📄 কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনার পর হযরত আলী (রা)-এর বংশধরদের জীবন ও কর্ম
ক্ষমতাসীন সরকার ও তার অনুগতদের ললাটে কলঙ্কতিলক অঙ্কন করে কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটলো এবং জীবন ও জীবনধারা পূর্বের অবস্থায় ফিরে এলো। হযরত আলী, হযরত হাসান ও হযরত হুসায়ন (রা)-এর সন্তান-সন্ততিও তাঁদের পূর্বের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেন যার মূল বৈশিষ্ট্য ছিলো পবিত্রতা ও শুচিতা, ইবাদত ও আখিরাত চিন্তায় আত্মনিমগ্নতা ও দুনিয়ার প্রতি মোহহীনতা, সত্যিকার আল্লাহ্-প্রেম ও অধ্যাত্ম সাধনা, আত্মমর্যাদাবোধ ও মহানুভবতা এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা। মোটকথা, যে জীবন ও চরিত্র আওলাদে রাসূলের শান-উপযোগী, নবী-পরিবারের ও নবীর স্থলবর্তীদের অত্যুচ্চ ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ এখানে আমরা মহাসমুদ্রের অথৈ জলরাশি হতে কয়েক ফোঁটা মাত্র পেশ করছি। কেননা নবী-পরিবার হলো ইসলামী চরিত্র ও নৈতিকতার আদর্শ শিক্ষা কেন্দ্র। প্রতিটি যুগের মানুষ এখান থেকেই লাভ করবে মহত্তম চরিত্রের, মানব হিতৈষণা, পরোপকারের ও চিত্ত ঔদার্য তথা মন্দের প্রতিদানে উত্তম আচরণের আদর্শ শিক্ষা।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রা) বলেন, আলী ইবনুল হুসায়নের চেয়ে অধিক আল্লাহভীরু ও ধার্মিক আমি আর কাউকে দেখিনি। [হুলইয়াতুল আউলিয়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪১]
ইমাম যুহরী (র) বলেন, কোন কুরায়শীকে আমি তাঁর চেয়ে উত্তম দেখিনি। আলী ইবনুল হুসায়নের আলোচনা শুরু হলে তিনি কেঁদে ফেলতেন আর বলতেন, তিনি হলেন যায়নুল আবেদীন (ইবাদতগুজারদের ভূষণ)। রাতের অন্ধকারে তিনি রুটির বোঝা পিঠে বহন করে বের হতেন এবং চুপিসারে মদীনার অভাবী লোকদের হাতে তা পৌঁছে দিতেন। জারীর (র) বলেন, রাতের অন্ধকারে গরীব-মিসকীনদের জন্য রুটির বোঝা বহন করার কারণে মৃত্যুর সময় তাঁর পিঠে দাগ দেখা গিয়েছিলো। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৩৬]
হযরত শায়বা (র) বলেন, আলী ইবনুল হুসায়নের মৃত্যুর পর জানা গেল যে, তিনি মদীনার এক ‘শ’ টি পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করতেন। মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক (রা) বলেন, মদীনার বহু পরিবার জীবিকা লাভ করতো। কিন্তু কারো জানা ছিলো না যে, কোথেকে আসছে তাদের জীবিকা। আলী ইবনুল হুসায়নের যখন ইন্তিকাল করলেন তখন রাতের অন্ধকারে আসা তাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে গেলো। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৩৬]
দিনে ও রাতে মিলে প্রতিদিন তিনি এক হাজার রাকাত নফল সালাত আদায় করতেন। ঝড় শুরু হলে আল্লাহর আযাবের ভয়ে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়তেন। [সাফওয়াতুস সাফওয়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬]
আবদুল গাফফার ইব্ন কাসিম (র) বলেন, আলী ইবনুল হুসায়নের মসজিদের বাইরে ছিলেন। এমন সময় একজন লোক তাঁকে দেখতে পেয়ে মন্দ বলল। তাঁর দাস ও মাওয়ালীগণ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ধরতে গেলো। কিন্তু আলী ইবনুল হুসায়নের তাদের শান্ত করে লোকটির দিকে এগিয়ে গেলেন এবং কোমল স্বরে বললেন, তোমার কাছে আমাদের যে সকল অবস্থা গোপন রয়েছে তা আরো অনেক বেশি। যা হোক, বলো, তোমার কোন প্রয়োজন কি আমি পুরা করতে পারি? লোকটি লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেলো। তখন তিনি নিজের গায়ের চাদর তাকে দিয়ে দিলেন এবং এক হাজার দিরহাম প্রদানের নির্দেশ দিলেন। লোকটি এ ঘটনার পর প্রায়ই বলতো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, অবশ্যই আপনি নবীর বংশধর। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫৬]
