📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কুফাবাসীদের মুসলিম ইবন আকীলের সঙ্গ বর্জন

📄 কুফাবাসীদের মুসলিম ইবন আকীলের সঙ্গ বর্জন


মুসলিম ইব্‌ন আকীল ঘোড়ায় চড়ে বের হলেন এবং স্লোগান দিলেন । সঙ্গে সঙ্গে কুফার চার হাজার যোদ্ধা তাঁর পাশে জড়ো হয়ে গেলো । ওবায়দুল্লাহ ইব্‌ন যিয়াদ অবস্থা টের পেয়ে সঙ্গী-সহচরদের নিয়ে প্রাসাদের ভেতরে আশ্রয় নিলেন এবং ফটক বন্ধ করে দিলেন । মুসলিম ইব্‌ন আকীল তাঁর বাহিনীসহ প্রাসাদের ফটকে অবস্থান গ্রহণ করলেন । প্রাসাদে ওবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদের নিকট যেসব গোত্র প্রধান উপস্থিত ছিলো তারা মুসলিম ইব্‌ন আকীলের ডাকে সমবেত নিজ নিজ গোত্রের লোকদের বোঝালো এবং সরে যেতে বললে ওবায়দুল্লাহ কতিপয় সরদারকে এই নির্দেশসহ শহরে পাঠিয়ে দিলেন যেন তারা শহরে ঘুরে ঘুরে সকলকে মুসলিম ইব্‌ন আকীল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় । ফলে তারা সারা শহরে জোরে শোরে প্রচারণা চালালো । মা তার পুত্রকে এবং বোন তার ভাইকে এসে চোখের পানি ফেলে বলতো, নিরাপদে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে চলো । তদ্রূপ বাপ তার পুত্রকে এবং ভাই তার ভাইকে এসে বোঝাতে লাগলো, এই তো সিরীয় বাহিনী এসে পড়লো বলে ! তখন কি দিয়ে তাদের মুকাবিলা করবে শুনি !
ফলে মানুষ হতোদ্যম হয়ে ধীরে ধীরে মুসলিম ইব্‌ন আকীলের সঙ্গ ছেড়ে সরে পড়তে লাগলো । ফলে পাঁচ 'শর বেশি মানুষ তাঁর সাথে থাকলো না । সে সংখ্যাও কমে গিয়ে তিন 'শ তে এসে দাঁড়ালো । মাগরিবের পূর্বে তিনি তাঁর পাশে দেখতে পেলেন মাত্র ত্রিশজনকে । তাদেরকে নিয়ে তিনি মাগরিবের সালাত আদায় করলেন । অতঃপর 'কিন্দা' মহল্লায় গেলেন এবং সেখান থেকে দশজন সঙ্গীসহ বের হলেন । পরে তারাও চলে গেলো । ফলে তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়লেন । পথ দেখাবার কেউ ছিলো না, কথা দিয়ে, সঙ্গ দিয়ে সান্ত্বনা দেয়ার কেউ ছিলো না । ঘরে এনে আশ্রয় দেবে এমনও কেউ ছিলো না । তখন তিনি অন্ধকার পথে একাকী লক্ষ্যহীনভাবে চলতে লাগলেন । কি করবেন , কোথায় যাবেন কিছুই তার জানা নেই । [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৫]
মুসলিম ইব্‌ন আকীলের প্রতি কুফাবাসীদের আচরণ ও সঙ্গ বর্জনের কাহিনী বড় দীর্ঘ ও করুণ । এ কাহিনী বারবার প্রমাণিত করে যে, উদ্দেশ্য ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে নীতি ও মূল্যবোধের গলায় ছুরি বসিয়েও শক্তি ও ক্ষমতার সামনে মাথা নোয়াতে এবং প্রদত্ত সম্পদের লোভ-লালসার কাছে নতি স্বীকার করতে মানুষ স্বভাবতই কোন দ্বিধাবোধ করে না ।
যা হোক , এ মর্মান্তিক কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটলো এভাবে যে, মুসলিম ইব্‌ন আকীল একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলেন । কিন্তু সে ঘর ঘেরাও করে ফেলা হলো । শত্রুপক্ষ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে তার ওপর চড়াও হলো । তিনি তরবারি হাতে তাদের তাড়া করলেন এবং তিন তিনবার বাড়ি থেকে বের করে দিলেন । তখন তারা তাঁকে পাথর মেরে ঘায়েল করতে লাগলো এবং বাঁশের মাথায় আগুন (প্রজ্বলিত করে) নিক্ষেপ করতে লাগলো । ফলে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়লেন ।
