📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হুসায়ন ইবন আলী (রা)

📄 হুসায়ন ইবন আলী (রা)


৪ হিজরীর ৫ শাবান হুসায়ন ইবন আলী (রা) জন্মগ্রহণ করেছিলেন । রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে খেজুর চিবিয়ে দিয়েছিলেন এবং আপন পবিত্র থু থু তাঁর মুখে দান করেছিলেন । তাঁর জন্য দু'আ করেছিলেন এবং হুসায়ন নাম রেখেছিলেন ।
ইতিপূর্বেও আমরা বলেছি , হযরত হাসানের মুখমণ্ডল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মুখমণ্ডলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো । পক্ষান্তরে হযরত হুসায়ন (রা)-এর দেহ নবী-এর পবিত্র দেহের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো ।
হুসায়ন (রা) নবী ﷺ-এর জীবদ্দশার ৬ বছর ৬ মাসের মত সময় পেয়েছিলেন । নবী ﷺ-এর ওফাত হয়েছিলো ১১ হিজরীর ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার ।
হযরত আবূ আইয়ূব আনসারী (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে হাযির হলাম , তখন হাসান ও হুসায়ন (রা) তাঁর বুকের ওপর বসে খেলা করছিলেন । আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আপনি কি তাদেরকে ভালোবাসেন ? তিনি বললেন, কেমনে ভালো না বেসে পারি ? তারা তো হলো দুনিয়াতে আমার (আল্লাহপ্রদত্ত) সম্পদ । [তাবারানী]
হযরত হারিস (র) হযরত আলী (রা) হতে মারফু সনদে বর্ণনা করেন , الحسن والحسين سيدا شباب اهل الجنة "হাসান ও হুসায়ন হলেন জান্নাতী যুবকগণের সরদার ।"
তাবারানী বর্ণিত অন্য একটি 'মুরসাল' হাদীসে রয়েছে , নবী একবার হযরত হুসায়ন (রা)-কে কাঁদতে শুনে তাঁর আম্মা ফাতিমাকে বললেন, তুমি কি জান না যে, তার কান্না আমাকে কষ্ট দেয় ? মু'আবিয়া-পুত্র ইয়াযীদের নেতৃত্বে কনস্টান্টিনোপল অভিযানে প্রেরিত বাহিনীতে তিনি শরীক ছিলেন , এটা ছিলো ৫১ হিজরীর ঘটনা ।
নামায , রোযা , হজ্জ ইত্যাদি ইবাদত তিনি প্রচুর পরিমাণে করতেন । তিনি পায়ে হেঁটে বিশবার হজ্জ করেছেন ।
হুসায়ন (রা) ছিলেন স্বভাব বিনয়ী । একদল দরিদ্র লোকের পাশ দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন । সওয়ারির ওপর থেকে তাদেরকে তিনি সালাম করলেন । তারা মাটিতে দস্তরখান পেতে রুটির টুকরো খাচ্ছিলো , তারা তাঁকে দস্তরখানে শরীক হওয়ার দাওয়াত দিয়ে বললো, আসুন, হে আল্লাহর রাসূলের দৌহিত্র ! তিনি সওয়ারি থেকে নেমে এসে বললেন, আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না । অতঃপর তিনি তাদের সাথে বসে খানায় শরীক হলেন । সবাই যখন আহার শেষ করলো তখন তিনি তাদের বললেন, তোমরা আমাকে দাওয়াত দিয়েছো , আমি তোমাদের দাওয়াত কবুল করেছি । এখন আমি তোমাদেরকে আমার ঘরে দাওয়াত করছি । তারা দাওয়াত কবুল করে তাঁর বাড়িতে হাযির হলে হযরত হুসায়ন (রা) তখন দাসীকে ডেকে বললেন, হে রাবার , ঘরে কি রেখেছো , দাও ।
হযরত ইব্‌ন উয়ায়না (রহ) আবদুল্লাহ ইবন আবু যায়দ হতে বর্ণনা করেন , তিনি বলেন, হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা)-কে আমি দেখেছি , দাড়ির সামনের দিকে কয়েকটি চুল ছাড়া তিনি সম্পূর্ণ কৃষ্ণকেশী ছিলেন ।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়ার শাসন

