📄 হযরত হাসান (রা)-এর নির্ভুল সিদ্ধান্ত
মু'আবিয়া (রা)-এর সাথে সন্ধির প্রতিষ্ঠা ও তাঁর অনুকূলে খিলাফত থেকে সরে দাঁড়ানোর যে সিদ্ধান্ত হযরত হাসান (রা) গ্রহণ করেছিলেন তা ছিলো অত্যন্ত সময়োপযোগী ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত । তদ্রূপ পরবর্তীতে ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়া (রা)-এর বিপক্ষে হযরত হুসায়ন (রা) যে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন যার আলোচনা সামনে আসছে , সেটাও সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো । বস্তুত যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে ও যে স্থানকালে ঘটনা প্রবাহ সংঘটিত হয় এবং কঠিন সিদ্ধান্ত ও অবস্থান গৃহীত হয় সেই পরিবেশ-পরিস্থিতি ও স্থান-কালের তাপমাত্রা স্বভাবতই ওঠানামা করে থাকে । আর সেই ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করেই পরিবর্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অনিবার্য হয়ে পড়ে । আর একথা তো অনস্বীকার্য যে, জীবন , চরিত্র, দীন , ধর্ম , নবী সান্নিধ্য ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে হযরত মু'আবিয়া ও তার পুত্রের মাঝে কোন তুলনাই করা চলে না ।
তাছাড়া মু'আবিয়া (রা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহ বজায় রাখার পরিণাম মুসলিম উম্মাহর রক্তস্রোত প্রবাহিত করা এবং নবীন ইসলামী সমাজে অতি প্রয়োজনীয় শান্তি-শৃঙ্খলা , আস্থা ও স্থিতিশীলতার পরিবর্তে যুদ্ধাবস্থার চরম উন্মাদনা ও ভয়াবহ নৈরাজ্য বজায় রাখা ছাড়া আর কিছুই হতো না , অথচ তাঁর সেনাবাহিনী ছিলো অস্থির , উচ্ছৃঙ্খল ও অবাধ্য । ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কারণে বিদ্রোহ কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা করতে তাদের কোন দ্বিধাবোধ ছিলো না ।
হযরত হাসান (রা) তাঁর ও তাঁর পিতার সমর্থনের দাবিদার এই ইরাকী বাহিনীর স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ছিলেন । এই বাহিনীর অবিশ্বস্ততা এবং চরম মুহূর্তে অবিচলতা ও দৃঢ়তার পরিবর্তে পক্ষত্যাগ ও অবাধ্যতা প্রদর্শনের কারণে তাঁর মহান পিতা যে কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন , তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও খেয়াল-খুশির যে কঠিন মাশুল তাঁকে দিতে হয়েছে তা তাঁর চেয়ে বেশি আর কে জানবে ? ইরাকীদের প্রতি যে তীব্র ক্ষোভ ও মনোবেদনা , অভিযোগ ও সমালোচনা তিনি তাঁর বিভিন্ন ভাষণে প্রকাশ করেছেন সেগুলো তাঁর সামনে বিদ্যমান ছিলো । সুতরাং যে সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেছিলেন একজন দূরদর্শী ও উম্মতের প্রতি দরদী নেতার পক্ষে তা থেকে অপর কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিলো না ।
📄 হুসায়ন ইবন আলী (রা)
৪ হিজরীর ৫ শাবান হুসায়ন ইবন আলী (রা) জন্মগ্রহণ করেছিলেন । রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে খেজুর চিবিয়ে দিয়েছিলেন এবং আপন পবিত্র থু থু তাঁর মুখে দান করেছিলেন । তাঁর জন্য দু'আ করেছিলেন এবং হুসায়ন নাম রেখেছিলেন ।
ইতিপূর্বেও আমরা বলেছি , হযরত হাসানের মুখমণ্ডল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মুখমণ্ডলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো । পক্ষান্তরে হযরত হুসায়ন (রা)-এর দেহ নবী-এর পবিত্র দেহের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো ।
হুসায়ন (রা) নবী ﷺ-এর জীবদ্দশার ৬ বছর ৬ মাসের মত সময় পেয়েছিলেন । নবী ﷺ-এর ওফাত হয়েছিলো ১১ হিজরীর ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার ।
