📄 সাক্ষাতের ঘোষণা
বলুন তো, সালাত কখন থেকে শুরু হয়? তাকবির তাহরিমা থেকে? উঁহু, এরও আগে। একেবারে আজানের সময় থেকে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সালাতের জন্য অপেক্ষারত ব্যক্তির জন্য ফেরেশতাগণ এ বলে দুআ করতে থাকে—হে আল্লাহ, আপনি তাকে মাফ করুন, আপনি তার ওপর রহম করুন।[১] আজান হলো আল্লাহর সাথে আসন্ন সাক্ষাতের ঘোষণা। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর যে ভীতি ও বিনয়, তা তখন থেকেই শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। তার মানে তখন থেকেই আপনার সালাত শুরু হয়ে গেছে।
আজান শয়তানকেও তাড়িয়ে দেয়। আজানের আওয়াজ শোনামাত্র সে রাগে গজগজ করতে করতে পালায়। শত্রু এখন আশপাশে নেই, এই চিন্তাই তো মনোযোগ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ফলে সালাতের প্রয়োজনীয় একাগ্রতাও চলে আসা উচিত।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মনোযোগের অভাবে সালাতে যতটুকু সাওয়াব কমে যেত, আজান সে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ। কীভাবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আজান শুনে যতজন সালাতে আসে, মুয়াজ্জিন ততজনের সালাতের সাওয়াব পায়।[২] ধরুন, জামাতে শরিক হলো একশো জন মানুষ। মানে মুয়াজ্জিন সে ওয়াক্তে পেলেন একশটি সালাতের সাওয়াব। আমরাও পেতে পারি সে সাওয়াব। কিন্তু আমরা তো মুয়াজ্জিন নই। তাহলে? এর জন্য আজানের কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করা চাই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরামর্শ, তারা (মুয়াজ্জিনগণ) যা বলে, তোমরাও তা-ই বলবে। [১] মক্কায় মসজিদুল হারামের আজানের জবাব দিলে কেমন হবে, ভাবুন একবার। সেখানে লক্ষ লক্ষ মুসল্লি। আবার প্রতি রাকআতের সাওয়াব এক লক্ষ গুণ। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দানশীলতা এমনই। ছোট্ট কাজ, বিশাল প্রতিদান।
আজানের শুরুও হয় ‘আল্লাহু আকবার' (اللَّهُ أَكْبَرُ) দিয়ে। আল্লাহ সবচেয়ে মহান। তাঁর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ নেই আপনার জীবনে। ব্যবসা-চাকরি-পরিবার-সন্তান-ঘুম সব ছেড়ে চলে আসুন এখন তাঁর কাছে রিপোর্ট করতে। মানুষ দুনিয়ার মিছে কোলাহলের পেছনে পড়ে ভুলে যায় আল্লাহর স্মরণ। তাই মুয়াজ্জিন প্রতিদিন এ কথাগুলো একাধিকবার করে বলে থাকেন।
কিন্তু এতসব ফেলে মসজিদে আসছি, কীসের জন্য? সব কাজ ফেলে সালাতে দাঁড়াচ্ছি কেন? তার উত্তর নিহিত পরের কথাগুলোতে ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ)। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য না থাকার সাক্ষ্য। সবকিছু ফেলে আমরা সেই অদ্বিতীয় সত্তার কাছে আসছি। পক্ষান্তরে এ কথাকে অবজ্ঞা করার অর্থ যেন, হাতের কাজটাকে আল্লাহর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে সাক্ষ্য দেওয়া। ওই পার্থিব ব্যস্ততাই যেন ইবাদতের বেশি যোগ্য। কাজই যেন আমাদের উপাসনা!
