📄 সম্পর্কে কোরআনের বর্ণনা
এই পরিচ্ছেদে হযরত ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে পুনরায় আগমনের ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্যাদি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্যাদির প্রথম ও প্রধান উৎস হলো অবিকৃত ও অপরিবর্তনীয় আল্লাহর বাণী পবিত্র কোরআন। পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করা হয়েছে: "সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়া তোমার প্রতিপালকের বানী পরিপূর্ণ। তাহার বাক্য পরিবর্তন করার কেহ নাই। আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ" (সুরা আল-আনআম: ১১৫)। আর দ্বিতীয় উৎস হলো আল্লাহর শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর পবিত্র মুখে নিঃসৃত বানী হাদীসে রসুল।
হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহতালার একজন বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট পয়গম্বর, যিনি প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে এই পৃথিবীতে অবস্থান করছিলেন। কোরআনে তিনি ইহকালে ও পরকালে অতি মর্যাদাশীল হিসাবে বিবেচিত। তাঁর নিকট আল্লাহর সত্যধর্ম নাজিল করা হয়েছিল যা অদ্যাবধি নামে মাত্র হলেও টিকে আছে। হযরত ঈসা (আঃ) এর মূল ধর্মীয় শিক্ষা ব্যাপকভাবে বিকৃত করা হয়েছে। অনুরূপভাবে তাঁর কাছে নাজিলকৃত ঐশী গ্রন্থ ইঞ্জিলও বিকৃত, সংশোধিত ও সংযোজিত করা হয়েছে। খৃষ্টান পন্ডিতগণ এই মহা বিকৃতির কাজটি অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে সম্পন্ন করেছেন। এ কারণে খৃষ্টান উৎস থেকে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে সার্বিক তথ্য পাওয়ার কোন সুযোগ বা সম্ভাবনা নাই।
আল্লাহর নবী হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে প্রকৃত ও সঠিক তথ্য প্রাপ্তির একমাত্র উৎস হলো কোরআন, যে পুস্তকের কেয়ামত পর্যন্ত সঠিকতা ও অবিকৃত থাকা সম্পর্কে আল্লাহ স্বয়ং নিশ্চয়তা দিয়েছেন এবং সুন্নাহ অর্থাৎ রসুল হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর বানী। কোরআনে আল্লাহতালা হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্ম ও জীবন বৃত্তান্ত সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে কিছু ঘটনা তিনি পৃথিবীতে তার অবস্থানকালীন সময়ে সংঘটিত হয়েছে এবং তাঁর পারিপার্শ্বিক নিকটতম লোকজন ও তাঁর সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়াদি উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া কোরআনে হযরত মারিয়ম (আঃ) এর জীবনী, হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্মের পূর্বের ঘটনা, কি অলৌকিক পদ্ধতিতে তিনি হযরত ঈসা (আঃ) কে গর্ভে ধারন করেছিলেন, এই ঘটনায় তাঁর পারিপার্শ্বিক লোকজন কি প্রতিক্রিয়া দেখায়, এই ঘটনার সার্বিক রহস্য ও সামাজিক পরিবেশ ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। উপরন্তু কোরআনের কোন কোন আয়াতে হযরত ঈসা (আঃ) এর পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার আগমনের ইংগিত রয়েছে।
হযরত মরিয়ম (আঃ) কে হযরত ঈসা (আঃ) এর মাতা হওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। হযরত মরিয়ম (আঃ) একটি বিশৃংখলাপূর্ণ সামাজিক পরিবেশে জন্ম গ্রহণ করেন। আল্লাহতালা হযরত মরিয়ম (আঃ) কে এই পবিত্র দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষভাবে মনোনীত করেছিলেন এবং সেই ভাবেই তাঁকে প্রতিপালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। হযরত মরিয়ম (আঃ) বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। হযরত ইমরান (আঃ) এর পরিবারটিকে আল্লাহতালা স্বয়ং সমগ্র বিশ্বের জনগনের মধ্য থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসাবে মনোনীত করেছেন। এই পরিবারের সদস্যবৃন্দ খোদাভীরুতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। তারা সকল কাজে আল্লাহর প্রতি নিবেদিত ছিল এবং অতি সতর্কতার সাথে আল্লাহর বিধি বিধান অনুসরন করতো। যখন হযরত ইমরান (আঃ) এর স্ত্রী জানতে পারলেন যে, তিনি সন্তানসম্ভবা, তখন তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্তার দরবারে অনাগত সন্তানকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করবেন মর্মে মানত করলেন।
