📄 হযরত আলী (রা)-এর ফাযায়েল সংক্রান্ত হাদীসের সংখ্যাধিক্যের কারণ
একথা সর্বজনবিদিত যে, হযরত আলী (রা)-এর গুণাবলী ফাযায়েল সম্পর্কে এত অধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যা অপর কোন সাহাবী সম্পর্কে ও রিসালত যুগের সমসাময়িক অন্য কোন ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে বর্ণিত হয়নি। অবশ্য এটা ছিলো বাস্তব অবস্থারই স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। কেননা কুদরতের ফায়সালা অনুযায়ী তাঁকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহ মারাত্মকভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে ছিলো এবং তুমুল মতবিরোধ ও বিবাদ-বিসম্বাদে জড়িয়ে পড়েছিলো। খিলাফত আমলে এবং খিলাফত-পরবর্তীকালে তিনি প্রবল সমালোচনা ও নিন্দা-অপবাদের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়েছিলেন। এমন অনন্যসাধারণ প্রতিভা, যোগ্যতা, অতুলনীয় কীর্তি ও কর্মের অধিকারী ছিলেন যা মানুষকে সহজেই নিন্দা-প্রশংসা ও আলোচনা-সমালোচনার পাত্রে পরিণত করে। তাঁর ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে বিবাদবিতর্কের এমন ঝড় ওঠে যে, অবমূল্যায়নের তলে চাপা পড়ে যায় তাঁর আসল ব্যক্তিত্ব। একদল হয়ে ওঠে অন্ধ সমালোচক, আরেকদল হয়ে ওঠে অন্ধ স্তাবক।
বহু মুহাদ্দিস, সীরাত লেখক ও ঐতিহাসিক হযরত আলী (রা)-এর ফাযায়েল, মানাকিব, গুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। তন্মধ্যে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ও প্রসিদ্ধ হলো ইমাম আবূ আবদুর রহমান আহমদ ইব্ন শো'আইব নাসাঈ (র)-এর সংকলন। 'কিতাবুল খাসাইস ফী মানকিবি আলী ইব্ন আবী তালিব (রা)' নামক গ্রন্থটি ইমাম নাসাঈ (র) ছিলেন সিহাহ সিত্তার অন্যতম সংকলন নাসাঈ শরীফের প্রণেতা। তাঁর মৃত্যু ৩০৩ হিজরী। আলোচ্য গ্রন্থটি সংকলনের অনুপ্রেরণা ছিলো। সিরিয়ায় দামেস্কে অবস্থানকালে তিনি দেখতে পেলেন যে, বহু সিরীয় হযরত আলী (রা)-এর প্রতি অত্যন্ত বিরূপ মনোভাব পোষণ করে এবং তাঁর প্রতি বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করে থাকে। বলা বাহুল্য, এ গ্রন্থ সংকলনের কারণে তাঁকে আমীরুল মু'মিনীন আলী (রা)-এর প্রতি চরম বিদ্বেষীদের পক্ষ হতে তীব্র হামলার (এমন কি প্রাণ নাশের হুমকির) সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। কিন্তু সত্য প্রকাশের এবং জ্ঞান ও গুণীর পক্ষে সাক্ষ্য দানের পথ থেকে কোন কিছুই তাঁকে বিরত রাখতে পারেনি।
হযরত আলী (রা) সম্পর্কে এত অধিক সংখ্যক ফাযায়েল বর্ণিত হওয়ার কারণ সম্পর্কে আল্লামা হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (র) তাঁর বুখারী শরীফের ভাষ্যগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে বিশ্লেষণধর্মী বিশদ আলোচনা করেছেন। সেখানে তাঁর শেষ বক্তব্য ছিলো:
আলী (রা) সম্পর্কে মানুষ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রথম শ্রেণী হলো আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের শ্রেণী। দ্বিতীয় হলো বিদ'আতপন্থী খারিজী সম্প্রদায় আর তৃতীয় হলো হযরত আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণকারী বনূ উমাইয়া ও তাদের সমর্থকশ্রেণী। ফলে আহলে সুন্নাতের অনুসারিগণ তাঁর ফাযায়েল ও গুণ বৈশিষ্ট্য প্রচারের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। এভাবে তা ফাযায়েল ও মানাকিব অস্বীকারকারীদের সংখ্যাধিক্যের কারণে সেগুলো বর্ণনাকারীদেরও সংখ্যাধিক্য ঘটেছিলো। অন্যথায় প্রকৃত সত্য এই যে, চার ইমামের প্রত্যেকেরই এমন গুণ ও ফাযায়েল রয়েছে যা ইনসাফের মানদণ্ডে লেখা হলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতামতের বাইরে মোটেই যাবে না।