মনে রাখতে হবে, আমরা সালাত পড়ব নবিজির অনুকরণে। তিনি বলেন, 'আমাকে যেভাবে সালাত পড়তে দেখেছ, সেভাবে পড়ো।’[২] আজানেও আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়ার পরের বাক্যে বলা হয় আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ (وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً رَّسُوْلُ اللَّهِ); আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল। এটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শিক্ষক ও আদর্শ হিসেবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা। আমরা মেনে নিচ্ছি, যেকোনো আমল করতে হবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেখানো নিয়ম অনুসারে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তো তাকে পাঠিয়েছেনই মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও শিক্ষক হিসেবে। তাই আল্লাহর ইবাদত করতে হবে তাঁর পাঠানো শিক্ষকের শেখানো রীতি অনুযায়ী, একনিষ্ঠতার সাথে। আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা এবং রাসুলের দেখানো পদ্ধতির অনুকরণ এই দুই মূলনীতি যেকোনো আমলের গ্রহণযোগ্যতার পূর্বশর্ত।
সুরা কাহফের শেষ আয়াতে এই মূলনীতিই বর্ণিত হয়েছে—
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ۞
বলুন, 'আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ মাত্র। আমার কাছে ওহি এসেছে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ। সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে আর কাউকে অংশীদার না বানায়।[১]
এমনই মর্যাদা আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের। আর কারো নামের মর্যাদা এত সমুন্নত করা হয়নি। পৃথিবী নামক এই পুরো গ্রহে ক্রমান্বয়ে একের পর এক স্থানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম অনবরত ঘোষিত হতে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম এই গুণগান কর্মসূচিতে আপনিও অংশ নিন। পুনরাবৃত্তি করুন মুয়াজ্জিনের কথার।
সাক্ষ্য তো দেওয়া হলো। এরপর করণীয় কী? 'হাইয়া আলাস-সালাহ' (حَيَّ عَلَى الصَّلاةِ), সালাতের দিকে এসো। কিন্তু এখানে হুবহু এই বাক্যের পুনরাবৃত্তি না করে বলতে হবে 'লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' (لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ)। আল্লাহপ্রদত্ত শক্তিবলেই সালাতে যোগদান করা সম্ভব। এই যে সালাত পড়তে যাব, এই সামর্থ্যের যোগানদাতাও তো আল্লাহই। আজানেও ঠিক সুরা ফাতিহার ক্রম মানা হচ্ছে। সুরা ফাতিহাতে প্রথমে আমরা শুধুই তাঁর ইবাদত করার কথা বলি 'ইয়্যাকা না'বুদু' (إِيَّاكَ نَعْبُدُ), তারপর চাই সে ইবাদত করার সামর্থ্য 'ইয়্যাকা নাস্তা'ঈন' (إِيَّاكَ نَسْتَعِينُ)। সালাতের আলোচনায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
আজানের পরের বাক্যটুকু মুমিনকে করে আনন্দে উদ্বেলিত আর আগ্রহে উদ্দীপ্ত। তা হলো কল্যাণের প্রতিশ্রুতি 'হাইয়া আলাল ফালাহ' (حَيَّ عَلَى الْفَلَاح), কল্যাণের দিকে এসো। সালাতেই যেহেতু কল্যাণ, তাহলে কেন এটা ছেড়ে অন্য কাজ নিয়ে পড়ে থাকব? এবারও সেই কল্যাণ গ্রহণের সামর্থ্যদাতা আল্লাহ। তাই এবারও জবাব, লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
আজান শেষ হয় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' দিয়ে। 'আল্লাহু আকবার' আমাদের মনে করিয়ে দেয় দুনিয়াবি কাজ ফেলে মহান আল্লাহর কাছে আসার কথা। আর 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ডাকে আখিরাতের জন্য কাজ করার দিকে।
