📄 ইরাক ও সিরিয়ার গুণগত পার্থক্য
হযরত আলী (রা) দু'টি অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং সে আগুনের তাপে তিনি ঝলসে গিয়েছিলেন। প্রথম অগ্নিপরীক্ষা এই যে, সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন, অথচ তাঁর সমর্থক ও অনুগামীদের মাঝে সেই আনুগত্য ও কর্মোদ্যমের ছিটেফোঁটাও ছিলো না যা সিরীয়দের মাঝে ছিলো। বিপুল পরিমাণে অবশ্য দু'টি অঞ্চলের স্বভাবপ্রকৃতি ও দু'টি শিবিরের সমর প্রস্তুতির পার্থক্যই ছিলো এর কারণ।
উভয় অঞ্চলের অতীত ইতিহাসই তাদের স্বভাব-প্রকৃতিে সুগভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো। কেননা ইসলামী শাসনের পূর্বে সিরিয়া ছিলো বাইজান্টাইন শাসনের পূর্ণ কর্তৃত্বাধীন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সর্বক্ষেত্রে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিদ্যমান ছিলো এবং সিরিয়ার সাথে বনূ উমাইয়ার সম্পর্ক ছিলো প্রাচীন। যখন নেতৃত্ব নিয়ে উমাইয়া ও হাশিমের মাঝে প্রবল প্রতিযোগিতা হয়েছিলো তখন উমাইয়া মক্কা ত্যাগ করে দশ বছর সিরিয়ায় বসবাস করেছিলেন। আর বিচারকগণ হাশিমের অনুকূলে ও উমাইয়ার প্রতিকূলে রায় প্রদান করেছিলেন। বনূ উমাইয়ার দায়িত্ব ছিলো মক্কা ও সিরিয়ার পথে চলাচলকারী বাণিজ্য কাফেলার নিরাপত্তা বিধান। আর এটা ছিলো একটা স্থায়ী দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ড যা কাফেলার যাত্রা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যেতো না বরং প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও তার সহকর্মীদের মাঝে এবং পথের বিভিন্ন মঞ্জিলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে একটি স্থায়ী সম্পর্ক, যোগাযোগ ও সখ্য বিদ্যমান থাকতো। হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর পিতা আবু সুফিয়ান ছিলেন তাঁর যুগে কাফেলার নিরাপত্তা প্রধান। এ কারণেই রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন পত্র প্রাপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন, তখন আবু সুফিয়ানকে সহজেই সেখানে পাওয়া গিয়েছিলো।
তদুপরি সিরিয়া ইয়াযীদ ইব্ন আবু সুফিয়ানের শাসনাধীন ছিলো এবং হযরত মু'আবিয়া (রা) একচ্ছত্রভাবে সুদীর্ঘ বিশ বছর পর্যন্ত সিরিয়া শাসন করেছেন। সেখানে তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ার মতো কিংবা তাঁর অবাধ্যতা করার মতো কেউ ছিলো না, বলতে গেলে এককভাবে সমগ্র সিরিয়া অঞ্চল এক স্বাধীন শাসকের শাসিত স্বাধীন রাজ্যের রূপ প্রকৃতি ধারণ করতে বসেছিলো।
এদিকে সমসাময়িকদের মাঝে হযরত মু'আবিয়া (রা) ছিলেন কর্ম-কুশলতা, ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ, প্রজা তোষণ, শাসনে সোহাগে মানুষের সন্তুষ্টি সাধন, বাস্তব জ্ঞান, বাস্তববাদিতা ইত্যাদি বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
