📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কাব্য চর্চা

📄 কাব্য চর্চা


হযরত আলী (রা)-এর নামে একটি দীওয়ান বা কাব্য সঞ্চয়নও প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। বহু লেখক, সাহিত্যিক ও আলিম বুদ্ধিজীবী তাঁর কবিতা উদাহরণ ও দৃষ্টান্তরূপে আবৃত্তি করে থাকেন। তবে সমালোচকগণ দীওয়ানভুক্ত বহু কবিতারই মৌলিকত্ব সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে আসছেন। কোন কোন কবিতা আবার হযরত আলী (রা)-এর সাহিত্যমান থেকেও নিচে।

মুজামুল উদাবা গ্রন্থে বলা হয়েছে, আবূ মানসূর মুহম্মদ ইব্‌ন আহমদ আযহারীর স্বহস্তে সংকলিত 'কিতাবুত তাহবীর'-এ এ মন্তব্য আমি নিজে পড়েছি। "আবু উসমান আল আমিনী বলেন, দু'টি কবিতা পংক্তি ছাড়া হযরত আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা)-এর নামে সম্পৃক্ত কোন কবিতা পংক্তি আমাদের মতে বিশুদ্ধ প্রমাণিত নয়।"

ইন্ন হিশাম তাঁর সীরাত গ্রন্থে কয়েকটি স্থানে হযরত আলী (রা)-এর কবিতা উদ্ধৃত করেছেন এবং সেগুলোর মৌলিকত্ব সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেছেন।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 তিরস্কারমূলক সাহিত্যের অনন্য উদাহরণ

📄 তিরস্কারমূলক সাহিত্যের অনন্য উদাহরণ


হযরত আলী (রা)-এর জীবন চরিতের এ মর্মান্তিক ও গুরুতর অধ্যায়টির সমাপ্তি টানার পূর্বে তাঁর নিন্দা ও তিরস্কার কাব্যের কতিপয় অনবদ্য উদাহরণ পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরছি। বস্তুত নিন্দা ও তিরস্কার বিষয়ক বিশ্ব সাহিত্যে হযরত আলী (রা)-এর সাহিত্য অবশ্যই শীর্ষ স্থান লাভের যোগ্য দাবিদার। হযরত আলী (রা)-এর পক্ষ সমর্থনের প্রবল দাবিদার ইরাকীদের অদ্ভুত স্বভাব-প্রকৃতি ও শুধু সমকালীন নয়, বরং সর্বকালীন আরবী সাহিত্যের ইতিহাসে হযরত আলী (রা) যে বিরল আরবীয় অলংকার ও বাগ্মিতার অধিকারী ছিলেন- এ উভয় উপাদান আলোচ্য সাহিত্যের রূপ কাঠামো গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলো।

দেখুন, অবাধ্য সঙ্গী সমর্থক ও উচ্ছৃঙ্খল বাহিনীর উদ্দেশে কঠোর তিরস্কার বাণী উচ্চারণ করে তিনি বলেছেন,

"শীর্ণ উট ও জীর্ণ বস্ত্রের যেরূপ যত্ন নেয়া হয়, তেমন করে আর কত যত্ন নিতে হবে তোমাদের আমার! জীর্ণ বস্ত্র এক দিকে সেলাই করলে অন্য দিক যেমন ছিঁড়ে যায় তেমনি হয়েছে তোমাদের দশা। যখনই সিরিয়ার কোন ক্ষুদ্র বাহিনী উঁকি দেয় তখনই তোমাদের প্রত্যেকে তার ঘরের দুয়ার বন্ধ করে দেয় এবং গুইসাপের মতো গর্তে ঢুকে পড়ে এবং হায়েনার মতো বাসগুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে।"

আরেকবার তিনি বলেছেন, "আল্লাহর কসম, তোমরা যার সাহায্যকারী হবে সে অপদস্থ হবে। আর যে তোমাদেরকে তীররূপে ব্যবহার করবে সে ফলাহীন ও ভাংগা তীর নিক্ষেপ করবে। আল্লাহর শপথ! খোলা মাঠে তোমরা সংখ্যায় বিপুল কিন্তু যুদ্ধের ঝাণ্ডাতলে তোমাদের সংখ্যা অতি নগণ্য। অবশ্য আমি জানি তোমাদের সংশোধনের ও সোজা পথে আনয়নের উপায় কি? কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি নিজেকে নষ্ট করে তোমাদের সংশোধন চাই না। আল্লাহ্ তোমাদের অপদস্থ করুন ও তোমাদের পূর্বপুরুষদের দুর্ভাগা করুন। বাতিলের সাথে তোমাদের যত নিবিড় পরিচয় সত্যের সাথে তত নয় এবং সত্যকে যেমন প্রত্যাখ্যান করো, বাতিলকে তেমন নয়।"

অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "অতঃপর হে ইরাকবাসিগণ, তোমরা হলে সেই গর্ভবতী নারীর মতো, প্রসবাসন্ন অবস্থায় যার গর্ভপাত হয়ে গেলো, এমন কি তার রক্ষাকর্তা স্বামীরও মৃত্যু হলো এবং তার বৈধব্যকাল দীর্ঘ হলো এবং তাঁর দূরতম সম্পর্কের লোক তার (সম্পত্তির) উত্তরাধিকার লাভ করলো। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি শোনো, অবশ্যই এরা তোমাদের ওপর বিজয়ী হবে। তবে এজন্য নয় যে, তারা তোমাদের চেয়ে অধিক হকপন্থী, বরং এজন্য যে, তাদের বাতিলের প্রতি তারা ধাবমান, অথচ আমার হকের প্রতি তোমরা অতি ধীরগামী, বিভিন্ন জাতি তো তাদের শাসকদের জুলুমের ভয়ে শংকিত কিন্তু আমি আমার প্রজা সাধারণের জুলুমের ভয়ে শংকিত! আমি তোমাদেরকে জিহাদের আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু তোমরা জিহাদে বের হওনি এবং আমি তোমাদেরকে তোমাদের কল্যাণের কথা শুনিয়েছি কিন্তু তোমরা তাতে কর্ণপাত করোনি। তোমাদেরকে আমি গোপনে ও প্রকাশ্যে সত্যের পথে ডেকেছি, কিন্তু তোমরা সাড়া দাওনি। আমি তোমাদের উপদেশ দিয়েছি কিন্তু তোমরা তা গ্রহণ করোনি।"

"তোমরা উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিতের মতো এবং শাসিত হয়েও শাসকের মতো। আমি তোমাদেরকে 'হিকমত' তিলাওয়াত করে শোনাই, অথচ তোমরা তা থেকে পলায়ন করো, আর আমি তোমাদেরকে প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দান করি কিন্তু তোমরা তা উপেক্ষা করে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাও। আর আমি তোমাদেরকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করি কিন্তু আমার কথা শেষ না হতেই দেখি তোমরা একেবারে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছো। নিজ নিজ মজলিসে তোমরা ফিরে যাও এবং যাবতীয় উপদেশ ভুলে যাও। সকালে তোমাদেরকে আমি সোজা করি কিন্তু সন্ধ্যায় দেখি ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেছো। ফলে সংশোধক হতাশ হয়ে পড়েছে আর সংশোধিতরা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।"

অন্য প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, "হে আমার জাতি! যাদের শরীর হাযির কিন্তু বুদ্ধি গায়েব ও আকাঙ্ক্ষা বিভিন্ন এবং যাদের নেতাগণ তাদের দ্বারা বিপদগ্রস্ত! তোমাদের নেতা তো আল্লাহর আনুগত্য করেন কিন্তু তোমরা তাঁর অবাধ্যতা করো। ওদিকে সিরিয়াবাসীদের নেতা আল্লাহর নাফরমানি করে, অথচ তারা তার আনুগত্য করে। আল্লাহর শপথ! আমার আকাঙ্ক্ষা হয় যে, মু'আবিয়া যদি 'দিনারের বিনিময়ে দিরহাম' এই ভিত্তিতে আমার সাথে তোমাদেরকে বিনিময় করতেন এবং তাদের থেকে একজনকে দিয়ে আমার কাছ থেকে তোমাদের দশজন নিতেন তাহলে আমি সানন্দে তাতে রাজী হতাম। সত্যের ব্যাপারে বহুধাবিভক্ত যুদ্ধের প্রতি নিস্পৃহ, দেহগুলো একত্র সমবেত কিন্তু হৃদয়গুলো বিচ্ছিন্ন। আল্লাহর বিধানগুলো লংঘিত হতে দেখেও তারা ক্রুদ্ধ হয় না। এরা আরবের অভিজাত শ্রেণী এবং সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু মনের অমিল অবস্থায় সংখ্যাধিক্যে কোন লাভ নেই। আমি তোমাদেরকে দিয়ে চিকিৎসা লাভ করতে চাই, অথচ তোমরাই হলে আমার ব্যাধি।"

"আমি যেন দিব্যি দেখতে পাচ্ছি যে, তোমরা গুঁইসাপের মতো অর্থহীন শব্দ করছো। কিন্তু নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট নও এবং জুলুম প্রতিরোধেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নও। যুদ্ধের মাঠে যেমন তোমরা সাহসী পুরুষ নও তেমনি একান্ত মুহূর্তে নও বিশ্বস্ত বন্ধু। আমি তোমাদের সঙ্গ প্রত্যাশী কিন্তু তোমরা আমার লোকবল নও।"

অন্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "হে লোক সকল, যাদের দেহ একত্র কিন্তু হৃদয় বিভক্ত, তোমাদের কথা জন্ম বধিরকেও দুর্বল করে আর তোমাদের আচরণ শত্রুকে তোমাদের প্রতি প্রলুব্ধ করে। তোমাদের যিনি আব্বান জানাবেন তার আহ্বানের কোন মর্যাদা নেই এবং তোমাদেরকে নিয়ে যিনি দুর্ভোগ পোহাবেন তার অন্তরে স্বস্তি নেই। মিথ্যা অজুহাতে তোমরা গোমরাহির পথে ধাবমান। তোমাদের বাসভূমি হাত ছাড়া হওয়ার পর আর কোন্ বাসভূমি রক্ষা করবে এবং আমার পরে আর কোন্ ইমামের পক্ষ হয়ে তোমরা লড়াই করবে। তোমরা যাকে প্রবঞ্চিত করেছ আল্লাহর শপথ, সেই হলো প্রবঞ্চিত আর তোমাদের সাহায্যে যে জয় লাভ করবে সে যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট তীর দ্বারা জয় লাভ করবে।" [নাহজুল বালাগা]

ফন্ট সাইজ
15px
17px