📄 আলী ও মু'আবিয়া (রা)-এর সংঘাত
৩৬ হিজরী সনের আগমন হলো। ইতিমধ্যে আমীরুল মু'মিনীন আলী ইব্ন আবূ তালিব খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন এবং বিভিন্ন শহরে প্রশাসক নিয়োগ করেছেন। মু'আবিয়া (রা) আলী (রা)-এর নিকট দূত প্রেরণ করলেন। দূত বললেন, এমন এক কাওমের কাছ থেকে আমি এসেছি যারা নেতৃত্ব ছাড়া আর কিছু চায় না। রক্তের বদলা না পাওয়ায় তারা সবাই ক্ষিপ্ত। তখন আলী (রা) দামেস্কের মিম্বরে বললেন, "হে আল্লাহ্! উসমানের রক্তের ব্যাপারে তোমার কাছে আমি আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করছি।"
অতঃপর আলী (রা) সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। হযরত জারীর ইব্ন আবদুল্লাহকে তিনি পত্রসহ মু'আবিয়া (রা)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। পত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে, আনসার ও মুহাজিরগণ যে ইমামের ওপর একমত হন, তা আল্লাহর পক্ষ হতে সন্তুষ্টির পরিচায়ক। এরপর যদি কেউ বিদ্রোহ করে তবে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা মুসলমানদের কর্তব্য। [নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা-৩৬৬-৩৬৭]
📄 সিফফীন যুদ্ধ
সিরিয়ায় প্রবেশের উদ্দেশে আমীরুল মুমিনীন আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) কুফা থেকে রওয়ানা হলেন। মু'আবিয়া (রা) সিরিয়ার সকল বাহিনীকে তলব করে জড়ো করলেন এবং ফুরাতের সিফফীন অঞ্চলের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। আলী (রা) তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন যেন লড়াইয়ের আগে বারবার বায়'আত গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। উভয় পক্ষ সিফফীনে মুখোমুখি হলো। যুদ্ধ কয়েক দিনব্যাপী চললো। উভয় পক্ষই বীরত্বের পরিচয় দিলো।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিজয়ের পাল্লা সিরীয়দের প্রতিকূলে ও ইরাকীদের অনুকূলে ঝুঁকতে লাগলো, এমন কি সিরীয় বাহিনীর পরাজয় আসন্ন হয়ে উঠলো। ঠিক সেই মুহূর্তে সিরীয়রা বর্শার অগ্রভাগে কুরআন শরীফ উত্তোলন করে আওয়াজ তুললো, এই কুরআন হলো আমাদের ও তোমাদের মাঝে ফায়সালাকারী। এতে ইরাকী বাহিনীর বড় একটি অংশ লড়াই বন্ধ করে কিতাবুল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার কথা বললো। আলী (রা) তাদেরকে অনেক বোঝাতে চাইলেন যে এটি একটি কৌশল মাত্র, কিন্তু তারা নিবৃত্ত হলো না। [আল ইসাবা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৩]
📄 মীমাংসা
ইরাকীদের অধিকাংশ ও সিরীয়দের সর্বাংশ সমঝোতা ও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলো। ফলে দীর্ঘ পত্র-বিনিময় ও আলাপ-আলোচনার পর উভয় পক্ষ সালিসী ব্যবস্থায় সম্মত হলো অর্থাৎ আলী ও মু'আবিয়া (রা) উভয়ে নিজ নিজ পক্ষে একজন করে সালিস নিযুক্ত করবেন। অতঃপর উভয় সালিস মুসলমানদের জন্য যা কল্যাণকর সে বিষয়ে একমত হবেন। হযরত মু'আবিয়া (রা) আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে উকিল নিযুক্ত করলেন। হযরত আলী (রা)-এর পক্ষে একদলের চাপে আবু মূসা আশ'আরী (রা)-কে মীমাংসাকারী সাব্যস্ত করা হলো। সালিসদ্বয় আলী ও মু'আবিয়া (রা) এবং উভয় সেনা শিবির হতে এ মর্মে ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি নিলেন যে, সালিসন্বয় ও তাদের পরিবার-পরিজন সর্বাবস্থায় নিরাপদ থাকবেন এবং যে সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করবেন তাতে উম্মাত তাদের সাহায্যকারী হবে।
📄 খারিজীদের দলত্যাগ
সালিস-বিষয়ক পত্র শোনার পর বনী তামীম গোত্রের উরওয়া ইব্ন ওয়ায়না নামক এক ব্যক্তি বলে উঠলো, "আল্লাহর দীনের ব্যাপারে মানুষকে তোমরা বিচারক সাব্যস্ত করছো?" এখান থেকেই প্রথম দলত্যাগের সূচনা হয় যা খারিজী সম্প্রদায়ের জন্ম দেয়। তাদের স্লোগান ছিলো: لا حكم الا الله "আল্লাহ্ ছাড়া কারো বিধান প্রদানের অধিকার নেই।"
আলী (রা) কুফায় প্রত্যাবর্তন করলেন। শহরে প্রবেশের পূর্ব মুহূর্তে তাঁর বাহিনীর প্রায় বার হাজার সৈন্য দলত্যাগ করলো। তারা 'হারুরা' নামক এলাকায় জমায়েত হলো। এরপর তারা নাহরওয়ান অঞ্চলে সংঘবদ্ধ হলো। এদিকে সালিসদ্বয় দাওমাতুল জান্দাল এলাকায় বৈঠকে মিলিত হলেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে আলী ও মু'আবিয়া উভয়কে অপসারিত করে বিষয়টি মুসলমানদের পরামর্শের ওপর ন্যস্ত করবেন। কিন্তু জনসমক্ষে ঘোষণার সময় আমর ইবনুল আ'স (রা) চাতুর্য অবলম্বন করে মু'আবিয়াকে বহাল রাখার ঘোষণা দিলেন। এতে উভয় সালিসের মাঝে বাদানুবাদ হলো। অন্যদিকে খারিজীরা আবদুল্লাহ্ ইব্ন ওয়াহব রাসেদীর নেতৃত্বে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করলো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৮৭]