📄 অন্তর থেকে তিলাওয়াত
সুরা ফাতিহা শেষ করলাম। এরপর আসবে কুরআনের অন্য কোনো অংশের তিলাওয়াত।
খেয়াল করেছেন, সালাতে কুরআন তিলাওয়াত সবসময় দাঁড়ানো অবস্থায় করা হয়? বসা, রুকু, বা সিজদা অবস্থায় নয়। কেন?
দাঁড়ানো অবস্থা হলো সবচেয়ে সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। কুরআনের বাণী সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কথা। সম্মানের স্থান থেকেই তাই সম্মানের এসব উক্তি উচ্চারণ করা উচিত। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রুকু ও সিজদাকালে কুরআন তিলাওয়াত করতে নিষেধ করা হয়েছে।[২]
কুরআন আল্লাহ তাআলার বাণী। সর্বোচ্চ সম্মানের হকদার। কিন্তু জীবনে কতবারই না আমরা এই শক্তিশালী কথাগুলো আওড়ে গেছি একদম অন্যমনস্কভাবে, কোনো আবেগ-অনুভূতি ছাড়াই! যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন, এই মাত্র যে আয়াতটা পড়লেন, সেখানে একটি বিধানের কথা ছিল। কী যেন সেটা? অনেকেই পারবে না উত্তর দিতে। ইমাম জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনা তিলাওয়াত করতে থাকেন। আর পেছনে মুসল্লিরা ভাবতে থাকেন খাবার আর পানীয়ের কথা।
প্রতাপশালী কোনো শাসকের সাথে ঐতিহাসিক কোনো সাক্ষাৎকারের কথা কল্পনা করুন। কতটা মনোযোগী হওয়ার কথা শ্রোতার? শুধু কান নয়; মন দিয়ে শোনা হতো সব কথা। বরং এত মনোযোগ থাকার কথা যে, রীতিমতো মুখস্থ হয়ে যাবে শাসকের প্রতিটি বাক্য। আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের কথাগুলোতে মনোযোগ না দেওয়া তাহলে কীভাবে সম্ভব?
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?[১]
আমাদের অন্তর যদি যথাযথভাবে পরিষ্কার থাকত, তাহলে কখনো আল্লাহকে ভুলতেই পারতাম না। মনে রাখবেন, তিলাওয়াতের পরিমাণ নয়; মান বিবেচ্য। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার অশ্রুভেজা নয়নে একটি আয়াত তিলাওয়াত করেই সারা রাত কাটিয়ে দিয়েছেন—
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন, তবে তো তারা আপনারই বান্দা। আর যদি ক্ষমা করে দেন, আপনি তো এমনিতেই মহাশক্তিধর ও প্রজ্ঞাবান [২]
তাই তিলাওয়াতের সময় ভালো করে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সাথে আমাদের দ্বিপাক্ষিক কথোপকথন চলছে। তবে কোন আয়াতে কেমন অনুভূতি হতে হবে, তা বুঝব কীভাবে? ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ এ ব্যাপারে একটি সাধারণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। প্রতিটি আয়াতের তাফসির জানা না থাকলেও চলবে। তিনি বলেন—
আয়াতে আল্লাহর অনুগ্রহ, নাম ও বৈশিষ্ট্যের কথা থাকলে অন্তরকে ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করতে হবে।
আল্লাহর দয়া, ক্ষমা ও জান্নাতবাসীদের আলোচনা থাকলে অন্তরে আনতে হবে আনন্দ, প্রশান্তি ও আশা।
আর আল্লাহর শাস্তি, ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি সংক্রান্ত আয়াত হলে ভীতি ও দুশ্চিন্তা নিয়ে আসতে হবে অন্তরে। [১]
অতএব আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত মানেই ভালোবাসা, আশা ও ভয়ের মাঝে দুলতে থাকা। কুরআন আমাদের জ্ঞানের চেয়েও মহান—
لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ )
এ কুরআন যদি পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে দেখতেন যে তা আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও চূর্ণ হয়ে গেছে। মানুষ যাতে চিন্তাভাবনা করে, তাই আমি এসব দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করি।[২]
টিকাঃ
[১] সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ২৪
[২] সুরা মায়িদা, আয়াত : ১১৮
[১] মাদারিজুস সালিকিন, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৫০, ৪৫১; নাদারাতুন নাইম, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৮৪৪; কথাগুলো হুবহু বলা না হলেও কাছাকাছি শব্দে বলা হয়েছে।
[২] সুরা হাশর, আয়াত: ২১
📄 প্রাণভরে চাওয়া
তিলাওয়াত শেষ করতে করতে আবারও মনোযোগ ছুটে গেছে? সমস্যা নেই। রুকুতে যাওয়ার সময় 'আল্লাহু আকবার' বলে আবারও নিজেকে মনে করিয়ে দিন আল্লাহর বড়ত্বের কথা।
এই যে আমরা মাটিতে সালাত আদায় করছি, আর আল্লাহ আমাদের দেখছেন সপ্ত আসমানের ওপর থেকে। তাই সালাত তো এমনিতেই সুন্দর হওয়া উচিত, বিশেষত রুকু। আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য ও পূর্ণতা ভালোবাসেন। তাই সালাতকেও পূর্ণাঙ্গ সুন্দর করি, আসুন।
আঙুলগুলো আলাদা করে দুই হাতের তালু রাখুন দুই হাঁটুতে। এরপর হেলানো মাথার উচ্চতা বরাবর পিঠ সোজা করে রাখুন। শান্তভাবে দেহের প্রতিটি অঙ্গকে জায়গামতো আসতে দিন। পড়ুন ‘সুবহা-না রব্বিয়াল ‘আযীম (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ), মহামহিম আমার সুমহান প্রতিপালক।’ রব্বি শব্দটার শেষের ই (ি) সর্বনামের অর্থ আমার। এই কথাটা খেয়াল করুন ভালো করে। ভালোবাসার যে বন্ধন বান্দা ও রবের মাঝে, তারই নির্দেশক এই সর্বনাম। তিনি আমার রব। যত্ন, আচ্ছাদন, আহার্য, সুস্থতা আর মমতা দিয়ে তিনি আমাকে পালন করেছেন। অন্তর দিয়ে উচ্চারণ করা ‘সুবহা-না’ অর্থ যেকোনো প্রকার ত্রুটি থেকে বহু ঊর্ধ্বে।
যতবার পড়বেন সুবহা-না রব্বিয়াল ‘আযীম, ততই বিনীত হতে থাকবে মন। আল্লাহর মহত্ত্ব-বড়ত্ব স্মরণ করুন। অনুধাবন করুন, আপনি আপনারই প্রতিপালকের কাছে সমর্পিত করছেন সব আশা।
সালাতের এই অংশটুকু যান্ত্রিকভাবে পড়ে চলে যাই আমরা অনেকে। আবেগ-অনুভূতির লেশমাত্র মেলে না। অথচ এই রুকু অবস্থানটা আল্লাহর প্রতি দাসত্ব প্রকাশের খুবই নিবিড় এক নিদর্শন। আনুগত্যের নির্যাস এতে নিহিত। সেসময়কার আরবরা এ ব্যাপারে ভালো করেই জানত। তাই এ কাজ করতে প্রত্যাখ্যান করে কিছু অহংকারী ব্যক্তি। এমনকি তাদের পক্ষ থেকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক সাহাবি অনুরোধ করেছিলেন তারা যেহেতু সালাতে রুকু তথা মাথা ঝুঁকাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে তাই দাঁড়ানো থেকে সরাসরি সিজদায় চলে যাওয়া যায় কি না! অন্তত সালাতটা পড়ুক তারা।
আমাদের প্রত্যেকের প্রয়োজন আলাদা। ভালোবাসার চাহিদা, কিছুক্ষণ একা থাকার ইচ্ছা, কারো কাছে প্রতীক্ষিত হওয়ার বাসনা, সন্তানদের জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর আকাঙ্ক্ষা, কিছু সান্ত্বনার বাণী শোনার কামনাসহ আরো কত কী! এর কোনোটার অভাব ঘটলে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় আমাদের মাঝে। এমন ভারসাম্যহীন অবস্থা পুরো দিনটিকে প্রভাবিত করে। অজানা কারণে মেজাজ খিটমিটে লাগে। লাগারই কথা, প্রয়োজন পূরণ হয়নি যে!
