📄 কারবালার প্রান্তরে
হযরত হুসায়ন (রা) কারবালা প্রান্তরে অবতরণ করে জিজ্ঞেস করলেন, এ ভূমির নাম কি ? তাঁকে বলা হলো, এটা কারবালা । তিনি বললেন, এ তো 'কারব' ও 'বালা' অর্থাৎ বিপদ ও বালা-মুসিবতের সমষ্টি ।
যা-ই হোক , ইব্ন যিয়াদ উমর ইব্ন সা'আদকে এ নির্দেশ দিলো যে, হুসায়ন ও তার সঙ্গীদল তরবারি সমর্পণ না করা পর্যন্ত পানি অবরোধ করে রাখো যাতে তারা ফোরাতের এক ফোঁটা পানিও সংগ্রহ করতে না পারে । পক্ষান্তরে হুসায়ন ইব্ন আলী (রা) তাঁর সঙ্গীদের নির্দেশ দিলেন, যাতে তারা ফোরাতের পানিতে পিপাসা নিবারণ করে এবং নিজেদের ঘোড়াগুলোর সঙ্গে শত্রুদের ঘোড়াগুলোকেও পানি খেতে দেয় । দুপুরে ইমাম হুসায়ন (রা) যোহরের সালাত আদায় করলেন । উমর ইবন সা'আদ শিমার ইব্ন যিল জাওশানকে পদাতিক দলের দায়িত্ব প্রদান করলো । তারা ৯ মুহররম রোজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হুসায়ন ও তাঁর সঙ্গী দলের দিকে অগ্রসর হলো । সেই রাত্রে হুসায়ন (রা) তাঁর পরিবার-পরিজনকে প্রয়োজনীয় অসিয়ত করলেন এবং সাথীদের উদ্দেশে ভাষণ প্রদান করে বললেন: দেখো, তোমরা যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারো । ওরা শুধু আমার মাথাটাই চায় । এর উত্তরে হযরত হুসায়ন (রা)-এর সঙ্গী-সাথীরা ও তাঁর পুত্ররা ও ভ্রাতুষ্পুত্ররা দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, আপনার পরে আমরা বেঁচে থাকতে চাই না । আল্লাহ্ যেন আপনার কোন মন্দ পরিণতি আমাদের না দেখান !
আকীল (রা)-এর পুত্রগণ বললেন, আমরা আমাদের জান-মাল ও পরিবার- পরিজন আপনার জন্য উৎসর্গ করবো এবং আপনার মতো ভাগ্য বরণ করা পর্যন্ত আপনার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাবো । আপনার পর বেঁচে থাকাকে আল্লাহ্ ধিক্কার দান করুন । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৭৬-৭৭]
শুক্রবার সকালে (কোন কোন মতে শনিবার সকাল) হযরত হুসায়ন (রা) ফজরের সালাত আদায় করলেন । সেদিন ছিলো আশুরার দিন । তাঁর সঙ্গীদের মাঝে ছিলো বত্রিশ জন যোদ্ধা ও চল্লিশ জন (সাধারণ) পুরুষ । ইমাম হুসায়ন (রা) ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং একখণ্ড কুরআন নিজের সামনে রাখলেন । তাঁর পুত্র আলী ইবন হুসায়নও ঘোড়ায় আরোহণ করলেন । তিনি তখন খুব দুর্বল ও অসুস্থ ছিলেন ।
হযরত হুসায়ন (রা) লোকদের সামনে আপন উচ্চ বংশ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনাপূর্বক তাদের ধর্মানুভূতি জাগ্রত করার চেষ্টা করে বললেন, তোমরা নিজ নিজ বিবেকের মুখোমুখি হয়ে আত্মজিজ্ঞাসা করো । আমি তো তোমাদের নবীর কন্যার পুত্র ! আমার মত মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ কি তোমাদের শোভা পায় ? এ ধরনের আরো অনেক কথা তিনি বললেন । হুর ইব্ন ইয়াযীদ রায়াহী তখন তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন ও ঘোড়ায় চড়ে লড়াই শুরু করলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেলেন ।
শিমার অগ্রসর হয়ে হুসায়নের সঙ্গীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো । আর তারা দু'জন দু'জন ও একজন একজন করে তাদের প্রিয় ইমামের সামনে লড়াই করতে লাগলেন । আর তিনি এই বলে তাদেরকে দু'আ দিতে থাকলেন , "আল্লাহ্ তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠ মুত্তাকীদের শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দান করুন !" এভাবে তারা তাঁর সামনে লড়াই করতে করতে শেষ হয়ে গেলেন , আলী-পুত্র ও হুসায়ন-ভ্রাতাদের অনেকেই নিহত হলেন ।
