📄 অসম সাহস, উচ্চ মনোবল, জিহাদ, সংগ্রামের ধারক ও বাহকগণ
আহলে বায়ত ও শেরে খোদা আলী ইব্ন আবু তালিবের সন্তান ও বংশধরগণ অত্যুচ্চ মনোবল ও অসমসাহসিকতার অধিকারী ছিলেন যা শুরু থেকে নবী পরিবারের বৈশিষ্ট্য এবং আলী মুরতাযা ও শহীদে কারবালা হুসায়ন (রা)-এর ঐতিহ্যগত উত্তরাধিকার ছিলো। সত্যের পথে অবিচল থেকে সকল বিপদ-মুসিবত উপেক্ষা করে এবং কঠিনতর প্রতিকূলতার মুকাবিলা করে মুসলিম উম্মাহকে সঠিক পথে পরিচালিত করার মহান লক্ষ্যে তাঁরা তাঁদের সমগ্র জীবন ও কর্ম পরিচালিত করেছেন।
ইতিপূর্বে আমরা উমাইয়া খলীফা হিশাম ইব্ন আবদুল মালিক ইব্ মারওয়ানের মুকাবিলায় যায়দ ইব্ন আলী ইবন হুসায়নের জিহাদী ভূমিকা ও আব্বাসী খলীফা আল-মানসুরের মুকাবিলায় নাফসে যাকিয়া মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ও তাঁর ভাই ইবরাহীমের মহান সংগ্রামের কথা বর্ণনা করে এসেছি। ইসলামী ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এটাই ছিলো তাঁদের নীতি ও বৈশিষ্ট্য। তাই দেখা যায়, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ঔপনিবেশিক বাহিনী ও দখলদার বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ও সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন আহলে বায়তের কোন-না-কোন মুজাহিদ পুরুষ। তাঁদের ইতিহাস, শৌর্যবীর্য ও সাহসিকতার অকথিত ইতিহাস এবং সুমহান কীর্তি ও কর্মের ইতিহাস যা অজ্ঞতার অন্ধকার বিবর থেকে মুক্তির আশায় আজও অপেক্ষা করছে সেই বিশ্বস্ত ঐতিহাসিকের যিনি পরম ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সাথে তুলে ধরবেন মুসলিম উম্মাহর সামনে কোন একটি গ্রন্থে কিংবা গ্রন্থমালায়।
পক্ষান্তরে আহলে বায়তের এই মহান ইমামগণের যে জীবনচিত্র তাঁদের গুণ ও প্রশস্তি বর্ণনায় লিখিত গ্রন্থগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে তা বিভিন্ন দেশে সক্রিয় বিভিন্ন গুপ্ত সংস্থা ও ফ্রিম্যাশন সংগঠনের উপস্থাপিত জীবনচিত্র থেকে মোটেই ভিন্ন নয় এবং তা অধ্যয়নকারীর অন্তরে ইসলামের প্রসার ও দীনের বিজয় অর্জনের জন্য মৃত্যুভয়হীন সংগ্রাম সাধনার এবং জিহাদ ও কুরবানী, অত্যুচ্চ মনোবল ও প্রেরণা উৎসারিত হয় না, সেই সুমহান প্রেরণা যা বিভিন্ন দুর্যোগপূর্ণ যুগে ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে ইতিহাসের ধারা পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং ঘটনা প্রবাহের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ইসলামের ইতিহাসের সুদীর্ঘ চৌদ্দশ বছরে সময়ের ধারাকে বারবার নতুন দিক গ্রহণে বাধ্য করেছে।
'আলাবী রক্তের' উভয় শাখা তথা হাসান ও হুসায়ন (রা)-এর মাধ্যমে যারা নবী পরিবারভুক্ত হয়েছেন, বহু যুগ পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি এমন সকল অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তাঁদের নিরবচ্ছিন্ন ও অনন্যসাধারণ ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। অসংখ্য মানুষ তাদের দাওয়াতী ত্যাগের বদৌলতে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং এ সকল অঞ্চলে ইসলাম প্রবেশ করার পর ইসলাম-বৃক্ষ তার প্রতিপালকের ইচ্ছায় যুগ যুগ ধরে প্রতিনিয়ত অশেষ সুফল দান করে এসেছে। বড় বহু আলিম ও আধ্যাত্মিক পুরুষ সেখানে জন্মগ্রহণ করেছেন। 'মাসজিদে আকসা' অঞ্চলে বারবার জাতির ক্ষেত্রে ও ভারতীয় উপমহাদেশের কাশ্মীর অঞ্চলে যেমন ঘটেছিলো।¹
