📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 খিলাফত গ্রহণের পর আলী (রা)-এর প্রথম খুতবা

📄 খিলাফত গ্রহণের পর আলী (রা)-এর প্রথম খুতবা


পরবর্তী জুমার দিন হযরত আলী (রা) মিম্বরে আরোহণ করলেন। যারা ইতিপূর্বে বায়'আত হয়নি তারা বায়'আত গ্রহণ করলো। এই বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো যিলহজ্জ মাসের পঁচিশ তারিখে।

প্রথম খুতবায় তিনি আল্লাহ্র হামদ ছানা ও প্রশংসা বর্ণনার পর বললেন, আল্লাহ্ তা'আলা পথ প্রদর্শক এক কিতাব নাযিল করেছেন যাতে ভালো ও মন্দ বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং তোমরা যা ভালো তা গ্রহণ করো এবং যা মন্দ তা পরিহার করো। আল্লাহ্ তা'আলা অনেক কিছু হারাম করেছেন। তন্মধ্যে মুসলমানের (জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু) হুরমতকে সকল হুরমতের ওপর অগ্রাধিকার দান করেছেন এবং ইখলাস ও তাওহীদের বন্ধন দ্বারা মুসলমানদের হকসমূহকে সুদৃঢ় করেছেন।

পূর্ণ মুসলমান সেই ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অন্য সকল মুসলমান নিরাপদ থাকে, তবে হক ও সত্যের খাতিরে হলে ভিন্ন কথা। কোন মুসলমানকে কষ্ট দেয়া কোন মুসলমানের জন্য হালাল নয়, তবে শরীয়তের বিষয় হলে ভিন্ন কথা। বিশিষ্ট-সাধারণ সকল মানুষের যাবতীয় বিষয়ের অতি সত্বর যত্ন লও। কেননা পূর্বসূরিগণ তোমাদের সম্মুখে আর সেই মহামূহূর্ত তোমাদের হাঁকিয়ে নিয়ে চলেছে। সুতরাং দ্রুত ধাবিত হও, তাহলে (তাদের সঙ্গে) যুক্ত হতে পারবে। কেননা আখিরাত মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে।

আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বান্দাদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তোমাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে, এমন কি পশু-প্রাণী সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করা হবে। অতঃপর তোমরা আল্লাহ্র আনুগত্য কর, তার নাফরমানি করো না। যদি কল্যাণ ও ভালো কিছু দেখ তবে তা গ্রহণ করো আর যদি অকল্যাণ ও মন্দ কিছু দেখ তবে বর্জন করো।

وَاذْكُرُوا إِذْ أَنْتُمْ قَلِيلٌ مُسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُوْনَ أَنْ يتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَاؤُكُمْ وَايْدَكُمْ بِنَصْرِهِ، وَرَزَقَكُمْ মِّنَ الطَّيِّبَاتِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ .
"ঐ সময়ের কথা স্মরণ কর যখন পৃথিবীতে তোমরা (সংখ্যায়) অল্প, ও (শক্তিতে) দুর্বল ছিলে এবং এ আশংকা করছিলে যে, লোকেরা তোমাদেরকে থাবা মেরে নিয়ে যাবে। তখন তিনি তোমাদেরকে আশ্রয় দান করেছেন এবং আপন সাহায্য দ্বারা তোমাদের শক্তি যুগিয়েছেন এবং উত্তম উত্তম খাদ্য দ্বারা তোমাদের রিযিক দান করেছেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। [সূরা আনফাল: ২৬]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আলী (রা)-এর খিলাফত কালের সমস্যা, সংকট ও দুর্যোগ

📄 আলী (রা)-এর খিলাফত কালের সমস্যা, সংকট ও দুর্যোগ


ইতিহাসের যে চরম ক্রান্তিকাল ও নাযুক পরিস্থিতি এই উম্মাহ অতিক্রম করে এসেছে তন্মধ্যে হযরত আলী (রা)-এর খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ ছিলো অন্যতম এক নাযুক মুহূর্ত। কেননা জাহিলিয়াতের মহাসমুদ্রে ইসলাম তখনও ছিলো এক ক্ষুদ্রতম দ্বীপ। সে সময় খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান ইব্‌ন আফফান (রা)-এর শাহাদাতের ঘটনা বীভৎস ও বর্বরতমরূপে সংঘটিত হয়েছিলো। তদুপরি বিক্ষোভ ও অসন্তোষ এবং উত্তাপ ও অগ্নি উদ্গিরণের বিভিন্ন উপাদানের একত্র সমাবেশ ঘটেছিলো তখন। গুজব-গুঞ্জন, জল্পনা-কল্পনা ও সংশয়-সন্দেহেরও বিস্তার ঘটেছিলো ভয়াবহ রূপে। উচ্চাভিলাসীদের দাবি ও চাহিদাও প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছিলো। শহরে-পল্লীতে-মজলিসে-মাহফিলে হযরত উসমান (রা)-এর শাহাদাতের মর্মান্তিক ঘটনাই ছিলো মূল আলোচ্য বিষয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিলো এই যে, মিসর, ইরাক ও বেদুঈন জনগোষ্ঠীর যারা ঘটনার সময় ছিলো সম্পূর্ণ নিশ্চুপ ও নির্লিপ্ত, এক ফোঁটা রক্ত দূরের কথা, এক ফোঁটা ঘামও যারা ঝরায়নি তখন তারাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিসাসের দাবিতে অতি সোচ্চার হয়ে উঠেছিলো।

