📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কুরআন ও সুন্নাহর বিশেষজ্ঞ

📄 কুরআন ও সুন্নাহর বিশেষজ্ঞ


আবূ তোফায়ল-এর সূত্রে আবু উমর হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হযরত আলী (রা) ভাষণ দানকালে আমি উপস্থিত ছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আমাকে কিতাবুল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে পারো। কেননা আল্লাহর শপথ! যে কোন আয়াত সম্পর্কে আমিই অধিক অবগত যে, তা রাতে নাযিল হয়েছে নাকি দিনে, উপত্যকায় নাযিল হয়েছে নাকি পাহাড়ে। [ইযালাতুল খাফা, পৃষ্ঠা-২৬৮।]

শুরায়হ ইব্‌ন হানি (র) বলেন, আমি আয়েশা (রা)-কে মোজার ওপর মাসেহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আলীকে জিজ্ঞেস করো। কেননা তিনি এ সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত। তিনি তো রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর সঙ্গে সফর করতেন। শুরায়হ বলেন, অতঃপর আমি আলী (রা)-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন, মুসাফিরের জন্য (মাসেহ এর মেয়াদ হলো) তিন দিন তিন রাত আর মুকীমের জন্য এক দিন এক রাত। [মুসনাদে আহমাদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৯৬]

রাসূলুল্লাহ হতে তাঁর সূত্রে পাঁচশ ছিয়াশিটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। [তারীখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা-১৬৭]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কোমলপ্রাণ মানুষটি

📄 কোমলপ্রাণ মানুষটি


অসাধারণ শোর্যবীর্য, বিরল যুদ্ধ প্রতিভা ও ভাবগাম্ভীর্য সত্ত্বেও হযরত আলী (রা) ছিলেন অতি কোমলপ্রাণ মানুষ। কোমল মানবিক অনুভূতি তথা দয়া, মায়া ও সংবেদনশীলতার উজ্জ্বলতম প্রকাশ ঘটে ছিলো তাঁর ব্যক্তিচরিত্রে, আপন হত্যাকারীর সাথে তিনি যে মহৎ আচরণ করেছিলেন সেটাই এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ হতে পারে। কেননা বর্ণিত আছে, ইবন মুলজিম যখন তাঁকে বিষমাখা তরবারি দ্বারা আঘাত করেছিলেন তখন তিনি পুত্র হাসানকে এ অসিয়ত করেছিলেন,

“দেখ হে হাসান, যদি আমি তার এই আঘাতে মৃত্যুবরণ করি তাহলে তাকেও তুমি একটি আঘাতের পরিবর্তে একটি আঘাতই শুধু করবে। তবে তার লাশ বিকৃত করো না। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ্র বলতে শুনেছি,
اياكم والمثالة ولو بالكلব العقدر .
'মুসলাহ করার ব্যাপারে সাবধান থেকো যদিও তা পাগলা কুকুর হয়।'

ঘাতককে যখন তার সামনে পেশ করা হলো তখন তিনি বললেন, তাকে আটক করে রাখো, তবে আরামদায়কভাবে তাকে বাঁধবে। যদি আমি বেঁচে থাকি তাহলে কিসাস গ্রহণ কিংবা ক্ষমা প্রদর্শন সম্পর্কে আমি চিন্তা-ভাবনা করে দেখবো। আর যদি মৃত্যুবরণ করি তাহলে প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ।"

হযরত তালহা (রা)-এর মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রবলভাবে কেঁদেছিলেন এবং তাঁর মুখমণ্ডল হতে ধুলোবালি মুছে দিতে দিতে বলেছিলেন,

"হে আবু মুহাম্মদ! খোলা আসমানের নীচে এভাবে ধূলিলুষ্ঠিত অবস্থায় তোমাকে পড়ে থাকতে দেখা আমার জন্য বড়ই বেদনাদায়ক। অতঃপর তিনি আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন যে, আল্লাহ্ যদি তাঁকে আজ থেকে বিশ বছর আগেই দুনিয়া থেকে তুলে নিতেন তাহলে উত্তম হতো!" [আল আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যা, পৃষ্ঠা-৯৫৯]

ছোটদের প্রতি স্নেহমায়া ও বড়দের প্রতি ভালোবাসা ও দয়া ছিলো তাঁর সুপরিচিত গুণ বৈশিষ্ট্য। ছোটদেরকে নিজে আদর-সোহাগ করতে কিংবা অন্য কাউকে আদর সোহাগ করছে দেখতে তিনি অত্যধিক আনন্দবোধ করতেন। তিনি বলতেন, সন্তানের ওপর পিতার হক রয়েছে; আবার পিতার ওপরও সন্তানের হক রয়েছে। সন্তানের উপর পিতার হক হলো আল্লাহর নাফরমানি ছাড়া সকল বিষয়ে তার আনুগত্য করা। পক্ষান্তরে পিতার ওপর সন্তানের হক হলো সুন্দর দেখে তার নাম রাখা এবং তাকে উত্তম আদব শিক্ষা দান করা এবং কুরআন শিক্ষা দান করা। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৯৮২]

