📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনপরিচিতি

📄 লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনপরিচিতি


আমাদের সালাফদের মধ্যে যে সকল মনীষী তাদের ইলম, মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে দ্বীনি ময়দানে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন, আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. তাদের মধ্যে অন্যতম। বিশেষভাবে-একই সাথে তার নসিহত ও লেখা, সমান গতিতে যেভাবে উম্মতের রাহবারি করেছে, এমন সমন্বয় খুব কম মনীষীর মধ্যেই দেখা গেছে। অনেক পরে আবার যেমনটি দেখা দিয়েছিল হজরত আশরাফ আলি থানবি রহ.-এর ক্ষেত্রে। আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. ছিলেন যেন ইলমের সাগর।

এই মহান মনীষী ৫১০ হিজরি সালে [১১২৬ খ্রিষ্টাব্দে] বসরার জাওযা নামক মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন।

তবে এই সাল নিয়ে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। তিনি নিজে যেহেতু স্পষ্টভাবে কিছু বলে যেতে পারেননি, এ কারণে অন্যরা কয়েকটি সালের কথা বলে থাকেন। সকলেই অবশ্য ৫০৮-৫১৭ এর মধ্যে রয়েছেন। তবে ৫১০ সালটি অধিক প্রসিদ্ধ এবং সঠিক হওয়ার সবচেয়ে কাছাকাছি।

তাঁর সম্বন্ধবাচক নাম আল-জাওযি। বসরার একটি মহল্লার নাম জাওযা। তাঁর দিকে সম্পর্ক করে তাকে 'জাওযি' বলা হয়। কেউ বলেন, তাঁর একজন পূর্বপুরুষ জাফর সেই জাওযা নামক মহল্লার অধিবাসী ছিলেন। সেই দিকে সম্বন্ধ করে তাকে 'জাওযি' বলা হয়।

তাঁর বাবার নাম আলি। তাঁর পুরো পরিচয়টা এভাবে বলা যায়- জামালুদ্দিন আবুল ফারাজ আবদুর রহমান ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলি ইবনে উবাইদুল্লাহ আল-কুরাশি আত-তামিমি আল-বাগদাদি, হাম্বলি।

তাঁর বয়স যখন তিন বছর, তখন তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। তার মা ও ফুফু তখন তার লেখাপড়া ও প্রতিপালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রথমে হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর বহু দূর-দূরান্তের উস্তাদদের নিকট ইলম শিক্ষার জন্য সফর করেন। লেখাপড়ার জন্য তিনি অনেক কষ্ট ও মুজাহাদা করতেন। সামান্য শুকনো রুটি দিয়ে আহার সমাধা করতেন। সমসাময়িক প্রায় ৭৮ জন আলেমের নিকট তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধতম হলেন, আবু বকর আদ-দীনওয়ারি (মৃত্যু: ৫৩২ হি./১১৪৪-৪৫), আবুল ফজল ইবনুন নাদির (মৃত্যু: ৫৫০ হি./১১৫৫ খ্রি.), আবু হাকিম আন-নাহরাওয়ানি (মৃত্যু: ৫৫৬ হি./১১৬১ খ্রি.) আবু ইয়ালা রহ. (মৃত্যু : ৫৫৮ হি./১১৬৩ খ্রি.), ইবনে রজব হাম্বলি রহ.।