তাই এখন থেকে আজান শুরু হলেই তা শুনবেন বহুল প্রতীক্ষিত কোনো ডাক শোনার মতো করে। প্রিয়তম সত্তার সাথে দেখা করার সময় চলে এসেছে। শিশু যেভাবে তার মায়ের পথ চেয়ে থাকে, আজানকেও নিজের অন্তরে সেভাবে প্রোথিত হতে দিন।
আজান নিজেও এক অনন্য নিয়ামত। কারণ, যে কেউ রবের সাথে সাক্ষাৎ করতে ভালোবাসে, রবও তার সাক্ষাৎ ভালোবাসেন।[১] আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা আপনাকে প্রণোদিত করবে দেরি না করে সালাতে যেতে। ঠিক যেমনটি করেছেন মুসা আলাইহিস সালাম—
... وَعَجِلْتُ إِلَيْكَ رَبِّ لِتَرْضَى আমি দ্রুত আপনার কাছে এলাম, হে প্রতিপালক, যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন।[২]
কিন্তু আফসোস! অনেকের কাছে আজান এখন একঘেয়ে কিছু আওয়াজ। হঠাৎ করেই শুরু হয়, তারপর আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় ব্যস্ত জীবনের কোলাহলে। অথচ আজানের কথাগুলোকে একটু মন দিয়ে লক্ষ করলে যাপিত জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিতে চলে আসতে পারত খুব দ্রুত পরিবর্তন।
টিকাঃ
[১] সহিহুল বুখারি : ৬৫৯; সহিহ মুসলিম : ৬৪৯
[২] সুনানুন নাসায়ি : ৬৪৬; মুসনাদু আহমাদ : ১৮৫০৬
[১] সহিহুল বুখারি : ৬১১; সহিহ মুসলিম: ৩৮৩
[২] সহিহুল বুখারি: ৬৩১; সহিহ মুসলিম: ১৫৬৭।
[১] সুরা কাহফ, আয়াত : ১১০
[১] সহিহুল বুখারি: ৬৫০৭
[২] সুরা ত-হা, আয়াত: ৮৪
📄 আগে দর্শনধারী
ওযুর ব্যাপারে কিছু কথা না-বললেই নয়। আমরা অনেকে ওযু করি অনেকটা অভ্যাসবশত, যেন এতে তেমন বিশেষ কিছু নেই। মনে করি, এটি সালাতের আগের আবশ্যক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কিন্তু ওযু এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু।
ওযু কীভাবে করতে হয়, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কীভাবে করেছেন, পানি অপচয় করা যাবে না ইত্যাদি তথ্য হয়তোবা আপনি ইতোমধ্যে জানেন। মুখ, মাথা, হাত, পা সব তো ধোয়া হচ্ছেই। অন্তর কোথায়? নিয়ত তো অন্তরেই থাকে। কত সাধারণ আটপৌরে কাজ মিযানের পাল্লা ভারি করে দেয় এই এক নিয়তের কারণে।
তাই অন্তর যখন কোনো কাজে মগ্ন হয়, তখন সত্যিকার অর্থেই ওই কাজ হয়ে ওঠে ওজনদার। অন্য সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সম্মিলিত সাওয়াবের চেয়েও বেশি উপার্জন করতে সক্ষম অন্তর। তাই এখন থেকে ওযুর সময় কেবল হাত-মুখ ধুয়েই ক্ষান্ত হবেন না; বরং নিয়তের মাঝে কিছু বিষয় যুক্ত করে জিতে নিন আকর্ষণীয় সাওয়াব। ওযু করতে যাবেন আল্লাহর আদেশ পালনের নিয়তে। সুরা মায়িদার ষষ্ঠ আয়াতে যেমনটি আছে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ...
হে ঈমানদারগণ, যখন সালাতের জন্য উঠবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল এবং উভয় হাত কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নেবে। আর মাথা মাসাহ করবে এবং দুই পা ধৌত করবে গোড়ালি পর্যন্ত।[১]
আরো নিয়ত রাখবেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণের।
নিয়ত করবেন মন্দ কর্মের আবর্জনা থেকে নিজেকে মুক্ত করার। পবিত্র না হয়ে আল্লাহর সাক্ষাতে যেতে নেই। ওযু বাহ্যিক ময়লা পরিষ্কার করে দেবে, যাতে এরপর সালাতে দাঁড়িয়ে অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করতে পারেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে উত্তমরূপে ওযু করে, পানির শেষ ফোঁটা শরীর থেকে গড়িয়ে পড়া পর্যন্ত তার গুনাহ ঝরে যেতে থাকে। অথবা এমনকি নখের নিচ থেকে পানি গড়িয়ে পড়া পর্যন্তও।[১] প্রতিটি অঙ্গের গুনাহ ঝরে পড়ে ওযুর ফলে। হাত, পা, মুখমণ্ডল, চোখ, মুখ। অদেখা এই পরিচ্ছন্ন প্রক্রিয়াকে কল্পনার চোখে দেখার চেষ্টা করুন। দেখুন আল্লাহর রহমতের আশায় ভরা অন্তর নিয়ে। ওযু শেষে পাঠ করুন কালিমাতুশ শাহাদাহ। তারপর বলুন—
اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ
আল্লাহুম্মাজ' আলনি মিনাত্তাওওয়াবীন, ওয়াজ' আলনি মিনাল মুতাত্বহহিরীন
অর্থ : হে আল্লাহ, আমাকে আপনার প্রতি প্রত্যাবর্তনকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।[২]
যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারের আগেই মানুষ অনেক সময় লাগিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়। সেখানে আপনি দেখা করতে যাচ্ছেন বিশ্বজাহানের মালিক আল্লাহর সাথে। ওযু আপনার রবের সামনে দাঁড়ানোর আগে নিজেকে পরিপাটি করে নেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। ওযুর এই সৌন্দর্য আমাদের সঙ্গ দেবে আখিরাতেও। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইশ, যদি আমার ভাইদের দেখা পেতাম।[৩] এখানে তিনি বুঝিয়েছেন উম্মাহর পরবর্তী সময়ে আসন্ন প্রজন্মগুলোর কথা। অর্থাৎ, আমরা! বিচারদিবসে তিনি আমাদের চিনবেন চেহারায় ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ওযুর চিহ্ন দেখে। তাই নবিজি আমাদের ওযুর অঙ্গগুলো ফরয অংশের চেয়েও বেশি করে ধুতে বলেছেন।[৪] যেমন: কনুই ও গোড়ালির একটু ওপর পর্যন্ত। এই অতিরিক্ত প্রচেষ্টায় শুধু গুনাহই মাফ হবে না, বেড়ে যাবে আমাদের মর্যাদাও।
ওযুর মর্যাদা অকল্পনীয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সকালে বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, তুমি জান্নাতে আমার আগে গেলে কী করে? জান্নাতে আমার সামনে সামনে তোমার পায়ের আওয়াজ শুনেছি। মানে সেবক যেভাবে মনিবের সামনে সামনে চলে, সেরকম। বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাব দিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আজান দেওয়ার পরপরই দুই রাকআত সালাত পড়ি। আর ওযু ছুটে যাওয়া মাত্রই আবার ওযু করে নিই।
ও, এ কারণেই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মন্তব্য করলেন।[১]
ওযু শেষ করেই আমরা কালিমাতুশ শাহাদাহ পড়ে জান্নাতের আটটি দরজাই নিজেদের জন্য খুলে নিই, যাতে ইচ্ছেমতো যেকোনোটি দিয়ে প্রবেশ করা যায়। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُوْلُ اللَّهِ) [২]
টিকাঃ
[১] সুরা মায়িদা, আয়াত : ৬
[১] সহিহ মুসলিম: ১৮১৫
[২] সহিহ মুসলিম : ২৩৪; জামিউত তিরমিযি: ৫৫
[৩] মুসনাদু আহমাদ: ১২৫৭৯
[৪] সহিহুল বুখারি : ১৩৬; এই কথাটুকু রাসুলের নয়; বরং আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর।
[১] সহিহুল বুখারি : ১১৪৯; সহিহ মুসলিম: ২৪৫৮
[২] সহিহ মুসলিম: ২৩৪; সুনানু আবি দাউদ: ১৬৯; জামিউত তিরমিযি: ৫৫
📄 তাকবিরে তাহরিমা কালে
আল্লাহু আকবার বলার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে একটি কথোপকথন শুরু করি আমরা, যার নাম সালাত। আচ্ছা, কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আমরা কেন আল্লাহু আকবার বলেই সালাত শুরু করি? এর বদলে সুবহানাল্লাহ কেন বলি না? কারণ আছে। আল্লাহু আকবার বলে আমরা সাক্ষ্য দিই যে, অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে আল্লাহর বড়ত্ব-মহত্ত্ব অনেক অনেক বেশি। তিনি আমাদের চাকরির চেয়ে বড়, আমাদের ব্যবসার চেয়ে বড়, ঘুমের চেয়ে বড়, টাকার চেয়ে বড়, পরিবারের চেয়ে, সন্তানের চেয়ে, শত কাজ আর ব্যস্ততার চেয়ে বড়। তাই আল্লাহু আকবার বলে আমরা আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দুটি হাত তুলি। পেছনে ছুঁড়ে ফেলি সেই সব পার্থিব ব্যস্ততাকে।