আলী ইবনুল হুসায়নের নিকট একদল মেহমান ছিলো। এক খাদেমকে তিনি মেহমানদের জন্য তন্দুর থেকে ভুনা গোশত তাড়াতাড়ি আনতে বললেন। গোলাম তা নিয়ে দ্রুত আসছিলো। ফলে গোশত গাঁথার ‘শিক’ তার হাত থেকে ছুটে গিয়ে আলী ইব্ন হুসায়নের একটি শিশুপুত্রের মাথায় গিয়ে পড়লো। ফলে শিশুপুত্রটি মারা গেলো। তখন আলী ইব্ন হুসায়নের গোলামকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তুমি তো ইচ্ছা করে করোনি! যাও, তুমি আযাদ। অতঃপর তিনি শিশু পুত্রটির দাফন-কাফনে মনোযোগী হলেন। [প্রাগুক্ত]
আলী ইব্ন হুসায়নের জন্ম হয়েছিলো ৩৮ হিজরীর কোন এক মাসে। তার মা ছিলেন পারস্যের শেষ সম্রাট ‘ইয়াযদাজারদ’ কন্যা সোলাফা। ৯৪ হিজরীতে তিনি মদীনায় ইন্তিকাল করেন। জান্নাতুল বাকীতে আপন চাচা হাসান ইবন আলী (রা)-এর কবরেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। এই যায়নুল আবেদীন আলী ইবনুল হুসায়নের মাধ্যমেই হযরত হুসায়ন (রা)-এর বংশধারা রক্ষিত হয়েছে।
হযরত যায়নুল আবেদীনের পুত্র মুহম্মদ আল বাকের, তাঁর পুত্র জাফর সাদিক, তাঁর পুত্র মুসা আল কাসিম ও তাঁর পুত্র আলী রেজা এঁরা সকলেই হৃদয় ও আত্মার পবিত্রতায়, চারিত্রিক শুচিতা ও মহত্ত্বে, সহনশীলতা ও মহানুভবতায় আপন মহান পূর্বপুরুষগণের সুযোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন। হযরত আমর ইব্ন আবুল মিকদাম (র) বলেন, আবু জাফর মুহম্মদ-এর দিকে তাকালেই আমার বিশ্বাস হতো যে, অবশ্যই তিনি নবীর বংশধর।
আর মুহাম্মদ-তনয় জাফর ইব্ন সাদিক ইবাদত-বন্দেগীতেই বেশির ভাগ সময় কাটাতেন। নেতৃত্ব ও জনসমাগমের পরিবর্তে নির্জনবাসকেই তিনি অগ্রাধিকার প্রদান করেছিলেন। ইমাম মালিক (র) তাঁর সম্পর্কে বলেন, আমি জাফর ইব্ন মুহাম্মদ-এর খিদমতে যাতায়াত করতাম। তিনি সদা 'স্মিতমুখ' ছিলেন। তাঁর সামনে যখন নবী ﷺ -এর আলোচনা হতো তখন ফ্যাকাসে ও বিবর্ণ হয়ে যেতেন। দীর্ঘদিন আমি তাঁর কাছে আসা-যাওয়া করেছি কিন্তু তিন অবস্থার কোন একটির বাইরে তাঁকে আমি দেখিনি। হয় তিনি সালাত আদায় করছেন কিংবা রোযা রেখেছেন কিংবা কুরআন তিলাওয়াত করছেন। কখনো তাঁকে অযু অবস্থা ছাড়া নবী ﷺ -এর আলোচনা করতে শুনিনি। অনর্থক কোন কথা তিনি বলতেন না। আল্লাহর ভয়ে ম্রিয়মাণ যাঁরা, তিনি ছিলেন সেই সকল ইবাদাতগুজার ও যাহিদের অন্যতম। [আল-ইমাম আস-সাদিক, ইমাম আবূ প্রণীত, পৃষ্ঠা-৭৭]
মুসা ইব্ন জাফর ইবন মুহাম্মদ ইব্ন আলী (মুসা আল কাসিম) ছিলেন অতি সহনশীল ও মহানুভব যখন কারো সম্পর্কে তিনি তাঁকে কষ্ট দেয়ার খবর পেতেন তখন তার নামে কিছু অর্থ উপহার পাঠিয়ে দিতেন। [সাফওয়াতুস সাফওয়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৩] এমনকি এক হাজার দিনারে পূর্ণ থলেও পাঠিয়ে দিতেন কখনো কখনো। এছাড়া তিন'শ, চার 'শ ও দু'শ দিনারের থলে তৈরি করে মদীনার মানুষের মাঝে তা বণ্টন করতেন।
খলীফা আল মামুন আবুল হাসান আলী রেযা ইন্ন মূসা আল কাযিম ইন্ন জাফর সাদিক (র)-কে তাঁর পরবর্তী খলীফা মনোনীত করেছিলেন। ১৫৩ হিজরীর কোন এক মাসে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ২০০ হিজরীর সফর মাসের শেষ তারিখে ইন্তিকাল করেছিলেন। খলীফা আল মামুন নিজে তাঁর জানাযা পড়িয়েছিলেন এবং তাঁর পিতা হারুন রশীদের কবরের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করেছিলেন।
