📄 নবী-বংশ পরিচয়ের প্রতি ঈর্ষা
যে পবিত্র রক্ত-সম্পর্ক তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর সঙ্গে সম্পৃক্তির সৌভাগ্য দান করেছিলো, সে সম্পর্কের শুচিতা ও পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁরা অত্যন্ত সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এ মহান সম্পর্ক-সূত্রকে তুচ্ছ পার্থিব স্বার্থে কখনোই তাঁরা ব্যবহার করেন নি অন্যান্য জাতি ও ধর্মের আধ্যাত্মিক পুরুষ ও ধর্ম-নেতাদের পরিবার ও বংশধরদের বেলায় যেমন হয়ে থাকে। সর্বাবস্থায় তাঁরা অতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় পবিত্রতা ভোগ করে থাকে এবং তাদের অনুসারীরা তাদের সাথে অতিমানবীয় ব্যক্তিত্বের ন্যায় আচরণ করে থাকে। কিন্তু নবী-পরিবারের বংশধররা কখনো দুনিয়ার উচ্ছিষ্ট ভোজনের জন্য তাঁদের পূর্বপুরুষদের নাম ব্যবহার করেন নি এবং তাঁদের মৃত্তিকামিশ্রিত অস্থিকংকালের ওপর গৌরবের প্রাসাদ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন নি। ইতিহাস ও জীবনচরিত বিষয়ক গ্রন্থগুলোতে তাঁদের আত্মসম্মানবোধের যে সকল চমকপ্রদ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তা অন্যান্য জাতি ও ধর্মের পেশাদার আধ্যাত্মিক শ্রেণীর সম্পূর্ণ বিপরীত এক জীবনচিত্র পেশ করে, যেখানে অতি পবিত্রতা আরোপ কিংবা আলাদা সুবিধা ভোগের কোন অবকাশ নেই।
পক্ষান্তরে ব্রাহ্মণ ও যাজকশ্রেণী জন্মসূত্রে একটি ধর্মীয় পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা ভোগ করে থাকে। ফলে জীবিকা ও জীবনের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য তাদের কোন পরিশ্রম করতে হয় না। কপালের এক ফোঁটা ঘামও ঝরাতে হয় না।
হাসান ইব্ন আলী (রা) একবার কোন প্রয়োজনে বাজারে গেলেন এবং এক দোকানদারকে একটি পণ্যের দাম জিজ্ঞেস করলেন। দোকানদার সাধারণ দাম বললো। অতঃপর যখন জানতে পারলো যে, ইনি রাসূলুল্লাহ্-এর দৌহিত্র তখন তাঁর সম্মানার্থে হ্রাসকৃত মূল্য বললো। কিন্তু হাসান ইব্ন আলী (রা) তা গ্রহণ করলেন না, বরং জিনিস না কিনেই চলে এলেন। তিনি বললেন, তুচ্ছ একটি বিষয়ে আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক থেকে ফায়দা ওঠাতে রাজি নই।
যায়নুল আবেদীন আলী ইবনুল হুসায়ন (র)-এর বিশিষ্টতম খাদেম জুয়াইরিয়া বিন আসমা (র) বলেন, আলী ইব্ন হুসায়ন (র) রাসূলুল্লাহ্ এর আত্মীয়তার সুবাদে একটি দিরহামও কখনো অতিরিক্ত গ্রহণ করেন নি। সফরের সময় তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতেন। এ সম্পর্কে একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, সাধারণ পরিচয়ে যা আমাকে দেয়া হবে না তা রাসূলুল্লাহ্-এর পরিচয়ের সুবাদে গ্রহণ করা আমার অপছন্দ।
আবুল হাসান আলী রেযা ইব্ন মূসা আল কাযিম সম্পর্কেও বর্ণিত আছে যে, সফরের সময় নিজের পরিচয় তিনি গোপন রাখতেন। এ সম্পর্কে একবার জিজ্ঞেস করা হলে তিনিও একই উত্তর দিলেন। বললেন, সাধারণ পরিচয়ে যা আমাকে দেয়া হবে না, তা রাসূলুল্লাহ্-এর পরিচয়ের সুবাদে গ্রহণ করা আমার অপছন্দ। [ইব্ন খাল্লিকানকৃত ওফায়াতুল আইয়ান, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৩৪]
📄 অতিভক্তি ও অতি প্রশংসার প্রতি অসন্তুষ্টি
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর সাথে রক্ত-সম্পর্কের বিষয়ে তাঁরা খুবই সংযমী ও সতর্ক ছিলেন। এ ক্ষেত্রে ইহুদী, খ্রীস্টান ও ব্রাহ্মণ ধর্মের (হিন্দু ধর্ম) কট্টর গোড়া অনুসারীদের ন্যায় তাঁদের প্রতি ভক্তি-ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রেও মানুষ অতিরঞ্জনের আশ্রয় গ্রহণ করবে, এটা তাঁরা মোটেই পছন্দ করতেন না।
