📘 হৃদয় জুড়ানো সালাত 📄 তাকবিরে তাহরিমা কালে

📄 তাকবিরে তাহরিমা কালে


আল্লাহু আকবার বলার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে একটি কথোপকথন শুরু করি আমরা, যার নাম সালাত। আচ্ছা, কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আমরা কেন আল্লাহু আকবার বলেই সালাত শুরু করি? এর বদলে সুবহানাল্লাহ কেন বলি না? কারণ আছে। আল্লাহু আকবার বলে আমরা সাক্ষ্য দিই যে, অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে আল্লাহর বড়ত্ব-মহত্ত্ব অনেক অনেক বেশি। তিনি আমাদের চাকরির চেয়ে বড়, আমাদের ব্যবসার চেয়ে বড়, ঘুমের চেয়ে বড়, টাকার চেয়ে বড়, পরিবারের চেয়ে, সন্তানের চেয়ে, শত কাজ আর ব্যস্ততার চেয়ে বড়। তাই আল্লাহু আকবার বলে আমরা আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দুটি হাত তুলি। পেছনে ছুঁড়ে ফেলি সেই সব পার্থিব ব্যস্ততাকে।

বান্দা সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ আদেশ দেন, আমার ও বান্দার মধ্যকার আবরণ তুলে দাও! যেই মুহূর্তে আপনি আল্লাহু আকবার ঘোষণা করেন, ঠিক তখন থেকে আল্লাহর চেহারা আপনার প্রতি পূর্ণরূপে নিবিষ্ট। আপনি বিমুখ না হলে তিনিও মুখ ফিরিয়ে নেন না। আপনার এই বিমুখতা শারীরিকও হতে পারে, হতে পারে আত্মিকও। হতে পারে আপনি এদিক-ওদিক মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছেন। অথবা হতে পারে আপনার মন ঘুরে বেড়াচ্ছে পার্থিব ব্যাপারে। এই বিমুখতা শুরু হওয়া মাত্রই আল্লাহ ডেকে বলেন, আমার চেয়েও উত্তম কিছুর দিকে মুখ ফেরাচ্ছ? আদেশ করেন আবারও সেই আবরণ নামিয়ে দেওয়ার।

মনে করুন, আপনার দিকে ঘুরে আছে ক্যামেরা। তাতে টকটকে লাল রঙের একটি বাতি জানান দিচ্ছে সরাসরি সম্প্রচার। কেমন লাগে তখন? সালাতে আল্লাহু আকবার বলার সাথে সাথে সেই বাতিটি জ্বলে উঠেছে। কিন্তু আপনার দর্শক সাধারণ কোনো মানুষ নয়। সারা জগতের মালিক দেখছেন আপনাকে। আপনি সহ সবকিছু যার হাতে আছে ও চিরকাল থাকবে। তাঁরই তত্ত্বাবধানে সারা জগত চলছে ও চলবে নিখুঁতভাবে। ছোটবড় কোনোকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। এবার বলুন, কেমন লাগছে সালাতে দাঁড়িয়ে। প্রবলভাবে ধুকপুক করছে না হৃদপিণ্ডটা?

আল্লাহু আকবার বলার পর এবার তিলাওয়াতের দিকে এগোচ্ছেন। আর আপনার দেহমন দিয়ে সংঘটিত প্রতিটি গুনাহ বেয়ে উঠতে শুরু করেছে আপনার কাঁধে ও মাথায়। প্রত্যেকটি রুকু ও সিজদার সময় একে একে ঝরে পড়ে যাবে তারা।[১] স্বভাবতই রুকু-সিজদা লম্বা করার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠা উচিত আমাদের।

একটু আগেও যেসব কাজ করা জায়িয ছিল, আল্লাহু আকবার বলার সাথে সাথে সেগুলো হয়ে যায় নাজায়িয। খাওয়া, কথাবার্তা, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া। হলোটা কী? কেন এই পার্থক্য? কারণ, এই পর্যায়ের এক সাক্ষাতে এ ধরনের কাজ অশোভন। দাস তার মনিবের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর সামনে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এখন ওসবের সময় নয়।

এখনো মন এদিক-ওদিক যাচ্ছে? এজন্যই তো আমরা সালাতের প্রতিটি নড়াচড়ায় আল্লাহু আকবারের পুনরাবৃত্তি করি। এগুলো একেকটি স্মরণিকা। মনোযোগ পুনরুদ্ধারের নতুন নতুন সুযোগ।

