📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত হাসান (রা) সম্পর্কে নববী ভবিষ্যদ্বাণীর গুরুত্ব ও তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

📄 হযরত হাসান (রা) সম্পর্কে নববী ভবিষ্যদ্বাণীর গুরুত্ব ও তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব


হযরত হাসান (রা) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী যে , আল্লাহ্ তাঁর মাধ্যমে মুসলমানদের দু'টি যুদ্ধরত দলের মাঝে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত করবেন । এটা নিছক একটি ভবিষ্যদ্বাণী ছিলো না , যা হযরত হাসান ও অন্যান্য সাহাবা কিরাম শুনেছেন এবং অন্যান্য নববী ভবিষ্যদ্বাণীর ন্যায় এটাকেও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছেন । এরপর ঘটনা শেষ হয়ে গেছে , বরং এ ভবিষ্যদ্বাণীর আলাদা তাৎপর্য এই যে, এটা ছিলো হযরত হাসান (রা)-এর উদ্দেশে উচ্চারিত এক দিকনির্দেশনামূলক বাণী যা তাঁর ভবিষ্যত জীবনের চিন্তা , কর্ম, নীতি ও আদর্শকে নিয়ন্ত্রণ করেছে । এতে কোন সন্দেহ নেই যে, উপরোক্ত ভবিষ্যদ্বাণী হযরত হাসান (রা)-এর অন্তরের অন্তস্থলে প্রবেশ করে ছিলো এবং তাঁর অনুভূতিকে পূর্ণরূপে আচ্ছন্ন করে ছিলো এবং তার রক্তমাংসে মিশে গিয়েছিলো । ফলে এটাকে তিনি তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহ্-এর একটি অসিয়তরূপে গ্রহণ করেছিলেন ।
তাঁর প্রিয়নবী ও প্রিয় নানাজানের মুখে যখন তিনি এ শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছিলেন এবং এটাকে তিনি তাঁর প্রতি তাঁর স্নেহ-ভালোবাসার কারণরূপে উল্লেখ করছিলেন তখন তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে অপার্থিব আনন্দের ছাপ ও তাঁর দু'চোখে নূরের একটা ঝিলিক অবশ্যই তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যা তাঁর হৃদয়ের গভীরে রেখাপাত করেছিলো । ফলে এটাকে তিনি জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যরূপে এবং ভবিষ্যতের সর্বোচ্চ আদর্শরূপে আঁকড়ে ধরেছিলেন ।
বস্তুত হযরত হাসান (রা)-এর পরবর্তী জীবনের প্রতিটি আচার-আচরণে ও প্রতিটি বক্তব্যের উচ্চারণে এই মহান নববী ভবিষ্যদ্বাণীর ছাপ প্রকাশ পেয়েছিলো , এমনকি তাঁর মহান পিতা যাঁকে আল্লাহ্ এমন কিছু গুণ ও প্রতিভা দান করেছিলেন যাতে এই উম্মতের খুব কম সদস্যই তাঁর অংশীদার হতে পেরেছিলো । আর পুত্রত্ব ও নিকট সান্নিধ্যের সুবাদে সে বিষয়ে হযরত হাসান (রা)-ই সর্বাধিক অবগত ছিলেন । তাই মহান পিতাকে তিনি মহান পুত্রের মতোই ভালোবাসতেন এবং গুণমুগ্ধ ও অভিভূত হৃদয়েই তাঁর প্রতি অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন , অথচ এমন মহান পিতার সাথে কথোপকথনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি । বর্ণিত আছে, হযরত উসমান (রা)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর হযরত আলী (রা)-কে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন তিনি লোক সমাজের সংস্পর্শ ত্যাগ করে যে কোন নির্জন স্থানে ইচ্ছা চলে যান যতক্ষণ না আরবদের বুদ্ধি-বিবেচনা ফিরে আসে । তিনি তাঁকে বললেন ,
لو كنت في حجر ضب لا ستخرجول منه فبايعوك دون أن تعرض نفسك لهم .