তখন আশ্রয়-গৃহের মালিক আবদুর রহমান তাঁকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলো । ফলে তিনি নিজেকে তাঁর হাতে তুলে দিলেন । কিন্তু তারা তাঁর তলোয়ার ছিনিয়ে নিলো এবং একটি খচ্চরের পিঠে তাঁকে তুলে দিলো । তখন তার আর কিছুই করার ছিলো না । এ সময় অজ্ঞাতসারেই তিনি কেঁদে ফেললেন এবং নিশ্চিত হলেন যে, তিনি শহীদ হতে চলেছেন ।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হুসায়নের নামে মুসলিম ইবন আকীলের বার্তা ও হিতাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ

📄 হুসায়নের নামে মুসলিম ইবন আকীলের বার্তা ও হিতাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ


ঠিক সেই দিন কিংবা তার আগের দিন হুসায়ন (রা) মক্কা হতে যাত্রা শুরু করেছিলেন । এমতাবস্থায় মুসলিম ইব্‌ন আকীল (রা) মুহাম্মদ বিন আস'আদকে বললেন, যদি পার তাহলে আমার যবানিতে হুসায়নের নিকট বার্তা পাঠিয়ে দাও, যাতে তিনি ফিরে যান । মুহাম্মদ ইব্‌ন আস'আদ হুসায়নের নিকট দূত মারফত বার্তা পৌঁছে দিলেন । কিন্তু দূতের কথায় তাঁর আস্থা হলো না । তাই তিনি বললেন, আল্লাহর ইচ্ছা অনিবার্য ।
মুসলিম ইব্‌ন আকীলকে ইবন যিয়াদের সামনে উপস্থিত করা হলো এবং উভয়ের মাঝে বেশ উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলো । তখন ইব্‌ন যিয়াদের নির্দেশে মুসলিম ইব্‌ন আকীল (রা)-কে প্রাসাদের ছাদে নিয়ে যাওয়া হলো । তিনি তখন তাকবীর , তাহলীল , তাসবীহ , ইস্তিগফার করছিলেন এবং আল্লাহ্ ফেরেশতাদের নামে সালাম পেশ করছিলেন । বোকায়র ইব্‌ন ইমরান নামক এক ব্যক্তি তরবারির আঘাতে তাঁর মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেললো এবং প্রাসাদের ওপর থেকে তাঁর ছিন্ন মস্তক নীচে ফেলে দিলো , মস্তকহীন দেহটা আগেই নিচে পড়ে গিয়েছিলো । [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৫৯]
মুসলিম ইব্‌ন আকীল মুহাম্মদ ইবনুল আস'আদকে হুসায়নের নামে তাঁর যবানীতে এই মর্মে এক বার্তা পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন , "আপনি পরিবার-পরিজনসহ ফিরে যান, কুফাবাসীদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি যেন আপনাকে বিভ্রান্ত না করে । কেননা এরা হলো আপনার পিতার সেই সহচর দল, মৃত্যু কিংবা শাহাদাতের মাধ্যমে তিনি যাদের বিচ্ছেদ কামনা করেছিলেন । কুফাবাসীরা আপনার সাথে প্রতারণা করেছে এবং আমার সাথেও প্রতারণা করেছে । আর প্রতারকের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই ।"
