📘 হযরত ঈসা আঃ এর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন > 📄 হযরত ঈসা (আঃ) এর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন

📄 হযরত ঈসা (আঃ) এর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন


পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে হযরত ঈসা (আঃ) এর এই পৃথিবীতে পুনরাগমনের বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং এ ব্যাপারে বহু প্রমান রয়েছে।

প্রথম প্রমানঃ সুরা আল ইমরানের ৫৫ আয়াতে আল্লাহ বলেন, "আর আমি তোমার অনুসারীদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিতেছি।" এখানে হযরত ঈসা (আঃ) এর একনিষ্ঠ অনুসারী বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে যারা আখেরী জমানায় তাঁর পুনরাগমনের পর তাঁর অনুসারী হবে। আল্লাহর নবী ও শেষ পয়গম্বর (সঃ) হযরত ঈসার (আঃ) প্রত্যাবর্তনের সুসংবাদ দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রসূল (সঃ) বলেছেন: "কসম সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রান। মরিয়ম (আঃ) তনয় অবশ্যই শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে অবতরন করে একজন ন্যায়বান বিচারক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবেন।"

দ্বিতীয় প্রমানঃ সুরা নিসার ১৫৯ আয়াতে আল্লাহ বলেন, "কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে নিজেদের মৃত্যুর পূর্বে তাহাকে বিশ্বাস করিবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।" এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) এর দ্বিতীয়বার আগমনের পর এবং তাঁর কায়িক মৃত্যুর পূর্বে সকল আহলে কিতাবগণ তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং সমগ্র বিশ্বে ইসলামী নৈতিক মূল্যবোধের বিজয় সূচিত হবে।

তৃতীয় প্রমানঃ সুরা যুখরুফের ৬১ আয়াতে বর্ণিত আছে, "ঈসা কিয়ামতের নিশ্চিত নিদর্শন। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ করিওনা এবং আমাকে অনুসরন কর।" কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার ৬০০ বছর পূর্বে তাঁর প্রথম আগমন ঘটেছিল, তাই তাঁর পুনরাগমনই কেয়ামতের আলামত হিসাবে গণ্য।

চতুর্থ প্রমানঃ সুরা আলে ইমরান ও সুরা মায়িদার বিভিন্ন আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ হযরত ঈসাকে (আঃ) কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজিল শিক্ষা দিবেন। এখানে 'কিতাব' বলতে অনেক মুফাসসির কোরআনকে বুঝিয়েছেন। এটি তখনই সম্ভব যদি তিনি কোরআন নাজিল হওয়ার পর পুনরায় পৃথিবীতে আসেন। হাদীসেও বলা হয়েছে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় আগমন করবেন তিনি ইনজিল নয় বরং কোরআন দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন।

পঞ্চম প্রমানঃ সুরা আল ইমরানের ৫৯ আয়াতে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসার উদাহরন তো আদমের উদাহরনের মতই।" হযরত আদম (আঃ) যেমন বেহেশত থেকে পৃথিবীতে এসেছিলেন, হযরত ঈসাও (আঃ) আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে আখেরী জামানায় পৃথিবীতে অবতরন করবেন।

ষষ্ঠ প্রমানঃ সুরা মরিয়মের ৩৩ আয়াতে ঈসা (আঃ) বলেন, "আমার প্রতি শান্তি যে দিন আমি জন্মলাভ করিয়াছি, সেদিন আমার মৃত্যু হইবে এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় উত্থিত হইব।" এই আয়াতে তাঁর যে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, তা হবে তাঁর দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে আগমনের পর।

সপ্তম প্রমানঃ সুরা মায়িদা ও সুরা আল ইমরানে উল্লিখিত "কাহলান" শব্দটি। এর অর্থ হলো পরিণত বয়স (৩০-৫০ বছর)। হযরত ঈসা (আঃ) যৌবনকালেই উর্ধাকাশে গমন করেছিলেন। সুতরাং পৃথিবীতে পুনরাগমনের পরেই তিনি এই পরিণত বয়সে পৌঁছাবেন এবং জনগণের সাথে কথা বলবেন।

পবিত্র কোরআনে এমন ঘটনার উদাহরণ রয়েছে যেখানে মৃত ব্যক্তি বা ঘুমন্ত ব্যক্তি দীর্ঘকাল পর পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। যেমন সুরা বাকারার ২৫৯ আয়াতে বর্ণিত এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ ১০০ বছর মৃত রাখার পর পুনর্জীবিত করেছিলেন। আবার সুরা কাহাফে আসহাবে কাহাফের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যারা ৩০০ বছরের বেশি সময় গুহায় ঘুমিয়ে থাকার পর পুনরায় জাগ্রত হয়েছিলেন। অনুরূপভাবেই হযরত ঈসা (আঃ) যখন পৃথিবীতে ফিরে আসবেন, তখন তিনি স্বাভাবিক জীবনে প্রবেশ করবেন এবং আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব পালন শেষে মৃত্যুবরণ করবেন।