"তবে গুঁই সাপের গর্তেও যদি আপনি আত্মগোপন করেন মানুষ আপনাকে বের করে এনে আপনার হাতে বায়'আত হবে , নিজেকে তাদের সামনে তুলে ধরা ছাড়া ।"
তদ্রূপ হযরত আলী (রা) যখন সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে বাহিনী প্রস্তুত করার উদ্যোগ আয়োজন শুরু করলেন এবং অনুগত ও নিবেদিতপ্রাণ লোকদের নিয়ে অবাধ্য ও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশে মদীনা থেকে যাত্রা করলেন তখন হযরত হাসান ইব্‌ন আলী (রা) তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললেন ,
يا ابت دع هذا ، فان فيه سغل دماء المسلمين ওوقوع الاختلاف
"হে পিতা ! এ বর্জন করুন । কেননা এতে মুসলমানদের রক্তপাত হবে এবং তাদের মাঝে অনৈক্য দেখা দেবে ।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৯-২৩০]
কিন্তু হযরত আলী (রা) তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেন নি । কেননা আমর বিন মারূফ ও নাহী আনিল মুনকারের আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান পালন না করে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার এবং প্রাপককে তার অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা না চালিয়ে মানুষকে ফাসাদের মুখে ছেড়ে দেয়া সঠিক মনে করেন নি । আর প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব চিন্তা ও যুক্তি ।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত হাসান (রা)-এর খিলাফত ও মু'আবিয়া (রা)-এর সঙ্গে তাঁর সন্ধি

📄 হযরত হাসান (রা)-এর খিলাফত ও মু'আবিয়া (রা)-এর সঙ্গে তাঁর সন্ধি


ইব্‌ন মুলজিম যখন হযরত আলী (রা)-কে হামলা করলো , তখন সকলে তাঁর খিদমতে আরয করলো , হে আমীরুল মু'মিনীন ! স্থলবর্তী নিয়োগ করুন । তিনি বললেন, না, বরং আমি তোমাদেরকে এভাবেই ছেড়ে যাবো , যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ খলীফা নিযুক্ত না করে ছেড়ে গিয়েছিলেন । অতঃপর আল্লাহ্ যদি তোমাদের কল্যাণ চান তাহলে তোমাদেরকে তিনি তোমাদের মধ্যকার সর্বোত্তম ব্যক্তির পাশে একত্র করবেন যেমন রাসূলুল্লাহ্-এর পর তোমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তির পাশে একত্র করেছিলেন । [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪]
কিন্তু মানুষ হযরত আলী (রা)-এর আহত হওয়ার দিন , ৪০ হিজরীর ১৭ রমযান রোয শুক্রবার হযরত হাসান (রা)-এর হাতে বায়'আত হলো ।
আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (র) বলেন, আলী (রা)-এর শাহাদাতের পর হযরত হাসান (রা)-এর বায়'আত যখন সম্পন্ন হলো তখন কায়স ইব্‌ন সা'দ ইব্‌ন উবাদা হযরত হাসান (রা)-কে সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে বের হওয়ার জন্য চাপ দিলেন , অথচ হযরত হাসান (রা)-এর কারো বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মনোভাব ছিলো না কিন্তু তারা তাঁকে মত পরিবর্তনে বাধ্য করে ফেললো । তখন তারা এমন বিরাট সৈন্য সমাবেশ ঘটালো যার নযীর ইতিপূর্বে দেখা যায়নি । তখন হাসান ইব্‌ন আলী (রা) কায়স ইবন সা'আদকে অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে বার হাজার সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দিলেন । আর তিনি মূল বাহিনী নিয়ে মু'আবিযা (রা) ও তাঁর অনুগামী সিরীয়দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশে অগ্রবর্তী বাহিনীর পেছনে রওয়ানা হলেন । মাদায়েন অতিক্রমের সময় তিনি সেখানে যাত্রা বিরতি করলেন । আর অগ্রগামী বাহিনী আগে বেড়ে গেলো ।