পক্ষান্তরে ইরাক ছিলো কয়েক শতাব্দী ধরে ইরানী কায়হানী ও সাসানী সম্রাটদের শাসনাধীন। ইরানের রাজসিংহাসনে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন শাসকের পালা বদল ঘটেছিলো। নওশেরাঁওয়ার (৫৩১-৫৭৯) মৃত্যুর পর তার পৌত্র পারভেজ (মৃত্যু ৬২৮) সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাকেই পরাজিত করেছিলেন এবং ৬২৮ সালে শেরওয়ে-এর হাতে সিংহাসনচ্যুত ও নিহত হয়েছিলেন। ৬২৮ সাল থেকে ৬৩২ সালে সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদাজারদ-এর ক্ষমতারোহণ পর্যন্ত সময়কালে ইরান ছিলো সীমাহীন বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের শিকার। পারভেজের পুত্র কুবাম 'শেরওয়ে' উপাধি ধারণ করে পিতার সিংহাসন দখল করেছিলেন এবং ৬২৮ সালে তারই ইঙ্গিতে অতি অপদস্থতার সাথে নিহত হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর পারস্য সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়েছিলো। তখন সিংহাসন ছিলো রাজপরিবারের উচ্চাভিলাষী রাজপুরুষদের খেলনা বিশেষ। শেরওয়ে ছয় মাসের মতো বেঁচেছিলেন মাত্র। এরপর চার বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে দশজন সম্রাট সিংহাসনে ওঠানামা করেছেন। রাষ্ট্রের শাসন-শৃঙ্খলা তখন একেবারেই শিথিল হয়ে পড়েছিলো। অতঃপর পারস্যবাসিগণ সম্মিলিতভাবে ইয়াজদাজারদকে রাজসিংহাসনে বসিয়েছিলো। তিনিই ছিলেন শেষ সাসানী সম্রাট। তৎকালীন সাসানী সাম্রাজ্যের শাসনদুর্বলতা ও অস্থিতিশীলতার অবস্থা এই ছিলো যে, পারভেজ কন্যা 'বউরান' সম্রাট শাহরিয়ারের পর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন, অথচ সে যুগের শাসক পরিবারগুলোতে কোন নারীর শাসন ক্ষমতা গ্রহণের দৃষ্টান্ত বিদ্যমান ছিলো না। তাঁর শাসনকাল ছিলো এক বছর চার মাস।
তদ্রূপ উভয় অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যের আরেকটি কারণ ছিলো একদিকে সিরিয়া বিজয় অর্জনকারী ও সিরিয়ায় বসতি স্থাপনকারী আরব গোত্রসমূহ এবং অন্যদিকে ইরান ও ইরাক বিজয় অর্জনকারী আরব গোত্রগুলোর স্বভাবগত পার্থক্য। প্রথমোক্ত গোত্রগুলোর অধিকাংশ ই ছিলো জাযীরাতুল আরবের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল থেকে আগত। স্বভাবগতভাবেই তারা নিয়ম-শৃঙ্খলা ও শাসন ব্যবস্থার প্রতি অনুগত, শ্রদ্ধাশীল ছিলো। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় গোত্রগুলো এসেছিলো জাযীরাতুল আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে। সেখানকার প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিলো বিক্ষোভ, গোলযোগ, অস্থিরতা, অসন্তোষ ও চিন্তাগত নৈরাজ্য, যার ফলশ্রুতি ছিলো ইরতিদাদ ও ধর্মত্যাগের সর্বব্যাপী ফিতনা এবং যাকাত অস্বীকারের ভয়াবহ আন্দোলন। তবে এসবের পাশাপাশি তাদের শৌর্যবীর্য, যুদ্ধ নৈপুণ্য ও অন্যান্য গুণও ছিলো অনস্বীকার্য।
ড. আহমদ আমীন বলেন, প্রাচীনকাল থেকেই ইরাক ছিলো বিভিন্ন ধর্মের এবং উদ্ভট সকল চিন্তাধারার উৎসভূমি। মানী, মাসদাফ ও ইন্ন দীসানের চিন্তা ও দর্শন সেখানে বিস্তার লাভ করেছিলো। তাদের মাঝে ইহুদী ও খ্রীস্টান সম্প্রদায়েরও অধিকাংশ ছিলো যারা মানব সত্তায় ঈশ্বরের আত্মপ্রকাশ ধরনের চিন্তাবিশ্বাসের সাথে পরিচিত ছিলো। [ফজরুল ইসলাম, পৃষ্ঠা-৩৩২]
এছাড়া আরবরা ইরাকে ইয়ামানী ও নাযারী সাম্প্রদায়িকতার বীজ নিয়ে এসেছিলো এবং রাবীয়া গোত্রের বাসভূমি হিসেবে ফোরাত অঞ্চল খ্রীস্টান সম্প্রদায় কিংবা খারিজী সম্প্রদায়ের তৎপরতা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো। আর আসমাঈর মন্তব্য মতে রাবীয়া গোত্র ছিলো সকল ফিতনার মূল। [তারীখুল আদাব আল আরাবী, পৃষ্ঠা-১০২]
