📄 আপন সীমানা ছাড়িয়ে যাত্রা
তো এতক্ষণে আমরা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে আল্লাহর পরম ত্রুটিহীনতার সাক্ষ্য দিলাম। তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানালাম সবকিছুর জন্য। এবার পরের ধাপ।
জনপ্রিয় একটি পাওয়ার পয়েন্ট অ্যানিমেশান আছে। প্রথমে ছোট্ট একটি গাছের পাতার কোষের ভেতরের জগৎটা দেখানো হয়। তারপর দশ গুণ করে জুম আউট করে দেখানো হয় বাইরের জগৎগুলো। একে একে পৃথিবী, তারকারাজি, নভোমণ্ডল হয়ে অবিশ্বাস্য এ বিশ্বজগতের একটি চিত্র তৈরি করা হয়। এই একই কাজ এখন আপনি করবেন, তবে তা ওই পাতা থেকে শুরু হবে না। শুরু হবে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো এই আপনার নিজের প্রতিচ্ছবি দিয়ে।
প্রথমেই ভাবুন আপনার শরীরের ভেতরে সুনিপুণ শৃঙ্খলায় চলমান বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় তন্ত্রের কথা। রক্ততন্ত্র, রোগপ্রতিরোধতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, প্রাণরস, হৃদস্পন্দন, শ্বাসতন্ত্র, স্নায়ুকোষের চলাচল, ত্বকের কোষ, যকৃত, প্লীহা, রেচনতন্ত্র ইত্যাদি সবকিছু। তারপর বেরিয়ে আসুন আপনার চারপাশের জিনিসগুলোতে। মহাবিস্ময়কর উদ্ভিদজগৎ, প্রাণিজগৎ, সাত সাগর, অতি তুচ্ছ পতঙ্গ আর অণুজীবের জগতে।
এবার আরেক ধাপ বাইরে। অলৌকিক নিপুণতায় ভাসমান গ্রহ-উপগ্রহ ও সূর্যের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের সৌরজগতে। তারও বাইরে থাকা নক্ষক্ষত্রপুঞ্জ ও বিশ্বজগতে। তারও চিরকাল মানব-দানবের নাগালের বাইরে রয়ে যাওয়া অদেখা জগতে।
এখানেই শেষ নয় হয়তোবা। কিন্তু আমাদের জ্ঞানের দৌড় অতটুকুই। তাই আবারও ধাপে ধাপে ফিরে আসুন সালাতরত নিজের কাছে। আল্লাহর সৃষ্টিযজ্ঞের সামনে নিজেকে কি একটি বিন্দুবিসর্গ বলেও মনে হচ্ছে আর? তাও তো মাত্র প্রথম আসমানের কথা বলা হলো। কুরআন আমাদের জানায়, এর বাইরে আরো ছয়টি আসমান আছে। আর এই সবকিছুতে শৃঙ্খলা রক্ষা করছেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ।
এখন কেমন লাগছে সেই প্রতিপালকের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর সাথে কথা বলতে? কেমন লাগছে প্রতিটি আয়াতের জবাব পেয়ে? এখনো কি সাহস আছে তাঁর আদেশ অমান্য করার? এই উচ্চতার প্রতাপের অবাধ্যতা যে কত বড় দুঃসাহস, তা কি বুঝতে পারছেন এখন? কিংবা এই উচ্চতার ভালোবাসার অবমূল্যায়ন? পুরো সৃষ্টিজগতের মাঝে আমাদের মতো তুচ্ছ জিনিসকে তিনি বেছে নিয়েছেন সালাতের ওই প্রিয় বাক্যগুলো বলার জন্য। কতটা ভালোবাসা থাকলে কোনো সত্তা এরূপ করতে পারেন? এই যে আজানের জবাবে সালাতে দাঁড়ানোর মতো সাধ্যটুকু তিনি দিলেন, এটাই তো এক অকল্পনীয় অনুগ্রহ। কোন অজুহাতে তবে আমরা নিজেদের সেরাটা ঢেলে দেওয়া থেকে বিরত থাকি? এইরকম মর্যাদার হাতছানি উপেক্ষা করে কি আর জীবনের সালাত পরিত্যাগ করা সম্ভব?
যে প্রতাপের সামনে আমরা দাঁড়াচ্ছি, তার স্বরূপ বোঝানোর চেষ্টা করেছেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বলেছেন, আল্লাহর আরশের পায়া (আল-কুরসি) পুরো আসমান-জমিনকে বেষ্টন করে আছে।[১] আর আল্লাহর কুরসির তুলনায় সপ্ত আসমান যেন মরুভূমিতে পড়ে থাকা একটি আংটি। আবার আরশের তুলনায় কুরসিও অতটুকুই!