শিমার ইব্ন যিল জাওশান তার যোদ্ধাদের উত্তেজিত করে বললো, তাঁকে হত্যা করতে তোমাদের আর অপেক্ষা কিসের ?! তখন (নরাধম) যোরআ বিন শরীক তামীমী আগে বেড়ে তাঁর কাঁধে তরবারির দ্বারা আঘাত করলো । অতঃপর সিনান ইব্ন আনাস ইব্ন আমর নাখয়ী তাঁকে বর্শাঘাত করলো । অতঃপর ঘোড়া থেকে নেমে তাঁর মাথা কেটে নিলো এবং তা খাওলার হাতে অর্পণ করলো ।
আবূ মুখান্নাফ জাফার ইব্ন মুহাম্মাদ সূত্রে বর্ণনা করেন । জাফার বলেন, নিহত হওয়ার সময় হুসায়নের শরীরে আমরা ৩৩টি বর্শাঘাত ও ৩৪টি তরবারির আঘাত দেখতে পেয়েছি ।¹
কারবালার যুদ্ধে হযরত হুসায়ন (রা)-এর পক্ষে ৭২ জন শাহাদাত বরণ করেছিলেন । মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়া হতে বর্ণিত , তিনি বলেন, হযরত হুসায়ন (রা)-এর সঙ্গে এমন ১৭ জন পুরুষ নিহত হয়েছিলেন যাঁদের সকলেই ছিলেন হযরত ফাতিমা (রা)-এর বংশধর ।
ইমাম হুসায়ন (রা) ৬১ হিজরীর ১০ মুহররম , রোজ শুক্রবার শাহাদাতবরণ করেন । ইন্তিকালের সময় তাঁর বয়স হয়ে ছিলো ৫৪ বছর ৬ মাস ১৫ দিন ।
টিকাঃ
১. শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, হযরত হুসায়ন (রা)-এর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে ও তাঁকে হত্যা করার ব্যাপারে যাদের ভূমিকা ছিলো তাদের সকলেই পবর্তীকালে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলো । আল মুখতার তার গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা সত্ত্বেও হযরত হুসায়ন (রা)-এর ঘাতকদের খুঁজে খুঁজে বের করেছিলো এবং এ জঘন্য অপরাধে যাদেরই হাত রঞ্জিত হয়েছিলো তাদেরকে সে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো , অবশ্যই আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী ও প্রতিশোধ গ্রহণকারী ।
📄 ইয়াযীদের দরবারে
হিশাম বলেন, হযরত হুসায়ন (রা)-এর ছিন্ন মস্তক যখন হাযির করা হলো তখন ইয়াযীদ ইব্ন মু'আবিয়ার দু' চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিলো । সে বলেছিলো, হুসায়নকে হত্যা করা ছাড়াও তোমাদের আনুগত্যে আমি সন্তুষ্ট হতাম । ইব্ন সুমাইয়ার (ওবায়দুল্লাহ ইব্ন যিয়াদের) প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক , আল্লাহর শপথ , যদি ইনি আমার সম্মুখে উপস্থিত হতেন তাহলে তাঁকে আমি ক্ষমা করে দিতাম । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৯১]
মু'আবিয়া ইব্ন আবূ সুফিয়ানের জনৈক মুক্ত দাস বর্ণনা করেন , ইয়াযীদের সামনে যখন হুসায়ন (রা)-এর ছিন্ন মস্তক রাখা হলো তখন তাকে আমি কাঁদতে দেখেছি এবং বলতে শুনেছি, ইব্ন যিয়াদ ও হুসায়নের মাঝে যদি রক্ত সম্পর্ক থাকতো তাহলে সে এটা করতে পারতো না । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৭১]
বন্দীদেরকে যখন ইয়াযীদের সামনে উপস্থিত করা হলো তখন প্রথমে সে তাঁদের প্রতি রুক্ষ আচরণ করলো । পরে আবার কোমল আচরণ প্রদর্শন করে তাঁদের নিজ হারেমে পাঠিয়ে দিলো । অতঃপর তাদেরকে সসম্মানে মদীনা শরীফে পাঠিয়ে দিলো ।
