📘 হৃদয় জুড়ানো সালাত 📄 শ্রেষ্ঠতম দুআ

📄 শ্রেষ্ঠতম দুআ


জীবনে যত দুআ করা সম্ভব, তার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ ও গভীর দুআটি এখন চলে এসেছে।

'ইহদিনাস-সিরাতাল মুস্তাক্বীম' (اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ), আমাদের সরল পথে পরিচালিত করুন।

আমাদের সরল পথে পরিচালিত করার অর্থ হলো যথাযথভাবে তাঁর ইবাদত করার ব্যাপারে সাহায্য করা। মনে আছে, আগের আয়াতেই যে আমরা সাহায্য চাওয়ার কথা বলেছিলাম?

খেয়াল করুন, সুরা ফাতিহা আমাদের শেখাচ্ছে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা তুলে ধরার আদব-কায়দা। শেখাচ্ছে কীভাবে দুআ করলে আল্লাহ শুনবেন এবং জবাব দেবেন।

মহাসম্মানিত সত্তার সাথে কথাবার্তা যেভাবে শুরু করা উচিত, এখানেও তা-ই করা হয়েছে। প্রশংসা দিয়ে শুরু। তারপর অনুরোধ।

তো, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথটিকে বলে আস-সিরাতাল মুস্তাক্বীম, সরলসোজা পথ। কিন্তু কোনো সাহায্য ছাড়া এ পথে অবিচল থাকা সহজ নয়।

কারণ এ পথ সম্পর্কে কিছু কিছু বিষয় আমরা জানি, আবার কিছু জানি না। অর্থাৎ, কোনটা হালাল, কোনটা হারাম। কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ। সত্যি বলতে জানার চেয়ে অজানার পরিমাণই বেশি।

আবার জানা বিষয়গুলোর মধ্যেও কিছু জিনিস আমাদের সাধ্যের মধ্যে, কিছু সাধ্যাতীত। যেমন : হজ, সিয়ামের মতো আর্থিক ও কায়িক শ্রমসাধ্য বিষয়গুলো।

যেগুলো সাধ্যের ভেতর, সেগুলোরও কোনো কোনোটি কঠিন বলে মনে হতে পারে। যেমন : ফজরের ওয়াক্তে ঘুম থেকে ওঠা।

কোনোমতে কঠিন কাজগুলো করে ফেললেও আবার তাতে থাকতে পারে নানারকম ত্রুটিবিচ্যুতি। হয়তো মনোযোগের অভাব ছিল বা সুন্নাহ ঠিকমতো আদায় করা হয়নি।

ওপরের সব শর্ত পূরণ করে ফেললেও আরেকটা জিনিস অবশ্যই লাগবে; অবিচলতা। প্রতিবার প্রতিটি কাজ ঠিকঠাকভাবে করার সামর্থ্য।

দেখলেন তো, কেন সরলপথে চলতে আল্লাহর সাহায্য আমাদের এতটা প্রয়োজন? বুঝলেন, কেন তাঁর সাহায্য ছাড়া চলা অসম্ভব? এখান থেকেই কি বোঝা যাচ্ছে না যে, এই দুআটি কতটা ব্যাপক?

আমরা জানি, সিরাত বা পথ দুটো। একটি এই দুনিয়ায়, যার কথা ওপরে বলা হলো। আরেকটি হলো আখিরাতের সেই পুলসিরাত, যা মারাত্মক সরু আর তরবারির চেয়ে ধারালো। জাহান্নামের ওপর স্থাপিত এই সেতু আমাদের সকলরেই পার হতে হবে। এর অপর পাড়েই জান্নাত।

وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا )

প্রত্যেককে এটি পার হতে হবে। এটি আপনার প্রতিপালকের নির্ধারিত বিধি, যা বাস্তবায়িত হবেই। অতঃপর যারা আল্লাহকে ভয় করেছিল, তাদের রক্ষা করব আমি। আর পাপাচারীদের সেখানেই ফেলে রাখব নতজানু অবস্থায়। [সুরা মারইয়াম, আয়াত : ৭১-৭২]

ইহজীবনের সিরাতে অবিচল থাকতে পারলে পরকালের সিরাতও সহজ হয়ে যাবে। তাই দ্বিতীয়টির সাফল্য সরাসরি নির্ভরশীল ইহকালের ঈমান ও আমলের পরিমাণের ওপর। বিচারদিবসের আঁধার আর সেই সেতুর আতঙ্কের মাঝে আমাদের ঈমান আর আমল হবে পথপ্রদর্শক বাতি।

يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ يَسْعَى نُورُهُم بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِم ...