ইবনুল জাওযি রহ. প্রখর মেধা ও প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তাঁর উস্তাদ ইবনুয যাগুনী রহ. লোকদের ওয়াজ-নসিহত করতেন। সেখানে অনেক লোকের সমাগম হতো। সে সময় এটি একটি বিশেষ মর্যাদার বিষয় ছিল। উস্তাদের মৃত্যুর পর নিজের যোগ্যতার কারণে ইবনুল জাওযি রহ. তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারতেন; কিন্তু তখন তাঁর বয়স অল্প হওয়ায় তা সম্ভব হয় না। অবশ্য কিছুদিন পরই তিনি সেই স্থান অধিকার করেন এবং তিনি এ ময়দানে আরও বেশি প্রসিদ্ধি ও দক্ষতা অর্জন করেন। তার জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ও আলংকারিক বাক্যবিন্যাস চতুর্দিকে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি জামিউল মানসুরে ওয়াজ করার যোগ্যতা অর্জন করেন। খলিফা আল মুকতাফির ওজির ইবনে হুবায়রার গৃহে অনুষ্ঠিত ওয়াজ-মাহফিলেও তিনি ওয়াজ করেছেন। এরপর খলিফা আল মুসতানজিদের শাসনামলে (৫৫৫-৬৬ হি./১১৬০-৭০ খ্রি.) তিনি শাহি মসজিদে ওয়াজ করা শুরু করেন। সমকালীন খলিফাগণও তাঁর ওয়াজের মজলিসে উপস্থিত হতেন। তার ওয়াজে দশ হাজার থেকে এক লক্ষ লোকের সমাগম হতো। জনগণ তার নসিহত ও উপদেশ শুনে খুব প্রভাবিত হতো। প্রায় লক্ষাধিক মানুষ তার হাতে সরাসরি তাওবা করেছেন। প্রায় বিশ হাজার ইহুদি ও খ্রিষ্টান তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

হজরত ইবনে কাসির রহ. তাঁর ওয়াজের ব্যাপারে বলেন, 'নসিহত প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। তার আগে কেউ আর এমনটি ছিল না—তার পদ্ধতি, ধরণ, ভাষার বিশুদ্ধতা, বিন্যাস, মিষ্টতা, হৃদয়গ্রাহিতা, বিস্ময়কর সকল চিন্তা ও ভাবনা। গভীরতম কথা। তিনি এগুলো এমনভাবে বলতেন, যেন মানুষজন সেগুলো চাক্ষুষ দেখতে পেত। প্রত্যক্ষ অনুভব করতে পারত। অতি দ্রুত তারা সেগুলো বুঝেও যেত। সহজ কথা ও বাক্যে তিনি গভীরতম অর্থ ধারণ করতে পারতেন।'

এরপর খলিফা আল মুসতাদিও তাঁর ওপর বিশেষ নজর রাখতেন। ইবনুল জাওযি রহ. খলিফার নামে—আল মিসবাহুল মুদি ফি দাওলাতিল মুসতাদি' নামক একটি গ্রন্থও রচনা করেন।

৫৭০ সালের দিকে তিনি দারব দীনার-এ একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত করেন এবং সেখানে পাঠদান শুরু করেন। এ বছরই তিনি তাঁর ওয়াজের মাধ্যমে সম্পূর্ণ কোরআনের তাফসির সমাপ্ত করেন। মুসলিম বিশ্বে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ওয়াজ-অনুষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে কোরআনের তাফসির সমাপ্ত করেন।

তিনি একজন বড় কবিও ছিলেন। কবিদের অনেক কবিতাও তাঁর ছিল মুখস্থ ও কণ্ঠস্থ।

তিনি নফল ইবাদতের চেয়ে ইলমচর্চাকে বেশি প্রাধান্য দিতেন। জুহুদ বা কৃচ্ছসাধনার প্রতি তাঁর কোনো অনুরাগ ছিল না। তিনি বরং পানাহার ও স্মরণশক্তি বর্ধক খাদ্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন এবং পোশাক-পরিচ্ছদের প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি দিতেন।

অনেক খলিফাই তাঁর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রেখেছেন। কিন্তু তিনি কোনোদিন সম্পদ বা ক্ষমতা লাভের জন্য কোনো খলিফার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেননি। তিনি তাদের মাধ্যমে কখনো দুনিয়ার বিষয়-আশয়ও কামনা করেননি। সত্য প্রকাশে তিনি কখনো পিছপা হননি। 'লিফতাতুল কাবিদ ফি নাসিহাতিল ওয়ালাদ' গ্রন্থে তিনি বলেন, জীবিকা অর্জনের জন্য আমি কখনো কোনো আমিরের তোষামোদ করিনি।