মাদায়েনের উপকণ্ঠে যখন তিনি ছাউনি ফেলে অবস্থান করছিলেন তখন হঠাৎ অজ্ঞাত এক ব্যক্তি বাহিনীর মাঝে চিৎকার জুড়ে দিয়ে বললো, সাবধান হও ! কায়স ইব্‌ন সা'দ ইব্‌ন ওবাদা নিহত হয়েছেন । এ ঘোষণার ফলে চরম নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা দেখা দিলো । সৈন্যবাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে নিজেদের মাঝেই লুটতরাজ শুরু করে দিলো , এমনকি হযরত হাসান (রা)-এর শামিয়ানাও লুট করে নিলো এবং যে চাদর বিছিয়ে তিনি বসা ছিলেন সেটা নিয়েও টানাটানি শুরু করে দিলো । তিনি যখন আরোহণ করতে যাচ্ছিলেন তখন একজন তাঁকে খঞ্জরাঘাতে জখম করে ফেললো । এতে হযরত হাসান (রা) তাঁর বাহিনীর প্রতি নিতান্ত বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লেন এবং আহত অবস্থায় মাদায়েনের কাছে আবওয়ামে প্রবেশ করলেন ।
বাহিনী কাছরে আবিয়াতে স্থির হওয়ার পর মুখতার ইব্‌ন আবূ ওবায়দ , আল্লাহ্ তাকে অপদস্থ করুন - তার চাচা সা'দ ইবন মাসউদকে যিনি মাদায়েনের প্রশাসক ছিলেন , বললো, আপনি কী মর্যাদা ও সম্পদ প্রাচুর্য কামনা করেন ? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী সেটা ? সে বললো, হাসান ইব্‌ন আলীকে কয়েদ করে মু'আবিয়ার কাছে পৌঁছে দিন । সা'আদ ইবন মাসউদ বললেন, আল্লাহ তোমাকে ও তোমার এই কুমতলবকে ধ্বংস করুন ! নবী-কন্যার পুত্রের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করবো ? [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪]
ইবন কাছীর (র) বলেন, ইরাকবাসীরা সিরীয়দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে হাসান ইব্‌ন আলী (রা)-কে দাঁড়িয়ে করিয়েছিলো । কিন্তু তাদের ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা পূর্ণ হলো না , বরং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বেই তারা সঙ্গ বর্জন শুরু করলো এবং নেতৃস্থানী গণের সাথে মতবিরোধ শুরু হলো । তাদের যদি অনুমতি থাকতো তাহলে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্রের হাতে বায়'আত গ্রহণের যে সৌভাগ্য আল্লাহ্ তাদের দান করেছিলেন , তারা তার কদর করতো । কেননা তিনি ছিলেন সাইয়েদুল মুসলিমীন । জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও বিচক্ষণতার অধিকারী বিশিষ্ট সাহাবা কিরামের অন্যতম ।
বাহিনীর শৃঙ্খলাহীনতা ও অবাধ্যতা দেখে তাদের প্রতি হযরত হাসান ইব্‌ন আলী (রা)-এর মন বিষিয়ে উঠলো এবং তিনি মু'আবিয়া ইব্‌ন আবু সুফিয়ান (রা)-এর নিকট পত্র লিখলেন । মুআবিয়া (রা) তখন সন্ধি ও সমঝোতার জন্য তাঁকে উদ্বুদ্ধ করছিলেন । হযরত হাসান (রা) কতিপয় শর্ত আরোপ করে জানালেন যে, মু'আবিয়া এগুলো মেনে নিলে মুসলমানদের মাঝে রক্তপাত বন্ধের স্বার্থে মু'আবিয়ার অনুকূলে তিনি খিলাফত থেকে সরে দাঁড়াবেন । এই শর্তে উভয় পক্ষ সন্ধিতে উপনীত হলো এবং মু'আবিয়া (রা)-এর বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলো । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৬]
ইব্‌ন কাছীর (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন , "আমার পরে খিলাফাত ত্রিশ বছর স্থায়ী হবে । অতঃপর রাজত্ব শুরু হবে । আর হাসান ইব্‌ন আলী (রা)-এর খিলাফতের মাধ্যমে ত্রিশ বছর পূর্ণ হয় । কেননা তিনি ৪১ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে মু'আবিয়া (রা)-এর অনুকূলে খিলাফত থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন । আর উক্ত সময় রাসূলুল্লাহ্-এর ওফাত থেকে শুরু করে পূর্ণ ত্রিশ বছর হয় ।
খিলাফত থেকে সরে দাঁড়ানোর পর মু'আবিয়া (রা)-এর অনুরোধে হযরত হাসান (রা) একটি ভাষণ প্রদান করেছিলেন । সেই ভাষণে তিনি হামদ-ছানার পর বলেছিলেন , اما بعد! ايها الناس ان الله هداكم باولنا وحقن دماءكم ياخرنا وان لهذا الأمر مرة والدينا دول وان ادرى لعله فتنة لكم ومتاع الى حين .