📄 হযরত আলী (রা)-এর খিলাফতের কয়েকটি দিক, যার যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি
বহু ইতিহাস গবেষক যারা হযরত আলী (রা)-এর জীবনচরিত ও তাঁর খিলাফতকালীন যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘটনাবলী সম্পর্কে গবেষণা ও পর্যালোচনা করে থাকেন তারা মনে করেন, হযরত আলী (রা)-এর যাবতীয় যুদ্ধ তৎপরতা শুধু যে ইরাকী ও শামীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো তা নয়, বরং আহলে কিবলা তথা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো। পূর্ববর্তী খলীফাদের যুগে যেমন দেশ ও অঞ্চল বিজিত হয়েছিলো সেখানে ইসলামের শাসন বন্ধন সুসংহত করা, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ধর্মত্যাগীদের শায়েস্তা করা এবং ফিতনা সৃষ্টিকারীদের দমন করার ব্যাপারে তার কোন তৎপরতা ছিলো না। নতুন নতুন এলাকা জয় করা এবং ইসলামী ভূখণ্ডের সম্প্রসারণ চিন্তা তো কোন প্রশ্নই ছিলো না।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, ঐতিহাসিকগণ সাধারণভাবে হযরত আলী (রা)-এর চরিত্রের এ দিকটির প্রতি সুবিচার করতে পারেন নি এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ব্যাপারেও যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করেন নি। ফলে ইরাক ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে খবরাখবরের স্থলে অনেকটা চাপা পড়া অবস্থায় রয়ে গেছে। এখানে আমরা কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে হযরত আলী (রা)-এর সীরাত ও ঘটনাবলীর আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে প্রসঙ্গত এতদসংক্রান্ত যে সকল তথ্য বর্ণিত হয়েছে তার যৎসামান্য উল্লেখ করছি।
তন্মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো পারস্য ও কিরমানের অধিবাসীদেরকে ইমামের নিকট খারাজ আদায়ে বাধ্য করা এবং খারাজ পরিশোধে ইমাম ও খিলাফতের আনুগত্য অস্বীকার ও বিদ্রোহের ফিতনা পূর্ণরূপে দমন করা। ৩৯ হিজরীর ঘটনাবলী প্রসঙ্গে ইবনে জাবীর তাবারী রচিত 'তারীখুল উমাম ও মুলুক' নামক ইতিহাস গ্রন্থে এসেছে। ইবনুল খাযরামী যখন নিহত হলেন এবং আলী (রা)-এর ব্যাপারে মানুষ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়লো, তখন পারস্য ও কিরমানের অধিবাসীরা খারাজের বিধান লংঘনে প্রলুব্ধ হলো এবং সকল এলাকার লোকেরা সন্নিহিত এলাকার ওপর দখল কায়েম করে নিয়োগকৃত প্রশাসকদের বের করে দিলো।
অন্য এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে, পারস্যবাসী যখন খারাজ প্রদানে অস্বীকৃতি জানালো তখন আলী (রা) পারস্যের প্রশাসনে একজন উপযুক্ত লোক নিযুক্ত করার ব্যাপারে লোকদের পরামর্শ চাইলেন। তখন জারিয়া ইবনে কুদামা তাঁকে বললেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! আমি কি আপনাকে এমন লোকের সন্ধান দেব না, যিনি মনোভাবে কঠোর ও শাসনকার্যে বিজ্ঞ ও অর্পিত দায়িত্ব পালনে একাই যথেষ্ট? তিনি বললেন, কে তিনি? জারিয়া ইবনে কুদামা বললেন, তিনি হলেন যিয়াদ। আলী (রা) বললেন, হ্যাঁ, তিনি এ কাজের উপযুক্ত ব্যক্তি। তখন তিনি তাঁকে পারস্য ও কিরমানের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন এবং চার হাজার সৈন্যের বাহিনীসহ তাঁকে পারস্য ও কিরমান অভিমুখে প্রেরণ করলেন। যিয়াদ সমগ্র অঞ্চল পদানত করলেন। ফলে স্থানীয় অধিবাসীরা সোজা পথে ফিরে এলো।