ইয়াহয়া ইবন সাঈদ (রা) বলেন, একদল লোক আলী ইবনুল হুসায়নের পাশে জড়ো হয়ে অতিরঞ্জিত ভক্তিমূলক কিছু কথা বললো। তখন তিনি তাদেরকে উপদেশ দিয়ে বললেন, "আমাদেরকে আল্লাহর ওয়াস্তে ইসলামের ভিত্তিতে ভালোবাসবে। কেননা তোমাদের (অতিরঞ্জিত) ভালোবাসা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।" [হুলইয়াতুল আউলিয়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৩৬]
তদ্রূপ খালাফ ইব্ন হাওশাব আলী ইবনুল হুসায়ন সম্পর্কে বলেন, “হে ইরাকবাসিগণ! আমাদের ইসলামের ভিত্তিতে ভালবাসবে। আমাদেরকে আমাদের প্রাপ্য মর্যাদার ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে না।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৩৭]
তিনি আরো বলেছেন, আমরা আহলে বায়তের লোকেরা আমাদের পছন্দনীয় ক্ষেত্রে আল্লাহ্র আনুগত্য করি এবং অপছন্দনীয় বিষয়ে আল্লাহর প্রশংসা করি।
আহলে বায়তের প্রতি জনৈক ব্যক্তি অতিরঞ্জিত ভক্তি প্রকাশের জবাবে হাসান ইব্ন হাসান ইব্ন আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-ও একইভাবে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, "ছি! আমাদেরকে শুধু আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসবে। যদি আমরা আল্লাহর আনুগত্য করি তাহলেই আমাদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করবে। পক্ষান্তরে যদি আল্লাহর নাফরমানি করি তাহলে আমাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে। কেননা আল্লাহ্র আনুগত্য ছাড়া রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর নিকটাত্মীয়তা যদি কারো জন্য উপকারী হতো তাহলে তাঁর মাতা-পিতার জন্যই তা উপকারী হতো। আমাদের সম্পর্কে যা সত্য তাই বলবে। কেননা এটাই তোমাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয় লাভের জন্য অধিক কার্যকর। আর আমরাও তোমাদের প্রতি এতেই সন্তুষ্ট হবো। [ইব্ন আসাকির, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৯]
আরেকবার তিনি তাঁর একদল প্রশংসাকারীকে বলেছিলেন, "ছি! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করি তাহলে এই আনুগত্যের কারণেই শুধু আমাদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করবে। পক্ষান্তরে যদি আমরা আল্লাহর নাফরমানি করি তাহলে এই নাফরমানির কারণে আমাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে।"
মুসলমানদের ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাঁরা সর্বদা অতি যত্নবান ও আন্তরিকভাবে প্রয়াসী ছিলেন। শহীদ যায়দ ইব্ন আলীর জনৈক সহচর আবদুল্লাহ ইব্ন মুসলিম ইব্ন বাবক (বাবকী নামে পরিচিত) বলেন, যায়দ ইব্ন আলী (রা)-এর সঙ্গে আমরা মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। যখন মধ্যরাত হলো এবং সুরাইয়া তারকা স্থির হলো তখন তিনি বললেন, হে বাবকী! এই যে সুরাইয়া তারকা দেখছ, তোমার কি মনে হয় যে, কেউ তার নাগাল পাবে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আমার কামনা এই যে, আমি যদি সুরাইয়ার সাথে ঝুলে থাকতাম আর পৃথিবীতে কিংবা যে কোন স্থানে হোক পড়ে গিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতাম। আর এর বিনিময়ে আল্লাহ্ উম্মতে মুহাম্মদীর মাঝে সমঝোতা সৃষ্টি করে দিতেন তাহলে কতই না ভালো হতো!
