📄 বিদায়বেলা
এক রাকআত শেষ হয়ে গেলে দ্বিতীয় রাকআতের জন্য উঠুন। আগেরবার মনোযোগের ঘাটতি হয়ে থাকলে এবারই তা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ। এবার যেন আর বিনয়-একাগ্রতায় কোনো ত্রুটি না হয়।
আর যদি শেষ রাকআতে চলে এসে থাকেন, তবে তো এটিই বিদায়বেলা। বান্দা ও দয়াময় রবের মাঝে অনিন্দ্যসুন্দর সাক্ষাতের সুমিষ্ট সমাপ্তি। আমরা পৌঁছে গেছি তাশাহহুদে।
হাত রাখতে হবে হাঁটতে অথবা তার ঠিক ওপরে উরুতে। পুরো সাক্ষাতের মতোই শেষ বৈঠকও শুরু হবে আল্লাহর প্রচুর প্রশংসার মাধ্যমে। তাঁর চিরন্তন অস্তিত্ব, ত্রুটিহীনতা ও সার্বভৌমত্বের মহিমাকীর্তন করে। তাঁকে সরাসরি অভিবাদন জানিয়ে কথা বলুন গভীর সুন্দর কিছু শব্দে, আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি (ٱلتَّحِيَّاتُ لِلَّهِ), সকল তাহিয়্যাত (অভিবাদন-প্রশংসা-কীর্তন) শুধু এবং শুধুই আল্লাহর জন্য, আর কারো জন্য নয়।
ওয়ালাওয়াতু (ٱلصَّلَوَاتُ), আর আমাদের সকল দুআ ও সালাত তাঁর কাছে। ওয়ায়্যিবাতু (ٱلطَّيِّبَاث), আর সকল ভালো প্রচেষ্টা (কথা-কাজ) শুধু তাঁর জন্য। কারণ আল্লাহ শুধু উত্তম, পবিত্র ও একনিষ্ঠ জিনিসই কবুল করেন।
এরপর যে কথাগুলো বলবেন, সেগুলো পাহাড়সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অন্য এক ভূখণ্ডে চলে যাবে। হাজার ক্রোশ দূরে একেবারে মদিনায়, যেখানে শায়িত আছেন আমাদের প্রিয় নবিজি। 'আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান্নাবিয়্যু ওয়ারহমাতুল্লহি ওয়াবারাকাতুহ” (اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ ); আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি, দয়া ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক আপনার প্রতি, হে নবি; প্রতিদিন যতবার আপনি এই বিশেষ অভিবাদন পাঠান, ততবার এর জবাব দেন তিনি। এ হাদিসটি দেখুন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখনই কেউ আমার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠায়, তখনই আল্লাহ আমার রুহ ফিরিয়ে দেন যাতে তার ফিরতি সালাত ও সালাম জানাতে পারি। [১]
এই মুহূর্তে আপনার সবচেয়ে কাছে যে দরজাটা আছে, সেদিকে তাকান। মনে করুন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এইমাত্র প্রবেশ করছেন সেটা দিয়ে। নুরানি সুন্দর চেহারা, পরিপাটি করে বাঁধা পাগড়ি, সুগন্ধময় ধবধবে সাদা পোশাক। হৃদয়গলানো উন্ন হাসি ঠোঁটে। আজ তিনি একজনেরই সালামের জবাব দিতে এসেছেন, আর সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটি হলেন আপনি! কেমন লাগবে তখন? কী বলবেন তাকে? উত্তেজনার বশে হয়তো মুখ দিয়ে কথাই বেরুবে না। অথচ ওপরের এই ভালোবাসাময় শব্দগুলো দিয়ে আপনি ঠিক এভাবেই রাসুলুল্লাহর সাথে কথা বলেন আর এই বিরল সম্মান আপনি পাচ্ছেন দিনে কমপক্ষে নয়বার!