আবু কাসেম বাগাবী নিজস্ব সনদে তার দাদীর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আলী (রা)-কে দেখেছি এক দিরহামের খেজুর খরিদ করে নিজেই চাদরে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি আরয করলেন, হে আমীরুল মু'মিনীন, আপনার হয়ে আমরা বয়ে নিয়ে যাই। তিনি বললেন, সন্তান-সন্ততি জন্য পিতারই দায়িত্ব বহন করে নিয়ে যাওয়া। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫]

এক ব্যক্তি তার খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললো, হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার কাছে আমার কিছু প্রয়োজন ও প্রার্থনা আছে। তিনি বললেন, তোমার প্রার্থনা ও প্রয়োজনের কথা মাটিতে লিখে দাও। কেননা তোমার চেহারায় আমি প্রার্থনার দীনতা দেখতে চাই না। তখন সে লিখে দিলো আর তিনি তার প্রয়োজন পুরো করে দিলেন এবং বিপুল পরিমাণ অতিরিক্তও দান করলেন। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৯]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 নবী চরিত্র এবং নবুওয়তি বৈশিষ্ট্যের সর্বাঙ্গীণ ও সূক্ষ্ম জ্ঞান

📄 নবী চরিত্র এবং নবুওয়তি বৈশিষ্ট্যের সর্বাঙ্গীণ ও সূক্ষ্ম জ্ঞান


নবী ﷺ -এর সাথে বংশীয় ও পারিবারিক সম্পর্ক ও দীর্ঘ দিনের নিবিড় সান্নিধ্য, নবী ﷺ -কে আল্লাহ্ শানে নবুয়তের উপযুক্ত যে মন-মানস, মহত্তম চরিত্র, চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণা বিশেষভাবে দান করেছিলেন, সেগুলো সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধিৎসা ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এই সকল বিষয় নবী চরিত্রের ও নবুয়তি বৈশিষ্ট্যের সর্বাঙ্গীণ ও সূক্ষ্ম জ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে নবী জীবন ও নবী চরিত্রের বিভিন্ন সূক্ষ্ম দিকের সঠিক মূল্যায়ন ও বিবরণ উপস্থাপনের যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে হযরত আলী (রা)-এর জন্য বিশেষ সহায়ক হয়েছিলো। নবী ﷺ -এর গুণ, চরিত্র, আচার-আচরণ ও অবয়ব সম্পর্কে হযরত আলী (রা) হতে যে রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে তাতে তা অতি পরিষ্কারভাবে বিধৃত হয়েছে। নমুনাস্বরূপ তাঁর নিম্নোক্ত বক্তব্য পেশ করাই যথেষ্ট মনে করি:

"হৃদয়ের ব্যাপ্তিতে সবার চেয়ে দানশীল, মুখের উচ্চারণে সবার চেয়ে সত্যভাষী, স্বভাবের গণ্ডীতে সবার চেয়ে স্নিগ্ধ কোমল। সমাজে সবার চেয়ে সম্মানী। হঠাৎ যে দেখে সে ভয় পেয়ে যায় কিন্তু যে ঘনিষ্ঠ হয়ে মেশে সে ভালোবেসে ফেলে। তাঁর বিবরণ দানকারী বলেন, তাঁর আগে ও পরে তাঁর তুলনা দেখিনি।"

অপরাধীদের প্রতি তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহ এবং সহনশীলতা ও মহানুভবতার প্রতি স্বভাব অনুরাগ সম্পর্কে হযরত আলী (রা)-এর সূক্ষ্ম জ্ঞান নিম্নোক্ত ঘটনা থেকেও সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়:

আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর চাচাত ভাই। সে তাঁকে অনেক কষ্ট দিয়েছিলো এবং নিন্দা করেছিলো। মক্কাভিমুখী পথে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেলো। পেছনের নিন্দা ও নিগ্রহের কথা মনে পড়ায় তিনি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আবূ সুফিয়ান তখন আলী (রা)-এর নিকট এ বিষয়ে অনুযোগ করলেন। আলী (রা) তাঁকে বললেন, সম্মুখ দিক হতে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর খিদমতে উপস্থিত হও এবং ইউসুফ ভ্রাতৃগণ ইউসুফ (আ)-কে যা বলেছিলেন তাই তুমি তাঁকে বলো,
تَاللهِ لَقَدْ أَثَرَكَ اللهُ عَلَيْنَا وَإِنْ كُنَّا لَخَاطِينَ .
"আল্লাহর শপথ! আল্লাহ্ আপনাকে আমাদের ওপর অগ্রাধিকার দান করেছেন। আর নিঃসন্দেহে আমরা ভুলের ওপর ছিলাম।"