সেদিন দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের নুর তাদের সামনে ও ডানে আগে আগে চলছে। [১]

তাই কেউ পার হবে বিদ্যুৎগতিতে। কেউ উল্কাবেগে। কেউবা বাতাস আর কেউ ঘোড়ার গতিতে। দৌড়েও পার হবে কেউ। কারো কারো যেতে হবে হামাগুড়ি দিয়ে। আর কেউ কেউ ব্যর্থ হয়ে পড়ে যাবে নিচে। প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মরিয়া হয়ে সুপারিশ করতে থাকবেন, প্রতিপালক, ওদের বাঁচান! ওদের রেহাই দিন, হে প্রতিপালক... [২]

ইহকালের সিরাত আমাদের পৌঁছে দেবে আল্লাহর কাছে। আর পরকালের সিরাত নিয়ে যাবে সোজা জান্নাতে।

বুঝতে পারছেন তো দুআটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আমাদের পুরো অস্তিত্ব 'ইহদিনাস সিরাতুল মুস্তাক্বীম'-এর ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতা জেনে যখন আমিন বলবেন, তখনই কেবল তা অন্তরের অন্তস্তল থেকে উঠে আসবে। আসলে যেকোনো দুআ কবুল হওয়ার জন্যই এটি শর্ত। একাগ্র অন্তর থেকে আসতে হবে সেই দুআ। কারণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘অমনোযোগী অন্তর থেকে আসা দুআর জবাব আল্লাহ দেন না।[৩]

আল্লাহ আমাদের সরল পথে পরিচালিত করুন, আমিন।

টিকাঃ
[১] সুরা হাদিদ, আয়াত: ১২
[২] সহিহ মুসলিম: ৩২৯; সহিহুল বুখারি: ৬৫৭৩
[৩] জামিউত তিরমিযি : ৩৪৭৯; হাদিসটি হাসান তথা গ্রহণযোগ্য।

📘 হৃদয় জুড়ানো সালাত 📄 ফাতিহার সমাপ্তি

📄 ফাতিহার সমাপ্তি


আস-সিরাতুল মুস্তাক্বীম নিয়ে এতক্ষণ কথা হলো। আল্লাহর সাহায্যে এতে অবিচল থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করা চাই। তাহলেই আসবে দুজাহানের মুক্তি। এবার সুরা ফাতিহাকে বিদায় জানানোর পালা।

কথায় বলে; সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। তাই আগের দুআটিকে আরো বিশেষায়িত করে আমরা এবার বলছি, সিরাতুল্লাযীনা আন'আমতা আলাইহিম (صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ); তাদের পথ, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন।

পূর্বসূরি সকল সৎকর্মশীল নরনারী এর অন্তর্ভুক্ত। নবি, সাহাবি, নেককার এবং সর্বোপরি আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তারা যে চরম কষ্ট ভোগ করে সরলপথে অবিচল থেকেছেন, সে স্মৃতি আমাদের সান্ত্বনা। নিজেদের দুঃখকষ্ট এতে হালকা হয়ে যায়। স্বস্তি পাই এই জেনে, ইনশাআল্লাহ অন্তহীন আখিরাতে এই মানুষগুলোর সঙ্গী হব আমরা।

গইরিল মাগদুবি আলাইহিম (غَيْرِ الْمَغْضُوبِ); যাদের প্রতি ক্রোধ আপতিত, তাদের পথ নয়। এরা হলো এমন লোক, যারা সত্য-সঠিককে ভালো করেই চেনে। তারপরও ইচ্ছে করেই তা প্রত্যাখ্যান ও অমান্য করে। জানে, কিন্তু মানে না। যেমন : পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয জেনেও অনেকে পড়ে না।

