📄 এক নযরে তৎকালীন ইসলামী সমাজ
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা একান্ত জরুরী। তা এই যে, প্রিয় পাঠক! একান্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত চিত্তে মত বিরোধের যেসব ঘটনা আপনারা পাঠ করেছেন যা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়ে ছিলো তা ক্ষমতা ও নেতৃত্ব এবং শাসকবর্গ ও তাদের সেনাবাহিনীর পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিলো। পক্ষান্তরে অহী ও রিসালাতের পুণ্যভূমি জাযيرةতুল আরব থেকে ইসলামী বিজয়াভিযানের শেষ সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত গোটা ইসলামী সমাজ দীনের ওপর পূর্ণ অবিচল ছিলো। শরীয়তের যাবতীয় আহকাম ও বিধানের প্রতি ছিলো তাদের নিরংকুশ আনুগত্য। কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা এবং সুন্নাতের ওপর অতি গভীর অনুরাগ ছিলো তাদের অন্তরে। দীন ও ঈমান এবং ইলম ও আমলের ধারক-বাহক, হাদীস-বিশারদ ও ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞগণের প্রতি তাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিলো অটুট।
ইসলামের বৈশিষ্ট্যমূলক আহকাম সমাজের বুকে একই রকম সমুন্নত ছিলো। জুমুআ ও জামা'আত পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে আদায় করা হতো। সময় ও স্থানসহ হজ্জের যাবতীয় আরকান-আহকামে সামান্যতম পরিবর্তনও অনুপ্রবেশ করেনি। সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তি তথা খলীফার পক্ষ হতে নিযুক্ত আমীরের নেতৃত্বে হজ্জ অনুষ্ঠিত হতো। জিহাদও জারি ছিলো পূর্ণ উদ্দীপনার সাথে। কুরআনের হিফজ ও তিলাওয়াত একই ধারায় অব্যাহত ছিলো। তার উত্তাপে হৃদয় একই রকম বিগলিত হতো, চোখ থেকে একই ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হতো। দীন ও শরীয়তের আহকাম ও বিধানের ক্ষেত্রে কোন প্রকার পরিবর্তন ও বিকৃতি তখন দেখা দেয়নি।
মোটকথা, কিছু কিছু দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও এই ইসলামী সমাজ সমকালীন খ্রীস্টীয় সমাজ কিংবা অগ্নিপূজক সমাজ কিংবা হিন্দু সমাজ থেকে সর্বতোভাবেই উত্তম ছিলো। আল্লাহর ভয়, মৃত্যুচিন্তা, আখিরাত ও পরকাল ভাবনা, যাবতীয় পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে সংযম, বস্তু পূজা ও বিষয়-সম্পদের প্রতি অতি আসক্তি পরিহার এবং সকল কিছুকে স্থূল লাভ-লোকসানের মাপকাঠিতে বিচারের প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি, এক কথায় সার্বিক আত্মোৎর্ষের ক্ষেত্রে ইসলামী সমাজই ছিলো একক আদর্শ ও অনন্য দৃষ্টান্ত। আর এসব কিছু সম্ভব হয়েছিলো সেই মহান আসমানী কিতাবের কল্যাণে যা কোন প্রকার পরিবর্তন কিংবা সংস্কার দোষে দুষ্ট হয়নি এবং নবী ﷺ -এর সীরাত ও জীবনাদর্শের কল্যাণে যা সমাজের সর্বস্তরে প্রতিনিয়ত আলোচিত হয়ে আসছিলো। তাছাড়া সাহাবা কিরাম ও খুলাফায়ে রাশেদীনের জীবন ও কর্ম এবং মুজাহিদীন ও শহীদানের আত্মত্যাগ ও কুরবানী তাদের চোখের সামনে ছিলো। দুনিয়ার প্রতি নিরাশ ও পরহেযগার লোকদের প্রবল উপস্থিতি এবং আল্লাহ্র পথে আহ্বান তথা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ-এর মুবারক আমলও সমাজকে পূত-পবিত্র করে রেখেছিলো।
মোটকথা, মানুষের হৃদয়ে ও চিন্তায় যেমন দীনের সর্বোচ্চ মর্যাদা অক্ষুণ্ণ ছিলো তেমনি কর্মজীবনে ও দৈনন্দিন আচরণে দীনের একচ্ছত্র প্রভাব ও আত্মিক নিয়ন্ত্রণ অটুট ছিলো। এসব কিছু এজন্যই ছিলো যে, এই দীনের হিফাযতের ও আল্লাহর পথে দাওয়াতের মহান দায়িত্ব পালনকারী এই উম্মাহর কেয়ামত পর্যন্ত অস্তিত্ব রক্ষার যিম্মা আল্লাহ্ স্বয়ং গ্রহণ করেছেন।
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ .
"নিঃসন্দেহে আমরা কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরাই তার হিফাযত করবো।"
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَসَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونُ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا .
"তদ্রূপ তোমাদেরকে আমি মধ্যপন্থী উম্মতরূপে মনোনীত করেছি যেন তোমরা অপরাপর উম্মতের প্রতিপক্ষে সাক্ষী হতে পারো। আর রাসূল তোমাদের সাক্ষী হতে পারেন।"
আসলে বিশ্বজগতের অস্তিত্বের স্বার্থেই এই দীন ও এই উম্মতের হিফাযত জরুরী। কেননা এ দু'টির কোন বিকল্প নেই। যেহেতু মুসলিম উম্মাহ তখনো দাওয়াত ইলাল্লাহ্ ও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ্'র ক্ষেত্রে শূন্যতা পূরণ করে চলেছিলো, যেহেতু আকীদা ও বিশ্বাস এবং আমল ও কর্মের ক্ষেত্রে বিশ্বের মাঝে তারাই ছিলো শ্রেষ্ঠ সেহেতু আল্লাহ্ তাদের ওঁৎ পেতে থাকা শত্রু তথা খ্রীস্টান শক্তিকে যাদের কেন্দ্র ছিলো কনস্টান্টিনোপল ও খ্রীস্ট ধর্ম অধ্যুষিত ইউরোপীয় মহাদেশ, তাদেরকে আল্লাহ্ বিভক্ত মুসলিম উম্মাহর গৃহবিবাদ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সুযোগ গ্রহণের কোন অবকাশ দেন নি। অন্যথায় এই সুযোগে তারা বহু শতাব্দী ধরে তাদের শাসনাধীন সিরিয়া, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার কতিপয় দেশ পুনর্দখল করার এবং নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাতে পারতো।
৩৫ হিজরীর ঘটনাবলী প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ইন্ন জারীর তাবারী (র) বলেন, এই বছর হিরাক্লিয়াস-পুত্র কনস্টান্টিই এক হাজার যুদ্ধজাহাজ নিয়ে মুসলিম এলাকাগুলোর উদ্দেশে অভিযানে বের হয়েছিলেন। তখন আল্লাহ্ তাদের ওপর ভীষণ ঝড় পাঠিয়ে দিলেন এবং আপন কুদরত দ্বারা সৈন্যসহ তাকে ডুবিয়ে দিলেন। সম্রাট ও তার অল্প ক'জন সহচর ছাড়া কেউ ঝড়ের তাণ্ডব থেকে রেহাই পেলো না। সে যখন প্রাণ হাতে করে সিসিলিতে এসে পৌঁছলো তখন এই বলে সুকৌশলে তাকে হত্যা করা হলো, তুমিই আমাদের লোকদের ধ্বংসের মূল। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২৯]