📄 আলী (রা)-এর খিলাফত কালের সমস্যা, সংকট ও দুর্যোগ
ইতিহাসের যে চরম ক্রান্তিকাল ও নাযুক পরিস্থিতি এই উম্মাহ অতিক্রম করে এসেছে তন্মধ্যে হযরত আলী (রা)-এর খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ ছিলো অন্যতম এক নাযুক মুহূর্ত। কেননা জাহিলিয়াতের মহাসমুদ্রে ইসলাম তখনও ছিলো এক ক্ষুদ্রতম দ্বীপ। সে সময় খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর শাহাদাতের ঘটনা বীভৎস ও বর্বরতমরূপে সংঘটিত হয়েছিলো। তদুপরি বিক্ষোভ ও অসন্তোষ এবং উত্তাপ ও অগ্নি উদ্গিরণের বিভিন্ন উপাদানের একত্র সমাবেশ ঘটেছিলো তখন। গুজব-গুঞ্জন, জল্পনা-কল্পনা ও সংশয়-সন্দেহেরও বিস্তার ঘটেছিলো ভয়াবহ রূপে। উচ্চাভিলাসীদের দাবি ও চাহিদাও প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছিলো। শহরে-পল্লীতে-মজলিসে-মাহফিলে হযরত উসমান (রা)-এর শাহাদাতের মর্মান্তিক ঘটনাই ছিলো মূল আলোচ্য বিষয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিলো এই যে, মিসর, ইরাক ও বেদুঈন জনগোষ্ঠীর যারা ঘটনার সময় ছিলো সম্পূর্ণ নিশ্চুপ ও নির্লিপ্ত, এক ফোঁটা রক্ত দূরের কথা, এক ফোঁটা ঘামও যারা ঝরায়নি তখন তারাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিসাসের দাবিতে অতি সোচ্চার হয়ে উঠেছিলো।
গবেষক আল-আক্কাদ বলেন, ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও রক্তাক্ত ঘটনার পর হযরত আলী (রা)-এর খিলাফত ও বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এ ঘটনায় সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক ছিলো, এ ফিতনা রোধ করার ও এর অবধারিত পরিণতি পরিহার করার কোন উপায় ছিলো না। কেননা ঘটনার দায়-দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিরা বিপুল সংখ্যায় সর্বদিকে ছড়িয়ে ছিলো। দ্বিতীয় সমস্যা ছিলো, উসমান হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা পূর্ণরূপে চিহ্নিত ছিলো না অর্থাৎ তাদের বিপক্ষে প্রত্যক্ষদর্শীর শরীয়তসম্মত সাক্ষ্য বিদ্যমান ছিলো না যাতে কিসাস গ্রহণ করা যেতে পারে। যারা হযরত আলী (রা)-এর নিকট কিসাস জারি করার দাবি জানাতো তাদের উদ্দেশে তিনি বলতেন, "দেখ, তোমরা যা জানো আমি সে বিষয়ে অজ্ঞ নই। কিন্তু (সুসংগঠিত) 'জনদল' সম্পর্কে আমি কি করতে পারি যারা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, অথচ আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না?"