ওয়ালা-দ্ব দ্ব-ল্লীন (وَلَا الضَّالِّينَ); তাদের পথও নয়; যারা পথভ্রষ্ট। এই ধরনের মানুষেরা জানেও না, জানতে চেষ্টাও করে না। তাই তারা মানে, কিন্তু ভুল পথে। যেমন : ভুল নিয়মে সালাত আদায়কারী।

নিয়ামত বা অনুগ্রহের ব্যাপারটি আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। আনআমতা আলাইহিম (أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ), আপনি অনুগ্রহ করেছেন। পক্ষান্তরে ক্রোধ ও পথভ্রষ্টতার ব্যাপারে এরকম কোনো সর্বনামের উল্লেখ নেই। কারণ অনুগ্রহদাতা একমাত্র আল্লাহ। আর পাপাচারে লিপ্ত হলে সারা সৃষ্টিজগতের ক্রোধ উপার্জিত হতে থাকে। ফেরেশতাদের, নবিগণের ক্রোধ, সৎকর্মশীল বান্দাদের ক্রোধ ইত্যাদি।

আমীন অর্থ, হে রব, গ্রহণ করে নিন, উত্তর দিন (আমার প্রার্থনার)। আমীন বলে আমরা প্রার্থনা করছি সেই সত্তার কাছে, যার হাতে আমাদের হিদায়াত, সাফল্য আর নাজাত।

তাই আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন খোলাখুলি বলুন। ফাঁসির আসামি যেভাবে বাদী পরিবারের কাছে প্রাণভিক্ষা করে, সেভাবে। কণ্ঠে থাকবে মরিয়া ভাব, অন্তরে প্রবল আকাঙ্ক্ষা।

প্রাণভরে 'আমীন' বলার আরেকটি কারণ আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যার 'আমীন' আসমানের ফেরেশতাদের 'আমীন' এর সাথে মিলে যাবে, আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। [১]

তাই সালাতে মন হারানোর কোনো কারণই থাকতে পারে না। এত ভালো জিনিস হারাতে চাইবে না কেউ। আমাদের হৃদয় একাগ্র ও জীবিত হওয়া চাই।

আগেও বলা হয়েছে, সুরা ফাতিহা সালাতের অন্তর, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি খুঁটি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে সুরা ফাতিহা পড়েনি, তার সালাতই হয়নি।[২] আল্লাহ এ সুরার প্রতিটি আয়াতের জবাব দেন। কীভাবে? চলুন, শোনা যাক।

আল্লাহ বলেন, 'আমি সালাতকে আমি এবং বান্দার মাঝে ভাগ করে নিয়েছি। আমার বান্দা যা চাইবে, তাই পাবে।'

সে যখন বলে, 'সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।' আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।'

বান্দা যখন বলে, 'পরম করুণাময় ও সতত দয়ালু।' আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা আমার মহিমা ঘোষণা করেছে।'

সে যখন বলে, 'বিচারদিবসের অধিপতি।' আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা আমার মহত্ত্ব ঘোষণা করেছে বা আমার বান্দা সবকিছু আমার কাছে সমর্পিত করেছে।'

সে যখন বলে, 'আমরা শুধু আপনার উপাসনা করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য চাই।' আল্লাহ বলেন, 'এটি আমার ও আমার বান্দার মধ্যকার ব্যাপার। সে যা চাইবে, তা-ই পাবে।'

সে যখন বলে, 'আমাদের সরল পথে পরিচালিত করুন। তাদের পথ, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন। তাদের নয়, যাদের প্রতি আপতিত হয়েছে ক্রোধ। তাদেরও নয়, যারা পথভ্রষ্ট।' তখন আল্লাহ বলেন, 'এটি আমার বান্দার জন্য। আর বান্দা যা চেয়েছে তা-ই পাবে।'[১]

তাই এখন থেকে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াতের সময় প্রতি আয়াতের পর একটু করে থামবেন। এমনটিই করতেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কারণ মহাপ্রতিপালক আপনার প্রতি নিবিষ্ট হয়ে জবাব দিচ্ছেন। দৃশ্যটি অন্তর দিয়ে অনুভব করে দেখুন। তাঁর দাস হওয়াটা কতই না মর্যাদার ব্যাপার!

