📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 ইয়াযীদের জীবন ও চরিত্র

📄 ইয়াযীদের জীবন ও চরিত্র


ইমাম তাবারানী বলেন, অল্প বয়সে ইয়াযীদ 'পানীয়' ধরেছিলেন , যেমন শখের বশে অল্প বয়স্করা ধরে থাকে ।
ইব্‌ন কাসীর (র) বলেন, ইয়াযীদের চরিত্রে বদান্যতা , সহনশীলতা-বিশুদ্ধভাষিতা , কাব্যরুচি , সাহসিকতা , প্রশাসনিক দক্ষতা ইত্যাদি কতিপয় গুণ ছিলো । তদুপরি সে ছিলো সুদর্শন এবং আচার-আচরণে মার্জিত । তবে কিছু প্রবৃত্তিপরায়ণতা ছিলো , কখনো কখনো সালাত ছেড়ে দিতো । আর অধিকাংশ সময় সালাতে অবহেলা করতো । তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিলো , মদ পান ও আনুষঙ্গিক কোন কোন অশ্লীল কাজে লিপ্ততা , তবে তার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার কোন অভিযোগ ছিলো না । ফাসিক ও পাপাচারী ছিলো অবশ্যই ।
বর্ণিত আছে, গান বাজনা , মদ পান , সুন্দরী দাস-দাসীর সঙ্গ , কুকুর পোষা , বানর , ভালুক ও ভেড়ার লড়াই এগুলোতে ইয়াযীদের আসক্তি ছিলো বহুল আলোচিত । ২৫ কিংবা ২৬ কিংবা ২৭ হিজরীতে সে জন্মগ্রহণ করেছিলো । পিতার জীবদ্দশায় এ শর্তে তার অনুকূলে বায়'আত গ্রহণ করা হয়েছিলো যে, পিতার মৃত্যুর পর তিনি হবেন পরবর্তী খলীফা । অতঃপর পিতা হযরত মু'আ'বিয়া (রা)-এর ইন্তিকালের পর ৬০ হিজরীর মধ্যরজবে পুনঃ বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ।
উমর ইবন খাত্তাব (রা) বলেছেন, "কাবার রবের শপথ ! আমি জানি , আরবগণ কখন ধ্বংস হবে । যখন তাদের শাসক হবে এমন কোন ব্যক্তি যে জাহিলিয়াতের যমানা দেখেনি এবং ইসলামেও সে প্রবীণ নয় ।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৩২]
ইয়াযীদের জীবন ও চরিত্রের পূর্ববর্ণিত রূপ থেকেই এটা পরিষ্কার যে, ইয়াযীদের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ এমন সাধারণ কোন ঘটনা ছিলো না , যা খিলাফতে রাশেদার সংলগ্ন পরবর্তী যুগে বরদাশত করা যেতে পারে । বিশিষ্ট সাহাবা কিরামের ও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী তাবেঈনের এক বিরাট জামাআত তখনও জীবদ্দশায় ছিলেন । তাঁদের মাঝে এমন বহু ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা খিলাফতের দায়িত্ব পালন , মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব গ্রহণ এবং যেসব মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ইসলামের আবির্ভাব , কুরআনের অবতরণ ও খিলাফাত ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিলো সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইয়াযীদের চেয়ে বহু গুণে যোগ্য ছিলেন , সেজন্য এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতররূপে গ্রহণ করাই ছিলো স্বাভাবিক । পরবর্তী কোন কালে হয়তো বিষয়টি এতটা গুরুতর বিবেচিত হতো না , যেমন ইতিহাসের বাস্তবতায় দেখা গেছে ।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা

📄 কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা


কারবালার যে মর্মন্তুদ ঘটনায় প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত ও লজ্জাবনত , সম্ভব হলে কলমের কালিতে এ ঘটনা আমরা কিছুতেই লিপিবদ্ধ করতাম না , বরং অপরাধীর ন্যায় তা এড়িয়ে যেতাম । কিন্তু ইতিহাস তো সব ঘটনার সাক্ষী ! যত বিচিত্রই হোক তার গতি-প্রকৃতি এবং মানুষের হৃদয়ে তা যত রক্তক্ষরণই করুক না কেন, সেই ইতিহাসের দাবি রক্ষার জন্যই আমাদেরকে আজ কারবালার কথা বলতে হবে যাতে আলোচনা সর্বাঙ্গ পূর্ণ হয় এবং ইতিহাসের পাতায় বাস্তব ঘটনা সংরক্ষিত হয় । সর্বোপরি হৃদয় ও বিবেকের নিকট যাতে কিঞ্চিৎ কৈফিয়ত পেশ করা যায় এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ পাঠকবর্গের অন্তরে সামান্য সান্ত্বনার সঞ্চার হয় , যাঁরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর আহলে বায়তের সম্মান ও মর্যাদা জানেন এবং উম্মতের প্রতি তাঁদের ইহসান ও অবদান কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেন ।
হযরত হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা) ইয়াযীদের হাতে বায়'আত গ্রহণ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং স্বীয় নীতি ও অবস্থানে অটল থেকে প্রাণপ্রিয় নানাজানের শহর মদীনায় অবস্থান করতে লাগলেন । ইয়াযীদ ও ক্ষমতাসীন মহল বায়'আত গ্রহণ থেকে হযরত হুসায়ন (রা)-এর বিরত থাকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছিলো , অথচ আবদুল্লাহ্ ইবন উমর , আবদুর রহমান ইব্‌ন আবু বকর , আবদুল্লাহ ইব্‌ন যুবায়র (রা) প্রমুখের বেলায় তারা ততটা গুরুত্ব দেয়নি । এর কারণ এদিকে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর সঙ্গে তাঁর নিকটতম সম্পর্কের কারণে মুসলিম উম্মাহর অন্তরে তাঁর প্রতি অখণ্ড ভক্তি-শ্রদ্ধা ও প্রেম-ভালোবাসা । অন্যদিকে মু'আবিয়া (রা)-এর শাসন ক্ষমতার বিরুদ্ধে তাঁর মহান পিতার সংগ্রাম-ঐতিহ্যের কারণে মুসলিম সমাজের অপরিসীম প্রভাব-প্রতিপত্তি । কিন্তু হযরত হুসায়ন (রা) বিন্দুমাত্র নমনীয়তা ও বশ্যতা স্বীকার করলেন না এবং পূর্ণ উপলব্ধি ও সচেতনতার সাথে যে নীতি ও অবস্থান তিনি গ্রহণ করেছিলেন তা থেকে বিন্দু পরিমাণ বিচ্যুত হলেন না ।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 ইরাকীদের প্রতি আহ্বান ও মুসলিম ইবন আকীলকে ইরাকে প্রেরণ

📄 ইরাকীদের প্রতি আহ্বান ও মুসলিম ইবন আকীলকে ইরাকে প্রেরণ


ইয়াযীদ ও তার প্রশাসকদের পক্ষ থেকে যখন বায়'আতে চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে লাগলো তখন হুসায়ন (রা) মক্কায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন । ইতিমধ্যে ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক 'পত্র' আসতে লাগলো , এমনকি ইরাকীরা এক প্রতিনিধি দলের হাতে হুসায়ন (রা)-এর নামে একশত পঞ্চাশটি পত্র প্রেরণ করলো এবং এই বার্তা প্রদান করলো, আপনার পেছনে এক লাখ যোদ্ধা রয়েছে । এক পত্রে তারা অবিলম্বে ইরাক আগমনের আহ্বান জানালো যাতে তারা ইয়াযীদ ইব্‌ন মু'আবিয়ার পরিবর্তে তাঁর হাতে বায়'আত হতে পারে । তখন হযরত হুসায়ন (রা) প্রকৃত অবস্থা অবগত হওয়ার জন্য আপন পিতৃব্য পুত্র মুসলিম ইব্‌ন আকীলকে ইরাকে পাঠালেন এবং তাঁর হাতে এই মর্মে ইরাকীদের নামে একটি পত্র দিলেন ।
মুসলিম ইব্‌ন আকীল কুফায় প্রবেশ করলেন এবং কুফাবাসীদের মুখে মুখে তাঁর আগমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো । ফলে তারা তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে তাঁর হাতে হুসায়ন (রা)-এর আনুগত্যের বায়'আত গ্রহণ করলো এবং তাঁর সমর্থনে জানমাল কুরবান করার শপথ গ্রহণ করলো । এভাবে কুফায় বার হাজার মানুষ তাঁর বায়'আতে ঐক্যবদ্ধ হলো । অতঃপর সে সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে আঠারো হাজারে উন্নীত হলো । তখন মুসলিম ইব্‌ন আকীল হযরত হুসায়ন (রা)-কে কুফায় আগমনের কথা লিখে জানালেন, বায়'আত গ্রহণসহ যাবতীয় পরিস্থিতি তাঁর অনুকূল হয়েছে । তখন হযরত হুসায়ন (রা) মক্কা হতে কুফার উদ্দেশে যাত্রা করলেন । এদিকে ইয়াযীদ কুফার প্রশাসক নোমান ইব্‌ন বশীরকে হুসায়নের প্রতি তাঁর দুর্বল নীতি ও অবস্থানের কারণে বরখাস্ত করলো এবং বসরার সাথে কুফাকেও ওবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদের শাসনাধীনে যুক্ত করে দিলো । [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫২]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কুফাবাসীদের মুসলিম ইবন আকীলের সঙ্গ বর্জন