হাফেয ইবন হাজার (র) বলেন, আলী (রা)-এর অবস্থান এই ছিলো যে, প্রতিপক্ষ লোকেরা প্রথমে আনুগত্য গ্রহণ করুক, অতঃপর উসমানের রক্তের বৈধ দাবিদাররা তাঁর নিকট কিসাসের দাবি উত্থাপন করুক! তখন তিনি শরীয়তের হুকুম মুতাবিক ফায়সালা জারি করবেন। কিন্তু বিরোধী পক্ষ এই বলে দাবি জানাচ্ছিলো, আপনি তাদের খুঁজে বের করুন এবং হত্যা করুন। কিন্তু তিনি মনে করতেন, দাবি উত্থাপন ও প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়া কিসাস বৈধ নয়। মূলত উভয় পক্ষই ছিলেন মুজতাহিদ। [আল-ইসাবা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫০৮]
মদীনায় অবস্থানকারী সকল সাহাবী ও তাবেয়ীর বায়'আত গ্রহণ প্রসঙ্গ আলোচনার পর জানা যায়, হযরত তালহা ও যুবায়র (রা) মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। হযরত আয়েশা (রা) তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। অতঃপর হযরত আয়েশা (রা)-কে সঙ্গে করে হযরত উসমান (রা)-এর কিসাসের দাবিতে বসরা অভিমুখে যাত্রা করলেন। হযরত আলী (রা) এ সংবাদ অবগত হয়ে মদীনা হতে ইরাক অভিমুখে যাত্রা করলেন। ছত্রিশ হিজরীর জুমাদাল আখিরায় উভয় পক্ষে ঘোরতর যুদ্ধ হলো যা "উষ্ট্রের যুদ্ধ" নামে খ্যাতি লাভ করেছে। যুদ্ধে হযরত আলী (রা)-এর জয় হলো। যুদ্ধের শুরু হযরত আলী (রা)-এর পক্ষ হতে ছিলো না, বরং প্রতিপক্ষ লড়াই শুরু করার পরই তিনি অস্ত্র ধারণ করেছিলেন।
📄 কুফায় খিলাফত কেন্দ্রের স্থানান্তর
হযরত আলী (রা) ইরাকের কুফা শহরকে তাঁর খিলাফতের কেন্দ্র ও রাজধানীরূপে গ্রহণ করলেন। কুফাকে কেন্দ্র করেই তাঁর যাবতীয় সামরিক কার্যক্রম, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হতো। হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর প্রিয় শহর ও হিজরত ভূমিকে মুসলমানদের সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত সংঘর্ষের কলঙ্ক থেকে রক্ষার উদ্দেশেই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ইসলামের দ্বিতীয় হারাম, মসজিদে নববী ও রাওযাতুর রাসূল-এর প্রতি আদব ও সম্মান প্রদর্শনের এটাই ছিলো স্বাভাবিক দাবি।
গবেষক আল আক্কাদ বলেন, হযরত আলী (রা) কুফাকে মনোনীত করেছিলেন যা ইসলামী সালতানাতের ঐ সময় পর্বে বিশ্ব ইসলামী ইমামতের জন্য সর্বোত্তম রাজধানীরূপে প্রমাণিত হয়েছিলো। কেননা কুফা ছিলো তখন সকল জাতির মিলন ক্ষেত্র এবং ভারত, পারস্য, ইয়ামান, ইরাক ও সিরিয়ার মাঝে ব্যবসা-বাণিজ্যের সেতুবন্ধন। তদুপরি কুফা ছিলো 'আরবীয় সংস্কৃতির লালন কেন্দ্র, যেখানে ভাষা, সাহিত্য, কিরাত, বংশবিদ্যা, বিভিন্ন ধারার কাব্য চর্চা ও বর্ণনাবিদ্যার প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। সুতরাং একজন ইমামের শাসন পরিচালনার জন্য কুফাই ছিলো সে যুগের যোগ্যতম রাজধানী। [আল আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৯৫২]
📄 হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর সম্মান প্রদর্শন
হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর আচরণ ছিলো চূড়ান্ত পর্যায়ের সম্মানজনক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। ঐতিহাসিকগণ বলেন, হযরত আলী (রা) হযরত আয়েশা (রা)-এর সফরের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিলেন। পুরুষদের একটি জামাতকে ও বসরার সম্ভ্রান্ত চল্লিশজন স্ত্রীলোককে তাঁর সফরসঙ্গী করে দিলেন। সফরের যাত্রার দিন আলী (রা) তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে দণ্ডায়মান হলেন। তিনি সকলকে বিদায় জানিয়ে বললেন, "হে বৎসগণ! আমরা যেন পরস্পর পরস্পরকে তিরস্কার না করি। আল্লাহর শপথ! আমার ও আলীর মাঝে শুরু থেকেই কোন কিছু ছিলো না, তবে এক স্ত্রীলোক ও তাঁর শ্বশুরকুলের মাঝে স্বাভাবিকভাবে যা হয়ে থাকে। আমার সাথে বিরোধিতা সত্ত্বেও নিঃসন্দেহে তিনি উত্তম ব্যক্তিগণের অন্তর্ভুক্ত।"