📄 ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়ার শাসন


মু'আবিয়া (রা) তাঁর মৃত্যুর পর হাসান ইবন আলী (রা)-কে শাসন ক্ষমতা প্রদানের ওয়াদা করেছিলেন । তাঁর কোন কোন প্রশাসক পুত্র ইয়াযীদকে স্থলবর্তী নিয়োগের পরামর্শ দিলেন । তবে হযরত মু'আবিয়া (রা) সে বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন । কিন্তু হযরত হাসান (রা)-এর ইন্তিকালের পর হযরত মু'আবিয়া (রা)- এর অন্তরে ইয়াযীদের বিষয়টি প্রবল হলো , সন্তানের প্রতি পিতার স্নেহের প্রাবল্যবশত ইয়াযীদকে তিনি শাসন ক্ষমতার উপযুক্তও মনে করতেন । এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা)-এর সঙ্গে আলোচনাকালে তিনি বলেছিলেন, আমার আশংকা হয়েছে যে, মৃত্যুর পর প্রজা সাধারণকে হয়ত রাখালবিহীন বৃষ্টিভেজা বকরী পালের ন্যায় আমাকে রেখে যেতে হবে । বায়'আত গ্রহণের সময় ইয়াযীদের বয়স ছিলো ৩৪ বছর ।
৪৯ হিজরীতে মু'আবিয়া (রা) ইয়াযীদের অনুকূলে বায়'আত গ্রহণের জন্য লোকদের আহ্বান জানালেন । এতে সাধারণ মানুষের মাঝে অসন্তোষ সৃষ্টি হলো । কেননা ইয়াযীদের জীবনযাত্রা ও খেলাধুলায় আত্মনিমগ্নতা ও শিকারপ্রিয়তার কথা তাদের অজানা ছিলো না । কেউ কেউ ইয়াযীদকে খিলাফতের প্রার্থী না হওয়ার পরামর্শ দিলো এবং তাকে বোঝালো যে, এর পেছনে চেষ্টা করার চেয়ে তা পরিত্যাগ করা তার জন্য কল্যাণকর হবে । ফলে ইয়াযীদ তার ইচ্ছা থেকে সরে দাঁড়ালো এবং পিতার সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হলো , তখন উভয়ে বিষয়টি প্রত্যাহার করে নিতে একমত হলেন ।
৫৬ হিজরীতে মু'আবিয়া (রা) পুনরায় ইয়াযীদের খিলাফতের প্রস্তাব করলেন এবং বিষয়টি সুসংগঠিত রূপ দিতে শুরু করলো , এমনকি পুত্র ইয়াযীদের অনুকূলে তিনি বায়'আত অনুষ্ঠিত করলেন এবং সকল অঞ্চলে এ মর্মে লিখিত ফরমান পাঠিয়ে দিলেন । ফলে লোকেরা তার হাতে বায়'আত হলো । কিন্তু আবদুর রহমান ইব্‌ন আবূ বকর , আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন যোবায়র , আবদুল্লাহ ইবন উমর , হুসায়ন ইন্ন আলী ও ইব্‌ন আব্বাস (রা) বায়'আত হতে বিরত থাকলেন ।
এদিকে হযরত মু'আবিয়া (রা) উমরার জন্য মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করলেন । মদীনায় তিনি উপরোক্তদের উপস্থিতিতে ভাষণ দিলেন , আর মানুষ ইয়াযীদের অনুকূলে বায়'আত হলো । কিন্তু তাঁরা সমর্থন না জানিয়ে বসেছিলেন তবে তাঁর ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে কোন রকমের প্রতিবাদেরও প্রকাশ ঘটান নি । ফলে সকল অঞ্চলে ইয়াযীদের বায়'আত সম্পন্ন হয়ে গেলো এবং সকল অঞ্চল থেকে ইয়াযীদের সাক্ষাতে প্রতিনিধি দলের আগমন হতে লাগলো । [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮০]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 ইয়াযীদের জীবন ও চরিত্র