তিনি বিদ’আতের এত কঠোর সমালোচনা করতেন যে, কখনো কখনো এটা তার নিজের অনুসারীদের জন্যও কঠিন হয়ে পড়ত। এমনকি ইমাম গাজ্জালি রহ. রচিত ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থের কিছু দুর্বল হাদিসের সমালোচনা করে এর উপকারকে নিষ্কলুষ করার জন্য এটিকে তিনি নতুনভাবে লিপিবদ্ধ করেন।

ওয়াজের মতো রচনা-সংকলনেও তাঁর সমান আগ্রহ ছিল। যে গতিতে তিনি ওয়াজ করতেন, একই গতিতে রচনার কাজেও নিয়োজিত থাকতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি প্রায় তিনশত গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি আবার কয়েক খণ্ড-সংবলিত। তাঁর সময় পর্যন্ত কোনো মুসলিম লেখক এত বেশি গ্রন্থ রচনা করেননি।

তাঁর বাক্যবিন্যাস ছিল খুব সহজ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। বক্তব্যের মধ্যে অনেক উদাহরণ এবং ছোট ছোট ঘটনা উল্লেখ করতেন। পাঠক এবং শ্রোতা এতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। ওয়াজের ক্ষেত্রে তিনি কখনো কখনো দুর্বল হাদিসও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ‘উলুমুল হাদিস’ হাদিস-সংক্রান্ত ইলমি গ্রন্থে তিনি ছিলেন খুবই কঠোর এবং মুহাqক নজরের ব্যক্তি।

তাঁর রচনাগুলোর অধিকাংশই ছিল সংকলন ধরনের। এ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন, তিনি এই সকল বিষয়ের অনেক বিষয়ের রচয়িতা নন; সংকলকমাত্র।

তবুও অধিকাংশ আলেমের মত হলো—তাঁর সকল রচনাই প্রশংসার যোগ্য।

জীবনের শেষ দিকে এসে তাঁকে জেল খাটতে হয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর জেলখানায় বন্দি ছিলেন। এটা হয়েছিল কিছু ভ্রান্ত মানুষ ও হিংসুকের প্ররোচনার কারণে। তারা খলিফার নিকট বিভিন্ন অভিযোগ করতে থাকে। পরিণামে তাঁকে বাগদাদ থেকে দূরে ‘ওয়াসেত’ শহরে বন্দি করে রাখা হয়। তাঁর আত্মীয়স্বজনের ওপর অত্যাচার করা হয়। বাড়ি ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়।

এই পুরো বিষয়টার পেছনে মনে করা হয় ইবনুল কাসসাব আশ- শাঈর হাত ছিল। সে-ই ষড়যন্ত্র করে এটা করেছিল। আর ষড়যন্ত্রের সুযোগ পেয়েছিল একারণে যে, ইবনুল জাওযি রহ. আমির-উমারা, রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের অনিয়ম-দুর্নীতি ও জুলুমের কঠিন সমালোচনা করতেন। তিনি তাদেরকে কখনো ভয় করে চলতেন না। ভয় করে কথা বলতেন না।

তবে অনেকে এটাও বলেন—হজরত আবদুল কাদের জিলানি রহ. এর পুত্র এবং তাঁর মাঝে কিছু বিষয় নিয়ে মতবিরোধ ছিল। কারণ, ইবনুল জাওযি আবদুল কাদের জিলানির অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। তিনি তাঁর সববিষয়ে সহমত পোষণ করতেন না। তাঁর বন্দি হওয়ার ক্ষেত্রে এটাও একটা উপলক্ষ্য হতে পারে। ফ্রী-স্ট্যান্ড

অবশেষে পাঁচ বছর জেলে বন্দি থাকার পর খলিফার মায়ের হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি লাভ করেন। ফ্রীকা-কাট একটি ইতিরিয়ামিটার

এরপর তিনি বাগদাদে ফিরে আসেন। এর দু-বছর পর তিনি সাধারণ রোগে ৫৯৭ হি./১২০০ খ্রি. সালে রমজানে জুমার দিন ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর দিন বাগদাদের সকল দোকান-পাট বন্ধ ছিল। পুরো শহর শোকে যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।