টিকাঃ
[১] সহিহুল বুখারি: ৭৮০; সহিহ মুসলিম : ৪১০
[২] সহিহুল বুখারি : ৭৫৬; সহিহ মুসলিম : ৩৯৪
[১] সহিহ মুসলিম: ৩৯৫; জামিউত তিরমিযি: ২৯৫৩;

📘 হৃদয় জুড়ানো সালাত 📄 অন্তর থেকে তিলাওয়াত

📄 অন্তর থেকে তিলাওয়াত


সুরা ফাতিহা শেষ করলাম। এরপর আসবে কুরআনের অন্য কোনো অংশের তিলাওয়াত।

খেয়াল করেছেন, সালাতে কুরআন তিলাওয়াত সবসময় দাঁড়ানো অবস্থায় করা হয়? বসা, রুকু, বা সিজদা অবস্থায় নয়। কেন?

দাঁড়ানো অবস্থা হলো সবচেয়ে সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। কুরআনের বাণী সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কথা। সম্মানের স্থান থেকেই তাই সম্মানের এসব উক্তি উচ্চারণ করা উচিত। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রুকু ও সিজদাকালে কুরআন তিলাওয়াত করতে নিষেধ করা হয়েছে।[২]

কুরআন আল্লাহ তাআলার বাণী। সর্বোচ্চ সম্মানের হকদার। কিন্তু জীবনে কতবারই না আমরা এই শক্তিশালী কথাগুলো আওড়ে গেছি একদম অন্যমনস্কভাবে, কোনো আবেগ-অনুভূতি ছাড়াই! যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন, এই মাত্র যে আয়াতটা পড়লেন, সেখানে একটি বিধানের কথা ছিল। কী যেন সেটা? অনেকেই পারবে না উত্তর দিতে। ইমাম জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনা তিলাওয়াত করতে থাকেন। আর পেছনে মুসল্লিরা ভাবতে থাকেন খাবার আর পানীয়ের কথা।

প্রতাপশালী কোনো শাসকের সাথে ঐতিহাসিক কোনো সাক্ষাৎকারের কথা কল্পনা করুন। কতটা মনোযোগী হওয়ার কথা শ্রোতার? শুধু কান নয়; মন দিয়ে শোনা হতো সব কথা। বরং এত মনোযোগ থাকার কথা যে, রীতিমতো মুখস্থ হয়ে যাবে শাসকের প্রতিটি বাক্য। আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের কথাগুলোতে মনোযোগ না দেওয়া তাহলে কীভাবে সম্ভব?

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?[১]

আমাদের অন্তর যদি যথাযথভাবে পরিষ্কার থাকত, তাহলে কখনো আল্লাহকে ভুলতেই পারতাম না। মনে রাখবেন, তিলাওয়াতের পরিমাণ নয়; মান বিবেচ্য। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার অশ্রুভেজা নয়নে একটি আয়াত তিলাওয়াত করেই সারা রাত কাটিয়ে দিয়েছেন—

إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন, তবে তো তারা আপনারই বান্দা। আর যদি ক্ষমা করে দেন, আপনি তো এমনিতেই মহাশক্তিধর ও প্রজ্ঞাবান [২]

তাই তিলাওয়াতের সময় ভালো করে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সাথে আমাদের দ্বিপাক্ষিক কথোপকথন চলছে। তবে কোন আয়াতে কেমন অনুভূতি হতে হবে, তা বুঝব কীভাবে? ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ এ ব্যাপারে একটি সাধারণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। প্রতিটি আয়াতের তাফসির জানা না থাকলেও চলবে। তিনি বলেন—

আয়াতে আল্লাহর অনুগ্রহ, নাম ও বৈশিষ্ট্যের কথা থাকলে অন্তরকে ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করতে হবে।

আল্লাহর দয়া, ক্ষমা ও জান্নাতবাসীদের আলোচনা থাকলে অন্তরে আনতে হবে আনন্দ, প্রশান্তি ও আশা।

আর আল্লাহর শাস্তি, ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি সংক্রান্ত আয়াত হলে ভীতি ও দুশ্চিন্তা নিয়ে আসতে হবে অন্তরে। [১]