টিকাঃ
[১] সহিহু ইবনি হিব্বান: ১৭৩৪; হাদিসটি সহিহ।

📘 হৃদয় জুড়ানো সালাত 📄 রাজাকে সম্ভাষণ, শত্রুর বিতাড়ন

📄 রাজাকে সম্ভাষণ, শত্রুর বিতাড়ন


‘আল্লাহু আকবার’ বলার সাথে সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে আপনি সালাতে প্রবেশ করলেন। এবার দৃষ্টি অবনত রাখুন সিজদার জায়গায়। বাম হাতের ওপর ডান হাত রেখে বেঁধে রাখুন হৃদয়ের কাছাকাছি। কেন?

ধরুন একটি রাজপ্রাসাদে ঢুকলেন আপনি। দূরে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কারো দৃষ্টি উদ্ধতভাবে সম্মুখ পানে আর হাত আরাম করে দুপাশে ছড়ানো। আরেকদল মানুষ আবার মাটির দিকে তাকিয়ে হাত দুটো এক করে ধরে আছে নিজেদের সামনে। দাঁড়ানোর এই ভঙ্গি দেখেই বুঝে যাবেন, কারা রাজপরিবারের লোক আর কারা সেবক। তাই না?

অতএব বান্দা হিসেবে রবের সামনে বিনয় সহকারে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক। রবের সামনে দাঁড়ানোর চিন্তাটা মাথায় আসলে তো আপনা থেকেই বিনয় চলে আসার কথা। তবে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সামনে বিনীত হওয়া মানে আসলে সম্মানিত হওয়া। কারণ এর ফলে মানুষ অন্য সব অযথা বিনয় থেকে মুক্ত হয়ে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে আল্লাহর কাছে নিজেকে ছোট করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।[১]

টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮; জামিউত তিরমিযি: ২০২৯

📘 হৃদয় জুড়ানো সালাত 📄 এখনই সময় রাজাধিরাজকে যথাযথ সম্ভাষণ জানানোর, সানা পড়ার

📄 এখনই সময় রাজাধিরাজকে যথাযথ সম্ভাষণ জানানোর, সানা পড়ার


মহামহিম আপনি, হে আল্লাহ! প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আপনারই তরে। আপনার নাম মহান, আপনার মর্যাদা সর্বোন্নত, আপনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাধিক সানা শিক্ষা দিয়েছেন। যেকোনোটিই বেছে নিয়ে পড়া যায়। একেকটি সানা আমাদের সালাতে যুক্ত করে অনন্য একেকটি গুণ। তাই একেক সালাতে একেক সানা পড়লে এই পবিত্র মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া আরো সহজ হয়।

পাশাপাশি বিতাড়িত করতে হবে শত্রুকেও। এই পবিত্র মুহূর্ত, এই মহিমান্বিত সাক্ষাৎ দেখে হিংসায় দাউদাউ করে জ্বলে শয়তান। তার উদ্দেশ্যই হয়ে দাঁড়ায় প্রিয়তম রবের সাথে আপনার এই মুহূর্তগুলোকে চুরি করা, আপনাকে সাওয়াব থেকে বঞ্চিত করা। সালাত শেষে তাই হয়ত দেখা যাবে আপনি পূর্ণ সাওয়াবের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বা এক-পঞ্চমাংশ কিংবা এমনকি এক-দশমাংশ পেয়ে বসে আছেন। কারণ, সালাতে শুধু একনিষ্ঠ মনোেযাগের অংশটুকুই কবুল হয়। হাশরের মাঠে কেউ কেউ আসবে নব্বই বছরের সালাত আদায়ের আমলনামা নিয়ে। কিন্তু প্রচন্ড হতাশা ও বিস্ময় নিয়ে দেখবে সাওয়াব লিপিবদ্ধ হয়েছে মাত্র চার কি পাঁচ বছরের সালাতের জন্য।

এর কারণ শয়তান। দেখেন না ঠিক সালাতের সময়ই কেন যেন প্রতিটা দুনিয়াবি কাজ-কর্ম-ব্যস্ততা-চিন্তা হঠাৎ করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে? দিনের পর দিন বা এমনকি মাসের পর মাস ধরে ভুলে থাকা জিনিস মনে পড়ে যায় সালাতে দাঁড়ানো মাত্রই। এমনকি জায়নামাযের আল্পনাগুলোও বলতে শুরু করে কত যে রঙবেরঙের গল্প! আপনি হয়তো লড়াই করে আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু শয়তান দমে যাওয়ার পাত্র নয়। নাকের কাছে ভনভন করা মাছির মতো বারবার ফিরে আসে সে।