তাই এখন থেকে সালাতে দাঁড়ালে নিজেকে এভাবে দূর থেকে দেখবেন। তাহলেই বুঝে যাবেন রব্বিল 'আলামীনের সামনে দাঁড়ানোর আসল মানে।
টিকাঃ
[১] সুরা বাকারা, আয়াত : ২৫৫
📄 ফাতিহার আরো কিছু গুপ্তধন
এখন আমরা এলাম 'আর-রহমানির রহীম' (الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ), পরম দয়াবান ও সতত দয়ালু অংশে। কখনো কি ভেবেছেন, কেন এটি 'মালিকি ইয়াওমিদ্দীন' (مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ), বিচারদিবসের অধিকর্তা আয়াতের আগে এলো?
একটা দৃশ্য কল্পনা করুন। কোনো একটি অপরাধের তদন্ত চলছে। আপনি ঘটনাস্থলে ছিলেন। শুরু হলো বিচারকার্য। আপনি নিরপরাধ। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিচারক আপনাকেও তলব করলেন। যেকোনোভাবে প্রশ্ন করতে পারেন তিনি।
শুরুতেই প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলা। ঘটনাস্থলে কেন ছিলেন? কী কাজ সেখানে? ঠিক কোন সময়ে পৌঁছেছিলেন? কী দেখেছেন? ইত্যাদি। আপনার হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার জোগাড়। আর নিতে পারছেন না আপনি। এমনসময় বিচারক আশ্বস্ত করে বললেন, যা-ই হোক। আমরা কিন্তু জানি, আপনি নিরপরাধ। কিন্তু আমাদের যথাসাধ্য তথ্য জোগাড় করা প্রয়োজন।
অথবা শুরুতেই আপনার নির্দোষ ঘোষণা করে তারপর প্রশ্ন শুরু করা। দেখুন, আমরা জানি আপনি নির্দোষ। তবে যদি তথ্য দিয়ে আমাদের সাহায্য করেন, তাহলে খুবই উপকৃত হই।
প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আপনার বেশ নির্ভার অনুভূত হবে না? আর-রহমানির রহীম এর সাথে মালিকি ইয়াওমিদ্দীনের সম্পর্কটা এরকমই। বিচারদিবসে আপনার বিচার করবেন আর-রহমানির রহীম। এ কথাটিই স্মরণ করিয়ে দিতে এ দুটো নাম আগে এসেছে। দয়াময়-দয়ালু নাম দুটো হৃদয়ে জ্বেলে দেয় প্রশান্তি আর নির্ভরতার আলো। ভয়াল সেই মহাদিবসে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর পূর্বপ্রস্তুতিই তো সালাতে দাঁড়ানো। তবে হ্যাঁ, আমরা যেন নিজেদের সেই দয়ার যোগ্য করে তোলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে না ভুলি।
আর-রহমানির রহীম থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর দয়া সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে, ক্রোধ নয়। ইহকালে এই দয়া মুসলিম-কাফির, সদাচারী-কদাচারীসহ সকলেই পেয়ে থাকে। আল্লাহ সবাইকে আহার করান, পোশাক পরান, সুস্থ করেন। তাড়াহুড়ো করে শাস্তি না দিয়ে প্রচুর সময় দেন সুপথে ফিরে আসার। সম্পূর্ণ একটা জীবন, মৃত্যুর আগপর্যন্ত ফিরে আসার সুযোগ থাকে!
আল্লাহর দান যেমন তাঁর রহমত, তেমনি তাঁর না দেওয়াটাও রহমত। মাঝেমাঝে তিনি আমাদের কিছু কিছু অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করেন। বিশ্বাস করুন, এটিই সত্যিকারের দান। কষ্টের ছদ্মবেশে রহমত। কিন্তু তা সাথে সাথে উপলব্ধি করার মতো প্রজ্ঞাটাই আমাদের নেই।
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ ...
যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি বুঝি জানবেন না?[১]
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
আর হয়তো তোমরা যা অপছন্দ করো, তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যা ভালোবাসো, তা হয়তো অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।[২]
আর-রহমান হলো মমতার পূর্ণাঙ্গ রূপ। আরবিতে শব্দের গঠন এরকম হলে পূর্ণাঙ্গতা বোঝায়। যেমন গাযবান (غضبان) ও গাযিব (غَاضِب) দুটো শব্দরই অর্থ ক্রোধান্বিত। আবার জাওআন (جَوْعَان) ও জা-ই (جَائِع) শব্দদ্বয়ের অর্থ ক্ষুধার্ত। কিন্তু গাযবান ও জাওআন দিয়ে যথাক্রমে একেবারে বেশি ক্রোধান্বিত ও একেবারে বেশি ক্ষুধার্ত বোঝায়, এর বেশি ক্রোধান্বিত বা ক্ষুধার্ত হওয়া সম্ভব নয়। তাই আর-রহমান অর্থ আল্লাহ পরিপূর্ণ দয়াময়।
সত্যি বলতে, আল্লাহর সকল নামের মাঝে আর-রহমান নামটির পরিসরই সবচেয়ে বড়। আরশে সমুন্নত হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এ নামটিই উল্লেখ করেছেন।
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى আর-রহমান আরশে সমুন্নত।[৩]
এই মহান নাম কুরআনে বারবার উচ্চারিত হয়েছে মহান সৃষ্টি আল-আরশের সাথে। এ নামের ওপর আল্লাহর মালিকানা এতই একচ্ছত্র যে, অন্য কোনো সৃষ্টির নাম আর-রহমান হতে পারে না। মানুষের নাম আব্দুর রহমান (আর-রহমানের বান্দা) হয়, শুধু আর-রহমান হয় না। এই নাম কোনো সৃষ্টির রাখা যাবে না। আবার আল্লাহও কিন্তু নাম হয় না কারো। এই দুটো নাম একেবারেই তাঁর নিজস্ব।
আর আর-রহিম হলেন যিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া পৌঁছে দেন। কুরআনে কেবল মুমিনদের প্রতি দয়া করার ক্ষেত্রে এই নামটি ব্যবহৃত হয়েছে।
আল্লাহ এবং মানুষের আসল স্বভাব সম্পর্কে যদি আমাদের ভালোভাবে জানা থাকত, তাহলে যেকোনো ব্যাপারে আমরা মানুষের দ্বারস্থ হওয়ার বদলে আল্লাহর স্মরণ নিতাম। আপন মায়ের চেয়ে যে আল্লাহর ভালোবাসা বেশি, এটা জানার পর আর কীইবা বাকি থাকে? সকল প্রশংসা আল্লাহর যে তিনি ক্রোধের পরিবর্তে দয়া দিয়ে সবকিছুকে শাসন করেন।
হৃদয়ের ভার সরিয়ে ফেলুন আর-রহমানির রহীমের ছন্দে।
টিকাঃ
[১] সুরা মুলক, আয়াত: ১৪
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬
[৩] সুরা ত-হা, আয়াত: ৫
📄 একটু ঝাঁকুনি
তারপর আসে 'মালিকি ইয়াওমিদ্দীন' (مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ), বিচারদিবসের অধিপতি। মালিক (অধিপতি, সার্বভৌম, কর্তা) শব্দটি কেন বেছে নিলেন আল্লাহ? কারণ ইহকালে সৃষ্টিকে যাও বা কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, কিয়ামতের পর তা একেবারেই ছিনিয়ে নেওয়া হবে। সকল ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিকারী হবেন স্বয়ং আল্লাহ। এমনকি তাঁর অনুমতি পাওয়ার আগে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারবে না কেউ, কারো নামে সুপারিশ করা তো দূর কি বাত! আর এই শব্দটির দুইরকম কিরাআত আছে। মা-লিকি (মালিকানা অর্থে) এবং মালিকি (রাজত্ব অর্থে)। দুটিই এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলার একক আধিপত্যের সেই দিনটি কতটা ভীতিকর, তা জানা যায় বহু আয়াত থেকে—
'যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে...যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে... যখন তারকারাজি নিষ্প্রভ হয়ে খসে পড়তে থাকবে... যখন পাহাড়গুলো মিলিয়ে যাবে...যখন সাগর ফুটতে শুরু করবে... পৃথিবী যখন প্রকম্পিত হবে... পশুপালকে যখন জড়ো করা হবে...যখন কবরগুলো উলটে দেওয়া হবে।' [সুরা তাকভির, ইনফিতার, ইনশিকাক, ফাজর]
(৩৬) يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ
যখন মানুষ পালিয়ে বেড়াবে তার নিজের ভাইয়ের কাছ থেকে, মায়ের ও বাবার কাছ থেকে, আপন সঙ্গী ও সন্তানের কাছ থেকে[১]
يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ
সেদিন দেখবেন স্তন্যদাত্রী মা তার কোলের শিশুকে ভুলে যাবে, গর্ভপাত হয়ে যাবে গর্ভবতীদের। মনে হবে যেন পুরো মানবজাতি মাতাল, অথচ আসলে তারা তা নয়; বরং আল্লাহর শাস্তিই প্রচণ্ড![২]
يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيّ السَّجِلِ لِلْكُتُبِ ...