শা'বী (র)-এর সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, পার্বত্য এলাকার অধিবাসীরা যখন আনুগত্য বর্জন করলো এবং খারাজ আদায়কারীরা খারাজের বিধান লংঘনে প্রলুব্ধ হলো এবং হযরত আলী (রা) নিযুক্ত প্রশাসক সাহাল ইবনে হানীফ (রা)-কে পারস্য থেকে বের করে দিলো তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হযরত আলী (রা)-কে বললেন, পারস্যের ব্যাপারে আমি আপনার জন্য যথেষ্ট হবো। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বসরায় এসে যিয়াদকে বিরাট বাহিনীসহ পারস্য অভিমুখে প্রেরণ করলেন। আর তিনি তাঁর বাহিনীর সাহায্যে পারস্যবাসীকে পদানত করলেন। ফলে তারা খারাজ আদায়ে পুনঃস্বীকৃত হলো। [তারীখুল উমাম ওয়াল মূল্ক, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৯]
এ পর্যায়ে হযরত আলী (রা)-এর আরেকটি অবদান এই যে, সিন্ধু অঞ্চলে তিনি খিলাফতের সময় কতিপয় বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন এবং সিন্ধুর এমন কিছু এলাকা জয় করেছিলেন যা ইতিপূর্বে ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফুতুহুল বুলদান গ্রন্থে বালাযুরী (র) বলেন, আলী ইবনে আবু তালিব (রা)-এর খিলাফত কালে ৩৮ হিজরীর শেষ ভাগ এবং ৩৯ হিজরীর প্রথম ভাগে আলী (রা)-এর অনুমতি প্রাপ্ত হলে হারিস ইবনে মুররা আল-আবাদী ঐ অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করলেন এবং প্রচুর গনীমতের মাল ও যুদ্ধবন্দী লাভ করলেন, এমন কি একদিনে এক হাজার যুদ্ধবন্দী (দাসরূপে) বণ্টন করলেন। অতঃপর তিনি তাঁর প্রায় সকল অনুগামীসহ বীকান অঞ্চলে নিহত হলেন। এটা ছিলো ৪২ হিজরীর ঘটনা। বীকান হলো সিন্ধুর খোরাসান সংলগ্ন এলাকা। [ফুতহুল বুলদান, পৃষ্ঠা-৩৮]
এ পর্যায়ে তাঁর তৃতীয় কীর্তি হলো খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের একটি দলের বিরুদ্ধে লড়াই করা যারা ইসলাম গ্রহণের পর আবার ধর্মত্যাগ করেছিলো। আম্মার ইবনে আবূ মু'আবিয়ার সূত্রে ও তিনি আবূ তোফায়েলের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক দল লোক ধর্মত্যাগ করেছিলো। তারা মূলত খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের লোক ছিলো। তাদেরকে দমনের জন্য আলী ইবনে আবু তালিব (রা) মা'আকাল ইবনে ফয়েজ তায়মীকে প্রেরণ করলেন। তিনি যুদ্ধের উপযুক্ত লোকদের হত্যা করলেন এবং তাদের সন্তান-সন্ততিদের বন্দী করলেন। [তাহাবী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৩]
📄 সন্তান-সন্ততি
ফাতিমা (রা)-এর গর্ভে হযরত আলী (রা)-এর যে সকল সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাঁরা হলেন হাসান ও হুসায়ন। কথিত আছে, মুহসিন নামেও তাঁর একটি পুত্র সন্তান ছিলো যিনি শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এছাড়া হলেন যায়নাতুল কুবরা ও উম্মে কুলসুম। পূর্বেও বলা হয়েছে, এই হযরত উম্মে কুলসুমকে হযরত উমর (রা) বিয়ে করেছিলেন।