📄 কুফাবাসীদের মুসলিম ইবন আকীলের সঙ্গ বর্জন


মুসলিম ইব্‌ন আকীল ঘোড়ায় চড়ে বের হলেন এবং স্লোগান দিলেন । সঙ্গে সঙ্গে কুফার চার হাজার যোদ্ধা তাঁর পাশে জড়ো হয়ে গেলো । ওবায়দুল্লাহ ইব্‌ন যিয়াদ অবস্থা টের পেয়ে সঙ্গী-সহচরদের নিয়ে প্রাসাদের ভেতরে আশ্রয় নিলেন এবং ফটক বন্ধ করে দিলেন । মুসলিম ইব্‌ন আকীল তাঁর বাহিনীসহ প্রাসাদের ফটকে অবস্থান গ্রহণ করলেন । প্রাসাদে ওবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদের নিকট যেসব গোত্র প্রধান উপস্থিত ছিলো তারা মুসলিম ইব্‌ন আকীলের ডাকে সমবেত নিজ নিজ গোত্রের লোকদের বোঝালো এবং সরে যেতে বললে ওবায়দুল্লাহ কতিপয় সরদারকে এই নির্দেশসহ শহরে পাঠিয়ে দিলেন যেন তারা শহরে ঘুরে ঘুরে সকলকে মুসলিম ইব্‌ন আকীল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় । ফলে তারা সারা শহরে জোরে শোরে প্রচারণা চালালো । মা তার পুত্রকে এবং বোন তার ভাইকে এসে চোখের পানি ফেলে বলতো, নিরাপদে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে চলো । তদ্রূপ বাপ তার পুত্রকে এবং ভাই তার ভাইকে এসে বোঝাতে লাগলো, এই তো সিরীয় বাহিনী এসে পড়লো বলে ! তখন কি দিয়ে তাদের মুকাবিলা করবে শুনি !
ফলে মানুষ হতোদ্যম হয়ে ধীরে ধীরে মুসলিম ইব্‌ন আকীলের সঙ্গ ছেড়ে সরে পড়তে লাগলো । ফলে পাঁচ 'শর বেশি মানুষ তাঁর সাথে থাকলো না । সে সংখ্যাও কমে গিয়ে তিন 'শ তে এসে দাঁড়ালো । মাগরিবের পূর্বে তিনি তাঁর পাশে দেখতে পেলেন মাত্র ত্রিশজনকে । তাদেরকে নিয়ে তিনি মাগরিবের সালাত আদায় করলেন । অতঃপর 'কিন্দা' মহল্লায় গেলেন এবং সেখান থেকে দশজন সঙ্গীসহ বের হলেন । পরে তারাও চলে গেলো । ফলে তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়লেন । পথ দেখাবার কেউ ছিলো না, কথা দিয়ে, সঙ্গ দিয়ে সান্ত্বনা দেয়ার কেউ ছিলো না । ঘরে এনে আশ্রয় দেবে এমনও কেউ ছিলো না । তখন তিনি অন্ধকার পথে একাকী লক্ষ্যহীনভাবে চলতে লাগলেন । কি করবেন , কোথায় যাবেন কিছুই তার জানা নেই । [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৫]
মুসলিম ইব্‌ন আকীলের প্রতি কুফাবাসীদের আচরণ ও সঙ্গ বর্জনের কাহিনী বড় দীর্ঘ ও করুণ । এ কাহিনী বারবার প্রমাণিত করে যে, উদ্দেশ্য ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে নীতি ও মূল্যবোধের গলায় ছুরি বসিয়েও শক্তি ও ক্ষমতার সামনে মাথা নোয়াতে এবং প্রদত্ত সম্পদের লোভ-লালসার কাছে নতি স্বীকার করতে মানুষ স্বভাবতই কোন দ্বিধাবোধ করে না ।
যা হোক , এ মর্মান্তিক কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটলো এভাবে যে, মুসলিম ইব্‌ন আকীল একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলেন । কিন্তু সে ঘর ঘেরাও করে ফেলা হলো । শত্রুপক্ষ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে তার ওপর চড়াও হলো । তিনি তরবারি হাতে তাদের তাড়া করলেন এবং তিন তিনবার বাড়ি থেকে বের করে দিলেন । তখন তারা তাঁকে পাথর মেরে ঘায়েল করতে লাগলো এবং বাঁশের মাথায় আগুন (প্রজ্বলিত করে) নিক্ষেপ করতে লাগলো । ফলে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়লেন ।
তখন আশ্রয়-গৃহের মালিক আবদুর রহমান তাঁকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলো । ফলে তিনি নিজেকে তাঁর হাতে তুলে দিলেন । কিন্তু তারা তাঁর তলোয়ার ছিনিয়ে নিলো এবং একটি খচ্চরের পিঠে তাঁকে তুলে দিলো । তখন তার আর কিছুই করার ছিলো না । এ সময় অজ্ঞাতসারেই তিনি কেঁদে ফেললেন এবং নিশ্চিত হলেন যে, তিনি শহীদ হতে চলেছেন ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px