📄 তিন খলীফার শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি
ইসলামে তিন খুলাফায়ে রাশেদীনের মহান অবদান ও মুসলিম উম্মাহর ওপর তাদের অপ্রতিশোধ্য ঋণের কথা তাদের জানা ছিলো ও প্রকাশ্য জনসমক্ষে তাঁরা সে কথার সুস্পষ্ট ঘোষণাও দিতেন। ইয়াহয়া ইব্ন সাঈদ বলেন, একদল ইরাকী আলী ইবনুল হুসায়ন (র)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে আবূ বকর, উমর ও উসমান (রা) সম্পর্কে বিরূপ আলোচনা শুরু করলো। যখন তাদের কথা শেষ হলো তখন তিনি তাদেরকে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তোমরা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত নও যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَالَّذِينَ جَاءُو مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْلَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رحيم .
“আর যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের ঐ ভাইদেরকে যারা ঈমানের ক্ষেত্রে আমাদের থেকে অগ্রগামী হয়েছে এবং আমাদের অন্তরে ঐ লোকদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবেন না যারা ঈমান এনেছে। হে আমাদের প্রতিপালক, নিঃসন্দেহে আপনি সদয়, দয়ালু। [সূরা হাশর : ১০]
সুতরাং তোমরা বের হয়ে যাও। আল্লাহ্ তোমাদের অমঙ্গল করুক। ওরওয়া ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র) বলেন, আবু জাফর মুহাম্মদ ইব্ন আলী (রা)-কে আমি তরবারি কারুকার্য খচিত করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, “কোন অসুবিধা নেই। কেননা আবূ বকর সিদ্দীক (রা) তাঁর তরবারি কারুকার্য খচিত করেছেন। আমি বললাম, আপনি সিদ্দীক বলছেন? ওরওয়া বলেন, একথা শোনা মাত্র তিনি লাফ দিয়ে উঠে কেবলামুখী হলেন। অতঃপর বললেন, অবশ্যই সিদ্দীক, তাঁকে যে সিদ্দীক না বলবে আল্লাহ্ যেন দুনিয়া ও আখিরাতে তার কোন কথাকে সত্য বলে গ্রহণ না করেন।"
কুফাবাসী জুফা গোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি, যিনি হযরত জাবির (রা)-এর মাওলা ছিলেন, তিনি বলেন, আবু জাফর মুহাম্মদ ইব্ন আলী আমাকে বিদায় দানকালে বললেন, কুফাবাসীদেরকে জানিয়ে দাও, যারা আবূ বকর ও উমর (রা)-এর সাথে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে আমি তাদের সাথে সম্পর্কহীন। [সাফওয়াতুল সাফওয়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৫]
মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক হতে বর্ণিত। তিনি আবূ জাফর মুহম্মদ ইব্ন আলী হতে বর্ণনা করেন। আবু জাফর মুহাম্মদ ইব্ন আলী (রা) বলেন, যে ব্যক্তি আবূ বকর ও উমর (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অবগত নয় সে মূলত সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞ। [প্রাগুক্ত, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৫]
