📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত আলী (রা)-এর রাজনীতি ও তাঁর সুবিচার বিশেষণ

📄 হযরত আলী (রা)-এর রাজনীতি ও তাঁর সুবিচার বিশেষণ


হযরত আলী (রা)-এর রাজনীতি ও প্রশাসন ব্যবস্থা যে কেন্দ্রবিন্দুতে আবর্তিত হতো, তা ছিলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বার্থের ওপর নীতি ও আদর্শ এবং ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার প্রদান করা। আম্বিয়া কিরামের খিলাফতের মূল প্রাণ রক্ষা করা এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের নীতি ও আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখা। তিনি মনে করতেন, খলীফা হলেন প্রথমত দীনের প্রধান দাঈ এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য পরিপূর্ণ আদর্শ। তারপর তিনি একজন শাসক ও মুসলমানদের যাবতীয় বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক। রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রশাসনিক প্রয়োজন উপেক্ষা করে এই সুমহান নীতি ও আদর্শ সমুন্নত রাখার পূর্ণ দায়-দায়িত্ব বহন ও মাশুল আদায়ের জন্য তিনি পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন এবং হাসিমুখে অতি সন্তুষ্ট চিত্তে এর চড়া মাশুল তিনি আদায়ও করেছেন।

আলী-মু'আবিয়া বিরোধের মূল ভিত্তি আলোচনা প্রসঙ্গে গবেষক আল-আক্কাদ বড় চমৎকার বলেছেন যে, এটা দু'জন ব্যক্তি মাত্রের বিরোধ ছিলো না, বরং এ বিরোধ ছিলো দু'টি ভিন্ন প্রকৃতির শাসন ব্যবস্থার কিংবা আধুনিক পরিভাষায় বলা যায় দু'টি ভিন্ন চিন্তাধারার। গবেষক আল আক্কাদ বলেন, বিষয়টি ছিলো দীনী খিলাফত ও দুনিয়াবী সালতানাতের মাঝে বিদ্যমান এক সংগ্রাম। প্রথমটির ধারক ছিলেন হযরত আলী (রা) এবং দ্বিতীয়টির ধারক ছিলেন হযরত মু'আবিয়া ইব্‌ন আবূ সুফিয়ান (রা)। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৮৯২]

উভয় সাহাবী ব্যক্তিত্ব স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে যে ভিন্নমুখী নীতি ও পন্থা গ্রহণ করেছিলেন তার স্বাভাবিক ফলাফলই প্রকাশ পেয়েছিলো, যার মূল কারণ ছিলো যুগের পরিবর্তন। দেশ বিজয়ের বিস্তৃতি, সম্পদের অব্যাহত ঢল ও মুসলিম উম্মাহ যে সকল নতুন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সংস্পর্শে এসেছিলেন সেগুলোর অবশ্যম্ভাবী প্রভাব, তদুপরি নববী যুগ থেকে কিঞ্চিত দূরত্ব এবং সর্বপরি প্রথম কাতারের লোকদের বিদায় গ্রহণ যাঁরা মদীনার নববী মাদরাসায় যুহদ ও দুনিয়াবিমুখ পরিবেশে পূর্ণ নববী তরবিয়ত লাভ করেছিলেন। অতি সূক্ষ্ম ও প্রজ্ঞাপূর্ণ গবেষক আল আক্কাদ সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, হযরত আলী (রা)-এর সময়কালটি ছিলো তাঁর পূর্বাপর সময়ের মধ্যবর্তী এক বিস্ময়কর সময়কাল কিংবা বলা যায়, তাতে আশ্চর্যের কিছু ছিলো না। কেননা তাতে যেভাবে চলা উচিত ছিলো সেভাবেই চলেছিলো, কিন্তু তা পূর্ণরূপে স্থির ও অবিচল হতে পারেনি। আবার পূর্ণরূপে বিপর্যস্তও হয়ে পড়েনি। কেননা তা ছিলো প্রায় পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত একটি নতুন ভবন। জরাজীর্ণ ভবন ছিলো না যা সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে কিংবা ছিলো না এমন সুসম্পূর্ণ ভবন যা আগাগোড়া মজবুত বুনিয়াদের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত।

দুই নীতি ও ব্যবস্থার মাঝে এ বিরোধ ছিলো যুগ বিবর্তনের অবশ্যম্ভাবী ফল, যা মানব স্বভাবের ও জগত প্রকৃতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতিরূপে তৎকালীন ইসলামী সমাজে দেখা দিয়েছিলো। বলা বাহুল্য, এ ভিন্নতা হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর অনুকূলে ছিলো। কেননা তাঁর সেনাবাহিনীতে ও শাসনাধীন অঞ্চলে বিরাজমান ছিলো পূর্ণ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আমীরের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যের জযবা। পক্ষান্তরে হযরত আলী (রা)-এর শিবিরে ও শাসন পরিমণ্ডলে বিদ্যমান ছিলো এক ধরনের অস্থিরতা, অনৈক্য ও প্রতিপক্ষ শিবির বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা ও উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে যে শৈথিল্য ও অবাধ্য স্বাধীনতা ভোগ করে আসছিলো তার প্রতি ছিলো তাদের প্রলুব্ধ দৃষ্টি। গবেষক আল-আক্কাদ বলেন, সুশৃংখল সমাজ ব্যবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট অংশটি হলো হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর শাসনাধীন সিরিয়া ও তার সন্নিহিত এলাকা। পক্ষান্তরে সুশৃংখল সমাজ ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ অংশটি হলো আলী (রা)-এর শাসনাধীন সমগ্র জাযীরাতুল আরব এলাকা ও তার জনগোষ্ঠী। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৬৯]

