📄 হাদীস ও আছার-এর আলোকে হযরত আলী (রা)
এখানে আমরা আলী (রা) সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস ও আছার-এর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের কতিপয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে চাই।
📄 জাহিলিয়াত ও প্রতিমা পূজার চিহ্ন মুছে ফেলা
হযরত আলী (রা) হতে আবু মুহাম্মদ আল-হুযালী-এর সূত্রে বর্ণিত। হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এক জানাযায় ছিলেন। সে সময় তিনি বললেন, তোমাদের মাঝে এমন কে আছে যে মদীনায় গিয়ে সব মূর্তি ভেঙ্গে ফেলবে এবং সব কবর মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে এবং সব ছবি নষ্ট করে ফেলবে?
আলী (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যাবো। তিনি বললেন, যাও, আলী (রা) গেলেন এবং ফিরে এসে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! মদীনায় কোন মূর্তি আমি না ভেঙ্গে রাখিনি এবং কোন কবর সমান না করে ছাড়িনি এবং কোন ছবি নষ্ট না করে ছাড়িনি।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, যে ব্যক্তি পুনরায় এ ধরনের কিছু করবে সে যেন মুহাম্মদ ﷺ -এর ওপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করলো। [মুসনাদে আহমাদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৭]
হযরত জারীর ইব্ন হিব্বান তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী (রা) তাঁকে বললেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ যে কাজে আমাকে পাঠিয়েছিলেন তোমাকে আমি সে কাজেই পাঠাচ্ছি। তিনি আমাকে সকল কবর সমান করে গুঁড়িয়ে দেয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৮৯]
আবুল হায়াজ আল-আসাদী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী (রা) আমাকে বললেন, আমি তোমাকে এমন এক কাজে পাঠাচ্ছি যে কাজে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আমাকে পাঠিয়েছিলেন। কোন মূর্তি তুমি আস্ত রাখবে না এবং কোন উঁচু কবর সমান না করে ছাড়বে না।
📄 বিজ্ঞতম ফকীহ ও বিচারক
একাধিক সূত্রে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ হতে প্রামাণ্যরূপে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমাদের বিজ্ঞতম বিচারক (اقضاكم على) হলেন আলী।
হযরত আলী (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আমাকে ইয়ামানে পাঠালেন। আমি তখন অল্প বয়স্ক যুবক। আমি বললাম, আপনি আমাকে এমন এক কাওমের নিকট পাঠাচ্ছেন, যাদের মাঝে বিভিন্ন ঘটনা সংঘটিত হবে, অথচ বিচার সম্পর্কে আমার কোন জ্ঞান নেই। তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমার জিহ্বাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন এবং তোমার হৃদয় (সত্যের ওপর) স্থির রাখবেন। হযরত আলী (রা) বলেন, এরপর কোন দুই বাদী-বিবাদীর মাঝে বিচার করতে গিয়ে কখনো আমি সংশয়গ্রস্ত হইনি। [মুসনাদে আহমাদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৩]
হযরত উমর (রা) এমন কোন জটিল সমস্যা সম্পর্কে আল্লাহর পানাহ চাইতেন যার সমাধানের জন্য আবুল হাসান [আলী (রা)] উপস্থিত নেই। হযরত উমর (রা) হতে নিম্নোক্ত মন্তব্যও বর্ণিত হয়েছে, لو لا على لهلك عمر "আলী না হলে উমর ধ্বংস হয়ে যেতো।" [ইযালাতুল খাফা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৮]
তাছাড়া হযরত উমর (রা) যখনই কোন জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখন আফসোস করে বলতেন, قضية ولا ابا حسن لها "এ এমন সমস্যা যার সমাধানের জন্য কোন আবুল হাসান নেই।" [আল আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৯৬৮]
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)-এর সূত্রে আবূ আমর বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আমরা এমন আলোচনা করতাম যে, মদীনাবাসীদের মাঝে আলী বিন আবূ তালিব (রা) হলেন বিজ্ঞতম বিচারক।