হযরত ফাতিমা (রা)-এর ওফাতের পর যাঁদেরকে তিনি স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের গর্ভজাত হযরত আলী (রা)-এর সন্তানগণ হলেন: আব্বাস, জাফর, আবদুল্লাহ্ ও উসমান। এঁরা সকলে আপন ভ্রাতা হযরত হুসায়ন (রা)-এর সঙ্গে কারবালায় শাহাদাত বরণ করেছেন। তাঁর ঔরসজাত আরও দু'জন পুত্র সন্তান হলেন উবায়দুল্লাহ্ ও আবূ বকর। হিশাম ইবনে কালবী বলেন, কারবালায় ইয়াহয়া, মুহাম্মদ আল আসগর, উমর, রোকাইয়া ও মুহাম্মদ আল আওছাতও শাহাদাত বরণ করেছেন।
তাঁর আরেক পুত্র মুহাম্মদ আল-আকবার ইব্দুল হানাফিয়া নামে খ্যাতি লাভ করেছেন। তিনি মুসলিম জগতের নেতৃস্থানীয়দের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে সাহসী, দানশীল, বিশুদ্ধভাষী। কুরআন-হাদীসের প্রাজ্ঞ আলিম। আবু বকর ও উমর (রা)-কে অগ্রাধিকার দান করতেন এবং উসমান (রা)-এর প্রশংসা করতেন। ৮১ হিজরীতে ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন।
ইবনে খাল্লিকান (র) বলেন, মুহাম্মদ (র) অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ও অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন। তাছাড়া প্রচণ্ড শারীরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। জামাল যুদ্ধের দিন তাঁর পিতার ঝাণ্ডা তাঁর হাতে ছিলো। হযরত উমর (রা)-এর খিলাফত অবসানের দু'বছর পূর্বে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮১ হিজরীর ১ মুহররম ইন্তিকাল করেন। এ সম্পর্কে ভিন্নমতও পাওয়া যায়। বাকীতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। [ওয়াফিয়াতুল আইয়ান, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩১-৩৩২]
তাঁর বংশধরের মধ্যে বড় বড় আলিম, মহান সাধক ও সংস্কারক জন্ম লাভ করেছেন। তাঁদের অনেকের পরিচিতি ও জীবনবৃত্তান্ত তাবাকাত ও তারাজিম (শ্রেণী ও পরিচিতি) বিষয়ক গ্রন্থাবলীতে স্থান লাভ করেছে। পাক-ভারত উপমহাদেশের বহু শহরে এ বংশধারা ছড়িয়ে আছে। সাধারণত এঁরা আলাবী নামে পরিচিত।
ইবনে জাবীর (র) বলেন, হযরত আলী (রা)-এর সন্তানদের মধ্যে ১৪ জন পুত্র ও ১৭ জন কন্যা।
ওয়াকিদী বলেন, তবে তাঁর বংশধারা রক্ষা পেয়েছে পাঁচজন দ্বারা। তাঁরা হলেন হাসান, হুসায়ন, মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়া, আব্বাস ও উমর (রা)।
📄 জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও ভাষা-প্রজ্ঞা
এখানে আমরা হযরত আলী (রা)-এর অসাধারণ প্রজ্ঞা, অতি উচ্চ অলংকার-সমৃদ্ধ ও সাহিত্যরসপূর্ণ ভাষা ও নীতিকথার কিছু নমুনা পেশ করবো যার উদাহরণ অন্যান্য ভাষার সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে তার পূর্বে ওস্তাদ আহমদ হাসান যাইয়াত রচিত 'আরবী সাহিত্যের ইতিহাস'-এর অংশ বিশেষ ধারণ করে এখানে তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর পর পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের মাঝে হযরত আলী (রা)-এর চেয়ে বিশুদ্ধ ভাষী ও বক্তৃতা পারদর্শী আর কারো কথা আমাদের জানা নেই। তিনি ছিলেন মহাপ্রজ্ঞাবান যাঁর বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ থেকে প্রজ্ঞা উৎসারিত হতো এবং আদর্শ বক্তা যাঁর জিহ্বা থেকে ভাষা অলংকারের যেন ফুলকি ঝরতো! তিনি সফল উপদেশদাতা যাঁর উপদেশ কর্ণপথে হৃদয়ের গভীরে গিয়ে রেখাপাত করতো এবং অসাধারণ পত্র-লেখক যাঁর প্রতিটি ছত্রে অতলান্ত যুক্তির প্রকাশ থাকতো। আদর্শ আলোচক যিনি যে কোন বিষয়ে ইচ্ছানুরূপ কথা বলতে পারতেন। সর্বসম্মতভাবেই তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ বক্তা ও সৃজনশীলদের শিরোমণি। [তারীখুল আদাব আল-আরাবী, পৃষ্ঠা-১৭৪]