তার কিছু উল্লেখযোগ্য বইয়ের নাম:
১. আল-মুনতাজাম, ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম। (ইতিহাস সম্পর্কিত অসাধারণ একটি গ্রন্থ।)
২. সিফাতুস সাফওয়া। গ্রন্থটি মূলত আবু নুয়ায়ম ইসফাহানির 'হিলইয়াতুল আওলিয়া' গ্রন্থের সমালোচনাসহ সারসংক্ষেপ।
৩. তালবিসু ইবলিস। শয়তানের বিভিন্ন চক্রান্ত ও কৌশল নিয়ে আলোচনা—শয়তান যা দিয়ে সে জনসাধারণকে ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করে।
৪. কিতাবুল আযকিয়া। মেধা ও বুদ্ধির বিবরণ। এরপর বুদ্ধিদীপ্ত ছোট-বড় অনেক ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
৫. কিতাবুল হাছছি আলা হিফজিল ইলম। জ্ঞান সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা এবং ধরন-পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা।
৬. কিতাবুল হুমাকা ওয়াল মুগাফফালিন। গ্রন্থটিতে নির্বোধ-বোকা ও অলসদের কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে।
৬. আল মাওদুআতুল কুবরা মিনাল আহাদিছিল মারফুআ। প্রচলিত বিভিন্ন জাল হাদিস নিয়ে আলোচনা। চার খণ্ডে সমাপ্ত।
৭. যাম্মুল হাওয়া। এ গ্রন্থে প্রবৃত্তি, প্রেম ও অনুরাগের ক্ষতিসমূহের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এবং এর থেকে মুক্তির উপায়ও বর্ণনা করা হয়েছে।
৮. কিতাবুল কুসসাস ওয়াল মুযাককিরিন। এতে খ্যাতিমান ধর্মীয় কাহিনিকারদের কথা বলা হয়েছে। তাদের কিছু হাস্যকর বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
৯. কিতাবু আআজিবিল খুতাব। তেইশটি বক্তৃতার সংকলন।
১০. আল মুগনি ফিল কিরাআত।
১১. নাফইয়ুত তাশবিহ।
১২. তাকওয়িমুল লিসান।
১৩. মানাকিবু আহমাদ।
১৪. আন নাসিখু ওয়াল মানসুখ।
১৫. মানহাযুল উসুল ইলা ইলমিল উসুল।
১৬. মানহাযুল ইসাবাহ ফি মাহাব্বাতিস সাহাবা।

তার এক বিখ্যাত দুআ ছিল এমন-
إلهي لا تعذب لسانا يخبر عنك، ولا عينا تنظر إلى علوم تدل عليك ولا قدماً تمشي إلى خدمتك ولا يداً تكتب حديث رسولك. فبعزتك لا تدخلني النار فقد علم أهلها أني كنت أذب عن دينك.

হে আমার প্রভু, আপনি এমন জিহ্বাকে শাস্তি দিয়েন না, যা আপনার বিষয়ে মানুষদের খবর দিয়ে বেড়ায়। এমন চোখকেও শাস্তি দিয়েন না, যা এমনসব ইলমের দিকে তাকায়, যা আপনার অস্তিত্বের প্রমাণ। এমন দুটি পা-কেও শাস্তি দিয়েন না, যা আপনার ইবাদতের জন্য হাঁটে। এমন হাতকে শাস্তি দিয়েন না, যা আপনার রাসুলের হাদিস লেখে। এবং হে রহমশীল, আপনার মর্যাদার ওয়াস্তে আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন না। কারণ, লোকেরা তো জানে- আমি আপনার দ্বীনের সংরক্ষণেরই কাজ করতাম!