কুফা থেকে চার রাতের দূরত্বে 'যিবালাহ' নামক স্থানে প্রেরিত দূত হুসায়ন (রা)-এর সাক্ষাৎ পেলেন এবং মুসলিম ইব্‌ন আকীল (রা) বার্তাসহ বিস্তারিত ঘটনা তাঁকে জানালেন , কিন্তু হুসায়ন (রা) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে বললেন, "আল্লাহ্র ফায়সালা অনিবার্য , আমাদের শাসকদের অনাচার নিজেদের দুরবস্থার জন্য আল্লাহর কাছেই আমরা ফরিয়াদ করি ।"
হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা)-এর কুফা যাত্রার প্রস্তুতির কথা জেনে মানুষ উদ্বিগ্ন ও বিচলিত হয়ে পড়লো । বিচক্ষণ ও হিতাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে কুফায় না যাওয়ার ব্যাপারে জোর পরামর্শ দিলেন । আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) তাঁকে বললেন, ইরাকীরা হলো বিশ্বাসঘাতকের জাত । সুতরাং তাদের কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে আপনি এখানেই অবস্থান করুন , ইরাকীরা যখন তাদের শত্রুকে শহরছাড়া করবে তখন আপনি তাদের কাছে যাবেন ।
হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা) বললেন, হে পিতৃব্য পুত্র ! আল্লাহর শপথ, আমি জানি, আপনি আমার পরম হিতাকাঙ্ক্ষী । কিন্তু আমি যাত্রার ফায়সালা করে ফেলেছি । তখন হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) বললেন, "যেতেই যদি হয় তাহলে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের অন্তত রেখে যান । কেননা আল্লাহর শপথ ! আমার আশংকা হয় যে, উসমানকে যেমন তাঁর স্ত্রীপুত্র-কন্যাদের চোখের সামনে হত্যা করা হয়েছে আপনাকেও সেভাবেই হত্যা করা হবে ।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৬০]
হযরত ইবন উমর (রা) একইভাবে তাঁকে নিষেধ করলেন । কিন্তু তিনি ফিরে আসতে অস্বীকার করলেন । ইবন উমর (রা) তখন তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন । বললেন, "নিহত হওয়া থেকে আপনাকে আমি আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করছি ।"
একইভাবে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন যুবায়র (রা) যখন তাঁকে নিষেধ করলেন তখন তিনি বললেন, চল্লিশ হাজার ব্যক্তির বায়'আত আমার হাতে এসেছে, যারা স্ত্রী তালাক ও গোলাম আযাদের শপথ করে আমার সঙ্গে থাকার শপথ করেছে । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৬১]
হযরত আবু সাঈদ খুদরী , জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ ও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবও তাঁকে নিষেধ করলেন । কিন্তু তিনি নিবৃত্ত হলেন না, বরং সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞায় যাত্রা শুরু করলেন । পথে কবি ফারাযদাকের সাথে দেখা হলে তিনি তাঁকে মানুষের মনোভাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন । ফারাযদাক বললেন, হে রাসূল-তনয় ! হৃদয় তো আপনার সাথে কিন্তু তলোয়ার আপনার বিরুদ্ধে । তবে বিজয়ের ফায়সালা আসমানে ।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কুফার পথে হুসায়ন ইবন আলী (রা)

📄 কুফার পথে হুসায়ন ইবন আলী (রা)