কিন্তু এর চেয়েও অনেক গুরুতর এক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে আমাদের মাঝে। এটি ছাড়া পুরোপুরি ভালো থাকা সম্ভব নয়। ইবাদতের প্রয়োজনীয়তা। এই অভাব পূরণ করতে যুগে যুগে মানুষ সূর্য এবং সূর্যের নিচে যা আছে, কোনোকিছুর আরাধনা করতে ছাড়েনি। মূর্তি, পানি, পশু, সাপ, সূর্য, বাঁদর, বিজ্ঞান এমনকি নিজের কামনা-বাসনা। অনেক শ্রম ও সম্পদ ব্যয় করে তারা এর পেছনে। অভাবটা তো পূরণ করতে হবে। কিন্তু সত্য অদ্বিতীয় সত্তার উপাসনার স্বাদ কি আর তাতে মেটে? সেই অভাব পূরণ করে সালাত। রুকু তার অবিচ্ছেদ্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সালাফগণ রুকুতে এত প্রশান্তি অনুভব করতেন, তিলাওয়াতের সমপরিমাণ সময় এই অবস্থানে থাকতেন। কোনো এক সাহাবি একবার সালাতে এক রাকআতে প্রথম পাঁচটি সুরা একনাগাড়ে তিলাওয়াত করেছেন। তার পাশেই সালাতরত আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই পুরোটা সময় ছিলেন রুকু অবস্থায়! মানুষগুলো এভাবেই পূরণ করেছেন ইবাদতের চাহিদা।
হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে দেখলেন রীতিমতো তাড়াহুড়া করে সালাত আদায় করছে। রুকু-সিজদা দিচ্ছে যেন ঠোকর মারার মতো করে। তিনি বললেন, তুমি এ অবস্থায় অর্থাৎ এরকম সালাত নিয়ে মারা গেলে সালাতের ব্যাপারে নবিজির দেখানো সুন্নাহর বিরুদ্ধাচরণকারী হয়ে মরবে।[১] তাই রুকু হওয়া চাই শান্ত, ধীর, স্থির-ঠিক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণে।
দেখুন, দুনিয়ার জীবন কষ্ট আর ব্যথায় ভরা। এই হাসি, তো এই কান্না। এর দাবিদাওয়া আমাদের তৃষ্ণার্ত ও ক্লান্ত করে ছাড়ে। এই তৃষ্ণা মেটাতে সালাতের চেয়ে ভালো আর কী আছে, বলুন! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ঠিকমতো রুকু পূর্ণ করে না, সে যেন অনাহারে একটি দুটি খেজুর খাওয়া ব্যক্তির মতো। ক্ষুধা একটুও মেটে না তাতে।[২] তাই আসুন, রুকু-সিজদায় প্রশান্তি খুঁজি।
দিনে কমপক্ষে সতেরোবার আমরা রুকু করি। প্রতিটি বারেই যেন বৃদ্ধি পায় আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালোবাসা। আপনি তাঁকে সাধ্যমতো ভালোবাসলে তিনি আপনাকে ভালোবাসবেন তাঁর মর্যাদা অনুপাতে। স্রষ্টাই যদি ভালোবাসেন, সৃষ্টির তবে কী সাধ্যি ক্ষতি করার?
টিকাঃ
[১] সহিহুল বুখারি: ৩৮৯; সহিহ সুনানু নাসায়ি: ১৩১১
[২] সহিহুত তারগিব: ৫২৮
📄 সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তের প্রস্তুতি
সালাতের সুন্দর একটি অংশ রুকু এইমাত্র শেষ করলাম আমরা। রুকু আসলে সিজদার ভূমিকা। রুকু থেকে সিজদায় যাওয়া মানে আনুগত্যের মহৎ এক অবস্থান থেকে মহত্তর, পূর্ণাঙ্গতর আরেকটি অবস্থানে যাওয়া। কিন্তু এর আগে আরেকটি সুন্দর অংশ আছে। রুকু থেকে দাঁড়ানো।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বান্দা যদি রুকু এবং সিজদার মাঝে পিঠ সোজা না করে, তাহলে আল্লাহ তার সালাতের দিকে ফিরেও তাকান না।[১] এই গতিহীন, সুস্থির অবস্থানটিরও এত গুরুত্ব যে, হাদিসে এর কথা আলাদা করে এসেছে। পুরো দেহ সোজা করে প্রত্যেক অঙ্গকে জায়গামতো আসার সময় দিতে হবে। কারণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, নিকৃষ্টতম চোর হলো যে সালাতের মধ্যে চুরি করে।[২] অর্থাৎ, তাড়াহুড়া করে। তাই রুকুর সমপরিমাণ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন নবিজি।
এবার কিন্তু আল্লাহু আকবার নয়, বলতে হবে 'সামি'আল্লহু লিমান হামিদাহ' (سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ), আল্লাহ যেন তাঁর প্রশংসাকারীর জবাব দেন। কেন?