হযরত আলী (রা) ও হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর উভয় শিবিরের মাঝে যে প্রকৃতিগত পার্থক্য বিদ্যমান ছিলো, তা অতি সূক্ষ্মভাবে ও প্রজ্ঞার সাথে গবেষক আল আক্কাদ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, সত্যি আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, মুসলিম বাহিনী তখন স্থিরতা ও স্থিতিশীলতা এবং অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা এ দু'টি পরস্পর বিপরীতমুখী ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলো। একটি অংশে সমাজ ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য ও সন্তুষ্টি এবং তার স্থিতি ও সংহতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার যাবতীয় উপাদান ও কার্যকারণ বিদ্যমান ছিলো, পক্ষান্তরে অপরাংশে সমাজ ব্যবস্থার প্রতি বিক্ষোভ ও অসন্তোষ এবং তার ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন মানসিকতার যাবতীয় উপাদান ও কার্যকারণ ক্রিয়াশীল ছিলো।
তিনি আরো বলেন, সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অনুগত ও সন্তুষ্ট অংশটি এসেছিলো মু'আবিয়া (রা)-এর ভাগে সিরিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল। পক্ষান্তরে সমাজ ব্যবস্থার প্রতি বিদ্রোহী অংশটি এসেছিলো হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-এর ভাগে সমগ্র জাযীরাতুল আরব অঞ্চলে। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়াত, পৃষ্ঠা-৮৬৯]
আলী (রা) সিরিয়া অভিযানে স্থিরপ্রতিজ্ঞ হলেন, কিন্তু খারিজীরা তাঁর আহ্হ্বান প্রত্যাখ্যান করলো। তিনি বিশাল বাহিনী নিয়ে কুফা থেকে যাত্রা করে নাখীলাহ অঞ্চলে উপনীত হলেন। সেখানে আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) এক জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমে তাদেরকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করলেন এবং আসন্ন সিরিয়া অভিযানে শত্রুর মুকাবিলায় অবিচল ধৈর্য ধারণের উপদেশ দান করলেন। ইতিমধ্যে তাঁর কাছে খবর এসে পৌঁছলো যে, খারিজীরা গোলযোগ, রক্তপাত, লুণ্ঠন ও অনাচারের এক তাণ্ডবলীলা শুরু করে দিয়েছে। তখন আলী (রা) খারিজীদের নিকট তাঁর পক্ষ হতে দূত প্রেরণ করলেন, কিন্তু তারা তাঁকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই হত্যা করে ফেললো। এ খবর পেয়ে হযরত আলী (রা) সিরিয়া অভিযানের পূর্বে খারিজীদের শায়েস্তা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। তিনি তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে তিরস্কার করলেন, উপদেশ দান করলেন এবং কঠিন পরিণতির হুঁশিয়ারি প্রদান করে বললেন, যে পদক্ষেপ তোমরা আমাকে গ্রহণ করতে বাধ্য করেছো এখন তাই নিয়ে আমার বিরোধিতায় নেমেছো অথচ আমি তখন তোমাদের নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু তোমরা মান্য করনি।
কিন্তু খারিজীরা লড়াইয়ের হঠকারিতা থেকে কোন যুক্তিতেই নিবৃত্ত হলো না, বরং যুদ্ধের উদ্দেশেই আলী (রা)-এর দিকে অগ্রসর হলো। আল্লাহ্ ছাড়া কারো হুকুম চলবে না, চলো জান্নাতে চলো ইত্যাদি স্লোগান দ্বারা উন্মাদনা সৃষ্টি করলো। তখন আলী (রা)-এর পক্ষের লোকেরা তরবারি ও বর্শা উচিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাদেরকে মৃত্যুর ঘুম পাড়িয়ে দিলো। ফলে রণাঙ্গনে অশ্বপদতলে তাদের লাশ পিষ্ট হতে লাগলো। এটা ছিলো সাঁইত্রিশ হিজরীর ঘটনা। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৮৮-২৮৯]