অতএব আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত মানেই ভালোবাসা, আশা ও ভয়ের মাঝে দুলতে থাকা। কুরআন আমাদের জ্ঞানের চেয়েও মহান—

لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ )

এ কুরআন যদি পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে দেখতেন যে তা আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও চূর্ণ হয়ে গেছে। মানুষ যাতে চিন্তাভাবনা করে, তাই আমি এসব দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করি।[২]

টিকাঃ
[১] সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ২৪
[২] সুরা মায়িদা, আয়াত : ১১৮
[১] মাদারিজুস সালিকিন, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৫০, ৪৫১; নাদারাতুন নাইম, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৮৪৪; কথাগুলো হুবহু বলা না হলেও কাছাকাছি শব্দে বলা হয়েছে।
[২] সুরা হাশর, আয়াত: ২১

📘 হৃদয় জুড়ানো সালাত 📄 প্রাণভরে চাওয়া

📄 প্রাণভরে চাওয়া


তিলাওয়াত শেষ করতে করতে আবারও মনোযোগ ছুটে গেছে? সমস্যা নেই। রুকুতে যাওয়ার সময় 'আল্লাহু আকবার' বলে আবারও নিজেকে মনে করিয়ে দিন আল্লাহর বড়ত্বের কথা।

এই যে আমরা মাটিতে সালাত আদায় করছি, আর আল্লাহ আমাদের দেখছেন সপ্ত আসমানের ওপর থেকে। তাই সালাত তো এমনিতেই সুন্দর হওয়া উচিত, বিশেষত রুকু। আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য ও পূর্ণতা ভালোবাসেন। তাই সালাতকেও পূর্ণাঙ্গ সুন্দর করি, আসুন।

আঙুলগুলো আলাদা করে দুই হাতের তালু রাখুন দুই হাঁটুতে। এরপর হেলানো মাথার উচ্চতা বরাবর পিঠ সোজা করে রাখুন। শান্তভাবে দেহের প্রতিটি অঙ্গকে জায়গামতো আসতে দিন। পড়ুন ‘সুবহা-না রব্বিয়াল ‘আযীম (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ), মহামহিম আমার সুমহান প্রতিপালক।’ রব্বি শব্দটার শেষের ই (ি) সর্বনামের অর্থ আমার। এই কথাটা খেয়াল করুন ভালো করে। ভালোবাসার যে বন্ধন বান্দা ও রবের মাঝে, তারই নির্দেশক এই সর্বনাম। তিনি আমার রব। যত্ন, আচ্ছাদন, আহার্য, সুস্থতা আর মমতা দিয়ে তিনি আমাকে পালন করেছেন। অন্তর দিয়ে উচ্চারণ করা ‘সুবহা-না’ অর্থ যেকোনো প্রকার ত্রুটি থেকে বহু ঊর্ধ্বে।

যতবার পড়বেন সুবহা-না রব্বিয়াল ‘আযীম, ততই বিনীত হতে থাকবে মন। আল্লাহর মহত্ত্ব-বড়ত্ব স্মরণ করুন। অনুধাবন করুন, আপনি আপনারই প্রতিপালকের কাছে সমর্পিত করছেন সব আশা।

সালাতের এই অংশটুকু যান্ত্রিকভাবে পড়ে চলে যাই আমরা অনেকে। আবেগ-অনুভূতির লেশমাত্র মেলে না। অথচ এই রুকু অবস্থানটা আল্লাহর প্রতি দাসত্ব প্রকাশের খুবই নিবিড় এক নিদর্শন। আনুগত্যের নির্যাস এতে নিহিত। সেসময়কার আরবরা এ ব্যাপারে ভালো করেই জানত। তাই এ কাজ করতে প্রত্যাখ্যান করে কিছু অহংকারী ব্যক্তি। এমনকি তাদের পক্ষ থেকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক সাহাবি অনুরোধ করেছিলেন তারা যেহেতু সালাতে রুকু তথা মাথা ঝুঁকাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে তাই দাঁড়ানো থেকে সরাসরি সিজদায় চলে যাওয়া যায় কি না! অন্তত সালাতটা পড়ুক তারা।

