📄 দুনিয়াবিমুখিতা ও মোহহীনতা
তাঁর জীবনের সর্বাধিক সমুজ্জ্বল গুণ-বৈশিষ্ট্য ছিলো অতি উচ্চ পর্যায়ের যুহদপূর্ণ জীবন, অথচ সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের উপায়-উপকরণ ছিলো অতি সুলভ, ক্ষমতা ছিলো একচ্ছত্র, আর মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিলো এমন যে, কোন রকম সমালোচনা ও কৈফিয়তের ঊর্ধ্বে ছিলো তাঁর অবস্থান। ইয়াহইয়া ইব্ন মুঈন আলী ইব্ন জা'আদ হতে এবং তিনি হাসান ইব্ন সালিহ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, উমর ইব্ন আবদুল আযীয (রা)-এর মজলিসে একবার যাহিদগণের আলোচনা হলো। তখন তিনি বললেন, দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠ যাহিদ হলেন আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫]
দুনিয়ার প্রতি তাঁর যুহদ ও নির্মোহতার কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হচ্ছে, বস্তুত এগুলো হলো অসংখ্য থেকে নগণ্য। আবু ওবায়দ হযরত আনতারাহ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'খোরনক' অঞ্চলে অবস্থানরত হযরত আলী (রা)-এর খিদমতে আমি হাযির হলাম। তিনি একটি মাত্র কম্বল গায়ে জড়িয়ে শীতে কাঁপছিলেন। আমি বললাম, হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহ্ তো এই সরকারি কোষাগারে আপনার ও আপনার পরিবারের জন্য হিসসা রেখেছেন, অথচ গরম বস্ত্রের অভাবে আপনি শীতে কাঁপছেন। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ। আমি তোমাদের মাল থেকে কিছুই নেই না। আর মদীনা থেকে এ কম্বলটাই শুধু সঙ্গে করে এনেছিলাম।
হুলইয়াতুল আউলিয়া কিতাবে আবু নাঈম যামীফ গোত্রের জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী (রা) 'আকবরা' অঞ্চলে তাঁকে দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি বলেন, হযরত আলী (রা) আমাকে বললেন, যোহরের সময় আমার কাছে চলে এসো। আমি যথাসময়ে তাঁর খিদমতে হাযির হলাম। পথ রোধ করবে এমন কোন দারোয়ান সেখানে আমি দেখলাম না। তিনি বসে ছিলেন, তাঁর সামনে একটি পেয়ালা এবং পানির একটি মশক ছিলো। তিনি একটি 'থলে' আনালেন। আমি মনে মনে বললাম, কোন হিরা-জহরত দান করার জন্যই আমাকে তিনি কষ্ট দিয়েছেন। আমি জানতাম না তাতে কী ছিলো। দেখি যে, থলের মুখ মোহর আঁটা। তিনি মোহর ভাঙ্গলেন। দেখা গেলো যে, তাতে ছাতু রয়েছে। তিনি ছাতু বের করে পেয়ালায় ঢাললেন এবং তাতে পানি মিশিয়ে শরবতের মতো করে নিজেও পান করলেন। আমাকেও পান করালেন। আমার আর ধৈর্যে মানলো না। তাই বললাম, হে আমীরুল মু'মিনীন, ইরাকে আপনি এমন করছেন, অথচ ইরাকে তো প্রচুর খাদ্য! তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! কৃপণতাবশত আমি তাতে মোহর এঁটে রাখিনি। তবে আমি আমার প্রয়োজন পরিমাণ খরিদ করে থাকি। এখন আমার আশংকা হয় যে, এটা শেষ হয়ে গেলে অন্য কিছু দিয়ে আমার খাবার তৈরি হবে। এজন্যই আমার এ সাবধানতা। কেননা হালাল ছাড়া অন্য কোন খাদ্য আমার উদরে প্রবেশ করবে, এটা আমার অপছন্দ। [১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮২]
তাঁর সামনে একবার ফালুদা নামের হালুয়া পেশ করা হলো। তখন তিনি বলেন, স্বাদে, গন্ধে ও বর্ণে তুমি অতি উৎকৃষ্ট বটে, কিন্তু আমার নফস যাতে অভ্যস্ত নয় তাতে তাকে অভ্যস্ত করে আমি বিপদে পড়তে চাই না। [প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮১]
