📄 ফাতিহার আরো কিছু গুপ্তধন
এখন আমরা এলাম 'আর-রহমানির রহীম' (الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ), পরম দয়াবান ও সতত দয়ালু অংশে। কখনো কি ভেবেছেন, কেন এটি 'মালিকি ইয়াওমিদ্দীন' (مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ), বিচারদিবসের অধিকর্তা আয়াতের আগে এলো?
একটা দৃশ্য কল্পনা করুন। কোনো একটি অপরাধের তদন্ত চলছে। আপনি ঘটনাস্থলে ছিলেন। শুরু হলো বিচারকার্য। আপনি নিরপরাধ। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিচারক আপনাকেও তলব করলেন। যেকোনোভাবে প্রশ্ন করতে পারেন তিনি।
শুরুতেই প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলা। ঘটনাস্থলে কেন ছিলেন? কী কাজ সেখানে? ঠিক কোন সময়ে পৌঁছেছিলেন? কী দেখেছেন? ইত্যাদি। আপনার হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার জোগাড়। আর নিতে পারছেন না আপনি। এমনসময় বিচারক আশ্বস্ত করে বললেন, যা-ই হোক। আমরা কিন্তু জানি, আপনি নিরপরাধ। কিন্তু আমাদের যথাসাধ্য তথ্য জোগাড় করা প্রয়োজন।
অথবা শুরুতেই আপনার নির্দোষ ঘোষণা করে তারপর প্রশ্ন শুরু করা। দেখুন, আমরা জানি আপনি নির্দোষ। তবে যদি তথ্য দিয়ে আমাদের সাহায্য করেন, তাহলে খুবই উপকৃত হই।
প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আপনার বেশ নির্ভার অনুভূত হবে না? আর-রহমানির রহীম এর সাথে মালিকি ইয়াওমিদ্দীনের সম্পর্কটা এরকমই। বিচারদিবসে আপনার বিচার করবেন আর-রহমানির রহীম। এ কথাটিই স্মরণ করিয়ে দিতে এ দুটো নাম আগে এসেছে। দয়াময়-দয়ালু নাম দুটো হৃদয়ে জ্বেলে দেয় প্রশান্তি আর নির্ভরতার আলো। ভয়াল সেই মহাদিবসে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর পূর্বপ্রস্তুতিই তো সালাতে দাঁড়ানো। তবে হ্যাঁ, আমরা যেন নিজেদের সেই দয়ার যোগ্য করে তোলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে না ভুলি।
আর-রহমানির রহীম থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর দয়া সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে, ক্রোধ নয়। ইহকালে এই দয়া মুসলিম-কাফির, সদাচারী-কদাচারীসহ সকলেই পেয়ে থাকে। আল্লাহ সবাইকে আহার করান, পোশাক পরান, সুস্থ করেন। তাড়াহুড়ো করে শাস্তি না দিয়ে প্রচুর সময় দেন সুপথে ফিরে আসার। সম্পূর্ণ একটা জীবন, মৃত্যুর আগপর্যন্ত ফিরে আসার সুযোগ থাকে!
আল্লাহর দান যেমন তাঁর রহমত, তেমনি তাঁর না দেওয়াটাও রহমত। মাঝেমাঝে তিনি আমাদের কিছু কিছু অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করেন। বিশ্বাস করুন, এটিই সত্যিকারের দান। কষ্টের ছদ্মবেশে রহমত। কিন্তু তা সাথে সাথে উপলব্ধি করার মতো প্রজ্ঞাটাই আমাদের নেই।
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ ...
যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি বুঝি জানবেন না?[১]
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
আর হয়তো তোমরা যা অপছন্দ করো, তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যা ভালোবাসো, তা হয়তো অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।[২]
আর-রহমান হলো মমতার পূর্ণাঙ্গ রূপ। আরবিতে শব্দের গঠন এরকম হলে পূর্ণাঙ্গতা বোঝায়। যেমন গাযবান (غضبان) ও গাযিব (غَاضِب) দুটো শব্দরই অর্থ ক্রোধান্বিত। আবার জাওআন (جَوْعَان) ও জা-ই (جَائِع) শব্দদ্বয়ের অর্থ ক্ষুধার্ত। কিন্তু গাযবান ও জাওআন দিয়ে যথাক্রমে একেবারে বেশি ক্রোধান্বিত ও একেবারে বেশি ক্ষুধার্ত বোঝায়, এর বেশি ক্রোধান্বিত বা ক্ষুধার্ত হওয়া সম্ভব নয়। তাই আর-রহমান অর্থ আল্লাহ পরিপূর্ণ দয়াময়।
সত্যি বলতে, আল্লাহর সকল নামের মাঝে আর-রহমান নামটির পরিসরই সবচেয়ে বড়। আরশে সমুন্নত হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এ নামটিই উল্লেখ করেছেন।
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى আর-রহমান আরশে সমুন্নত।[৩]
এই মহান নাম কুরআনে বারবার উচ্চারিত হয়েছে মহান সৃষ্টি আল-আরশের সাথে। এ নামের ওপর আল্লাহর মালিকানা এতই একচ্ছত্র যে, অন্য কোনো সৃষ্টির নাম আর-রহমান হতে পারে না। মানুষের নাম আব্দুর রহমান (আর-রহমানের বান্দা) হয়, শুধু আর-রহমান হয় না। এই নাম কোনো সৃষ্টির রাখা যাবে না। আবার আল্লাহও কিন্তু নাম হয় না কারো। এই দুটো নাম একেবারেই তাঁর নিজস্ব।
আর আর-রহিম হলেন যিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া পৌঁছে দেন। কুরআনে কেবল মুমিনদের প্রতি দয়া করার ক্ষেত্রে এই নামটি ব্যবহৃত হয়েছে।
আল্লাহ এবং মানুষের আসল স্বভাব সম্পর্কে যদি আমাদের ভালোভাবে জানা থাকত, তাহলে যেকোনো ব্যাপারে আমরা মানুষের দ্বারস্থ হওয়ার বদলে আল্লাহর স্মরণ নিতাম। আপন মায়ের চেয়ে যে আল্লাহর ভালোবাসা বেশি, এটা জানার পর আর কীইবা বাকি থাকে? সকল প্রশংসা আল্লাহর যে তিনি ক্রোধের পরিবর্তে দয়া দিয়ে সবকিছুকে শাসন করেন।
হৃদয়ের ভার সরিয়ে ফেলুন আর-রহমানির রহীমের ছন্দে।
টিকাঃ
[১] সুরা মুলক, আয়াত: ১৪
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬
[৩] সুরা ত-হা, আয়াত: ৫
📄 একটু ঝাঁকুনি
তারপর আসে 'মালিকি ইয়াওমিদ্দীন' (مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ), বিচারদিবসের অধিপতি। মালিক (অধিপতি, সার্বভৌম, কর্তা) শব্দটি কেন বেছে নিলেন আল্লাহ? কারণ ইহকালে সৃষ্টিকে যাও বা কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, কিয়ামতের পর তা একেবারেই ছিনিয়ে নেওয়া হবে। সকল ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিকারী হবেন স্বয়ং আল্লাহ। এমনকি তাঁর অনুমতি পাওয়ার আগে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারবে না কেউ, কারো নামে সুপারিশ করা তো দূর কি বাত! আর এই শব্দটির দুইরকম কিরাআত আছে। মা-লিকি (মালিকানা অর্থে) এবং মালিকি (রাজত্ব অর্থে)। দুটিই এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলার একক আধিপত্যের সেই দিনটি কতটা ভীতিকর, তা জানা যায় বহু আয়াত থেকে—
'যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে...যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে... যখন তারকারাজি নিষ্প্রভ হয়ে খসে পড়তে থাকবে... যখন পাহাড়গুলো মিলিয়ে যাবে...যখন সাগর ফুটতে শুরু করবে... পৃথিবী যখন প্রকম্পিত হবে... পশুপালকে যখন জড়ো করা হবে...যখন কবরগুলো উলটে দেওয়া হবে।' [সুরা তাকভির, ইনফিতার, ইনশিকাক, ফাজর]
(৩৬) يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ
যখন মানুষ পালিয়ে বেড়াবে তার নিজের ভাইয়ের কাছ থেকে, মায়ের ও বাবার কাছ থেকে, আপন সঙ্গী ও সন্তানের কাছ থেকে[১]
يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ
সেদিন দেখবেন স্তন্যদাত্রী মা তার কোলের শিশুকে ভুলে যাবে, গর্ভপাত হয়ে যাবে গর্ভবতীদের। মনে হবে যেন পুরো মানবজাতি মাতাল, অথচ আসলে তারা তা নয়; বরং আল্লাহর শাস্তিই প্রচণ্ড![২]
يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيّ السَّجِلِ لِلْكُتُبِ ...