তদ্রূপ এটাও ঐতিহাসিক সত্য যে, কাশ্মীর উপত্যকা ইসলামী সভ্যতার প্রবেশ, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনবসতির ইসলাম ধর্ম গ্রহণ (আল্লাহর রহমতে এখনও পর্যন্ত এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রয়েছে), বিভিন্ন শিল্প সাহিত্যের বিকাশ ও প্রথিতযশা বহু আলিম-ওলামার আত্মপ্রকাশ- এসবের জন্য কাশ্মীর উপত্যকা যাঁর নিকট ঋণী, তিনি হলেন মহান দাঈ আমীর সৈয়দ আলী ইন্ন শিহাব আল হামাদানী।²
তদ্রূপ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ দেশগুলোতে ও ভারতীয় দীপপুঞ্জ তথা ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রেও সর্বাধিক অবদান ছিলো সাইয়িদগণের। ফ্যান্ডন ব্যারখ, এলও, এস তার ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, ইসলাম বিস্তারের প্রভাব শক্তি মূলত এসেছে সম্মানীয় সাইয়েদগণের মধ্য থেকে। তাঁদের মাধ্যমেই জাভা ও অন্যান্য এলাকায় শাসকগণের মাঝে ইসলাম প্রসার লাভ করেছে। ১৩৮২ হিজরী আট যিলহজ্জ (মুতাবিক ত্রিশে এপ্রিল ১৯৬২) তারিখে অনুষ্ঠিত পরামর্শ পরিষদের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে, শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী হাযরামাউতের অধিবাসী আলাবী সাইয়েদগণই ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রচার করেছেন।
তদ্রূপ খ্রীস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে আলাবী সাইয়েদগণের একটি জামায়াতের মাধ্যমে ফিলিপাইনের বিভিন্ন দ্বীপে ইসলাম প্রবেশ করেছিলো। এই মহান ব্যক্তিগণ ইসলামী দাওয়াতের পতাকা বহন করে ফিলিপাইনে পৌঁছেছিলো। শুধু তাই নয়, সে দেশের উন্নয়নে ও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অগ্রসরতা অর্জনের ক্ষেত্রেও সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। দ্বীপদেশ চাঁদ, মাদাগাস্কার, মুজাম্বিক, মালয় প্রভৃতি দেশে ইসলামের আত্মপ্রকাশের ইতিহাসও অভিন্ন।
অতি উচ্চ মর্যাদাবান বহু আধ্যাত্মিক পুরুষও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন সাইয়েদগণের মাঝে, যাঁরা তাকওয়া ও সুন্নাতের ইত্তেবা, আত্মপূজা ও প্রবৃত্তিপূজা পরিহার, দুনিয়াবিমুখতা, আখিরাত চিন্তা, দাওয়াত ইলাল্লাহ্র মাধ্যমে উম্মতের আত্মসংশোধন ও তাযকিয়ার মহান সাধনায় ও স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মুজাহাদায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। জ্ঞান সাধনা, আধ্যাত্মিক সাধনা, সমাজ সংস্কার, চরিত্র সংশোধন, দাওয়াত ইলাল্লাহ ইত্যাদি দীনী কর্মকাণ্ডে তাঁরাই ছিলেন প্রাণপুরুষ। তাই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁদের কাছে এসে ভিড় জমাতো। আল্লাহ্ তাঁদেরকে সে গৌরব ও মর্যাদা দান করেছিলেন, দুনিয়ার বাদশাহ ও শাহানশাহদের মর্যাদা-গৌরবও তার সামনে ছিলো নিষ্প্রভ।