সুতরাং আলী ও মু'আবিয়া (রা)-এর মাঝে বিরোধ একটি বিষয়ের দখল লাভের বিরোধ ছিলো না যা কোন এক পক্ষের জয়-পরাজয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়ে যেতে পারে, বরং এ বিরোধ ছিলো দু'টি বিপরীতমুখী ব্যবস্থার ও প্রতিদ্বন্দ্বী দু'টি জগতের বিরোধ। একটি ছিলো স্বভাবতই দুর্বিনীত ও অস্থিতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে অন্যটি শাসন ব্যবস্থার বশ্যতা গ্রহণকারী এবং স্থায়িত্ব ও স্থিতিকামী। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৯৫]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আলী (রা)-এর শাসননীতিই তাঁর উপযোগী ও বিকল্পহীন

📄 আলী (রা)-এর শাসননীতিই তাঁর উপযোগী ও বিকল্পহীন


আলোচ্য বিরোধের ফলস্বরূপ যতই অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা এবং বশ্যতা ও আনুগত্যহীনতা প্রকাশ পেয়ে থাকুক এবং আলী (রা) যতই বিভিন্ন অগ্নি-পরীক্ষা ও সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকুন না কেন, তদ্রূপ হযরত মু'আবিয়া (রা) যতই অনুকূল পরিস্থিতি, চিত্ত প্রশান্তি এও নিরংকুশ আনুগত্য ও বশ্যতা লাভ করে থাকুন না কেন, এ কথা অনস্বীকার্য যে, আলী (রা)-এর শাসননীতিই ছিলো তাঁর উপযোগী এবং এর কোন বিকল্প ছিলো না। গবেষক আল-আক্কাদ তাঁর ইতিহাস-নিষ্ঠা ও নৈতিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে এ প্রসঙ্গে অতি সূক্ষ্ম ও ইনসাফপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে খিলাফত পরিচালনার প্রথম দিন থেকেই হযরত আলী (রা) সেই সর্বোত্তম শাসননীতিই গ্রহণ করেছিলেন যা গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে যথার্থ ছিলো। কেননা আমাদের জানা নেই যে, তাঁর কোন সমালোচক কিংবা জীবনচরিতকার যুক্তি-প্রমাণের আলোকে আর কোন শাসননীতি পেশ করতে পেরেছেন কিনা যা নির্ভুল চিন্তা ও নিরাপদ পরিণতির ক্ষেত্রে তাঁর শাসননীতির চেয়ে উত্তম হতে পারে কিংবা ঘটনা প্রবাহ যে সকল সংকট ও দুর্যোগের মুখে তাঁকে ঠেলে দিয়েছিলো, সেগুলো রোধ করার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে।

যে সকল ঐতিহাসিক ও সমালোচক বিভিন্ন যুগ ও যুগের মানুষকে ও (জাতি ও সমাজের) কর্ণধারগণ যে সকল আকীদা, বিশ্বাস, নীতি, মূল্যবোধ ও শিক্ষা-দীক্ষার প্রভাব সযত্নে লালন করে থাকেন, সেগুলোকে একই মাপকাঠিতে মেপে থাকেন তারা অতীতে যেমন তেমনি বর্তমানেও হযরত আলী (রা)-এর শাসননীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপের ভুল ধরে থাকেন। তাদের বক্তব্য হলো, হযরত আলী (রা) যদি সিরিয়াতে হযরত মু'আবিয়া (রা)-কে ও কায়স ইবন সা'দকে মিসরের প্রশাসকের পদ হতে অপসারণ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করতেন, উসমান (রা)-এর হত্যাকারীদের অর্পণ করতে রাজী হতেন এবং সালিসী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতেন তাহলে যেসব ভয়াবহ যুদ্ধ তিনি পরিপূর্ণ ঈমান ও অসাধারণ সাহসিকতার সাথে মুকাবিলা করেছেন এবং পূর্ণ খিলাফতকালে যেসব সংকট ও দুর্যোগের মুকাবিলা তিনি করেছেন সেগুলো অতি সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু পরিবেশ, পরিস্থিতি, ঘটনা ও পরিণতির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের পর গবেষক আল-আক্কাদ এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে পারেন নি, বরং ভিন্নমত পোষণ করে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় তিনি বলেছেন,

