📄 খিরাজ ও সাদকা আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁর জারিকৃত একটি ফরমান ছিল এই
খিরাজ ও সাদকা আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁর জারিকৃত একটি ফরমান ছিলো এই- "ভাবগম্ভীর ও প্রশান্তভাবে তাদের নিকট গমন করবে। যখন তাদের মাঝে গিয়ে দাঁড়াবে তখন তাদেরকে সালাম করবে এবং তাদের প্রতি সম্ভাষণে কোন ত্রুটি করবে না। অতঃপর তুমি বলবে, হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ্র পক্ষ হতে নিযুক্ত অভিভাবক ও খলীফা আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, যাতে তোমাদের কাছ থেকে তোমাদের সম্পদে নির্ধারিত আল্লাহর হক গ্রহণ করি। সুতরাং আল্লাহর পক্ষ হতে নিযুক্ত অভিভাবকের নিকট পরিশোধ করার কোন হক কি তোমাদের সম্পদে রয়েছে? কেউ যদি 'না' বলে তাহলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে যাবে না।
পক্ষান্তরে যদি কোন দানকারী তোমাকে দান করতে চায় তাহলে তার সঙ্গে গমন করবে কিন্তু তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করবে না। হয়রানি ও নাজেহাল করবে না এবং যে পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য দান করে তা গ্রহণ করবে। যদি তার নিকট গবাদি পশু ও উট থেকে থাকে তবে তার অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশ করবে না। কেননা এর অধিকাংশ ই তার। যখন তুমি পশুপালের নিকট হাযির হবে তখন দখলকারী রুক্ষ ও কর্কশ ব্যক্তির ন্যায় সেখানে প্রবেশ করবে না এবং প্রাণীকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবে না। পশুপাল নিয়ে মালিকের সঙ্গে অসদাচরণে লিপ্ত হবে না। পুরো পালকে দু'ভাগে ভাগ করে তাকে ইখতিয়ার দেবে। সে যেভাবে পছন্দ করবে তাতে আর হাত দিতে যাবে না। অতঃপর অবশিষ্ট মালকে আবার দু'ভাগ করবে এবং মালিককে (বাছাইয়ের) ইখতিয়ার প্রদান করবে। অতঃপর যে ভাগ সে নিজে পছন্দ করবে তাতে হাত দেবে না। এরূপ করতে থাকবে যতক্ষণ না পালে এই পরিমাণ পশু থেকে যায় যা তার সম্পদের ধার্যকৃত আল্লাহ্র হকের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তখন তার কাছ থেকে আল্লাহর হক গ্রহণ করবে। যদি সে অব্যাহতি প্রার্থনা করে তাহলে তাকে অব্যাহতি দান করবে। [নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা-৩৮১]
📄 শিক্ষা ও দীক্ষা দানকারী সংশোধক ইমাম
হযরত আলী (রা) নিছক একজন প্রশাসনিক প্রধান কিংবা সাধারণ অর্থে মুসলমানদের খলীফা মাত্র ছিলেন না, যেমনটি হয়েছিলো উমাইয়া ও আব্বাসী খলীফাদের ক্ষেত্রে, বরং তিনি ছিলেন প্রথম দুই খলীফার নীতি ও আদর্শের অনুসারী। ফলে একদিকে তিনি যেমন ছিলেন মুসলমানদের শাসক ও তত্ত্বাবধায়ক তেমনি অন্যদিকে ছিলেন মুসলমানদের শিক্ষা ও দীক্ষা দানকারী একজন আধ্যাত্মিক মুরুব্বী। উম্মাহর সামনে নববী জীবন চরিতের এক উত্তম নমুনা। মুসলমানদের দীন, ঈমান, আমল-আখলাক ও জীবনযাত্রায় তাঁর প্রতি অতি সতর্ক দৃষ্টি ছিলো, যেন ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও রাসূলুল্লাহ্-এর সুমহান আদর্শ থেকে চুল পরিমাণও বিচ্যুতি না ঘটে ইসলামী উম্মাহর। বিজিত দেশ ও জাতিসমূহের স্বভাব-প্রকৃতি ও সভ্যতা-সংসৃতি