গবেষক আল-আক্কাদ-এর মন্তব্যও এখানে আমরা যোগ করতে চাই। তিনি বলেন, ইমামের পক্ষ হতে যে সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ 'বাণী' বর্ণিত হয়েছে সেগুলো এমন অপূর্ব রীতি ও শৈলীমণ্ডিত যে, প্রচলিত প্রবাদ ও সুপ্রকাশিত ভাষা অনুসরণের ক্ষেত্রে এর চেয়ে উত্তম কোন রীতি ও শৈলী আর হতে পারে না। তাই হতবাক হয়ে ভাবতে হয় যে, ইমামের বাণীসমূহের কোন্ বৈশিষ্ট্যটি অধিকতর উৎকৃষ্ট ও সুষম। ভাবনিষ্ঠা নাকি প্রকাশ অলংকার নাকি শিল্পকুশলতা!
এই নীতিকথা, উপদেশ বাণী ও প্রবাদ বাক্যসমূহের প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, এগুলো নির্ভুল চিন্তা, বিশুদ্ধ ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এবং জীবন ও মানব স্বভাবের সুগভীর অধ্যায়ের কথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যেন তা সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা, চিন্তা-ভাবনা ও নিবিষ্ট অধ্যয়নের সারনির্যাসরূপে পেশ করা হয়েছে। যা হৃদয়ের গভীরে ও জীবনের অতলান্তে প্রবেশের মাধ্যমেই করা সম্ভব। এখানে আমরা পাঠকবর্গের সামনে বিশাল ভাণ্ডারের সামান্য নমুনা হিসাবে মাত্র বিশটি নীতিবাক্য ও প্রজ্ঞা তুলে ধরছি।
১. قيمة كل امرئ ما يحسنه প্রতিটি মানুষের মূল্য তার যোগ্যতায়।
২. كلموا النسا على قدر عقولهم، اتحبون ان يكذب الله ورسوله মানুষের সাথে তাদের বুদ্ধি পরিমাণ কথা বলো। তোমরা কি চাও আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল মিথ্যা সাব্যস্ত হোন?
৩. احذر صولة الكريم اذا جاء ، وصولة اللئيم اذا شبع লোকের হামলা সম্পর্কে সতর্ক হও যখন সে ক্ষুধার্ত হয়। আর ইতর লোকের হামলা হতে সতর্ক হও যখন সে পূর্ণ উদর হয়।
৪. اجمعوا هذه القلوب والتمসوا لها طرف الحكمة، فانها تمل كما تمل الابدان হৃদয়সমূহ একত্র করো এবং তা ধরে রাখতে হেকমতের আশ্রয় গ্রহণ করো। কেননা শরীরের ন্যায় হৃদয়ও ক্লান্তি ও একঘেয়েমি বোধ করে।
৫. النفس موثرة للهوى ، تخذة بالهويني ، جامحة الى اللهو ، امارة بالسوء، مستوطنة للفجور ، طالبة للراحة، نافرة عن العمل، فان اكরেتها انضيتها، وان اهملتها ارديته নফস খেয়াল-খুশির পূজারী। সহজগামী আমোদ-প্রমোদের অভিলাসী, কু-প্ররোচনায় অভ্যস্ত, পাপাচারে আসক্ত, আরামপ্রিয় ও কর্মবিমুখ। যদি তাকে বাধ্য করো তাহলে সে দুর্বল হয়ে পড়বে। আর যদি তাকে ছেড়ে দাও তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে।
৬. الا لا يرجون احدكم الا ربه ، ولا يخافن الا ذنبه، ولا يستحى احدكم اذا لم يعلم ان يتعلم، واذا سئل عما لا يعلم ان يقول لا اعلم তোমাদের কেউ যেন আপন প্রতিপালক ছাড়া অন্য কারো আশা না করে এবং তার 'শাস্তি' ছাড়া অন্য কিছুকে ভয় না করে। তোমাদের কেউ যেন যা জানে না তা শিখতে এবং না জানা বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে 'জানি না' বলতে সংকোচ বোধ না করে।
৭. الفقر يخرস الفطن عن حجته ، والمقل غريب في يدته দারিদ্র্য বিচক্ষণ ব্যক্তিকেও যুক্তিক্ষেত্রে নির্বাক করে দেয়। অভাবী নিজ দেশেই যেন প্রবাসী!
