📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 সাহাবা বিরোধ: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

📄 সাহাবা বিরোধ: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা


সাহাবা-কিরামের এ সকল মতবিরোধ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব যা কখনো কখনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছে, এ সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য হলো, পরিবেশ-পরিস্থিতি চিন্তা না করে এবং ঘটনার দায়-দায়িত্ব যাঁদের ওপর ছিলো তাঁদের প্রতি একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সঠিক নয়। যাঁরা নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন তাদের বিশাল ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত। হযরত আলী (রা) ব্যক্তিগতভাবে এ সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাতের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়েছিলেন, অথচ তাঁর মন্তব্য শুনুন। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে আলী (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, তারা কি মুশরিক? তিনি বললেন, শিরক থেকেই তো তারা পলায়ন করে এসেছেন! জিজ্ঞেস করা হলো তাহলে কি তারা মুনাফিক? তিনি বললেন, মুনাফিকরা তো অতি অল্পই আল্লাহর যিকির করে থাকে! জিজ্ঞেস করা হলো তাহলে এদের পরিচয় কি? তিনি বললেন, এঁরা আমাদের ভাই; আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। তিনি আরও বললেন, আমি আশা করি, আমরা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবো যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন, "আমি তাদের অন্তর হতে বিদ্বেষ দূর করে দেবো, তারা ভাই ভাইরূপে পরস্পর মুখোমুখী হয়ে আসনে অবস্থান করবে।" [সূরা হিজর: ৪৭]

দার্শনিক ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে খালদুন (র) বলেন, "নিজেকে ও নিজের জিহ্বাকে তাদের যে কারো সমালোচনায় অভ্যস্ত করার ব্যাপারে সতর্ক থেকো এবং তাঁদের কোন কার্যকলাপ সম্পর্কে দ্বিধাসংশয় দ্বারা আপন হৃদয়কে বিক্ষিপ্ত করো না, বরং তাদের পক্ষে সত্যের বিভিন্ন পথ ও পন্থা যথাসম্ভব অন্বেষণ করো। কেননা তাঁরা এ আচরণের অধিক হকদার। ভক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে জিহাদের পথেই তাঁরা লড়েছেন এবং জীবন দিয়েছেন। সুতরাং বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা কর এবং মানব সমাজে ও বিশ্বজগতের আল্লাহর হিকমত ও নিগূঢ় রহস্য অনুধাবন করতে চেষ্টা করো।" [মুকাদ্দিমা, ইব্‌ন্ন খালদুন, পৃষ্ঠা-১৭২]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আলী ও মু'আবিয়া (রা)-এর সংঘাত

📄 আলী ও মু'আবিয়া (রা)-এর সংঘাত


৩৬ হিজরী সনের আগমন হলো। ইতিমধ্যে আমীরুল মু'মিনীন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন এবং বিভিন্ন শহরে প্রশাসক নিয়োগ করেছেন। মু'আবিয়া (রা) আলী (রা)-এর নিকট দূত প্রেরণ করলেন। দূত বললেন, এমন এক কাওমের কাছ থেকে আমি এসেছি যারা নেতৃত্ব ছাড়া আর কিছু চায় না। রক্তের বদলা না পাওয়ায় তারা সবাই ক্ষিপ্ত। তখন আলী (রা) দামেস্কের মিম্বরে বললেন, "হে আল্লাহ্! উসমানের রক্তের ব্যাপারে তোমার কাছে আমি আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করছি।"

অতঃপর আলী (রা) সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। হযরত জারীর ইব্‌ন আবদুল্লাহকে তিনি পত্রসহ মু'আবিয়া (রা)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। পত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে, আনসার ও মুহাজিরগণ যে ইমামের ওপর একমত হন, তা আল্লাহর পক্ষ হতে সন্তুষ্টির পরিচায়ক। এরপর যদি কেউ বিদ্রোহ করে তবে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা মুসলমানদের কর্তব্য। [নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা-৩৬৬-৩৬৭]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 সিফফীন যুদ্ধ

📄 সিফফীন যুদ্ধ


সিরিয়ায় প্রবেশের উদ্দেশে আমীরুল মুমিনীন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) কুফা থেকে রওয়ানা হলেন। মু'আবিয়া (রা) সিরিয়ার সকল বাহিনীকে তলব করে জড়ো করলেন এবং ফুরাতের সিফফীন অঞ্চলের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। আলী (রা) তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন যেন লড়াইয়ের আগে বারবার বায়'আত গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। উভয় পক্ষ সিফফীনে মুখোমুখি হলো। যুদ্ধ কয়েক দিনব্যাপী চললো। উভয় পক্ষই বীরত্বের পরিচয় দিলো।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিজয়ের পাল্লা সিরীয়দের প্রতিকূলে ও ইরাকীদের অনুকূলে ঝুঁকতে লাগলো, এমন কি সিরীয় বাহিনীর পরাজয় আসন্ন হয়ে উঠলো। ঠিক সেই মুহূর্তে সিরীয়রা বর্শার অগ্রভাগে কুরআন শরীফ উত্তোলন করে আওয়াজ তুললো, এই কুরআন হলো আমাদের ও তোমাদের মাঝে ফায়সালাকারী। এতে ইরাকী বাহিনীর বড় একটি অংশ লড়াই বন্ধ করে কিতাবুল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার কথা বললো। আলী (রা) তাদেরকে অনেক বোঝাতে চাইলেন যে এটি একটি কৌশল মাত্র, কিন্তু তারা নিবৃত্ত হলো না। [আল ইসাবা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৩]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 মীমাংসা

📄 মীমাংসা


ইরাকীদের অধিকাংশ ও সিরীয়দের সর্বাংশ সমঝোতা ও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলো। ফলে দীর্ঘ পত্র-বিনিময় ও আলাপ-আলোচনার পর উভয় পক্ষ সালিসী ব্যবস্থায় সম্মত হলো অর্থাৎ আলী ও মু'আবিয়া (রা) উভয়ে নিজ নিজ পক্ষে একজন করে সালিস নিযুক্ত করবেন। অতঃপর উভয় সালিস মুসলমানদের জন্য যা কল্যাণকর সে বিষয়ে একমত হবেন। হযরত মু'আবিয়া (রা) আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে উকিল নিযুক্ত করলেন। হযরত আলী (রা)-এর পক্ষে একদলের চাপে আবু মূসা আশ'আরী (রা)-কে মীমাংসাকারী সাব্যস্ত করা হলো। সালিসদ্বয় আলী ও মু'আবিয়া (রা) এবং উভয় সেনা শিবির হতে এ মর্মে ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি নিলেন যে, সালিসন্বয় ও তাদের পরিবার-পরিজন সর্বাবস্থায় নিরাপদ থাকবেন এবং যে সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করবেন তাতে উম্মাত তাদের সাহায্যকারী হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px