📘 হযরত ঈসা আঃ এর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন > 📄 হযরত ঈসা (আঃ) এর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে আল হাদীস

📄 হযরত ঈসা (আঃ) এর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে আল হাদীস


হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর সান্নিধ্যে জীবিত অবস্থান করছেন এবং আখেরী জমানায় দুনিয়ায় পুনরায় আগমন করবেন—এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বিভিন্ন হাদীস সংকলনে উল্লেখ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রাঃ) 'আল ফিকাহ আল আকবর' গ্রন্থে লিখেছেন: দজ্জাল, ইয়াজুজ ও মাজুজ এর আগমন এবং হযরত ঈসার (আঃ) বেহেশত থেকে অবতরন বাস্তব সত্য। হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রত্যাবর্তন বিষয়ক হাদীসসমূহ 'তাওয়াতুর' পর্যায়ের, যা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।

সহীহ বোখারী ও মুসলিমের বিভিন্ন হাদীসে বলা হয়েছে: "হযরত মরিয়ম পুত্র ঈসা (আঃ) অচিরেই তোমাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ন শাসক হিসাবে অবতরন করবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শুকর হত্যা করবেন এবং জিজিয়া কর বাতিল করবেন।" তিনি পৃথিবীতে ৪০ বৎসর অবস্থান করবেন এবং তাঁর সময়ে পৃথিবীতে নজিরবিহীন শান্তি ও প্রাচুর্য বিরাজ করবে।

হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এই শতাব্দীতেই আগমন করবেন বলে অনেক ওলামায়ে কেরাম মত প্রকাশ করেছেন। হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা প্রতি শতকের শুরুতে একজন সংস্কারক প্রেরণ করেন। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী ইসলামী বর্ষপঞ্জীর ১৪০০ হিজরীর পরবর্তী সময়ে ইমাম মাহদী ও হযরত ঈসার (আঃ) আবির্ভাব ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

দজ্জাল (Anti-Christ) হবে আখেরী জমানার সবচেয়ে বড় ফিতনা। সে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে মানুষকে ঈমানহারা করবে। আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) দজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য বিশেষ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। হাদীসে বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা (আঃ) যখন পৃথিবীতে অবতরন করবেন, তখন তিনি লুদ (Ludd) নামক স্থানে দজ্জালকে দেখতে পাবেন এবং তাকে ধ্বংস করবেন। হযরত ঈসাকে দেখে দজ্জাল এমনভাবে গলে যাবে যেমন লবন পানিতে গলে যায়।

হযরত ঈসা (আঃ) এর আগমনের পর বিশ্বে সত্য ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। মুসলিম ও প্রকৃত খৃষ্টানরা একতাবদ্ধ হয়ে দজ্জালের সকল অপশক্তিকে পরাজিত করবে। এই ঐতিহাসিক যুগ সন্ধিক্ষণের জন্য মুমিনদের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

টিকাঃ
১. মুহাম্মদ ইবন আব্দ আর রসুল বারজানী, আল ইসাহ্ আহলি আশরাত আস্সাহ, The Portents of the Doomsday, পৃ-২৯৯।
২. সুযুতী আল কাসকু আন মুজেয়াবাতী হাজিহিল উম্মাহ আল আলফু আল হায়ী লিল কাতাই; ২/২৪৮।
৩. তকসীর রহুল বায়ান বাসায়ী ৪/২৬২।
৪. আহমদ বিন হাম্বল, কিতাব আল ইলাল, পৃ-৮৯।

📘 হযরত ঈসা আঃ এর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন > 📄 হযরত ঈসা (আঃ) এর পরিচয়

📄 হযরত ঈসা (আঃ) এর পরিচয়


হযরত ঈসা (আঃ) যখন পৃথিবীতে আগমন করবেন, তখন তাঁর চরিত্র ও কার্যকলাপ পবিত্র কোরআন ও হাদীসের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যাবে। নিষ্ঠাবান ঈমানদারগণ, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী, তারা আল্লাহর দেওয়া সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী জ্ঞানের (ফুরকান) মাধ্যমে তাঁকে চিনতে সক্ষম হবেন। বদিউজ্জামান সাইয়েদ নূরসী বলেন, তাঁর অবতরণের পর তিনি যে প্রকৃতপক্ষে পয়গম্বর হযরত ঈসা (আঃ), এটি শুধু তারাই বুঝতে পারবেন যাদের ঈমানের আলো অত্যন্ত প্রখর।