একটু আগেও আমরা কী বলেছি মনে আছে? চাওয়া পূরণ হয়, যদি চাওয়ার আগে যার কাছে চাওয়া হচ্ছে প্রচুর পরিমাণ তার প্রশংসা করা হয়। সুরা ফাতিহাও এভাবেই গঠিত। একই নিয়ম এখানেও। সালাতের মহত্তম অংশ সিজদায় প্রবেশ করব আমরা একটু পরেই। আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোত্তম অবস্থান। দুআ কবুলের নিশ্চিত সময়।
তাই 'সামি'আল্লহু লিমান হামিদাহ' আমাদের মনে করিয়ে দেয় সিজদায় কিছু চাওয়ার আগে যথাযথভাবে আল্লাহর প্রশংসা করার কথা। সে উদ্দেশ্যে বলি রব্বানা ওয়ালাকাল হামদ; হে আমাদের প্রতিপালক, আপনার তরে সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা। এর সাথে যোগ করা যায়—
حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيْهِ
হামদাং কাসীরাং তুইয়িবাম মুবারাকাং ফীহ। অর্থ : অসংখ্য, সুন্দর ও বরকতময় প্রশংসা তাঁরই।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার জামাআতে সালাত আদায়কালে রব্বানা ওয়ালাকাল হামদ বলার পর জনৈক সাহাবি উপর্যুক্ত বর্ধিত অংশটি বলেন। সালাম ফেরানোর পর নবিজি জিজ্ঞেস করলেন, ওই কথাগুলো কে বলল? সাহাবি বললেন, জি, আমি। নবিজির জবাব, ত্রিশজনেরও বেশি ফেরেশতাকে দেখলাম এর সাওয়াব লেখার জন্য প্রতিযোগিতা করছেন। [১]
আরো একটু আগে বেড়ে বলা যায়— مِلْءَ السَّمَوَاتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ মিলআস-সামাওয়াতি ওয়া মিলআল-আরদ্ব, ওয়া মিলআ মা বাইনাহুমা, ওয়া মিলআ মা-শি'তা মিং শাইইম বা'দ।
অর্থ : এমন প্রশংসা যা আসমান পূর্ণ করে দেয়, জমিন পূর্ণ করে দেয়, এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু এবং আপনি আরো যা কিছু ইচ্ছে করেছেন, সবই পূর্ণ করে দেয়।
এখানে আরো যা কিছু দিয়ে বোঝানো হচ্ছে মানবজ্ঞানের ও ইন্দ্রিয়ের সীমার বাইরের সব সৃষ্টিকে। যেমন, আরশ-কুরসি ইত্যাদি। এই বাক্যে শুধু স্রষ্টার প্রশংসাই নয়, তাঁর জ্ঞানের তুলনায় নিজেদের জ্ঞানের তুচ্ছতাও স্বীকার করা হচ্ছে অতি বিনয় সহকারে।
হাদিস থেকে এরকম একাধিক যিকির প্রমাণিত থাকায় আরো সুবিধা হচ্ছে। একেক সালাতে একেকভাবে বলে আমরা মনোযোগ বৃদ্ধি করতে পারি। বারবার একই জিনিস অন্যমনস্কভাবে বলতে হয় না।
আসুন, প্রশংসা করেই চলি, করেই চলি। মহান রবের যথাযথ প্রশংসা তো আর সারাজীবনেও করতে পারব না। যতটুকু সাধ্য, তার সবটুকু করতে পারাই সান্ত্বনা। তাঁর প্রাপ্য প্রশংসা করতে পারেন কেবল একজনই। কে, জানেন? আল্লাহ নিজেই!