আমাদের প্রত্যেকের প্রয়োজন আলাদা। ভালোবাসার চাহিদা, কিছুক্ষণ একা থাকার ইচ্ছা, কারো কাছে প্রতীক্ষিত হওয়ার বাসনা, সন্তানদের জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর আকাঙ্ক্ষা, কিছু সান্ত্বনার বাণী শোনার কামনাসহ আরো কত কী! এর কোনোটার অভাব ঘটলে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় আমাদের মাঝে। এমন ভারসাম্যহীন অবস্থা পুরো দিনটিকে প্রভাবিত করে। অজানা কারণে মেজাজ খিটমিটে লাগে। লাগারই কথা, প্রয়োজন পূরণ হয়নি যে!

কিন্তু এর চেয়েও অনেক গুরুতর এক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে আমাদের মাঝে। এটি ছাড়া পুরোপুরি ভালো থাকা সম্ভব নয়। ইবাদতের প্রয়োজনীয়তা। এই অভাব পূরণ করতে যুগে যুগে মানুষ সূর্য এবং সূর্যের নিচে যা আছে, কোনোকিছুর আরাধনা করতে ছাড়েনি। মূর্তি, পানি, পশু, সাপ, সূর্য, বাঁদর, বিজ্ঞান এমনকি নিজের কামনা-বাসনা। অনেক শ্রম ও সম্পদ ব্যয় করে তারা এর পেছনে। অভাবটা তো পূরণ করতে হবে। কিন্তু সত্য অদ্বিতীয় সত্তার উপাসনার স্বাদ কি আর তাতে মেটে? সেই অভাব পূরণ করে সালাত। রুকু তার অবিচ্ছেদ্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সালাফগণ রুকুতে এত প্রশান্তি অনুভব করতেন, তিলাওয়াতের সমপরিমাণ সময় এই অবস্থানে থাকতেন। কোনো এক সাহাবি একবার সালাতে এক রাকআতে প্রথম পাঁচটি সুরা একনাগাড়ে তিলাওয়াত করেছেন। তার পাশেই সালাতরত আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই পুরোটা সময় ছিলেন রুকু অবস্থায়! মানুষগুলো এভাবেই পূরণ করেছেন ইবাদতের চাহিদা।

হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে দেখলেন রীতিমতো তাড়াহুড়া করে সালাত আদায় করছে। রুকু-সিজদা দিচ্ছে যেন ঠোকর মারার মতো করে। তিনি বললেন, তুমি এ অবস্থায় অর্থাৎ এরকম সালাত নিয়ে মারা গেলে সালাতের ব্যাপারে নবিজির দেখানো সুন্নাহর বিরুদ্ধাচরণকারী হয়ে মরবে।[১] তাই রুকু হওয়া চাই শান্ত, ধীর, স্থির-ঠিক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণে।

দেখুন, দুনিয়ার জীবন কষ্ট আর ব্যথায় ভরা। এই হাসি, তো এই কান্না। এর দাবিদাওয়া আমাদের তৃষ্ণার্ত ও ক্লান্ত করে ছাড়ে। এই তৃষ্ণা মেটাতে সালাতের চেয়ে ভালো আর কী আছে, বলুন! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ঠিকমতো রুকু পূর্ণ করে না, সে যেন অনাহারে একটি দুটি খেজুর খাওয়া ব্যক্তির মতো। ক্ষুধা একটুও মেটে না তাতে।[২] তাই আসুন, রুকু-সিজদায় প্রশান্তি খুঁজি।

দিনে কমপক্ষে সতেরোবার আমরা রুকু করি। প্রতিটি বারেই যেন বৃদ্ধি পায় আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালোবাসা। আপনি তাঁকে সাধ্যমতো ভালোবাসলে তিনি আপনাকে ভালোবাসবেন তাঁর মর্যাদা অনুপাতে। স্রষ্টাই যদি ভালোবাসেন, সৃষ্টির তবে কী সাধ্যি ক্ষতি করার?

টিকাঃ
[১] সহিহুল বুখারি: ৩৮৯; সহিহ সুনানু নাসায়ি: ১৩১১
[২] সহিহুত তারগিব: ৫২৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px