হযরত আলী (রা)-এর অতি সূক্ষ্ম ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বিচারের একটি নমুনা হলো মুসনাদে আহমদে নিজস্ব সনদে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীস:
হযরত আলী (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আমাকে ইয়ামান পাঠালেন। আমি এক কাওমের নিকট উপনীত হলাম যারা সিংহ শিকারের জন্য একটি গর্ত তৈরি করেছিলো। গর্তের তীরে লোকেরা যখন ঠেলাঠেলি করছিলো তখন একজন লোক হঠাৎ পড়ে গেলো কিন্তু সে একজন লোককে ধরে ঝুলে গেলো। অতঃপর আরেকজন অন্য একজনকে ধরে ঝুলে পড়লো। এভাবে গর্তে চারজন হলো। আর গর্তে আটকা পড়া সিংহ তাদেরকে জখম করে ফেললো। তখন একজন বর্শাঘাতে তাকে হত্যা করে ফেললো। কিন্তু জখমের কারণে চার জনের সকলেই মারা গেলো। তখন প্রথম জনের অভিভাবকরা অপরজনের অভিভাবকদের মুকাবিলায় গিয়ে দাঁড়ালো এবং উভয় পক্ষ অস্ত্র হাতে লড়াইয়ের জন্য তৈরি হয়ে গেলো। আলী (রা) তাদের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এখনো জীবিত আছেন, আর তোমরা নিজেদের মাঝে লড়াই করতে চাচ্ছো! আমি তোমাদের মাঝে বিচার করে দিচ্ছি। যদি তোমরা সন্তুষ্ট হও তাহলে তো সেটাই হলো বিচার। আর যদি সন্তুষ্ট না হও তাহলে তোমরা নবী ﷺ -এর নিকট উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তোমাদের পরস্পরকে পরস্পর হতে দূরে রাখা হবে। এরপর যে সীমালংঘন করবে তার কোন অধিকার থাকবে না। যে সকল গোত্র গর্ত খুঁড়েছে তাদের নিকট হতে দিয়তের চতুর্থাংশ, দিয়তের তৃতীয়াংশ, দিয়তের অর্ধেক এবং পূর্ণ দিয়ত সংগ্রহ করো। প্রথম ব্যক্তি দিয়তের চতুর্থাংশ পাবে। কেননা সে তার ওপর থেকে নিহত হয়েছে এবং দ্বিতীয় জন দিয়তের তৃতীয়াংশ ও তৃতীয়জন অর্ধেক দিয়ত পাবে।
কিন্তু তারা এ ফায়সালা মানতে অস্বীকার করে নবী ﷺ -এর নিকট উপস্থিত হলো। তিনি তখন মাকামে ইবরাহীমে অবস্থান করছিলেন। তারা তাঁর খিদমতে ঘটনা আরয করলো। তিনি বললেন, আমি তোমাদের মাঝে ফায়সালা করবো। অতঃপর তিনি দু'হাতে হাঁটু জড়িয়ে বসলেন। তখন দলের একজন বললো, আলী আমাদের মাঝে ফায়সালা করেছেন। তখন তারা পুরা ঘটনা তাঁর খিদমতে আরয করলো আর রাসূলুল্লাহ্ ﷺ উক্ত ফায়সালা বহাল রাখলেন। হযরত হানাশ (র) হতে বর্ণিত। আলী (রা) বলেছেন, চতুর্থজন পুরো দিয়ত পাবে। [মুসনাদে আহমাদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৭]
📄 কুরআন ও সুন্নাহর বিশেষজ্ঞ
আবূ তোফায়ল-এর সূত্রে আবু উমর হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হযরত আলী (রা) ভাষণ দানকালে আমি উপস্থিত ছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আমাকে কিতাবুল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে পারো। কেননা আল্লাহর শপথ! যে কোন আয়াত সম্পর্কে আমিই অধিক অবগত যে, তা রাতে নাযিল হয়েছে নাকি দিনে, উপত্যকায় নাযিল হয়েছে নাকি পাহাড়ে। [ইযালাতুল খাফা, পৃষ্ঠা-২৬৮।]
শুরায়হ ইব্ন হানি (র) বলেন, আমি আয়েশা (রা)-কে মোজার ওপর মাসেহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আলীকে জিজ্ঞেস করো। কেননা তিনি এ সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত। তিনি তো রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর সঙ্গে সফর করতেন। শুরায়হ বলেন, অতঃপর আমি আলী (রা)-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন, মুসাফিরের জন্য (মাসেহ এর মেয়াদ হলো) তিন দিন তিন রাত আর মুকীমের জন্য এক দিন এক রাত। [মুসনাদে আহমাদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৯৬]
রাসূলুল্লাহ হতে তাঁর সূত্রে পাঁচশ ছিয়াশিটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। [তারীখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা-১৬৭]