টিকাঃ
[১] সুনানু ইবনি মাজাহ: ৮৭১, হাদিসটি সহিহ।
[২] মুসনাদু আহমাদ: ২২৬৪২; সহিহ ইবনি খুযাইমাহ: ৬৬৩; হাদিসটি সহিহ।
[১] সহিহুল বুখারি: ৭৯৯
📄 আসল সুখের আকর
রুকু থেকে দাঁড়ানোও হয়ে গেল। এর ফলে আমরা প্রস্তুত হয়ে গেছি সালাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিটির জন্য। এই সেই অংশ, যা এক এক রাকআতের সুমধুর সমাপ্তি নির্দেশক। এর আগের সবকিছু ছিল কেবল এখানে আসার পথ। সিজদা নামক সাড়ম্বর সমাপ্তির পূর্বকথন মাত্র।
সিজদা আসলে কী? এ কাজটা আমরা অনেকেই রোবটের মতো করে চলেছি বছরের বছর। তাই বুঝে উঠতে পারি না এর শক্তিশালী প্রভাব। হৃদয় না লাগালে তো সালাতের কোনো অংশের স্বাদই পাব না আমরা। সিজদা মানে নিজের সবচেয়ে দামি, সবচেয়ে সম্মানিত জিনিসটিকে চরম লাঞ্ছনার শিকার বানানো। চেহারাকে মাটিতে লুটানো। যেন আল্লাহকে বলা হচ্ছে, হে প্রতিপালক, নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব আপনার কাছে সমর্পণ করে দিলাম।
সত্যিকার সুখের আসল রহস্য এই সিজদা। কীভাবে? নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: চিরসুখের জায়গা জান্নাত কোথায়? সপ্ত আসমানের ওপর, আল্লাহর নিকটে। আর চিরদুর্ভোগের জাহান্নাম? নিচে। আচ্ছা, এবার বলুন জান্নাতের উচ্চতম স্থান কোনটি? আল-ফিরদাউসুল-আলা, যেখানে থাকবেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এরই ছাদ বা ঊর্ধ্বসীমা হলো আল্লাহর আরশ। আল্লাহর নিকটতম অবস্থান।[১] অন্য কথায়, এখানকার বাসিন্দাদের প্রতিবেশী স্বয়ং আল্লাহ!
আরেকটি ব্যাপার। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কায় জীবনের কঠিনতম কষ্টের সময় অতিক্রম করছিলেন, আল্লাহ তার কষ্ট লাঘব করতে কী করলেন? তাকে তুলে নিলেন নিজের কাছে। গোটা বিশ্বের ইতিহাসের স্মরণীয়তম ঘটনা: আল-ইসরা ওয়াল-মিরাজ [২]। মানুষের পক্ষে রবের যতটুকু নিকটে যাওয়া সম্ভব, ওই পর্যন্ত গেলেন নবিজি। এমনকি ইহকালের সুখের উৎস যে নেক কথা ও নেক আমল, সেগুলোও উঠে যায় আল্লাহর কাছে। সেখানেই তাদের স্থান। আল্লাহ বলেন—
... إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ...
উত্তম কথা তাঁর দিকে আরোহণ করে এবং সৎআমল তাকে (উত্তম কথাকে) উন্নীত করে।[১]
তাহলে সুখ কোথায়? ওই যে ঊর্ধ্বে আল্লাহর নিকটে। সূত্রটি দাঁড়াল এমন : আল্লাহর যত নিকটবর্তী হবেন, তত বেশি উঁচুতে উঠবে আত্মা, ততই বাড়বে সুখ। সেই সুখের কাছে পৌঁছানোর উপায় তাহলে কী? ওই উচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি যাওয়া। আর সেই উচ্চতায় পৌঁছানোর মাধ্যম? আল্লাহর সামনে নিজেকে নিচু থেকে নিচুতর করা। এ হাদিসটি তো শুনেছেন মনে হয়, যে আল্লাহর কাছে নিজেকে ছোট করে, আল্লাহ তাকে সমুচ্চ করেন।[২] আল্লাহ তাকে উঁচু করেন মর্যাদায়, উন্নীত করেন তার সুখ। এই হাদিসও দেখুন, বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয় সিজদা দেওয়ার সময়।[৩] সুরা আলাকের শেষ আয়াতে আল্লাহ কী বলছেন, দেখুন—
وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ
সিজদা দিন ও নিকটবর্তী হোন।[৪]