📄 ইয়াযীদের জীবন ও চরিত্র


ইমাম তাবারানী বলেন, অল্প বয়সে ইয়াযীদ 'পানীয়' ধরেছিলেন , যেমন শখের বশে অল্প বয়স্করা ধরে থাকে ।
ইব্‌ন কাসীর (র) বলেন, ইয়াযীদের চরিত্রে বদান্যতা , সহনশীলতা-বিশুদ্ধভাষিতা , কাব্যরুচি , সাহসিকতা , প্রশাসনিক দক্ষতা ইত্যাদি কতিপয় গুণ ছিলো । তদুপরি সে ছিলো সুদর্শন এবং আচার-আচরণে মার্জিত । তবে কিছু প্রবৃত্তিপরায়ণতা ছিলো , কখনো কখনো সালাত ছেড়ে দিতো । আর অধিকাংশ সময় সালাতে অবহেলা করতো । তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিলো , মদ পান ও আনুষঙ্গিক কোন কোন অশ্লীল কাজে লিপ্ততা , তবে তার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার কোন অভিযোগ ছিলো না । ফাসিক ও পাপাচারী ছিলো অবশ্যই ।
বর্ণিত আছে, গান বাজনা , মদ পান , সুন্দরী দাস-দাসীর সঙ্গ , কুকুর পোষা , বানর , ভালুক ও ভেড়ার লড়াই এগুলোতে ইয়াযীদের আসক্তি ছিলো বহুল আলোচিত । ২৫ কিংবা ২৬ কিংবা ২৭ হিজরীতে সে জন্মগ্রহণ করেছিলো । পিতার জীবদ্দশায় এ শর্তে তার অনুকূলে বায়'আত গ্রহণ করা হয়েছিলো যে, পিতার মৃত্যুর পর তিনি হবেন পরবর্তী খলীফা । অতঃপর পিতা হযরত মু'আ'বিয়া (রা)-এর ইন্তিকালের পর ৬০ হিজরীর মধ্যরজবে পুনঃ বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ।
উমর ইবন খাত্তাব (রা) বলেছেন, "কাবার রবের শপথ ! আমি জানি , আরবগণ কখন ধ্বংস হবে । যখন তাদের শাসক হবে এমন কোন ব্যক্তি যে জাহিলিয়াতের যমানা দেখেনি এবং ইসলামেও সে প্রবীণ নয় ।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৩২]
ইয়াযীদের জীবন ও চরিত্রের পূর্ববর্ণিত রূপ থেকেই এটা পরিষ্কার যে, ইয়াযীদের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ এমন সাধারণ কোন ঘটনা ছিলো না , যা খিলাফতে রাশেদার সংলগ্ন পরবর্তী যুগে বরদাশত করা যেতে পারে । বিশিষ্ট সাহাবা কিরামের ও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী তাবেঈনের এক বিরাট জামাআত তখনও জীবদ্দশায় ছিলেন । তাঁদের মাঝে এমন বহু ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা খিলাফতের দায়িত্ব পালন , মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব গ্রহণ এবং যেসব মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ইসলামের আবির্ভাব , কুরআনের অবতরণ ও খিলাফাত ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিলো সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইয়াযীদের চেয়ে বহু গুণে যোগ্য ছিলেন , সেজন্য এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতররূপে গ্রহণ করাই ছিলো স্বাভাবিক । পরবর্তী কোন কালে হয়তো বিষয়টি এতটা গুরুতর বিবেচিত হতো না , যেমন ইতিহাসের বাস্তবতায় দেখা গেছে ।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা

📄 কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা


কারবালার যে মর্মন্তুদ ঘটনায় প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত ও লজ্জাবনত , সম্ভব হলে কলমের কালিতে এ ঘটনা আমরা কিছুতেই লিপিবদ্ধ করতাম না , বরং অপরাধীর ন্যায় তা এড়িয়ে যেতাম । কিন্তু ইতিহাস তো সব ঘটনার সাক্ষী ! যত বিচিত্রই হোক তার গতি-প্রকৃতি এবং মানুষের হৃদয়ে তা যত রক্তক্ষরণই করুক না কেন, সেই ইতিহাসের দাবি রক্ষার জন্যই আমাদেরকে আজ কারবালার কথা বলতে হবে যাতে আলোচনা সর্বাঙ্গ পূর্ণ হয় এবং ইতিহাসের পাতায় বাস্তব ঘটনা সংরক্ষিত হয় । সর্বোপরি হৃদয় ও বিবেকের নিকট যাতে কিঞ্চিৎ কৈফিয়ত পেশ করা যায় এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ পাঠকবর্গের অন্তরে সামান্য সান্ত্বনার সঞ্চার হয় , যাঁরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর আহলে বায়তের সম্মান ও মর্যাদা জানেন এবং উম্মতের প্রতি তাঁদের ইহসান ও অবদান কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেন ।
হযরত হুসায়ন ইব্‌ন আলী (রা) ইয়াযীদের হাতে বায়'আত গ্রহণ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং স্বীয় নীতি ও অবস্থানে অটল থেকে প্রাণপ্রিয় নানাজানের শহর মদীনায় অবস্থান করতে লাগলেন । ইয়াযীদ ও ক্ষমতাসীন মহল বায়'আত গ্রহণ থেকে হযরত হুসায়ন (রা)-এর বিরত থাকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছিলো , অথচ আবদুল্লাহ্ ইবন উমর , আবদুর রহমান ইব্‌ন আবু বকর , আবদুল্লাহ ইব্‌ন যুবায়র (রা) প্রমুখের বেলায় তারা ততটা গুরুত্ব দেয়নি । এর কারণ এদিকে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর সঙ্গে তাঁর নিকটতম সম্পর্কের কারণে মুসলিম উম্মাহর অন্তরে তাঁর প্রতি অখণ্ড ভক্তি-শ্রদ্ধা ও প্রেম-ভালোবাসা । অন্যদিকে মু'আবিয়া (রা)-এর শাসন ক্ষমতার বিরুদ্ধে তাঁর মহান পিতার সংগ্রাম-ঐতিহ্যের কারণে মুসলিম সমাজের অপরিসীম প্রভাব-প্রতিপত্তি । কিন্তু হযরত হুসায়ন (রা) বিন্দুমাত্র নমনীয়তা ও বশ্যতা স্বীকার করলেন না এবং পূর্ণ উপলব্ধি ও সচেতনতার সাথে যে নীতি ও অবস্থান তিনি গ্রহণ করেছিলেন তা থেকে বিন্দু পরিমাণ বিচ্যুত হলেন না ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px