আপন পরিবার-পরিজনসহ কুফা থেকে আগত ষাটজন লোকের ক্ষুদ্র এক কাফেলা নিয়ে হুসায়ন ইব্‌ন আলী কুফার উদ্দেশে যাত্রা করলেন । তখনও কুফার ঘটনাবলী কিছুই তাঁর জানা ছিলো না । পথে মুসলিম ইব্‌ন আকীল ও হানী ইব্‌ন ওরওয়ার শাহাদাতের সংবাদ পেয়ে বারবার তিনি "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" পড়তে লাগলেন । সকলে তখন তাঁকে বিনীতভাবে বললো, আল্লাহ্র দোহাই, নিজেকে রক্ষা করুন ! তিনি বললেন, এ দু'জনের শাহাদাতের পর আর বেঁচে থাকায় কোন কল্যাণ নেই ।
'হাজির' অঞ্চলে পৌঁছার পর তিনি ঘোষণা দিলেন, দেখো, আমাদের সমর্থকরা আমাদের সঙ্গ বর্জন করেছে । সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা ফিরে যেতে চাও নিঃসংকোচে যেতে পারো । কারো ওপর আমাদের পক্ষ হতে আনুগত্যের দায়বদ্ধতা নেই । এ ঘোষণার পর পথের ডান বাম থেকে যারা তাঁর কাফেলায় যোগ দিয়েছিলো তারা সকলে তাঁকে পরিত্যাগ করে কেটে পড়লো । মক্কা থেকে যারা তাঁর সঙ্গী হয়ে ছিলো কেবল তারাই রয়ে গেলো । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৬৭]
হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা) চিঠিপত্রের দু'টি বান্ডিল হাযির করলেন এবং সেগুলো সামনে ছড়িয়ে দিয়ে তা থেকে কয়েকটা পত্র পাঠ করলেন । তখন হুর বলে উঠলো, যারা এসব কথা আপনার কাছে লিখেছে তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই । একথা বলে 'হুর' হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা) থেকে পৃথক হয়ে গেলো এবং তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে কেটে পড়লো । এ সময় কুফা থেকে আগত একদল লোক তার সঙ্গে দেখা করলো । তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের পেছনে কুফার লোকদের কী খবর বলো ।
মুজাম্মা ইব্‌ন আবদুল্লাহ আল-আমেরী বললেন, নেতৃস্থানীয় লোকেরা আপনার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ । কেননা বড় বড় অংকের উৎকোচ পেয়ে তাদের সিন্দুক ভরে গেছে । সুতরাং তারা আপনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ । পক্ষান্তরে সাধারণ লোকদের অবস্থা এই যে, হৃদয় তাদের আপনার প্রতি ঝুঁকে আছে । কিন্তু আগামীকাল তাদের তলোয়ার আপনার বিরুদ্ধেই কোষমুক্ত হবে ।
ওবায়দুল্লাহ ইব্‌ন যিয়াদ আমর ইবন সা'আদকে তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পাঠালো । হযরত হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা) তাকে বললেন, "হে উমর ! আমার তিনটি প্রস্তাবের যে কোন একটি গ্রহণ করো । হয় আমাকে যেভাবে এসেছি সেভাবে ফিরে যেতে দাও । আর তা গ্রহণযোগ্য না হলে আমাকে ইয়াযীদের কাছে পাঠিয়ে দাও । আমি তার হাতে হাত রাখবো । তখন আমার সম্পর্কে যে যা ভালো মনে করে ফায়সালা করবে । তাও যদি গ্রহণযোগ্য না মনে কর তাহলে আমাকে তুর্কীদের দেশে পাঠিয়ে দাও । মৃত্যু পর্যন্ত আমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো ।"