বিভিন্ন দিক থেকে সম্ভাব্য পরিণতির কথা চিন্তা করে আমাদের যা মনে হয় তা এই যে, যে সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছেন তা থেকে ভিন্ন কোন চিন্তা ও পদক্ষেপ বিজয় ও সফলতার এবং বিপদ ও বিপর্যয় থেকে নিরাপত্তার জামানত দিতে পারতো না। সম্ভবত সফলতার সম্ভাবনা সেক্ষেত্রে আরো দুর্বল ও বিপদ আশংকা আরো প্রবল হতো, যদি তিনি উপদেশ ও পরামর্শের গণ্ডি থেকে বের হয়ে বিকল্প কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতেন। অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তিনি প্রশ্ন রেখেছেন:

তাঁর সমকালের কিংবা পরবর্তী কালের কোন সমালোচক কি কখনো নিজেকে এ প্রশ্ন করার প্রয়োজন অনুভব করেছেন, হযরত আলী (রা) যা করেছেন তা থেকে ভিন্ন কিছু করা কি তার পক্ষে সম্ভব ছিলো? কারো মনে কি এ জিজ্ঞাসা কখনো জেগেছে যে, ধরুন, সেই 'অন্য কিছুটা' তিনি করতে পারতেন, কিন্তু ফলাফল কি হতো? এটা কি সুনিশ্চিত যে, যে পরিণতির সম্মুখীন তিনি হয়েছিলেন বিকল্প পদক্ষেপ দ্বারা তার চেয়ে ভাল কিছু তিনি লাভ করতে পারতেন?

আল-আক্কাদ আরো বলেন, তারপর আমরা আবারো বলতে চাই যে, (রাজনৈতিক কৌশল ও সামরিক) চাতুর্য পরিত্যাগ করে হযরত আলী (রা) খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নি। সকল কৌশল ও চাতুর্য যদি তিনি প্রয়োগ করতেন তাহলেও খুব বেশি লাভবান হতে পারতেন না। কেননা রাজত্ব কিংবা খিলাফত তো অনিবার্য ছিলো! তাছাড়া তাঁর দায়িত্ব লাভের পূর্বেই যেসব বিরুদ্ধ অবস্থা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো, যা থেকে রাসূলুল্লাহ্-এর কোন খলীফা সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেন নি সেগুলোর সব দায়ভাগ তাঁর কাঁধে একত্র চেপে বসেছিলো।

হযরত আলী ও মু'আবিয়া (রা) যে ভিন্ন ভিন্ন নীতি ও আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন তার স্বাভাবিক হিসেবে উত্তরাধিকার ও খলীফা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিভিন্নতা দেখা দিয়েছিলো। আলী (রা) তো তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত হাসান (রা) কে খলিফা মনোনীত করার পরিবর্তে বিষয়টি শুরা ও পরামর্শের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন, অথচ তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ-এর অতি আদরের দৌহিত্র, যাঁর সম্পর্কে তিনি ইরশাদ করেছিলেন, ان ابنی ھذا سید (আমার এ পুত্র যোগ্য নেতা)।

শাহাদাতের পূর্বে তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি কি খলীফা মনোনীত করবেন না? তিনি বললেন, না, বরং বিষয়টি আমি তোমাদের হাতে ছেড়ে যাবো যেমন রাসূলুল্লাহ ছেড়ে গিয়েছিলেন। আরয করা হলো, আমাদেরকে নিরাশ্রয় অবস্থায় ছেড়ে গিয়ে আপন প্রতিপালকের সামনে কি বলে দাঁড়াবেন? তিনি বললেন, আমি বলবো, হে আল্লাহ্! আপনি আমাকে তাদের মাঝে খলীফা বানিয়েছিলেন যখন আপনার ইচ্ছা হয়েছিলো। অতঃপর আপনি আমাকে 'তলব' করেছেন তখন তাদের মাঝে আমি আপনাকে রেখে এসেছি। আপনি ইচ্ছা করলে তাদের কল্যাণ সাধন করতে পারেন, আবার ইচ্ছা করলে অকল্যাণও করতে পারেন। পক্ষান্তরে মু'আবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ান (রা) পুত্র ইয়াযীদের অনুকূলে খিলাফাতের বায়'আত গ্রহণ করেছিলেন। আর পিতা মু'আবিয়া (রা)-এর মৃত্যুর পর তিনিই শাসনভার লাভ করেছিলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৬]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত মু'আবিয়া (রা) সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা

📄 হযরত মু'আবিয়া (রা) সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা


ইতিহাস পর্যালোচনার পর ও উসমান (রা)-এর শাহাদাত-পরবর্তী যে ভয়াবহ ও সংকটপূর্ণ সময়কাল দেখা দিয়েছিলো, ইসলামী সমাজ যে পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং আত্মনীতি ও বহির্গত প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছিলো তা বিশ্লেষণ করার পর আমার মনে হয় যে, হযরত মু'আবিয়া (রা) তাঁর মানব স্বভাব সম্পর্কিত সুগভীর জ্ঞান, শাসন পরিচালনার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলের বাস্তব অবস্থা অধ্যয়নের আলোকে তিনি স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, পূর্ববর্তী তিন খলীফার সযত্ন অনুসৃত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত খিলাফত ব্যবস্থা অনুসরণের মাধ্যমে বর্তমান আরব ইসলামী সমাজকে নেতৃত্ব দান করা ও বহু জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত এবং সমস্যাবহুল বিশাল বিস্তৃত ইসলামী সালতানাতের শাসনভার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। সুতরাং তিনি এ ধারণা গ্রহণ করলেন যে, যেসব পরিস্থিতি দেশের নিরাপত্তা ও সমাজের শান্তি-শৃংখলার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ইসলামী অভিযান ও বিজয় যাত্রা অব্যাহত রাখার বিষয়টিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে, বর্তমান নাযুক সময়ে সেসব পরিস্থিতির সফল মুকাবিলার জন্য ইনসাফপূর্ণ একটি ব্যক্তিতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা যেতে পারে।

উক্ত শাসন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী শাসক ব্যক্তিটি আদর্শিকভাবে ইসলামের আকীদা ও শরীয়তের বিধানের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবেন এবং সামগ্রিকভাবে ইসলামী হদ্দ ও শাস্তিসমূহ, আহকাম ও বিধানসমূহ এবং ইসলামের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানসমূহ রক্ষা করবেন। তবে শাসন ব্যবস্থায়, প্রশাসন পরিচালনায় ও জনকল্যাণের বেলায় প্রয়োজনবোধে কিছুটা উদারতা অবলম্বন করবেন। মোটকথা, দেশ ও সরকার ইসলামের সীমানা থেকে তো বের হবে না কিন্তু বিশাল একটি সাম্রাজ্যের প্রাণরূপ ধারণকারী সুবিস্তৃত ইসলামী সালতানাতের শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রচলিত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা, সুকৌশল ও দক্ষতা দ্বারা পরিস্থিতির মুকাবিলা করা, বাস্তব কর্মকৌশল ও বৃহত্তর স্বার্থের আলোকে দেশ-কালের পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সমস্যার মুকাবিলায় উদ্যোগী হওয়া যাবে। সুতরাং উক্ত ইজতিহাদের আলোকে তিনি একজন সামরিক ও প্রশাসনিক শাসকরূপে শাসন পরিচালনা শুরু করেছিলেন। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন:
خلافة النبوة ثلاثون سنة ثم يعطى الملك او ملكه من يشاء .
নবুয়তের ধারা অব্যাহত থাকবে ত্রিশ বৎসর। অতঃপর আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা তাকে রাজত্ব দান করবেন। [আবূ দাউদ, কিতাবুস সুন্নাহ, বাবুস সুলাকা।]

নিঃসন্দেহে এটা ছিলো তাঁর এমন এক ইজতিহাদ যা ইসলামের স্বীকৃত ও বহু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত খিলাফত ধারণার বিপরীত বিষয়। কেননা খিলাফত আলা মিনহাজিন্-নবুয়ত প্রতিষ্ঠার জোর তাকিদ রয়েছে বিভিন্ন হাদীসে এবং সর্বযুগের মুসলিম উম্মাহ এ বিষয়ে আদেশপ্রাপ্ত। ইসলাম গ্রহণে যাঁরা ছিলেন অগ্রগামী, জ্ঞান ও ইলমের ক্ষেত্রে ছিলেন পারদর্শী, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর অধিকতর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত, তাঁর অনুসরণ ও তাঁর ইচ্ছা ও আদেশ বাস্তবায়নে যাঁরা ছিলেন অধিক যত্নবান। সাহাবায়ে কিরাম তথা হযরত আবূ বকর, উমর, উসমান, আলী, আশারা মুবাশারা ও অন্যান্য বিশিষ্ট সাহাবা নেতৃস্থানীয় ফকীহ ও সাহাবা খিলাফতের যে ইসলামী ধারা উপলব্ধি ও গ্রহণ করেছেন এবং দেশ-কালনির্বিশেষে সকল মুসলমানের চিরকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ও সর্বোচ্চ আদর্শরূপে যে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করা কিংবা চালিয়ে যাওয়া উম্মাহর অপরিহার্য কর্তব্য- হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর এ ইজতিহাদ ছিলো খিলাফতের এই সর্বস্বীকৃত ধারণার পরিপন্থী। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, এ বিষয়ে হযরত আলী (রা)-ই ছিলেন নির্ভুল সিদ্ধান্তের ওপর সমাসীন। [ইযালাতুল খাফা]