সেদিন আমি আকাশগুলোকে গুটিয়ে নেব কাগজের মতো।[৩]
... وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتُ بِيَمِينِهِ ...
আর আকাশসমূহ গুটিয়ে নেওয়া হবে তাঁর ডান হাতে [৪]
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ ...
আর শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং আসমান-জমিনের সবকিছু হয়ে যাবে সংজ্ঞাহীন [৫]
বাকি থাকবে কে? শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া ফেরেশতা। তারপর আল্লাহ তাঁর প্রাণও নিয়ে নেবেন। আর কে বাকি? কেউ না। আমাদের প্রতিপালক ডেকে বলবেন, আজ রাজত্ব কার? কোনো উত্তর নেই। কার রাজত্ব আজ? উত্তর নেই। রাজত্ব কার? সুনসান নীরবতা। আল্লাহ তারপর নিজেই ঘোষণা করবেন, অদ্বিতীয় ও সর্বক্ষমতাময় আল্লাহর।[১]
ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا হُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ ﴿١৩ তারপর (শিঙ্গায়) দ্বিতীয় ফুৎকার ধ্বনিত হবে। তারা উঠে দাঁড়িয়ে তাকাবে।
وَأَشْرَقَتِ الْأَرْضُ بِنُورِ رَبِّهَا ... ﴿৬৯ আর জমিন উদ্ভাসিত হবে তার প্রতিপালকের নুরে।[৩]
وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ ... ﴿২৩ আর আপনার প্রতিপালক উপস্থিত হবেন, তাঁর ফেরেশতারা দাঁড়াবে সারিবদ্ধ হয়ে আর সেদিন জাহান্নামকে সামনে আনা হবে।[৪]
মাথার কাছে সূর্য চলে আসবে এমন এক দিনে, যার দৈর্ঘ্য ৫০ হাজার বছরের সমান! এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তির উপায় কী? উত্তর সামনে আসছে।
তার আগে আরো একবার মালিকি ইয়াওমিদ্দীনের সত্যিকার প্রতিচ্ছবিটি ভাবুন। সালাতে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করে একটু থামবেন। বধির ও নির্বোধের মতো পার করে যাবেন না এই অংশটি। কারণ মুমিনের হৃদয় তো আশা ও ভয়ের মাঝে দুলতে থাকে। আল্লাহর রহমতের আশা এবং তাঁর অসন্তুষ্টি ও শাস্তির ভয়।
টিকাঃ
[১] সুরা আবাসা, আয়াত : ৩৪
[২] সুরা হজ, আয়াত : ২
[৩] সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৪
[৪] সুরা যুমার, আয়াত: ৬৭
[৫] সুরা যুমার, আয়াত : ৬৮
[১] সুরা গাফির, আয়াত : ১৬
[৩] সুরা যুমার, আয়াত : ৬৯
[৪] সুরা ফজর, আয়াত: ২২
📄 মুক্তির চাবিকাঠি
মালিকি ইয়াওমিদ্দীন আয়াতের স্বরূপ বুঝতে পারলে আসলেই ভয়ে কেঁপে ওঠার কথা। অথচ অনেকে রীতিমতো আনমনে আওড়ে চলে যান আয়াতটি। কথাগুলো হৃদয়ে পৌঁছে না। মুখস্থ বুলির মতো চলতে থাকে।
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা গবেষণা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?[১]
সালাতে যাদের সত্যিকার অর্থে মনোযোগ থাকে, তারা সালাতে শান্তি পায় পানিতে থাকা মাছের মতো। আর যাদের মনোযোগ থাকে না, তারা যেন খাঁচায় বন্দি পাখির মতো অস্থির।
তো সেই ভয়াবহ দিনে রক্ষা পাওয়ার কী উপায়? উত্তর আছে পরের আয়াতেই। পুরো কুরআনের সারমর্ম যে সুরা ফাতিহা, সেই সুরার সারমর্ম এই আয়াত। 'ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা 'ঈন (إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ), আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং সাহায্যও চাই কেবল আপনারই কাছে।