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 উপদেশ গ্রহণে মানুষের বৈশিষ্ট্য

📄 উপদেশ গ্রহণে মানুষের বৈশিষ্ট্য


মানুষ যখন ওয়াজ বা বক্তৃতা শোনে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের আবেগ ও জাগরণের সৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন সে আলোচনার মজলিস থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তার মধ্যে সেই আবেগ ও জাগ্রতভাব আর থাকে না। তার হৃদয়ে আবার ফিরে আসে আগের সেই কঠিন অলসতা ও উদাসীনতা।

আমি এর কারণ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলাম- কেন এমনটি হয়? লক্ষ করে দেখলাম, এক্ষেত্রে মানুষের অবস্থার মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে। একেক জনের অবস্থা একেক রকম। তবে তাদের সাধারণ অবস্থা হলো, উপদেশ শোনার সময়ে আর পরে অন্তর এক অবস্থায় থাকে না। দু-সময়ের চেতনা ও আবেগে তাই স্বভাবতই ভিন্নতা পরিদৃষ্ট হয়। সাধারণভাবে এটি হয় দুই কারণে-

১. ওয়াজ-উপদেশ হলো চাবুকের মতো। চাবুক যখন শরীরে আঘাত করে তখন যেভাবে আঘাত ও ব্যথা লাগে, পরে আর সেই আঘাত ও ব্যথা থাকে না।

২. মানুষ ওয়াজ-উপদেশ শোনার সময়ে এক ধরনের তৃপ্তি ও উপভোগ্যতার মধ্যে অবস্থান করে। তার শরীর ও মন দুনিয়ার সকল কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। হৃদয় থাকে শ্রবণের প্রতি নিমগ্ন। অন্তর থাকে বিগলিত। কিন্তু যখন সে মজলিস থেকে বেরিয়ে আসে এবং জীবনের নানান ব্যস্ততা ও কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তখন তার পারিপার্শ্বিকতা তাকে আবার সেগুলোর দিকেই আকৃষ্ট করে ফেলে। তাকে আবার নগদ সুখ, দুঃখ ও পার্থিবতার দিকে টেনে নেয়。

এবার বলুন, তখন কীভাবে অন্তরের সেই অবস্থা বাকি থাকবে, উপদেশ শোনার সময় তার যে অবস্থা ছিল?

তো এটিই হলো মানুষের সাধারণ অবস্থা। তবে হ্যাঁ, প্রভাব অবশিষ্ট থাকার ক্ষেত্রে জাগ্রত মননের অধিকারী ব্যক্তিদের অবস্থা ভিন্নতর হয়ে থাকে। যেমন,

১. এমন কিছু প্রত্যয়ী ব্যক্তি আছে, যারা কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়া দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে নেয়। এরপর সময়ের অতিক্রম সত্ত্বেও যাদের চেতনা ও প্রত্যয়ের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসে না। তারা সব সময় লক্ষ্য ও সংকল্পের ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন থাকে। মনের কোনো দুর্বল মুহূর্তেও যদি নিজের ভেতর কোনো পরিবর্তন দেখতে পায়, তাহলে তৎক্ষণাৎ তার সচেতন প্রাণ বিচলিত হয়ে ওঠে। এই তারতম্য সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। যেমন হজরত হানজালা রা.-এর ঘটনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবার থেকে বাড়িতে ফিরে আসার পর হৃদয়ের পরিবর্তন দেখে তিনি নিজের ব্যাপারে বলে উঠেছিলেন, نافق حنظلة হানজালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে। আহা, কে বুঝবে ঈমানের এই দৃঢ়তা!

২. দ্বিতীয় প্রকার ব্যক্তিরা হলো এমন, যাদের আগের সেই উদাসীন মন কখনো তাদেরকে উদাসীনতার মধ্যে ডুবিয়ে রাখে। আবার কখনো শ্রুত উপদেশগুলি আমলের দিকে উৎসাহিত করে। তাদের দৃষ্টান্ত সেই গমের শীষের মতো, বাতাস যাকে একবার এক দিকে দোলায়, তো আরেকবার অন্য দিকে।

৩. তৃতীয় প্রকার ব্যক্তিরা হলো তারা, উপদেশের প্রভাব যাদের ভেতর ঠিক ততক্ষণ কার্যকর থাকে, যতক্ষণ তারা শোনে। এরপর সব ভুলে বসে থাকে। তাদের দৃষ্টান্ত শুকনো পাথরের ওপর প্রবাহিত পানির মতো।

