে ভাবনাহীন থাকা। এমন ব্যক্তি কখনো ইবাদতে সফলতা লাভ করতে পারে না। আনন্দ ও তৃপ্তি পায় না।

আমি অনেক আলেম ও জাহেদের ক্ষেত্রেও লক্ষ করে দেখেছি, তারা তাদের শাস্তি ও বঞ্চনা সম্পর্কে সচেতন নয়। এগুলোর অধিকাংশ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সুবিধা ভোগের কামনার কারণেই হয়েছে। অন্তর তাদের দুনিয়ার সাথে লেগে গেছে।

এ ধরনের আলেমরা ভুল ধরলে রেগে যায়। এ ধরনের বক্তারা ভণিতার আশ্রয় গ্রহণ করে। আর এ ধরনের জাহেদ ব্যক্তি হয় মুনাফিক বা লোক দেখানো আমলকারী।

তাদের প্রকাশ্য শাস্তি হলো, দুনিয়ার প্রতি লোভ থাকার কারণে তারা সত্য ও সঠিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর তাদের অভ্যন্তরীণ শাস্তি হলো, তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় আল্লাহর সাথে একান্ত আলাপের মিষ্টতা এবং নির্জন ইবাদতের আস্বাদন।

হ্যাঁ, তবে কিছু মুমিন পুরুষ ও নারী রয়েছে তাদের ব্যতিক্রম। আল্লাহ তাদের কারণে পৃথিবী এখনো স্থিত রেখেছেন। তাদের একাকী আমলগুলো সম্মিলিত আমলের মতোই; বরং এরচেয়েও আরও উজ্জ্বল। তাদের নির্জন আমলগুলো প্রকাশ্য আমলের মতোই; বরং তারচেয়েও আরও মুগ্ধকর ও স্বাদযুক্ত। তাদের হিম্মত ও ঈমানের দৃঢ়তা সুদূর নক্ষত্রপুঞ্জের উচ্চতায় স্থিত; বরং তারচেয়েও আরও ঊর্ধ্বে তার অবস্থান।

তারা গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো বলে বেড়ান না। তাদের সমুখে সম্মান ও মর্যাদার ডালি সাজিয়ে ধরলেও তারা সেগুলো স্বীকার করতে চান না।

অবুঝ মানুষরা তাদের তেমন মূল্যায়ন করে না; কিন্তু তারাও তো ভ্রুক্ষেপ করেন না মানুষের এই উন্নাসিকতা। তাদেরকে ভালোবাসে পৃথিবীর সকল তৃণলতা। তাদের নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে আসমানের সকল ফেরেশতা। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাদের অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মৃত্যুর জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি

📄 মৃত্যুর জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি


বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত তার অন্তিম সফরের জন্য সদা প্রস্তুত থাকা। কারণ, সে জানে না, কখন তার নিকট আকস্মিক তার প্রতিপালকের আদেশ এসে পড়বে। তার জানা নেই, কখন সে প্রস্তুতি নেবে। এ কারণে সে সর্বদাই প্রস্তুতি নিয়ে থাকবে।

কিন্তু অধিকাংশ মানুষকে দেখি, তাদের যৌবন তাদেরকে ধোঁকার মধ্যে ফেলে রেখেছে। কালচক্রের ধাবমানতা যেন তারা ভুলেই গেছে। দুনিয়ার যাবতীয় দীর্ঘ আশা ও প্রত্যাশা তাদেরকে প্রতারণার মধ্যে ফেলে রেখেছে। তাদের চোখের তারায় খেলা করে শুধু দুনিয়ায় রঙিন স্বপ্ন।

কোনো কোনো আলেম মনে করে, আজ ইলমটাই শুধু শিখি, পরে মন স্থির করে এর ওপর আমল করব। এভাবে সে অলসতা ও আয়েশের আশ্রয় নিয়ে নিজের পদস্খলন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে থাকে। তাওবার প্রস্তুতিকে বিলম্বিত করে। কারও গিবতে লিপ্ত হয় অথবা শুনতে থাকে। সে এমন সন্দেহপূর্ণ কাজ করতে থাকে, যা তার সকল ধর্ম-কর্ম ও পরহেজগারিকে নস্যাৎ করে দেয়। সে কবরকে ভুলে থাকে, অথচ হঠাৎ যেকোনো সময় বেজে উঠতে পারে তার মৃত্যুর ঘণ্টা।

সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তি সে-ই, যে প্রতিমুহূর্তে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনে ব্যস্ত থাকে। কখনো যদি আকস্মিক মৃত্যু এসেও পড়ে- তবে তো সে প্রস্তুত। আর যদি না আসে তাহলে তো সে প্রতিনিয়ত কত কত সৎ আমলের সুরভিত পুষ্প-ফুলে উপচে নিল জীবনের দীর্ঘ আঁচল!