প্রস্তাবগুলো ইব্‌ন যিয়াদের বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হলো । সে হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা)-কে ইয়াযীদের কাছে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল । তখন নরাধম শিমার ইব্‌ন যিল জাওশান বাধা দিয়ে বললো, আপনার সিদ্ধান্তের ওপর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছু গ্রহণযোগ্য নয় । ইব্‌ন যিয়াদ হুসায়ন (রা) কে সে কথাই জানিয়ে দিলো । হুসায়ন (রা) বললেন, আল্লাহর শপথ! এটা আমি করবো না ।
উমর বিন সা'আদ হুসায়ন (রা)-এর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে বিলম্ব করছিলো । তখন ইব্‌ন যিয়াদ শিমার বিন যিল জাওশানকে এই নির্দেশ দিয়ে পাঠালো, উমর যদি আগে বাড়ে তাহলে তার নেতৃত্বে তুমি লড়াই করবে । অন্যথায় তাকে হত্যা করে তুমি তার স্থান গ্রহণ করবে । আমি তোমাকে দায়িত্বভার অর্পণ করলাম । উমর ইব্‌ন সা'আদের সঙ্গে কুফার প্রায় ত্রিশজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলো । তাঁরা তাকে বললেন, নবী-কন্যার পুত্র তোমাদের সামনে তিনটি প্রস্তাব পেশ করছেন আর তোমরা তার একটিও গ্রহণ করবে না ! একথা বলে তারা হযরত হুসায়ন (রা)-এর সঙ্গে যোগ দিলো এবং তাঁর পক্ষে লড়াই করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৭০]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কারবালার প্রান্তরে

📄 কারবালার প্রান্তরে


হযরত হুসায়ন (রা) কারবালা প্রান্তরে অবতরণ করে জিজ্ঞেস করলেন, এ ভূমির নাম কি ? তাঁকে বলা হলো, এটা কারবালা । তিনি বললেন, এ তো 'কারব' ও 'বালা' অর্থাৎ বিপদ ও বালা-মুসিবতের সমষ্টি ।
যা-ই হোক , ইব্‌ন যিয়াদ উমর ইব্‌ন সা'আদকে এ নির্দেশ দিলো যে, হুসায়ন ও তার সঙ্গীদল তরবারি সমর্পণ না করা পর্যন্ত পানি অবরোধ করে রাখো যাতে তারা ফোরাতের এক ফোঁটা পানিও সংগ্রহ করতে না পারে । পক্ষান্তরে হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা) তাঁর সঙ্গীদের নির্দেশ দিলেন, যাতে তারা ফোরাতের পানিতে পিপাসা নিবারণ করে এবং নিজেদের ঘোড়াগুলোর সঙ্গে শত্রুদের ঘোড়াগুলোকেও পানি খেতে দেয় । দুপুরে ইমাম হুসায়ন (রা) যোহরের সালাত আদায় করলেন । উমর ইবন সা'আদ শিমার ইব্‌ন যিল জাওশানকে পদাতিক দলের দায়িত্ব প্রদান করলো । তারা ৯ মুহররম রোজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হুসায়ন ও তাঁর সঙ্গী দলের দিকে অগ্রসর হলো । সেই রাত্রে হুসায়ন (রা) তাঁর পরিবার-পরিজনকে প্রয়োজনীয় অসিয়ত করলেন এবং সাথীদের উদ্দেশে ভাষণ প্রদান করে বললেন: দেখো, তোমরা যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারো । ওরা শুধু আমার মাথাটাই চায় । এর উত্তরে হযরত হুসায়ন (রা)-এর সঙ্গী-সাথীরা ও তাঁর পুত্ররা ও ভ্রাতুষ্পুত্ররা দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, আপনার পরে আমরা বেঁচে থাকতে চাই না । আল্লাহ্ যেন আপনার কোন মন্দ পরিণতি আমাদের না দেখান !