হযরত হাসান ইব্ন আলী (রা)-এর বংশধরগণও অভিন্ন ঐতিহ্য, গুণ ও বৈশিষ্ট্যের ধারক ছিলেন। আল্লামা ইব্ন আসাকির (র) হাসান ইব্ন হাসান ইব্ন আলী (হাসান আল মুসান্না নামে পরিচিত)-এর পরিচিতি পেশ করেছেন এবং এমন সকল গুণ ও কীর্তি উল্লেখ করেছেন যা তাঁর বিশেষ মর্যাদা, আভিজাত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করে। তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইব্ন হাসান ইব্ন হাসান ইব্ন আলী ইব্ন আবূ তালিব ছিলেন মদীনার বিশিষ্ট তাবেঈ ও মুহাদ্দিসগণের অন্যতম। ওয়াকিদী (র) বলেন, আবদুল্লাহ ছিলেন বিশিষ্ট ইবাদতগুজারদের একজন। বিশেষ সম্মান, প্রতিপত্তি, 'ক্ষুরধার' ভাষা ও বাগ্মিতার অধিকারী ছিলেন। মুসআব ইব্ন আবদুল্লাহ (র) বলতেন, আমাদের কোন আলিমকে আমি আবদুল্লাহ ইবনুল হাসানের মতো সম্মান আর কাউকে করতে দেখিনি।
হযরত রাবী'আ, যিনি আবদুল্লাহ (র)-এর কথা ও বাণী শ্রবণ করেছেন, তিনি বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, এগুলো নবীগণের বংশধরদের উপযুক্ত কালাম ও বাণী। মক্কায় এক জামা'আতের মাঝে মুহাদ্দিস হযরত আইয়ুব বসা ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁকে পেছন থেকে সালাম দিলেন। আর তিনি সম্পূর্ণরূপে তাঁর দিকে ঘুরে গিয়ে নিম্নস্বরে সালামের জাওয়াব দিলেন। অতঃপর তিনি পূর্বের ন্যায় ফিরে বসলেন। তাঁর দু'চোখ তখন অশ্রুপূর্ণ হয়ে পড়েছিলো। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি হলেন নবীর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনুল হাসান। [তারীখে ইব্ন আসাকির, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৭-৩৬৬]
ইব্ন কাছীর (র) বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্ন হাসান ইব্ন হাসান ইব্ন আলী ইব্ন আবূ তালিব আলিমগণের নিকট অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন এবং অতি উচ্চ মার্গের ইবাদাতগুজার ব্যক্তি ছিলেন। হযরত ইয়াহয়া ইব্ন মুঈন (র) বলেন, তিনি সত্যবাদী ও আস্থাভাজন আলিম ছিলেন। ছুফয়ান সাওরী, ছারাওয়ারদী, মালিকসহ মুহাদ্দিসগণের এক জামা'আত তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ১৪৫ হিজরীতে তিনি ইন্তিকাল করেন।
তাঁর পুত্র মুহাম্মদ যিনি মদীনায় বিদ্রোহ করে জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন, তিনি উচ্চ মনোবল, অকুতোভয় ব্যক্তিত্ব, অতুলনীয় সাহস ও শৌর্যবীর্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত বলবান ছিলেন। নফল নামায ও রোযায় অধিক অগ্রণী ছিলেন। আল-মাহদী (হিদায়াতপ্রাপ্ত) নাফসে যাকিয়্যা (পবিত্রা) ছিলো তাঁর উপাধি। [তারীখে কামিল, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৫৩] মহত্ত্ব, মহানুভবতা, সদয়ভাব ও নিজে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে রক্ষা করার মহানুভবতা- এ জাতীয় বহু উচ্চ গুণের পূর্ণ প্রকাশ ঘটে ছিলো তাঁর মাঝে, যা আহলে বায়ত ও হাশেমীগণের সর্বকালীন বৈশিষ্ট্য। একটি মাত্র উদাহরণ দেখুন। মদীনায় খলীফা আলমানসুরের বাহিনীর সাথে যখন তাঁর ঘোরতর যুদ্ধ হলো এবং মুহাম্মদ নিশ্চিত হলেন যে, তিনি নিহত হতে চলেছেন তখন তিনি যে রেজিস্টারে তাঁর হাতে বায়'আতকারীদের নাম লিপিবদ্ধ ছিলো তা জ্বালিয়ে ফেললেন যাতে তাঁকে সমর্থনের অপরাধে তারা কোন রকম প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার শিকার না হয়।