যেন তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে তিনি মুসলমানদের ইমামতি করতেন। তাদেরকে প্রয়োজনীয় উপদেশ ও ধর্ম শিক্ষা দান করতেন। দুনিয়ার জীবনে মুসলমানদের কাছ থেকে আল্লাহ্ কি চান এবং কি অপছন্দ করেন সে সম্পর্কে তিনি তাদের জ্ঞান দান করতেন। মসজিদে বসে তিনি তাদের খোঁজ-খবর নিতেন এবং কুশল জিজ্ঞাসা করতেন। তাদের দীন ও দুনিয়া সম্পর্কিত যাবতীয় জিজ্ঞাসার জবাব দিতেন এবং সমস্যার সমাধান পেশ করতেন। বাজারে ঘুরে ঘুরে তিনি তাদের বেচাকেনা ও লেনদেন প্রত্যক্ষ করতেন এবং উপদেশ দিয়ে বলতেন: আল্লাহকে ভয় করো এবং মাপ ও পরিমাপ পূর্ণ করো। মানুষকে তাদের প্রাপ্য জিনিসে ঠকিও না। নিজের ব্যাপারে তিনি পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা এবং রক্ত ও বংশকৌলিন্যের বিন্দুমাত্র 'সুবিধা' তিনি গ্রহণ করেন নি। প্রয়োজনীয় কিছু ক্রয় করতে হলে তিনি অপরিচিত কোন বিক্রেতা তালাশ করে তার কাছ থেকে কিনতেন। এটা তাঁর খুবই পছন্দ ছিলো যে, আমীরুল মু'মিনীন পরিচয়ে কোন বিক্রেতা তার সঙ্গে কিছুমাত্র রেয়ায়েতমূলক আচরণ করবে।
কথায় ও কাজে এবং ভাগ-বাটোয়ারা ও সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের সঙ্গে সমতা রক্ষার ব্যাপারে তিনি নিজে যেমন অতি যত্নবান ছিলেন, তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলে নিযুক্ত প্রশাসকদের থেকেও তিনি অনুরূপ আচরণ ও নীতির অনুসরণ প্রত্যাশা করতেন। তাই তাদের প্রতি তিনি কঠোর দৃষ্টি রাখতেন। মাঝে মধ্যে প্রশাসকদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়া এবং তাদের প্রতি জনসাধারণের মনোভাব ও মতামত জানার জন্য গোপন পর্যবেক্ষক দল পাঠাতেন। তারা সরেজমিনে সব খোঁজ-খবর জেনে আমীরুল মু'মিনীনের নিকট রিপোর্ট পেশ করতেন। এ কারণে তাঁর অধীনস্থরা তাঁকে খুব ভয় করতো। প্রয়োজন হলে তাদের প্রতি তিনি কঠোর তিরস্কার ও সতর্কবাণী উচ্চারণ করতেন। প্রশাসকদের নামে লেখা তাঁর পত্রাবলীতে এর বহু প্রমাণ রয়েছে। প্রশাসকদের প্রতি তাঁর এ সতর্ক দৃষ্টি শাসনকার্য ও ইসলামী আইনের বিধি-বিধান পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং তাদের ব্যক্তিজীবন ও দৈনন্দিন আচার-আচরণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। আল্লাহকে ভয়কারী, রাসূলুল্লাহ্ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত ও আদর্শ অনুসরণকারী প্রশাসকদের মান উপযোগী নয় এমন কোন আচরণে তিনি তাদেরকে কঠোর কৈফিয়তের সম্মুখীন করতেন।
উদাহরণস্বরূপ তাঁর কাছে সংবাদ এলো যে, বসরায় তাঁর নিযুক্ত প্রশাসক উসমান ইব্ন হানীফ আল আনসারীকে এক ভোজসভায় দাওয়াত করা হয়েছিলো, কিন্তু দাওয়াতের ক্ষেত্রে ইসলামী সাম্যনীতি অনুসরণ করা হয়নি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভও এর উদ্দেশ্য ছিলো না। হযরত উসমান ইব্ন হানীফ সে দাওয়াতে শরীক হয়েছিলেন। তাই হযরত আলী (রা) তাঁর নামে এই মর্মে এক উপদেশ পত্র পাঠালেন:
"অতঃপর, হে ইব্ন হানীফ! আমি সংবাদ পেয়েছি, বসরার কোন এক যুবক তোমাকে দস্তরখানে দাওয়াত দিয়েছিলো, আর তুমি বড় বড় থালা ও রকমফের মজাদার খাবারের লোভে সেদিকে দৌড় দিয়েছো। আমার কিন্তু ধারণা ছিলো না, তুমি এমন লোকদের দস্তরখানে শরীক হতে পারো, যাদের দরিদ্ররা সেখানে অনাদৃত আর ধনীরা সাদরে আমন্ত্রিত। শোন, এ ধরনের খাবার মুখে দেয়ার আগে চিন্তা করে নিও, যদি সন্দেহযুক্ত মনে হয় তাহলে ফেলে দিও। আর যদি উত্তম বলে নিশ্চিত হতে পারো তাহলে গ্রহণ করো। [নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা ৪১৬-৪১৭]
📄 হযরত আলী (রা)-এর রাজনীতি ও তাঁর সুবিচার বিশেষণ
হযরত আলী (রা)-এর রাজনীতি ও প্রশাসন ব্যবস্থা যে কেন্দ্রবিন্দুতে আবর্তিত হতো, তা ছিলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বার্থের ওপর নীতি ও আদর্শ এবং ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার প্রদান করা। আম্বিয়া কিরামের খিলাফতের মূল প্রাণ রক্ষা করা এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের নীতি ও আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখা। তিনি মনে করতেন, খলীফা হলেন প্রথমত দীনের প্রধান দাঈ এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য পরিপূর্ণ আদর্শ। তারপর তিনি একজন শাসক ও মুসলমানদের যাবতীয় বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক। রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রশাসনিক প্রয়োজন উপেক্ষা করে এই সুমহান নীতি ও আদর্শ সমুন্নত রাখার পূর্ণ দায়-দায়িত্ব বহন ও মাশুল আদায়ের জন্য তিনি পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন এবং হাসিমুখে অতি সন্তুষ্ট চিত্তে এর চড়া মাশুল তিনি আদায়ও করেছেন।
আলী-মু'আবিয়া বিরোধের মূল ভিত্তি আলোচনা প্রসঙ্গে গবেষক আল-আক্কাদ বড় চমৎকার বলেছেন যে, এটা দু'জন ব্যক্তি মাত্রের বিরোধ ছিলো না, বরং এ বিরোধ ছিলো দু'টি ভিন্ন প্রকৃতির শাসন ব্যবস্থার কিংবা আধুনিক পরিভাষায় বলা যায় দু'টি ভিন্ন চিন্তাধারার। গবেষক আল আক্কাদ বলেন, বিষয়টি ছিলো দীনী খিলাফত ও দুনিয়াবী সালতানাতের মাঝে বিদ্যমান এক সংগ্রাম। প্রথমটির ধারক ছিলেন হযরত আলী (রা) এবং দ্বিতীয়টির ধারক ছিলেন হযরত মু'আবিয়া ইব্ন আবূ সুফিয়ান (রা)। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৮৯২]
উভয় সাহাবী ব্যক্তিত্ব স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে যে ভিন্নমুখী নীতি ও পন্থা গ্রহণ করেছিলেন তার স্বাভাবিক ফলাফলই প্রকাশ পেয়েছিলো, যার মূল কারণ ছিলো যুগের পরিবর্তন। দেশ বিজয়ের বিস্তৃতি, সম্পদের অব্যাহত ঢল ও মুসলিম উম্মাহ যে সকল নতুন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সংস্পর্শে এসেছিলেন সেগুলোর অবশ্যম্ভাবী প্রভাব, তদুপরি নববী যুগ থেকে কিঞ্চিত দূরত্ব এবং সর্বপরি প্রথম কাতারের লোকদের বিদায় গ্রহণ যাঁরা মদীনার নববী মাদরাসায় যুহদ ও দুনিয়াবিমুখ পরিবেশে পূর্ণ নববী তরবিয়ত লাভ করেছিলেন। অতি সূক্ষ্ম ও প্রজ্ঞাপূর্ণ গবেষক আল আক্কাদ সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, হযরত আলী (রা)-এর সময়কালটি ছিলো তাঁর পূর্বাপর সময়ের মধ্যবর্তী এক বিস্ময়কর সময়কাল কিংবা বলা যায়, তাতে আশ্চর্যের কিছু ছিলো না। কেননা তাতে যেভাবে চলা উচিত ছিলো সেভাবেই চলেছিলো, কিন্তু তা পূর্ণরূপে স্থির ও অবিচল হতে পারেনি। আবার পূর্ণরূপে বিপর্যস্তও হয়ে পড়েনি। কেননা তা ছিলো প্রায় পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত একটি নতুন ভবন। জরাজীর্ণ ভবন ছিলো না যা সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে কিংবা ছিলো না এমন সুসম্পূর্ণ ভবন যা আগাগোড়া মজবুত বুনিয়াদের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত।
