📄 পরিণামের প্রতি দৃষ্টি রাখা
যে ব্যক্তি পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি ফেলে কোনো বিষয়ের সূচনাতেই তার পরিণতি লক্ষ করে নিতে পারে, সে সেই বিষয়ের কল্যাণ লাভ করে এবং অকল্যাণ থেকে মুক্তি পায়। অপরদিকে যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের পরিণামের কথা চিন্তা করে না, তার ওপর প্রবৃত্তি প্রবল হয়ে যায়। ফলে সে যা থেকে পেতে চেয়েছিল নিরাপত্তা ও নির্ভরতা, তা থেকেই সে প্রাপ্ত হয় কষ্ট ও অনিষ্টতা। আর যে ব্যাপারে সে কামনা করেছিল শান্তি ও স্বস্তি, তা থেকে প্রাপ্ত হয় ক্লান্তি ও অস্বস্তি।
যদিও কথাটি পরীক্ষাযোগ্য এবং ঘটিতব্য একটি বিষয়ের দর্শন; কিন্তু এটাকে একটি পরীক্ষিত অতীতের দ্বারাও প্রমাণ করা যায়। যেমন ধরো—তুমি তোমার জীবনের কিছু ক্ষেত্রে আল্লাহর আনুগত্য করেছ, আবার কিছু ক্ষেত্রে তাঁর অবাধ্যতাও করেছ। এখন বলো, এখনো কি তোমার মধ্যে রয়ে গেছে সেই গোনাহের স্বাদ ও অনুভব? কিংবা সেই আনুগত্যের ক্লান্তি ও ক্লেশ? দুটোর কোনোটিই কিন্তু তোমার মধ্যে এখন অবশিষ্ট নেই। তোমার বর্তমান থেকে দুটো জিনিসই মুছে গেছে। কিন্তু অবশিষ্ট থেকে গেছে সেই গোনাহের পরিণাম ও প্রতিফল। এর শাস্তি তোমাকে পেতে হবে।
হায়, গোনাহের সেই অবস্থা যদি মনের খেয়ালে এসে আবার মনের খেয়ালেই হারিয়ে যেত! গোনাহটি যদি কার্যে পরিণত না করা হতো, তাহলে কতই না ভালো হতো!
এভাবে তুমি অনেক মানুষকে মৃত্যুর সময় কৃত গোনাহের কারণে বারবার আফসোস করতে দেখেছ। স্মরণ রেখো, গোনাহের স্বাদ ও আস্বাদন এক সময় রূপান্তরিত হয় গলার কাঁটায়। মজা তো ফুরিয়ে যায় অল্পতেই; কিন্তু বাকি থাকে তার দুঃখ ও দুর্দশা এবং অনুতাপ ও অনুশোচনার ক্লেশ।
আমাকে বলো, তোমার অর্জিত জ্ঞান তোমাকে কি কোনো জিনিসের পরিণাম সম্পর্কে ভাবতে শেখায় না?
জনৈক কবি বলেন, فراقب العواقب تسلم ولا تمل مع هوى الحس فتندم. সুতরাং হে বন্ধু, পরিণাম সম্পর্কে ভেবে অগ্রসর হও, নিরাপদ থাকবে। প্রবৃত্তির চাহিদার দিকে ঝুঁকে পড়ো না কিছুতেই, অন্যথায় লজ্জিত হবে।
📄 প্রতারণার সঙ্গে বসবাস
যে ব্যক্তি দুনিয়ার পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে, সে অবশ্যই সতর্ক ও সচেতন হয়। সফরের দীর্ঘ পথ সম্পর্কে যার রয়েছে নিশ্চিত বিশ্বাস, সে অবশ্যই পাথেয় সঞ্চয় করে, প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অথচ হে বন্ধু,
ما أعجب أمرك يا من يوقن بأمر ثم ينساه، ويتحقق ضرر حال ثم يغشاه . وتخشى الناس والله أحق أن تخشاه
তোমার বিষয়টি কত আশ্চর্যজনক—একটি বিষয়কে নিশ্চিত জেনেও আবার সেটাকে ভুলে যাও।
ব্যাপক ক্ষতি ও বিপদের বাস্তবতা জেনেও অন্যদিকে লিপ্ত হও।
ভয় করছ মানুষকে; অথচ আল্লাহকেই তোমার অধিক ভয় করা উচিত।
এ কী বিস্ময়কর ব্যাপার!
দুনিয়ার অনিশ্চিত কোনো বিপদের সামান্য আশঙ্কাও তোমাকে কাবু করে ফেলে; অথচ আখেরাতের মতো একটি নিশ্চিত অনিবার্য বিষয় তোমার মাঝে কোনো প্রভাব ফেলছে না!