"অতঃপর হে লোক সকল ! আল্লাহ আমাদের প্রথমজন দ্বারা তোমাদের হিদায়াত দান করেছেন আর আমাদের শেষ জন দ্বারা তোমাদের রক্তপাত বন্ধ করেছেন । এ রাজত্ব হলো নির্ধারিত সময়ের জন্য । আর দুনিয়ার ধর্মই হলো উত্থান-পতন । আর আমি জানি না, হয়তো তোমাদের জন্য এটা পরীক্ষার বিষয় হবে এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য ভোগের বিষয় হবে ।"
এ ভাষণ মু'আবিয়া (রা)-এর পছন্দ হয়নি এবং তাঁর মনে সব সময় তা লেগেছিলো । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৮]
আবু আমির নামক জনৈক ব্যক্তি তাঁকে একবার এভাবে সম্বোধন করেছিলেন , হে মু'মিনদেরকে অপদস্থকারী , আপনাকে সালাম , তখন তিনি বললেন, হে আবু আমির ! একথা বলো না, আমি মু'মিনদেরকে অপদস্থকারী নই, বরং আমি রাজত্বের জন্য তাদের রক্তপাত পছন্দ করিনি । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৯]
ইবনে কাছীর (র) বলেন, সে বছর মু'আবিয়া (রা)-এর বায়'আতের বিষয়ে যখন ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলো তখন হযরত হাসান ইবন আলী (রা) তাঁর ভাই হোসাইন ইবন আলী (রা) , অন্যান্য ভাই ও চাচাত ভাই হযরত আমদুল্লাহ ইবন জাফরকে সঙ্গে নিয়ে ইরাক ভূমি থেকে মদীনার পুণ্যভূমির উদ্দেশে যাত্রা করলেন । মদীনায় মহান বাসিন্দার প্রতি সর্বোত্তম দরূদ ও সালাম ।
পথে যখনই তারা তাদের ভক্ত, অনুরক্ত ও সমর্থকদের কোন বস্তি অতিক্রম করছিলেন তারা তাঁকে মুআবিয়ার অনুকূলে খিলাফত ত্যাগের পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তাঁকে তিরস্কার করছিলো , অথচ এ বিষয়ে তিনি ছিলেন অকুণ্ঠ প্রশংসা পাওয়ার উপযুক্ত এবং তাঁর এ সিদ্ধান্ত ছিলো অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ । এ বিষয়ে তাঁর অন্তরে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিলো না, আফসোস বা অনুতাপ ছিলো না । বরং তিনি পূর্ণ সন্তুষ্ট ও আনন্দিত ছিলেন, যদিও তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও ভক্ত-প্রেমিকদের বিরাট অংশের নিকট যুগ যুগ ধরে আজ পর্যন্ত বিষয়টি লজ্জাজনক ও গ্লানিকর মনে হয়েছে । কিন্তু এক্ষেত্রে সঠিক পথ হলো সুন্নাতের অনুসরণ করা এবং তাঁর উসিলায় উম্মতের রক্তপাত বন্ধ হওয়ার কারণে তাঁর প্রশংসা করা যেমন রাসূলুল্লাহ প্রশংসা করেছিলেন ।
হযরত হাসান (রা)-এর ক্ষুব্ধ অনুগামীরা এই বলে তাঁকে সম্বোধন করতো , হে মু'মিনদের কলঙ্ক ! উত্তরে তিনি তাদের বলতেন, العار خير من النار "কলঙ্ক বহন অগ্নি-দহন হতে উত্তম ।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪১]
আবূ দাউদ তায়ালসী (র) যোহায়র ইবন নাফীর হতে হাদীস বর্ণনা করেন । আর তিনি তাঁর পিতা নাফীর হতে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, হাসান ইবন আলী (রা)-কে একদিন আমি বললাম, মানুষ মনে করে, আপনি খিলাফতের প্রত্যাশী । তিনি বললেন, আরবের সমস্ত মাথা আমার মুঠোয় ছিলো । আমি যার সাথে সন্ধি করি তারাও সন্ধি করে । আমি যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করি তারাও অস্ত্র ধারণ করে । সে অবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে আমি তা পরিত্যাগ করেছি । এখন দ্বিতীয়বার হিজায ভূমি হতে আমি কি সে দাবি তুলতে পারি ?