আকীল (রা)-এর পুত্রগণ বললেন, আমরা আমাদের জান-মাল ও পরিবার- পরিজন আপনার জন্য উৎসর্গ করবো এবং আপনার মতো ভাগ্য বরণ করা পর্যন্ত আপনার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাবো । আপনার পর বেঁচে থাকাকে আল্লাহ্ ধিক্কার দান করুন । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৭৬-৭৭]
শুক্রবার সকালে (কোন কোন মতে শনিবার সকাল) হযরত হুসায়ন (রা) ফজরের সালাত আদায় করলেন । সেদিন ছিলো আশুরার দিন । তাঁর সঙ্গীদের মাঝে ছিলো বত্রিশ জন যোদ্ধা ও চল্লিশ জন (সাধারণ) পুরুষ । ইমাম হুসায়ন (রা) ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং একখণ্ড কুরআন নিজের সামনে রাখলেন । তাঁর পুত্র আলী ইবন হুসায়নও ঘোড়ায় আরোহণ করলেন । তিনি তখন খুব দুর্বল ও অসুস্থ ছিলেন ।
হযরত হুসায়ন (রা) লোকদের সামনে আপন উচ্চ বংশ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনাপূর্বক তাদের ধর্মানুভূতি জাগ্রত করার চেষ্টা করে বললেন, তোমরা নিজ নিজ বিবেকের মুখোমুখি হয়ে আত্মজিজ্ঞাসা করো । আমি তো তোমাদের নবীর কন্যার পুত্র ! আমার মত মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ কি তোমাদের শোভা পায় ? এ ধরনের আরো অনেক কথা তিনি বললেন । হুর ইব্‌ন ইয়াযীদ রায়াহী তখন তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন ও ঘোড়ায় চড়ে লড়াই শুরু করলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেলেন ।
শিমার অগ্রসর হয়ে হুসায়নের সঙ্গীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো । আর তারা দু'জন দু'জন ও একজন একজন করে তাদের প্রিয় ইমামের সামনে লড়াই করতে লাগলেন । আর তিনি এই বলে তাদেরকে দু'আ দিতে থাকলেন , "আল্লাহ্ তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠ মুত্তাকীদের শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দান করুন !" এভাবে তারা তাঁর সামনে লড়াই করতে করতে শেষ হয়ে গেলেন , আলী-পুত্র ও হুসায়ন-ভ্রাতাদের অনেকেই নিহত হলেন ।
শিমার ইব্‌ন যিল জাওশান তার যোদ্ধাদের উত্তেজিত করে বললো, তাঁকে হত্যা করতে তোমাদের আর অপেক্ষা কিসের ?! তখন (নরাধম) যোরআ বিন শরীক তামীমী আগে বেড়ে তাঁর কাঁধে তরবারির দ্বারা আঘাত করলো । অতঃপর সিনান ইব্‌ন আনাস ইব্‌ন আমর নাখয়ী তাঁকে বর্শাঘাত করলো । অতঃপর ঘোড়া থেকে নেমে তাঁর মাথা কেটে নিলো এবং তা খাওলার হাতে অর্পণ করলো ।
আবূ মুখান্নাফ জাফার ইব্‌ন মুহাম্মাদ সূত্রে বর্ণনা করেন । জাফার বলেন, নিহত হওয়ার সময় হুসায়নের শরীরে আমরা ৩৩টি বর্শাঘাত ও ৩৪টি তরবারির আঘাত দেখতে পেয়েছি ।¹
কারবালার যুদ্ধে হযরত হুসায়ন (রা)-এর পক্ষে ৭২ জন শাহাদাত বরণ করেছিলেন । মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়া হতে বর্ণিত , তিনি বলেন, হযরত হুসায়ন (রা)-এর সঙ্গে এমন ১৭ জন পুরুষ নিহত হয়েছিলেন যাঁদের সকলেই ছিলেন হযরত ফাতিমা (রা)-এর বংশধর ।
ইমাম হুসায়ন (রা) ৬১ হিজরীর ১০ মুহররম , রোজ শুক্রবার শাহাদাতবরণ করেন । ইন্তিকালের সময় তাঁর বয়স হয়ে ছিলো ৫৪ বছর ৬ মাস ১৫ দিন ।

টিকাঃ
১. শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, হযরত হুসায়ন (রা)-এর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে ও তাঁকে হত্যা করার ব্যাপারে যাদের ভূমিকা ছিলো তাদের সকলেই পবর্তীকালে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলো । আল মুখতার তার গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা সত্ত্বেও হযরত হুসায়ন (রা)-এর ঘাতকদের খুঁজে খুঁজে বের করেছিলো এবং এ জঘন্য অপরাধে যাদেরই হাত রঞ্জিত হয়েছিলো তাদেরকে সে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো , অবশ্যই আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী ও প্রতিশোধ গ্রহণকারী ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px