দুই নীতি ও ব্যবস্থার মাঝে এ বিরোধ ছিলো যুগ বিবর্তনের অবশ্যম্ভাবী ফল, যা মানব স্বভাবের ও জগত প্রকৃতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতিরূপে তৎকালীন ইসলামী সমাজে দেখা দিয়েছিলো। বলা বাহুল্য, এ ভিন্নতা হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর অনুকূলে ছিলো। কেননা তাঁর সেনাবাহিনীতে ও শাসনাধীন অঞ্চলে বিরাজমান ছিলো পূর্ণ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আমীরের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যের জযবা। পক্ষান্তরে হযরত আলী (রা)-এর শিবিরে ও শাসন পরিমণ্ডলে বিদ্যমান ছিলো এক ধরনের অস্থিরতা, অনৈক্য ও প্রতিপক্ষ শিবির বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা ও উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে যে শৈথিল্য ও অবাধ্য স্বাধীনতা ভোগ করে আসছিলো তার প্রতি ছিলো তাদের প্রলুব্ধ দৃষ্টি। গবেষক আল-আক্কাদ বলেন, সুশৃংখল সমাজ ব্যবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট অংশটি হলো হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর শাসনাধীন সিরিয়া ও তার সন্নিহিত এলাকা। পক্ষান্তরে সুশৃংখল সমাজ ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ অংশটি হলো আলী (রা)-এর শাসনাধীন সমগ্র জাযীরাতুল আরব এলাকা ও তার জনগোষ্ঠী। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৬৯]
সুতরাং আলী ও মু'আবিয়া (রা)-এর মাঝে বিরোধ একটি বিষয়ের দখল লাভের বিরোধ ছিলো না যা কোন এক পক্ষের জয়-পরাজয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়ে যেতে পারে, বরং এ বিরোধ ছিলো দু'টি বিপরীতমুখী ব্যবস্থার ও প্রতিদ্বন্দ্বী দু'টি জগতের বিরোধ। একটি ছিলো স্বভাবতই দুর্বিনীত ও অস্থিতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে অন্যটি শাসন ব্যবস্থার বশ্যতা গ্রহণকারী এবং স্থায়িত্ব ও স্থিতিকামী। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৯৫]
📄 আলী (রা)-এর শাসননীতিই তাঁর উপযোগী ও বিকল্পহীন
আলোচ্য বিরোধের ফলস্বরূপ যতই অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা এবং বশ্যতা ও আনুগত্যহীনতা প্রকাশ পেয়ে থাকুক এবং আলী (রা) যতই বিভিন্ন অগ্নি-পরীক্ষা ও সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকুন না কেন, তদ্রূপ হযরত মু'আবিয়া (রা) যতই অনুকূল পরিস্থিতি, চিত্ত প্রশান্তি এও নিরংকুশ আনুগত্য ও বশ্যতা লাভ করে থাকুন না কেন, এ কথা অনস্বীকার্য যে, আলী (রা)-এর শাসননীতিই ছিলো তাঁর উপযোগী এবং এর কোন বিকল্প ছিলো না। গবেষক আল-আক্কাদ তাঁর ইতিহাস-নিষ্ঠা ও নৈতিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে এ প্রসঙ্গে অতি সূক্ষ্ম ও ইনসাফপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে খিলাফত পরিচালনার প্রথম দিন থেকেই হযরত আলী (রা) সেই সর্বোত্তম শাসননীতিই গ্রহণ করেছিলেন যা গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে যথার্থ ছিলো। কেননা আমাদের জানা নেই যে, তাঁর কোন সমালোচক কিংবা জীবনচরিতকার যুক্তি-প্রমাণের আলোকে আর কোন শাসননীতি পেশ করতে পেরেছেন কিনা যা নির্ভুল চিন্তা ও নিরাপদ পরিণতির ক্ষেত্রে তাঁর শাসননীতির চেয়ে উত্তম হতে পারে কিংবা ঘটনা প্রবাহ যে সকল সংকট ও দুর্যোগের মুখে তাঁকে ঠেলে দিয়েছিলো, সেগুলো রোধ করার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে।
যে সকল ঐতিহাসিক ও সমালোচক বিভিন্ন যুগ ও যুগের মানুষকে ও (জাতি ও সমাজের) কর্ণধারগণ যে সকল আকীদা, বিশ্বাস, নীতি, মূল্যবোধ ও শিক্ষা-দীক্ষার প্রভাব সযত্নে লালন করে থাকেন, সেগুলোকে একই মাপকাঠিতে মেপে থাকেন তারা অতীতে যেমন তেমনি বর্তমানেও হযরত আলী (রা)-এর শাসননীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপের ভুল ধরে থাকেন। তাদের বক্তব্য হলো, হযরত আলী (রা) যদি সিরিয়াতে হযরত মু'আবিয়া (রা)-কে ও কায়স ইবন সা'দকে মিসরের প্রশাসকের পদ হতে অপসারণ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করতেন, উসমান (রা)-এর হত্যাকারীদের অর্পণ করতে রাজী হতেন এবং সালিসী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতেন তাহলে যেসব ভয়াবহ যুদ্ধ তিনি পরিপূর্ণ ঈমান ও অসাধারণ সাহসিকতার সাথে মুকাবিলা করেছেন এবং পূর্ণ খিলাফতকালে যেসব সংকট ও দুর্যোগের মুকাবিলা তিনি করেছেন সেগুলো অতি সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু পরিবেশ, পরিস্থিতি, ঘটনা ও পরিণতির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের পর গবেষক আল-আক্কাদ এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে পারেন নি, বরং ভিন্নমত পোষণ করে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় তিনি বলেছেন,
বিভিন্ন দিক থেকে সম্ভাব্য পরিণতির কথা চিন্তা করে আমাদের যা মনে হয় তা এই যে, যে সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছেন তা থেকে ভিন্ন কোন চিন্তা ও পদক্ষেপ বিজয় ও সফলতার এবং বিপদ ও বিপর্যয় থেকে নিরাপত্তার জামানত দিতে পারতো না। সম্ভবত সফলতার সম্ভাবনা সেক্ষেত্রে আরো দুর্বল ও বিপদ আশংকা আরো প্রবল হতো, যদি তিনি উপদেশ ও পরামর্শের গণ্ডি থেকে বের হয়ে বিকল্প কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতেন। অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তিনি প্রশ্ন রেখেছেন:
তাঁর সমকালের কিংবা পরবর্তী কালের কোন সমালোচক কি কখনো নিজেকে এ প্রশ্ন করার প্রয়োজন অনুভব করেছেন, হযরত আলী (রা) যা করেছেন তা থেকে ভিন্ন কিছু করা কি তার পক্ষে সম্ভব ছিলো? কারো মনে কি এ জিজ্ঞাসা কখনো জেগেছে যে, ধরুন, সেই 'অন্য কিছুটা' তিনি করতে পারতেন, কিন্তু ফলাফল কি হতো? এটা কি সুনিশ্চিত যে, যে পরিণতির সম্মুখীন তিনি হয়েছিলেন বিকল্প পদক্ষেপ দ্বারা তার চেয়ে ভাল কিছু তিনি লাভ করতে পারতেন?