আরেকবার তিনি বলেছেন, আমার ভয় হয়ে ছিলো যে, কিয়ামতের দিন সত্তর হাজার কিংবা আশি হাজার কিংবা কমবেশী মানুষ আমার বিরুদ্ধে হাযির হবে যাদের গলা থেকে রক্ত ঝরছে আর তারা সকলে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলছে, কি প্রয়োজনে আমাদের রক্তপাত করা হয়েছে ? [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৪২]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 শাহাদাত

📄 শাহাদাত


হযরত হাসান (রা)-কে বিষ প্রয়োগ করা হয়ে ছিলো আর সেটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়েছিলো । ওমায়র ইবন ইসহাক (রা) বলেন, আমি ও অন্য একজন কুরায়শী হযরত হাসান (রা)-এর খিদমতে হাযির হলাম । তিনি বললেন, কয়েক দফা আমাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে কিন্তু এবারের মতো এমন ভয়ঙ্কর বিষ আর কখনো প্রয়োগ করা হয়নি ।
যখন মৃত্যুর পূর্বে গড়গড়া শব্দ শুরু হলো তখন হযরত হুসায়ন (রা) তাঁর মাথার কাছে বসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, প্রিয় ভাই ! বলুন কে সে ? তিনি বললেন, তুমি কি তাকে হত্যা করতে চাও ? হুসায়ন (রা) বললেন, হ্যাঁ, তিনি বললেন, আমি যাকে সন্দেহ করছি যদি সে হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ প্রতিশোধ গ্রহণে অধিক কঠোর । আর যদি সে না হয়ে থাকে তাহলে আমার নামে এক নিরপরাধকে হত্যা করা আমার পছন্দ নয় । [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪২]
তাঁর জানাযায় এমন বিরাট সমাবেশ হয়েছিলো যে , জান্নাতুল বাকীতে আর একজনও মানুষ ধারণের স্থান ছিলো না । সালাবা ইবন আবূ মালিক হতে ওয়াকিদী বর্ণনা করেন । সালাবা বলেন, হাসান (রা) যেদিন শহীদ হলেন এবং বাকীতে দাফন হলো সেদিন আমি উপস্থিত ছিলাম । বাকীর অবস্থা এমন দেখলাম যে, সেখানে যদি একটি সুই ফেলা হতো তাহলে তা কোন-না-কোন মানুষের মাথায় পড়তো । [আল-ইসাবা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৩১]
বিশুদ্ধতম মতে হযরত হাসান (রা) ৫০ হিজরীর ৫ রবিউল ৪৭ বছর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন ।
হযরত আবু জাফর (রা) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন, মানুষ একাধারে সাত দিন হযরত হাসান (রা)-এর শোকে কেঁদেছে । বাজার ও দোকানপাট কিছুই খোলা হয়নি ।
হযরত আলী (রা)-এর মৃত্যুর পর ৪০ হিজরীর রমযান মাসের ২৩ তারিখে খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং একচল্লিশ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে মু'আবিয়া (রা)-এর সাথে সন্ধিতে উপনীত হন । সন্ধির বছরকে عام الجماعة বা ঐক্যের বছর নামে অভিহিত করা হয় । এই হিসেবে তাঁর খিলাফতকাল ছিলো ৬ মাস যাতে খিলাফতের ত্রিশ বছর পূর্ণ হয় । [জাওহারা, পৃষ্ঠা-২০৪]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত হাসান (রা)-এর নির্ভুল সিদ্ধান্ত