একথা নিঃসন্দেহ যে, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ তাঁর দ্বারা প্রভূত কল্যাণ লাভ করেছে। কেননা মুসলিম বাহিনীর অব্যাহত বিজয়, ইসলামের প্রচার, প্রসার, ইসলামী সালতানাতের ক্রমবিস্তার ও সুশৃংখল প্রশাসনের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিলো অতুলনীয়। স্বীয় শাসনকালে তিনি এমন সকল দেশে নৌ ও স্থল অভিযান পরিচালনা করেছেন যেখানে ইতিপূর্বে বিজেতা মুসলিম বাহিনীর পদধূলি পড়েনি। একদিকে তাঁর বিজয়াভিযান আটলান্টিক মহাসাগরের জলরাশি গিয়ে স্পর্শ করেছিলো, অন্যদিকে মিসরে নিযুক্ত তাঁর সুযোগ্য প্রশাসক সূদান দখল করে নিয়েছিলেন। নৌবহরকে তিনি এতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন যে, তাঁর সময়ে নৌযুদ্ধের পূর্ণ সাজ-সরঞ্জামে সুসজ্জিত যুদ্ধ জাহাজের সংখ্যা এক হাজার সাত শতে পৌঁছে গিয়েছিলো। এসব যুদ্ধজাহাজ তিনি সমুদ্রপথে অভিযানে প্রেরণ করতেন আর তা বিজয়ীর বেশে ফিরে আসতো। বেশ কিছু ভূখণ্ড তিনি নৌ অভিযানের মাধ্যমে জয় করেছেন। তন্মধ্যে সাইপ্রাস দ্বীপ ও কতিপয় গ্রীক দ্বীপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পক্ষান্তরে স্থলযুদ্ধের জন্য তিনি শীতকালীন বাহিনী ও গ্রীষ্মকালীন বাহিনী তৈরি করেছিলেন। ফলে সারা বছরই তাঁর যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হতো এবং বিশাল বিস্তৃত ইসলামী সালতানাতের সীমান্ত জুড়ে ছিলো নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা।

৪৮ হিজরীতে তিনি কন্সটান্টিনোপল জয়ের উদ্দেশে স্থল ও নৌপথে বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু সুরক্ষিত প্রাচীর, নিরাপদ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ও মুসলিম নৌবহরে গ্রীকদের আগুনে তীর বর্ষণের কারণে কন্সটান্টিনোপল জয় করা তখন সম্ভব হয়নি। ঐ বাহিনীতে হযরত ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, ইবনে যুবায়র, আবু আইউব (রা) ও ইয়াযীদ ইবনে মু'আবিয়া শরীক ছিলেন। শহর অবরোধকালে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর মেযবান হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা) ইন্তিকাল করেছিলেন। (অছিয়ত মুতাবিক) তাঁকে শহরের বাইরে প্রাচীর সংলগ্ন স্থানে দাফন করা হয়েছিলো। তাঁর শাসনামলেই সেনাপতি ওকবা ইবনে নাফে আফ্রিকায় প্রবেশ করেছিলেন এবং বারবারীদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো তারা তাঁর সাথে এসে শামিল হয়েছিলো। কায়রোয়ানকে (তিউনিসিয়াতে) তিনি সেনাছাউনি ও সামরিক কেন্দ্ররূপে গ্রহণ করেছিলেন। বহু সংখ্যক বারবারী তখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। ফলে ইসলামী সালতানাত আরো বিস্তার লাভ করেছিলো। [তারীখুল উমাম আল-ইসলামিয়্যা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৪-১১৫]

ড. ফিলিপ হিট্টি বলেন, প্রশাসন পরিচালনায় হযরত মু'আবিয়া (রা) অসাধারণ যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। সীমাহীন নৈরাজ্যের ভেতর থেকেও তিনি সুশৃংখল একটি ইসলামী সমাজ কায়েম করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন এবং ইসলামী সালতানাতের সর্বপ্রথম রেজিস্ট্রার বিভাগ চালু করেছিলেন। ডাক বিভাগ চালুর প্রচেষ্টাও তিনি শুরু করেছিলেন যা পরবর্তী সাম্রাজ্যের সকল অঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছিলো। ফলে সালতানাতের প্রত্যন্ত অঞ্চলও পরস্পর যুক্ত হয়ে পড়েছিলো। তিনি ছিলেন ক্রোধ-সংযমী, আত্মসম্বরণকারী ও মধুর স্বভাবের মানুষ। তাঁর আচরণ ও স্বভাবের পরিচায়ক একটি বাণী হলো এই: لا أضع سيفى حيث يكفيني سوطر، ولا اضع سوطى حيث يكفيني لساني ولو أن بيني وبين الناس شعرة ما انقطعت اذا حدوها خليتها واذا خلوها مددتها . "যেখানে চাতুর্য কাজ চলে সেখানে আমি তলোয়ার চালাই না, তদ্রূপ যেখানে আমার জিহ্বার কাজ চলে সেখানে আমি চাবুক তুলি না, আমার ও মানুষের মাঝে চুল পরিমাণ বন্ধনও যদি থাকে তাহলে আমি তা কর্তন করি না। তারা সুতায় টান দিলে আমি তাতে ঢিল দিই। আর তারা ঢিল দিলে আমি টেনে ধরি।"

