📄 সতর্কতাই নিরাপত্তার উত্তম পথ
যে ব্যক্তি ফিতনার কাছাকাছি থাকে, তার সকল নিরাপত্তা উবে যায়। আর নিজের ধৈর্য ও নিয়ন্ত্রণের কথা বলে যারা ফিতনার দিকে এগিয়ে আসে, তাদেরকে নিজেদের শক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে তারা হয় বিচ্যুত বিভ্রান্ত ও পদস্খলিত কিংবা তাদেরকে সইতে হয় সীমাহীন দুর্যোগ ও দুর্ভোগ...।
এভাবে কত আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিদার মানুষ অবেলায় হারিয়ে গেছে; লাঞ্ছিত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে তাদের আগামী। সবচেয়ে বেশি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত হলো জিহ্বা ও চোখ। তাই হে বন্ধু, ফিতনার সীমানায় থেকেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখার মিথ্যা প্রতারণা থেকে বেঁচে থেকো। এ বড় সঙ্গিন কাজ। প্রবৃত্তির চক্র-চাল বড় মারাত্মক। বিশ্বজয়ী কত বীরযোদ্ধাও লড়াই-প্রান্তে এভাবে গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছে। হায়, আঘাতটা এসেছে সেখান থেকেই, তুচ্ছতা ও অবহেলায় যার দিকে দৃষ্টিই দেওয়া হয়নি। একবার স্মরণ করো সেই ওহুদ প্রান্তরের করুণ চিত্র—হামজার অমিত বাহুর শাণিত তরবারি ছিন্ন করে চলেছে কত বীর, লুটিয়ে দিচ্ছে কোরাইশদের কত গর্দান। অথচ তিনি নিজেই শহিদ হলেন লুকিয়ে থাকা ওয়াহশির গুপ্ত বল্লমে! কবি বলেন,
فتبصر ولا تشم كل برق .... رب برق فيه صواعق حين فبلاء الفتى موافقة النف ... س وبدء الهوى طموح العين
বিচক্ষণতার সাথে পথ চলো। প্রতিটি বিদ্যুৎ চমকের আনন্দ উপভোগ করতে চেয়ো না। কিছু বিজলীতে রয়েছে মৃত্যুর পরোয়ানা।
প্রবৃত্তির অনুসরণই অনভিজ্ঞ যুবকের বিপর্যয়ের প্রধান কারণ; যার সূচনা করে চোখের অন্যায় অতৃপ্ত দৃষ্টির কামনা।
টিকাঃ
*. এর দ্বারা ওহুদ প্রান্তরের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে- যেখানে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার গোলাম ওয়াহশির বল্লমের আঘাতে হজরত হামজা রা. শহিদ হন। ওয়াহশি লুকিয়ে লুকিয়ে শুধু এই সুযোগের অপেক্ষায়ই ছিল। ঘটনাটি ইমাম বোখারি রহ. 'কিতাবুল মাগাযি' এর মধ্যে 'قتل حمزة ابن عبد المطلب' শিরোনামে উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারি: ৭/৪০৭২। একইভাবে ইবনে হিশাম রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'السيرة النبوية' তে দালিলিকভাবে এোটার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।
📄 ইবাদতের সাথে অন্তরের সংযোগ
أعظم المعاقبة أن لا يحس المعاقب بالعقوبة - শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি তার (গোপন) শাস্তির বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারে, তবে এটাই হলো তার জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি।
এরচেয়েও মারাত্মক ব্যাপার হলো, সতর্ক না হয়ে বরং শাস্তির বিষয় নিয়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকা। যেমন, হারাম সম্পদ নিয়ে গর্ব করা। গোনাহের বিষয়ে ভাবনাহীন থাকা। এমন ব্যক্তি কখনো ইবাদতে সফলতা লাভ করতে পারে না। আনন্দ ও তৃপ্তি পায় না।
আমি অনেক আলেম ও জাহেদের ক্ষেত্রেও লক্ষ করে দেখেছি, তারা তাদের শাস্তি ও বঞ্চনা সম্পর্কে সচেতন নয়। এগুলোর অধিকাংশ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সুবিধা ভোগের কামনার কারণেই হয়েছে। অন্তর তাদের দুনিয়ার সাথে লেগে গেছে।
এ ধরনের আলেমরা ভুল ধরলে রেগে যায়। এ ধরনের বক্তারা ভণিতার আশ্রয় গ্রহণ করে। আর এ ধরনের জাহেদ ব্যক্তি হয় মুনাফিক বা লোক দেখানো আমলকারী।
তাদের প্রকাশ্য শাস্তি হলো, দুনিয়ার প্রতি লোভ থাকার কারণে তারা সত্য ও সঠিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর তাদের অভ্যন্তরীণ শাস্তি হলো, তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় আল্লাহর সাথে একান্ত আলাপের মিষ্টতা এবং নির্জন ইবাদতের আস্বাদন।
হ্যাঁ, তবে কিছু মুমিন পুরুষ ও নারী রয়েছে তাদের ব্যতিক্রম। আল্লাহ তাদের কারণে পৃথিবী এখনো স্থিত রেখেছেন। তাদের একাকী আমলগুলো সম্মিলিত আমলের মতোই; বরং এরচেয়েও আরও উজ্জ্বল। তাদের নির্জন আমলগুলো প্রকাশ্য আমলের মতোই; বরং তারচেয়েও আরও মুগ্ধকর ও স্বাদযুক্ত। তাদের হিম্মত ও ঈমানের দৃঢ়তা সুদূর নক্ষত্রপুঞ্জের উচ্চতায় স্থিত; বরং তারচেয়েও আরও ঊর্ধ্বে তার অবস্থান।