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 গোনাহের পরিণতি

📄 গোনাহের পরিণতি


বর্তমানের অনেক আলেমই সীমাহীন দুর্যোগ, দুর্ভোগ ও মুসিবতের মধ্যে কাল যাপন করছেন। অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে কাটছে তাদের জীবন ও জীবিকা। বিষয়টি ভাবনায় আসতেই আমার মুখে এসে গেল—إِنَّ اللّٰهَ اَکْرَمُ الْاَکْرَمِیْن —আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে মর্যাদাশীল। আর তাঁর মর্যাদার দাবিই হলো, বান্দার ওপর ব্যাপক রহম করা। তাহলে মানুষদের আজ এই অবস্থা কেন? আলেমদের এই দুর্দশা কেন?

অনুসন্ধান নিয়ে দেখতে পেলাম, মুসলমান হিসেবে অধিকাংশের অস্তিত্ব না থাকার মতোই। তারা আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। চতুষ্পদ জন্তুর মতো তারা তাদের অভ্যাস ও প্রবৃত্তির চাহিদার অনুসরণ করে চলে। শরিয়ত যদি তাদের চাহিদামতো হয় তবে সেটা পালন করে; নতুবা তারা তাদের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষামতোই চলে। যেভাবেই হোক, সম্পদ অর্জিত হলেই হলো; হালাল-হারামের কোনো ধার তারা ধারে না। পরিবেশ ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে নামাজ পড়া সহজ হলে পড়ে; অন্যথায় পড়ে না। নিষেধ ও হারাম জানা সত্ত্বেও বড় বড় গোনাহের মধ্যে সর্বদা লিপ্ত থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের কারও হয়তো ইলম বা জ্ঞানের প্রাচুর্য রয়েছে; কিন্তু তার সাথে পাল্লা দিয়ে রয়েছে গোনাহের ব্যাপকতা।

এই যখন অবস্থা, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি যত বেশিই হোক না কেন, তবুও সেটা তাদের গোনাহের তুলনায় অনেক কম।

আর যদি আল্লাহ তাআলা তাদের গোনাহ মাফ করার জন্য তাদেরকে কোনো বালা-মুসিবতে আপতিত করেন, তখন কোনো কোনো ফরিয়াদি অনুযোগ করে বলে ওঠে, আচ্ছা বলো তো, আমার কোন গোনাহের কারণে এমন হলো? [আহা, ভাবখানা এমন—তাদের জীবনে যেন শাস্তিযোগ্য কোনো গোনাহই সংঘটিত হয়নি!]

অথচ গোনাহের পাহাড় জমে আছে পৃথিবী জুড়ে। এর একাংশ সহ্য করতেও পৃথিবী আজ বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে।

অনেক বৃদ্ধ ব্যক্তিও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে। সে কি জানে না, এটি তার যৌবনে আল্লাহ তাআলার হক নষ্ট করার শাস্তি?

হায়, যখনই কোনো মুসিবতে আপতিত হও, তখন স্মরণ রেখো, এটা তোমার কৃত গোনাহের কারণেই হয়েছে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুনিয়ামুখী আলেম ও আখেরাতমুখী আলেম

📄 দুনিয়ামুখী আলেম ও আখেরাতমুখী আলেম


আলেমদের মাঝে এত যে রেষারেষি হিংসা বিদ্বেষ ও পারস্পরিক দোষচর্চা— আমি এর কারণ অনুসন্ধান করে দেখলাম, এগুলোর প্রধান উৎস হলো দুনিয়ার প্রতি তাদের লোভ ও আসক্তি। কারণ, আখেরাতমুখী আলেমগণ দ্বীনের প্রতি নিঃশর্ত অনুগত হন। তারা এভাবে রেষারেষি করে বেড়ান না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا )

যা কিছু তাদেরকে দেওয়া হয়, তার প্রতি তারা তাদের অন্তরে কোনো চাহিদা বোধ করে না। [সুরা হাশর: ৯]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَقُولُونَ: رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْأَيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غلا لِلَّذِينَ آمَنُوا )

(মুমিনগণ) বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, ক্ষমা করো আমাদেরকে এবং আমাদের সেই ভাইদেরকেও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে এবং আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। [সুরা হাশর: ১০]

হজরত আবু দারদা রা. প্রতিরাতে তার সকল সাথির জন্য দুআ করতেন।

হজরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. একবার ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর ছেলেকে বললেন, আমি প্রতিদিন প্রভাতে যে ছয় জন ব্যক্তির জন্য একান্তভাবে দুআ করি, তোমার বাবা হলেন তাদের অন্যতম।

