📄 পরিস্থিতির পরিবর্তন, সৎ শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও তার সুফল
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, খুলাফায়ে রাশেদীনের পর খিলাফত নামক প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণরূপে বংশীয় ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার অনুগত হয়ে পড়েছিলো , এবং আরব ও মুসলিম জাতি তা মেনেও নিয়েছিলো । ফলে যে কারো পক্ষে উমাইয়া কিংবা আব্বাসী খলীফার মুকাবিলায় দাঁড়ানো এবং সফলভাবে সংগ্রাম পরিচালনা করা সম্ভব ছিলো না । এজন্য প্রয়োজন ছিলো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে এমন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের যিনি ঈমান , আমল , ইখলাস , তাকওয়া ও চারিত্রিক মহত্ত্বে হবেন মুসলিম উম্মাহর সর্বজনশ্রদ্ধেয় । তদুপরি খান্দানী আভিজাত্যেও উচ্চ বংশ মর্যাদার পাশাপাশি তিনি হবেন বিরাট লোকবলের অধিকারী যাতে অস্ত্র দিয়ে অস্ত্রের মুকাবিলা করা যায় এবং বাতাসের মুকাবিলায় ঝড়-ঝঞ্ঝা সৃষ্টি করা যায় ।
এ কারনেই দেখা যায়, উমাইয়া ও আব্বাসী সালতানাতের বিরুদ্ধে যারাই বিদ্রোহ করেছেন এবং জিহাদের ঝাণ্ডা বুলন্দ করেছেন তাঁরা সকলেই ছিলেন নবী-পরিবার ও আলী-পরিবারের সদস্য । কেননা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে তাঁদের প্রতি অখণ্ড ভক্তি-শ্রদ্ধা ও প্রভাব বিদ্যমান থাকার কারণে তাঁদের নেতৃত্বে জিহাদি আন্দোলনের সফলতার সম্ভাবনা ছিলো অধিকতর উজ্জ্বল । বলা বাহুল্য, এই নেতৃপুরুষগণ যখনই জিহাদের ডাক দিয়েছেন সমকালীন অলী-বুজুর্গ তথা সংশোধনকামী নেককার ও পুণ্যবান লোকদের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেছেন । যারা চারিত্রিক অধঃপতন খিলাফতের ভাবমূর্তির বিনষ্টতা , বল্গাহীন ভোগ-বিলাস ও জাহিলিয়াতের আচার-প্রবৃত্তির চাহিদা চরিতার্থ করার পেছনে মুসলমানদের সম্পদের সীমাহীন অপচয় হতে দেখে অন্তর্জালা অনুভব করতেন ।
হুসায়ন ইব্ন আলী (রা)-এর পর তাঁর পৌত্র যায়দ ইব্ন আলী ইব্ন হুসায়ন খিলাফতের মূল চরিত্র ও সঠিক ভাব-মর্যাদা পুনরুদ্ধারে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন । উমাইয়া খলীফা হিশাম ইব্ন আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অপরাধে ১২১ হিজরীতে শূলে চড়িয়ে তাঁকে হত্যা করা হয় । ইমাম আবূ হানীফা (র) তাঁর খিদমতে দশ হাজার দিরহাম হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন এবং ব্যস্ততার কারণে তাঁর সশরীরে উপস্থিত হতে না পারার ওযর পেশ করেছিলেন । [মানাকিবে আবূ হানীফা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৫]
অতঃপর হাসান ইব্ন আলী (রা)-এর বংশধরদের মাঝে নাফসে যাকিয়্যা (পুণ্যাত্মা) নামে সুপরিচিত মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন হাসান ইবন হাসান মদীনায় ও তার ভাই ইবরাহীম কুফায় উভয়ের মাঝে পূর্ব যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে জিহাদের ঝাণ্ডা উত্তোলন করেন ।
ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক (র) নাফসে যাকিয়্যার প্রধান সমর্থক ছিলেন । আবূ হানীফা (র) তো তাঁকে প্রকাশ্যে আর্থিক সহযোগিতা দান করেছিলেন এবং খলীফা আল-মানসুরের সেনাপতি হাসান ইব্ন কাহতাবাকে নাফসে যাকিয়্যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে নিষেধ করেছিলেন যার ফলে সেনাপতি হাসান ইব্ন কাহতাবা খলীফা আল-মানসুরকে অভিযান পরিচালনায় তাঁর অপারকতার কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন । ইমাম আবু হানীফা (র) ও খলীফা মানসুরের মাঝে যা কিছু ঘটে ছিলো এবং যা কারাগারে ইমামের মৃত্যু ডেকে এনে ছিলো তার মূল কারণ ছিলো এটাই ।
ইবনুল আসীরকৃত 'তারিখে কামিল' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, মদীনাবাসিগণ ইমাম মালিক (র)-এর নিকট মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ সঙ্গে যোগদানের ব্যাপারে ফতোয়া জিজ্ঞেস করে বলেছিলো, আমাদের ঘাড়ে তো আবু জাফর আল-মনসুরের বায়'আত রয়েছে । এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, বল প্রয়োগের মাধ্যমে অপারক অবস্থায় তোমরা বায়'আত হয়েছো , আর অক্ষম ব্যক্তির জিম্মায় কোন দায়বদ্ধতা নেই ।
