📄 রাজাকে সম্ভাষণ, শত্রুর বিতাড়ন
‘আল্লাহু আকবার’ বলার সাথে সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে আপনি সালাতে প্রবেশ করলেন। এবার দৃষ্টি অবনত রাখুন সিজদার জায়গায়। বাম হাতের ওপর ডান হাত রেখে বেঁধে রাখুন হৃদয়ের কাছাকাছি। কেন?
ধরুন একটি রাজপ্রাসাদে ঢুকলেন আপনি। দূরে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কারো দৃষ্টি উদ্ধতভাবে সম্মুখ পানে আর হাত আরাম করে দুপাশে ছড়ানো। আরেকদল মানুষ আবার মাটির দিকে তাকিয়ে হাত দুটো এক করে ধরে আছে নিজেদের সামনে। দাঁড়ানোর এই ভঙ্গি দেখেই বুঝে যাবেন, কারা রাজপরিবারের লোক আর কারা সেবক। তাই না?
অতএব বান্দা হিসেবে রবের সামনে বিনয় সহকারে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক। রবের সামনে দাঁড়ানোর চিন্তাটা মাথায় আসলে তো আপনা থেকেই বিনয় চলে আসার কথা। তবে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সামনে বিনীত হওয়া মানে আসলে সম্মানিত হওয়া। কারণ এর ফলে মানুষ অন্য সব অযথা বিনয় থেকে মুক্ত হয়ে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে আল্লাহর কাছে নিজেকে ছোট করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।[১]
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮; জামিউত তিরমিযি: ২০২৯
📄 এখনই সময় রাজাধিরাজকে যথাযথ সম্ভাষণ জানানোর, সানা পড়ার
মহামহিম আপনি, হে আল্লাহ! প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আপনারই তরে। আপনার নাম মহান, আপনার মর্যাদা সর্বোন্নত, আপনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাধিক সানা শিক্ষা দিয়েছেন। যেকোনোটিই বেছে নিয়ে পড়া যায়। একেকটি সানা আমাদের সালাতে যুক্ত করে অনন্য একেকটি গুণ। তাই একেক সালাতে একেক সানা পড়লে এই পবিত্র মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া আরো সহজ হয়।
পাশাপাশি বিতাড়িত করতে হবে শত্রুকেও। এই পবিত্র মুহূর্ত, এই মহিমান্বিত সাক্ষাৎ দেখে হিংসায় দাউদাউ করে জ্বলে শয়তান। তার উদ্দেশ্যই হয়ে দাঁড়ায় প্রিয়তম রবের সাথে আপনার এই মুহূর্তগুলোকে চুরি করা, আপনাকে সাওয়াব থেকে বঞ্চিত করা। সালাত শেষে তাই হয়ত দেখা যাবে আপনি পূর্ণ সাওয়াবের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বা এক-পঞ্চমাংশ কিংবা এমনকি এক-দশমাংশ পেয়ে বসে আছেন। কারণ, সালাতে শুধু একনিষ্ঠ মনোেযাগের অংশটুকুই কবুল হয়। হাশরের মাঠে কেউ কেউ আসবে নব্বই বছরের সালাত আদায়ের আমলনামা নিয়ে। কিন্তু প্রচন্ড হতাশা ও বিস্ময় নিয়ে দেখবে সাওয়াব লিপিবদ্ধ হয়েছে মাত্র চার কি পাঁচ বছরের সালাতের জন্য।
এর কারণ শয়তান। দেখেন না ঠিক সালাতের সময়ই কেন যেন প্রতিটা দুনিয়াবি কাজ-কর্ম-ব্যস্ততা-চিন্তা হঠাৎ করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে? দিনের পর দিন বা এমনকি মাসের পর মাস ধরে ভুলে থাকা জিনিস মনে পড়ে যায় সালাতে দাঁড়ানো মাত্রই। এমনকি জায়নামাযের আল্পনাগুলোও বলতে শুরু করে কত যে রঙবেরঙের গল্প! আপনি হয়তো লড়াই করে আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু শয়তান দমে যাওয়ার পাত্র নয়। নাকের কাছে ভনভন করা মাছির মতো বারবার ফিরে আসে সে।
তাহলে এর সমাধান কী? এই দুর্বল আমরা তাহলে কোন উপায় অবলম্বন করব? কার কাছে সাহায্য চাইব? সেই প্রিয়তম রবেরই কাছে! তাঁরই নাম নিয়ে তাঁরই সৃষ্টির অপকর্ম থেকে চাইব আশ্রয়। সালাত শুরুর আগেই তাই আত্মবিশ্বাস সহকারে বলব, আ'ঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রজীম, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই বিতাড়িত শয়তান থেকে। বলেই দেখুন না কেমন শক্তি ভর করে আপনার মাঝে!