হযরত ঈসা (আঃ)-কে চেনার জন্য প্রধানত নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষণীয় হবে:
১. অসাধারণ নৈতিক মূল্যবোধ: তিনি আল্লাহর প্রতি নিবেদিত, বলিষ্ঠ এবং সাহসী একজন প্রকৃত মুমিন হবেন। তাঁর উন্নত চারিত্রিক মাধুর্য তাঁর অনুসারীদের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করবে।
২. চেহারার অভিব্যক্তি: তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং শারীরিক শক্তিতে তিনি শ্রেষ্ঠ হবেন। তাঁর খোদাভীরুতা ও ঈমানের দীপ্তি মুখমন্ডলে বিরাজ করবে, যা দেখে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে তারা একজন অতি অসামান্য ব্যক্তিত্বের সম্মুখীন হয়েছে।
৩. অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বাগ্মিতা: আল্লাহ তাঁকে অসামান্য হিকমত ও বাগ্মিতা দান করেছেন। তিনি অত্যন্ত বিজ্ঞজনোচিত ফয়সালাকারী হবেন এবং তাঁর যুক্তিপূর্ণ কথাবার্তা মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিবে।
৪. বিশ্বস্ততা: সকল নবীর ন্যায় তিনিও হবেন চরম বিশ্বস্ত। তাঁর সত্যবাদিতা ও আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা শীঘ্রই জনগণের নিকট প্রকাশিত হবে।
৫. আল্লাহর নিরাপত্তা বলয়: হযরত ঈসা (আঃ) যা করবেন তা-ই সফলতার মুখ দেখবে। আল্লাহর বিশেষ সাহায্যে তিনি সকল ষড়যন্ত্র থেকে সুরক্ষিত থাকবেন এবং তাঁর প্রতিটি মিশন নিশ্চিত বিজয় লাভ করবে।
৬. কোনো প্রতিদান প্রত্যাশা করবেন না: তিনি বিশ্ববাসীকে সত্যের পথে আহ্বান জানাবেন কিন্তু এর বিনিময়ে কোনো পার্থিব লাভ বা পারিশ্রমিক চাইবেন না। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, হযরত ঈসা (আঃ) যখন পৃথিবীতে পুনরায় আগমন করবেন, তখন এই পৃথিবীতে তাঁর কোনো আত্মীয়, পরিবার বা পরিচিত বন্ধু থাকবে না। তাঁর মাতা হযরত মরিয়ম (আঃ) এবং পূর্ববর্তী সকল পরিচিত ব্যক্তি দুই হাজার বছর পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন। তিনি পৃথিবীতে হঠাৎ করেই আবির্ভূত হবেন, যার কোনো শৈশব বা বংশীয় ইতিহাস তৎকালীন মানুষের নিকট থাকবে না। এটিই তাঁকে মিথ্যা মসীহ বা প্রতারকদের থেকে আলাদা করে চেনার প্রধান মাধ্যম হবে।

📘 হযরত ঈসা আঃ এর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


হযরত ঈসা (আঃ)-এর পৃথিবীতে পুনরাগমন মানবজাতির জন্য একটি অত্যন্ত শুভ সংবাদ। তাঁর প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই ইসলামী নৈতিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত বিজয় সূচিত হবে। যখন সমগ্র বিশ্বে বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয় ও যুলুম ছড়িয়ে পড়বে এবং অসহায় মানুষ আল্লাহর নিকট একজন ত্রাণকর্তার জন্য প্রার্থনা করবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর অপার দয়ায় হযরত ঈসা (আঃ)-কে প্রেরণ করবেন।

বর্তমানে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো পবিত্র কোরআনের শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ নিজেদের জীবনে ধারণ করা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে তা প্রতিষ্ঠা করা। হযরত ঈসা (আঃ) পুনরায় এসে বিশ্ববাসীকে আল্লাহর একত্বের বাণী পৌঁছে দিবেন এবং দজ্জালের সকল মিথ্যা মতবাদকে ধ্বংস করবেন। আখেরী জমানার নিদর্শনাবলী সম্পর্কে সচেতন কোনো ব্যক্তিই এই মহান অতিথিকে স্বাগতম জানানোর প্রস্তুতি না নিয়ে থাকতে পারে না। যারা প্রকৃত মুমিন, তারা অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁকে সর্বাত্মক সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করবে। অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসার এবং আল্লাহর দেওয়া উত্তম রিযিক ও জান্নাত লাভের এটিই হবে চূড়ান্ত সুযোগ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00