হযরত আবূ আইয়ূব আনসারী (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে হাযির হলাম , তখন হাসান ও হুসায়ন (রা) তাঁর বুকের ওপর বসে খেলা করছিলেন । আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আপনি কি তাদেরকে ভালোবাসেন ? তিনি বললেন, কেমনে ভালো না বেসে পারি ? তারা তো হলো দুনিয়াতে আমার (আল্লাহপ্রদত্ত) সম্পদ । [তাবারানী]
হযরত হারিস (র) হযরত আলী (রা) হতে মারফু সনদে বর্ণনা করেন , الحسن والحسين سيدا شباب اهل الجنة "হাসান ও হুসায়ন হলেন জান্নাতী যুবকগণের সরদার ।"
তাবারানী বর্ণিত অন্য একটি 'মুরসাল' হাদীসে রয়েছে , নবী একবার হযরত হুসায়ন (রা)-কে কাঁদতে শুনে তাঁর আম্মা ফাতিমাকে বললেন, তুমি কি জান না যে, তার কান্না আমাকে কষ্ট দেয় ? মু'আবিয়া-পুত্র ইয়াযীদের নেতৃত্বে কনস্টান্টিনোপল অভিযানে প্রেরিত বাহিনীতে তিনি শরীক ছিলেন , এটা ছিলো ৫১ হিজরীর ঘটনা ।
নামায , রোযা , হজ্জ ইত্যাদি ইবাদত তিনি প্রচুর পরিমাণে করতেন । তিনি পায়ে হেঁটে বিশবার হজ্জ করেছেন ।
হুসায়ন (রা) ছিলেন স্বভাব বিনয়ী । একদল দরিদ্র লোকের পাশ দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন । সওয়ারির ওপর থেকে তাদেরকে তিনি সালাম করলেন । তারা মাটিতে দস্তরখান পেতে রুটির টুকরো খাচ্ছিলো , তারা তাঁকে দস্তরখানে শরীক হওয়ার দাওয়াত দিয়ে বললো, আসুন, হে আল্লাহর রাসূলের দৌহিত্র ! তিনি সওয়ারি থেকে নেমে এসে বললেন, আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না । অতঃপর তিনি তাদের সাথে বসে খানায় শরীক হলেন । সবাই যখন আহার শেষ করলো তখন তিনি তাদের বললেন, তোমরা আমাকে দাওয়াত দিয়েছো , আমি তোমাদের দাওয়াত কবুল করেছি । এখন আমি তোমাদেরকে আমার ঘরে দাওয়াত করছি । তারা দাওয়াত কবুল করে তাঁর বাড়িতে হাযির হলে হযরত হুসায়ন (রা) তখন দাসীকে ডেকে বললেন, হে রাবার , ঘরে কি রেখেছো , দাও ।
হযরত ইব্ন উয়ায়না (রহ) আবদুল্লাহ ইবন আবু যায়দ হতে বর্ণনা করেন , তিনি বলেন, হুসায়ন ইব্ন আলী (রা)-কে আমি দেখেছি , দাড়ির সামনের দিকে কয়েকটি চুল ছাড়া তিনি সম্পূর্ণ কৃষ্ণকেশী ছিলেন ।
📄 ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়ার শাসন
মু'আবিয়া (রা) তাঁর মৃত্যুর পর হাসান ইবন আলী (রা)-কে শাসন ক্ষমতা প্রদানের ওয়াদা করেছিলেন । তাঁর কোন কোন প্রশাসক পুত্র ইয়াযীদকে স্থলবর্তী নিয়োগের পরামর্শ দিলেন । তবে হযরত মু'আবিয়া (রা) সে বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন । কিন্তু হযরত হাসান (রা)-এর ইন্তিকালের পর হযরত মু'আবিয়া (রা)- এর অন্তরে ইয়াযীদের বিষয়টি প্রবল হলো , সন্তানের প্রতি পিতার স্নেহের প্রাবল্যবশত ইয়াযীদকে তিনি শাসন ক্ষমতার উপযুক্তও মনে করতেন । এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা)-এর সঙ্গে আলোচনাকালে তিনি বলেছিলেন, আমার আশংকা হয়েছে যে, মৃত্যুর পর প্রজা সাধারণকে হয়ত রাখালবিহীন বৃষ্টিভেজা বকরী পালের ন্যায় আমাকে রেখে যেতে হবে । বায়'আত গ্রহণের সময় ইয়াযীদের বয়স ছিলো ৩৪ বছর ।
৪৯ হিজরীতে মু'আবিয়া (রা) ইয়াযীদের অনুকূলে বায়'আত গ্রহণের জন্য লোকদের আহ্বান জানালেন । এতে সাধারণ মানুষের মাঝে অসন্তোষ সৃষ্টি হলো । কেননা ইয়াযীদের জীবনযাত্রা ও খেলাধুলায় আত্মনিমগ্নতা ও শিকারপ্রিয়তার কথা তাদের অজানা ছিলো না । কেউ কেউ ইয়াযীদকে খিলাফতের প্রার্থী না হওয়ার পরামর্শ দিলো এবং তাকে বোঝালো যে, এর পেছনে চেষ্টা করার চেয়ে তা পরিত্যাগ করা তার জন্য কল্যাণকর হবে । ফলে ইয়াযীদ তার ইচ্ছা থেকে সরে দাঁড়ালো এবং পিতার সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হলো , তখন উভয়ে বিষয়টি প্রত্যাহার করে নিতে একমত হলেন ।