📄 সিরিয়া অভিযান ও ইরাকীদের যুদ্ধে অনীহা
নাহরাওয়ান থেকে ফিরে এসে আলী (রা) সমবেত লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দান করলেন। হামদ ও ছানা এবং দরূদ ও সালামের পর বললেন, অতঃপর নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তোমাদেরকে সুসংহত বিজয় দান করেছেন। সুতরাং এই মুহূর্তে তোমরা সিরিয়ায় তোমাদের শত্রুদের উদ্দেশ্যে যাত্রা কর। কিন্তু তারা তাঁর উদ্দেশে দাঁড়িয়ে বললো, হে আমীরুল মু'মিনীন, আমাদের তীর ফুরিয়ে গেছে; তলোয়ার ভোঁতা হয়ে গেছে এবং বর্শার ফলা বাঁকা হয়ে গেছে। সুতরাং পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য আমাদেরকে আমাদের শহরে নিয়ে চলুন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩০৮]
এটাই ছিলো তাদের সব সময়ের আচরণ। ইন্ন জারীর বর্ণনা করেছেন, ইরাকীরা যখন সিরিয়া অভিযানে রওয়ানা হতে অস্বীকার করলো তখন এক ভাষণে আলী (রা) তাদেরকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করলেন এবং কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন। বিভিন্ন সূরা থেকে জিহাদের আয়াত তিলাওয়াত করে তাদেরকে সিরিয়া অভিযানে উদ্বুদ্ধ করলেন। কিন্তু আনুগত্যের পরিবর্তে তারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করলো এবং তাঁর উদাত্ত আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে দেশের পথে ফিরে চললো। এভাবে গোটা বাহিনী এদিক-সেদিক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। তখন আলী (রা) কুফায় ফিরে গেলেন।
উনচল্লিশ হিজরী শুরু হলো, তখন হযরত মু'আবিয়া (রা) বহু সংখ্যক বাহিনী তৈরি করে হযরত আলী (রা)-এর শাসনাধীন বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিলেন। কেননা তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন যে, আলী (রা)-এর ইরাকী বাহিনী অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর আনুগত্য করে না এবং তাঁর আদেশ প্রতিপালন করে না। সুতরাং এই সুযোগে তাঁর বিভিন্ন বাহিনী আইনাত্তাসার, আনবার, তায়মা ও তাদমুর অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করলো। ফলে আলী (রা)-এর সমর্থক ও ইরাকীদের মাঝে দুর্বলতা ও হতাশা দেখা দিলো।
ইরাকীদের দুর্বল অবস্থান তথা তাদের বিভিন্ন ওযর, অজুহাত, উদ্যোগ ও উদ্যমহীনতার মুখে আলী (রা) কেমন অস্থির ও ব্যথিত হৃদয় ছিলেন তার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিলো আম্বারের পতনের সংবাদ শুনে প্রদত্ত তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণটিতে।