ইতিহাসে এমন কোন তথ্য বর্ণিত হয়নি যাতে প্রমাণিত হয় যে, ইব্ন যিয়াদকে সে কৃতকর্মের কারণে বরখাস্ত করেছিলো বা কোন সাজা দিয়ে ছিলো কিংবা অন্তত কোন্ রকম তিরস্কার করেছিলো । পক্ষান্তরে আনন্দ-উল্লাস প্রকাশের এমন কিছুও বর্ণনা এসেছে যা কোন মুসলমানের পক্ষে শোভনীয় নয় ।
📄 হাররার মর্মন্তুদ ঘটনা ও ইয়াযীদের মৃত্যু
৬৩ হিজরীতে সংঘটিত হাররার মর্মন্তুদ ঘটনা ইসলামের প্রথম যুগের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসের ললাটে এক কলংকতিলক হয়ে থাকবে । ইয়াযীদ মুসলিম ইব্ন ওকবাকে মদীনায় তিন দিনব্যাপী নৈরাজ্য চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলো । আল্লামা ইবন কাসীর (র) বলেন, এই তিন দিনে মদীনায় যে ভয়ঙ্কর ফিতনা- ফাসাদ ও ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়েছে তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয় । ইয়াযীদ এভাবে চেয়ে ছিলো তার রাজত্বের বুনিয়াদ মজবুত করতে এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক শাসন ক্ষমতাকে স্থায়িত্ব দান করতে কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর ইচ্ছার বিপরীত ঘটিয়ে তাকে শায়েস্তা করলেন । ফলে মৃত্যু এসে তার স্বপ্নসাধের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২২২]
রাজত্ব ভোগ করার জন্য ইয়াযীদ চার বছরের বেশি বেঁচে ছিলো না । ৬৪ হিজরীর ১৪ রবিউল আউয়াল সে মৃত্যুমুখে পতিত হয় । তার মৃত্যুর মাধ্যমেই আবু সুফিয়ানের পরিবারের খিলাফতের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং মারওয়ান ইবনুল হাকাম পরিবারে স্থানান্তরিত হয় । আব্বাসীদের হাতে উমাইয়া রাজত্বের পতন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে । সর্বরাজত্বের একচ্ছত্র মালিক হলেন আল্লাহ্ , যাকে ইচ্ছা তিনি রাজত্ব দান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন । যাকে ইচ্ছা মর্যাদা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপদস্থ করেন ।
📄 পরিস্থিতির পরিবর্তন, সৎ শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও তার সুফল
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, খুলাফায়ে রাশেদীনের পর খিলাফত নামক প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণরূপে বংশীয় ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার অনুগত হয়ে পড়েছিলো , এবং আরব ও মুসলিম জাতি তা মেনেও নিয়েছিলো । ফলে যে কারো পক্ষে উমাইয়া কিংবা আব্বাসী খলীফার মুকাবিলায় দাঁড়ানো এবং সফলভাবে সংগ্রাম পরিচালনা করা সম্ভব ছিলো না । এজন্য প্রয়োজন ছিলো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে এমন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের যিনি ঈমান , আমল , ইখলাস , তাকওয়া ও চারিত্রিক মহত্ত্বে হবেন মুসলিম উম্মাহর সর্বজনশ্রদ্ধেয় । তদুপরি খান্দানী আভিজাত্যেও উচ্চ বংশ মর্যাদার পাশাপাশি তিনি হবেন বিরাট লোকবলের অধিকারী যাতে অস্ত্র দিয়ে অস্ত্রের মুকাবিলা করা যায় এবং বাতাসের মুকাবিলায় ঝড়-ঝঞ্ঝা সৃষ্টি করা যায় ।