📄 নবী-বংশ পরিচয়ের প্রতি ঈর্ষা
যে পবিত্র রক্ত-সম্পর্ক তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর সঙ্গে সম্পৃক্তির সৌভাগ্য দান করেছিলো, সে সম্পর্কের শুচিতা ও পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁরা অত্যন্ত সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এ মহান সম্পর্ক-সূত্রকে তুচ্ছ পার্থিব স্বার্থে কখনোই তাঁরা ব্যবহার করেন নি অন্যান্য জাতি ও ধর্মের আধ্যাত্মিক পুরুষ ও ধর্ম-নেতাদের পরিবার ও বংশধরদের বেলায় যেমন হয়ে থাকে। সর্বাবস্থায় তাঁরা অতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় পবিত্রতা ভোগ করে থাকে এবং তাদের অনুসারীরা তাদের সাথে অতিমানবীয় ব্যক্তিত্বের ন্যায় আচরণ করে থাকে। কিন্তু নবী-পরিবারের বংশধররা কখনো দুনিয়ার উচ্ছিষ্ট ভোজনের জন্য তাঁদের পূর্বপুরুষদের নাম ব্যবহার করেন নি এবং তাঁদের মৃত্তিকামিশ্রিত অস্থিকংকালের ওপর গৌরবের প্রাসাদ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন নি। ইতিহাস ও জীবনচরিত বিষয়ক গ্রন্থগুলোতে তাঁদের আত্মসম্মানবোধের যে সকল চমকপ্রদ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তা অন্যান্য জাতি ও ধর্মের পেশাদার আধ্যাত্মিক শ্রেণীর সম্পূর্ণ বিপরীত এক জীবনচিত্র পেশ করে, যেখানে অতি পবিত্রতা আরোপ কিংবা আলাদা সুবিধা ভোগের কোন অবকাশ নেই।
পক্ষান্তরে ব্রাহ্মণ ও যাজকশ্রেণী জন্মসূত্রে একটি ধর্মীয় পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা ভোগ করে থাকে। ফলে জীবিকা ও জীবনের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য তাদের কোন পরিশ্রম করতে হয় না। কপালের এক ফোঁটা ঘামও ঝরাতে হয় না।
হাসান ইব্ন আলী (রা) একবার কোন প্রয়োজনে বাজারে গেলেন এবং এক দোকানদারকে একটি পণ্যের দাম জিজ্ঞেস করলেন। দোকানদার সাধারণ দাম বললো। অতঃপর যখন জানতে পারলো যে, ইনি রাসূলুল্লাহ্-এর দৌহিত্র তখন তাঁর সম্মানার্থে হ্রাসকৃত মূল্য বললো। কিন্তু হাসান ইব্ন আলী (রা) তা গ্রহণ করলেন না, বরং জিনিস না কিনেই চলে এলেন। তিনি বললেন, তুচ্ছ একটি বিষয়ে আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক থেকে ফায়দা ওঠাতে রাজি নই।
যায়নুল আবেদীন আলী ইবনুল হুসায়ন (র)-এর বিশিষ্টতম খাদেম জুয়াইরিয়া বিন আসমা (র) বলেন, আলী ইব্ন হুসায়ন (র) রাসূলুল্লাহ্ এর আত্মীয়তার সুবাদে একটি দিরহামও কখনো অতিরিক্ত গ্রহণ করেন নি। সফরের সময় তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতেন। এ সম্পর্কে একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, সাধারণ পরিচয়ে যা আমাকে দেয়া হবে না তা রাসূলুল্লাহ্-এর পরিচয়ের সুবাদে গ্রহণ করা আমার অপছন্দ।
আবুল হাসান আলী রেযা ইব্ন মূসা আল কাযিম সম্পর্কেও বর্ণিত আছে যে, সফরের সময় নিজের পরিচয় তিনি গোপন রাখতেন। এ সম্পর্কে একবার জিজ্ঞেস করা হলে তিনিও একই উত্তর দিলেন। বললেন, সাধারণ পরিচয়ে যা আমাকে দেয়া হবে না, তা রাসূলুল্লাহ্-এর পরিচয়ের সুবাদে গ্রহণ করা আমার অপছন্দ। [ইব্ন খাল্লিকানকৃত ওফায়াতুল আইয়ান, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৩৪]
📄 অতিভক্তি ও অতি প্রশংসার প্রতি অসন্তুষ্টি
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর সাথে রক্ত-সম্পর্কের বিষয়ে তাঁরা খুবই সংযমী ও সতর্ক ছিলেন। এ ক্ষেত্রে ইহুদী, খ্রীস্টান ও ব্রাহ্মণ ধর্মের (হিন্দু ধর্ম) কট্টর গোড়া অনুসারীদের ন্যায় তাঁদের প্রতি ভক্তি-ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রেও মানুষ অতিরঞ্জনের আশ্রয় গ্রহণ করবে, এটা তাঁরা মোটেই পছন্দ করতেন না।