যখন খবর এলো যে, মু'আবিয়ার প্রেরিত অশ্ববাহিনী আম্বার দখল করে নিয়েছে এবং আলী (রা)-এর নিযুক্ত প্রশাসক হাসসান বিন হাসসানকে তারা হত্যা করেছে তখন তিনি ক্রোধান্বিত অবস্থায় বের হলেন। তাঁর চাদর তখন মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো। এভাবে তিনি নাখীলা অঞ্চলে এসে পৌঁছলেন। লোকেরাও তার পেছনে পেছনে এসে জমায়েত হলো। তিনি একটি টিলায় আরোহণ করলেন এবং আল্লাহ্র হামদ্, ছানা এবং নবী ﷺ -এর প্রতি দরূদ ও সালামের পর নিম্নোক্ত ভাষণ প্রদান করলেন। বস্তুত আপন নীতি ও অবস্থানের প্রতি বিশ্বাসে অবিচল কিন্তু কাওমের অবাধ্যতায় বিক্ষত হৃদয় শাসকদের যত ভাষণ পৃথিবীর ইতিহাসে সংরক্ষিত হয়েছে, সেগুলোর মাঝে হযরত আলী (রা)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ অধিক সারগর্ভ ও আবেদনপূর্ণ। আলী (রা)-এর সহজাত আরবীয় অলংকারিত্বের যে সমুজ্জ্বল প্রকাশ এতে ঘটেছে বড় বড় অলংকারশাস্ত্রবিশারদ ও অনলবর্ষী বক্তাদের পক্ষেও তাতে উত্তীর্ণ হওয়া খুব কমই সম্ভব হবে।
তিনি বললেন, অতঃপর জিহাদ হলো জান্নাতের অন্যতম দরজা। নিস্পৃহায় যারা তা বর্জন করবে আল্লাহ্ তাদেরকে যিল্লতির লেবাস পরাবেন, কলংকের কালিমা লেপন করবেন এবং হীনতায় অভ্যস্ত করবেন। রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে আমি তোমাদেরকে এ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছি। আমি তোমাদের বলেছি, তারা হামলা করার আগে তোমরা তাদের ওপর হামলা করো, যাঁর হাতে আমার প্রাণ সেই আল্লাহর শপথ! কোন কাওম যদি তার ঘরের ভেতরে হামলার শিকার হয় তাহলে যিল্লতি ছাড়া তার কোন পথ নেই। কিন্তু সংহতির পরিবর্তে তোমরা একে অন্যের মুখ চেয়ে বসেশিলে। আমার কথা তোমাদের অসহনীয় মনে হয়েছে, তাই অবজ্ঞা করেছো। শেষ পর্যন্ত তোমাদের ওপর লাগাতার হামলা শুরু হয়ে গেছে।
এই দেখ 'গামেদী' ভ্রাতার অশ্ববাহিনী আম্বারে এসে গেছে এবং হাসসান ইব্ন হাসসানসহ বহু নারী-পুরুষকে নির্দ্বিধায় তারা হত্যা করেছে। যে আল্লাহ্র হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলি, আমার কাছে এ মর্মে সংবাদ এসেছে যে, কোন কোন হানাদার সেনা মুসলিম নারী ও যিম্মী নারীর ঘরে হানা দিয়েছে এবং তাদের কানের দুল ও পায়ের নূপুর খুলে ফেলেছে। এরপর সবাই নিরাপদে ফিরে গেছে। সামান্য আঁচড়ও লাগেনি কারো গায়ে। এই দুঃখে ও লজ্জায় কোন মুসলিম পুরুষ যদি মরে যায় তাহলে আমার মতে তা দোষের কিছু নয়, বরং খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
হায় আশ্চর্য! বাতিলের পথে তাদের একতা আর হকের পথে তোমাদের ভীরুতা দেখে হতবাক হই। দুঃখের পেয়ালা পূর্ণ হয়ে যায়, অন্তর ফেটে যায় এবং বিবেক স্তব্ধ হয়ে যায়। এখন তো তোমরা লক্ষ্যস্থল হয়ে পড়েছো, তোমাদের বুকে তীর বেঁধে। তোমাদের তীর তাদের বুকে বেঁধে না। তোমাদের ওপর হামলা হয়। তোমরা তাদের ওপর হামলা কর না। তোমাদের সামনে আল্লাহর নাফরমানি হয়, অথচ তোমরা সানন্দ বোধ করছো।
যদি বলি শীতকালে অভিযানে চলো, তখন তোমরা বল, এ তো ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার সময়। আর যদি বলি গ্রীষ্মকালে তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে চলো তখন তোমরা বলো, এ তো আগুন ঝরার সময়, গরম কালটা একটু যেতে দিন। শীত-গরমের ভয়েই যদি পিছপা হও তাহলে আল্লাহর শপথ, তলোয়ারের ভয়ে তো তোমরা ঊর্ধ্বশ্বাসেই পালাবে!
হে পৌরুষহীন পুরুষদল ও হে আকল-বুদ্ধিহীন চুড়িওয়ালীর দল! আল্লাহর শপথ, অবাধ্যতা করে তোমরা আমার বিচার-বুদ্ধি শেষ করে দিয়েছো এবং আমার বুক ক্রোধে পূর্ণ করে দিয়েছো, এমন কি কুরায়শরা বলাবলি শুরু করেছে, আবূ তালিবের পুত্র বাহাদুর বটে, কিন্তু যুদ্ধের বিচক্ষণতা নেই তার। কী আশ্চর্য! আমার চেয়ে যুদ্ধ-পারদর্শী ও রণভিজ্ঞ কে হতে পারে!