আরও অধিক আশ্চর্যের ব্যাপার তো হলো, তুমি ধোঁকা ও প্রতারণার উপকরণ নিয়ে তৃপ্ত ও আনন্দিত হয়ে আছ। কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের অন্বেষণ ছেড়ে অনর্থক বিষয় নিয়েই মত্ত রয়েছ। অদেখা জগৎকে ভুলে প্রকাশ্য জগতেই পুরো বুঁদ হয়ে আছ। রোগের যাতনা ভুলে সাময়িক সুস্থতা নিয়ে রয়েছ প্রতারিত। আসন্ন কষ্ট ও দুর্ভোগের কথা ভুলে বর্তমানের অবকাশ নিয়ে রয়েছ উল্লসিত। অথচ অন্যের মৃত্যু কি তোমার মৃত্যুর পয়গাম নিয়ে আসেনি? অন্যের কবর-শয্যা কি তোমার কবর-শয্যার খবর দেয় না? হায়, সামান্য এই ভোগ-বিলাস তোমাকে মহা ধ্বংসের চেতনা থেকে কীভাবেই না বিমুখ করে রেখেছে!
كأنك لم تسمع بأخبار من مضى .. ولم تر في الباقين ما يصنع الدهر ! فإن كنت لا تدري فتلك ديارهم .... محاها مجال الريح بعدك والقبر !
আহা, তুমি যেন বিগত মানুষের কোনো সংবাদই শোনোনি! বিরাজিত মানুষদের নিয়ে কালের চক্র যে নির্মম খেলাটা খেলেছে— তা-ও যেন দেখোনি তুমি।
এতদিনেও যদি না জানো, আজ অন্তত তাকিয়ে দেখো তাদের বাড়ি- ঘরের দিকে—যুগের ঘূর্ণিবায়ু সেসব ধ্বসিয়ে দিয়েছে কবে। এবং জেনে রেখো, তোমার মৃত্যুর পরও এমনই অবস্থা হবে তোমার কবরের।
তুমি নিজেই কত প্রাসাদ-অট্টালিকাবাসীকে দেখেছ, কিছুতেই তারা প্রাসাদ ছেড়ে কবরে নামতে চায়নি। তবুও তাদের নামতে হয়েছে; বরং নামানো হয়েছে। আরও কত অট্টালিকাবাসীকে দেখেছ, তাদেরকে নিজেদের অট্টালিকা থেকে সরানো হয়েছে... এরপর তাদের শত্রুরাই চেপে বসেছে সেই অট্টালিকায়।
তাই হে প্রতিমুহূর্তে কবরের দিকে এগিয়ে যাওয়া যাত্রী, তোমার কাজ দেখে মনে হয়, তুমি যেন কবরের ভয়াবহ দুর্ভোগ সম্পর্কে কিছুই জানো না। এ তোমার কেমন আচরণ!
وكيف تنام العين وهي قريرة ... ولم تدر من أي المحلين تنزل؟
এখনো নিশ্চিন্তে ঘুমায় তোমার দু-চোখ, অথচ সে এখনো জানে না, কবরে কী ধরনের শয্যায় সে শায়িত হবে!
📄 সতর্কতাই নিরাপত্তার উত্তম পথ
যে ব্যক্তি ফিতনার কাছাকাছি থাকে, তার সকল নিরাপত্তা উবে যায়। আর নিজের ধৈর্য ও নিয়ন্ত্রণের কথা বলে যারা ফিতনার দিকে এগিয়ে আসে, তাদেরকে নিজেদের শক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে তারা হয় বিচ্যুত বিভ্রান্ত ও পদস্খলিত কিংবা তাদেরকে সইতে হয় সীমাহীন দুর্যোগ ও দুর্ভোগ...।
এভাবে কত আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিদার মানুষ অবেলায় হারিয়ে গেছে; লাঞ্ছিত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে তাদের আগামী। সবচেয়ে বেশি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত হলো জিহ্বা ও চোখ। তাই হে বন্ধু, ফিতনার সীমানায় থেকেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখার মিথ্যা প্রতারণা থেকে বেঁচে থেকো। এ বড় সঙ্গিন কাজ। প্রবৃত্তির চক্র-চাল বড় মারাত্মক। বিশ্বজয়ী কত বীরযোদ্ধাও লড়াই-প্রান্তে এভাবে গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছে। হায়, আঘাতটা এসেছে সেখান থেকেই, তুচ্ছতা ও অবহেলায় যার দিকে দৃষ্টিই দেওয়া হয়নি। একবার স্মরণ করো সেই ওহুদ প্রান্তরের করুণ চিত্র—হামজার অমিত বাহুর শাণিত তরবারি ছিন্ন করে চলেছে কত বীর, লুটিয়ে দিচ্ছে কোরাইশদের কত গর্দান। অথচ তিনি নিজেই শহিদ হলেন লুকিয়ে থাকা ওয়াহশির গুপ্ত বল্লমে! কবি বলেন,
فتبصر ولا تشم كل برق .... رب برق فيه صواعق حين فبلاء الفتى موافقة النف ... س وبدء الهوى طموح العين