📄 সালাতের প্রাণ
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি অভ্যাস ছিল। সালাতের ওয়াক্ত হলেই মুয়াজ্জিন বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলতেন, আমাদের প্রশান্তি দাও, বিলাল।[১] অর্থাৎ, আজান দাও। এটিই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে প্রশান্তি। যেন কাঁধ থেকে বোঝা নামিয়ে রাখার মাধ্যম। দুরূহ কোনো বিষয় বা দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হলেই সালাত অভিমুখী হতেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কারণ, আল্লাহই তো বলেছেন—
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ...
আর সাহায্য প্রার্থনা করো ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে।[২]
একেকজন একেক পদ্ধতিতে দুশ্চিন্তামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। কেউ গান শোনে, কেউ করে যোগব্যায়াম, কেউবা দারস্থ হয় মাদকের। কিন্তু আমাদের মুসলিমদের জন্য এই চাহিদা পূরণ করে সালাত। আমরা ফিরে যাই সব সমাধানের আসল উৎস ও সর্বপ্রকার শান্তির মালিকের দ্বারে। সেই প্রিয়তম স্রষ্টার কাছে।
শয়তানকে বিতাড়িত করার পর এখন আমরা সালাতের প্রাণস্বরূপ অংশে প্রবেশ করতে চলেছি। সুরা ফাতিহা; কুরআনের মহত্তম সুরা। যে অংশটুকু ছাড়া কবুলই হয় না সালাত। যে অংশে আল্লাহ প্রতিটি আয়াতের জবাব দেন! অন্তত এই অংশে কীভাবে মনোযোগ হারানো সম্ভব, বলুন তো!
আচ্ছা, এক মিনিট। কোন জিনিসটা যেন আমাদের এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে? ও হ্যাঁ, আল্লাহর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা ও তাঁর নৈকট্য লাভের বাসনা। প্রিয়পাত্রের সাথে দেখা হলেই প্রথমে মানুষ কী উচ্চারণ করে? প্রিয়জনের সুমধুর নামের ধ্বনি। কিন্তু আমাদের প্রিয়জন তো যেনতেন কোনো সত্তা নন। তাঁর নামটিও নয় সাধারণ কোনো নাম। এ এমন এক নাম, যা তার আশপাশের সবকিছুকে বরকতময় করে দেয়। এ নামেতেই শুরু, এ নামেই শেষ, এ নামেই আস্বাদন করি আমরা দুনিয়া ও আখিরাতের মিষ্টতা। বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম (بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ), আল্লাহর নামে যিনি পরম দয়াময় ও অতি দয়ালু। ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে এ কথাটি কীভাবে আপনার মনকে ঠান্ডা করে দেয়, অনুভব করেই দেখুন।
لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى...