এই সংক্ষিপ্ত কলেবরে সকলকে ধারণ করা যেহেতু সম্ভব নয়, সেহেতু ইমাম আবদুল কাদির জিলানী (র)-এর কথা আমরা বিশেষভাবে উল্লেখ করবো। আল্লাহ্র পথে দাওয়াত ও মানব হৃদয় ও আত্মার সংশোধনের ক্ষেত্রে তিনি অতি উচ্চ মকাম ও মরতবা লাভ করেছিলেন। তাঁর হাতে পাঁচ হাজারেরও বেশি ইহুদী ও নাসারা ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং এক লাখেরও বেশি সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারী তাওবা করেছে। [কালায়িদুল জাওয়াহির, পৃষ্ঠা-২২] তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণকারী সাধক পুরুষগণও পূর্ণোদ্যমে দাওয়াত, তারবিয়াত ও তাযকিয়ার মহান কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং আফ্রিকার গভীর অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। ফলে তাঁদের কল্যাণে (আফ্রিকায়) ইসলাম ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিলো।
ভারত উপমহাদেশেও আওলাদে রাসূল ও সাইয়েদগণের মাঝে বহু সাধক পুরুষ ও সংস্কারক বুজুর্গানের আবির্ভাব ঘটেছিলো। মানুষের হৃদয় ও আত্মার সংশোধন ও রূহানী রোগ-ব্যাধির চিকিৎসার মাধ্যমে আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর শরীয়তের সাথে মানুষের সুগভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুমহান দায়িত্ব তাঁরা আঞ্জাম দিয়েছেন।
শায়খ নিযামুদ্দীন মুহাম্মদ ইব্ন আহমদ আল বাদায়ুনী (৬৩৬-৭১৫) [র] মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা ও দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক বর্জন, ইবাদতের পথে পরিচালিত করা ও এর পাশাপাশি যাবতীয় ইলমে জাহিরীতে পারদর্শিতা অর্জন এবং মহত্তম গুণ ও বৈশিষ্ট্য অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রাণপুরুষ।
শায়খ মাহমুদ ইব্ন ইয়াহয়া (ওরফে নাসিরুদ্দীন) আল হুসায়নী একজন বড় মাপের আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ ছিলেন। ৭৭৫ হিজরীতে দিল্লী শহরে তিনি ইন্তিকাল করেছেন এবং সেখানেই সমাধিস্থ হয়েছেন।
শায়খ মুহাম্মদ ইব্ন ইউসুফ ছিলেন বহু শাস্ত্রবিশারদ আলিম ও ফকীহ, বহু কারামাত ও আধ্যাত্মিক উচ্চ মরতবার অধিকারী যাহিদ বুজুর্গ। তিনি ৭২১ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮২৫ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।
ভারতবর্ষের অধিবাসী সাইয়েদগণের আরেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হলেন সৈয়দ শরীফ আল্লামা আশরাফ ইব্ন ইবরাহীম আল হাসানী আল হুসায়নী (ওরফে জাহাঙ্গীর)। তিনি ৮০৮ হিজরীর ২৮ মুহররম ইন্তিকাল করেছেন। [নুজহাতুল খাওয়াতির, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬০-১৬৪]