আবূ খালিদ আল আহমর বলেন, আবদুল্লাহ ইবনুল হাসান (রা)-কে আমি আবূ বকর ও উমর (রা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, আর যারা তাঁদের প্রতি রহমত বর্ষণের দু'আ করে না তাদের প্রতি আল্লাহ্ রহমত বর্ষণ না করুন! অতঃপর তিনি বললেন, আমি এমন কোন লোক দেখিনি, যে আবূ বকর ও উমর (রা)-কে মন্দ বলেছে আর পরবর্তীতে কখনো তাওবার তাওফিক তার হয়েছে। অতঃপর তিনি হযরত উসমান (রা)-এর শাহাদাতের আলোচনা করলেন এবং এত বেশি কাঁদলেন যে, তাঁর দাড়ি ও কাপড় ভিজে গেলো।
📄 অসম সাহস, উচ্চ মনোবল, জিহাদ, সংগ্রামের ধারক ও বাহকগণ
আহলে বায়ত ও শেরে খোদা আলী ইব্ন আবু তালিবের সন্তান ও বংশধরগণ অত্যুচ্চ মনোবল ও অসমসাহসিকতার অধিকারী ছিলেন যা শুরু থেকে নবী পরিবারের বৈশিষ্ট্য এবং আলী মুরতাযা ও শহীদে কারবালা হুসায়ন (রা)-এর ঐতিহ্যগত উত্তরাধিকার ছিলো। সত্যের পথে অবিচল থেকে সকল বিপদ-মুসিবত উপেক্ষা করে এবং কঠিনতর প্রতিকূলতার মুকাবিলা করে মুসলিম উম্মাহকে সঠিক পথে পরিচালিত করার মহান লক্ষ্যে তাঁরা তাঁদের সমগ্র জীবন ও কর্ম পরিচালিত করেছেন।
ইতিপূর্বে আমরা উমাইয়া খলীফা হিশাম ইব্ন আবদুল মালিক ইব্ মারওয়ানের মুকাবিলায় যায়দ ইব্ন আলী ইবন হুসায়নের জিহাদী ভূমিকা ও আব্বাসী খলীফা আল-মানসুরের মুকাবিলায় নাফসে যাকিয়া মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ও তাঁর ভাই ইবরাহীমের মহান সংগ্রামের কথা বর্ণনা করে এসেছি। ইসলামী ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এটাই ছিলো তাঁদের নীতি ও বৈশিষ্ট্য। তাই দেখা যায়, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ঔপনিবেশিক বাহিনী ও দখলদার বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ও সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন আহলে বায়তের কোন-না-কোন মুজাহিদ পুরুষ। তাঁদের ইতিহাস, শৌর্যবীর্য ও সাহসিকতার অকথিত ইতিহাস এবং সুমহান কীর্তি ও কর্মের ইতিহাস যা অজ্ঞতার অন্ধকার বিবর থেকে মুক্তির আশায় আজও অপেক্ষা করছে সেই বিশ্বস্ত ঐতিহাসিকের যিনি পরম ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সাথে তুলে ধরবেন মুসলিম উম্মাহর সামনে কোন একটি গ্রন্থে কিংবা গ্রন্থমালায়।
পক্ষান্তরে আহলে বায়তের এই মহান ইমামগণের যে জীবনচিত্র তাঁদের গুণ ও প্রশস্তি বর্ণনায় লিখিত গ্রন্থগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে তা বিভিন্ন দেশে সক্রিয় বিভিন্ন গুপ্ত সংস্থা ও ফ্রিম্যাশন সংগঠনের উপস্থাপিত জীবনচিত্র থেকে মোটেই ভিন্ন নয় এবং তা অধ্যয়নকারীর অন্তরে ইসলামের প্রসার ও দীনের বিজয় অর্জনের জন্য মৃত্যুভয়হীন সংগ্রাম সাধনার এবং জিহাদ ও কুরবানী, অত্যুচ্চ মনোবল ও প্রেরণা উৎসারিত হয় না, সেই সুমহান প্রেরণা যা বিভিন্ন দুর্যোগপূর্ণ যুগে ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে ইতিহাসের ধারা পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং ঘটনা প্রবাহের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ইসলামের ইতিহাসের সুদীর্ঘ চৌদ্দশ বছরে সময়ের ধারাকে বারবার নতুন দিক গ্রহণে বাধ্য করেছে।