৫৬ হিজরীতে মু'আবিয়া (রা) পুনরায় ইয়াযীদের খিলাফতের প্রস্তাব করলেন এবং বিষয়টি সুসংগঠিত রূপ দিতে শুরু করলো , এমনকি পুত্র ইয়াযীদের অনুকূলে তিনি বায়'আত অনুষ্ঠিত করলেন এবং সকল অঞ্চলে এ মর্মে লিখিত ফরমান পাঠিয়ে দিলেন । ফলে লোকেরা তার হাতে বায়'আত হলো । কিন্তু আবদুর রহমান ইব্ন আবূ বকর , আবদুল্লাহ্ ইব্ন যোবায়র , আবদুল্লাহ ইবন উমর , হুসায়ন ইন্ন আলী ও ইব্ন আব্বাস (রা) বায়'আত হতে বিরত থাকলেন ।
এদিকে হযরত মু'আবিয়া (রা) উমরার জন্য মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করলেন । মদীনায় তিনি উপরোক্তদের উপস্থিতিতে ভাষণ দিলেন , আর মানুষ ইয়াযীদের অনুকূলে বায়'আত হলো । কিন্তু তাঁরা সমর্থন না জানিয়ে বসেছিলেন তবে তাঁর ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে কোন রকমের প্রতিবাদেরও প্রকাশ ঘটান নি । ফলে সকল অঞ্চলে ইয়াযীদের বায়'আত সম্পন্ন হয়ে গেলো এবং সকল অঞ্চল থেকে ইয়াযীদের সাক্ষাতে প্রতিনিধি দলের আগমন হতে লাগলো । [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮০]
📄 ইয়াযীদের জীবন ও চরিত্র
ইমাম তাবারানী বলেন, অল্প বয়সে ইয়াযীদ 'পানীয়' ধরেছিলেন , যেমন শখের বশে অল্প বয়স্করা ধরে থাকে ।
ইব্ন কাসীর (র) বলেন, ইয়াযীদের চরিত্রে বদান্যতা , সহনশীলতা-বিশুদ্ধভাষিতা , কাব্যরুচি , সাহসিকতা , প্রশাসনিক দক্ষতা ইত্যাদি কতিপয় গুণ ছিলো । তদুপরি সে ছিলো সুদর্শন এবং আচার-আচরণে মার্জিত । তবে কিছু প্রবৃত্তিপরায়ণতা ছিলো , কখনো কখনো সালাত ছেড়ে দিতো । আর অধিকাংশ সময় সালাতে অবহেলা করতো । তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিলো , মদ পান ও আনুষঙ্গিক কোন কোন অশ্লীল কাজে লিপ্ততা , তবে তার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার কোন অভিযোগ ছিলো না । ফাসিক ও পাপাচারী ছিলো অবশ্যই ।
বর্ণিত আছে, গান বাজনা , মদ পান , সুন্দরী দাস-দাসীর সঙ্গ , কুকুর পোষা , বানর , ভালুক ও ভেড়ার লড়াই এগুলোতে ইয়াযীদের আসক্তি ছিলো বহুল আলোচিত । ২৫ কিংবা ২৬ কিংবা ২৭ হিজরীতে সে জন্মগ্রহণ করেছিলো । পিতার জীবদ্দশায় এ শর্তে তার অনুকূলে বায়'আত গ্রহণ করা হয়েছিলো যে, পিতার মৃত্যুর পর তিনি হবেন পরবর্তী খলীফা । অতঃপর পিতা হযরত মু'আ'বিয়া (রা)-এর ইন্তিকালের পর ৬০ হিজরীর মধ্যরজবে পুনঃ বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ।
উমর ইবন খাত্তাব (রা) বলেছেন, "কাবার রবের শপথ ! আমি জানি , আরবগণ কখন ধ্বংস হবে । যখন তাদের শাসক হবে এমন কোন ব্যক্তি যে জাহিলিয়াতের যমানা দেখেনি এবং ইসলামেও সে প্রবীণ নয় ।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৩২]
ইয়াযীদের জীবন ও চরিত্রের পূর্ববর্ণিত রূপ থেকেই এটা পরিষ্কার যে, ইয়াযীদের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ এমন সাধারণ কোন ঘটনা ছিলো না , যা খিলাফতে রাশেদার সংলগ্ন পরবর্তী যুগে বরদাশত করা যেতে পারে । বিশিষ্ট সাহাবা কিরামের ও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী তাবেঈনের এক বিরাট জামাআত তখনও জীবদ্দশায় ছিলেন । তাঁদের মাঝে এমন বহু ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা খিলাফতের দায়িত্ব পালন , মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব গ্রহণ এবং যেসব মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ইসলামের আবির্ভাব , কুরআনের অবতরণ ও খিলাফাত ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিলো সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইয়াযীদের চেয়ে বহু গুণে যোগ্য ছিলেন , সেজন্য এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতররূপে গ্রহণ করাই ছিলো স্বাভাবিক । পরবর্তী কোন কালে হয়তো বিষয়টি এতটা গুরুতর বিবেচিত হতো না , যেমন ইতিহাসের বাস্তবতায় দেখা গেছে ।