কতজনেরই না ইচ্ছে হয়, ইশ! যদি নবিজির সাথে একই যুগে বাস করতে পারতাম। তাকে সরাসরি দেখতে পারতাম। ওপরের কথাগুলোর মাধ্যমে আমাদের এই ইচ্ছেরই বাস্তবায়ন হচ্ছে। তাই প্রিয়নবিকে হৃদয় নিংড়ানো আবেগ সহকারে অভিবাদন জানাই, আসুন। যে অমূল্য আসমানি বার্তা তিনি এনেছেন, তার যথাযথ কৃতজ্ঞতা জানাই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসার কথা তো স্মরণ করবেনই। তার পাশাপাশি মনে রাখবেন, আমরা এখন রাসুলুল্লাহর স্রষ্টা সেই অদ্বিতীয় সত্তা আল্লাহর সামনে। তাঁর প্রিয়পাত্র নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিবাদন ও সালাম জানাচ্ছেন দেখে আল্লাহ আপনাকে দিয়ে দিলেন তারও দশগুণ রহমত-বরকত!
আল্লাহ ও নবিজির পর আমরা এবার সালাত ও সালাম পাঠাব নিজেদের প্রতি। সেইসাথে আল্লাহর সকল সৎকর্মশীল দাসের প্রতি।
'আসসালামু আলাইনা ওয়া 'আলা 'ইবাদিল্লাহিস সলিহীন (السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّلِحِين অর্থাৎ ‘শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের ওপর এবং আল্লাহর সকল নেককার বান্দার ওপর।' হোক সে বান্দা জমিনের অধিবাসী বা আসমানের, মানুষ বা ফেরেশতা।
এরপর তাওহিদের সেই শক্তিশালী বাণী দিয়ে নবায়ন করব আমাদের ঈমান ও ইখলাস।
আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রসূলুহু ; (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ) (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যার শেষ কথা হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে যাবে।[১] তাই ওপরের কথাগুলো রীতিমতো জান্নাতের টিকিট।
অবশেষে চমৎকার এই সাক্ষাৎ যখন সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে, এ সময় দুআ কবুল করা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। তাই প্রথমে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবারের প্রতি দরুদ পড়ে নিন। তারপর পড়ুন হাদিসে আসা বিভিন্ন দুআ, যেখানে আমাদের প্রতিটি প্রয়োজনের কথাই বলা হয়েছে।
তারপর ডানে-বামে ফিরে দুইবার সালাম দিন আপনার সাথের ব্যক্তিদের। এসময় আপনার এক গভীর প্রশান্তি ও স্নিগ্ধতার অনুভূতি হওয়া চাই। যদি না হয়, তাহলে বুঝতে হবে আপনার হৃদয় স্থির হয়ে গেছে। এটি আপনারই বদ আমলের প্রভাব। এর ফলে রবের সাথে সৃষ্টি হয়েছে আপনার দূরত্ব। অন্তরের ত্রুটির জন্য সালাত শেষে তাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, কমপক্ষে তিনবার। তারপর উঠে দাঁড়ান সুন্নাত সালাত আদায়ের জন্য। আল্লাহপ্রদত্ত শান্তি উপভোগের এটি আরো একটি সুযোগ। আল্লাহর প্রতি আপনার ভালোবাসা যত বাড়বে আর যতই তাঁর নৈকট্য লাভ করবেন, আপনার অন্তর ততই হয়ে উঠবে বিনয় ও একাগ্রতায় সজীব। এটা সবসময় মনে রাখবেন। ফলে বাড়বে আপনার মনোযোগ। আস্বাদন করতে পারবেন সালাতের সত্যিকার সৌন্দর্য।
টিকাঃ
[১] সুনানু আবি দাউদ: ২০৪১; হাদিসটি গ্রহণযোগ্য।
[১] সুনানু আবি দাউদ : ৩১১৬; হাদিসটি সহিহ।