তাহলে এর সমাধান কী? এই দুর্বল আমরা তাহলে কোন উপায় অবলম্বন করব? কার কাছে সাহায্য চাইব? সেই প্রিয়তম রবেরই কাছে! তাঁরই নাম নিয়ে তাঁরই সৃষ্টির অপকর্ম থেকে চাইব আশ্রয়। সালাত শুরুর আগেই তাই আত্মবিশ্বাস সহকারে বলব, আ'ঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রজীম, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই বিতাড়িত শয়তান থেকে। বলেই দেখুন না কেমন শক্তি ভর করে আপনার মাঝে!

📘 হৃদয় জুড়ানো সালাত 📄 সালাতের প্রাণ

📄 সালাতের প্রাণ


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি অভ্যাস ছিল। সালাতের ওয়াক্ত হলেই মুয়াজ্জিন বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলতেন, আমাদের প্রশান্তি দাও, বিলাল।[১] অর্থাৎ, আজান দাও। এটিই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে প্রশান্তি। যেন কাঁধ থেকে বোঝা নামিয়ে রাখার মাধ্যম। দুরূহ কোনো বিষয় বা দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হলেই সালাত অভিমুখী হতেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কারণ, আল্লাহই তো বলেছেন—

وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ...

আর সাহায্য প্রার্থনা করো ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে।[২]

একেকজন একেক পদ্ধতিতে দুশ্চিন্তামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। কেউ গান শোনে, কেউ করে যোগব্যায়াম, কেউবা দারস্থ হয় মাদকের। কিন্তু আমাদের মুসলিমদের জন্য এই চাহিদা পূরণ করে সালাত। আমরা ফিরে যাই সব সমাধানের আসল উৎস ও সর্বপ্রকার শান্তির মালিকের দ্বারে। সেই প্রিয়তম স্রষ্টার কাছে।

শয়তানকে বিতাড়িত করার পর এখন আমরা সালাতের প্রাণস্বরূপ অংশে প্রবেশ করতে চলেছি। সুরা ফাতিহা; কুরআনের মহত্তম সুরা। যে অংশটুকু ছাড়া কবুলই হয় না সালাত। যে অংশে আল্লাহ প্রতিটি আয়াতের জবাব দেন! অন্তত এই অংশে কীভাবে মনোযোগ হারানো সম্ভব, বলুন তো!

আচ্ছা, এক মিনিট। কোন জিনিসটা যেন আমাদের এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে? ও হ্যাঁ, আল্লাহর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা ও তাঁর নৈকট্য লাভের বাসনা। প্রিয়পাত্রের সাথে দেখা হলেই প্রথমে মানুষ কী উচ্চারণ করে? প্রিয়জনের সুমধুর নামের ধ্বনি। কিন্তু আমাদের প্রিয়জন তো যেনতেন কোনো সত্তা নন। তাঁর নামটিও নয় সাধারণ কোনো নাম। এ এমন এক নাম, যা তার আশপাশের সবকিছুকে বরকতময় করে দেয়। এ নামেতেই শুরু, এ নামেই শেষ, এ নামেই আস্বাদন করি আমরা দুনিয়া ও আখিরাতের মিষ্টতা। বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম (بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ), আল্লাহর নামে যিনি পরম দয়াময় ও অতি দয়ালু। ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে এ কথাটি কীভাবে আপনার মনকে ঠান্ডা করে দেয়, অনুভব করেই দেখুন।

لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى...

সুন্দরতম নামসমূহ তাঁরই [১]

ভালোবাসার পাত্র যে কত নিখুঁত, এই ভাবনায় মানুষ হাবুডুবু খেতে থাকে তাই না? আর বাস্তব অর্থে এই গুণের একমাত্র অধিকারী হলেন আল্লাহ। তাই 'আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল 'আলামীন' (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ), সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।

টিকাঃ
[১] সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৮৫; হাদিসটি সহিহ।
[২] সুরা বাকারা: আয়াত: ৪৫
[১] সুরা হাশর, আয়াত: ২৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px