হযরত মু'আবিয়া (রা) বহু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, যা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি তাঁর গভীর ভালবাসা ও দীনের সুরক্ষার জন্য অতুলনীয় জযবার পরিচয় বহন করে। তদুপরি ছিলো বিস্ময়কর দূরদর্শিতা, প্রশাসনিক কুশলতা, দীনী আত্মসম্মানবোধ এবং প্রয়োজনে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ ও কল্যাণ অন্য সকল স্বার্থ ও কল্যাণের ওপর অগ্রাধিকার প্রদানের মনোভাব। এ প্রসঙ্গে তাঁর দীনী আত্মসম্মানবোধের প্রমাণরূপে একটি অমর কীর্তির কথা উল্লেখ করা জরুরী মনে করি। ইবনে কাছীর ও অন্যান্য ঐতিহাসিক তাঁর ও রোম সম্রাটের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। আল্লামা ইবন কাছীর (র) বলেন, রোম সম্রাট ও তার বাহিনী হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর হাতে পর্যুদস্ত ও বিধ্বস্ত হওয়ার পরও একবার তিনি মু'আবিয়া (রা)-এর প্রতি প্রলুব্ধ হলেন অর্থাৎ রোম সম্রাট হযরত মু'আবিয়া (রা)-কে আলী (রা)-এর সাথে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত দেখে কোন এক সীমান্তে বিরাট সেনা সমাবেশ ঘটালেন এবং তাঁর ওপর চড়াও হতে প্রলুব্ধ হলেন। তখন হযরত মু'আবিয়া (রা) রোম সম্রাটের নামে এই মর্মে এক হুঁশিয়ারি পত্র পাঠালেন, "হে অভিশপ্ত মালাউন! তুমি যদি নিবৃত্ত হয়ে সোজা দেশে প্রত্যাবর্তন না করো তাহলে নির্দ্বিধায় আমি আমার পিতৃব্য আলীর সঙ্গে সমঝোতায় উপনীত হবো এবং তোমার শাসনাধীন সমগ্র এলাকা থেকে তোমাকে আমি বিতাড়িত করবো এবং এই প্রশস্ত পৃথিবী তোমার জন্য সংকীর্ণ করে ছাড়বো।" এই একটিমাত্র ধমকে ভীত-সন্ত্রস্ত রোম সম্রাট হাত গুটিয়ে নিলেন এবং সন্ধি প্রার্থনা করে দূত প্রেরণ করলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১৯]

এ কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, হযরত মু'আবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান (রা) সাহাবা জামা'আতের অন্তর্ভুক্ত একজন বিশিষ্ট সাহাবী। তাঁর ফযীলত ও গুণ নিয়ে বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং তাঁর নিন্দা-সমালোচনায় সীমাতিক্রম করার ব্যাপারে খুব সংযত ও সতর্ক হওয়া উচিত। এমন কোন ফায়সালা ও সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা উচিত নয় যা তাঁর সাহাবী শানের উপযুক্ত নয়। কেননা ইমাম আবূ দাউদ (র) আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لا تسبو اصحابى والذي نفسي بيده لو اسفق لحدكم مثل احد ذهبا ما بلغ مد احدهم ولا نصيفه . "আমার সাহাবাগণকে গাল-মন্দ করো না। ঐ সত্তার শপথ, যাঁর নিয়ন্ত্রণে আমার জীবন, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর পথে ব্যয় করে তবুও তাদের কোন একজনের 'এক মুদ্দ' বা তার অর্ধেক দানেরও সমান হবে না।"

তাছাড়া আবু দাউদ হযরত আবূ বাকরা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ইব্‌ন আলী (রা) সম্পর্কে বলেছেন, ان ابنى هذا سيد واني ارجد ان يصلহ الله به بين فئتين من امتى وفي رواية لعل الله ان يصلح به بين فئتين عظيمتين . "আমার এ পুত্র একজন নেতা। আমি আশা করি যে, তার মাধ্যমে আল্লাহ আমার উম্মতের দু'টি দলের মাঝে সমঝোতা করাবেন।" অন্য রিওয়ায়াতে আছে, হয়তো আল্লাহ্ তার মাধ্যমে বিরাট দু'টি দলের মাঝে সমঝোতা দান করবেন।

দায়লামী হাসান ইব্‌ন আলী (রা) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আলী (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্-কে আমি বলতে শুনেছি: لا تذهب الايام والليالي পর্যন্ত لا يملك معاوية . "মু'আবিয়া রাজত্ব লাভ না করা পর্যন্ত দিন-রাতের বিলুপ্তি হবে না।"

