📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কুফায় খিলাফত কেন্দ্রের স্থানান্তর

📄 কুফায় খিলাফত কেন্দ্রের স্থানান্তর


হযরত আলী (রা) ইরাকের কুফা শহরকে তাঁর খিলাফতের কেন্দ্র ও রাজধানীরূপে গ্রহণ করলেন। কুফাকে কেন্দ্র করেই তাঁর যাবতীয় সামরিক কার্যক্রম, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হতো। হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর প্রিয় শহর ও হিজরত ভূমিকে মুসলমানদের সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত সংঘর্ষের কলঙ্ক থেকে রক্ষার উদ্দেশেই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ইসলামের দ্বিতীয় হারাম, মসজিদে নববী ও রাওযাতুর রাসূল-এর প্রতি আদব ও সম্মান প্রদর্শনের এটাই ছিলো স্বাভাবিক দাবি।

গবেষক আল আক্কাদ বলেন, হযরত আলী (রা) কুফাকে মনোনীত করেছিলেন যা ইসলামী সালতানাতের ঐ সময় পর্বে বিশ্ব ইসলামী ইমামতের জন্য সর্বোত্তম রাজধানীরূপে প্রমাণিত হয়েছিলো। কেননা কুফা ছিলো তখন সকল জাতির মিলন ক্ষেত্র এবং ভারত, পারস্য, ইয়ামান, ইরাক ও সিরিয়ার মাঝে ব্যবসা-বাণিজ্যের সেতুবন্ধন। তদুপরি কুফা ছিলো 'আরবীয় সংস্কৃতির লালন কেন্দ্র, যেখানে ভাষা, সাহিত্য, কিরাত, বংশবিদ্যা, বিভিন্ন ধারার কাব্য চর্চা ও বর্ণনাবিদ্যার প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। সুতরাং একজন ইমামের শাসন পরিচালনার জন্য কুফাই ছিলো সে যুগের যোগ্যতম রাজধানী। [আল আবকারিয়াতুল ইসলামিয়‍্যাহ, পৃষ্ঠা ৯৫২]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর সম্মান প্রদর্শন

📄 হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর সম্মান প্রদর্শন


হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর আচরণ ছিলো চূড়ান্ত পর্যায়ের সম্মানজনক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। ঐতিহাসিকগণ বলেন, হযরত আলী (রা) হযরত আয়েশা (রা)-এর সফরের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিলেন। পুরুষদের একটি জামাতকে ও বসরার সম্ভ্রান্ত চল্লিশজন স্ত্রীলোককে তাঁর সফরসঙ্গী করে দিলেন। সফরের যাত্রার দিন আলী (রা) তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে দণ্ডায়মান হলেন। তিনি সকলকে বিদায় জানিয়ে বললেন, "হে বৎসগণ! আমরা যেন পরস্পর পরস্পরকে তিরস্কার না করি। আল্লাহর শপথ! আমার ও আলীর মাঝে শুরু থেকেই কোন কিছু ছিলো না, তবে এক স্ত্রীলোক ও তাঁর শ্বশুরকুলের মাঝে স্বাভাবিকভাবে যা হয়ে থাকে। আমার সাথে বিরোধিতা সত্ত্বেও নিঃসন্দেহে তিনি উত্তম ব্যক্তিগণের অন্তর্ভুক্ত।"

আলী (রা) তখন বললেন, "আল্লাহর শপথ! তিনি সত্য বলেছেন, আমার ও তাঁর মাঝে এ ছাড়া আর কিছু ছিলো না। নিঃসন্দেহে তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের নবীর সহধর্মিণী।" হযরত আলী (রা) তাঁকে বিদায় জানাতে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে কয়েক মাইল চললেন এবং তাঁর পুত্রদ্বয়কে অবশিষ্ট দিন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে বললেন।

যুদ্ধশেষে আলী (রা) নিহতদের দেখতে বের হলেন। যখন বসরাবাসী কোন নিহত ব্যক্তিকে দেখে চিনতে পেতেন বিষণ্ণ কণ্ঠে তিনি বলতেন, মানুষের ধারণা যে, তাদের সাথে নির্বোধ ও অপদার্থরাই শুধু যোগ দিয়েছিলো, অথচ এই দেখ, অমুক, অমুক। অতঃপর তিনি নিহতদের জানাযা পড়ালেন এবং তাদেরকে দাফন করার আদেশ করলেন। হযরত তালহা (রা) একটি অজ্ঞাত তীরের আঘাতে জখমী হয়ে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। আলী (রা) তাঁর মুখমণ্ডলের ধুলোবালি মুছে দিতে দিতে বলেছিলেন, "হে আবু মুহাম্মদ! তোমার প্রতি আল্লাহ্ রহম করুন! নক্ষত্ররাজি পরিপূর্ণ খোলা আকাশের নীচে এভাবে তোমাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা আমার জন্য বড় কঠিন। আল্লাহর শপথ! আজকের এ দিনের বিশ বছর আগে আমার মৃত্যু হলে আমি খুশী হতাম।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৬-২৪৮]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 সাহাবা বিরোধ: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