দাওয়াত ও প্রশিক্ষণের মহান কাজে নিবেদিত সাইয়েদগণের মাঝে আরেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হলেন মহান তত্ত্বজ্ঞানী শায়খ আদম ইব্ন ইসমাঈল আল হুসায়নী আল কাসেমী বিন্নোরী (র)। তিনি ১০৫৩ হিজরীতে মদীনায় ইন্তিকাল করেন। [নুজহাতুল খাওয়াতির, পৃষ্ঠা ১-২]
স্থান ও কালের বহু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখন আমরা এমন এক মহান ব্যক্তির সম্মুখে উপস্থিত, যাঁকে মারিফাতের আলোকপ্রাপ্ত বহু অন্তর্জানী ত্রয়োদশ হিজরী শতাব্দীর মুজাদ্দিদরূপে গণ্য করেছেন। তিনি হলেন মহান দাঈ ইলাল্লাহ, মুজাহিদ ফী সাবীলিল্লাহ ও মুসলিম মিল্লাতের রূহানী মুরুব্বী সৈয়দ ইমাম আহমদ ইব্ন ইরফান শহীদ (র)। ভূপালের নওয়াব আল্লামা সৈয়দ সিদ্দীক হাসান (মৃ. ১৩০৭ হি.) তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, তাঁর সমসাময়িক পৃথিবীর কোন অংশে এমন একজনও মানুষের কথা আমাদের জানা নেই, যিনি তাঁর শান মরতবার সমকক্ষতার দাবিদার হতে পারেন। সৈয়দ আহমদ শহীদ (র)-এর হাতে ৪০ হাজারেরও বেশি অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং ৩০ লাখ মানুষ তাঁর হাতে বায়'আত হয়েছিল।
বিভিন্ন ইসলামী আরব অঞ্চলেও সাইয়েদগণের মাঝে বহু বুযুর্গ ও মরদে মুজাহিদ আত্মপ্রকাশ করেছেন। এখানে বিশেষভাবে আমীর সৈয়দ আবদুল কাদির আল জাযায়েরী ও সাইয়েদ আহমদ শরীফ সনোসী (র)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। আবদুল কাদির আল-জাযায়েরী ১৮৩৯ সনের ২০ নভেম্বর অমুসলিম আগ্রাসী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি ১৮৮৩ খ্রীস্টাব্দে ইন্তিকাল করেন। সাইয়েদ আহমদ শরীফ সনোসী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি তাকওয়া ও ধার্মিকতায় যেখানে ছিলেন অলীশ্রেষ্ঠ, সেখানে সাহাসিকতায়ও ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ। ত্রিপোলী যুদ্ধের বহু লড়াইয়ে তিনি সশরীরে উপস্থিত থাকতেন।
টিকাঃ
১. ঐতিহাসিকভাবে এটা সত্য যে, আফ্রিকায় ইসলামী হকুমতের প্রতিষ্ঠাতা ইদরীস ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইবনুল হাসান (মৃ. ১৭৫ হিজরী)-এর কর্তৃত্ব যখন সুপ্রতিষ্ঠিত হলো এবং তাঁর দাওয়াতী মিশন পরিপূর্ণতা লাভ করলো, তখন তিনি মাগরিব এলাকায় বসবাসকারী বারবারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন, যাদের অধিকাংশই ইহুদী ও খ্রীষ্টধর্মের অনুসারী ছিলো, তখন তারা তাঁর হাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলো।
২. নুযহাতুল খাওয়াতিরের বর্ণনামতে ইনি ছিলেন ইসমাঈল বিন আলী বিন মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসায়ন-এর বংশধর। সাত'শ তিয়াত্তর হিজরীতে (মতান্তরে সাত'শ আশি হিজরীতে) সাত'শ অনুগামীসহ তিনি কাশ্মীরে আগমন করেছিলেন এবং তাঁর হাতে কাশ্মীরের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলো, (২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫)। তিনি সাত'শ ছেয়াশি হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।
📄 শিয়া সম্প্রদায়ের ইমামতের আকীদা
পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে দিবালোকের ন্যায় এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, আহলে বায়তের সাইয়েদগণ ইসলামের পরিচ্ছন্ন ও বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাসকে অন্তরে স্থান দিয়েছিলেন যা তাঁরা তাদের প্রিয় নবী ﷺ ও নানাজানের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন। সে আকীদা-বিশ্বাসের সারনির্যাস এই যে, তাদের প্রিয় নবী ও নানাজানই হলেন সর্বশেষ নবী যাঁর মাধ্যমে নবুয়ত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। অহীর অবতরণ বন্ধ হয়েছে এবং দীন ও শরীয়ত পরিপূর্ণতায় উপনীত হয়েছে।
ইমাম সুফিয়ান-মুতারবাফ হতে, তিনি শা'বী হতে, তিনি আবূ জুহায়ফা হতে বর্ণনা করেন। আবূ জুহায়ফা (র) বলেন, আলী (রা)-কে আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনাদের নিকট কি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর পক্ষ হতে কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু রয়েছে? তিনি বললেন, সেই পবিত্র সত্তার শপথ, যিনি বীজ অংকুরিত করেন এবং মানবকে সৃষ্টি করেছেন তা ছাড়া আর কিছু নেই। তবে কুরআন সম্পর্কে বিশেষ সমঝ যা আল্লাহ দান করে থাকেন আর যা 'সহীফায়' রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সহীফায় কি রয়েছে? তিনি বললেন, 'দিয়ত' এর বিধান, বন্দী মুক্তির বিধান এবং এই বিধান যে, কোন মুসলমানকে কোন কাফিরের বিনিময়ে হত্যা করা হবে না। [মুসনাদে আহমাদ]
📄 এই আকীদা গ্রহণের বিকৃত মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ
হযরত আলী (রা)-এর সন্তান-সন্ততি ও উত্তরাধিকারিগণ এই আকীদা-বিশ্বাস সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন এবং এর প্রতিই মানুষকে তাঁরা আজীবন আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু অবশেষে সেই স্বভাব ও মানসিকতাই প্রবল হয়ে উঠলো যার উৎস হলো প্রাচীন জাহিলিয়াত বিকৃতিপ্রাপ্ত প্রাচীন ধর্মসমূহ এবং নবুয়তের সম্পর্ক ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত গ্রীক, পারস্য, চীন ও ভারতবর্ষের সমাজ সভ্যতা ও দর্শনসমূহ। শিয়া ইছনা আশারিয়া সম্প্রদায় ধর্মীয় পবিত্রতার ছাপ দিয়ে ইমামতের আকীদার মাধ্যমে কিছু মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য অর্জনের প্রয়াসী হয়েছিলো। এই ভ্রান্ত ফেরকা দাবি করলো যে, রাসূলের খলীফা ও ইমামগণের নির্বাচন আল্লাহর পক্ষ হতেই হয়ে গিয়েছিলো। নবী ও রাসূলের ন্যায় তাঁরাও নিষ্পাপ। তাঁদের মর্যাদা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর মর্যাদার সমতুল্য এবং অন্যান্য নবী-রাসূলের মর্যাদার ঊর্ধ্বে। তারা বিশ্বাস করে ইমাম ছাড়া বান্দার ওপর আল্লাহর হুজ্জত (প্রমাণ) সাব্যস্ত হয় না এবং ইমাম ছাড়া দুনিয়া কায়েম থাকতে পারে না।