আল-আক্কাদ আরো বলেন, তারপর আমরা আবারো বলতে চাই যে, (রাজনৈতিক কৌশল ও সামরিক) চাতুর্য পরিত্যাগ করে হযরত আলী (রা) খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নি। সকল কৌশল ও চাতুর্য যদি তিনি প্রয়োগ করতেন তাহলেও খুব বেশি লাভবান হতে পারতেন না। কেননা রাজত্ব কিংবা খিলাফত তো অনিবার্য ছিলো! তাছাড়া তাঁর দায়িত্ব লাভের পূর্বেই যেসব বিরুদ্ধ অবস্থা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো, যা থেকে রাসূলুল্লাহ্-এর কোন খলীফা সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেন নি সেগুলোর সব দায়ভাগ তাঁর কাঁধে একত্র চেপে বসেছিলো।
হযরত আলী ও মু'আবিয়া (রা) যে ভিন্ন ভিন্ন নীতি ও আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন তার স্বাভাবিক হিসেবে উত্তরাধিকার ও খলীফা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিভিন্নতা দেখা দিয়েছিলো। আলী (রা) তো তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত হাসান (রা) কে খলিফা মনোনীত করার পরিবর্তে বিষয়টি শুরা ও পরামর্শের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন, অথচ তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ-এর অতি আদরের দৌহিত্র, যাঁর সম্পর্কে তিনি ইরশাদ করেছিলেন, ان ابنی ھذا سید (আমার এ পুত্র যোগ্য নেতা)।
শাহাদাতের পূর্বে তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি কি খলীফা মনোনীত করবেন না? তিনি বললেন, না, বরং বিষয়টি আমি তোমাদের হাতে ছেড়ে যাবো যেমন রাসূলুল্লাহ ছেড়ে গিয়েছিলেন। আরয করা হলো, আমাদেরকে নিরাশ্রয় অবস্থায় ছেড়ে গিয়ে আপন প্রতিপালকের সামনে কি বলে দাঁড়াবেন? তিনি বললেন, আমি বলবো, হে আল্লাহ্! আপনি আমাকে তাদের মাঝে খলীফা বানিয়েছিলেন যখন আপনার ইচ্ছা হয়েছিলো। অতঃপর আপনি আমাকে 'তলব' করেছেন তখন তাদের মাঝে আমি আপনাকে রেখে এসেছি। আপনি ইচ্ছা করলে তাদের কল্যাণ সাধন করতে পারেন, আবার ইচ্ছা করলে অকল্যাণও করতে পারেন। পক্ষান্তরে মু'আবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ান (রা) পুত্র ইয়াযীদের অনুকূলে খিলাফাতের বায়'আত গ্রহণ করেছিলেন। আর পিতা মু'আবিয়া (রা)-এর মৃত্যুর পর তিনিই শাসনভার লাভ করেছিলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৬]