'আলাবী রক্তের' উভয় শাখা তথা হাসান ও হুসায়ন (রা)-এর মাধ্যমে যারা নবী পরিবারভুক্ত হয়েছেন, বহু যুগ পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি এমন সকল অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তাঁদের নিরবচ্ছিন্ন ও অনন্যসাধারণ ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। অসংখ্য মানুষ তাদের দাওয়াতী ত্যাগের বদৌলতে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং এ সকল অঞ্চলে ইসলাম প্রবেশ করার পর ইসলাম-বৃক্ষ তার প্রতিপালকের ইচ্ছায় যুগ যুগ ধরে প্রতিনিয়ত অশেষ সুফল দান করে এসেছে। বড় বহু আলিম ও আধ্যাত্মিক পুরুষ সেখানে জন্মগ্রহণ করেছেন। 'মাসজিদে আকসা' অঞ্চলে বারবার জাতির ক্ষেত্রে ও ভারতীয় উপমহাদেশের কাশ্মীর অঞ্চলে যেমন ঘটেছিলো।¹
তদ্রূপ এটাও ঐতিহাসিক সত্য যে, কাশ্মীর উপত্যকা ইসলামী সভ্যতার প্রবেশ, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনবসতির ইসলাম ধর্ম গ্রহণ (আল্লাহর রহমতে এখনও পর্যন্ত এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রয়েছে), বিভিন্ন শিল্প সাহিত্যের বিকাশ ও প্রথিতযশা বহু আলিম-ওলামার আত্মপ্রকাশ- এসবের জন্য কাশ্মীর উপত্যকা যাঁর নিকট ঋণী, তিনি হলেন মহান দাঈ আমীর সৈয়দ আলী ইন্ন শিহাব আল হামাদানী।²
তদ্রূপ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ দেশগুলোতে ও ভারতীয় দীপপুঞ্জ তথা ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রেও সর্বাধিক অবদান ছিলো সাইয়িদগণের। ফ্যান্ডন ব্যারখ, এলও, এস তার ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, ইসলাম বিস্তারের প্রভাব শক্তি মূলত এসেছে সম্মানীয় সাইয়েদগণের মধ্য থেকে। তাঁদের মাধ্যমেই জাভা ও অন্যান্য এলাকায় শাসকগণের মাঝে ইসলাম প্রসার লাভ করেছে। ১৩৮২ হিজরী আট যিলহজ্জ (মুতাবিক ত্রিশে এপ্রিল ১৯৬২) তারিখে অনুষ্ঠিত পরামর্শ পরিষদের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে, শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী হাযরামাউতের অধিবাসী আলাবী সাইয়েদগণই ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রচার করেছেন।
তদ্রূপ খ্রীস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে আলাবী সাইয়েদগণের একটি জামায়াতের মাধ্যমে ফিলিপাইনের বিভিন্ন দ্বীপে ইসলাম প্রবেশ করেছিলো। এই মহান ব্যক্তিগণ ইসলামী দাওয়াতের পতাকা বহন করে ফিলিপাইনে পৌঁছেছিলো। শুধু তাই নয়, সে দেশের উন্নয়নে ও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অগ্রসরতা অর্জনের ক্ষেত্রেও সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। দ্বীপদেশ চাঁদ, মাদাগাস্কার, মুজাম্বিক, মালয় প্রভৃতি দেশে ইসলামের আত্মপ্রকাশের ইতিহাসও অভিন্ন।
অতি উচ্চ মর্যাদাবান বহু আধ্যাত্মিক পুরুষও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন সাইয়েদগণের মাঝে, যাঁরা তাকওয়া ও সুন্নাতের ইত্তেবা, আত্মপূজা ও প্রবৃত্তিপূজা পরিহার, দুনিয়াবিমুখতা, আখিরাত চিন্তা, দাওয়াত ইলাল্লাহ্র মাধ্যমে উম্মতের আত্মসংশোধন ও তাযকিয়ার মহান সাধনায় ও স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মুজাহাদায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। জ্ঞান সাধনা, আধ্যাত্মিক সাধনা, সমাজ সংস্কার, চরিত্র সংশোধন, দাওয়াত ইলাল্লাহ ইত্যাদি দীনী কর্মকাণ্ডে তাঁরাই ছিলেন প্রাণপুরুষ। তাই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁদের কাছে এসে ভিড় জমাতো। আল্লাহ্ তাঁদেরকে সে গৌরব ও মর্যাদা দান করেছিলেন, দুনিয়ার বাদশাহ ও শাহানশাহদের মর্যাদা-গৌরবও তার সামনে ছিলো নিষ্প্রভ।