আলী (রা) তখন বললেন, "আল্লাহর শপথ! তিনি সত্য বলেছেন, আমার ও তাঁর মাঝে এ ছাড়া আর কিছু ছিলো না। নিঃসন্দেহে তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের নবীর সহধর্মিণী।" হযরত আলী (রা) তাঁকে বিদায় জানাতে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে কয়েক মাইল চললেন এবং তাঁর পুত্রদ্বয়কে অবশিষ্ট দিন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে বললেন।
যুদ্ধশেষে আলী (রা) নিহতদের দেখতে বের হলেন। যখন বসরাবাসী কোন নিহত ব্যক্তিকে দেখে চিনতে পেতেন বিষণ্ণ কণ্ঠে তিনি বলতেন, মানুষের ধারণা যে, তাদের সাথে নির্বোধ ও অপদার্থরাই শুধু যোগ দিয়েছিলো, অথচ এই দেখ, অমুক, অমুক। অতঃপর তিনি নিহতদের জানাযা পড়ালেন এবং তাদেরকে দাফন করার আদেশ করলেন। হযরত তালহা (রা) একটি অজ্ঞাত তীরের আঘাতে জখমী হয়ে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। আলী (রা) তাঁর মুখমণ্ডলের ধুলোবালি মুছে দিতে দিতে বলেছিলেন, "হে আবু মুহাম্মদ! তোমার প্রতি আল্লাহ্ রহম করুন! নক্ষত্ররাজি পরিপূর্ণ খোলা আকাশের নীচে এভাবে তোমাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা আমার জন্য বড় কঠিন। আল্লাহর শপথ! আজকের এ দিনের বিশ বছর আগে আমার মৃত্যু হলে আমি খুশী হতাম।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৬-২৪৮]
📄 সাহাবা বিরোধ: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
সাহাবা-কিরামের এ সকল মতবিরোধ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব যা কখনো কখনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছে, এ সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য হলো, পরিবেশ-পরিস্থিতি চিন্তা না করে এবং ঘটনার দায়-দায়িত্ব যাঁদের ওপর ছিলো তাঁদের প্রতি একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সঠিক নয়। যাঁরা নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন তাদের বিশাল ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত। হযরত আলী (রা) ব্যক্তিগতভাবে এ সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাতের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়েছিলেন, অথচ তাঁর মন্তব্য শুনুন। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে আলী (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, তারা কি মুশরিক? তিনি বললেন, শিরক থেকেই তো তারা পলায়ন করে এসেছেন! জিজ্ঞেস করা হলো তাহলে কি তারা মুনাফিক? তিনি বললেন, মুনাফিকরা তো অতি অল্পই আল্লাহর যিকির করে থাকে! জিজ্ঞেস করা হলো তাহলে এদের পরিচয় কি? তিনি বললেন, এঁরা আমাদের ভাই; আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। তিনি আরও বললেন, আমি আশা করি, আমরা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবো যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন, "আমি তাদের অন্তর হতে বিদ্বেষ দূর করে দেবো, তারা ভাই ভাইরূপে পরস্পর মুখোমুখী হয়ে আসনে অবস্থান করবে।" [সূরা হিজর: ৪৭]
দার্শনিক ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে খালদুন (র) বলেন, "নিজেকে ও নিজের জিহ্বাকে তাদের যে কারো সমালোচনায় অভ্যস্ত করার ব্যাপারে সতর্ক থেকো এবং তাঁদের কোন কার্যকলাপ সম্পর্কে দ্বিধাসংশয় দ্বারা আপন হৃদয়কে বিক্ষিপ্ত করো না, বরং তাদের পক্ষে সত্যের বিভিন্ন পথ ও পন্থা যথাসম্ভব অন্বেষণ করো। কেননা তাঁরা এ আচরণের অধিক হকদার। ভক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে জিহাদের পথেই তাঁরা লড়েছেন এবং জীবন দিয়েছেন। সুতরাং বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা কর এবং মানব সমাজে ও বিশ্বজগতের আল্লাহর হিকমত ও নিগূঢ় রহস্য অনুধাবন করতে চেষ্টা করো।" [মুকাদ্দিমা, ইব্ন্ন খালদুন, পৃষ্ঠা-১৭২]