যায়দ ইব্ন ওয়াহব (র) বলেন, একটি চাদর ও একটি লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় হযরত আলী (রা) আমাদের মাঝে তাশরীফ আনলেন। তাতেও তালি ছিলো। তাঁকে যখন এ বিষয়ে বলা হলো তখন তিনি বললেন, এ কাপড় দু'টি আমি এজন্য পরিধান করি যে, তা যেন আমাকে অহংকার হতে অধিক দূরে রাখে ও আমার নামাযের জন্য অধিক উত্তম হয় এবং মু’মিনদের জন্য আদর্শ হয়। [আল মুন্তাখাব, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৮]
মুজাম্মা ইব্ন সাম'আন তায়মী (র) বলেন, হযরত আলী (রা) তাঁর তলোয়ারখানা বাজারে নিয়ে গেলেন এবং এই বলে আওয়াজ দিলেন, আমার এ তলোয়ারখানা কে খরিদ করবে? লুঙ্গি কেনার জন্য চারটি দিরহাম আমার কাছে থাকলে এটা আমি বিক্রি করতাম না। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩]
আবদুল্লাহ ইব্ন রাযীন (র) বলেন, একবার আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)- এর খিদমতে হাযির হলাম। তিনি আপ্যায়নের জন্য আমাদের সামনে 'খাযবারা' পেশ করলেন। আমরা বললাম, আল্লাহ্ আপনার 'শুভ' করুন। যদি এই হাঁসটা জবাই করতেন তাহলে ভালো হতো। কেননা আল্লাহ তো প্রাচুর্য দান করেছেন! তিনি বললেন, হে ইব্ন রাযীন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে বলতে শুনেছি: لا يحل للخليفة من مال الله الا قصعتان، فصعة يأكلها هو واهله وقصعة يضعها بين ايدى الناس . "খলীফার জন্য বায়তুলমাল হতে দু'টি পেয়ালার অধিক গ্রহণ করা বৈধ নয়। একটিতে তিনি ও তাঁর পরিবার খাবেন আর অন্যটি আপ্যায়নের জন্য মানুষের সামনে পেশ করবেন।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩]
হযরত আবু ওবায়দ বর্ণনা করেন যে, আলী (রা) এক বছর তিনবার ভাতা প্রদান করলেন, সে বছর ইস্পাহান হতে কিছু সম্পদ এসেছিলো। তখন তিনি বললেন, এসো, চতুর্থ ভাতা গ্রহণ কর, আমি তোমাদের কোষাধ্যক্ষ নই। তখন একদল লোক তা গ্রহণ করলো, আরেক দল ফিরিয়ে দিলো। একবার তিনি লোকদের মাঝে ভাষণ দিতে গিয়ে বললেন, হে লোক সকল! সেই আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, আমি তোমাদের (বায়তুল) মাল থেকে কম বা বেশি কিছু গ্রহণ করি না, তবে এইটে ছাড়া। একথা বলে তিনি তাঁর জামার হাতা থেকে আতরের একটা শিশি বের করলেন, আর বললেন, এক দিহকান (প্রধান) এটা আমাকে হাদিয়া দিয়েছেন। অতঃপর তিনি বায়তুলমালে গিয়ে বললেন, নাও, এটা রেখে দাও। অতঃপর তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন:
افلح من كانت له قوصرة يأكل منها كل يوم تمرة .
"সফলকাম ঐ ব্যক্তি যার রয়েছে এক ঝুড়ি খেজুর আর প্রতিদিন তা থেকে একটি খেজুর খেয়ে সে জীবন ধারণ করে।"
হুরায়রা ইবন ইয়ারীম বলেন, হাসান ইব্ন আলী (রা)-কে আমি মানুষের মাঝে ভাষণ দানকালে একথা বলতে শুনেছি: হে লোক সকল, এমন এক ব্যক্তি গতকাল তোমাদের থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন যিনি সাদা বা হলদে (অর্থাৎ রৌপ্য বা স্বর্ণ) কোন সম্পদই রেখে যাননি। তবে তাঁর ভাতা থেকে উদ্বৃত্ত সাত'শত দিরহাম ছিলো যা দ্বারা তিনি একটি খাদিম খরিদ করতে চেয়েছিলেন। [মুসান্নাফে আবূ শায়বা, কিতাবুল ফাদাইল, ১২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৪]