📄 সাহাবা বিরোধ: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা


সাহাবা-কিরামের এ সকল মতবিরোধ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব যা কখনো কখনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছে, এ সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য হলো, পরিবেশ-পরিস্থিতি চিন্তা না করে এবং ঘটনার দায়-দায়িত্ব যাঁদের ওপর ছিলো তাঁদের প্রতি একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সঠিক নয়। যাঁরা নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন তাদের বিশাল ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত। হযরত আলী (রা) ব্যক্তিগতভাবে এ সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাতের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়েছিলেন, অথচ তাঁর মন্তব্য শুনুন। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে আলী (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, তারা কি মুশরিক? তিনি বললেন, শিরক থেকেই তো তারা পলায়ন করে এসেছেন! জিজ্ঞেস করা হলো তাহলে কি তারা মুনাফিক? তিনি বললেন, মুনাফিকরা তো অতি অল্পই আল্লাহর যিকির করে থাকে! জিজ্ঞেস করা হলো তাহলে এদের পরিচয় কি? তিনি বললেন, এঁরা আমাদের ভাই; আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। তিনি আরও বললেন, আমি আশা করি, আমরা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবো যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন, "আমি তাদের অন্তর হতে বিদ্বেষ দূর করে দেবো, তারা ভাই ভাইরূপে পরস্পর মুখোমুখী হয়ে আসনে অবস্থান করবে।" [সূরা হিজর: ৪৭]

দার্শনিক ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে খালদুন (র) বলেন, "নিজেকে ও নিজের জিহ্বাকে তাদের যে কারো সমালোচনায় অভ্যস্ত করার ব্যাপারে সতর্ক থেকো এবং তাঁদের কোন কার্যকলাপ সম্পর্কে দ্বিধাসংশয় দ্বারা আপন হৃদয়কে বিক্ষিপ্ত করো না, বরং তাদের পক্ষে সত্যের বিভিন্ন পথ ও পন্থা যথাসম্ভব অন্বেষণ করো। কেননা তাঁরা এ আচরণের অধিক হকদার। ভক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে জিহাদের পথেই তাঁরা লড়েছেন এবং জীবন দিয়েছেন। সুতরাং বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা কর এবং মানব সমাজে ও বিশ্বজগতের আল্লাহর হিকমত ও নিগূঢ় রহস্য অনুধাবন করতে চেষ্টা করো।" [মুকাদ্দিমা, ইব্‌ন্ন খালদুন, পৃষ্ঠা-১৭২]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আলী ও মু'আবিয়া (রা)-এর সংঘাত

📄 আলী ও মু'আবিয়া (রা)-এর সংঘাত


৩৬ হিজরী সনের আগমন হলো। ইতিমধ্যে আমীরুল মু'মিনীন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন এবং বিভিন্ন শহরে প্রশাসক নিয়োগ করেছেন। মু'আবিয়া (রা) আলী (রা)-এর নিকট দূত প্রেরণ করলেন। দূত বললেন, এমন এক কাওমের কাছ থেকে আমি এসেছি যারা নেতৃত্ব ছাড়া আর কিছু চায় না। রক্তের বদলা না পাওয়ায় তারা সবাই ক্ষিপ্ত। তখন আলী (রা) দামেস্কের মিম্বরে বললেন, "হে আল্লাহ্! উসমানের রক্তের ব্যাপারে তোমার কাছে আমি আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করছি।"

অতঃপর আলী (রা) সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। হযরত জারীর ইব্‌ন আবদুল্লাহকে তিনি পত্রসহ মু'আবিয়া (রা)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। পত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে, আনসার ও মুহাজিরগণ যে ইমামের ওপর একমত হন, তা আল্লাহর পক্ষ হতে সন্তুষ্টির পরিচায়ক। এরপর যদি কেউ বিদ্রোহ করে তবে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা মুসলমানদের কর্তব্য। [নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা-৩৬৬-৩৬৭]

ফন্ট সাইজ
15px
17px