সেদিন আমি আকাশগুলোকে গুটিয়ে নেব কাগজের মতো।[৩]
... وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتُ بِيَمِينِهِ ...
আর আকাশসমূহ গুটিয়ে নেওয়া হবে তাঁর ডান হাতে [৪]
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ ...
আর শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং আসমান-জমিনের সবকিছু হয়ে যাবে সংজ্ঞাহীন [৫]
বাকি থাকবে কে? শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া ফেরেশতা। তারপর আল্লাহ তাঁর প্রাণও নিয়ে নেবেন। আর কে বাকি? কেউ না। আমাদের প্রতিপালক ডেকে বলবেন, আজ রাজত্ব কার? কোনো উত্তর নেই। কার রাজত্ব আজ? উত্তর নেই। রাজত্ব কার? সুনসান নীরবতা। আল্লাহ তারপর নিজেই ঘোষণা করবেন, অদ্বিতীয় ও সর্বক্ষমতাময় আল্লাহর।[১]
ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا হُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ ﴿١৩ তারপর (শিঙ্গায়) দ্বিতীয় ফুৎকার ধ্বনিত হবে। তারা উঠে দাঁড়িয়ে তাকাবে।
وَأَشْرَقَتِ الْأَرْضُ بِنُورِ رَبِّهَا ... ﴿৬৯ আর জমিন উদ্ভাসিত হবে তার প্রতিপালকের নুরে।[৩]
وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ ... ﴿২৩ আর আপনার প্রতিপালক উপস্থিত হবেন, তাঁর ফেরেশতারা দাঁড়াবে সারিবদ্ধ হয়ে আর সেদিন জাহান্নামকে সামনে আনা হবে।[৪]
মাথার কাছে সূর্য চলে আসবে এমন এক দিনে, যার দৈর্ঘ্য ৫০ হাজার বছরের সমান! এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তির উপায় কী? উত্তর সামনে আসছে।
তার আগে আরো একবার মালিকি ইয়াওমিদ্দীনের সত্যিকার প্রতিচ্ছবিটি ভাবুন। সালাতে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করে একটু থামবেন। বধির ও নির্বোধের মতো পার করে যাবেন না এই অংশটি। কারণ মুমিনের হৃদয় তো আশা ও ভয়ের মাঝে দুলতে থাকে। আল্লাহর রহমতের আশা এবং তাঁর অসন্তুষ্টি ও শাস্তির ভয়।
টিকাঃ
[১] সুরা আবাসা, আয়াত : ৩৪
[২] সুরা হজ, আয়াত : ২
[৩] সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৪
[৪] সুরা যুমার, আয়াত: ৬৭
[৫] সুরা যুমার, আয়াত : ৬৮
[১] সুরা গাফির, আয়াত : ১৬
[৩] সুরা যুমার, আয়াত : ৬৯
[৪] সুরা ফজর, আয়াত: ২২
📄 মুক্তির চাবিকাঠি
মালিকি ইয়াওমিদ্দীন আয়াতের স্বরূপ বুঝতে পারলে আসলেই ভয়ে কেঁপে ওঠার কথা। অথচ অনেকে রীতিমতো আনমনে আওড়ে চলে যান আয়াতটি। কথাগুলো হৃদয়ে পৌঁছে না। মুখস্থ বুলির মতো চলতে থাকে।
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা গবেষণা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?[১]
সালাতে যাদের সত্যিকার অর্থে মনোযোগ থাকে, তারা সালাতে শান্তি পায় পানিতে থাকা মাছের মতো। আর যাদের মনোযোগ থাকে না, তারা যেন খাঁচায় বন্দি পাখির মতো অস্থির।
তো সেই ভয়াবহ দিনে রক্ষা পাওয়ার কী উপায়? উত্তর আছে পরের আয়াতেই। পুরো কুরআনের সারমর্ম যে সুরা ফাতিহা, সেই সুরার সারমর্ম এই আয়াত। 'ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা 'ঈন (إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ), আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং সাহায্যও চাই কেবল আপনারই কাছে।
প্রত্যেক নবি নিজ নিজ উম্মাতকে নাজাতের এই চাবি দিয়ে গেছেন—
إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُبِينٌ أَنْ لَا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ
আমি তোমাদের কাছে এসেছি সুস্পষ্ট সতর্ককারী হিসেবে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপাসনা করবে না। তোমাদের জন্য এক যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির ব্যাপারে সত্যিই আশঙ্কা হয়।[২]
জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাহলে কী হওয়া চাই? শুধু এবং শুধুই আল্লাহর ইবাদত। আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে এ কাজের জন্য। সেই লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম? আল্লাহর সাহায্য কামনা।
আর ইবাদতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক কোনটি? অন্তরের একনিষ্ঠতা। আমরা যা করছি এবং যা করব সবই শুধু আল্লাহর জন্য আর কারো জন্য নয়। তাঁর সন্তুষ্টিই একমাত্র কাম্য। নিয়তের এই বিশুদ্ধতা ছাড়া ইবাদত করা মানে বালুর বস্তা নিয়ে ভ্রমণে বের হওয়া। কাঁধে প্রচুর ওজন, কিন্তু সবটাই অযথা বোঝা।
কেবল আল্লাহকে আপনার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু বানান; মানুষকে নয়। তারা কী ভাবল বা বলল, তা বিবেচ্যই নয়। এতে আপনার না কোনো ক্ষতি হবে, না উপকার। অমুক কাজটি কেন করেছেন? এ প্রশ্নের উত্তরে যেন আপনি দৃঢ়ভাবে বলতে পারেন, আল্লাহর জন্য। মানুষ বলবে, না, সেটা তো ঠিক আছে। আর কীসের জন্য? একই রকম প্রত্যয়ে বলবেন, আর কিছুর জন্যই নয়।
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا ۞ الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ (১০৩) يُحْسِنُونَ صُنْعًا
বলুন, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো, কাজের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় অভাগা কারা? এই জীবনের সকল প্রচেষ্টা যাদের বৃথা হয়ে গেছে, অথচ তারা ভাবছিল কতই না ভালো কাজ করছে।[১]
আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ একাগ্রতা আপনার জীবনটাই পালটে দেবে। তাই প্রতিটি কাজে নিয়ত পরিশুদ্ধ করে নিন। সন্তানদেরও বুঝিয়ে দিন যে, যেকোনো কাজ তারা করতে শিখবে আল্লাহ সেটা পছন্দ করেন বলে। আর যেকোনো কাজ থেকে বিরতও থাকবে সেটা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় বলে। তারা যেন জেনে যায় যে, পুরস্কারদাতা শুধু আল্লাহ। মানুষ নয়।
তবে বিশুদ্ধ নিষ্ঠা ও নিয়ত অত সোজা নয়, এটা সত্য। তাই বলে অসম্ভবও তো নয়। কারণ আমাদের শেখানো হয়েছে এক জাদুমন্ত্র, 'ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা'ঈন (وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ) আর সাহায্যও চাই আপনারই কাছে।' আল্লাহ সাহায্য করলে কিছুই আর অসম্ভব থাকে না। সবই আল্লাহর হাতে। স্রেফ চেয়ে নিন, তিনি দিয়ে দেবেন। তিনি তো বলেই দিয়েছেন, আমি যাকে সুপথে চালাই, সে ছাড়া তোমরা সকলে পথভ্রষ্ট। [১]
ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা'ঈন এমন এক আয়াত, যা নিয়ে আমাদের সৎকর্মশীল পূর্বসূরিগণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কান্নাকাটি করতেন। জনৈক সালাফ একবার সালাত আদায় করছিলেন মসজিদুল হারামে। এই আয়াতটা বারবার পড়তে পড়তে কাঁদছিলেন তিনি। সেসময় কাবা তাওয়াফ করতে গেলেন তাঁর এক বন্ধু। তাওয়াফ শেষ করে ফিরে এসে দেখেন এখনো তিনি ওই আয়াত পড়ছেন আর কাঁদছেন। এরকম করতে করতেই সূর্যোদয়ের সময় চলে আসে।
তাই 'ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা'ঈন' দিয়ে অন্তরের সব মুনাফেকির ময়লা ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে ফেলুন।
টিকাঃ
[১] সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ২৪
[২] সুরা হুদ, আয়াত: ২৫-২৬
[১] সুরা কাহফ, আয়াত : ১০৩-১০৪
[১] সহিহ মুসলিম : ২৫৭৭; জামিউত তিরমিজি : ২৪৯৫