সম্পদে ও পানাহারে কৃষ্ণ অবলম্বনের চেয়ে কঠিন কাজ হলো শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েও ক্ষমতার বিন্দুমাত্র প্রদর্শন না করে একজন সাধারণ অমুসলমান বাদীর প্রতিপক্ষ হিসেবে বিচারকের বিচার ও শরীয়তের ফায়সালা অম্লান বদনে মেনে নেয়া। নিম্নোক্ত ঘটনায় হযরত আলী (রা)-এর আলোচ্য গুণ ও বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুট হয়ে ওঠে: ইমাম হাকিম হযরত শা'বী (র) হতে বর্ণনা করেন। শা'বী (র) বলেন, জামাল যুদ্ধের দিন হযরত আলী (রা)-এর একটি 'লৌহবর্ম' হারিয়ে গেল এবং একজন লোক তা পেয়ে বিক্রি করে ফেললো। পরে সেটা পাওয়া গেলো জনৈক ইহুদীর নিকট। হযরত আলী (রা) বিচারক শোরায়হের বরাবরে তার বিরুদ্ধে বিচার দায়ের করলেন। হযরত আলী (রা)-র পক্ষে হযরত হাসান ও তাঁর আযাদকৃত দাস কম্বর সাক্ষ্য দান করলেন কিন্তু কাযী শোরায়হ বললেন, হাসানের স্থলে অন্য কোন সাক্ষী পেশ করুন। হযরত আলী (রা) বললেন, আপনি 'হাসান'-এর সাক্ষ্য রদ করতে চান? তিনি বললেন, না, তবে আপনার নিকট হতেই আমি হাদীস শুনে স্মরণ রেখেছি যে, পিতার পক্ষে সন্তানের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। অতঃপর তিনি ইহুদীকে বললেন, লৌহবর্ম নিয়ে যাও। তখন বিস্ময়াভিভূত ইহুদী বলে উঠলো, আমীরুল মু'মিনীন! আমার সাথে আপনি মুসলমানদের কাযীর দরবারে হাযির হলেন। আর তিনি আপনার বিপক্ষে রায় দিলেন এবং সে রায় আমীরুল মু'মিনীন অম্লান বদনে মেনে নিলেন! আল্লাহর শপথ, হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি সত্য বলেছেন, অবশ্যই এটা আপনার লৌহবর্ম। আপনার এক উটের পিঠ থেকে তা পড়ে গিয়েছিলো আর আমি তা কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। এখন আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। তখন হযরত আলী (রা) লৌহবর্মটি তাঁকে দান করলেন এবং অতিরিক্ত সাত 'শ দিরহাম প্রদান করলেন। এই নও মুসলিম হযরত আলী (রা)-এর সঙ্গেই ছিলেন এবং সিফফীন যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। [কানযুল উম্মাল, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৬]
এই অসাধারণ যুহদ ও কৃষ্ণ, এবং পরহেযগারি ও দীনী কঠোরতা সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিত্বে ও চরিত্রে রূঢ়তা, রুক্ষতা, অপ্রসন্নতা ও নিরসতার কোন স্থান ছিলো না, বরং তিনি ছিলেন দয়ার্দ্র ও সুপ্রসন্নচিত্ত মানুষ, যথেষ্ট পরিমাণ রসপ্রিয়তাও ছিলো তাঁর মাঝে। তাঁর বিবরণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: "তিনি ছিলেন সুদর্শন ও সুস্মিত এবং কোমল পদক্ষেপে মাটিতে বিচরণকারী।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২৩]
📄 প্রশাসক, কর্মচারী ও সাধারণ মুসলমানদের প্রতি আলী (রা)-এর আচরণ
প্রশাসক ও সরকারী কাজে নিযুক্ত অন্যদের সঙ্গে এটাই ছিলো তাঁর আচরণ নীতি আর সম্ভবত একজন শাসক ও খলীফার জন্য কার্যত এটা আত্মকৃষ্ণ ও আত্মকঠোরতার চেয়ে কঠিন বিষয় ছিলো। প্রশাসকদের প্রতি তাঁর বারংবার প্রদত্ত উপদেশ বাণী ছিলো এই-
"নিজেদের ব্যাপারে মানুষের প্রতি তোমরা ন্যায়পূর্ণ আচরণ করবে এবং তাদের অভাব-অভিযোগ ও প্রয়োজন নিরসনে ধৈর্যের পরিচয় দেবে। কেননা এরা হলো প্রাপ্তির অধিকারী প্রজা সাধারণ। কাউকে তার প্রয়োজন হতে সরিয়ে রাখবে না, আটকে রাখবে না এবং খিরাজ (ও রাজস্ব) আদায় করতে গিয়ে মানুষের শীত-গরমের বস্ত্র, সওয়ারির পশু ও দাস বিক্রি করে ফেলবে না। আর দু'একটি দিরহামের জন্য কাউকে চাবুক মারবে না।"