বান্দা সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ আদেশ দেন, আমার ও বান্দার মধ্যকার আবরণ তুলে দাও! যেই মুহূর্তে আপনি আল্লাহু আকবার ঘোষণা করেন, ঠিক তখন থেকে আল্লাহর চেহারা আপনার প্রতি পূর্ণরূপে নিবিষ্ট। আপনি বিমুখ না হলে তিনিও মুখ ফিরিয়ে নেন না। আপনার এই বিমুখতা শারীরিকও হতে পারে, হতে পারে আত্মিকও। হতে পারে আপনি এদিক-ওদিক মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছেন। অথবা হতে পারে আপনার মন ঘুরে বেড়াচ্ছে পার্থিব ব্যাপারে। এই বিমুখতা শুরু হওয়া মাত্রই আল্লাহ ডেকে বলেন, আমার চেয়েও উত্তম কিছুর দিকে মুখ ফেরাচ্ছ? আদেশ করেন আবারও সেই আবরণ নামিয়ে দেওয়ার।
মনে করুন, আপনার দিকে ঘুরে আছে ক্যামেরা। তাতে টকটকে লাল রঙের একটি বাতি জানান দিচ্ছে সরাসরি সম্প্রচার। কেমন লাগে তখন? সালাতে আল্লাহু আকবার বলার সাথে সাথে সেই বাতিটি জ্বলে উঠেছে। কিন্তু আপনার দর্শক সাধারণ কোনো মানুষ নয়। সারা জগতের মালিক দেখছেন আপনাকে। আপনি সহ সবকিছু যার হাতে আছে ও চিরকাল থাকবে। তাঁরই তত্ত্বাবধানে সারা জগত চলছে ও চলবে নিখুঁতভাবে। ছোটবড় কোনোকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। এবার বলুন, কেমন লাগছে সালাতে দাঁড়িয়ে। প্রবলভাবে ধুকপুক করছে না হৃদপিণ্ডটা?
আল্লাহু আকবার বলার পর এবার তিলাওয়াতের দিকে এগোচ্ছেন। আর আপনার দেহমন দিয়ে সংঘটিত প্রতিটি গুনাহ বেয়ে উঠতে শুরু করেছে আপনার কাঁধে ও মাথায়। প্রত্যেকটি রুকু ও সিজদার সময় একে একে ঝরে পড়ে যাবে তারা।[১] স্বভাবতই রুকু-সিজদা লম্বা করার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠা উচিত আমাদের।
একটু আগেও যেসব কাজ করা জায়িয ছিল, আল্লাহু আকবার বলার সাথে সাথে সেগুলো হয়ে যায় নাজায়িয। খাওয়া, কথাবার্তা, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া। হলোটা কী? কেন এই পার্থক্য? কারণ, এই পর্যায়ের এক সাক্ষাতে এ ধরনের কাজ অশোভন। দাস তার মনিবের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর সামনে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এখন ওসবের সময় নয়।
এখনো মন এদিক-ওদিক যাচ্ছে? এজন্যই তো আমরা সালাতের প্রতিটি নড়াচড়ায় আল্লাহু আকবারের পুনরাবৃত্তি করি। এগুলো একেকটি স্মরণিকা। মনোযোগ পুনরুদ্ধারের নতুন নতুন সুযোগ।
টিকাঃ
[১] সহিহু ইবনি হিব্বান: ১৭৩৪; হাদিসটি সহিহ।
📄 রাজাকে সম্ভাষণ, শত্রুর বিতাড়ন
‘আল্লাহু আকবার’ বলার সাথে সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে আপনি সালাতে প্রবেশ করলেন। এবার দৃষ্টি অবনত রাখুন সিজদার জায়গায়। বাম হাতের ওপর ডান হাত রেখে বেঁধে রাখুন হৃদয়ের কাছাকাছি। কেন?
ধরুন একটি রাজপ্রাসাদে ঢুকলেন আপনি। দূরে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কারো দৃষ্টি উদ্ধতভাবে সম্মুখ পানে আর হাত আরাম করে দুপাশে ছড়ানো। আরেকদল মানুষ আবার মাটির দিকে তাকিয়ে হাত দুটো এক করে ধরে আছে নিজেদের সামনে। দাঁড়ানোর এই ভঙ্গি দেখেই বুঝে যাবেন, কারা রাজপরিবারের লোক আর কারা সেবক। তাই না?
অতএব বান্দা হিসেবে রবের সামনে বিনয় সহকারে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক। রবের সামনে দাঁড়ানোর চিন্তাটা মাথায় আসলে তো আপনা থেকেই বিনয় চলে আসার কথা। তবে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সামনে বিনীত হওয়া মানে আসলে সম্মানিত হওয়া। কারণ এর ফলে মানুষ অন্য সব অযথা বিনয় থেকে মুক্ত হয়ে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে আল্লাহর কাছে নিজেকে ছোট করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।[১]
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮; জামিউত তিরমিযি: ২০২৯