📄 শেষকথা
সালাতের গুরুত্ব কত বেশি এতক্ষণে হয়তো একটু হলেও বুঝে এসেছে। আরো ভালো করে বুঝতে আলি রাযিআল্লাহু আনহুর অবস্থা মনে করতে পারি। সালাতের সময় হলে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যেত। ভয়ে কাঁপতে থাকতেন তিনি। বলতেন, এমন এক আমানত রক্ষার সময় এসেছে, যা একসময় আসমান, জমিন ও পাহাড়কে নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা তা নিতে অপারগতা জানিয়ে দেয়। এই আমি (মানুষ) অভাগা সেটা নিয়ে নিলাম।[১] এই আমানত হলো স্বাধীন ইচ্ছার দায়ভার। ভালো ও মন্দের মাঝে ইচ্ছেমতো বেছে নেওয়ার ক্ষমতা।
আখিরাতে সবার আগে হিসাব নেওয়া হবে সালাতের। এটি ঠিকঠাক থাকলে বাকি সব হিসেব হয়ে যাবে সহজ। এতে সমস্যা থাকলে কঠিন হয়ে যাবে পুরো হিসেব।[২] নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে সালাত ত্যাগ করল সে কুফরি করল (কাফির)। [৩]
সালাত কিন্তু আমরা শুধু বাধ্যবাধকতার কারণেই পড়ব না। এতে নিয়ত অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। একটা সময় মানুষ বাঁচার জন্য খেতো। আর এখন খাওয়ার জন্য বাঁচে। খাওয়া যেন এখন একটি শিল্প। কত যে রান্নাপদ্ধতি, পরিবেশনের ঢং আর সমন্বয়ের রং। প্রতিটি কামড়ে যেন পাওয়া যায় আলাদা আলাদা স্বাদ। সালাতও হওয়া উচিত এরকম। সালাত পড়বেন, কারণ আপনি তা ভালোবাসেন। এর স্বাদ নিতে চান আপনি।
আগেভাগে প্রস্তুতি নিন। ঠিক যেমন মূল খাবারের আগে আসে রুচিবর্ধক। আজান শোনার পর থেকেই শুরু হবে আপনার সালাত। আগের ওয়াক্তের ওযু থাকলেও আবার করে নিন। নিজের নুর বাড়ান। সচেতনভাবে নিজেকে প্রশ্ন করুন, কী করতে চলেছি এখন? কার সাথে সাক্ষাৎ করব? কোনোমতে সতর ঢাকা যায়-এমন পুরনো কাপড় বেছে না নিয়ে নিজের সাধ্যের সেরাটা নিন। জগতের অধিরাজের সাথে দেখা করতে যান সুন্দর কিছু পরে। বন্ধ করে দিন ফোন। জায়নামাজ যেন হয় সাদামাটা, আল্পনাহীন। কিবলামুখী হোন। জামাআতে আদায় করলে সোজা করে নিন কাতার। চেষ্টা রাখুন প্রথম কাতারে জায়গা পাওয়ার।
এই সেই সালাত, ইবাদতের সুন্দরতম পদ্ধতি। এক প্রশান্তি আনয়নকারী, তৃষ্ণা নিবারণকারী। দেহ থাকে মাটিতে, আত্মা ভেসে যায় রহমানের আরশে। সালাত মানুষের প্রতি আল্লাহর পাঠানো উৎকৃষ্ট উপহারগুলোর একটি। এরকম শান্তি আর সুখই তো খুঁজে বেড়াই আমরা। এই কষ্ট, দুঃখ, বেদনা ও ব্যথায় ভরা জীবনে আল্লাহই তো উপশমদাতা। আর সেই উপশম তিনি দেন সালাতের মাধ্যমে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ )
হে বিশ্বাসীগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।[১]
দুশ্চিন্তাকালে সালাতের সময় হলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী বলতেন, মনে আছে? আমাদের প্রশান্তি দাও, বিলাল।[২]
এই প্রশান্তি শুধু নেককার পূর্বসূরিদের একচ্ছত্র মালিকানা নয়। আমরা সাধারণ মানুষেরাও পারব সালাতের রহস্যের তালা খুলতে। এর মানে শুধু মনোযোগ-একাগ্রতা বৃদ্ধির চেয়েও বেশি কিছু।