এ ফতোয়ার পর মানুষ দলে দলে মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে আর ইমাম মালিক (র) ঘরে আবদ্ধ হয়ে পড়েন । মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহকে ১৪৫ হিজরীর রমযান মাসে মদীনায় হত্যা করা হয়েছিলো । পক্ষান্তরে তার ভাই ইবরাহীমকে হত্যা করা হয়েছিলো একই বছর যিলকদ মাসে ।
স্বাভাবিক কারণেই এ সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো । ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হয়নি । কেননা সরকার ও প্রশাসন ছিলো সুসংহত এবং লোকবল ও অর্থবলসহ যাবতীয় উপায়-উপকরণ ছিলো তার দখলে । ফলে তার বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন প্রচেষ্টাই মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি । বিগত ও সাম্প্রতিক ইতিহাসের এমন বহু আন্দোলন প্রচেষ্টার কথাই আমরা জানি যা ঈমান , ইখলাস , বীরত্ব ও সাহসিকতার ভিত্তিতে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং আন্দোলনের নেতৃবর্গ ও তাঁদের অনুসারীরা জানমালের কুরবানী পেশ করতেও কখনো পিছপা হন নি ।
কিন্তু তা সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, সুসংহত সরকার ও তার শক্তিশালী সেনাবাহিনীর মুকাবিলায় নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বকে পরাজয় স্বীকার করে নিতে হয়েছে । ইতিহাসের এটা অভাবিতপূর্ব কোন ঘটনা নয় এবং বিশ্বজগতের চিরন্তন নিয়মেরও বিরোধী নয় ; তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, রাজনীতির ময়দানে ও স্থূল ফলাফলের দিক থেকে এ সকল আন্দোলন ও জিহাদী প্রচেষ্টা দৃশ্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলেও তা ইসলামের অতি বিরাট খিদমত আঞ্জাম দিয়েছে । কেননা এগুলোই ইসলামী ইতিহাসের মর্যাদা ও ভাবমর্যাদা রক্ষা করেছে ।
যদি যুগে যুগে এ সকল সংগ্রামী চেতনা ও জিহাদী স্পৃহার প্রকাশ না ঘটতো এবং খিলাফত আলা মিনহাজিন-নবুয়ত প্রতিষ্ঠার প্রয়াস-প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকতো তাহলে গোটা ইসলামী ইতিহাস হয়ে পড়ত স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশাহদের স্বেচ্ছাচারিতার ও ভাগ্যান্বেষীদের রাজনৈতিক লীলাখেলার নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস । কিন্তু আল্লাহ্র প্রতি ঈমানের বলে বলীয়ান এই মর্দে মুজাহিদগণ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ইতিহাসের সুদূর অন্ধকার পথে আলোর মিনার প্রজ্বলিত করে গিয়েছেন , যাতে সেই আলোর ইশারায় যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহ পথের দিশা পেতে পারে এবং ঘুণে-ধরা সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ও ইসলামী শাসন ব্যবস্থার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করার জযবা ও অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারে এবং বাতিলের বিরুদ্ধে ইসলামী যুগের সেই মহান শৌর্যবীর্যের প্রকাশ ঘটাতে পারে ।
এ এমন সুমহান ঐতিহ্য যা নিয়ে ইসলাম গর্ব করতে পারে এবং এমন মহামূল্যবান সম্পদ যা যুগ যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুসলিম উম্মাহ কাজে লাগাতে পারে । এ হলো ইসলামী জিহাদের সেই পবিত্র ধারাবাহিকতা যা উম্মাহর হৃদয়ে ঈমান ও বিশ্বাস , আস্থা ও ভরসা এবং আশা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি করে ।
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مِّنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُم مِّن يُنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا .
"মু'মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহ্র সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে । তারা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি ।" [সূরা আহযাব : ২৩]