ইয়াহয়া ইবন সাঈদ (রা) বলেন, একদল লোক আলী ইবনুল হুসায়নের পাশে জড়ো হয়ে অতিরঞ্জিত ভক্তিমূলক কিছু কথা বললো। তখন তিনি তাদেরকে উপদেশ দিয়ে বললেন, "আমাদেরকে আল্লাহর ওয়াস্তে ইসলামের ভিত্তিতে ভালোবাসবে। কেননা তোমাদের (অতিরঞ্জিত) ভালোবাসা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।" [হুলইয়াতুল আউলিয়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৩৬]
তদ্রূপ খালাফ ইব্ন হাওশাব আলী ইবনুল হুসায়ন সম্পর্কে বলেন, “হে ইরাকবাসিগণ! আমাদের ইসলামের ভিত্তিতে ভালবাসবে। আমাদেরকে আমাদের প্রাপ্য মর্যাদার ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে না।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৩৭]
তিনি আরো বলেছেন, আমরা আহলে বায়তের লোকেরা আমাদের পছন্দনীয় ক্ষেত্রে আল্লাহ্র আনুগত্য করি এবং অপছন্দনীয় বিষয়ে আল্লাহর প্রশংসা করি।
আহলে বায়তের প্রতি জনৈক ব্যক্তি অতিরঞ্জিত ভক্তি প্রকাশের জবাবে হাসান ইব্ন হাসান ইব্ন আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-ও একইভাবে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, "ছি! আমাদেরকে শুধু আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসবে। যদি আমরা আল্লাহর আনুগত্য করি তাহলেই আমাদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করবে। পক্ষান্তরে যদি আল্লাহর নাফরমানি করি তাহলে আমাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে। কেননা আল্লাহ্র আনুগত্য ছাড়া রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর নিকটাত্মীয়তা যদি কারো জন্য উপকারী হতো তাহলে তাঁর মাতা-পিতার জন্যই তা উপকারী হতো। আমাদের সম্পর্কে যা সত্য তাই বলবে। কেননা এটাই তোমাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয় লাভের জন্য অধিক কার্যকর। আর আমরাও তোমাদের প্রতি এতেই সন্তুষ্ট হবো। [ইব্ন আসাকির, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৯]
আরেকবার তিনি তাঁর একদল প্রশংসাকারীকে বলেছিলেন, "ছি! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করি তাহলে এই আনুগত্যের কারণেই শুধু আমাদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করবে। পক্ষান্তরে যদি আমরা আল্লাহর নাফরমানি করি তাহলে এই নাফরমানির কারণে আমাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে।"
মুসলমানদের ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাঁরা সর্বদা অতি যত্নবান ও আন্তরিকভাবে প্রয়াসী ছিলেন। শহীদ যায়দ ইব্ন আলীর জনৈক সহচর আবদুল্লাহ ইব্ন মুসলিম ইব্ন বাবক (বাবকী নামে পরিচিত) বলেন, যায়দ ইব্ন আলী (রা)-এর সঙ্গে আমরা মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। যখন মধ্যরাত হলো এবং সুরাইয়া তারকা স্থির হলো তখন তিনি বললেন, হে বাবকী! এই যে সুরাইয়া তারকা দেখছ, তোমার কি মনে হয় যে, কেউ তার নাগাল পাবে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আমার কামনা এই যে, আমি যদি সুরাইয়ার সাথে ঝুলে থাকতাম আর পৃথিবীতে কিংবা যে কোন স্থানে হোক পড়ে গিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতাম। আর এর বিনিময়ে আল্লাহ্ উম্মতে মুহাম্মদীর মাঝে সমঝোতা সৃষ্টি করে দিতেন তাহলে কতই না ভালো হতো!