এ কারনেই দেখা যায়, উমাইয়া ও আব্বাসী সালতানাতের বিরুদ্ধে যারাই বিদ্রোহ করেছেন এবং জিহাদের ঝাণ্ডা বুলন্দ করেছেন তাঁরা সকলেই ছিলেন নবী-পরিবার ও আলী-পরিবারের সদস্য । কেননা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে তাঁদের প্রতি অখণ্ড ভক্তি-শ্রদ্ধা ও প্রভাব বিদ্যমান থাকার কারণে তাঁদের নেতৃত্বে জিহাদি আন্দোলনের সফলতার সম্ভাবনা ছিলো অধিকতর উজ্জ্বল । বলা বাহুল্য, এই নেতৃপুরুষগণ যখনই জিহাদের ডাক দিয়েছেন সমকালীন অলী-বুজুর্গ তথা সংশোধনকামী নেককার ও পুণ্যবান লোকদের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেছেন । যারা চারিত্রিক অধঃপতন খিলাফতের ভাবমূর্তির বিনষ্টতা , বল্গাহীন ভোগ-বিলাস ও জাহিলিয়াতের আচার-প্রবৃত্তির চাহিদা চরিতার্থ করার পেছনে মুসলমানদের সম্পদের সীমাহীন অপচয় হতে দেখে অন্তর্জালা অনুভব করতেন ।
হুসায়ন ইব্ন আলী (রা)-এর পর তাঁর পৌত্র যায়দ ইব্ন আলী ইব্ন হুসায়ন খিলাফতের মূল চরিত্র ও সঠিক ভাব-মর্যাদা পুনরুদ্ধারে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন । উমাইয়া খলীফা হিশাম ইব্ন আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অপরাধে ১২১ হিজরীতে শূলে চড়িয়ে তাঁকে হত্যা করা হয় । ইমাম আবূ হানীফা (র) তাঁর খিদমতে দশ হাজার দিরহাম হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন এবং ব্যস্ততার কারণে তাঁর সশরীরে উপস্থিত হতে না পারার ওযর পেশ করেছিলেন । [মানাকিবে আবূ হানীফা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৫]
অতঃপর হাসান ইব্ন আলী (রা)-এর বংশধরদের মাঝে নাফসে যাকিয়্যা (পুণ্যাত্মা) নামে সুপরিচিত মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন হাসান ইবন হাসান মদীনায় ও তার ভাই ইবরাহীম কুফায় উভয়ের মাঝে পূর্ব যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে জিহাদের ঝাণ্ডা উত্তোলন করেন ।
ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক (র) নাফসে যাকিয়্যার প্রধান সমর্থক ছিলেন । আবূ হানীফা (র) তো তাঁকে প্রকাশ্যে আর্থিক সহযোগিতা দান করেছিলেন এবং খলীফা আল-মানসুরের সেনাপতি হাসান ইব্ন কাহতাবাকে নাফসে যাকিয়্যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে নিষেধ করেছিলেন যার ফলে সেনাপতি হাসান ইব্ন কাহতাবা খলীফা আল-মানসুরকে অভিযান পরিচালনায় তাঁর অপারকতার কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন । ইমাম আবু হানীফা (র) ও খলীফা মানসুরের মাঝে যা কিছু ঘটে ছিলো এবং যা কারাগারে ইমামের মৃত্যু ডেকে এনে ছিলো তার মূল কারণ ছিলো এটাই ।
ইবনুল আসীরকৃত 'তারিখে কামিল' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, মদীনাবাসিগণ ইমাম মালিক (র)-এর নিকট মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ সঙ্গে যোগদানের ব্যাপারে ফতোয়া জিজ্ঞেস করে বলেছিলো, আমাদের ঘাড়ে তো আবু জাফর আল-মনসুরের বায়'আত রয়েছে । এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, বল প্রয়োগের মাধ্যমে অপারক অবস্থায় তোমরা বায়'আত হয়েছো , আর অক্ষম ব্যক্তির জিম্মায় কোন দায়বদ্ধতা নেই ।
এ ফতোয়ার পর মানুষ দলে দলে মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে আর ইমাম মালিক (র) ঘরে আবদ্ধ হয়ে পড়েন । মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহকে ১৪৫ হিজরীর রমযান মাসে মদীনায় হত্যা করা হয়েছিলো । পক্ষান্তরে তার ভাই ইবরাহীমকে হত্যা করা হয়েছিলো একই বছর যিলকদ মাসে ।