৮. العجزافة، والصبر شجاعة والزهد ثروه، والورع جنة অক্ষমতা একটি বিপদ, ধৈর্যের অর্থ সাহসিকতা, ভোগ-বিলাসিতার নির্মোহ অমূল্য সম্পদ এবং ধর্মানুরাগ জান্নাত লাভের মাধ্যম।
৯. الاداب حلل مجددة والفكر راه صافية সুন্দর আদব হলো নতুন পোশাক এবং চিন্তা হলো স্বচ্ছ আয়না।
১০. اذا قبلت الدنيا على الله اعارته محاسন غيره ، واذا ادبرت عنه سلبته محاسن نفسه দুনিয়া যখন কারো প্রতি প্রসন্ন হয় তখন অন্যের গুণাবলীও তাকে ধার দেয়, কিন্তু যখন অপ্রসন্ন হয় তখন তার নিজস্ব গুণাবলীও ছিনিয়ে নেয়।
১১. ما اضمر احد شيئا الا ظهر في فلتات لسانه وصفحات وجه অন্তরে যে যা-ই গোপন করে তা তার জিহ্বার ফাঁকে বের হয়ে পড়ে এবং মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তিতে ধরা পড়ে।
১২. لا تكن عبد غيرك ، وقد جعلك الله حرا আল্লাহ যখন তোমাকে স্বাধীন বানিয়েছেন তখন তুমি অন্যের গোলাম হয়ো না।
১৩. اياك والاتكال على المنى فانها بضائع النوكى অলীক আকাঙ্ক্ষার ওপর ভরসা করে বসে থেকো না। কেননা এটা হলো মূর্খ মানুষের পুঁজি।
১৪. الا انبئكم بالعالم كل العلم من لم يزين لعباد الله معاص الله ولم يؤمنهم، ولم يؤيس من روحه তোমাদের কে কি আদর্শ আলিমের পরিচয় বলবো না? যিনি আল্লাহ্র বান্দাদের সামনে আল্লাহর নাফরমানিকে মনোহররূপে তুলে ধরেন না এবং তাঁর 'পাকড়াও' সম্পর্কে তাদেরকে নিরুদ্বিগ্ন করে দেন না, এবং তাঁর রহমত সম্পর্কে হতাশ করে দেন না।
১৫. الناس نيام ، اذا ماتوا انتبهوا মানুষ সব বুঝে বেঘোর, মৃত্যু আসা মাত্র তারা জেগে উঠবে।
১৬. الناس اعداء ما جهলوا মানুষ যা জানে না তার প্রতি বিরূপ হয়ে থাকে।
১৭. الناس بزমানهم اشبه منهم بابائهم যুগের (স্বভাব প্রকৃতির) সঙ্গে মানুষের সাদৃশ্য পিতৃ সাদৃশ্যের চেয়ে অধিক।
১৮. المرأ مخبوء تحت لسانه মানুষ তার জিহ্বার নীচে লুক্কায়িত থাকে।
১৯. ما هلك امرؤ عرف قدره যে মানুষ আপন মর্যাদার সীমা বোঝে তার কোন ধ্বংস নেই।
২০. رب كلمة سلبت نعمة কখনো কখনো একটি মাত্র শব্দ বিরাট বঞ্চনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।