কিতাবুশ-শারিয়াহ গ্রন্থে আল-আজুররী আবদুল মালিক ইবন উমর হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, মু'আবিয়া (রা) বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর বাণী - يا معاوية ان ملكت فاحسن "হে মু'আবিয়া! যদি তুমি রাজত্ব লাভ করো তবে উত্তম আচরণ করবে।" এ বাণী শোনার পর হতে আমি খিলাফত লাভের আশা পোষণ করে আসছিলাম। তাছাড়া উম্মে হারাম (রা) হতে বিশুদ্ধ সনদে হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন- اول جيش من امتى بغزون البحر قد أوجبوا . "আমার উম্মতের যে প্রথম বাহিনী সমুদ্রপথে অভিযান পরিচালনা করবে তারা (জান্নাত) ওয়াজিব করে নিয়েছে।" আর মু'আবিয়া (রা)-ই সর্বপ্রথম উসমান (রা)-এর শাসনামলে সমুদ্রপথে অভিযান পরিচালনা করেছেন। স্বয়ং উম্মে হারাম উক্ত বাহিনীতে শরীক ছিলেন। সমুদ্র থেকে স্থলে নেমে আসার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।

তাছাড়া বহু বর্ণনায় এসেছে যে, নবী ﷺ তাঁকে 'কাতিব' (অহী লেখক)- রূপে কাছে রেখেছিলেন, অথচ ন্যায়নিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ছাড়া কাউকে তিনি কাতিব নিযুক্ত করতেন না। মু'আবিয়া (রা) নিজেও বলেছেন, "আমি খলীফা নই। তবে ইসলামী যুগের প্রথম বাদশাহ। অবশ্য আমার পরে তোমরা বাদশাহদের স্বরূপ বুঝতে পারবে।" তাঁর নিকট নবী ﷺ -এর কয়েক গাছি পবিত্র চুল ছিলো। মৃত্যুর সময় তিনি ওসিয়ত করেছিলেন যেন এই সংরক্ষিত চুলগুলো তার নাসারন্ধ্রে দিয়ে দেয়া হয়। খিলাফতের কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তিনি বুঝতেন কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন ও আমল তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। [ইযালাতুল খাফা, পৃষ্ঠা ১৪৬-১৪৭] কেননা সময় ও মানুষের যে পরিবর্তন ঘটে ছিলো পূর্ববর্তীদের তুলনায় তার ব্যাপ্তি ও গভীরতা, অবয়ব ও প্রকৃতি এবং শাসন দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির সমস্যা ও সংকট খুব একটা কম ছিলো না। অবস্থার দিকে বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে তাকালে তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 এক নযরে তৎকালীন ইসলামী সমাজ

📄 এক নযরে তৎকালীন ইসলামী সমাজ


আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা একান্ত জরুরী। তা এই যে, প্রিয় পাঠক! একান্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত চিত্তে মত বিরোধের যেসব ঘটনা আপনারা পাঠ করেছেন যা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়ে ছিলো তা ক্ষমতা ও নেতৃত্ব এবং শাসকবর্গ ও তাদের সেনাবাহিনীর পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিলো। পক্ষান্তরে অহী ও রিসালাতের পুণ্যভূমি জাযيرةতুল আরব থেকে ইসলামী বিজয়াভিযানের শেষ সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত গোটা ইসলামী সমাজ দীনের ওপর পূর্ণ অবিচল ছিলো। শরীয়তের যাবতীয় আহকাম ও বিধানের প্রতি ছিলো তাদের নিরংকুশ আনুগত্য। কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা এবং সুন্নাতের ওপর অতি গভীর অনুরাগ ছিলো তাদের অন্তরে। দীন ও ঈমান এবং ইলম ও আমলের ধারক-বাহক, হাদীস-বিশারদ ও ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞগণের প্রতি তাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিলো অটুট।

ইসলামের বৈশিষ্ট্যমূলক আহকাম সমাজের বুকে একই রকম সমুন্নত ছিলো। জুমুআ ও জামা'আত পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে আদায় করা হতো। সময় ও স্থানসহ হজ্জের যাবতীয় আরকান-আহকামে সামান্যতম পরিবর্তনও অনুপ্রবেশ করেনি। সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তি তথা খলীফার পক্ষ হতে নিযুক্ত আমীরের নেতৃত্বে হজ্জ অনুষ্ঠিত হতো। জিহাদও জারি ছিলো পূর্ণ উদ্দীপনার সাথে। কুরআনের হিফজ ও তিলাওয়াত একই ধারায় অব্যাহত ছিলো। তার উত্তাপে হৃদয় একই রকম বিগলিত হতো, চোখ থেকে একই ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হতো। দীন ও শরীয়তের আহকাম ও বিধানের ক্ষেত্রে কোন প্রকার পরিবর্তন ও বিকৃতি তখন দেখা দেয়নি।