গবেষক আল-আক্কাদ বলেন, ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও রক্তাক্ত ঘটনার পর হযরত আলী (রা)-এর খিলাফত ও বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এ ঘটনায় সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক ছিলো, এ ফিতনা রোধ করার ও এর অবধারিত পরিণতি পরিহার করার কোন উপায় ছিলো না। কেননা ঘটনার দায়-দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিরা বিপুল সংখ্যায় সর্বদিকে ছড়িয়ে ছিলো। দ্বিতীয় সমস্যা ছিলো, উসমান হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা পূর্ণরূপে চিহ্নিত ছিলো না অর্থাৎ তাদের বিপক্ষে প্রত্যক্ষদর্শীর শরীয়তসম্মত সাক্ষ্য বিদ্যমান ছিলো না যাতে কিসাস গ্রহণ করা যেতে পারে। যারা হযরত আলী (রা)-এর নিকট কিসাস জারি করার দাবি জানাতো তাদের উদ্দেশে তিনি বলতেন, "দেখ, তোমরা যা জানো আমি সে বিষয়ে অজ্ঞ নই। কিন্তু (সুসংগঠিত) 'জনদল' সম্পর্কে আমি কি করতে পারি যারা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, অথচ আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না?"

হাফেয ইবন হাজার (র) বলেন, আলী (রা)-এর অবস্থান এই ছিলো যে, প্রতিপক্ষ লোকেরা প্রথমে আনুগত্য গ্রহণ করুক, অতঃপর উসমানের রক্তের বৈধ দাবিদাররা তাঁর নিকট কিসাসের দাবি উত্থাপন করুক! তখন তিনি শরীয়তের হুকুম মুতাবিক ফায়সালা জারি করবেন। কিন্তু বিরোধী পক্ষ এই বলে দাবি জানাচ্ছিলো, আপনি তাদের খুঁজে বের করুন এবং হত্যা করুন। কিন্তু তিনি মনে করতেন, দাবি উত্থাপন ও প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়া কিসাস বৈধ নয়। মূলত উভয় পক্ষই ছিলেন মুজতাহিদ। [আল-ইসাবা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫০৮]

মদীনায় অবস্থানকারী সকল সাহাবী ও তাবেয়ীর বায়'আত গ্রহণ প্রসঙ্গ আলোচনার পর জানা যায়, হযরত তালহা ও যুবায়র (রা) মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। হযরত আয়েশা (রা) তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। অতঃপর হযরত আয়েশা (রা)-কে সঙ্গে করে হযরত উসমান (রা)-এর কিসাসের দাবিতে বসরা অভিমুখে যাত্রা করলেন। হযরত আলী (রা) এ সংবাদ অবগত হয়ে মদীনা হতে ইরাক অভিমুখে যাত্রা করলেন। ছত্রিশ হিজরীর জুমাদাল আখিরায় উভয় পক্ষে ঘোরতর যুদ্ধ হলো যা "উষ্ট্রের যুদ্ধ" নামে খ্যাতি লাভ করেছে। যুদ্ধে হযরত আলী (রা)-এর জয় হলো। যুদ্ধের শুরু হযরত আলী (রা)-এর পক্ষ হতে ছিলো না, বরং প্রতিপক্ষ লড়াই শুরু করার পরই তিনি অস্ত্র ধারণ করেছিলেন।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কুফায় খিলাফত কেন্দ্রের স্থানান্তর

