📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 ইয়াযীদের দরবারে

📄 ইয়াযীদের দরবারে


হিশাম বলেন, হযরত হুসায়ন (রা)-এর ছিন্ন মস্তক যখন হাযির করা হলো তখন ইয়াযীদ ইব্‌ন মু'আবিয়ার দু' চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিলো । সে বলেছিলো, হুসায়নকে হত্যা করা ছাড়াও তোমাদের আনুগত্যে আমি সন্তুষ্ট হতাম । ইব্‌ন সুমাইয়ার (ওবায়দুল্লাহ ইব্‌ন যিয়াদের) প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক , আল্লাহর শপথ , যদি ইনি আমার সম্মুখে উপস্থিত হতেন তাহলে তাঁকে আমি ক্ষমা করে দিতাম । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৯১]
মু'আবিয়া ইব্‌ন আবূ সুফিয়ানের জনৈক মুক্ত দাস বর্ণনা করেন , ইয়াযীদের সামনে যখন হুসায়ন (রা)-এর ছিন্ন মস্তক রাখা হলো তখন তাকে আমি কাঁদতে দেখেছি এবং বলতে শুনেছি, ইব্‌ন যিয়াদ ও হুসায়নের মাঝে যদি রক্ত সম্পর্ক থাকতো তাহলে সে এটা করতে পারতো না । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৭১]
বন্দীদেরকে যখন ইয়াযীদের সামনে উপস্থিত করা হলো তখন প্রথমে সে তাঁদের প্রতি রুক্ষ আচরণ করলো । পরে আবার কোমল আচরণ প্রদর্শন করে তাঁদের নিজ হারেমে পাঠিয়ে দিলো । অতঃপর তাদেরকে সসম্মানে মদীনা শরীফে পাঠিয়ে দিলো ।
ইতিহাসে এমন কোন তথ্য বর্ণিত হয়নি যাতে প্রমাণিত হয় যে, ইব্‌ন যিয়াদকে সে কৃতকর্মের কারণে বরখাস্ত করেছিলো বা কোন সাজা দিয়ে ছিলো কিংবা অন্তত কোন্ রকম তিরস্কার করেছিলো । পক্ষান্তরে আনন্দ-উল্লাস প্রকাশের এমন কিছুও বর্ণনা এসেছে যা কোন মুসলমানের পক্ষে শোভনীয় নয় ।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হাররার মর্মন্তুদ ঘটনা ও ইয়াযীদের মৃত্যু

📄 হাররার মর্মন্তুদ ঘটনা ও ইয়াযীদের মৃত্যু


৬৩ হিজরীতে সংঘটিত হাররার মর্মন্তুদ ঘটনা ইসলামের প্রথম যুগের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসের ললাটে এক কলংকতিলক হয়ে থাকবে । ইয়াযীদ মুসলিম ইব্‌ন ওকবাকে মদীনায় তিন দিনব্যাপী নৈরাজ্য চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলো । আল্লামা ইবন কাসীর (র) বলেন, এই তিন দিনে মদীনায় যে ভয়ঙ্কর ফিতনা- ফাসাদ ও ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়েছে তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয় । ইয়াযীদ এভাবে চেয়ে ছিলো তার রাজত্বের বুনিয়াদ মজবুত করতে এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক শাসন ক্ষমতাকে স্থায়িত্ব দান করতে কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর ইচ্ছার বিপরীত ঘটিয়ে তাকে শায়েস্তা করলেন । ফলে মৃত্যু এসে তার স্বপ্নসাধের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২২২]
রাজত্ব ভোগ করার জন্য ইয়াযীদ চার বছরের বেশি বেঁচে ছিলো না । ৬৪ হিজরীর ১৪ রবিউল আউয়াল সে মৃত্যুমুখে পতিত হয় । তার মৃত্যুর মাধ্যমেই আবু সুফিয়ানের পরিবারের খিলাফতের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং মারওয়ান ইবনুল হাকাম পরিবারে স্থানান্তরিত হয় । আব্বাসীদের হাতে উমাইয়া রাজত্বের পতন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে । সর্বরাজত্বের একচ্ছত্র মালিক হলেন আল্লাহ্ , যাকে ইচ্ছা তিনি রাজত্ব দান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন । যাকে ইচ্ছা মর্যাদা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপদস্থ করেন ।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 পরিস্থিতির পরিবর্তন, সৎ শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও তার সুফল

📄 পরিস্থিতির পরিবর্তন, সৎ শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও তার সুফল


