📄 হযরত আলী (রা)-এর বায়'আত
হযরত উসমান (রা)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর মদীনায় অবস্থানকারীরা এমন একজন লোকের সন্ধান করছিলো যিনি দায়িত্বভার গ্রহণে তাদের ডাকে সাড়া দেবেন। এদিকে মিসরীয়রা আলী (রা)-এর ওপর চাপ প্রয়োগ করে চলছিলো। আর তিনি বিভিন্ন খেজুর বাগানে তাদের থেকে আত্মগোপন করে ফিরছিলেন। মানুষ তখন হতবুদ্ধি অবস্থায় পড়ে আলী (রা)-এর নিকট গিয়ে জোর আবেদন জানালো এবং তাঁর হাতে বায়'আত গ্রহণ করলো। কেননা এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনার পর সবার মুখে একই কথা ছিলো যে, আলী ছাড়া আর কেউ তা সামাল দিতে পারতেন না। প্রকৃতপক্ষেও তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর মাঝে আবূ বকর, উমর ও উসমান (রা)-এর পর যাঁরা জীবিত ছিলেন তাঁদের মাঝে খিলাফতের দায়িত্ব ও মুসলমানদের শাসনভার গ্রহণের ব্যাপারে আলী (রা)-এর চেয়ে যোগ্য কোন ব্যক্তি ছিলেন না।
বর্ণনাকারী বলেন, আলী (রা) মসজিদে প্রবেশ করে মিম্বরে আরোহণ করলেন। তাঁর পরিধানে ছিলো বড় তহবন্দ ও রেশমী পাগড়ী। জুতা জোড়া ছিলো তাঁর হাতে, আপন ধনুকের ওপর ভর দিয়ে তিনি দাঁড়ানো ছিলেন। তখন সর্বস্তরের জনসাধারণ তাঁর হাতে বা'য়আত গ্রহণ করলো। সেদিন ছিলো পঁয়ত্রিশ হিজরীর যিলহজ্জ মাসের উনিশ তারিখ রোজ শনিবার। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৬-২২৭]
📄 খিলাফত গ্রহণের পর আলী (রা)-এর প্রথম খুতবা
পরবর্তী জুমার দিন হযরত আলী (রা) মিম্বরে আরোহণ করলেন। যারা ইতিপূর্বে বায়'আত হয়নি তারা বায়'আত গ্রহণ করলো। এই বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো যিলহজ্জ মাসের পঁচিশ তারিখে।
প্রথম খুতবায় তিনি আল্লাহ্র হামদ ছানা ও প্রশংসা বর্ণনার পর বললেন, আল্লাহ্ তা'আলা পথ প্রদর্শক এক কিতাব নাযিল করেছেন যাতে ভালো ও মন্দ বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং তোমরা যা ভালো তা গ্রহণ করো এবং যা মন্দ তা পরিহার করো। আল্লাহ্ তা'আলা অনেক কিছু হারাম করেছেন। তন্মধ্যে মুসলমানের (জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু) হুরমতকে সকল হুরমতের ওপর অগ্রাধিকার দান করেছেন এবং ইখলাস ও তাওহীদের বন্ধন দ্বারা মুসলমানদের হকসমূহকে সুদৃঢ় করেছেন।
পূর্ণ মুসলমান সেই ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অন্য সকল মুসলমান নিরাপদ থাকে, তবে হক ও সত্যের খাতিরে হলে ভিন্ন কথা। কোন মুসলমানকে কষ্ট দেয়া কোন মুসলমানের জন্য হালাল নয়, তবে শরীয়তের বিষয় হলে ভিন্ন কথা। বিশিষ্ট-সাধারণ সকল মানুষের যাবতীয় বিষয়ের অতি সত্বর যত্ন লও। কেননা পূর্বসূরিগণ তোমাদের সম্মুখে আর সেই মহামূহূর্ত তোমাদের হাঁকিয়ে নিয়ে চলেছে। সুতরাং দ্রুত ধাবিত হও, তাহলে (তাদের সঙ্গে) যুক্ত হতে পারবে। কেননা আখিরাত মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে।
আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বান্দাদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তোমাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে, এমন কি পশু-প্রাণী সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করা হবে। অতঃপর তোমরা আল্লাহ্র আনুগত্য কর, তার নাফরমানি করো না। যদি কল্যাণ ও ভালো কিছু দেখ তবে তা গ্রহণ করো আর যদি অকল্যাণ ও মন্দ কিছু দেখ তবে বর্জন করো।
وَاذْكُرُوا إِذْ أَنْتُمْ قَلِيلٌ مُسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُوْনَ أَنْ يتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَاؤُكُمْ وَايْدَكُمْ بِنَصْرِهِ، وَرَزَقَكُمْ মِّنَ الطَّيِّبَاتِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ .
"ঐ সময়ের কথা স্মরণ কর যখন পৃথিবীতে তোমরা (সংখ্যায়) অল্প, ও (শক্তিতে) দুর্বল ছিলে এবং এ আশংকা করছিলে যে, লোকেরা তোমাদেরকে থাবা মেরে নিয়ে যাবে। তখন তিনি তোমাদেরকে আশ্রয় দান করেছেন এবং আপন সাহায্য দ্বারা তোমাদের শক্তি যুগিয়েছেন এবং উত্তম উত্তম খাদ্য দ্বারা তোমাদের রিযিক দান করেছেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। [সূরা আনফাল: ২৬]
📄 আলী (রা)-এর খিলাফত কালের সমস্যা, সংকট ও দুর্যোগ
ইতিহাসের যে চরম ক্রান্তিকাল ও নাযুক পরিস্থিতি এই উম্মাহ অতিক্রম করে এসেছে তন্মধ্যে হযরত আলী (রা)-এর খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ ছিলো অন্যতম এক নাযুক মুহূর্ত। কেননা জাহিলিয়াতের মহাসমুদ্রে ইসলাম তখনও ছিলো এক ক্ষুদ্রতম দ্বীপ। সে সময় খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর শাহাদাতের ঘটনা বীভৎস ও বর্বরতমরূপে সংঘটিত হয়েছিলো। তদুপরি বিক্ষোভ ও অসন্তোষ এবং উত্তাপ ও অগ্নি উদ্গিরণের বিভিন্ন উপাদানের একত্র সমাবেশ ঘটেছিলো তখন। গুজব-গুঞ্জন, জল্পনা-কল্পনা ও সংশয়-সন্দেহেরও বিস্তার ঘটেছিলো ভয়াবহ রূপে। উচ্চাভিলাসীদের দাবি ও চাহিদাও প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছিলো। শহরে-পল্লীতে-মজলিসে-মাহফিলে হযরত উসমান (রা)-এর শাহাদাতের মর্মান্তিক ঘটনাই ছিলো মূল আলোচ্য বিষয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিলো এই যে, মিসর, ইরাক ও বেদুঈন জনগোষ্ঠীর যারা ঘটনার সময় ছিলো সম্পূর্ণ নিশ্চুপ ও নির্লিপ্ত, এক ফোঁটা রক্ত দূরের কথা, এক ফোঁটা ঘামও যারা ঝরায়নি তখন তারাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিসাসের দাবিতে অতি সোচ্চার হয়ে উঠেছিলো।
গবেষক আল-আক্কাদ বলেন, ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও রক্তাক্ত ঘটনার পর হযরত আলী (রা)-এর খিলাফত ও বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এ ঘটনায় সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক ছিলো, এ ফিতনা রোধ করার ও এর অবধারিত পরিণতি পরিহার করার কোন উপায় ছিলো না। কেননা ঘটনার দায়-দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিরা বিপুল সংখ্যায় সর্বদিকে ছড়িয়ে ছিলো। দ্বিতীয় সমস্যা ছিলো, উসমান হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা পূর্ণরূপে চিহ্নিত ছিলো না অর্থাৎ তাদের বিপক্ষে প্রত্যক্ষদর্শীর শরীয়তসম্মত সাক্ষ্য বিদ্যমান ছিলো না যাতে কিসাস গ্রহণ করা যেতে পারে। যারা হযরত আলী (রা)-এর নিকট কিসাস জারি করার দাবি জানাতো তাদের উদ্দেশে তিনি বলতেন, "দেখ, তোমরা যা জানো আমি সে বিষয়ে অজ্ঞ নই। কিন্তু (সুসংগঠিত) 'জনদল' সম্পর্কে আমি কি করতে পারি যারা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, অথচ আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না?"