প্রত্যেক নবি নিজ নিজ উম্মাতকে নাজাতের এই চাবি দিয়ে গেছেন—
إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُبِينٌ أَنْ لَا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ
আমি তোমাদের কাছে এসেছি সুস্পষ্ট সতর্ককারী হিসেবে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপাসনা করবে না। তোমাদের জন্য এক যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির ব্যাপারে সত্যিই আশঙ্কা হয়।[২]
জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাহলে কী হওয়া চাই? শুধু এবং শুধুই আল্লাহর ইবাদত। আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে এ কাজের জন্য। সেই লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম? আল্লাহর সাহায্য কামনা।
আর ইবাদতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক কোনটি? অন্তরের একনিষ্ঠতা। আমরা যা করছি এবং যা করব সবই শুধু আল্লাহর জন্য আর কারো জন্য নয়। তাঁর সন্তুষ্টিই একমাত্র কাম্য। নিয়তের এই বিশুদ্ধতা ছাড়া ইবাদত করা মানে বালুর বস্তা নিয়ে ভ্রমণে বের হওয়া। কাঁধে প্রচুর ওজন, কিন্তু সবটাই অযথা বোঝা।
কেবল আল্লাহকে আপনার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু বানান; মানুষকে নয়। তারা কী ভাবল বা বলল, তা বিবেচ্যই নয়। এতে আপনার না কোনো ক্ষতি হবে, না উপকার। অমুক কাজটি কেন করেছেন? এ প্রশ্নের উত্তরে যেন আপনি দৃঢ়ভাবে বলতে পারেন, আল্লাহর জন্য। মানুষ বলবে, না, সেটা তো ঠিক আছে। আর কীসের জন্য? একই রকম প্রত্যয়ে বলবেন, আর কিছুর জন্যই নয়।
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا ۞ الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ (১০৩) يُحْسِنُونَ صُنْعًا
বলুন, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো, কাজের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় অভাগা কারা? এই জীবনের সকল প্রচেষ্টা যাদের বৃথা হয়ে গেছে, অথচ তারা ভাবছিল কতই না ভালো কাজ করছে।[১]
আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ একাগ্রতা আপনার জীবনটাই পালটে দেবে। তাই প্রতিটি কাজে নিয়ত পরিশুদ্ধ করে নিন। সন্তানদেরও বুঝিয়ে দিন যে, যেকোনো কাজ তারা করতে শিখবে আল্লাহ সেটা পছন্দ করেন বলে। আর যেকোনো কাজ থেকে বিরতও থাকবে সেটা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় বলে। তারা যেন জেনে যায় যে, পুরস্কারদাতা শুধু আল্লাহ। মানুষ নয়।
তবে বিশুদ্ধ নিষ্ঠা ও নিয়ত অত সোজা নয়, এটা সত্য। তাই বলে অসম্ভবও তো নয়। কারণ আমাদের শেখানো হয়েছে এক জাদুমন্ত্র, 'ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা'ঈন (وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ) আর সাহায্যও চাই আপনারই কাছে।' আল্লাহ সাহায্য করলে কিছুই আর অসম্ভব থাকে না। সবই আল্লাহর হাতে। স্রেফ চেয়ে নিন, তিনি দিয়ে দেবেন। তিনি তো বলেই দিয়েছেন, আমি যাকে সুপথে চালাই, সে ছাড়া তোমরা সকলে পথভ্রষ্ট। [১]
ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা'ঈন এমন এক আয়াত, যা নিয়ে আমাদের সৎকর্মশীল পূর্বসূরিগণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কান্নাকাটি করতেন। জনৈক সালাফ একবার সালাত আদায় করছিলেন মসজিদুল হারামে। এই আয়াতটা বারবার পড়তে পড়তে কাঁদছিলেন তিনি। সেসময় কাবা তাওয়াফ করতে গেলেন তাঁর এক বন্ধু। তাওয়াফ শেষ করে ফিরে এসে দেখেন এখনো তিনি ওই আয়াত পড়ছেন আর কাঁদছেন। এরকম করতে করতেই সূর্যোদয়ের সময় চলে আসে।
তাই 'ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা'ঈন' দিয়ে অন্তরের সব মুনাফেকির ময়লা ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে ফেলুন।
টিকাঃ
[১] সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ২৪
[২] সুরা হুদ, আয়াত: ২৫-২৬
[১] সুরা কাহফ, আয়াত : ১০৩-১০৪
[১] সহিহ মুসলিম : ২৫৭৭; জামিউত তিরমিজি : ২৪৯৫
📄 শ্রেষ্ঠতম দুআ
জীবনে যত দুআ করা সম্ভব, তার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ ও গভীর দুআটি এখন চলে এসেছে।
'ইহদিনাস-সিরাতাল মুস্তাক্বীম' (اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ), আমাদের সরল পথে পরিচালিত করুন।
আমাদের সরল পথে পরিচালিত করার অর্থ হলো যথাযথভাবে তাঁর ইবাদত করার ব্যাপারে সাহায্য করা। মনে আছে, আগের আয়াতেই যে আমরা সাহায্য চাওয়ার কথা বলেছিলাম?
খেয়াল করুন, সুরা ফাতিহা আমাদের শেখাচ্ছে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা তুলে ধরার আদব-কায়দা। শেখাচ্ছে কীভাবে দুআ করলে আল্লাহ শুনবেন এবং জবাব দেবেন।
মহাসম্মানিত সত্তার সাথে কথাবার্তা যেভাবে শুরু করা উচিত, এখানেও তা-ই করা হয়েছে। প্রশংসা দিয়ে শুরু। তারপর অনুরোধ।
তো, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথটিকে বলে আস-সিরাতাল মুস্তাক্বীম, সরলসোজা পথ। কিন্তু কোনো সাহায্য ছাড়া এ পথে অবিচল থাকা সহজ নয়।
কারণ এ পথ সম্পর্কে কিছু কিছু বিষয় আমরা জানি, আবার কিছু জানি না। অর্থাৎ, কোনটা হালাল, কোনটা হারাম। কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ। সত্যি বলতে জানার চেয়ে অজানার পরিমাণই বেশি।
আবার জানা বিষয়গুলোর মধ্যেও কিছু জিনিস আমাদের সাধ্যের মধ্যে, কিছু সাধ্যাতীত। যেমন : হজ, সিয়ামের মতো আর্থিক ও কায়িক শ্রমসাধ্য বিষয়গুলো।
যেগুলো সাধ্যের ভেতর, সেগুলোরও কোনো কোনোটি কঠিন বলে মনে হতে পারে। যেমন : ফজরের ওয়াক্তে ঘুম থেকে ওঠা।
কোনোমতে কঠিন কাজগুলো করে ফেললেও আবার তাতে থাকতে পারে নানারকম ত্রুটিবিচ্যুতি। হয়তো মনোযোগের অভাব ছিল বা সুন্নাহ ঠিকমতো আদায় করা হয়নি।
ওপরের সব শর্ত পূরণ করে ফেললেও আরেকটা জিনিস অবশ্যই লাগবে; অবিচলতা। প্রতিবার প্রতিটি কাজ ঠিকঠাকভাবে করার সামর্থ্য।
দেখলেন তো, কেন সরলপথে চলতে আল্লাহর সাহায্য আমাদের এতটা প্রয়োজন? বুঝলেন, কেন তাঁর সাহায্য ছাড়া চলা অসম্ভব? এখান থেকেই কি বোঝা যাচ্ছে না যে, এই দুআটি কতটা ব্যাপক?