আল্লামা ইব্ন খালদুন বলেন, শিয়াদের ইমামতের ধারণাটি দীনের স্তম্ভ ও ইসলামের বুনিয়াদ হিসেবে তারা গণ্য করে। তাদের কতিপয় গোঁড়া উপদল এমনও রয়েছে যারা এই ইমামগণের ইলাহিয়াত দাবি করে বসেছে। এ ধরনের মতবাদ পোষণকারীদেরকে আলী (রা) আগুনে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিলেন। মুখতার ইব্ন আবূ ওবায়দ সম্পর্কে এই আকীদার কথা শুনতে পেয়ে মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়া (র) খুবই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। শিয়া সম্প্রদায়ের এ সকল আকীদা-বিশ্বাস বর্তমান যুগের শিয়া সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গও ধারণ করে চলেছেন, এমনকি আয়াতুল্লাহ খোমেনী তাঁর রচিত "আল-হুকুমাতুল ইসলামিয়া" গ্রন্থে ইমামদের এমন উচ্চ মরতবা দিয়েছেন যেখানে নৈকট্যপ্রাপ্ত কোন ফেরেশতা কিংবা কোন প্রেরিত নবী উপনীত হতে পারেন না।
📄 প্রাচীন ইরান ও তার ধর্মবিশ্বাসের প্রতিফলন
'ইমামত' গোঁড়া আকীদা বিশ্বাস যার সীমারেখা ব্যক্তি ও পরিবারের প্রতি ঐশ্বরিক পবিত্রতা আরোপ পর্যন্ত উপনীত হয়, মূলত এর ওপর প্রাচীন ইরানের ধর্মবিশ্বাসেরই প্রতিফলন ঘটেছে। পারসিকরা সম্রাটের প্রতি এমন দৃষ্টিতে তাকাতেই অভ্যস্ত ছিলো, যাতে একটা ঈশ্বরীয় ভাব বিদ্যমান থাকে। পরবর্তীতে ঠিক একই দৃষ্টিতে তারা আলী ও তাঁর পরিবারের প্রতি তাকাতে শুরু করেছিলো। [ফজরুল ইসলাম, পৃষ্ঠা-২৭৭]
শরীয়তের বিধান প্রবর্তন ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নবুয়তের সমান্তরাল প্রতিষ্ঠানরূপে আত্মপ্রকাশকারী 'ইমামত' থেকে যে নিরংকুশ ক্ষমতা উৎসারিত হয়েছে তার ফলশ্রুতি এই যে, ইমামতের নামে দীনের যে কোন রোকন বা বিধান যখনই কোন রাজনৈতিক প্রয়োজন দেখা দেবে, তখন রহিত করা যাবে। ইরানের সরকারি পত্রিকা কায়হান-এ প্রকাশিত খোমেনীর একটি পত্রে বলা হয়েছে যে, (ইমামের) হুকুমত সমস্ত মসজিদ বাতিল করে বা ভেঙ্গে ফেলতে পারে এবং এই হুকুমত নামায-রোযার ওপর অগ্রগণ্য।
আয়াতুল্লাহ্ খোমেনীর মৃত্যুর পর ইরানী জনগণের মাঝে যে অন্ধ আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, যেখানে লাশের কাফনের কাপড় ছিনিয়ে নেওয়া এবং সমাধি সৌধ নির্মাণে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সিদ্ধান্ত- এসবই ঐশ্বরিক পবিত্রতার সেই অতিমানবীয় বলয় যা ইমামতের চরমপন্থী আকীদা সৃষ্টি করে রেখেছে। অথচ রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর সীরাত ও শিক্ষা অনুযায়ী তিনি কোন বিষয়ে তাঁর প্রতি আলাদা আচরণ পছন্দ করতেন না। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, খ্রীস্টানরা ঈসা ইবন মারয়ামের যেমন অতিরঞ্জিত প্রশংসা করেছে তোমরা আমার সে রকম প্রশংসা করো না। [বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া]
এই ইমামত ব্যবস্থার ফলে এমন একটি বেকার ও কর্মবিমুখ শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে থাকে, যারা কপালের ঘাম ও হাতের শ্রমের পরিবর্তে জনসাধারণের দান ও ভিক্ষার ওপর জীবন ধারণ করে। আল্লাহ্ তা'আলা সত্যই বলেছেন, “হে মু'মিনগণ, অধিকাংশ ইহুদী আলিম ও খ্রীস্টান পাদরী মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে এবং আল্লাহ্র পথ হতে (মানুষকে) বাধা দান করে। [সূরা তাওবা: ৩৪]
সমাপ্ত