তারা গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো বলে বেড়ান না। তাদের সমুখে সম্মান ও মর্যাদার ডালি সাজিয়ে ধরলেও তারা সেগুলো স্বীকার করতে চান না।
অবুঝ মানুষরা তাদের তেমন মূল্যায়ন করে না; কিন্তু তারাও তো ভ্রুক্ষেপ করেন না মানুষের এই উন্নাসিকতা। তাদেরকে ভালোবাসে পৃথিবীর সকল তৃণলতা। তাদের নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে আসমানের সকল ফেরেশতা। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাদের অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।
📄 মৃত্যুর জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি
বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত তার অন্তিম সফরের জন্য সদা প্রস্তুত থাকা। কারণ, সে জানে না, কখন তার নিকট আকস্মিক তার প্রতিপালকের আদেশ এসে পড়বে। তার জানা নেই, কখন সে প্রস্তুতি নেবে। এ কারণে সে সর্বদাই প্রস্তুতি নিয়ে থাকবে।
কিন্তু অধিকাংশ মানুষকে দেখি, তাদের যৌবন তাদেরকে ধোঁকার মধ্যে ফেলে রেখেছে। কালচক্রের ধাবমানতা যেন তারা ভুলেই গেছে। দুনিয়ার যাবতীয় দীর্ঘ আশা ও প্রত্যাশা তাদেরকে প্রতারণার মধ্যে ফেলে রেখেছে। তাদের চোখের তারায় খেলা করে শুধু দুনিয়ায় রঙিন স্বপ্ন।
কোনো কোনো আলেম মনে করে, আজ ইলমটাই শুধু শিখি, পরে মন স্থির করে এর ওপর আমল করব। এভাবে সে অলসতা ও আয়েশের আশ্রয় নিয়ে নিজের পদস্খলন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে থাকে। তাওবার প্রস্তুতিকে বিলম্বিত করে। কারও গিবতে লিপ্ত হয় অথবা শুনতে থাকে। সে এমন সন্দেহপূর্ণ কাজ করতে থাকে, যা তার সকল ধর্ম-কর্ম ও পরহেজগারিকে নস্যাৎ করে দেয়। সে কবরকে ভুলে থাকে, অথচ হঠাৎ যেকোনো সময় বেজে উঠতে পারে তার মৃত্যুর ঘণ্টা।
সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তি সে-ই, যে প্রতিমুহূর্তে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনে ব্যস্ত থাকে। কখনো যদি আকস্মিক মৃত্যু এসেও পড়ে- তবে তো সে প্রস্তুত। আর যদি না আসে তাহলে তো সে প্রতিনিয়ত কত কত সৎ আমলের সুরভিত পুষ্প-ফুলে উপচে নিল জীবনের দীর্ঘ আঁচল!
📄 গোনাহের পরিণতি
বর্তমানের অনেক আলেমই সীমাহীন দুর্যোগ, দুর্ভোগ ও মুসিবতের মধ্যে কাল যাপন করছেন। অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে কাটছে তাদের জীবন ও জীবিকা। বিষয়টি ভাবনায় আসতেই আমার মুখে এসে গেল—إِنَّ اللّٰهَ اَکْرَمُ الْاَکْرَمِیْن —আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে মর্যাদাশীল। আর তাঁর মর্যাদার দাবিই হলো, বান্দার ওপর ব্যাপক রহম করা। তাহলে মানুষদের আজ এই অবস্থা কেন? আলেমদের এই দুর্দশা কেন?
অনুসন্ধান নিয়ে দেখতে পেলাম, মুসলমান হিসেবে অধিকাংশের অস্তিত্ব না থাকার মতোই। তারা আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। চতুষ্পদ জন্তুর মতো তারা তাদের অভ্যাস ও প্রবৃত্তির চাহিদার অনুসরণ করে চলে। শরিয়ত যদি তাদের চাহিদামতো হয় তবে সেটা পালন করে; নতুবা তারা তাদের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষামতোই চলে। যেভাবেই হোক, সম্পদ অর্জিত হলেই হলো; হালাল-হারামের কোনো ধার তারা ধারে না। পরিবেশ ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে নামাজ পড়া সহজ হলে পড়ে; অন্যথায় পড়ে না। নিষেধ ও হারাম জানা সত্ত্বেও বড় বড় গোনাহের মধ্যে সর্বদা লিপ্ত থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের কারও হয়তো ইলম বা জ্ঞানের প্রাচুর্য রয়েছে; কিন্তু তার সাথে পাল্লা দিয়ে রয়েছে গোনাহের ব্যাপকতা।
এই যখন অবস্থা, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি যত বেশিই হোক না কেন, তবুও সেটা তাদের গোনাহের তুলনায় অনেক কম।
আর যদি আল্লাহ তাআলা তাদের গোনাহ মাফ করার জন্য তাদেরকে কোনো বালা-মুসিবতে আপতিত করেন, তখন কোনো কোনো ফরিয়াদি অনুযোগ করে বলে ওঠে, আচ্ছা বলো তো, আমার কোন গোনাহের কারণে এমন হলো? [আহা, ভাবখানা এমন—তাদের জীবনে যেন শাস্তিযোগ্য কোনো গোনাহই সংঘটিত হয়নি!]
অথচ গোনাহের পাহাড় জমে আছে পৃথিবী জুড়ে। এর একাংশ সহ্য করতেও পৃথিবী আজ বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে।
অনেক বৃদ্ধ ব্যক্তিও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে। সে কি জানে না, এটি তার যৌবনে আল্লাহ তাআলার হক নষ্ট করার শাস্তি?
হায়, যখনই কোনো মুসিবতে আপতিত হও, তখন স্মরণ রেখো, এটা তোমার কৃত গোনাহের কারণেই হয়েছে।