টিকাঃ
*. এর দ্বারা সেই হাদিসের দিকে ইশারা করা হয়েছে- যা ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর 'সহিহ মুসলিম' এ উল্লেখ করেছেন। সেখানে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে- عَنْ أَبِي عُثْمَانَ النَّهْدِيَّ عَنْ حَنْظَلَةَ الْأُسَيِّدِي قَالَ وَكَانَ مِنْ كُتَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَقِيَنِي أَبُو بَكْرٍ فَقَالَ كَيْفَ أَنْتَ يَا حَنْظَلَةُ قَالَ قُلْتُ نَافَقَ حَنْظَلَةُ قَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ مَا تَقُولُ قَالَ قُلْتُ نَكُونُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُذَكِّرُنَا بِالنَّارِ وَالْجَنَّةِ حَتَّى كَأَنَّا رَأَي عَيْنٍ فَإِذَا خَرَجْنَا مِنْ عِنْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَافَسْنَا الْأَزْوَاجَ وَالْأَوْلَادَ وَالضَّيْعَاتِ فَنَسِينَا كَثِيرًا قَالَ أَبُو بَكْرٍ فَوَاللَّهِ إِنَّا لَتَلْقَى مِثْلَ هَذَا فَانْطَلَقْتُ أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ حَتَّى دَخَلْنَا عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْتُ نَافَقَ حَنْظَلَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَا ذَاكَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ تَكُونُ عِنْدَكَ تُذَكَّرُنَا بِالنَّارِ وَالْجَنَّةِ حَتَّى كَأَنَّا رَأَي عَيْنٍ فَإِذَا خَرَجْنَا مِنْ عِنْدِكَ عَافَسْنَا الْأَزْوَاجَ وَالْأَوْلَادَ وَالضَّيْعَاتِ نَسِينَا كَثِيرًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنْ لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِي وَفِي الذِّكْرِ لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلَائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً ثَلَاثَ مَرَّات . [সহিহ মুসলিম: ৪/১২-১৩/ ২১০৬-২১০৭, মুসনাদে আহমদ: ৪/৪৬]

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুনিয়ার সাথে হৃদয়ের বন্ধন

📄 দুনিয়ার সাথে হৃদয়ের বন্ধন


দুনিয়ার প্রতি মানুষের রয়েছে বর্ণনাতীত আকর্ষণ। দুনিয়ার প্রতি মানুষের এই যে বন্ধন ও আকর্ষণ, এর প্রেরণা ভেতর থেকেই উদ্ভূত। কিন্তু আখেরাতের প্রতি তার ঝোঁক বা আকর্ষণ সে তুলনায় অনেক ক্ষীণ। আখেরাতের প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ, তা মানবপ্রকৃতির বাইরের কোনো পারিপার্শ্বিকতা থেকে সৃষ্ট। বাইরে থেকে আমদানিকৃত।

কিন্তু বাস্তবতা সম্পর্কে যাদের জ্ঞান ও ধারণা নেই, তারা ভাবে—মানুষের বুঝি আখেরাতের প্রতিই আকর্ষণ বেশি। কোরআন ও হাদিসের সতর্কবাণীর প্রেক্ষিতে কোনো মুমিনের নিকট বাহ্যত এমনটা মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা এর থেকে ভিন্ন। কেননা, দুনিয়ার প্রতি মানুষের আকর্ষণের উদাহরণ হলো নিম্নভূমির দিকে পানির প্রবহমানতার মতো। পানি সহজেই নিচের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু আখেরাতের প্রতি মানুষের আকর্ষণের দৃষ্টান্ত হলো পাহাড়-চূড়ায় পানির উত্থিত হওয়ার মতো। পানি সে দিকে গড়াতে চায় না। অনেক কষ্ট ক্লেশ, পরিশ্রম ও কৌশলের মাধ্যমেই সেখানে ওঠা সম্ভব হয়। এ কারণে শরিয়তপ্রণেতা আল্লাহ তাআলা ভয় ও ভীতির মাধ্যমে এবং আশা ও প্রত্যাশার মাধ্যমে সচেতন বান্দাদের অন্তরে আখেরাতের আকর্ষণ জাগিয়ে তোলেন। তাকে বহু রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাগ্রত রাখেন। এটা এমনিতেই হওয়া সম্ভব ছিল না।