আল্লাহর শপথ! বিশ বছরেরও কম বয়সে যুদ্ধের মাঠে নেমেছি আর আজ ষাটের ওপর হলো আমার বয়স। কিন্তু যার প্রতি আনুগত্য নেই তার বিচক্ষণতা নিষ্ফল। তিনি তিনবার একথা বললেন। [আল-কামিল, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩০-৩১]
📄 হযরত আলী (রা)-এর শাহাদাত
আল্লামা ইব্ন কাছীর (র) বলেন, অবস্থা ও পরিস্থিতি হযরত আলী (রা)-এর প্রতিকূলে চলে গেলো এবং তাঁর সেনাবাহিনীও বিশৃঙ্খল হয়ে গেলো এবং ইরাকীরাও তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ শুরু করলো। এদিকে সিরীয়দেরও প্রতাপ বেড়ে গেলো। চতুর্দিকে প্রবল দাপটের সাথে তারা বিচরণ করতে লাগলো।
সে যা-ই হোক, ইরাকীদের আমীর আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) কিন্তু তাঁর যুগে পৃথিবীর সর্বোত্তম মানুষ ছিলেন। শ্রেষ্ঠ আবিদ, শ্রেষ্ঠ সাধক, শ্রেষ্ঠ আলিম ও শ্রেষ্ঠ আল্লাহভীরু ছিলেন। কিন্তু এসব কিছু সত্ত্বেও তারা তাঁকে পরিত্যাগ করলো এবং নিঃসঙ্গ রেখে চলে গেলো, এমন কি তিনি জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করতে লাগলেন। তিনি যথাক্রমে দাড়ি ও মাথার প্রতি ইঙ্গিত করে বলতেন, আল্লাহ্র শপথ! এটাকে এটা দ্বারা রঞ্জিত করা হবে (পরে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছিলো)। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২৪]
ঘটনা এই যে, আবদুর রহমান ইবন আমর ওরফে ইব্ন মুলজিম (প্রথমে হিমায়ারী ও পরবর্তীতে কিন্দী), বারক ইব্ন আবদুল্লাহ্ তামীমী ও আমর ইব্ন বকর তামীমী এই তিন খারিজী একত্রে বসে তাদের নাহরাওয়ানবাসী ভ্রাতাদের (যুদ্ধে) নিহত হওয়ার ঘটনা আলোচনা করলো এবং তাদের প্রতি রহমত কামনা করে বললো, আমরা যদি নিজেদের জীবন বাজি রেখে গোমরাহি ও ভ্রষ্টতার হোতাদের হত্যা করতে পারি তাহলে তাদের পাপ অস্তিত্ব থেকে দেশ মুক্তি পেতে পারে এবং আমাদের নিহত ভাইদের প্রতিশোধ গ্রহণও হতে পারে। তখন ইব্ন মুলজিম বললো, আমি আলী ইব্ন আবূ তালিবের জন্য যথেষ্ট। বারক বললো, আমি মু'আবিয়ার জন্য যথেষ্ট। আমর ইব্ন বকর বললো, আমি আমর ইব্ন আস-এর জন্য যথেষ্ট।
তারা এই মর্মে পরস্পর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো যে, তাদের কেউ তার প্রতিপক্ষকে নিস্তর দেবে না। হয় তাকে কতল করবে কিংবা নিজে কতল হবে। অতঃপর তারা নিজ নিজ তলোয়ার বিষমিশ্রিত করলো এবং এভাবে সময় নির্ধারণ করলো যে, রমযানের সতের তারিখ রাত্রে তাদের প্রত্যেকে তার প্রতিপক্ষ যে শহরে বসবাস করে সেখানে রাত যাপন করবে।
ইন্ন মুসলিম কুফায় গেলো, কিন্তু সে এমন কি তার খারিজী সাথীদের কাছেও আপন উদ্দেশ্য গোপন রাখলো। যখন রমযানের সতের তারিখ জুমুআর রাত হলো তখন সে আলী (রা) যে দরজা দিয়ে বের হন তার মুখোমুখি বসলো। আলী (রা) বের হয়ে 'আস-সালাত' 'আস-সালাত' বলে মানুষকে ঘুম থেকে সালাতের জন্য ওঠাতে লাগলেন। সেই মুহূর্তে ইন্ন মুলজিম তরবারি দ্বারা তাঁর মাথায় আঘাত করলো। ফলে রক্তে তাঁর দাড়ি ভেসে গেলো (আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন)। আঘাত করে সে বলে উঠলো, বিধান প্রদানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। হে আলী, তোমারও নয়, তোমার সাথীদেরও নয়।
হযরত আলী (রা) ডাক দিয়ে বললেন, ধরো তাকে। সঙ্গে সঙ্গে ইন্ন মুলজিমকে পাকড়াও করা হলো, হযরত আলী (রা) জা'দা ইব্ন্ন হোবায়রা ইন্ন আবু ওয়াহবকে আগে বাড়িয়ে দিলেন, তিনি ফজরের নামায পড়ালেন। হযরত আলী (রা)-কে তাঁর ঘরে তুলে আনা হলো। তিনি বললেন, আমার মৃত্যু হলে তাকে হত্যা করো, আর যদি বেঁচে থাকি তাহলে তাকে কি করবো তা আমিই ভালো বুঝবো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২৮]