📄 খিরাজ ও সাদকা আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁর জারিকৃত একটি ফরমান ছিল এই
খিরাজ ও সাদকা আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁর জারিকৃত একটি ফরমান ছিলো এই- "ভাবগম্ভীর ও প্রশান্তভাবে তাদের নিকট গমন করবে। যখন তাদের মাঝে গিয়ে দাঁড়াবে তখন তাদেরকে সালাম করবে এবং তাদের প্রতি সম্ভাষণে কোন ত্রুটি করবে না। অতঃপর তুমি বলবে, হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ্র পক্ষ হতে নিযুক্ত অভিভাবক ও খলীফা আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, যাতে তোমাদের কাছ থেকে তোমাদের সম্পদে নির্ধারিত আল্লাহর হক গ্রহণ করি। সুতরাং আল্লাহর পক্ষ হতে নিযুক্ত অভিভাবকের নিকট পরিশোধ করার কোন হক কি তোমাদের সম্পদে রয়েছে? কেউ যদি 'না' বলে তাহলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে যাবে না।
পক্ষান্তরে যদি কোন দানকারী তোমাকে দান করতে চায় তাহলে তার সঙ্গে গমন করবে কিন্তু তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করবে না। হয়রানি ও নাজেহাল করবে না এবং যে পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য দান করে তা গ্রহণ করবে। যদি তার নিকট গবাদি পশু ও উট থেকে থাকে তবে তার অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশ করবে না। কেননা এর অধিকাংশ ই তার। যখন তুমি পশুপালের নিকট হাযির হবে তখন দখলকারী রুক্ষ ও কর্কশ ব্যক্তির ন্যায় সেখানে প্রবেশ করবে না এবং প্রাণীকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবে না। পশুপাল নিয়ে মালিকের সঙ্গে অসদাচরণে লিপ্ত হবে না। পুরো পালকে দু'ভাগে ভাগ করে তাকে ইখতিয়ার দেবে। সে যেভাবে পছন্দ করবে তাতে আর হাত দিতে যাবে না। অতঃপর অবশিষ্ট মালকে আবার দু'ভাগ করবে এবং মালিককে (বাছাইয়ের) ইখতিয়ার প্রদান করবে। অতঃপর যে ভাগ সে নিজে পছন্দ করবে তাতে হাত দেবে না। এরূপ করতে থাকবে যতক্ষণ না পালে এই পরিমাণ পশু থেকে যায় যা তার সম্পদের ধার্যকৃত আল্লাহ্র হকের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তখন তার কাছ থেকে আল্লাহর হক গ্রহণ করবে। যদি সে অব্যাহতি প্রার্থনা করে তাহলে তাকে অব্যাহতি দান করবে। [নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা-৩৮১]
📄 শিক্ষা ও দীক্ষা দানকারী সংশোধক ইমাম
হযরত আলী (রা) নিছক একজন প্রশাসনিক প্রধান কিংবা সাধারণ অর্থে মুসলমানদের খলীফা মাত্র ছিলেন না, যেমনটি হয়েছিলো উমাইয়া ও আব্বাসী খলীফাদের ক্ষেত্রে, বরং তিনি ছিলেন প্রথম দুই খলীফার নীতি ও আদর্শের অনুসারী। ফলে একদিকে তিনি যেমন ছিলেন মুসলমানদের শাসক ও তত্ত্বাবধায়ক তেমনি অন্যদিকে ছিলেন মুসলমানদের শিক্ষা ও দীক্ষা দানকারী একজন আধ্যাত্মিক মুরুব্বী। উম্মাহর সামনে নববী জীবন চরিতের এক উত্তম নমুনা। মুসলমানদের দীন, ঈমান, আমল-আখলাক ও জীবনযাত্রায় তাঁর প্রতি অতি সতর্ক দৃষ্টি ছিলো, যেন ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও রাসূলুল্লাহ্-এর সুমহান আদর্শ থেকে চুল পরিমাণও বিচ্যুতি না ঘটে ইসলামী উম্মাহর। বিজিত দেশ ও জাতিসমূহের স্বভাব-প্রকৃতি ও সভ্যতা-সংসৃতি যেন তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে তিনি মুসলমানদের ইমামতি করতেন। তাদেরকে প্রয়োজনীয় উপদেশ ও ধর্ম শিক্ষা দান করতেন। দুনিয়ার জীবনে মুসলমানদের