কেননা তিনি কিছুতেই পছন্দ করবেন না, কেউ তার চেয়ে উত্তম কথা বলে যাবে। আবু সুফিয়ান খিদমতে রিসালতে উপস্থিত হয়ে তাই বললেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তাঁকে বললেন,
لَا تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ .
"তোমাদের প্রতি আজ কোন তিরস্কার নেই, আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করবেন। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।"

এরপর আবূ সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ অতি উত্তম হয়েছিলো। ইসলাম গ্রহণের পর হতে লজ্জায় তিনি রাসূলুল্লাহ্-এর দিকে মাথা তুলে তাকাতেন না। [যাদুল মা'আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪২১]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 অগ্র-কীর্তিসমূহ

📄 অগ্র-কীর্তিসমূহ


আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী ইবন আবূ তালিব (রা)-এর বেশ কিছু অমর কীর্তি রয়েছে। যেখানে তিনি অনন্য কৃতিত্বের দাবিদার। কোন কোন শাস্ত্রের ক্ষেত্রে, বিশেষত আরবী ভাষা ও তার ব্যাকরণের ক্ষেত্রে এমন অনন্য অবদান রেখে গেছেন যা কোন দিন বিস্মৃত হবার নয়। আবুল আসওয়াদ দু'আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত আলী (রা)-এর খিদমতে হাযির হলাম এবং তাঁকে চিন্তামগ্ন অবস্থায় দেখতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আমীরুল মু'মিনীন, কি চিন্তা করছেন? তিনি বললেন, আমি তোমাদের এ শহরে আরবী ভাষার ব্যাকরণগত ত্রুটি শুনতে পেলাম। তাই আরবী ভাষার মৌলিক নিয়মাবলী সম্পর্কে একটি 'পত্র' রচনা করতে মনস্থ করেছি। আমি বললাম, যদি আপনি তা করেন তাহলে যেন আপনি আমাদের নব জীবন দান করলেন! ফলে আরবী ভাষাও আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। তিনদিন পর আমি পুনরায় তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলাম, তখন তিনি আরবী ব্যাকরণশাস্ত্রের মৌলিক নিয়মাবলীসম্বলিত একটি 'পত্র' আমার হাতে অর্পণ করলেন। [তারীখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা-১৮১]

গবেষক আল আক্কাদ বলেন, আরবী ভাষা সম্পর্কে একথা বলাই যথার্থ যে, উক্ত শাস্ত্রের প্রবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে অধিক অবদান আর কারো ছিলো না। বহু সূত্রে একথা বর্ণিত হয়েছে যে, আবুল আসওয়াদ দুয়ালী একবার তাঁর নিকট আরবী ভাষার ব্যাপক ব্যাকরণ বিচ্যুতির অভিযোগ করলেন। তিনি বললেন, আমি তোমাকে যা বলি তা লিখে নাও। অতঃপর ব্যাকরণের কতিপয় মূল নিয়ম লিখিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি আবুল আসওয়াদকে বললেন,
أنحم هذا النحو يا ابا الاسود .
"হে আসওয়াদ! এই নির্দেশিত পন্থা অনুসরণ করো।"
সেই থেকে আরবী ব্যাকরণশাস্ত্রের নাম হয়ে গেলো "নাহ্" (النحو)।

তাছাড়া এ প্রসঙ্গ পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, হযরত আলী (রা)-ই রাসূলুল্লাহ্-এর হিজরত থেকে ইসলামী বর্ষ গণনার পরামর্শ ও প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, যা হযরত উমর (রা)-সহ অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম পছন্দ করেছিলেন। হযরত উমর (রা) হিজরতের দিন থেকে তারিখ ও বর্ষ গণনার আদেশ জারি করেছিলেন। ফলে ইসলামী বর্ষপঞ্জি অস্তিত্ব লাভ করেছিলো যা আল্লাহ্ চাহে তো পৃথিবীতে যতদিন মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব থাকবে ততদিন সগৌরবে বিদ্যমান থাকবে। বলা বাহুল্য, এই হিজরী বর্ষপঞ্জীর মাঝে ইসলামী, ইনসানী ও দাওয়াতী বহু কল্যাণ ও হিকমত নিহিত ছিলো এবং লেখক, গবেষক ও চিন্তাবিদগণ যুগে যুগে তাতে চিন্তার নতুন নতুন খোরাক ও দিগন্তপ্রসারী আলোর নতুন নতুন ইঙ্গিত পেয়ে এসেছেন। সর্বোপরি মানবতার জন্য তাতে রয়েছে কল্যাণময় ভবিষ্যতের শুভ ইঙ্গিত। কেননা হিজরত ছিলো মানুষের জীবন ও সভ্যতার ইতিহাসে নূর ও হিদায়াতের এবং কল্যাণ ও মুক্তির এক নতুন যুগের শুভ উদ্বোধন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px