এই সংক্ষিপ্ত কলেবরে সকলকে ধারণ করা যেহেতু সম্ভব নয়, সেহেতু ইমাম আবদুল কাদির জিলানী (র)-এর কথা আমরা বিশেষভাবে উল্লেখ করবো। আল্লাহ্র পথে দাওয়াত ও মানব হৃদয় ও আত্মার সংশোধনের ক্ষেত্রে তিনি অতি উচ্চ মকাম ও মরতবা লাভ করেছিলেন। তাঁর হাতে পাঁচ হাজারেরও বেশি ইহুদী ও নাসারা ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং এক লাখেরও বেশি সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারী তাওবা করেছে। [কালায়িদুল জাওয়াহির, পৃষ্ঠা-২২] তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণকারী সাধক পুরুষগণও পূর্ণোদ্যমে দাওয়াত, তারবিয়াত ও তাযকিয়ার মহান কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং আফ্রিকার গভীর অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। ফলে তাঁদের কল্যাণে (আফ্রিকায়) ইসলাম ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিলো।
ভারত উপমহাদেশেও আওলাদে রাসূল ও সাইয়েদগণের মাঝে বহু সাধক পুরুষ ও সংস্কারক বুজুর্গানের আবির্ভাব ঘটেছিলো। মানুষের হৃদয় ও আত্মার সংশোধন ও রূহানী রোগ-ব্যাধির চিকিৎসার মাধ্যমে আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর শরীয়তের সাথে মানুষের সুগভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুমহান দায়িত্ব তাঁরা আঞ্জাম দিয়েছেন।
শায়খ নিযামুদ্দীন মুহাম্মদ ইব্ন আহমদ আল বাদায়ুনী (৬৩৬-৭১৫) [র] মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা ও দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক বর্জন, ইবাদতের পথে পরিচালিত করা ও এর পাশাপাশি যাবতীয় ইলমে জাহিরীতে পারদর্শিতা অর্জন এবং মহত্তম গুণ ও বৈশিষ্ট্য অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রাণপুরুষ।
শায়খ মাহমুদ ইব্ন ইয়াহয়া (ওরফে নাসিরুদ্দীন) আল হুসায়নী একজন বড় মাপের আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ ছিলেন। ৭৭৫ হিজরীতে দিল্লী শহরে তিনি ইন্তিকাল করেছেন এবং সেখানেই সমাধিস্থ হয়েছেন।
শায়খ মুহাম্মদ ইব্ন ইউসুফ ছিলেন বহু শাস্ত্রবিশারদ আলিম ও ফকীহ, বহু কারামাত ও আধ্যাত্মিক উচ্চ মরতবার অধিকারী যাহিদ বুজুর্গ। তিনি ৭২১ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮২৫ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।
ভারতবর্ষের অধিবাসী সাইয়েদগণের আরেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হলেন সৈয়দ শরীফ আল্লামা আশরাফ ইব্ন ইবরাহীম আল হাসানী আল হুসায়নী (ওরফে জাহাঙ্গীর)। তিনি ৮০৮ হিজরীর ২৮ মুহররম ইন্তিকাল করেছেন। [নুজহাতুল খাওয়াতির, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬০-১৬৪]