এবার বুঝলেন তো, কী পরিমাণ দামি একটি কাজ এত বছর ধরে করে এসেছেন একেবারে হেলায়-ফেলায়? প্রতিটি সিজদায় আপনি আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করেছেন। শরীর পড়ে আছে মাটিতে, কিন্তু আত্মা উঠে যাচ্ছে উচু থেকে উচুতে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন, বেশি বেশি সিজদা দিয়ো। কারণ যতবারই কোনো মুসলিম সিজদা দেয়, ততই আল্লাহ জান্নাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে থাকেন এবং গুনাহ মাফ করতে থাকেন।[১] এভাবে করতে করতেই একসময় সে পৌঁছে যায় আল-ফিরদাউসুল-আলায়। যেখানে আল্লাহর আরশ নির্দেশ করে ঊর্ধ্বসীমা, যেথায় রয়েছেন আমাদের প্রাণপ্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আরো প্রমাণ চাই? রবিআ ইবনু কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওযু করতে সাহায্য করছিলেন। নবিজি বললেন, কিছু একটা চাও।
রবিআর জবাব, জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই।
আর? নবিজির জিজ্ঞাসা।
শুধু এটাই।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে বেশি বেশি সিজদা দিয়ে তোমার ইচ্ছা পূরণ করতে আমাকে সাহায্য করো।[২]
এই যে প্রমাণ পেলেন। আত্মাকে উঁচুতে তুলতে হলে দেহকে ফেলতে হবে নিচে। আর হ্যাঁ, শরীরের সাথে সাথে হৃদয়ও যেন সিজদা করে। সিজদা করে সেই আল্লাহকে, যিনি আরশে অধিষ্ঠিত এবং প্রতিদিন নিত্যনতুন বিষয়ের তত্ত্বাবধানে রত। প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা আর কর্ম তাঁরই কাছে পৌঁছে। সবার তাঁকে প্রয়োজন, তাঁর কাউকে প্রয়োজন নেই। এদিকে এর গুনাহ মাফ করছেন, তো ওদিকে ওর কষ্ট লাঘব করছেন। দুর্বলকে সাহায্য করছেন আর ভাঙা হৃদয়কে জোড়া লাগাচ্ছেন। জীবন দিচ্ছেন আর নিচ্ছেন। যাকে ইচ্ছে, দেখাচ্ছেন সুপথ। যাকে ইচ্ছে, করছেন পথভ্রষ্ট। কোনো জাতিকে অনুগ্রহ করছেন, আবার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিতও করছেন অন্য কোনো জাতিকে। সম্মানিত করছেন, করছেন লাঞ্ছিত। কাউকে সুখী করছেন তো কারো কাছ থেকে সুখ কেড়ে নিচ্ছেন।
এগুলো উপলব্ধি করতে পারবেন, যদি হৃদয় সিজদা করে। কারণ সিজদা থেকে উঠবেন এক বিশেষ নুর সহকারে।
... سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ ... (২৯)
তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন [১]
এটি আল্লাহর দয়া ও নূরের চিহ্ন। চেহারায় তা ফুটিয়ে তোলে বিনয় ও দয়াশীলতা। এরকম শান্তি আর সুস্থিরতা আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়।
সিজদা সালাতের বিশেষ অংশ। কত দুশ্চিন্তাকে যে দূর করে দিয়েছে এই অমূল্য সম্পদ। সমাধা করে দিয়েছে কতই-না সমস্যা, পূরণ করেছে প্রয়োজন। সিজদায় আল্লাহকে বলার আগে কত দু'আ-ই না রয়ে গিয়েছিল নামঞ্জুর!
তাই রবের নিকটবর্তী যদি হতে চান, ছোট হোন আগে। তনু-মন-প্রাণ দিয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ুন। অনুভব করে নিন জগতের সবচেয়ে মিষ্টি স্বাদ। আস্বাদন করুন আসল সুখ।
টিকাঃ
[১] সহিহুল বুখারি : ২৭৯০
[২] আল ইসরা শব্দের অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। জিবরিল আলাইহিস সালামের সাথে মক্কার মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসায় নবিজির সশরীরে ভ্রমণকে ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় 'ইসরা' বলা হয়। আর মসজিদে আকসা থেকে ঊর্ধ্বগমনকে বলা হয় মিরাজ।
[১] সুরা ফাতির, আয়াত : ১০
[২] যে আল্লাহর কাছে নিজেকে ছোট করে, আল্লাহ তাকে সমুচ্চ করেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮; জামিউত তিরমিযি : ২০২৯
[৩] সহিহ মুসলিম : ৪৮২; সুনানু আবি দাউদ : ৮৭৫
[৪] সুরা আলাক, আয়াত : ১৯
[১] সহিহ মুসলিম: ৪৮৮; জামিউত তিরমিযি: ৩৮৮
[২] সহিহ মুসলিম : ৪৮৯; সুনানু আবি দাউদ : ১৩২০
[১] সুরা ফাতহ, আয়াত : ২৯