দুনিয়ামুখী ও আখেরাতমুখী আলেমদের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-

এক. দুনিয়ামুখী আলেম যারা, তারা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের প্রতি অত্যধিক আগ্রহী হন। তারা নিজেদের নিকট মানুষদের আধিক্য কামনা করেন। লোকদের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসেন।

দুই. আখেরাতমুখী আলেম যারা, তারা কখনোই উল্লিখিত তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দেন না। তারা এগুলোকে ভয় করেন। এগুলো থেকে দূরে থাকতে চান। তবে কখনো নিজের ওপর দায়িত্ব এসে গেলে সবার ওপর দয়া ও মহানুভবতার পরিচয় দেন।

যেমন, আল্লামা নাখঈ রহ. কখনো কোনো খুঁটি বা তাকিয়াতে হেলান দিতেন না।

হজরত আলকামা রহ. তাঁর পেছনে কারও চলাকে পছন্দ করতেন না।

এমনকি আলেমদের মধ্যে এমন কিছু বুজুর্গ ব্যক্তিও অতিবাহিত হয়েছেন, যারা তাদের নিকট চারজনের বেশি উপবেশন করলে সেখান থেকে উঠে যেতেন। নিজেদের অহংকার প্রকাশ পাওয়ার সকল ব্যবস্থা ও মাধ্যম তারা এভাবেই পরিহার করে চলতেন।

তারা ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে অন্যদের প্রাধান্য দিতেন। প্রশ্নকারীকে অন্যের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। তারা খ্যাতির চেয়ে অখ্যাতিকেই পছন্দ করতেন বেশি। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সাগরের মাঝে তারা ছিলেন টলটলায়মান নৌকার অভিযাত্রীর মতো। নিজেদের এবং অন্যদের মুক্তির চিন্তা তাদেরকে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল। এত কিছুর পর অন্যদের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ করার সময় ও সুযোগ কোথায়!

তাই তারা সর্বক্ষণ একে অন্যের জন্যে দুআ করতেন। একে অন্যের থেকে উপকৃত হতেন। তারা ছিলেন দ্বীনের সফরে এমন এক সমমনা অভিযাত্রী দল, যারা ছিলেন পরস্পরের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল। পারস্পরিক সম্প্রীতি ছিল যাদের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। কারণ, তাদের দিন-রাতের অবিরাম যাত্রা ও অভিযাত্রা এগিয়ে চলেছে জান্নাতের অভিমুখে। তাই তারা ভেবেছেন, পথের মাঝেই পড়ে থাকুক ঠুনকো স্বার্থ নিয়ে সব রেষারেষির জঞ্জাল!

টিকাঃ
৪. কথাটি ইমাম যাহাবি রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' তে উল্লেখ করেছেন- ১১/২২৭।
৫. তাঁর পুরো নাম আবু ইমরান ইবরাহিম ইয়াযিদ ইবনে কায়েস আন-নাখঈ। ইয়ামানি এরপর কুফি। তিনি ছিলেন ইমাম হাফেজে হাদিস এবং ফকিহ। ইসলামি জ্ঞানের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বংশগতভাবে তিনি ছিলেন আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদের বোন মালিকার পুত্র। কুফাবাসীর একজন মুফতি। তিনি ছিলেন খুবই সচ্চরিত্রবান। লৌকিকতা-বর্জিত অমায়িক মানুষ। তাঁর স্ত্রী হুনাইদা বলেন, তিনি একদিন পরপর রোজা রাখতেন। হাজ্জাজের ভয়ে তাকে লুকিয়ে থাকতে হতো। অবশেষে যখন তাঁর নিকট একদিন হাজ্জাজের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছাল, তখন তিনি খুশিতে আল্লাহর দরবারে সেজদায় পড়ে গেলেন এবং দীর্ঘক্ষণ কাঁদলেন। তিনি ৯৬ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সূত্র- সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা ৪/৫২০। এবং তাবাকাতু ইবনু সা'দ : ৬/২৭০।
৬. তিনি ছিলেন কুফা নগরীর একজন বিখ্যাত আলেম, ফকিহ ও কারি। আরও ছিলেন হাফেজে হাদিস, ইমাম, সংস্কারক ও মুজতাহিদ। তাঁর পুরো নাম আবু শিবিল আলকামা ইবনে কায়েস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মালেক ইবনে আলকামা বিন সালামান বিন কুহুল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশাতেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইলম ও জিহাদের প্রয়োজনে বহু স্থানে সফর করেছেন। এরপর কুফায় অবস্থান করে বিরতিহীনভাবে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর সান্নিধ্য অর্জন করেন। তাঁর থেকে ইলম অর্জন করেন। তিনি ৭২ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা ৪/৩৫-৬১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00