দাওয়াত ও প্রশিক্ষণের মহান কাজে নিবেদিত সাইয়েদগণের মাঝে আরেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হলেন মহান তত্ত্বজ্ঞানী শায়খ আদম ইব্ন ইসমাঈল আল হুসায়নী আল কাসেমী বিন্নোরী (র)। তিনি ১০৫৩ হিজরীতে মদীনায় ইন্তিকাল করেন। [নুজহাতুল খাওয়াতির, পৃষ্ঠা ১-২]
স্থান ও কালের বহু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখন আমরা এমন এক মহান ব্যক্তির সম্মুখে উপস্থিত, যাঁকে মারিফাতের আলোকপ্রাপ্ত বহু অন্তর্জানী ত্রয়োদশ হিজরী শতাব্দীর মুজাদ্দিদরূপে গণ্য করেছেন। তিনি হলেন মহান দাঈ ইলাল্লাহ, মুজাহিদ ফী সাবীলিল্লাহ ও মুসলিম মিল্লাতের রূহানী মুরুব্বী সৈয়দ ইমাম আহমদ ইব্ন ইরফান শহীদ (র)। ভূপালের নওয়াব আল্লামা সৈয়দ সিদ্দীক হাসান (মৃ. ১৩০৭ হি.) তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, তাঁর সমসাময়িক পৃথিবীর কোন অংশে এমন একজনও মানুষের কথা আমাদের জানা নেই, যিনি তাঁর শান মরতবার সমকক্ষতার দাবিদার হতে পারেন। সৈয়দ আহমদ শহীদ (র)-এর হাতে ৪০ হাজারেরও বেশি অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং ৩০ লাখ মানুষ তাঁর হাতে বায়'আত হয়েছিল।
বিভিন্ন ইসলামী আরব অঞ্চলেও সাইয়েদগণের মাঝে বহু বুযুর্গ ও মরদে মুজাহিদ আত্মপ্রকাশ করেছেন। এখানে বিশেষভাবে আমীর সৈয়দ আবদুল কাদির আল জাযায়েরী ও সাইয়েদ আহমদ শরীফ সনোসী (র)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। আবদুল কাদির আল-জাযায়েরী ১৮৩৯ সনের ২০ নভেম্বর অমুসলিম আগ্রাসী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি ১৮৮৩ খ্রীস্টাব্দে ইন্তিকাল করেন। সাইয়েদ আহমদ শরীফ সনোসী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি তাকওয়া ও ধার্মিকতায় যেখানে ছিলেন অলীশ্রেষ্ঠ, সেখানে সাহাসিকতায়ও ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ। ত্রিপোলী যুদ্ধের বহু লড়াইয়ে তিনি সশরীরে উপস্থিত থাকতেন।
টিকাঃ
১. ঐতিহাসিকভাবে এটা সত্য যে, আফ্রিকায় ইসলামী হকুমতের প্রতিষ্ঠাতা ইদরীস ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইবনুল হাসান (মৃ. ১৭৫ হিজরী)-এর কর্তৃত্ব যখন সুপ্রতিষ্ঠিত হলো এবং তাঁর দাওয়াতী মিশন পরিপূর্ণতা লাভ করলো, তখন তিনি মাগরিব এলাকায় বসবাসকারী বারবারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন, যাদের অধিকাংশই ইহুদী ও খ্রীষ্টধর্মের অনুসারী ছিলো, তখন তারা তাঁর হাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলো।
২. নুযহাতুল খাওয়াতিরের বর্ণনামতে ইনি ছিলেন ইসমাঈল বিন আলী বিন মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসায়ন-এর বংশধর। সাত'শ তিয়াত্তর হিজরীতে (মতান্তরে সাত'শ আশি হিজরীতে) সাত'শ অনুগামীসহ তিনি কাশ্মীরে আগমন করেছিলেন এবং তাঁর হাতে কাশ্মীরের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলো, (২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫)। তিনি সাত'শ ছেয়াশি হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।