অন্যদিকে দুনিয়ার স্বাদ ও আস্বাদনের দিকে মানুষের প্রবৃত্তির ঝোঁক হলো স্বভাবগত। নিম্নদেশে ধাবিত হওয়ার মতো সহজ। কিন্তু এগুলোকে দমিয়ে রেখে আখেরাতের দিকে ধাবিত হওয়াই হলো দৃঢ় প্রত্যয়ের কাজ। এর জন্যই রয়েছে পুরস্কার।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 পরিণামের প্রতি দৃষ্টি রাখা

📄 পরিণামের প্রতি দৃষ্টি রাখা


যে ব্যক্তি পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি ফেলে কোনো বিষয়ের সূচনাতেই তার পরিণতি লক্ষ করে নিতে পারে, সে সেই বিষয়ের কল্যাণ লাভ করে এবং অকল্যাণ থেকে মুক্তি পায়। অপরদিকে যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের পরিণামের কথা চিন্তা করে না, তার ওপর প্রবৃত্তি প্রবল হয়ে যায়। ফলে সে যা থেকে পেতে চেয়েছিল নিরাপত্তা ও নির্ভরতা, তা থেকেই সে প্রাপ্ত হয় কষ্ট ও অনিষ্টতা। আর যে ব্যাপারে সে কামনা করেছিল শান্তি ও স্বস্তি, তা থেকে প্রাপ্ত হয় ক্লান্তি ও অস্বস্তি।

যদিও কথাটি পরীক্ষাযোগ্য এবং ঘটিতব্য একটি বিষয়ের দর্শন; কিন্তু এটাকে একটি পরীক্ষিত অতীতের দ্বারাও প্রমাণ করা যায়। যেমন ধরো—তুমি তোমার জীবনের কিছু ক্ষেত্রে আল্লাহর আনুগত্য করেছ, আবার কিছু ক্ষেত্রে তাঁর অবাধ্যতাও করেছ। এখন বলো, এখনো কি তোমার মধ্যে রয়ে গেছে সেই গোনাহের স্বাদ ও অনুভব? কিংবা সেই আনুগত্যের ক্লান্তি ও ক্লেশ? দুটোর কোনোটিই কিন্তু তোমার মধ্যে এখন অবশিষ্ট নেই। তোমার বর্তমান থেকে দুটো জিনিসই মুছে গেছে। কিন্তু অবশিষ্ট থেকে গেছে সেই গোনাহের পরিণাম ও প্রতিফল। এর শাস্তি তোমাকে পেতে হবে।

হায়, গোনাহের সেই অবস্থা যদি মনের খেয়ালে এসে আবার মনের খেয়ালেই হারিয়ে যেত! গোনাহটি যদি কার্যে পরিণত না করা হতো, তাহলে কতই না ভালো হতো!

এভাবে তুমি অনেক মানুষকে মৃত্যুর সময় কৃত গোনাহের কারণে বারবার আফসোস করতে দেখেছ। স্মরণ রেখো, গোনাহের স্বাদ ও আস্বাদন এক সময় রূপান্তরিত হয় গলার কাঁটায়। মজা তো ফুরিয়ে যায় অল্পতেই; কিন্তু বাকি থাকে তার দুঃখ ও দুর্দশা এবং অনুতাপ ও অনুশোচনার ক্লেশ।

আমাকে বলো, তোমার অর্জিত জ্ঞান তোমাকে কি কোনো জিনিসের পরিণাম সম্পর্কে ভাবতে শেখায় না?

জনৈক কবি বলেন, فراقب العواقب تسلم ولا تمل مع هوى الحس فتندم. সুতরাং হে বন্ধু, পরিণাম সম্পর্কে ভেবে অগ্রসর হও, নিরাপদ থাকবে। প্রবৃত্তির চাহিদার দিকে ঝুঁকে পড়ো না কিছুতেই, অন্যথায় লজ্জিত হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00