তাকে যখন হযরত আলী (রা)-এর সামনে পেশ করা হলো তখন তিনি বললেন, তাকে আটক করো। তবে বাঁধনটা আরামদায়ক করো। যদি বেঁচে থাকি তাহলে কিসাস গ্রহণ করবো কিংবা ক্ষমা প্রদর্শন সম্পর্কে আমি চিন্তা-ভাবনা করবো। আর যদি মৃত্যুবরণ করি তাহলে প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ। তবে তার লাশ বিকৃত করো না।
হযরত হাসান-হুসায়ন (রা)-কে তিনি দীর্ঘ অসিয়ত করেছিলেন, অসিয়তের শেষ দিকে তিনি বলেছেন, "হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরগণ! আমীরুল মু'মিনীন নিহত হয়েছেন, একথা বলে মুসলমানদের রক্তে ডুব দিও না। সাবধান, আমার বিনিময়ে আমার হত্যাকারী ছাড়া আর কাউকে যেন হত্যা করা না হয়! দেখো, আমি যদি তার এই আঘাতে মৃত্যুবরণ করি তাহলে তাকেও (অনুরূপ) একটি আঘাত করবে। তবে তার লাশ বিকৃত করো না।" কেননা আমি নবী ﷺ-কে বলতে শুনেছি,
اياكم والمثالة ولو بالكلب العقدر .
"এমন কি পাগলা কুকুরকেও মুসলাহ করার ব্যাপারে সাবধান থেকো।"
হযরত জুন্দুব ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র) জিজ্ঞেস করলেন, হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার মৃত্যু হলে আমরা কি হাসানের হাতে বায়'আত হবো? তিনি বললেন, আমি আদেশও করবো না, নিষেধও করবো না, তোমরাই ভালো বুঝবে। যখন মৃত্যুর হালত শুরু হলো তখন হযরত আলী (রা) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অধিক পরিমাণে উচ্চারণ করতে লাগলেন। এছাড়া অন্য কিছু উচ্চারণ করছিলেন না। কথিত আছে, তাঁর শেষ উচ্চারণ ছিলো এই আয়াত:
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ .
"যে কণা পরিমাণ নেক আমল করবে সে তা দেখতে পাবে আর যে কণা পরিমাণ মন্দ আমল করবে সে তাও দেখতে পাবে।" [সূরা যিলযাল: ৭-৮]
হযরত আলী (রা) আপন পুত্রদ্বয় হাসান ও হুসায়ন (রা)-কে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি অবলম্বনের ও উত্তম আমলসমূহের অসিয়ত করলেন এবং গ্রন্থাকারে সম্পূর্ণ অসিয়তটি লিখিয়ে দিলেন।
ইব্ন মুলজিম বলেছে, আমি তাঁকে এমন আঘাত করেছিলাম যে, শহরের অধিবাসীদেরকে যদি এ আঘাত করা হতো তাহলে তারা সকলে মৃত্যুবরণ করতো। আল্লাহর শপথ! এক মাস যাবৎ আমি এ তরবারিতে বিষ মেখেছি। এক হাজার দিরহামে আমি ঐ তরবারি খরিদ করেছি এবং এক হাজার দিরহাম ব্যয় করে বিষ মিশ্রিত করেছি।
আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা) চল্লিশ হিজরীর ১৭ রামাযান সাহরীর সময় জুমার দিন শাহাদাত বরণ করেছেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩০] বিশুদ্ধ বর্ণনামতে তাঁর বয়স হয়েছিলো তখন তেষট্টি বছর এবং তাঁর খিলাফতের মেয়াদ ছিলো চার বছর নয় মাস। তাঁর পুত্র হযরত হাসান (রা) তাঁর জানাযা পড়িয়েছেন। খারিজীদের পক্ষ হতে তাঁর জানাযার অবমাননার আশংকায় কুফাস্থ আমীরের সরকারি বাসভবনে তাঁকে দাফন করা হয়েছিলো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩০- ৩৩১]
📄 হাদীস ও আছার-এর আলোকে হযরত আলী (রা)
এখানে আমরা আলী (রা) সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস ও আছার-এর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের কতিপয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে চাই।