📄 তিন খলীফার শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি
ইসলামে তিন খুলাফায়ে রাশেদীনের মহান অবদান ও মুসলিম উম্মাহর ওপর তাদের অপ্রতিশোধ্য ঋণের কথা তাদের জানা ছিলো ও প্রকাশ্য জনসমক্ষে তাঁরা সে কথার সুস্পষ্ট ঘোষণাও দিতেন। ইয়াহয়া ইব্ন সাঈদ বলেন, একদল ইরাকী আলী ইবনুল হুসায়ন (র)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে আবূ বকর, উমর ও উসমান (রা) সম্পর্কে বিরূপ আলোচনা শুরু করলো। যখন তাদের কথা শেষ হলো তখন তিনি তাদেরকে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তোমরা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত নও যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَالَّذِينَ جَاءُو مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْلَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رحيم .
“আর যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের ঐ ভাইদেরকে যারা ঈমানের ক্ষেত্রে আমাদের থেকে অগ্রগামী হয়েছে এবং আমাদের অন্তরে ঐ লোকদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবেন না যারা ঈমান এনেছে। হে আমাদের প্রতিপালক, নিঃসন্দেহে আপনি সদয়, দয়ালু। [সূরা হাশর : ১০]
সুতরাং তোমরা বের হয়ে যাও। আল্লাহ্ তোমাদের অমঙ্গল করুক। ওরওয়া ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র) বলেন, আবু জাফর মুহাম্মদ ইব্ন আলী (রা)-কে আমি তরবারি কারুকার্য খচিত করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, “কোন অসুবিধা নেই। কেননা আবূ বকর সিদ্দীক (রা) তাঁর তরবারি কারুকার্য খচিত করেছেন। আমি বললাম, আপনি সিদ্দীক বলছেন? ওরওয়া বলেন, একথা শোনা মাত্র তিনি লাফ দিয়ে উঠে কেবলামুখী হলেন। অতঃপর বললেন, অবশ্যই সিদ্দীক, তাঁকে যে সিদ্দীক না বলবে আল্লাহ্ যেন দুনিয়া ও আখিরাতে তার কোন কথাকে সত্য বলে গ্রহণ না করেন।"
কুফাবাসী জুফা গোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি, যিনি হযরত জাবির (রা)-এর মাওলা ছিলেন, তিনি বলেন, আবু জাফর মুহাম্মদ ইব্ন আলী আমাকে বিদায় দানকালে বললেন, কুফাবাসীদেরকে জানিয়ে দাও, যারা আবূ বকর ও উমর (রা)-এর সাথে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে আমি তাদের সাথে সম্পর্কহীন। [সাফওয়াতুল সাফওয়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৫]
মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক হতে বর্ণিত। তিনি আবূ জাফর মুহম্মদ ইব্ন আলী হতে বর্ণনা করেন। আবু জাফর মুহাম্মদ ইব্ন আলী (রা) বলেন, যে ব্যক্তি আবূ বকর ও উমর (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অবগত নয় সে মূলত সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞ। [প্রাগুক্ত, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৫]
আবূ খালিদ আল আহমর বলেন, আবদুল্লাহ ইবনুল হাসান (রা)-কে আমি আবূ বকর ও উমর (রা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, আর যারা তাঁদের প্রতি রহমত বর্ষণের দু'আ করে না তাদের প্রতি আল্লাহ্ রহমত বর্ষণ না করুন! অতঃপর তিনি বললেন, আমি এমন কোন লোক দেখিনি, যে আবূ বকর ও উমর (রা)-কে মন্দ বলেছে আর পরবর্তীতে কখনো তাওবার তাওফিক তার হয়েছে। অতঃপর তিনি হযরত উসমান (রা)-এর শাহাদাতের আলোচনা করলেন এবং এত বেশি কাঁদলেন যে, তাঁর দাড়ি ও কাপড় ভিজে গেলো।