আমরা জানি, সিরাত বা পথ দুটো। একটি এই দুনিয়ায়, যার কথা ওপরে বলা হলো। আরেকটি হলো আখিরাতের সেই পুলসিরাত, যা মারাত্মক সরু আর তরবারির চেয়ে ধারালো। জাহান্নামের ওপর স্থাপিত এই সেতু আমাদের সকলরেই পার হতে হবে। এর অপর পাড়েই জান্নাত।
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا )
প্রত্যেককে এটি পার হতে হবে। এটি আপনার প্রতিপালকের নির্ধারিত বিধি, যা বাস্তবায়িত হবেই। অতঃপর যারা আল্লাহকে ভয় করেছিল, তাদের রক্ষা করব আমি। আর পাপাচারীদের সেখানেই ফেলে রাখব নতজানু অবস্থায়। [সুরা মারইয়াম, আয়াত : ৭১-৭২]
ইহজীবনের সিরাতে অবিচল থাকতে পারলে পরকালের সিরাতও সহজ হয়ে যাবে। তাই দ্বিতীয়টির সাফল্য সরাসরি নির্ভরশীল ইহকালের ঈমান ও আমলের পরিমাণের ওপর। বিচারদিবসের আঁধার আর সেই সেতুর আতঙ্কের মাঝে আমাদের ঈমান আর আমল হবে পথপ্রদর্শক বাতি।
يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ يَسْعَى نُورُهُم بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِم ...
সেদিন দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের নুর তাদের সামনে ও ডানে আগে আগে চলছে। [১]
তাই কেউ পার হবে বিদ্যুৎগতিতে। কেউ উল্কাবেগে। কেউবা বাতাস আর কেউ ঘোড়ার গতিতে। দৌড়েও পার হবে কেউ। কারো কারো যেতে হবে হামাগুড়ি দিয়ে। আর কেউ কেউ ব্যর্থ হয়ে পড়ে যাবে নিচে। প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মরিয়া হয়ে সুপারিশ করতে থাকবেন, প্রতিপালক, ওদের বাঁচান! ওদের রেহাই দিন, হে প্রতিপালক... [২]
ইহকালের সিরাত আমাদের পৌঁছে দেবে আল্লাহর কাছে। আর পরকালের সিরাত নিয়ে যাবে সোজা জান্নাতে।
বুঝতে পারছেন তো দুআটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আমাদের পুরো অস্তিত্ব 'ইহদিনাস সিরাতুল মুস্তাক্বীম'-এর ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতা জেনে যখন আমিন বলবেন, তখনই কেবল তা অন্তরের অন্তস্তল থেকে উঠে আসবে। আসলে যেকোনো দুআ কবুল হওয়ার জন্যই এটি শর্ত। একাগ্র অন্তর থেকে আসতে হবে সেই দুআ। কারণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘অমনোযোগী অন্তর থেকে আসা দুআর জবাব আল্লাহ দেন না।[৩]
আল্লাহ আমাদের সরল পথে পরিচালিত করুন, আমিন।
টিকাঃ
[১] সুরা হাদিদ, আয়াত: ১২
[২] সহিহ মুসলিম: ৩২৯; সহিহুল বুখারি: ৬৫৭৩
[৩] জামিউত তিরমিযি : ৩৪৭৯; হাদিসটি হাসান তথা গ্রহণযোগ্য।