দুঃখজনক হলেও সত্য যে, খুলাফায়ে রাশেদীনের পর খিলাফত নামক প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণরূপে বংশীয় ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার অনুগত হয়ে পড়েছিলো , এবং আরব ও মুসলিম জাতি তা মেনেও নিয়েছিলো । ফলে যে কারো পক্ষে উমাইয়া কিংবা আব্বাসী খলীফার মুকাবিলায় দাঁড়ানো এবং সফলভাবে সংগ্রাম পরিচালনা করা সম্ভব ছিলো না । এজন্য প্রয়োজন ছিলো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে এমন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের যিনি ঈমান , আমল , ইখলাস , তাকওয়া ও চারিত্রিক মহত্ত্বে হবেন মুসলিম উম্মাহর সর্বজনশ্রদ্ধেয় । তদুপরি খান্দানী আভিজাত্যেও উচ্চ বংশ মর্যাদার পাশাপাশি তিনি হবেন বিরাট লোকবলের অধিকারী যাতে অস্ত্র দিয়ে অস্ত্রের মুকাবিলা করা যায় এবং বাতাসের মুকাবিলায় ঝড়-ঝঞ্ঝা সৃষ্টি করা যায় ।
এ কারনেই দেখা যায়, উমাইয়া ও আব্বাসী সালতানাতের বিরুদ্ধে যারাই বিদ্রোহ করেছেন এবং জিহাদের ঝাণ্ডা বুলন্দ করেছেন তাঁরা সকলেই ছিলেন নবী-পরিবার ও আলী-পরিবারের সদস্য । কেননা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে তাঁদের প্রতি অখণ্ড ভক্তি-শ্রদ্ধা ও প্রভাব বিদ্যমান থাকার কারণে তাঁদের নেতৃত্বে জিহাদি আন্দোলনের সফলতার সম্ভাবনা ছিলো অধিকতর উজ্জ্বল । বলা বাহুল্য, এই নেতৃপুরুষগণ যখনই জিহাদের ডাক দিয়েছেন সমকালীন অলী-বুজুর্গ তথা সংশোধনকামী নেককার ও পুণ্যবান লোকদের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেছেন । যারা চারিত্রিক অধঃপতন খিলাফতের ভাবমূর্তির বিনষ্টতা , বল্গাহীন ভোগ-বিলাস ও জাহিলিয়াতের আচার-প্রবৃত্তির চাহিদা চরিতার্থ করার পেছনে মুসলমানদের সম্পদের সীমাহীন অপচয় হতে দেখে অন্তর্জালা অনুভব করতেন ।
হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা)-এর পর তাঁর পৌত্র যায়দ ইব্‌ন আলী ইব্‌ন হুসায়ন খিলাফতের মূল চরিত্র ও সঠিক ভাব-মর্যাদা পুনরুদ্ধারে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন । উমাইয়া খলীফা হিশাম ইব্‌ন আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অপরাধে ১২১ হিজরীতে শূলে চড়িয়ে তাঁকে হত্যা করা হয় । ইমাম আবূ হানীফা (র) তাঁর খিদমতে দশ হাজার দিরহাম হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন এবং ব্যস্ততার কারণে তাঁর সশরীরে উপস্থিত হতে না পারার ওযর পেশ করেছিলেন । [মানাকিবে আবূ হানীফা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৫]
অতঃপর হাসান ইব্‌ন আলী (রা)-এর বংশধরদের মাঝে নাফসে যাকিয়্যা (পুণ্যাত্মা) নামে সুপরিচিত মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন হাসান ইবন হাসান মদীনায় ও তার ভাই ইবরাহীম কুফায় উভয়ের মাঝে পূর্ব যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে জিহাদের ঝাণ্ডা উত্তোলন করেন ।
ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক (র) নাফসে যাকিয়্যার প্রধান সমর্থক ছিলেন । আবূ হানীফা (র) তো তাঁকে প্রকাশ্যে আর্থিক সহযোগিতা দান করেছিলেন এবং খলীফা আল-মানসুরের সেনাপতি হাসান ইব্‌ন কাহতাবাকে নাফসে যাকিয়্যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে নিষেধ করেছিলেন যার ফলে সেনাপতি হাসান ইব্‌ন কাহতাবা খলীফা আল-মানসুরকে অভিযান পরিচালনায় তাঁর অপারকতার কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন । ইমাম আবু হানীফা (র) ও খলীফা মানসুরের মাঝে যা কিছু ঘটে ছিলো এবং যা কারাগারে ইমামের মৃত্যু ডেকে এনে ছিলো তার মূল কারণ ছিলো এটাই ।
ইবনুল আসীরকৃত 'তারিখে কামিল' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, মদীনাবাসিগণ ইমাম মালিক (র)-এর নিকট মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ সঙ্গে যোগদানের ব্যাপারে ফতোয়া জিজ্ঞেস করে বলেছিলো, আমাদের ঘাড়ে তো আবু জাফর আল-মনসুরের বায়'আত রয়েছে । এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, বল প্রয়োগের মাধ্যমে অপারক অবস্থায় তোমরা বায়'আত হয়েছো , আর অক্ষম ব্যক্তির জিম্মায় কোন দায়বদ্ধতা নেই ।