স্বাভাবিক কারণেই এ সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো । ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হয়নি । কেননা সরকার ও প্রশাসন ছিলো সুসংহত এবং লোকবল ও অর্থবলসহ যাবতীয় উপায়-উপকরণ ছিলো তার দখলে । ফলে তার বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন প্রচেষ্টাই মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি । বিগত ও সাম্প্রতিক ইতিহাসের এমন বহু আন্দোলন প্রচেষ্টার কথাই আমরা জানি যা ঈমান , ইখলাস , বীরত্ব ও সাহসিকতার ভিত্তিতে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং আন্দোলনের নেতৃবর্গ ও তাঁদের অনুসারীরা জানমালের কুরবানী পেশ করতেও কখনো পিছপা হন নি ।
কিন্তু তা সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, সুসংহত সরকার ও তার শক্তিশালী সেনাবাহিনীর মুকাবিলায় নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বকে পরাজয় স্বীকার করে নিতে হয়েছে । ইতিহাসের এটা অভাবিতপূর্ব কোন ঘটনা নয় এবং বিশ্বজগতের চিরন্তন নিয়মেরও বিরোধী নয় ; তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, রাজনীতির ময়দানে ও স্থূল ফলাফলের দিক থেকে এ সকল আন্দোলন ও জিহাদী প্রচেষ্টা দৃশ্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলেও তা ইসলামের অতি বিরাট খিদমত আঞ্জাম দিয়েছে । কেননা এগুলোই ইসলামী ইতিহাসের মর্যাদা ও ভাবমর্যাদা রক্ষা করেছে ।
যদি যুগে যুগে এ সকল সংগ্রামী চেতনা ও জিহাদী স্পৃহার প্রকাশ না ঘটতো এবং খিলাফত আলা মিনহাজিন-নবুয়ত প্রতিষ্ঠার প্রয়াস-প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকতো তাহলে গোটা ইসলামী ইতিহাস হয়ে পড়ত স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশাহদের স্বেচ্ছাচারিতার ও ভাগ্যান্বেষীদের রাজনৈতিক লীলাখেলার নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস । কিন্তু আল্লাহ্র প্রতি ঈমানের বলে বলীয়ান এই মর্দে মুজাহিদগণ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ইতিহাসের সুদূর অন্ধকার পথে আলোর মিনার প্রজ্বলিত করে গিয়েছেন , যাতে সেই আলোর ইশারায় যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহ পথের দিশা পেতে পারে এবং ঘুণে-ধরা সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ও ইসলামী শাসন ব্যবস্থার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করার জযবা ও অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারে এবং বাতিলের বিরুদ্ধে ইসলামী যুগের সেই মহান শৌর্যবীর্যের প্রকাশ ঘটাতে পারে ।
এ এমন সুমহান ঐতিহ্য যা নিয়ে ইসলাম গর্ব করতে পারে এবং এমন মহামূল্যবান সম্পদ যা যুগ যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুসলিম উম্মাহ কাজে লাগাতে পারে । এ হলো ইসলামী জিহাদের সেই পবিত্র ধারাবাহিকতা যা উম্মাহর হৃদয়ে ঈমান ও বিশ্বাস , আস্থা ও ভরসা এবং আশা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি করে ।
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مِّنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُم مِّن يُنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا .
"মু'মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহ্র সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে । তারা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি ।" [সূরা আহযাব : ২৩]