📄 হযরত হাসান (রা)-এর নির্ভুল সিদ্ধান্ত


মু'আবিয়া (রা)-এর সাথে সন্ধির প্রতিষ্ঠা ও তাঁর অনুকূলে খিলাফত থেকে সরে দাঁড়ানোর যে সিদ্ধান্ত হযরত হাসান (রা) গ্রহণ করেছিলেন তা ছিলো অত্যন্ত সময়োপযোগী ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত । তদ্রূপ পরবর্তীতে ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়া (রা)-এর বিপক্ষে হযরত হুসায়ন (রা) যে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন যার আলোচনা সামনে আসছে , সেটাও সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো । বস্তুত যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে ও যে স্থানকালে ঘটনা প্রবাহ সংঘটিত হয় এবং কঠিন সিদ্ধান্ত ও অবস্থান গৃহীত হয় সেই পরিবেশ-পরিস্থিতি ও স্থান-কালের তাপমাত্রা স্বভাবতই ওঠানামা করে থাকে । আর সেই ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করেই পরিবর্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অনিবার্য হয়ে পড়ে । আর একথা তো অনস্বীকার্য যে, জীবন , চরিত্র, দীন , ধর্ম , নবী সান্নিধ্য ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে হযরত মু'আবিয়া ও তার পুত্রের মাঝে কোন তুলনাই করা চলে না ।
তাছাড়া মু'আবিয়া (রা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহ বজায় রাখার পরিণাম মুসলিম উম্মাহর রক্তস্রোত প্রবাহিত করা এবং নবীন ইসলামী সমাজে অতি প্রয়োজনীয় শান্তি-শৃঙ্খলা , আস্থা ও স্থিতিশীলতার পরিবর্তে যুদ্ধাবস্থার চরম উন্মাদনা ও ভয়াবহ নৈরাজ্য বজায় রাখা ছাড়া আর কিছুই হতো না , অথচ তাঁর সেনাবাহিনী ছিলো অস্থির , উচ্ছৃঙ্খল ও অবাধ্য । ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কারণে বিদ্রোহ কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা করতে তাদের কোন দ্বিধাবোধ ছিলো না ।
হযরত হাসান (রা) তাঁর ও তাঁর পিতার সমর্থনের দাবিদার এই ইরাকী বাহিনীর স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ছিলেন । এই বাহিনীর অবিশ্বস্ততা এবং চরম মুহূর্তে অবিচলতা ও দৃঢ়তার পরিবর্তে পক্ষত্যাগ ও অবাধ্যতা প্রদর্শনের কারণে তাঁর মহান পিতা যে কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন , তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও খেয়াল-খুশির যে কঠিন মাশুল তাঁকে দিতে হয়েছে তা তাঁর চেয়ে বেশি আর কে জানবে ? ইরাকীদের প্রতি যে তীব্র ক্ষোভ ও মনোবেদনা , অভিযোগ ও সমালোচনা তিনি তাঁর বিভিন্ন ভাষণে প্রকাশ করেছেন সেগুলো তাঁর সামনে বিদ্যমান ছিলো । সুতরাং যে সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেছিলেন একজন দূরদর্শী ও উম্মতের প্রতি দরদী নেতার পক্ষে তা থেকে অপর কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিলো না ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px