এ ফতোয়ার পর মানুষ দলে দলে মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে আর ইমাম মালিক (র) ঘরে আবদ্ধ হয়ে পড়েন । মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহকে ১৪৫ হিজরীর রমযান মাসে মদীনায় হত্যা করা হয়েছিলো । পক্ষান্তরে তার ভাই ইবরাহীমকে হত্যা করা হয়েছিলো একই বছর যিলকদ মাসে ।
স্বাভাবিক কারণেই এ সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো । ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হয়নি । কেননা সরকার ও প্রশাসন ছিলো সুসংহত এবং লোকবল ও অর্থবলসহ যাবতীয় উপায়-উপকরণ ছিলো তার দখলে । ফলে তার বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন প্রচেষ্টাই মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি । বিগত ও সাম্প্রতিক ইতিহাসের এমন বহু আন্দোলন প্রচেষ্টার কথাই আমরা জানি যা ঈমান , ইখলাস , বীরত্ব ও সাহসিকতার ভিত্তিতে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং আন্দোলনের নেতৃবর্গ ও তাঁদের অনুসারীরা জানমালের কুরবানী পেশ করতেও কখনো পিছপা হন নি ।
কিন্তু তা সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, সুসংহত সরকার ও তার শক্তিশালী সেনাবাহিনীর মুকাবিলায় নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বকে পরাজয় স্বীকার করে নিতে হয়েছে । ইতিহাসের এটা অভাবিতপূর্ব কোন ঘটনা নয় এবং বিশ্বজগতের চিরন্তন নিয়মেরও বিরোধী নয় ; তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, রাজনীতির ময়দানে ও স্থূল ফলাফলের দিক থেকে এ সকল আন্দোলন ও জিহাদী প্রচেষ্টা দৃশ্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলেও তা ইসলামের অতি বিরাট খিদমত আঞ্জাম দিয়েছে । কেননা এগুলোই ইসলামী ইতিহাসের মর্যাদা ও ভাবমর্যাদা রক্ষা করেছে ।
যদি যুগে যুগে এ সকল সংগ্রামী চেতনা ও জিহাদী স্পৃহার প্রকাশ না ঘটতো এবং খিলাফত আলা মিনহাজিন-নবুয়ত প্রতিষ্ঠার প্রয়াস-প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকতো তাহলে গোটা ইসলামী ইতিহাস হয়ে পড়ত স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশাহদের স্বেচ্ছাচারিতার ও ভাগ্যান্বেষীদের রাজনৈতিক লীলাখেলার নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস । কিন্তু আল্লাহ্র প্রতি ঈমানের বলে বলীয়ান এই মর্দে মুজাহিদগণ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ইতিহাসের সুদূর অন্ধকার পথে আলোর মিনার প্রজ্বলিত করে গিয়েছেন , যাতে সেই আলোর ইশারায় যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহ পথের দিশা পেতে পারে এবং ঘুণে-ধরা সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ও ইসলামী শাসন ব্যবস্থার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করার জযবা ও অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারে এবং বাতিলের বিরুদ্ধে ইসলামী যুগের সেই মহান শৌর্যবীর্যের প্রকাশ ঘটাতে পারে ।
এ এমন সুমহান ঐতিহ্য যা নিয়ে ইসলাম গর্ব করতে পারে এবং এমন মহামূল্যবান সম্পদ যা যুগ যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুসলিম উম্মাহ কাজে লাগাতে পারে । এ হলো ইসলামী জিহাদের সেই পবিত্র ধারাবাহিকতা যা উম্মাহর হৃদয়ে ঈমান ও বিশ্বাস , আস্থা ও ভরসা এবং আশা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি করে ।
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مِّنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُم مِّن يُنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا .
"মু'মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহ্র সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে । তারা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি ।" [সূরা আহযাব : ২৩]

ফন্ট সাইজ
15px
17px