📄 উসমান (রা)-এর দৃঢ় ঈমান, নৈতিকতা ও ইসলামে তাঁর উচ্চ মর্যাদা
ইসলামের ইতিহাসের চরম লজ্জাজনক ও মর্মান্তিক এ অধ্যায়টি আমরা বিদগ্ধ গবেষক আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদের মন্তব্যের মাধ্যমে সমাপ্ত করতে চাই। বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগকালে হযরত উসমান (রা)-এর অবস্থান ও তাঁর জীবন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল-আক্কাদ বলেন, একজন ব্যক্তি হিসেবে খলীফা হযরত উসমান (রা)-এর জীবনে ঈমান ও বিশ্বাসের প্রভাব ঐ সকল গোষ্ঠীর তুলনায় অধিকতর প্রোজ্জ্বল ছিলো, যারা তাঁর সাথে বিবাদ করার জন্য ও তার কৈফিয়ত তলব করার জন্য বিভিন্ন শহর থেকে এসে জড়ো হয়েছিলো। অথচ তিনি ছিলেন সেই স্বল্প সংখ্যক লোকদের একজন, যাঁদের সম্পর্কে সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির পক্ষে এমন ধারণাও করা সম্ভব নয় যে, ইসলাম গ্রহণের পর যে অত্যুচ্চ চরিত্র-মহিমায় তাঁরা সুশোভিত হয়েছেন তারপর জাহিলিয়াত তাদেরকে সামান্যই স্পর্শ করতে পারে। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যা, পৃষ্ঠা-৭০৮]
আত্মারবিচার ও আত্মসমালোচনায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়। নিজের ও নিজ প্রিয়তম ব্যক্তির জীবন রক্ষার বিনিময়ে হলেও সাধারণ মানুষের প্রাণহানি না করার সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল। নিজে নিহত হওয়ার ব্যাপারে তিনি যখন নিশ্চিন্ত হলেন, তখন তাঁর হত্যা প্রচেঠায় অবরোধ আরোপকারীদের প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে তাঁর সাহাবায়ে কিরামের অবস্থান গ্রহণের আবেদন তিনি দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। খিলাফতের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর দাবি জানালে তাও তিনি দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু এ প্রত্যাখ্যান কোন মোহ বা আপত্তির কারণে ছিলো না। কেননা জীবনের চেয়ে প্রিয়তর কিছু তো হতে পারে না! আর সেই জীবনটাই ছিলো তাঁর কাছে তুচ্ছ। তদ্রূপ কেউ যেনো একথাও না ভাবে যে, খিলাফত থেকে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। কেননা সকল ঐতিহাসিক এই বিষয়ে একমত যে, দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণের দিন তাঁর সম্পদের পরিমাণ ছিলো খিলাফতের দায়িত্বভার লাভের দিনের তুলনায় কম।
খিলাফতের দায়িত্ব ত্যাগে তার অস্বীকৃতির কারণ ছিলো এই আশংকায় যে, তিনি পদত্যাগ করলে তা থেকে উদ্ভূত সংঘাত-সংঘর্ষের দায়ভাগ তাঁকেই বহন করতে হবে। একাধিকবার স্পষ্ট ভাষায় তিনি তা প্রকাশও করেছেন। তিনি বলেছেন, আজ যারা তাঁর শাসনকালকে অসহনীয় দীর্ঘ মনে করছে, হয়তো তারাই পরবর্তীতে আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তাঁর শাসনকাল যদি এক শত বছর দীর্ঘ হতো! সুতরাং স্বেচ্ছায় তিনি অশুভ পরিণতির পথ খুলে দিতে পারেন না।
তাছাড়া ঘটনা প্রবাহকে এক পাশে রেখে যদি আমরা আদর্শ ও বিশ্বাসের ধারক হিসেবে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে একথা বলা যায় যে, আমরা এমন একটি আঘাতের সম্মুখীন হবো, আকীদা ও বিশ্বাসের প্রভাব ও পর্যালোচনাকারী ব্যক্তি মাত্রকেই যার মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু যদি আমরা আদর্শ ও বিশ্বাসের মানদণ্ডে ঘটনা প্রবাহের বিচার করি এবং একথা মনে রাখি যে, ঘটনা-দুর্ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত থেকে ইতিহাস মুক্ত হতে পারে না এবং মানব সম্প্রদায় ও তার বিবেকের জন্য বিরোধ ও সংঘাতের ঘটনাবলীই সবচেয়ে বড় বিপদ নয়, তাহলেই এটা আর কোন মর্মান্তিক আঘাত নয়। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যা, পৃষ্ঠা-৭০৯]
আল-আক্কাদ তাঁর "আবকারিয়াত উসমান" গ্রন্থের শেষ দিকে লিখেছেন, হযরত উসমান (রা)-এর হত্যাকাণ্ড যদি এক চরম মন্দ ও অকল্যাণকর হয়ে থাকে তাহলে বলতেই হবে, জগতের অন্যান্য অকল্যাণের ন্যায় এই অকল্যাণের মাঝেও বিভিন্ন কল্যাণ নিহিত ছিলো, যা দুর্যোগের কালো ছায়া সরে যাওয়ার পর ব্যক্তি ও জাতির জীবন আজও অম্লান হয়ে আছে।
এ মর্মান্তিক ঘটনার একটি কল্যাণ হলো, এই সত্যের প্রতিষ্ঠা যে, চীনের সীমান্ত থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র শাসক যিনি তিনিও জনসাধারণের নিকট জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন। অবশ্য দুষ্কৃতিকারীরা উক্ত অধিকারের অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে অপব্যবহার করেছিলো। আরেকটি কল্যাণ হলো, ঈমান ও বিশ্বাসের সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা নব্বই বছরের নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধ চরম দুর্যোগ মুহূর্তে আপন বাসগৃহে অবরুদ্ধ ও পিপাসার্ত অবস্থায় উম্মতের সামনে রেখেছেন, অথচ তখন তিনি ইচ্ছা করলে হাজার হাজার সাহায্যকারী রক্তের নদী বইয়ে দিতো যেখানে এক ফোঁটা পানিও ছিলো দুষ্প্রাপ্য।
আলহাফেয তাকীউদ্দীন সাবকী (মৃ. ৭৫৬ হি.) বলেন, আমাদের আকীদা হচ্ছে এই যে, হযরত উসমান (রা) ছিলেন ইমামে হক। তিনি মজলুম অবস্থায় শহীদ হয়েছিলেন, তবে সাহাবা-কিরামকে আল্লাহ্ তাঁর হত্যাকাণ্ডে জড়িত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। বরং এক অবাধ্য অভিশপ্ত শয়তানের হাতে হযরত উসমানের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিলো। তদুপরি এমন একজন সাহাবীর কথাও আমাদের জানা নেই যিনি এ ঘৃণ্য কাজ বিন্দুমাত্র সমর্থন করেছেন, বরং তাদের প্রত্যেকের পক্ষ হতেই কঠোর নিন্দা সুপ্রমাণিত হয়েছে।