স্মরন করো, যখন ইমরান এর স্ত্রী বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক, আমার গর্ভে যাহা আছে, তাহা একান্ত তোমার জন্য আমি উৎসর্গ করিলাম। সুতরাং তুমি, আমার নিকট হইতে উহা কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। অতঃপর যে উহাকে প্রসব করল, তখন সে বলিল, আমার প্রতিপালক, আমি কন্যা প্রসব করিয়াছে। সে যাহা প্রসব করিয়াছে আল্লাহ তাহা সম্যক অবগত। আর ছেলে তো মেয়ের মত নয়। আমি উহার নাম মরিয়াম রাখিয়াছি এবং অভিশপ্ত শয়তান হইতে তাহার ও তাহার বংশধরদের জন্য তোমার স্মরন লইতেছি (সুরা আলে ইমরান ৩৫-৩৬)।
হযরত ঈসা (আঃ) এর অলৌকিক জন্মের মাধ্যমে আল্লাহতালা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অসাধারন ঘটনাবলীর একটির প্রকাশ ও বিকাশ সাধন করেছেন। সুরা মরিয়ামে হযরত জিবরাইল (আঃ) যেভাবে হযরত মরিয়াম (আঃ) এর কাছে আবির্ভূত হয়েছিলেন তা বর্ণনা করা হয়েছে। জিবরাইল (আঃ) হযরত মরিয়ম (আঃ) কে তাঁর পরিচিতি দিলেন এবং বলেন যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য একটি সুসংবাদ প্রদানের জন্য আগমন করেছেন। তিনি বললেন: "আমি তোমার প্রতিপালক কর্তৃক প্রেরিত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করিবার জন্য" (সুরা মরিয়াম-১৯)। এবং "হে মরিয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে তাঁহার পক্ষ হইতে একটি কালেমার সুসংবাদ দিতেছেন। তাহার নাম মসীহ মরিয়ম তনয় ঈসা, সে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তদের অন্যতম হইবে" (সুরা আলে ইমরান-৪৫)।
আল্লাহতালা পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অন্য কোন সাধারন মানুষের মত নয় বরং তিনি আল্লাহতালার ইচ্ছায় একজন অনন্য অসাধারন ও অলৌকিক ব্যক্তিত্ব। কোরআন এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যে, তিনি কুমারী মাতার পুত্র যা একটি মহা অলৌকিক ঘটনা। কোরআনে বলা হয়েছে: "ঈসা, মসীহ, মরিয়াম তনয়, তো আল্লাহর রাসুল, তার বানী, যাহা তিনি মরিয়ামের নিকট প্রেরন করেছিলেন ও আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রুহ" (সুরা নিসা-১৭১)।
হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্ম যা একটি অনন্য সাধারন ঘটনা, এটি তাঁর এবং তাঁর জনগণের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা ছিল। অতঃপর সে সন্তানকে লইয়া তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হইল। উহারা বলিল, হে মরিয়ম। তুমি তো এক অদ্ভুত কান্ড করিয়া বসিয়াছ। যা হারুন ভগ্নী। তোমার পিতা, অসৎ ব্যক্তি ছিলনা এবং তোমার মাতাও ছিলনা ব্যভিচারিনী (সুরা মরিয়াম ২৭-২৮)। আল্লাহতালা তাঁকে কথা না বলার ব্রত পালনের নির্দেশের মাধ্যমে বিরক্তিকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করলেন। অতঃপর, মরিয়ম সন্তানের প্রতি ইংগিত করিল। উহারা বলিল, যে কোলের শিশু তাহার সহিত আমরা কেমন করিয়া কথা বলব? সে বলিল, ঈসা (আঃ) আমি তো আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়াছেন, আমাকে নবী করিয়াছেন। যেখানেই আমি থাকিনা কেন, তিনি আমাকে বরকতময় করিয়াছেন (সুরা মরিয়ম ২৯-৩৩)। কোনো শিশুর পক্ষে দোলনায় এ ধরনের কথা বলা নিঃসন্দেহে একটি বিরাট ধরনের অলৌকিক ঘটনা।
পবিত্র কোরআনে অতি স্পষ্টভাবে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে যে, ইহুদিগণ কর্তৃক প্ররোচিত হয়ে রোমান শাসক গোষ্ঠি কর্তৃক হযরত ঈসাকে (আঃ) হত্যা প্রচেষ্টা সফল হয় নাই। তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই, ক্রুশবিদ্ধও করে নাই। কিন্তু তাহাদের এই রূপ বিভ্রম হইয়াছিল (সুরা নিসা-১৫৭)। বরং আল্লাহ তাহাকে তাঁহার নিকট তুলিয়া লইয়াছেন এবং আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় (সুরা নিসা-১৫৮)।
পয়গম্বরদের মৃত্যুর বিষয়টি বর্ণনা প্রসঙ্গে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে— “কাতালাহু” (হত্যা করা), “মাতা” (মরা), “হালাকা” (ধ্বংস হওয়া) ও “সালাবাহু” (ক্রুশবিদ্ধ করা)। হযরত ঈসা (আঃ)-এর ক্ষেত্রে “তাওয়াফ্ফা” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার মূল অর্থ হলো পূর্ণ করা বা ফিরিয়ে নেওয়া। ইসলামী চিন্তাবিদগণের মতে, হযরত ঈসা (আঃ) মৃত্যুমুখে পতিত হন নাই বরং তাঁকে এই পার্থিব মাত্রা থেকে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি শরীর ও আত্মাসহ নিরাপদে জীবিত অবস্থায় বেহেশতে অবস্থান করছেন এবং তিনি এই পৃথিবীতে আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে পুনরায় আগমন করবেন।
টিকাঃ
১. মুহাম্মদ খলীল হেরাস, ফাস্ল আল-যাকাল ফি রালফি ইসা হায়ান ওয়া নুযুলিহ ওয়া কাতালিহ আজ দাজ্জাবল; পৃ-৬৬।
২. আল হামিদী ইয়াজর (Elmali), The Time Religion the Language of the Quran, পৃঃ ১১১২-১৩।