বিচক্ষণতার সাথে পথ চলো। প্রতিটি বিদ্যুৎ চমকের আনন্দ উপভোগ করতে চেয়ো না। কিছু বিজলীতে রয়েছে মৃত্যুর পরোয়ানা।
প্রবৃত্তির অনুসরণই অনভিজ্ঞ যুবকের বিপর্যয়ের প্রধান কারণ; যার সূচনা করে চোখের অন্যায় অতৃপ্ত দৃষ্টির কামনা।
টিকাঃ
*. এর দ্বারা ওহুদ প্রান্তরের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে- যেখানে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার গোলাম ওয়াহশির বল্লমের আঘাতে হজরত হামজা রা. শহিদ হন। ওয়াহশি লুকিয়ে লুকিয়ে শুধু এই সুযোগের অপেক্ষায়ই ছিল। ঘটনাটি ইমাম বোখারি রহ. 'কিতাবুল মাগাযি' এর মধ্যে 'قتل حمزة ابن عبد المطلب' শিরোনামে উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারি: ৭/৪০৭২। একইভাবে ইবনে হিশাম রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'السيرة النبوية' তে দালিলিকভাবে এোটার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।
📄 ইবাদতের সাথে অন্তরের সংযোগ
أعظم المعاقبة أن لا يحس المعاقب بالعقوبة - শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি তার (গোপন) শাস্তির বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারে, তবে এটাই হলো তার জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি।
এরচেয়েও মারাত্মক ব্যাপার হলো, সতর্ক না হয়ে বরং শাস্তির বিষয় নিয়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকা। যেমন, হারাম সম্পদ নিয়ে গর্ব করা। গোনাহের বিষয়ে ভাবনাহীন থাকা। এমন ব্যক্তি কখনো ইবাদতে সফলতা লাভ করতে পারে না। আনন্দ ও তৃপ্তি পায় না।
আমি অনেক আলেম ও জাহেদের ক্ষেত্রেও লক্ষ করে দেখেছি, তারা তাদের শাস্তি ও বঞ্চনা সম্পর্কে সচেতন নয়। এগুলোর অধিকাংশ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সুবিধা ভোগের কামনার কারণেই হয়েছে। অন্তর তাদের দুনিয়ার সাথে লেগে গেছে।
এ ধরনের আলেমরা ভুল ধরলে রেগে যায়। এ ধরনের বক্তারা ভণিতার আশ্রয় গ্রহণ করে। আর এ ধরনের জাহেদ ব্যক্তি হয় মুনাফিক বা লোক দেখানো আমলকারী।
তাদের প্রকাশ্য শাস্তি হলো, দুনিয়ার প্রতি লোভ থাকার কারণে তারা সত্য ও সঠিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর তাদের অভ্যন্তরীণ শাস্তি হলো, তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় আল্লাহর সাথে একান্ত আলাপের মিষ্টতা এবং নির্জন ইবাদতের আস্বাদন।
হ্যাঁ, তবে কিছু মুমিন পুরুষ ও নারী রয়েছে তাদের ব্যতিক্রম। আল্লাহ তাদের কারণে পৃথিবী এখনো স্থিত রেখেছেন। তাদের একাকী আমলগুলো সম্মিলিত আমলের মতোই; বরং এরচেয়েও আরও উজ্জ্বল। তাদের নির্জন আমলগুলো প্রকাশ্য আমলের মতোই; বরং তারচেয়েও আরও মুগ্ধকর ও স্বাদযুক্ত। তাদের হিম্মত ও ঈমানের দৃঢ়তা সুদূর নক্ষত্রপুঞ্জের উচ্চতায় স্থিত; বরং তারচেয়েও আরও ঊর্ধ্বে তার অবস্থান।
তারা গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো বলে বেড়ান না। তাদের সমুখে সম্মান ও মর্যাদার ডালি সাজিয়ে ধরলেও তারা সেগুলো স্বীকার করতে চান না।
অবুঝ মানুষরা তাদের তেমন মূল্যায়ন করে না; কিন্তু তারাও তো ভ্রুক্ষেপ করেন না মানুষের এই উন্নাসিকতা। তাদেরকে ভালোবাসে পৃথিবীর সকল তৃণলতা। তাদের নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে আসমানের সকল ফেরেশতা। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাদের অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।