📄 কুফায় খিলাফত কেন্দ্রের স্থানান্তর


হযরত আলী (রা) ইরাকের কুফা শহরকে তাঁর খিলাফতের কেন্দ্র ও রাজধানীরূপে গ্রহণ করলেন। কুফাকে কেন্দ্র করেই তাঁর যাবতীয় সামরিক কার্যক্রম, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হতো। হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর প্রিয় শহর ও হিজরত ভূমিকে মুসলমানদের সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত সংঘর্ষের কলঙ্ক থেকে রক্ষার উদ্দেশেই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ইসলামের দ্বিতীয় হারাম, মসজিদে নববী ও রাওযাতুর রাসূল-এর প্রতি আদব ও সম্মান প্রদর্শনের এটাই ছিলো স্বাভাবিক দাবি।

গবেষক আল আক্কাদ বলেন, হযরত আলী (রা) কুফাকে মনোনীত করেছিলেন যা ইসলামী সালতানাতের ঐ সময় পর্বে বিশ্ব ইসলামী ইমামতের জন্য সর্বোত্তম রাজধানীরূপে প্রমাণিত হয়েছিলো। কেননা কুফা ছিলো তখন সকল জাতির মিলন ক্ষেত্র এবং ভারত, পারস্য, ইয়ামান, ইরাক ও সিরিয়ার মাঝে ব্যবসা-বাণিজ্যের সেতুবন্ধন। তদুপরি কুফা ছিলো 'আরবীয় সংস্কৃতির লালন কেন্দ্র, যেখানে ভাষা, সাহিত্য, কিরাত, বংশবিদ্যা, বিভিন্ন ধারার কাব্য চর্চা ও বর্ণনাবিদ্যার প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। সুতরাং একজন ইমামের শাসন পরিচালনার জন্য কুফাই ছিলো সে যুগের যোগ্যতম রাজধানী। [আল আবকারিয়াতুল ইসলামিয়‍্যাহ, পৃষ্ঠা ৯৫২]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর সম্মান প্রদর্শন

📄 হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর সম্মান প্রদর্শন


হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর আচরণ ছিলো চূড়ান্ত পর্যায়ের সম্মানজনক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। ঐতিহাসিকগণ বলেন, হযরত আলী (রা) হযরত আয়েশা (রা)-এর সফরের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিলেন। পুরুষদের একটি জামাতকে ও বসরার সম্ভ্রান্ত চল্লিশজন স্ত্রীলোককে তাঁর সফরসঙ্গী করে দিলেন। সফরের যাত্রার দিন আলী (রা) তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে দণ্ডায়মান হলেন। তিনি সকলকে বিদায় জানিয়ে বললেন, "হে বৎসগণ! আমরা যেন পরস্পর পরস্পরকে তিরস্কার না করি। আল্লাহর শপথ! আমার ও আলীর মাঝে শুরু থেকেই কোন কিছু ছিলো না, তবে এক স্ত্রীলোক ও তাঁর শ্বশুরকুলের মাঝে স্বাভাবিকভাবে যা হয়ে থাকে। আমার সাথে বিরোধিতা সত্ত্বেও নিঃসন্দেহে তিনি উত্তম ব্যক্তিগণের অন্তর্ভুক্ত।"

আলী (রা) তখন বললেন, "আল্লাহর শপথ! তিনি সত্য বলেছেন, আমার ও তাঁর মাঝে এ ছাড়া আর কিছু ছিলো না। নিঃসন্দেহে তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের নবীর সহধর্মিণী।" হযরত আলী (রা) তাঁকে বিদায় জানাতে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে কয়েক মাইল চললেন এবং তাঁর পুত্রদ্বয়কে অবশিষ্ট দিন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে বললেন।

যুদ্ধশেষে আলী (রা) নিহতদের দেখতে বের হলেন। যখন বসরাবাসী কোন নিহত ব্যক্তিকে দেখে চিনতে পেতেন বিষণ্ণ কণ্ঠে তিনি বলতেন, মানুষের ধারণা যে, তাদের সাথে নির্বোধ ও অপদার্থরাই শুধু যোগ দিয়েছিলো, অথচ এই দেখ, অমুক, অমুক। অতঃপর তিনি নিহতদের জানাযা পড়ালেন এবং তাদেরকে দাফন করার আদেশ করলেন। হযরত তালহা (রা) একটি অজ্ঞাত তীরের আঘাতে জখমী হয়ে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। আলী (রা) তাঁর মুখমণ্ডলের ধুলোবালি মুছে দিতে দিতে বলেছিলেন, "হে আবু মুহাম্মদ! তোমার প্রতি আল্লাহ্ রহম করুন! নক্ষত্ররাজি পরিপূর্ণ খোলা আকাশের নীচে এভাবে তোমাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা আমার জন্য বড় কঠিন। আল্লাহর শপথ! আজকের এ দিনের বিশ বছর আগে আমার মৃত্যু হলে আমি খুশী হতাম।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৬-২৪৮]

ফন্ট সাইজ
15px
17px