হৃদয়ের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ: সালাতকে অনুভব করতে হলে অন্তরকে সালাতে মগ্ন রাখতে হবে। এ কোনো কঠিন কাজ নয়। স্রেফ দশটা মিনিট আল্লাহর প্রতি আপনার ভালোবাসা নিয়ে ভাবুন। ভুলে যান দুনিয়াকে। ওসবের জন্য আরো তেইশ ঘণ্টা সময় পাবেন। এই দশটা মিনিট শুধু উপভোগ করুন আল্লাহর নৈকট্যের শান্তি ও আনন্দ।
সালাতের কাজ ও কথাগুলোর উপলব্ধি : কী করছি, কী বলছি, তা বুঝতে পারলে মনোযোগ অটুট থাকে। আল্লাহ যেহেতু মনোযোগ দিয়ে সালাত আদায়ের আদেশ করেছেন, তার মানে তা আমাদের সাধ্যের মধ্যেই আছে। সালাতে যে শুধু একাগ্র অংশটুকুরই সাওয়াব পাওয়া যায়, জানেন? দুই ঘণ্টার মুভি দেখতে বা পরীক্ষা দিতে তো আমরা মনোযোগ হারাই না। আর যে আল্লাহর উপাসনা করে দুনিয়ার প্রতিটি জিনিস, তাঁর প্রতি দশটা মিনিট মন দিতে পারব না? আল্লাহর কাছে সাহায্য চান কেবল। এত সাহায্য চান, যেন একসময় গিয়ে ইচ্ছে হয় অনন্তকাল ধরে সালাত আদায় করার।
আশা নিয়ে আগমন : আশা এক গভীর আবেগ, যা পুরো সালাতে উপস্থিত থাকা চাই। আল্লাহর ব্যাপারে যত জানবেন, আপনার অন্তর ততই আশা করবে আল্লাহর দয়া, ক্ষমা, স্বীকৃতি, ভালোবাসা ও নৈকট্য। আশা আর ইচ্ছা কিন্তু আলাদা জিনিস। আশা অনুযায়ী কাজ করতে হয়। তাই আল্লাহর রহমতের আশা নিয়ে তাঁর কাছে তা চান।
...ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ...
আমাকে ডাকো। আমি সাড়া দেবো।[১]
يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّه্যায় ইয়াগফিরুয যুনূবা জামীআ' ইন্নাহূ হুয়াল গাফূরুর রাহীম
হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ! আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন। তিনি তো সদা ক্ষমাশীল, দয়াময়। [সুরা যুমার, আয়াত : ৫৩]
আল্লাহর মহব্বত ও বড়ত্ব অনুভব : গভীর ভালোবাসা-ভয় ও শ্রদ্ধামিশ্রিত সমীহের অনুভূতি হওয়া চাই আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সময়। এই অনুভূতির নাম হাইবা বা বড়ত্ব। অনেকটা যেমন পিতামাতা বা কোনো কর্তৃপক্ষের ব্যাপারে অনুভূত হয়, সেরকম। হাইবা হলো ভয়ের উচ্চতম পর্যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআগুলো আমাদের মাঝে তাঁর বড়ত্ব ও ভয় জাগ্রত করে যেমন, আপনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। আপনার পাকড়াও থেকে বাঁচার কোনো পথ নেই আপনি ছাড়া[১]। এমনও ফেরেশতা আছেন, যারা সৃষ্ট হওয়ার পর থেকে শুরু করে, একদম কিয়ামত পর্যন্ত সিজদাতেই লুটিয়ে থাকবেন। তারপরও তারা আল্লাহর উদ্দেশে বলবেন, সুমহান আপনি, আমরা যথাযথভাবে আপনার ইবাদত করতে পারিনি।
যতই আল্লাহকে জানবেন এবং সে তুলনায় নিজের তুচ্ছতা উপলব্ধি করবেন, ততই আপনার অন্তরে বাড়বে আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ব। সবকিছুই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও নিয়ন্ত্রণের অধীনে। আমরা তাঁর আদেশ অমান্য করার কে?
مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا )
তোমাদের কী হলো যে, আল্লাহর বড়ত্বের ব্যাপারে সচেতন হচ্ছ না?[২]
إِنْ يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزٍ (۱৭)
....তিনি চাইলেই তোমাদের সরিয়ে নিয়ে আসতে পারেন নতুন এক সৃষ্টি। এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়।[৩]
মিরাজের রাতে আল্লাহর প্রতি জিবরিল আলাইহিস সালামের যে শ্রদ্ধা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখেছেন, সে ব্যাপারে তিনি বলেন, জিবরিল যেন উটের পিঠের পুরনো কাপড়ের মতো হয়ে গেছেন আল্লাহর ভয়ে।[৪]
ভালোবাসা : আল্লাহর প্রতি তীব্র ভালোবাসা নিয়ে সালাতে প্রবেশ করুন। কারণ তাঁর সৌন্দর্য, আপনার প্রতি তাঁর দয়াশীলতা এবং অনুগ্রহের কোনো শেষ নেই।
লজ্জাবোধ : আমরা এত এত গুনাহ করার পরও আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ বন্ধ করেন না। ধৈর্য নিয়ে আমাদের রক্ষা করে চলেন আমাদের সব সীমালঙ্ঘন সত্ত্বেও। আল্লাহ বলেন—
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ ﴿١﴾
নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল, যারা তাদের সালাতে বিনয়-নম্র।[১]
সালাতের এই রহস্যগুলো আপনাকে খুশু অর্জনে সাহায্য করবে। এ দুনিয়ায় সালাতের মিষ্টতা অনুভব ও আখিরাতে এর প্রতিদান পাওয়ার জন্য যে বিনয় ও একাগ্রতা প্রয়োজন, তাকে খুশু বলে। সালাতের এই খুশু কেড়ে নিতেই শয়তান সদা তৎপর। তাই তো সালাত শুরু করতেই মনে পড়ে যায় দুনিয়ার তাবৎ অপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম। চোর কখনো রাজপ্রাসাদে হানা দেয় না, কারণ তা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত। গরিবের ঘরেও যায় না, কারণ তা খালি। সে ছোঁকছোঁক করে বড়লোকের ঘরে, যেখানে সম্পদ থাকলেও প্রহরী নেই। আপনিও তা-ই। আপনি ধনী, কারণ আপনার খুশু আছে। কিন্তু তার জন্য নেই সর্বোচ্চ মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা। তাই শয়তান বারবার মন সরিয়ে দিয়ে আপনার সালাতের দাম কমিয়ে দিতে চায়। কিন্তু এতক্ষণ ধরে যা জানলেন, তা প্রয়োগ করলে এই বাধা-বিপত্তিগুলো টপকানো সহজ হবে। দেখার মতো উন্নতি হবে আপনার সালাতের।
এবার বলুন তো, কোন মাসে সবচেয়ে ভালো খুশু থাকে? রামাদানে, তাই না? রামাদানের বিশেষত কোন সময়? অবশ্যই তারাবিহ। এ সময়টাতেই চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। সারা মসজিদ জুড়ে থাকে ডুকরে ডুকরে কান্নার আওয়াজ। কী এমন বিশেষত্ব এই ইবাদতের? কারণ ওই মুহূর্তেই সত্যিকার অর্থে অনুভূত হয়, আপনি কোন সত্তার সাথে কথা বলছেন। উপলব্ধি হয় আল্লাহর সাথে সরাসরি কথোপকথনের।
এই অমূল্য মুহূর্ত ও প্রকৃত খুশু যেন বছরে একবারই না আসে; বরং আসে প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্তের সালাতে। নিজের সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করুন আল্লাহর সাথে কথা বলার, তাঁকে সম্বোধন করার, আলাপচারিতা করার ব্যাপারটি। সালাত কেবল একজনের বকবক নয়। এটি সংলাপ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংলাপ। প্রাণ দিয়ে অনুভব করুন সংলাপের অন্য প্রান্তের সত্তাকে।
টিকাঃ
[১] সুরা আহযাব, আয়াত: ৭২; হিলয়াতুল আওলিয়া, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৩৩
[২] সুনানু আবি দাউদ: ৮৬৪; জামিউত তিরমিযি: ৪১৩; হাদিসটি গ্রহণযোগ্য।
[৩] জামিউত তিরমিযি: ২৬২১; সুনানুন নাসায়ি: ৪৬৩; হাদিসটি গ্রহণযোগ্য।
[১] সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩;
[২] সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৮৫; হাদিসটি সহিহ।
[১] সুরা গাফির, আয়াত: ৬০
[১] জামিউত তিরমিযি: ৩৩৯৪; হাদিসটি হাসান।
[২] সুরা নূহ, আয়াত: ১৩
[৩] সুরা ফাতির, আয়াত: ১৬-১৭
[৪] আল-মুজামুল আওসাত: ৪৬৭৯; সহিহুল জামি: ৫৮৬৪; হাদিসটি সহিহ।
[১] সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২