সুন্দরতম নামসমূহ তাঁরই [১]
ভালোবাসার পাত্র যে কত নিখুঁত, এই ভাবনায় মানুষ হাবুডুবু খেতে থাকে তাই না? আর বাস্তব অর্থে এই গুণের একমাত্র অধিকারী হলেন আল্লাহ। তাই 'আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল 'আলামীন' (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ), সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।
টিকাঃ
[১] সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৮৫; হাদিসটি সহিহ।
[২] সুরা বাকারা: আয়াত: ৪৫
[১] সুরা হাশর, আয়াত: ২৪
📄 আপন সীমানা ছাড়িয়ে যাত্রা
তো এতক্ষণে আমরা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে আল্লাহর পরম ত্রুটিহীনতার সাক্ষ্য দিলাম। তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানালাম সবকিছুর জন্য। এবার পরের ধাপ।
জনপ্রিয় একটি পাওয়ার পয়েন্ট অ্যানিমেশান আছে। প্রথমে ছোট্ট একটি গাছের পাতার কোষের ভেতরের জগৎটা দেখানো হয়। তারপর দশ গুণ করে জুম আউট করে দেখানো হয় বাইরের জগৎগুলো। একে একে পৃথিবী, তারকারাজি, নভোমণ্ডল হয়ে অবিশ্বাস্য এ বিশ্বজগতের একটি চিত্র তৈরি করা হয়। এই একই কাজ এখন আপনি করবেন, তবে তা ওই পাতা থেকে শুরু হবে না। শুরু হবে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো এই আপনার নিজের প্রতিচ্ছবি দিয়ে।
প্রথমেই ভাবুন আপনার শরীরের ভেতরে সুনিপুণ শৃঙ্খলায় চলমান বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় তন্ত্রের কথা। রক্ততন্ত্র, রোগপ্রতিরোধতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, প্রাণরস, হৃদস্পন্দন, শ্বাসতন্ত্র, স্নায়ুকোষের চলাচল, ত্বকের কোষ, যকৃত, প্লীহা, রেচনতন্ত্র ইত্যাদি সবকিছু। তারপর বেরিয়ে আসুন আপনার চারপাশের জিনিসগুলোতে। মহাবিস্ময়কর উদ্ভিদজগৎ, প্রাণিজগৎ, সাত সাগর, অতি তুচ্ছ পতঙ্গ আর অণুজীবের জগতে।
এবার আরেক ধাপ বাইরে। অলৌকিক নিপুণতায় ভাসমান গ্রহ-উপগ্রহ ও সূর্যের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের সৌরজগতে। তারও বাইরে থাকা নক্ষক্ষত্রপুঞ্জ ও বিশ্বজগতে। তারও চিরকাল মানব-দানবের নাগালের বাইরে রয়ে যাওয়া অদেখা জগতে।
এখানেই শেষ নয় হয়তোবা। কিন্তু আমাদের জ্ঞানের দৌড় অতটুকুই। তাই আবারও ধাপে ধাপে ফিরে আসুন সালাতরত নিজের কাছে। আল্লাহর সৃষ্টিযজ্ঞের সামনে নিজেকে কি একটি বিন্দুবিসর্গ বলেও মনে হচ্ছে আর? তাও তো মাত্র প্রথম আসমানের কথা বলা হলো। কুরআন আমাদের জানায়, এর বাইরে আরো ছয়টি আসমান আছে। আর এই সবকিছুতে শৃঙ্খলা রক্ষা করছেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ।
এখন কেমন লাগছে সেই প্রতিপালকের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর সাথে কথা বলতে? কেমন লাগছে প্রতিটি আয়াতের জবাব পেয়ে? এখনো কি সাহস আছে তাঁর আদেশ অমান্য করার? এই উচ্চতার প্রতাপের অবাধ্যতা যে কত বড় দুঃসাহস, তা কি বুঝতে পারছেন এখন? কিংবা এই উচ্চতার ভালোবাসার অবমূল্যায়ন? পুরো সৃষ্টিজগতের মাঝে আমাদের মতো তুচ্ছ জিনিসকে তিনি বেছে নিয়েছেন সালাতের ওই প্রিয় বাক্যগুলো বলার জন্য। কতটা ভালোবাসা থাকলে কোনো সত্তা এরূপ করতে পারেন? এই যে আজানের জবাবে সালাতে দাঁড়ানোর মতো সাধ্যটুকু তিনি দিলেন, এটাই তো এক অকল্পনীয় অনুগ্রহ। কোন অজুহাতে তবে আমরা নিজেদের সেরাটা ঢেলে দেওয়া থেকে বিরত থাকি? এইরকম মর্যাদার হাতছানি উপেক্ষা করে কি আর জীবনের সালাত পরিত্যাগ করা সম্ভব?
যে প্রতাপের সামনে আমরা দাঁড়াচ্ছি, তার স্বরূপ বোঝানোর চেষ্টা করেছেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বলেছেন, আল্লাহর আরশের পায়া (আল-কুরসি) পুরো আসমান-জমিনকে বেষ্টন করে আছে।[১] আর আল্লাহর কুরসির তুলনায় সপ্ত আসমান যেন মরুভূমিতে পড়ে থাকা একটি আংটি। আবার আরশের তুলনায় কুরসিও অতটুকুই!
তাই এখন থেকে সালাতে দাঁড়ালে নিজেকে এভাবে দূর থেকে দেখবেন। তাহলেই বুঝে যাবেন রব্বিল 'আলামীনের সামনে দাঁড়ানোর আসল মানে।
টিকাঃ
[১] সুরা বাকারা, আয়াত : ২৫৫