হাফেয ইবন হাজার (র) বলেন, আলী (রা)-এর অবস্থান এই ছিলো যে, প্রতিপক্ষ লোকেরা প্রথমে আনুগত্য গ্রহণ করুক, অতঃপর উসমানের রক্তের বৈধ দাবিদাররা তাঁর নিকট কিসাসের দাবি উত্থাপন করুক! তখন তিনি শরীয়তের হুকুম মুতাবিক ফায়সালা জারি করবেন। কিন্তু বিরোধী পক্ষ এই বলে দাবি জানাচ্ছিলো, আপনি তাদের খুঁজে বের করুন এবং হত্যা করুন। কিন্তু তিনি মনে করতেন, দাবি উত্থাপন ও প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়া কিসাস বৈধ নয়। মূলত উভয় পক্ষই ছিলেন মুজতাহিদ। [আল-ইসাবা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫০৮]
মদীনায় অবস্থানকারী সকল সাহাবী ও তাবেয়ীর বায়'আত গ্রহণ প্রসঙ্গ আলোচনার পর জানা যায়, হযরত তালহা ও যুবায়র (রা) মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। হযরত আয়েশা (রা) তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। অতঃপর হযরত আয়েশা (রা)-কে সঙ্গে করে হযরত উসমান (রা)-এর কিসাসের দাবিতে বসরা অভিমুখে যাত্রা করলেন। হযরত আলী (রা) এ সংবাদ অবগত হয়ে মদীনা হতে ইরাক অভিমুখে যাত্রা করলেন। ছত্রিশ হিজরীর জুমাদাল আখিরায় উভয় পক্ষে ঘোরতর যুদ্ধ হলো যা "উষ্ট্রের যুদ্ধ" নামে খ্যাতি লাভ করেছে। যুদ্ধে হযরত আলী (রা)-এর জয় হলো। যুদ্ধের শুরু হযরত আলী (রা)-এর পক্ষ হতে ছিলো না, বরং প্রতিপক্ষ লড়াই শুরু করার পরই তিনি অস্ত্র ধারণ করেছিলেন।
📄 কুফায় খিলাফত কেন্দ্রের স্থানান্তর
হযরত আলী (রা) ইরাকের কুফা শহরকে তাঁর খিলাফতের কেন্দ্র ও রাজধানীরূপে গ্রহণ করলেন। কুফাকে কেন্দ্র করেই তাঁর যাবতীয় সামরিক কার্যক্রম, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হতো। হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর প্রিয় শহর ও হিজরত ভূমিকে মুসলমানদের সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত সংঘর্ষের কলঙ্ক থেকে রক্ষার উদ্দেশেই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ইসলামের দ্বিতীয় হারাম, মসজিদে নববী ও রাওযাতুর রাসূল-এর প্রতি আদব ও সম্মান প্রদর্শনের এটাই ছিলো স্বাভাবিক দাবি।
গবেষক আল আক্কাদ বলেন, হযরত আলী (রা) কুফাকে মনোনীত করেছিলেন যা ইসলামী সালতানাতের ঐ সময় পর্বে বিশ্ব ইসলামী ইমামতের জন্য সর্বোত্তম রাজধানীরূপে প্রমাণিত হয়েছিলো। কেননা কুফা ছিলো তখন সকল জাতির মিলন ক্ষেত্র এবং ভারত, পারস্য, ইয়ামান, ইরাক ও সিরিয়ার মাঝে ব্যবসা-বাণিজ্যের সেতুবন্ধন। তদুপরি কুফা ছিলো 'আরবীয় সংস্কৃতির লালন কেন্দ্র, যেখানে ভাষা, সাহিত্য, কিরাত, বংশবিদ্যা, বিভিন্ন ধারার কাব্য চর্চা ও বর্ণনাবিদ্যার প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। সুতরাং একজন ইমামের শাসন পরিচালনার জন্য কুফাই ছিলো সে যুগের যোগ্যতম রাজধানী। [আল আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৯৫২]