মোটকথা, কিছু কিছু দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও এই ইসলামী সমাজ সমকালীন খ্রীস্টীয় সমাজ কিংবা অগ্নিপূজক সমাজ কিংবা হিন্দু সমাজ থেকে সর্বতোভাবেই উত্তম ছিলো। আল্লাহর ভয়, মৃত্যুচিন্তা, আখিরাত ও পরকাল ভাবনা, যাবতীয় পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে সংযম, বস্তু পূজা ও বিষয়-সম্পদের প্রতি অতি আসক্তি পরিহার এবং সকল কিছুকে স্থূল লাভ-লোকসানের মাপকাঠিতে বিচারের প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি, এক কথায় সার্বিক আত্মোৎর্ষের ক্ষেত্রে ইসলামী সমাজই ছিলো একক আদর্শ ও অনন্য দৃষ্টান্ত। আর এসব কিছু সম্ভব হয়েছিলো সেই মহান আসমানী কিতাবের কল্যাণে যা কোন প্রকার পরিবর্তন কিংবা সংস্কার দোষে দুষ্ট হয়নি এবং নবী ﷺ -এর সীরাত ও জীবনাদর্শের কল্যাণে যা সমাজের সর্বস্তরে প্রতিনিয়ত আলোচিত হয়ে আসছিলো। তাছাড়া সাহাবা কিরাম ও খুলাফায়ে রাশেদীনের জীবন ও কর্ম এবং মুজাহিদীন ও শহীদানের আত্মত্যাগ ও কুরবানী তাদের চোখের সামনে ছিলো। দুনিয়ার প্রতি নিরাশ ও পরহেযগার লোকদের প্রবল উপস্থিতি এবং আল্লাহ্র পথে আহ্বান তথা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ-এর মুবারক আমলও সমাজকে পূত-পবিত্র করে রেখেছিলো।

মোটকথা, মানুষের হৃদয়ে ও চিন্তায় যেমন দীনের সর্বোচ্চ মর্যাদা অক্ষুণ্ণ ছিলো তেমনি কর্মজীবনে ও দৈনন্দিন আচরণে দীনের একচ্ছত্র প্রভাব ও আত্মিক নিয়ন্ত্রণ অটুট ছিলো। এসব কিছু এজন্যই ছিলো যে, এই দীনের হিফাযতের ও আল্লাহর পথে দাওয়াতের মহান দায়িত্ব পালনকারী এই উম্মাহর কেয়ামত পর্যন্ত অস্তিত্ব রক্ষার যিম্মা আল্লাহ্ স্বয়ং গ্রহণ করেছেন।

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ .
"নিঃসন্দেহে আমরা কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরাই তার হিফাযত করবো।"

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَসَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونُ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا .
"তদ্রূপ তোমাদেরকে আমি মধ্যপন্থী উম্মতরূপে মনোনীত করেছি যেন তোমরা অপরাপর উম্মতের প্রতিপক্ষে সাক্ষী হতে পারো। আর রাসূল তোমাদের সাক্ষী হতে পারেন।"

আসলে বিশ্বজগতের অস্তিত্বের স্বার্থেই এই দীন ও এই উম্মতের হিফাযত জরুরী। কেননা এ দু'টির কোন বিকল্প নেই। যেহেতু মুসলিম উম্মাহ তখনো দাওয়াত ইলাল্লাহ্ ও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ্'র ক্ষেত্রে শূন্যতা পূরণ করে চলেছিলো, যেহেতু আকীদা ও বিশ্বাস এবং আমল ও কর্মের ক্ষেত্রে বিশ্বের মাঝে তারাই ছিলো শ্রেষ্ঠ সেহেতু আল্লাহ্ তাদের ওঁৎ পেতে থাকা শত্রু তথা খ্রীস্টান শক্তিকে যাদের কেন্দ্র ছিলো কনস্টান্টিনোপল ও খ্রীস্ট ধর্ম অধ্যুষিত ইউরোপীয় মহাদেশ, তাদেরকে আল্লাহ্ বিভক্ত মুসলিম উম্মাহর গৃহবিবাদ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সুযোগ গ্রহণের কোন অবকাশ দেন নি। অন্যথায় এই সুযোগে তারা বহু শতাব্দী ধরে তাদের শাসনাধীন সিরিয়া, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার কতিপয় দেশ পুনর্দখল করার এবং নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাতে পারতো।

৩৫ হিজরীর ঘটনাবলী প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ইন্ন জারীর তাবারী (র) বলেন, এই বছর হিরাক্লিয়াস-পুত্র কনস্টান্টিই এক হাজার যুদ্ধজাহাজ নিয়ে মুসলিম এলাকাগুলোর উদ্দেশে অভিযানে বের হয়েছিলেন। তখন আল্লাহ্ তাদের ওপর ভীষণ ঝড় পাঠিয়ে দিলেন এবং আপন কুদরত দ্বারা সৈন্যসহ তাকে ডুবিয়ে দিলেন। সম্রাট ও তার অল্প ক'জন সহচর ছাড়া কেউ ঝড়ের তাণ্ডব থেকে রেহাই পেলো না। সে যখন প্রাণ হাতে করে সিসিলিতে এসে পৌঁছলো তখন এই বলে সুকৌশলে তাকে হত্যা করা হলো, তুমিই আমাদের লোকদের ধ্বংসের মূল। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২৯]

ফন্ট সাইজ
15px
17px