কাছ থেকে আল্লাহ্ কি চান এবং কি অপছন্দ করেন সে সম্পর্কে তিনি তাদের জ্ঞান দান করতেন। মসজিদে বসে তিনি তাদের খোঁজ-খবর নিতেন এবং কুশল জিজ্ঞাসা করতেন। তাদের দীন ও দুনিয়া সম্পর্কিত যাবতীয় জিজ্ঞাসার জবাব দিতেন এবং সমস্যার সমাধান পেশ করতেন। বাজারে ঘুরে ঘুরে তিনি তাদের বেচাকেনা ও লেনদেন প্রত্যক্ষ করতেন এবং উপদেশ দিয়ে বলতেন: আল্লাহকে ভয় করো এবং মাপ ও পরিমাপ পূর্ণ করো। মানুষকে তাদের প্রাপ্য জিনিসে ঠকিও না। নিজের ব্যাপারে তিনি পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা এবং রক্ত ও বংশকৌলিন্যের বিন্দুমাত্র 'সুবিধা' তিনি গ্রহণ করেন নি। প্রয়োজনীয় কিছু ক্রয় করতে হলে তিনি অপরিচিত কোন বিক্রেতা তালাশ করে তার কাছ থেকে কিনতেন। এটা তাঁর খুবই পছন্দ ছিলো যে, আমীরুল মু'মিনীন পরিচয়ে কোন বিক্রেতা তার সঙ্গে কিছুমাত্র রেয়ায়েতমূলক আচরণ করবে।
কথায় ও কাজে এবং ভাগ-বাটোয়ারা ও সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের সঙ্গে সমতা রক্ষার ব্যাপারে তিনি নিজে যেমন অতি যত্নবান ছিলেন, তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলে নিযুক্ত প্রশাসকদের থেকেও তিনি অনুরূপ আচরণ ও নীতির অনুসরণ প্রত্যাশা করতেন। তাই তাদের প্রতি তিনি কঠোর দৃষ্টি রাখতেন। মাঝে মধ্যে প্রশাসকদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়া এবং তাদের প্রতি জনসাধারণের মনোভাব ও মতামত জানার জন্য গোপন পর্যবেক্ষক দল পাঠাতেন। তারা সরেজমিনে সব খোঁজ-খবর জেনে আমীরুল মু'মিনীনের নিকট রিপোর্ট পেশ করতেন। এ কারণে তাঁর অধীনস্থরা তাঁকে খুব ভয় করতো। প্রয়োজন হলে তাদের প্রতি তিনি কঠোর তিরস্কার ও সতর্কবাণী উচ্চারণ করতেন। প্রশাসকদের নামে লেখা তাঁর পত্রাবলীতে এর বহু প্রমাণ রয়েছে। প্রশাসকদের প্রতি তাঁর এ সতর্ক দৃষ্টি শাসনকার্য ও ইসলামী আইনের বিধি-বিধান পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং তাদের ব্যক্তিজীবন ও দৈনন্দিন আচার-আচরণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। আল্লাহকে ভয়কারী, রাসূলুল্লাহ্ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত ও আদর্শ অনুসরণকারী প্রশাসকদের মান উপযোগী নয় এমন কোন আচরণে তিনি তাদেরকে কঠোর কৈফিয়তের সম্মুখীন করতেন।
উদাহরণস্বরূপ তাঁর কাছে সংবাদ এলো যে, বসরায় তাঁর নিযুক্ত প্রশাসক উসমান ইব্ন হানীফ আল আনসারীকে এক ভোজসভায় দাওয়াত করা হয়েছিলো, কিন্তু দাওয়াতের ক্ষেত্রে ইসলামী সাম্যনীতি অনুসরণ করা হয়নি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভও এর উদ্দেশ্য ছিলো না। হযরত উসমান ইব্ন হানীফ সে দাওয়াতে শরীক হয়েছিলেন। তাই হযরত আলী (রা) তাঁর নামে এই মর্মে এক উপদেশ পত্র পাঠালেন:
"অতঃপর, হে ইব্ন হানীফ! আমি সংবাদ পেয়েছি, বসরার কোন এক যুবক তোমাকে দস্তরখানে দাওয়াত দিয়েছিলো, আর তুমি বড় বড় থালা ও রকমফের মজাদার খাবারের লোভে সেদিকে দৌড় দিয়েছো। আমার কিন্তু ধারণা ছিলো না, তুমি এমন লোকদের দস্তরখানে শরীক হতে পারো, যাদের দরিদ্ররা সেখানে অনাদৃত আর ধনীরা সাদরে আমন্ত্রিত। শোন, এ ধরনের খাবার মুখে দেয়ার আগে চিন্তা করে নিও, যদি সন্দেহযুক্ত মনে হয় তাহলে ফেলে দিও। আর যদি উত্তম বলে নিশ্চিত হতে পারো তাহলে গ্রহণ করো। [নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা ৪১৬-৪১৭]